The Covenant - যুদ্ধের ময়দানে মানবিক দায়বদ্ধতা ও বন্ধুত্ব

Dec 19, 2025

গাই রিচি বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ব্রিটিশ গ্যাংস্টার ড্রামা, দ্রুতগতির সংলাপ আর ডার্ক হিউমার। কিন্তু ২০২৩ সালে তিনি যখন 'The Covenant' (বা 'Guy Ritchie's The Covenant') নির্মাণ করলেন, তখন বিশ্ব অবাক হয়ে দেখল এক অন্য রিচিকে। যুদ্ধ মানেই কি শুধু গোলাবারুদ, ধুলো আর রক্তের হোলি খেলা? অবশ্যই নয়! এই সিনেমাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মাঝেও বন্ধুত্ব, বিশ্বাস এবং মানবিক দায়বদ্ধতা কীভাবে ধ্রুবতারার মতো জ্বলে উঠতে পারে।

যুদ্ধের ময়দানে সম্পর্কের সমীকরণগুলো সবসময় খুব জটিল হয়। সেখানে কেউ কারোর আপন নয়, আবার কখনো কোনো অপরিচিত মানুষই হয়ে ওঠে জীবনের পরম ত্রাণকর্তা। গাই রিচি তাঁর ‘দি কভনেন্ট’ সিনেমায় ঠিক এই জটিল রসায়নকেই অত্যন্ত সহজ কিন্তু তীব্র আবেগের সাথে উপস্থাপন করেছেন। এটি কেবল একটি অ্যাকশন-থ্রিলার নয়, বরং এটি আত্মত্যাগ এবং দেওয়া কথা রাখার এক বিশাল লড়াই।

আজকের বিস্তারিত রিভিউ আর্টিকেলে আমরা যুদ্ধের ময়দানের সেই মানবিক মহাকাব্যের গভীরে প্রবেশ করব, যেখানে হৃদয়ই প্রধান মঞ্চ এবং অনুভূতিই একমাত্র ধ্রুবক।

গল্পের প্রেক্ষাপট - আফগানিস্তানের সেই উত্তাল সময়

সিনেমাটির পটভূমি তৈরি হয়েছে ২০১১ সালের আফগানিস্তান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। মার্কিন সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট জন কিনলি (জেক জিলেনহাল) এবং তাঁর অনুবাদক আহমেদ (দার সালিম)-কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে পুরো কাহিনি। আফগানিস্তানে তালেবানদের বিস্ফোরক তৈরির কারখানা খুঁজে বের করার মিশনে থাকা একটি ইউনিটের নেতৃত্ব দেন কিনলি। আর আহমেদ তাঁর ইউনিটে যোগ দেন অনুবাদক হিসেবে। তবে আহমেদ সাধারণ কোনো অনুবাদক ছিলেন না; তাঁর জীবনের নিজস্ব এক ট্র্যাজেডি আর তালেবানদের প্রতি তাঁর তীব্র ঘৃণা তাঁকে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামতে বাধ্য করেছিল।

গল্পের মোড় ঘুরে যায় যখন একটি মিশনে কিনলির পুরো ইউনিট ধ্বংস হয়ে যায় এবং কিনলি নিজে গুরুতর আহত হন। শত্রুবেষ্টিত পাহাড়ি অঞ্চলে একা হয়ে পড়া জখম কিনলিকে বাঁচানোর ভার এসে পড়ে আহমেদের ওপর। সেখান থেকেই শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য এবং শ্বাসরুদ্ধকর যাত্রার।

দুজন মানুষ এবং একটি অলিখিত অঙ্গীকার

সিনেমাটির নাম ‘The Covenant’ বা ‘অঙ্গীকার’ রাখার পেছনে গভীর তাৎপর্য রয়েছে। এটি কোনো আইনি চুক্তি নয়, বরং হৃদয়ের এক অলিখিত বন্ধন।

আহমেদের ত্যাগ: আহত কিনলিকে শত মাইল দুর্গম পাহাড় এবং তালেবানদের নজর এড়িয়ে নিজের কাঁধে করে বা ঠেলাগাড়িতে করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসার দৃশ্যগুলো দর্শকদের শিহরিত করবে। আহমেদ কেন নিজের জীবন বাজি রাখলেন? কারণ তিনি কিনলির মধ্যে এক অদ্ভুত সততা দেখেছিলেন।

কিনলির প্রতিদান: কিনলি যখন সুস্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান, তিনি জানতে পারেন আহমেদ এবং তাঁর পরিবার এখনো আফগানিস্তানে লুকিয়ে আছে এবং তালেবানরা তাঁদের হন্যে হয়ে খুঁজছে। মার্কিন প্রশাসন যখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আহমেদের ভিসা দিতে দেরি করে, তখন কিনলি স্থির থাকতে পারেননি। তিনি একা ফিরে যান সেই নরকে, যেখান থেকে একদিন আহমেদ তাঁকে ফিরিয়ে এনেছিলেন।

