ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড ও বিয়ার গ্রিলসের অজানা কিছু তথ্য

যে কারণে মেয়েরা বেশি বয়সী পুরুষদের জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ করে

টেলিভিশনের পর্দায় আমরা বহু ধরনের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখেছি নাটক, সিনেমা, গান বা নাচের রিয়েলিটি শো। কিন্তু ২০০৬ সালের শেষের দিকে বিশ্ববাসী এমন এক রিয়েলিটি শোর মুখোমুখি হয়, যা ড্রয়িংরুমের গণ্ডি পেরিয়ে দর্শকদের একলহমায় নিয়ে গিয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী, দুর্গম ও প্রাণঘাতী সব অঞ্চলে। অনুষ্ঠানের নাম ‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ (Man vs. Wild)

এটি কেবল একটি সাধারণ চাক্ষুষ বিনোদন ছিল না; এটি ছিল মানবজাতির আদিমতম চাওয়া ‘টিকে থাকা’ বা ‘সারভাইভাল’ (Survival)-এর এক অবিশ্বাস্য সামাজিক ও মানসিক দলিল। এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গল, বরফাবৃত পর্বতচূড়া থেকে তীব্র খরতপ্ত মরুভূমি কিংবা সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ সবখানেই একজন মানুষকে প্রকৃতির বৈরী রূপের মুখোমুখি একা দাঁড়িয়ে সংগ্রাম করতে দেখা গেছে। সেই দুঃসাহসী মানুষটি আর কেউ নন, তিনি বিয়ার গ্রিলস।

নিজের জীবনকে বারবার বাজিকরে বিয়ার গ্রিলস বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষকে শিখিয়েছেন কীভাবে চরম প্রতিকূল পরিবেশেও অদম্য মনোবল ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকা যায়। সাপ বা পোকামাকড়ের মতো জঘন্য খাবার কাঁচা চিবিয়ে খাওয়া থেকে শুরু করে মরুভূমির চোরাবালি, খাঁড়ি বা হিমবাহ পেরিয়ে ফিরে আসার দৃশ্যগুলো দর্শকদের একই সাথে শিউরে তুলেছে এবং মুগ্ধ করেছে। পাঁচ বছর ধরে টানা চলা এই শোটি পাঁচ মহাদেশের ১.২ বিলিয়নেরও বেশি মানুষের মনে স্থায়ী আসন গেড়ে নেয়।

ডিসকভারি চ্যানেলের এই মেগা হিট শো এবং এর কেন্দ্রবিন্দু বিয়ার গ্রিলসের জীবন শুধুই ক্যামেরায় দেখা রোমাঞ্চে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে সামরিক জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার গল্প, অনবদ্য টিমওয়ার্ক, আবার কিছু বিতর্ক ও নাটকীয় সত্য। বিয়ার গ্রিলস ও ‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’-এর সেই অবিশ্বাস্য ও অজানা ইতিহাসের আদ্যোপান্ত বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

এডওয়ার্ড মাইকেল গ্রিলস - ব্যক্তিগত পরিচয় ও শৈশবের শিকড়

জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে বিশ্ব যাকে 'বিয়ার গ্রিলস' নামে চেনে, তার পেছনের মানুষটির বাস্তব পরিচয় অনেকটাই ভিন্ন। ক্যামেরার সামনের দুঃসাহসিক পারফর্ম্যান্সের পেছনে কাজ করেছে তার পারিবারিক ঐতিহ্য ও সুশৃঙ্খল ব্যাকগ্রাউন্ড।

জন্ম ও বংশপরিচয়

বিয়ার গ্রিলসের আসল নাম এডওয়ার্ড মাইকেল গ্রিলস (Edward Michael Grylls)। তিনি ১৯৭৪ সালের ৭ জুন উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডোনাঘাডি (Donaghadee) শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার রগে রগে প্রবাহিত হচ্ছিল খেলাধুলা ও সামরিক দক্ষতার রক্ত।

পৈতৃক ক্রীড়া ঐতিহ্য: তার পিতামহ নেভিল ফোর্ড এবং প্র-পিতামহ উইলিয়াম অগাস্টাস ফোর্ড ছিলেন তৎকালীন ইংল্যান্ডের অত্যন্ত নামকরা ও প্রখ্যাত ক্রিকেটার।

