যুদ্ধবিমান সম্পর্কে চমকপ্রদ ও অজানা কিছু তথ্য

যুদ্ধবিমান সম্পর্কে চমকপ্রদ ও অজানা কিছু তথ্য

আকাশের বুকে যখন শব্দের গতির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বেগে একটি ধাতব পাখি চিরে যায়, তখন পৃথিবীর বুকেও তার কম্পন অনুভূত হয়। ফাইটার জেট বা যুদ্ধবিমান কেবল সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়; এটি মানবজাতির প্রকৌশল, পদার্থবিজ্ঞান, অ্যারোডাইনামিকস এবং প্রযুক্তির সর্বোচ্চ শিখরের এক জীবন্ত উদাহরণ। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে যে দেশ আকাশের নিয়ন্ত্রণ দখল করতে পারে, যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণের ক্ষমতা তাদের হাতেই চলে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষলগ্নে প্রপেলার চালিত বিমান থেকে প্রথম জেট ইঞ্জিনের আবির্ভাব ঘটেছিল। মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই সাধারণ জেট প্রযুক্তি আজ রূপান্তরিত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রাডার-অদৃশ্য স্টেলথ (Stealth) প্রযুক্তি, এবং শব্দের গতির চেয়ে বহু গুণ দ্রুতগতির হাইপারসোনিক মারণাষ্ট্রে। আজকের ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানগুলো কেবল মানুষের আদেশে চলে না; এগুলো নিজেই ড্রোন বহরকে পরিচালনা করে এবং প্রতিপক্ষের চোখের অলক্ষে নিখুঁত আঘাত হানতে পারে।

এই নিবন্ধে আমরা যুদ্ধবিমানের প্রথম প্রজন্ম থেকে ষষ্ঠ প্রজন্মের বিবর্তনের গল্প, আকাশযুদ্ধের আধুনিক কৌশল এবং এমন ৩০টি অবিশ্বাস্য ও অজানা তথ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যা বিমান চলাচলের ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিকে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে সামনে নিয়ে আসবে।

ফাইটার জেটের প্রজন্মের ইতিহাস: প্রথম থেকে ষষ্ঠ প্রজন্ম

যুদ্ধবিমানের ইতিহাসকে মূলত ৬টি প্রজন্মে (Generations) ভাগ করা হয়। প্রতিটি প্রজন্ম তার পূর্ববর্তী প্রজন্মকে প্রযুক্তিগতভাবে পেছনে ফেলে আকাশযুদ্ধের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে।

প্রথম প্রজন্ম (১৯৪০ - ১৯৫০-এর দশক): সাবসোনিক ও প্রারম্ভিক জেট

প্রথম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানগুলোতে প্রথমবারের মতো পিস্টন ও প্রপেলার ইঞ্জিনের বদলে টার্বোজেট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। এই বিমানগুলোর গতি ছিল সাবসোনিক বা ট্রান্সসোনিক (শব্দের গতির নিচে বা কাছাকাছি)। অস্ত্র হিসেবে এদের মূল ভরসা ছিল ভারী মেশিনগান বা ক্যানন (কামান)। এদের কোনো জটিল রাডার বা গাইডেড মিসাইল ছিল না। মেসারশমিট মি ২৬২, মার্কিন এফ-৮৬ স্যাবরে এবং সোভিয়েত মিগ-১৫ এই যুগের অন্যতম প্রতিনিধি।

দ্বিতীয় প্রজন্ম (১৯৫০ - ১৯৬০-এর দশক): সুপারসনিক ও গাইডেড মিসাইল

এই প্রজন্মে ফাইটার জেটগুলো প্রথম শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিতে (সুপারসনিক) উড়ার সক্ষমতা অর্জন করে। প্রবর্তিত হয় ট্র্যাকিং রাডার এবং প্রাথমিক ইনফ্রারেড (তাপ-সংবেদনশীল) ও রাডার-গাইডেড এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল। ডানার নকশায় 'সুইপ্ট উইং' এবং 'ডেল্টা উইং' যুক্ত করে বায়ুর বাধা কমানো হয়। আইকনিক মিগ-২১ এবং মার্কিন এফ-১০৪ স্টারফাইটার ছিল এই যুগের মূল ভিত্তি।