জেক জিলেনহাল - অভিনয়ের জাদুকর

আপনি জেক জিলেনহালকে ‘ওভাররেটেড’ মনে করতেই পারেন, কিন্তু এই সিনেমায় তাঁর অভিনয় আপনাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। সার্জেন্ট জন কিনলির চরিত্রে তাঁর শারীরিক পরিবর্তন এবং মানসিক টানাপোড়েন ছিল অনবদ্য। বিশেষ করে যখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন আহমেদের প্রতি তাঁর ঋণের বোঝা তাঁকে ঘুমাতে দেয় না সেই দৃশ্যগুলোতে জেকের চোখের চাহনি নীরব কান্নার চেয়েও বেশি তীব্র ছিল। এখানে তিনি শুধু অভিনয় করেননি, দর্শকদের সেই যন্ত্রণা অনুভব করিয়েছেন।

দার সালিম - গল্পের অপ্রকাশিত নায়ক

আহমেদ চরিত্রে দার সালিম ছিলেন সিনেমার তুরুপের তাস। তাঁর শান্ত কিন্তু দৃঢ় ব্যক্তিত্ব দর্শকদের মুগ্ধ করবেই। একজন বিদেশি সৈনিকের জন্য নিজের পুরো পরিবারকে ঝুঁকিতে ফেলার যে মানসিক সাহস, তা সালিম তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। জেক এবং সালিমের কেমিস্ট্রি সিনেমাটিকে সাধারণ ওয়ার-মুভি থেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

সিনেমাটোগ্রাফি ও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক

সিনেমাটির দৃশ্যধারণ করা হয়েছে স্পেনে, যা আফগানিস্তানের রুক্ষ এবং পাহাড়ি ভূখণ্ডকে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরেছে। সিনেমাটোগ্রাফার এড ওয়াইল্ডের ক্যামেরা যুদ্ধের ময়দানের ধুলোবালি থেকে শুরু করে রাতের আঁধারে শত্রুর ভয় সবই খুব কাছ থেকে দেখিয়েছে।

তবে আলাদা করে বলতে হয় এর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের কথা। ক্রিস্টোফার বেনস্টেড এর সুর প্রতিটি দৃশ্যের উত্তেজনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যখন আহমেদ আহত কিনলিকে নিয়ে পাহাড় ভাঙছিলেন, তখন সুরের মূর্ছনা দর্শকদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়। এটি কেবল সিনেমা নয়, বরং এক অভিজ্ঞতার দুনিয়া, যেখানে প্রতিটি নোট আপনার অনুভূতিকে স্পর্শ করবে।

গাই রিচির সিগনেচার স্টাইল এবং পরিবর্তন

গাই রিচি এই সিনেমায় তাঁর চিরাচরিত অতি-দ্রুত এডিটিং বা কমেডি ঘরানা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। এখানে তিনি অনেক বেশি সংযত এবং সিরিয়াস। যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা দেখানোর চেয়ে তিনি যুদ্ধের ময়দানে থাকা মানুষগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের গভীরতা দেখাতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। রিচির এই ‘ম্যাচিউর’ কাজ প্রমাণ করে যে তিনি যে কোনো জনরাতেই সমান দক্ষ।

বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে 'The Covenant'

২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পর হাজার হাজার আফগান অনুবাদক এবং তাঁদের পরিবার যে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিল, এই সিনেমাটি সেই করুণ বাস্তবতার এক প্রতিচ্ছবি। এটি কেবল কাল্পনিক গল্প নয়, বরং বাস্তবের সেই নাম না জানা হাজারো আহমেদের আর্তনাদ, যারা জীবন বাজি রেখে ভিনদেশি সৈন্যদের সাহায্য করেছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদের ভাগ্যে জোটে শুধু প্রতারণা কিংবা মৃত্যু। এই সিনেমাটি সেই নৈতিক দায়িত্ববোধের কথা মনে করিয়ে দেয় যা রাষ্ট্র ভুলে গেলেও একজন মানুষ ভুলতে পারে না।

এক নজরে সিনেমা তথ্যাবলি:

  • জনরা: ওয়ার - থ্রিলার - অ্যাকশন।

  • পরিচালক: গাই রিচি (Guy Ritchie)।

  • অভিনয়ে: জেক জিলেনহাল, দার সালিম, আলেকজান্ডার লুডউইগ।

  • রান টাইম: ২ ঘণ্টা ০৩ মিনিট।

  • আইএমডিবি রেটিং: ৭.৫/১০।

  • রোটেন টোমেটোস: ৮৩% ফ্রেশ।

  • ভাষা: ইংরেজি (হিন্দি ডাবিং এবং সাবটাইটেল সহ সহজলভ্য)।

কেন দেখবেন এই সিনেমাটি?

যুদ্ধের ময়দানে কত শত বীরত্বগাথা লেখা হয়, কিন্তু ‘The Covenant’ আপনাকে শেখাবে বিশ্বাস আর সমঝোতার শক্তি সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত বিপদকেও কীভাবে জয় করে নিতে পারে। এটি শুধু একটি মিশন সম্পন্ন করার গল্প নয়, এটি একজন মানুষের হারানো ঋণ পরিশোধের এবং নিজের সত্তাকে খুঁজে পাওয়ার গল্প।

আপনি যদি গতানুগতিক মারপিট বা শুধু দেশপ্রেমের সিনেমা দেখে ক্লান্ত হয়ে থাকেন, তবে গাই রিচির এই মাস্টারপিসটি আপনার জন্য। এটি আপনার চোখে জল আনবে, আবার আপনার মেরুদণ্ডে শীতল স্রোত বইয়ে দেবে উত্তেজনায়।

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.