পিতার সামরিক অনুপ্রেরণা: তার পিতা স্যার মাইকেল গ্রিলস ছিলেন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর (Royal Navy) সদস্য এবং পরবর্তীতে বিখ্যাত ‘রয়্যাল ইয়ট স্কোয়াড্রন’-এর সম্মানিত পদাধিকারী। ছোটবেলা থেকেই পিতা মাইকেল গ্রিলস বালক এডওয়ার্ডকে পাহাড়ে চড়া, সাগরে নৌকা চালানো এবং খোলা আকাশে ক্যাম্পিং করার দীক্ষা দিতেন।

‘বিয়ার’ নামের পেছনের গল্প

অনেকে মনে করেন যে বুনো প্রকৃতির সাথে লড়াই করেন বলেই হয়তো তিনি নিজেই পরে এই নাম গ্রহণ করেছেন। কিন্তু মূল ঘটনা সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেন, তার বয়স যখন মাত্র এক সপ্তাহ, তখন তার বড় বোন লারা ফসেট (Lara Fawcett) তাকে আদর করে ‘বিয়ার’ (Bear) বলে ডাকা শুরু করেন। ছোট্ট বোনটির দেওয়া সেই আদুরে ডাকনামটি পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে অ্যাডভেঞ্চার জগতের এক বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও বহুভাষাবিদ

অ্যাডোলেসেন্ট বয়সে বিয়ার ঐতিহ্যবাহী ইটন কলেজে পড়াশোনা করেন, যেখানে তিনি প্রথম ক্লাইম্বিং ও মার্শাল আর্টের প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি দুটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ড (UWE) এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত বার্কবেক কলেজ (Birkbeck College) থেকে স্প্যানিশ ও জার্মান সাহিত্যের ওপর দীর্ঘ পড়াশোনা সম্পন্ন করেন এবং ২০০২ সালে ২:২ অনার্স ডিগ্রি নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

সামরিক জীবন ও প্যারাশুট দুর্ঘটনায় মেরুদণ্ড ভাঙার ট্র্যাজেডি

ক্যামেরার সামনে বিয়ার গ্রিলস যেভাবে সিদ্ধান্ত নেন, তার পেছনে রয়েছে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সবচেয়ে এলিট ও নৃশংস সামরিক ইউনিটের দীর্ঘ কঠোর প্রশিক্ষণ।

২১ এসএএস (SAS) রেজিমেন্টে সার্ভিস

১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বিয়ার গ্রিলস ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বিশেষ সংরক্ষিত রিজার্ভ ফোর্স ২১ এসএএস (21 Special Air Service Regiment)-এ প্যারাটুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসএএস-এর নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন সামরিক পরীক্ষাগুলোর একটি। সেখানে নির্ঘুম রাতে পাহাড়ি চড়াই পার হওয়া, ম্যাপ ছাড়া নেভিগেশন এবং সারভাইভাল ট্রেনিংয়ের অভিজ্ঞতা লাভ করেন তিনি। তিনি সেখানে কম্ব্যাট সারভাইভাল, ট্র্যাকিং, আনআর্মড কম্ব্যাট, প্যারাসুট ড্রপ এবং ডেজার্ট-জঙ্গল ওয়ারফেয়ারে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন।

১৬,০০০ ফুট থেকে পতন ও অলৌকিক বেঁচে ফেরা

১৯৯৬ সালে জাম্বিয়ার মরু আকাশে এক সান্ধ্যকালীন ট্রেনিং মিশন চলাকালে ঘটে এক মর্মান্তিক ঘটনা। প্রায় ১৬,০০০ ফুট উচ্চতা থেকে বিমান থেকে ফ্রিফল লাফ দেওয়ার পর ৪,৫০০ ফুট উচ্চতায় পৌঁছালে তার মূল প্যারাশুটটি ছেঁড়ে যায়।

রিজার্ভ প্যারাশুট খুলতে দেরি হওয়ায় ভয়াবহ গতিতে মাটিতে এসে আছড়ে পড়েন বিয়ার। তীব্র আঘাতে তার মেরুদণ্ডের তিনটি হাড় (T8, T10, T11 vertebrae) চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের পর সরাসরি জানিয়ে দিয়েছিলেন, বিয়ার হয়তো আজীবনের জন্য পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়বেন এবং আর কখনো নিজে হেঁটে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না।

হেডলি কোর্টে পুনর্জন্ম ও সামরিক পদক

চিকিৎসকদের সেই হতাশাজনক ভবিষ্যদ্বাণীকে নিজের অদম্য মানসিক জোর দিয়ে ভুল প্রমাণিত করেন বিয়ার। ডিফেন্স মেডিকেল রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার 'হেডলি কোর্ট'-এ সুদীর্ঘ ১৮ মাস ধরে ফিজিওথেরাপির তীব্র যাতনা সহ্য করে তিনি কেবল স্বাভাবিক জীবনেই ফিরে আসেননি, বরং সামরিক জীবনে পান একের পর এক সর্বোচ্চ সম্মাননা:

২০১৩ সাল: বিয়ার গ্রিলসকে ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীর ‘লেফটেন্যান্ট কর্নেল অব রয়্যাল মেরিন রিজার্ভ’ (Honorary Lieutenant Colonel) উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

২০২১ সাল (জুন): ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সম্মানসূচক ‘কর্নেল’ (Honorary Colonel) পদমর্যাদা প্রদান করা হয়।

মৃত্যুর দুয়ার থেকে এভারেস্ট জয়

মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়ার মারাত্মক আঘাতের ঠিক ১৮ মাস পর যেখানে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক হাঁটাচলাই দুষ্কর সেখানে ২৩ বছর বয়সী তরুণ বিয়ার গ্রিলস একটি অসম্ভব স্বপ্ন বুকে ধারণ করেন। স্বপ্নটি ছিল পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থান এভারেস্ট জয় করা।

১৯৯৮ সালের ২৬ মে, মাত্র ২৩ বছর বয়সে বিয়ার গ্রিলস বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৮ মিটার) সফলভাবে আরোহণ করেন। তৎকালীন সময়ে তিনি ছিলেন সবচেয়ে কম বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে এভারেস্ট জয়ের রেকর্ডধারী।

তবে এই রেকর্ড অর্জনের পথটি মসৃণ ছিল না। অভিযানের সময় খুম্বু আইসফলে (Khumbu Icefall) ১৯,০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থানকালে তার পায়ের নিচের বরফ ধসে যায়। তিনি একটি গভীর হিমবাহের ফাঁকে (Crevasse) খসে পড়েন। সৌভাগ্যবশত তার সাথে থাকা রশি ও সঙ্গীর তাৎক্ষণিক উপস্থিতির কারণে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে সেযাত্রা রক্ষা পান তিনি।

‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ - বিশ্বজোড়া ইতিহাস ও প্রচারের নেপথ্য

এভারেস্ট জয় এবং এসএএস-এর অভিজ্ঞতার পর ডিসকভারি চ্যানেল বিয়ার গ্রিলসের ভেতরের সেই সারভাইভাল দক্ষতা ও টেলিভিশন পারসোনাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে। তৈরি হয় রিয়েলিটি শো-এর ইতিহাসের সবচেয়ে সফল কনসেপ্ট।

শো-এর শুভসূচনা ও পরিসংখ্যান

পাইলট এপিসোড: ২০০৬ সালের ১০ মার্চ ডিসকভারি চ্যানেল ‘দ্য রকিজ’ (The Rockies) শিরোনামে ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ডের পরীক্ষামূলক পাইলট পর্ব সম্প্রচার করে। দর্শকদের অভাবনীয় সাড়া দেখে চ্যানেল কতৃপক্ষ পূর্ণাঙ্গ সিরিজের অনুমোদন দেয়।

মূল সম্প্রচার: ২০০৬ সালের ১০ নভেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ শো চালু হয়।

সিজন ও পর্ব: ২০১১ সাল পর্যন্ত একটানা ৭টি সফল সিজনে মোট ৭৩টি নিয়মিত পর্ব এবং একাধিক বিশেষ 'বিহাইন্ড দ্য সিন' প্রচারিত হয়। এটি বিশ্বের ১৮০টিরও বেশি দেশে পৌঁছায় এবং সামগ্রিকভাবে ১.২ বিলিয়ন (১২০ কোটি) দর্শকের এক বিশাল বিশ্বস্ত ভিত্তি তৈরি করে।

বিভিন্ন অঞ্চলে শো-এর ভিন্ন ভিন্ন নামকরণ

বিশ্বের বৈচিত্র্যময় অঞ্চলের বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ডিসকভারি চ্যানেল শো-টিকে বিভিন্ন দেশে আলাদা আলাদা নামে প্রচার করত:

১. ‘Man vs. Wild’: যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ায় এই নামে প্রচারিত হতো।

২. ‘Born Survivor: Bear Grylls’: বিয়ারের নিজের দেশ যুক্তরাজ্যে এটি প্রচারিত হতো ‘বর্ন সারভাইভার’ নামে।

৩. ‘Ultimate Survival’: সমগ্র ইউরোপ, এশিয়া মহাদেশের বাকি অংশ এবং আফ্রিকা অঞ্চলে এটি ‘আল্টিমেট সারভাইভাল’ নামে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