তৃতীয় প্রজন্ম (১৯৬০ - ১৯৭০-এর দশক): মাল্টিরোল ও অ্যাডভান্সড অ্যাভিওনিক্স

তৃতীয় প্রজন্মে যুদ্ধবিমানগুলো কেবল আকাশে মারামারি (Dogfight) করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বহুমুখী ভূমিকার (Multirole) রূপ নেয়। আকাশ থেকে আকাশে এবং আকাশ থেকে মাটিতে আঘাত হানার ক্ষমতা সমন্বিত হয়। যুক্ত হয় পালস-ডপলার রাডার, অফ-অ্যাক্সিস মিসাইল, নাইট ভিশন এবং অটোমেটেড ফ্লাইট কন্ট্রোল। এফ-৪ ফ্যান্টম II এবং মিগ-২৩ এই যুগের সেরা উদাহরণ।

চতুর্থ ও ৪.৫ প্রজন্ম (১৯৭০ - ২০০০-এর দশক): ফ্লাই-বাই-ওয়্যার ও এএসএ রাডার

চতুর্থ প্রজন্মে অ্যারোডাইনামিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে সর্বোচ্চ গতিশীলতা (Maneuverability) নিশ্চিত করতে 'ফ্লাই-বাই-ওয়্যার' (Fly-By-Wire) ডিজিটাল কম্পিউটার সিস্টেম আনা হয়। পরবর্তীতে ৪.৫ প্রজন্মে যুক্ত হয় অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারো (AESA) রাডার, গ্লাস ককপিট, ক্যানার্ড ডানা এবং সুপারক্রুজ (আফটারবার্নার ছাড়াই শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিতে ওড়ার) সক্ষমতা। এফ-১৫, এফ-১৬, সু-২৭ এবং পরবর্তীতে ফ্রান্সের রাফাল ও ইউরোফাইটার টাইফুন এই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত।

পঞ্চম প্রজন্ম (২০০০ - ২০২০-এর দশক): স্টেলথ ও সেন্সর ফিউশন

পঞ্চম প্রজন্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অত্যন্ত কম রাডার দৃশ্যমানতা বা 'স্টেলথ' (Stealth) প্রযুক্তি। বিমানের নকশা এমনভাবে করা হয় এবং রাডার-শোষক পদার্থ (RAM) ব্যবহার করা হয় যাতে শত্রুর রাডারে বিমানটিকে একটি ছোট পাখির মতো দেখায়। এদের অস্ত্র রাখা হয় বিমানের পেটের ভেতরের ইন্টারনাল ওয়েপন বে-তে। এছাড়াও যুক্ত হয় 'সেন্সর ফিউশন', যা রাডার, ইনফ্রারেড এবং স্যাটেলাইট ডেটা একসাথে বিশ্লেষণ করে পাইলটকে ৩৬০ ডিগ্রি যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র দেয়। এফ-২২ র‍্যাপ্টর, এফ-৩৫, চীনের জে-২০ এবং রাশিয়ার সু-৫৭ এই প্রজন্মের উদাহরণ।

ষষ্ঠ প্রজন্ম (২০২০-এর দশক ও ভবিষ্যৎ): এআই উইংম্যান ও ডায়রেক্টেড এনার্জি

ছয় নম্বর প্রজন্ম হলো যুদ্ধক্ষেত্রের ডিজিটাল রূপান্তর। এতে কোনো কেবল-ভিত্তিক ককপিট সীমাবদ্ধতা থাকছে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) পাইলটের সহকারী হিসেবে কাজ করবে এবং আনম্যান্ড কমব্যাট অ্যারিয়াল ভেহিকল (UCAV) বা 'লয়াল উইংম্যান' ড্রোন বহরকে আকাশে বসেই নিয়ন্ত্রণ করবে। এগুলোতে ব্যবহৃত হচ্ছে অ্যাডাপটিভ সাইকেল ইঞ্জিন (যা প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি দক্ষতা বা গতি বাড়ায়) এবং লেজার অস্ত্রের মতো ডায়রেক্টেড এনার্জি ওয়েপন (DEW)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং এফ-৪৭ (NGAD), ইউরোপের টিম টেম্পেস্ট এবং চীনের জে-৩৬ প্রোটোটাইপ এই যুগের পথপ্রদর্শক।