চরম জঘন্য খাদ্যভ্যাস ও শারীরিক বিপদ

‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ শোর সবচেয়ে বিতর্কিত, একই সাথে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিক ছিল যেকোনো বিরূপ পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য বিয়ার গ্রিলসের বুনো ও জঘন্য সব খাবার গ্রহণের প্রবণতা।

বিয়ারের পাকস্থলীতে প্রবেশ করা অদ্ভুত সব খাবার

বিয়ার গ্রিলস ক্যামেরার সামনে বারবার দেখিয়েছেন যে, জঙ্গল বা মরুভূমিতে প্রোটিন ও পানির সঞ্চয় ধরে রাখাটা জীবনের মূল চাবিকাঠি। সেই খাতিরে তিনি গ্রহণ করেছেন।

পচা পশুর মাংস, তাজা শিকার করা কাঁচা মাছ ও হরিণের হৃৎপিণ্ড। বিশাল আকৃতির বিটল পোকা, শুঁয়োপোকা, বিছা ও বিষাক্ত মাকড়সা। হাতির মল চিপে পানি বের করে পান করা বা মরুভূমির চরম ডিহাইড্রেশনে নিজের মূত্র সংরক্ষণ করে পান করা।

জীবনের সবচেয়ে জঘন্য খাবারের অভিজ্ঞতা

শত শত অদ্ভুত খাবারের মাঝে বিয়ার গ্রিলসকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তার জীবনের খাওয়া সবচেয়ে জঘন্য ও বিষাক্ত অনুভূতির খাবার কোনটি ছিল? বিয়ার জানান, তাঁর খাওয়া সবচেয়ে খারাপ খাবার ছিল কাঁচা ছাগলের অণ্ডকোষ (Goat Testicles)। এটি মুখে দেওয়ার পর তীব্র দুর্গন্ধ ও স্বাদের কারণে তিনি ক্যামেরার সামনেই বমি করে ফেলেছিলেন। যদিও মধ্যপ্রাচ্য ও আরব বিশ্বের যাযাবর বা বেদুইন সম্প্রদায়ের মানুষ এটি নিয়মিত প্রোটিনের উৎস হিসেবে খেয়ে থাকে।

উচ্চতার চরম ভয় (Acrophobia)

শুনে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য যে, যে মানুষটি হাজার হাজার ফুট ওপর থেকে লাফ দেন, খাড়া ক্লিফ থেকে দড়ি বেয়ে নেমে যান সেই বিয়ার গ্রিলস ব্যক্তিগত জীবনে মারাত্মক উচ্চতা ভয়ে বা অ্যাক্রোফোবিয়া (Acrophobia)-য় ভোগেন!

বিয়ার বহু সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে এখনও তার বুক কেঁপে ওঠে। তবে তিনি এটিও প্রমাণ করেছেন যে প্রকৃত সাহসিকতা মানে ভয়ের অনুপস্থিতি নয়, বরং ভয়কে জয় করে লক্ষ্য পূরণ করা।

২২ বার মৃত্যুর খুব কাছাকাছি ও অ্যানাফিল্যাকটিক শক

ক্যামেরার পেছনের ঝুঁকিপূর্ণ কসরত করতে গিয়ে বিয়ার গ্রিলস কমপক্ষে ২১ থেকে ২২ বার সরাসরি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদের একটি ঘটেছিল যখন একটি সাপের কামড় বা মৌমাছির হুল থেকে তার শরীরে Anaphylactic Shock (তীব্র অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া) দেখা দেয়। তিনি অ্যালার্জিক হওয়ায় মৌমাছির কামড়ে তার মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে ফুলে যায় এবং শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়, যা দ্রুত চিকিৎসায় সেরে ওঠে।

ক্যামেরার পেছনের নাটকীয় সত্য - টিমওয়ার্ক, বিতর্ক ও ডিসক্লেমার

২০০৭ সাল নাগাদ ‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ যখন বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, ঠিক তখনই এটি ঘিরে দানা বাঁধে মারাত্মক সমালোচনার মেঘ। রিয়েলিটি শোর আড়ালে কিছু দৃশ্য আগে থেকে সাজানো বা কৃত্রিম বলে অভিযোগ ওঠে।

একাকী সারভাইভাল বনাম বিশালাকার টিম

শোতে দেখানো হতো যে বিয়ারকে একটি মানচিত্র বা কম্পাস ছাড়া সম্পূর্ণ অচেনা স্থানে একা হেলিকপ্টার থেকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, এটি ছিল এক সুবিশাল টিমওয়ার্ক।

সময়কাল: মাত্র ৪৫ মিনিটের এক-একটি পর্ব তৈরির জন্য পুরো টিমকে টানা ১০ থেকে ১২ দিন দুর্গম স্থানে অবস্থান করতে হতো।

ক্রু সদস্য: প্রতিটি অভিযানে বিয়ারের সাথে থাকত একাধিক বিশেষজ্ঞ ক্যামেরাম্যান, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার, রোপ সারভাইভাল এক্সপার্ট, নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং লোকাল গাইড।

ক্যামেরাম্যানদের অসম সাহস: বিয়ার যেসব পাহাড় থেকে লাফ দিতেন, যেসব গাছে উঠতেন বা নদী সাঁতরে পার হতেন তার ক্যামেরাম্যানদের ৪০ পাউন্ড (১৮ কেজি) ওজনের ভারী ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে ঠিক একই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে হতো।

নকল দৃশ্য ও ভুয়া শুটিংয়ের অভিযোগ

২০০৭ সালে শোর সাবেক সারভাইভাল পরামর্শক মার্ক ওয়াইনার্ট (Mark Weinert) অভিযোগ তোলেন যে শোর কিছু অংশ বাস্তবে ম্যানিপুলেট করা হয়েছে:

হাওয়াই পর্বের সত্যতা: হাওয়াইয়ের একটি পর্বে দেখানো হয় বিয়ার জনমানবহীন দ্বীপে রাতে সারভাইভ করছেন। কিন্তু বাস্তবে জানা যায়, তিনি এবং ক্রু মেম্বাররা কাছেই একটি বিলাসবহুল মোটেলে রাত কাটিয়েছিলেন।

কৃত্রিম ধোঁয়া ও সাজানো ভালুক: একটি আগ্নেয়গিরির পর্বে বিপদ বোঝাতে স্মোক মেশিন (Smoke Machine) দিয়ে কৃত্রিম ধোঁয়া তৈরি করা হয়েছিল। এমনকি একটি পর্বে বিয়ারের দিকে তেড়ে আসা 'ভালুক'-টি ছিল ভালুকের কস্টিউম পরা একজন ক্রু সদস্য!

রেডিমেড প্রোপস: অরিগনের গভীর জঙ্গলে ঘোড়া বাঁধার দড়ি বা কাঠ আগে থেকেই ক্রু মেম্বাররা সাজিয়ে রেখেছিলেন।

ডিসকভারি চ্যানেলের ডিসক্লেমার ও ক্ষমা

এই বিতর্ক বিশ্বব্যাপী শোর ভাবমূর্তি ধাক্কা দিলে ডিসকভারি চ্যানেল দ্রুত পদক্ষেপ নেয়।

ডিসক্লেমার সংযোজন (২০০৮): ২০০৮ সাল থেকে শোর প্রতিটি পর্বের শুরুতে স্পষ্ট ডিসক্লেমার দেওয়া শুরু হয়। এতে লেখা থাকতো: "বিয়ার গ্রিলস একা নন, তার সাথে একটি টিম রয়েছে এবং সুরক্ষার স্বার্থে কিছু দৃশ্য আগে থেকে পরীক্ষা বা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।"

বিয়ার গ্রিলসের প্রতিক্রিয়া: বিয়ার জনসম্মুখে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, "যদি কোনো দর্শক মনে করেন যে তাদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে, তবে আমি তার জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাই। আসল ব্যাকস্টেজ সত্যটা হয়তো রূপকথার গল্পের চেয়ে কিছুটা কম রোমাঞ্চকর, কিন্তু নিরাপত্তার খাতিরে এটা জরুরি ছিল।"

বিহাইন্ড দ্য সিনস প্রকাশ: চতুর্থ সিজন থেকে ডিসকভারি চ্যানেল নিয়মিত ‘Behind the Scenes’ পর্ব রিলিজ করা শুরু করে, যেখানে ক্যামেরাম্যানদের কষ্ট এবং লোকেশনের সত্যতা তুলে ধরা হয়।

ভিআইপি তারকামেলা - বিশ্বনেতা ও হলিউড মহাতারকাদের সাথে অভিযান

‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ এবং তার পরবর্তী সিক্যুয়েলগুলোতে বিয়ার গ্রিলসের সাথে যোগ দিয়েছিলেন বিশ্বের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, রাষ্ট্রপ্রধান ও হলিউড-বলিউডের মহাতারকারা।