বিভিন্ন প্রজন্মের ফাইটার জেটের প্রযুক্তির তুলনা

প্রজন্ম

প্রতিনিধিত্বকারী বিমান

সর্বোচ্চ গতি ও ক্রুজ সীমানা

রাডার ও সেন্সর প্রযুক্তি

প্রধান অস্ত্র ও ডিফেন্স সিস্টেম

১ম প্রজন্ম

Me 262, F-86 Sabre, MiG-15

গতি: ম্যাক ০.৯; উচ্চতা: ১৫,০০০ মিটার।

অপটিক্যাল সাইট, প্রাথমিক ভিজ্যুয়াল ট্র্যাকিং।

৩০ মিমি ক্যানন, অসংগঠিত রকেট।

২য় প্রজন্ম

MiG-21, F-104 Starfighter

গতি: ম্যাক ২.০; উচ্চতা: ১৮,০০০ মিটার।

রেঞ্জ-ফাইন্ডিং রাডার, ইনফ্রারেড ট্র্যাকার।

প্রাথমিক AIM-9 Sidewinder, R-3S মিসাইল।

৩য় প্রজন্ম

F-4 Phantom II, MiG-23

গতি: ম্যাক ২.২; উচ্চতা: ১৯,০০০ মিটার।

পালস-ডপলার রাডার, BVR (বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ)।

AIM-7 Sparrow, রডার জ্যামিং পড, গাইডেড বোম।

৪র্থ ও ৪.৫ প্রজন্ম

F-16, Su-35, Rafale, Typhoon

গতি: ম্যাক ২.২৫5; উচ্চতা: ২০,০০০ মিটার।

AESA রাডার, IRST (ইনফ্রারেড সার্চ অ্যান্ড ট্র্যাক)।

Meteor, AMRAAM, হাইপারসোনিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইল।

৫ম প্রজন্ম

F-22 Raptor, F-35, J-20, Su-57

গতি: ম্যাক ২.২৫; উচ্চতা: ২০,০০০+ মিটার।

লিপি (LPI) AESA রাডার, ৩৬০° সেন্সর ফিউশন।

অভ্যন্তরীণ ওয়েপন বে-তে অবস্থানরত গাইডেড মিসাইল, RAM কোটিং।

৬ষ্ঠ প্রজন্ম

Boeing F-47, Tempest, J-36

গতি: ম্যাক ৩.০+; উচ্চতা: ২২,০০০+ মিটার।

কোয়ান্টাম রাডার, AI প্রসেসিং, নেটওয়ার্কড ড্রোন লিংক।

ড্রোন সোয়ার্মিং, হাই-পাওয়ার লেজার, অ্যাডাপটিভ ইঞ্জিন।

আকাশে আধিপত্যের গোপন কাহিনী: ৩০টি বিস্ময়কর ও অজানা তথ্য

ফাইটার জেটের দীর্ঘ পথচলায় এমন কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা, প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং রোমাঞ্চকর তথ্য রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে। নিচে চারভাগে ৩০টি তথ্য উপস্থাপন করা হলো:

১. মেসারশমিট মি ২৬২: প্রথম অপারেশনাল জেট ফাইটার

১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্বে হিটলারের জার্মানি আকাশে নিয়ে আসে বিশ্বর প্রথম জেট ইঞ্জিন চালিত ফাইটার মেসারশমিট মি ২৬২ (Messerschmitt Me 262)। যেখানে মিত্রশক্তির প্রপেলার বিমানে সর্বোচ্চ গতি ছিল ঘণ্টায় ৪০০ মাইল, সেখানে মি ২৬২ ম্যাক ০.৯ (ঘণ্টায় প্রায় ৫৪০ মাইল) গতিতে উড়তে পারত। এর ৩০ মিমি কামান বোমারু বিমান ধ্বংস করে দিত। তবে হিটলার এটিকে আকাশ সুরক্ষার বদলে বোমারু বিমান হিসেবে ব্যবহারের ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এটি যুদ্ধের ফল পরিবর্তন করতে পারেনি। ২০২৬ সালেও এর প্রোটোটাইপ জার্মান মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে।

২. এফ-১১ টাইগার: নিজের গুলিতে নিজেই ধ্বংস হওয়া বিমান!

১৯৫৬ সালে মার্কিন নৌবাহিনীর পাইলট টম অ্যাট্রিজ জুনিয়র এফ-১১ টাইগার জেট নিয়ে একটি অদ্ভুত ও ঐতিহাসিক দুর্ঘটনার শিকার হন। তিনি আকাশে উড়ার সময় ২০ মিমি ক্যানন দিয়ে একঝাঁক গুলি ছোড়েন এবং এরপরই বিমানের নাক নিচের দিকে নামিয়ে দ্রুতগতিতে ডাইভ দেন। বিমানের গতি গুলির চেয়েছেও বেশি হওয়ায় এবং গুলির গতিপথ বাঁকা হয়ে আসায়, কয়েক সেকেন্ড পর তিনি নিজের ছোড়া সেই গুলির মুখোমুখি হন! গুলিগুলো বিমানের ইঞ্জিনে আঘাত করে এবং বিমানটি ক্র্যাশ করে। পাইলট অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও এটি ছিল ইতিহাসে প্রথম নিজের গুলিতে নিজের বিমান ধ্বংসের ঘটনা।

৩. এফ-১০৪ স্টারফাইটার: "মিসাইল উইথ এ ম্যান" ও উইডোমেকার

লকহিড এফ-১০৪ স্টারফাইটারের ডানাগুলো এত ছোট ও ধারালো ছিল যে রানওয়েতে রক্ষণাবেক্ষণের সময় টেকনিশিয়ানদের হাত কেটে যেত! একে বলা হতো "উইডোমেকার" বা বিধবা তৈরিকারী বিমান, কারণ এর অতিরিক্ত উচ্চ গতি (ম্যাক ২.২) এবং ছোট ডানার কারণে সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটিতেই বিমানটি ক্র্যাশ করত। পশ্চিম জার্মানির ব্যবহৃত ৯১৬টি স্টারফাইটারের মধ্যে ২৯২টি দুর্ঘটনায় পড়েছিল। ১৯৬০-এর দশকে রানওয়ে ছাড়াই উড়ার জন্য রকেট-বুস্টেড ZELL (Zero Length Launch) সিস্টেমে রকেটের মতো ঠেলে একে শূন্যে ছুড়ে মারা হতো।

৪. মিগ-১৫: কোরীয় যুদ্ধের ভয়াল ডার্ক হর্স

১৯৫০ সালের কোরিয়ান যুদ্ধে আমেরিকান বোমারু বিমানগুলোর ওপর আতঙ্ক হিসেবে দেখা দেয় Soviet MiG-15। এর 'সুইপ্ট উইং' ডিজাইন এবং অ্যালুমিনিয়াম ফিনিশিং একে মার্কিন এফ-৮০-এর চেয়ে অনেক গুণ বেশি গতি ও ম্যানুভারিং ক্ষমতা দিয়েছিল। একে থামাতে আমেরিকা তড়িঘড়ি করে এফ-৮৬ স্যাবরে যুদ্ধক্ষেত্র পাঠায়। উত্তর কোরিয়া আজও প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষায় মিগ-১৫-এর আধুনিকীকৃত সংস্করণ ব্যবহার করে।

৫. এফ-২২ র‍্যাপ্টর: পাইলটদের রহস্যময় হাইপক্সিয়া সমস্যা

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ৫মে প্রজন্মের স্টেলথ ফাইটার এফ-২২ র‍্যাপ্টরের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারী ছিল এর অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা (OBOGS)। উচ্চ উচ্চতায় উড়ার সময় বিমানের ইঞ্জিন থেকে কেবিনে বাতাস সরবরাহের সিস্টেমে ত্রুটির কারণে পাইলটরা অক্সিজেনের অভাবে (Hypoxia) অজ্ঞান হয়ে যেতেন বা তাদের দৃষ্টিভ্রম হতো। ২০১১-২০১২ সালে এই আতঙ্কে একাধিক পাইলট এফ-২২ উড়াতে অস্বীকার করেন এবং হুইসলব্লোয়ার হিসেবে সামনে আসেন। পরবর্তীতে কোটি কোটি ডলার খরচ করে এই ত্রুটি সংশোধন করা হয়।

৬. মিগ-২৫ ফক্সব্যাট: জাপানে পালিয়ে যাওয়া সোভিয়েত দানব

১৯৭৬ সালে ঠান্ডা যুদ্ধের অন্যতম বড় রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটে। সোভিয়েত পাইলট ভিক্টর বেলেনকো তাঁর MiG-25 ফাইটার জেট নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে সোজা জাপানের হাকোদাতে বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চান! পশ্চিমা বিশ্ব ভেবেছিল মিগ-২৫ হয়তো পুরোটা টাইটেনিয়াম দিয়ে তৈরি কোনো মহাকাশীয় বিমান। কিন্তু মার্কিন প্রকৌশলীরা পরীক্ষা করে অবাক হয়ে দেখেন বিমানটি আসলে ভারী স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে তৈরি, যাতে দুটি বিশাল প্রকাণ্ড ইঞ্জিন বসিয়ে দেওয়া হয়েছে কেবল ম্যাক ৩.২ গতি অর্জনের জন্য!