বারাক ওবামা (আলাস্কা, ২০১৫)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পরিবেশ বিপর্যয় ও গ্লোবাল ওয়ার্মিং সম্পর্কে বিশ্বকে সচেতন করতে বিয়ার গ্রিলসের সাথে আলাস্কার দুর্গম হিমবাহে অভিযান চালান। এই পর্বে ওবামা ভালুকের অর্ধেক খেয়ে ফেলে যাওয়া কাঁচা স্যালমন মাছ আগুনে হালকা ঝলসে বিয়ারের সাথে শেয়ার করে খেয়েছিলেন।

নরেন্দ্র মোদি (জিম করবেট পার্ক, ভারত, ২০১৯)

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৯ সালে উত্তরাখণ্ডের জিম করবেট ন্যাশনাল পার্কে বিয়ার গ্রিলসের সাথে এক বিশেষ পর্বে অংশ নেন। সেখানে প্রতিকূল আবহাওয়ায় নদী পার হওয়া, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং প্লাস্টিক বর্জ্য বন্ধের বার্তা দেওয়া হয়। এটি ভারতে টেলিভিশনের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ টিআরপি লাভ করে।

হলিউড ও ক্রীড়া জগতের রথী-মহারথীরা

উইল ফেরেল (২০০৯): সুইডেনের বরফাবৃত অঞ্চলে জঘন্য রিইনডিয়ার মস (Reindeer Moss) খেয়ে সারভাইভ করেন।

জেক জিলেনহল (২০১১): আইসল্যান্ডের হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রায় মারাত্মক অভিযানে নামেন।

রজার ফেদেরার ও অক্ষয় কুমার: টেনিস কিংবদন্তি রজার ফেদেরারকে নিয়ে সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বত এবং ভারতীয় সুপারস্টার অক্ষয় কুমারকে নিয়ে বন্দিপুর টাইগার রিজার্ভে রোমাঞ্চকর পর্ব শুট করা হয়।

নেটফ্লিক্স যুগে পদার্পণ ও নতুন যুগের শোসমূহ

২০১২ সালে ডিসকভারি চ্যানেলের সাথে চুক্তির অর্থ ও সময়সূচী নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় ডিসকভারি বিয়ার গ্রিলসকে বরখাস্ত করে এবং ‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ বন্ধ হয়ে যায়। তবে বিয়ার থেমে থাকেননি। তিনি নতুন প্রযুক্তি ও ফরম্যাট নিয়ে ফিরে আসেন।

ইন্টারেক্টিভ শো ‘ইউ ভার্সেস ওয়াইল্ড’ (You vs. Wild - 2019)

২০১৯ সালে বিয়ার গ্রিলস নেটফ্লিক্সের সাথে বড় চুক্তি করেন। তিনি নিয়ে আসেন সম্পূর্ণ নতুন কনসেপ্টের ইন্টারেক্টিভ শো ‘ইউ ভার্সেস ওয়াইল্ড’। এখানে টিভির রিমোট বা মোবাইল টাচ দিয়ে দর্শক ঠিক করতেন বিয়ার পাহাড় থেকে লাফ দেবেন নাকি হেঁটে যাবেন, কিংবা তিনি সাপ খাবেন নাকি মাশরুম খাবেন!

বাস্তব অসুস্থতা: দর্শকের ভুল সিদ্ধান্তের পর্ব ধারণ করতে গিয়ে এক দৃশ্যে বিয়ার সত্যি সত্যি বিষাক্ত মাশরুম খেয়ে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবুও এই বিশ্বজনীন কনসেপ্ট ব্যাপক হিট করে।

২০২৫ সালের নতুন শো: ‘সেলিব্রিটি বিয়ার হান্ট’ (Celebrity Bear Hunt)

২০২৫ সালে ব্রিটিশ-মার্কিন যৌথ প্রযোজনায় নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায় ‘Celebrity Bear Hunt’

হোস্ট ও কনসেপ্ট: বিখ্যাত টিভি প্রেজেন্টার হলি উইলংবি (Holly Willoughby) এবং বিয়ার গ্রিলস যৌথভাবে এটি উপস্থাপনা করেন। সেন্ট্রাল আমেরিকার কোস্টারিকার গভীর জঙ্গলে ১২ জন নামিদামি সেলিব্রিটিকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং বিয়ার গ্রিলস নিজে একজন শিকারির মতো জঙ্গল চষে তাদের ‘হান্ট’ বা বন্দি করেন।

অঘটন ও ড্রামা: প্রথম পর্বেই টেনিস লিজেন্ড বরিস বেকার (Boris Becker) হাঁটুতে মারাত্মক চোট পেয়ে শো থেকে বাদ পড়েন। অন্য তারকা লোরেন্স লিয়েন (Laurence Llewelyn-Bowen) আতঙ্কে ভেবেছিলেন তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, যদিও পরে ডাক্তাররা নিশ্চিত করেন এটি ছিল চরম প্যানিক অ্যাটাক (Panic Attack)।