৭. এফ-১৪ টমক্যাট: হলিউড ও ইরানের রহস্যময় বন্ধন

১৯৮৬ সালের বিখ্যাত হলিউড সিনেমা 'টপ গান' (Top Gun)-এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয় ভ্যারিয়েবল-সুইপ উইংয়ের F-14 Tomcat। ডানা পেছনের দিকে গুটিয়ে এটি ম্যাক ২.৩৪ গতি তুলতে পারত। ১৯৭০-এর দশকে ইরানের শাহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৭৯টি এফ-১৪ কিনেছিলেন। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর মার্কিনদের সাথে ইরানের শত্রুতা তৈরি হলেও, ২০২৬ সালেও ইরান নিজস্ব প্রযুক্তি ও খুচরা যন্ত্রাংশ বানিয়ে প্রায় ৪০টি এফ-১৪ সফলভাবে আকাশে উড়িয়ে যাচ্ছে!

৮. স্যুডিশ সাব ৩৭ ভিগেন: এসআর-৭১-কে রাডার লক করার একমাত্র বীর

আমেরিকার অতি-গোপনীয় এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড যখন উচ্চ আকাশে ম্যাক ৩+ গতিতে উড়ত, তখন পৃথিবীর কোনো মিসাইল বা বিমান একে শনাক্ত করতে পারত না। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে সুইডেনের Saab 37 Viggen বিমানের পাইলটরা অনন্য এক ডাটা-লিঙ্ক ও হেড-অন ট্র্যাকিং রাডার ব্যবহার করে চালকের চোখের পলকে অতিক্রম করা এসআর-৭১-কে রাডার লক (Radar Lock) করতে সমর্থ হন। ইতিহাস জুড়ে এটিই একমাত্র যুদ্ধবিমান যা আনুষ্ঠানিকভাবে ব্ল্যাকবার্ডকে লক করতে পেরেছিল।

৯. এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড: মিসাইলকে পেছনে ফেলে যাওয়ার গতি

লকহিড এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড উঁচুতে পর্যবেক্ষণকারী এমন এক বিমান, যা ম্যাক ৩.৩ (ঘণ্টায় ২,১৯৩ মাইল) গতিতে উড়তে পারত। এর উড়ার নিয়মই ছিল যদি শত্রুপক্ষ কোনো অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট মিসাইল ছোড়ে, তবে পাইলটকে কোনো ম্যানুভার করতে হতো না; কেবল থ্রোটল বাড়িয়ে বিমানের গতি বাড়িয়ে দিতে হতো! মিসাইলের চেয়ে বিমান দ্রুতগতিতে ছুটে বেরিয়ে যেত। এর বডি টাইটেনিয়াম দিয়ে তৈরি হওয়ায় এবং বায়ুর ঘর্ষণে তাপমাত্রা ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ায় উড্ডয়নের সময় এটি দৈর্ঘ্যে কয়েক ইঞ্চি প্রসারিত হতো।

১০. এফ-২২ র‍্যাপ্টরের অদৃশ্য হওয়ার কৌশল

এফ-২২ র‍্যাপ্টরের বডির আয়তন একটি বিশালাকার বাসের সমান হলেও, শত্রুর রাডার স্ক্রিনে এর রাডার ক্রস-সেকশন (RCS) মাত্র একটি ছোট মার্বেল বা মৌমাছির সমান দেখা যায়! এর বডিতে থাকা বিশেষ ইপক্সি কোটিং ও অ্যাঙ্গেলড ফিউসেলেজ রাডার তরঙ্গকে শুষে নেয় অথবা অন্যদিকে প্রতিফলিত করে দেয়।

১১. এফ-৩৫: ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সামরিক প্রকল্প

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের F-35 Lightning II প্রকল্প মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সামরিক প্রোগ্রাম, যার পুরো লাইফ-সাইকেল খরচ ধরা হয়েছে ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার! এটি তিনটি সংস্করণে তৈরি F-35A (সাধারণ রানওয়ে), F-35B (উলম্বভাবে টেক-অফ ও ল্যান্ডিং বা STOVL), এবং F-35C (বিমানবাহী রণতরণীর জন্য)। ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১,১০০-এর বেশি এফ-৩৫ বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিশালী দেশে সার্ভিসে রয়েছে।

১২. সু-৫৭ ফেলন: রাশিয়ার থ্রাস্ট-ভেক্টরিং দানব

রাশিয়ার ৫ম প্রজন্মের স্টেলথ ফাইটার Su-57 Felon কেবল স্টেলথ প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না, এতে রয়েছে ৩ডি থ্রাস্ট ভেক্টরিং নোযল। এর ফলে ইঞ্জিন থেকে বের হওয়া ধোঁয়া বা গ্যাস যেকোনো দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। বিমানটি মাঝআকাশে থামার মতো গতি কমিয়ে 'পুগাচেভস কোবরা' (Pugachev's Cobra) ম্যানুভারের মাধ্যমে পেছনে থাকা শত্রু বিমানকে এক মুহূর্তে সামনে এনে মিসাইল ছুড়তে পারে।

১৩. চেংডু জে-২০: চীনের 'মাইটি ড্রাগন'

চীনের ১ম স্বদেশী ৫ম প্রজন্মের ফাইটার J-20 Mighty Dragon। এতে ব্যবহৃত হয়েছে ক্যানার্ড ডানা ও লং-রেঞ্জ স্ট্রাইক ডিজাইন। ২০২৬ সালের হিসাবে চীন ইতোমধ্যে ২৫০টির বেশি জে-২০ সার্ভিসে যুক্ত করেছে। এটি দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালীতে আমেরিকার আধিপত্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।

১৪. সেন্সর ফিউশন ও এফ-৩৫-এর ৪০০,০০০ ডলারের হেলমেট!

এফ-৩৫ বিমানের পাইলট যে হেলমেটটি পরেন (Helmet Mounted Display System - HMDS), তার একক দাম প্রায় ৪ লাখ মার্কিন ডলার! এই হেলমেটে বিমানের বাইরের ৬টি ইনফ্রারেড ক্যামেরার লাইভ ফিড সরাসরি পাইলটের চোখের সামনে প্রজেক্ট করা হয়। পাইলট যদি নিচের দিকে তাকান, তবে তিনি বিমানের মেঝে ভেদ করে নিচের মাটির দৃশ্য দেখতে পান যেন তিনি ককপিটে নয়, মহাশূন্যে ভেসে আছেন!

১৫. শেনিয়াং জে-৩৫: চীনের নতুন নেভাল স্টেলথ

চীন সম্প্রতি তাদের ৩য় বিমানবাহী রণতরণী 'ফুজিয়ান'-এর জন্য উন্মোচন করেছে J-35। এটি একটি স্টিলথ ক্যাটাপাল্ট-লঞ্চড যুদ্ধবিমান, যা আমেরিকার এফ-৩৫সি-এর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কাজ করবে। ২০২৬ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চিনের নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে।

১৬. মিগ-২১: ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত সুপারসনিক জেট

সোভিয়েত ইউনিয়নের MiG-21 বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় নির্মিত সুপারসনিক জেট ফাইটার। এটি ১১,০০০-এরও বেশি সংখ্যায় তৈরি করা হয়েছিল এবং বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশের বিমানবাহিনী এটি ব্যবহার করেছে। দীর্ঘ সাত দশক আকাশ কাঁপানোর পর, সম্প্রতি ভারত তাদের মিগ-২১ বহরকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর দিয়েছে।

১৭. এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন: আকাশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফাইটার

সাধারণ দুই ডানা ও একটি ইঞ্জিনের F-16 Fighting Falcon বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় যুদ্ধবিমান। বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত ৪,৬০০-এর বেশি এফ-১৬-এর মধ্যে আজও ২,০০০-এর বেশি বিমান ২৫টি দেশে সক্রিয় রয়েছে। এর আধুনিক 'ব্লক ৭০/৭২' ভার্সনে ৫ম প্রজন্মের রাডার প্রযুক্তি ও অ্যাভিওনিক্স যুক্ত করা হয়েছে।

১৮. এফ-১৫ই এক্স ঈগল II: বোমারু বিমানকেও হার মানানো পেলোড!