চিফ স্কাউট পদ, ব্যক্তিগত দ্বীপ ও অন্যান্য অর্জন

বিয়ার গ্রিলস কেবল ক্যামেরার রিয়েলিটি স্টারের গণ্ডিতেই নিজেকে আটকে রাখেননি। সমাজসেবা, তরুণ নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিজীবনের অদ্ভুত পছন্দের দিক থেকেও তিনি অনন্য।

যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ চিফ স্কাউট

২০০৯ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে বিয়ার গ্রিলস যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক ‘স্কাউট অ্যাসোসিয়েশন’-এর সর্বকনিষ্ঠ চিফ স্কাউট (Chief Scout) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ১৫ বছর এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। স্কাউটিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা লর্ড রবার্ট ব্যাডেন-পাওয়েলের পর বিয়ার গ্রিলসই হলেন ইতিহাসের দ্বিতীয় দীর্ঘমেয়াদী চিফ স্কাউট।

ওয়েলসের নিজস্ব নির্জন দ্বীপে অফ-গ্রিড জীবন

অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় এই মানুষটি পরিবার নিয়ে অবকাশ যাপনের জন্য বেছে নিয়েছেন পৃথিবীর যান্ত্রিকতাহীন এক নির্জন কোণ। ২০০১ সালে মাত্র ৯৫,০০০ ইউরো দিয়ে তিনি উত্তর ওয়েলসের উপকূলীয় এলাকা ‘সেন্ট টুডওয়াল’স ওয়েস্ট’ (St Tudwal’s West Island) নামক একটি সম্পূর্ণ নির্জন দ্বীপের ২০ একর জমি কিনে নেন।

দ্বীপের জীবন: এই দ্বীপে মূল ভূখণ্ডের কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, নেই কোনো সুপেয় পানির পাইপলাইন। রয়েছে কেবল একটি শতবর্ষী বাতিঘর এবং একটি পাথর দিয়ে তৈরি বাড়ি। তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে সেখানে সোলার প্যানেল ও অফ-গ্রিড লাইফস্টাইলে সময় কাটান।

৮৫টিরও বেশি বই ও লেখালেখি

বিয়ার গ্রিলস একজন অত্যন্ত সফল লেখক। তিনি এ পর্যন্ত ৮৫টিরও বেশি বই লিখেছেন। তার লেখা আত্মজীবনী ‘Mud, Sweat and Tears’ টানা কয়েক মাস সানডে টাইমস বেস্টসেলার তালিকায় ১ নম্বরে ছিল। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘Facing Up’, ‘Man vs. Wild: Survival Techniques’ এবং বেশ কিছু চিলড্রেনস অ্যাডভেঞ্চার ফিকশন। বিশ্বজুড়ে তার বই ২০ মিলিয়নেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে।

সমাজসেবা ও 'দ্য বিয়ার গ্রিলস ফাউন্ডেশন'

২০১০ সালে তিনি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পুনর্বাসন ও শিক্ষার জন্য ‘The Bear Grylls Foundation’ গঠন করেন। এছাড়া তিনি দীর্ঘকাল ধরে ইউনিসেফ (UNICEF), ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড (WWF) এবং সেভ দ্য চিলড্রেন-এর বৈশ্বিক অ্যাম্বাসেডর হিসেবে সমাজকল্যাণমূলক কাজ করে যাচ্ছেন।

ভারতীয় সেনাবাহিনী সম্পর্কিত সংবাদের সত্যতা

২০১৫ সালে ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ সহ কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ভুল সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে বিয়ার গ্রিলস নাকি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে ইচ্ছুক! তবে ঘটনা বিশ্লেষণ করে জানা যায় এটি সম্পূর্ণ ভুয়া সংবাদ ছিল। মূলত বিয়ার তার তরুণ বয়সে দার্জিলিং ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভ্রমণের সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর আতিথেয়তা ও সহায়তার কথা উল্লেখ করে একটি কৃতজ্ঞতামূলক কলাম লিখেছিলেন, যা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।

বিয়ার গ্রিলস ও ‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’-এর সামগ্রিক সারসংক্ষেপ

নিচে বিয়ার গ্রিলসের জীবন, সামরিক ক্যারিয়ার, ‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ শোর প্রধান পরিসংখ্যান ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর একটি সুনির্দিষ্ট তথ্যসারণী দেওয়া হলো:

ক্যাটাগরি / বিষয়

বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান

পূর্ণ নাম ও জন্ম

এডওয়ার্ড মাইকেল গ্রিলস (জন্ম: ৭ জুন, ১৯৭৪; ডোনাঘাডি, উত্তর আয়ারল্যান্ড)।

সামরিক পদবী ও ইউনিট

২১ এসএএস রেজিমেন্ট (১৯৯৪-১৯৯৭); সম্মানসূচক কর্নেল (ব্রিটিশ সেনাবাহিনী, ২০২১)।

জীবন রক্ষাকারী অলৌকিক ঘটনা

জাম্বিয়ায় ১৬,০০০ ফুট ওপর থেকে ফ্রিফলে মেরুদণ্ডের ৩টি হাড় চূর্ণ হওয়া থেকে ১৮ মাসে সুস্থতা।

মাউন্ট এভারেস্ট জয়

২৬ মে ১৯৯৮ (বয়স: ২৩ বছর); তৎকালীন সর্বকনিষ্ঠ ব্রিটিশ এভারেস্ট বিজয়ী।

ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড সূচনা

পাইলট: ১০ মার্চ ২০০৬ ('দ্য রকিজ'); নিয়মিত সম্প্রচার: ১০ নভেম্বর ২০০৬ - ২০১১।

শোর মোট প্রসার

৭টি সিজন, ৭৩টি মূল পর্ব, ১.২ বিলিয়ন (১২০ কোটি) বিশ্বব্যাপী দর্শক।

আঞ্চলিক নামসমূহ

Man vs. Wild (ইউএস/ভারত), Born Survivor (ইউকে), Ultimate Survival (ইউরোপ/আফ্রিকা)।

সবচেয়ে জঘন্য খাদ্যাভিজ্ঞতা

কাঁচা ছাগলের অণ্ডকোষ (Goat Testicles), নিজের মূত্র, ভালুক ও হাতির মলের রস।

সর্বোচ্চ পদের দায়িত্ব

যুক্তরাজ্যের চিফ স্কাউট (২০০৯-২০২৪); দ্বিতীয় দীর্ঘমেয়াদী চিফ স্কাউট।

হাই-প্রোফাইল অতিথি

বারাক ওবামা, নরেন্দ্র মোদি, উইল ফেরেল, জেক জিলেনহল, রজার ফেদেরার, অক্ষয় কুমার।

নেটফ্লিক্স প্রজেক্টসমূহ

You vs. Wild (২০১৯ - ইন্টারেক্টিভ), Celebrity Bear Hunt (২০২৫ - রিয়েলিটি শো)।

ব্যক্তিগত দ্বীপ

সেন্ট টুডওয়াল’স ওয়েস্ট (ওয়েলস); ২০ একরের বিদ্যুৎহীন ও আধুনিকতামুক্ত দ্বীপ।

গ্রন্থ প্রকাশনা

৮৫টির বেশি বই; ২০ মিলিয়ন কপি বিক্রি (আত্মজীবনী: Mud, Sweat and Tears)।

জীবনসংগ্রামের চিরন্তন শিক্ষা

‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ কেবল গুটিকয়েক ঝুঁকিপূর্ণ শট আর জঘন্য খাবার খাওয়ার সস্তা বিনোদন ছিল না; এটি ছিল আধুনিক সভ্যতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়া নমনীয় মানুষের জন্য এক মহা জাগরণী বার্তা। শত সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকা মানুষকে প্রাকৃতির বৈরী রূপের সামনে দাঁড় করিয়ে বিয়ার গ্রিলস দেখিয়েছেন ইচ্ছা শক্তি থাকলে মানুষ যেকোনো চরম পরিস্থিতি জয় করতে পারে।

যদিও শোর পেছনের বিশাল টিমওয়ার্ক বা নিরাপত্তার স্বার্থে প্রস্তুত করা কিছু দৃশ্য সমালোচিত হয়েছে, তবুও এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে বিয়ার গ্রিলস নিজের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে আমাদের শিখিয়েছেন সারভাইভালের মৌলিক মন্ত্র "Never Give Up" (কখনও হার মেনো না)

পাহাড়ের চূড়া থেকে সমুদ্রের অতল পর্যন্ত বিয়ার গ্রিলসের এই বীরত্বগাথা যুগের পর যুগ বিশ্ববাসীকে শেখাবে প্রকৃতির সাথে লড়াইয়ে জিততে হলে কেবল পেশিবহুল শরীরের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় একটি দৃঢ় অনমনীয় মন এবং বেঁচে থাকার অদম্য আকুতি।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.