বোয়িংয়ের তৈরি F-15EX Eagle II হলো একটি আকাশ-দানব। এটি আকাশে প্রায় ২৯,৫০০ পাউন্ড (১৩.৩ টন) ওজনের অস্ত্র বহনে সক্ষম, যা বিশ্বের যেকোনো ফাইটার জেটের মধ্যে সর্বোচ্চ। এটি একক ফ্লাইটে ১২টি থেকে সর্বোচ্চ ১৩টি এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল বহন করে আকাশে 'অস্ত্রাগার' (Flying Arsenal) হিসেবে কাজ করতে পারে।

১৯. দাসো রাফাল: ফ্রান্সের ওমনিবোল সুপারস্টার

ফ্রান্সের Dassault Rafale এমন একটি বিমান যা একক মিশনে পরমাণু হামলা, এয়ার ডিফেন্স, গ্রাউন্ড অ্যাট্যাক এবং রিকনেসান্স একসাথে করতে পারে। একে বলা হয় 'ওমনিট্রোল' (Omnirole) বিমান। এরSPECTRA ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম প্রতিপক্ষের রাডারকে কৃত্রিম সিগন্যাল পাঠিয়ে বিভ্রান্ত করে দেয়। ভারত, মিশর ও ইন্দোনেশিয়া বর্তমানে রাফালের প্রধান ক্রেতা।

২০. ইউরোফাইটার টাইফুন: চার দেশের প্রযুক্তির মেলবন্ধন

যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি এবং স্পেন এই চার দেশের যৌথ উদ্যোগে তৈরি Eurofighter Typhoon ডেল্টা-ক্যানার্ড ডিজাইনের অন্যতম সেরা বিমান। এর 'ক্যাপটর-ই' (CAPTOR-E) AESA রাডার একই সাথে আকাশে একাধিক লক্ষ্যবস্তু লক করে Meteor মিসাইল ছুড়তে পারে, যা ১০০ কিলোমিটার দূরের টার্গেটও নিশ্চিত ধ্বংস করে।

২১. এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট: মার্কিন নৌবাহিনীর মূল কান্ডারী

মার্কিন বিমানবাহী রণতরণীগুলোর মেরুদণ্ড হলো F/A-18E/F Super Hornet। এর ব্লকে ৩ ভার্সনে স্যাটেলাইট যোগাযোগ, উন্নত কনফর্মাল ফিউয়েল ট্যাংক এবং IRST21 সেন্ট্রাল পড রয়েছে, যা স্টেলথ বিমানকেও তাপমাত্রার পার্থক্য দেখে ধরে ফেলতে পারে।

২২. চেংডু জে-১০: চীনের ভিগোরাস ড্রাগন

চীনের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ৪.৫ প্রজন্মের একক ইঞ্জিনের বিমান J-10C। এটি একটি ডেল্টা-ক্যানার্ড ডিজাইনের জেট যা কম খরচে চমৎকার ম্যানুভারিং দেয়। পাকিস্তান বিমানবাহিনী সম্প্রতি ৩৬টি J-10CE কিনে তাদের বিমানবহর আধুনিকায়ন করেছে।

২৩. সু-৩৫: ক্যানার্ড ছাড়াই অবিশ্বাস্য ম্যানুভারিং

রাশিয়ার Su-35 Flanker-E বিমানের কোনো ক্যানার্ড ডানা নেই, তবুও এর থ্রাস্ট ভেক্টরিং ইঞ্জিনের কারণে এটি আকাশে থমকে দাঁড়িয়ে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে যেতে পারে। আকাশযুদ্ধে এটি কাছাকাছি লড়াইয়ে (WVR) অত্যন্ত বিপজ্জনক।

২৪. সাব জেএএস ৩৯ গ্রিপেন: যেকোনো সাধারণ রাস্তায় ল্যান্ডিং সক্ষমতা!

সুইডেনের Saab JAS 39 Gripen বিমানটি তৈরি করা হয়েছে যুদ্ধকালীন চরম জরুরি পরিস্থিতির কথা ভেবে। এটি কোনো বড় রানওয়ে ছাড়াই সাধারণ হাইওয়ে বা পাকা রাস্তায় অবতরণ করতে পারে এবং মাত্র ১০ মিনিটে ৫ জন টেকনিশিয়ান মিলে এতে পুনরায় জ্বালানি ও মিসাইল ভরে আকাশে পাঠাতে পারেন!

২৫. বোয়িং এফ-৪৭ (NGAD): মার্কিনদের গোপন ষষ্ঠ প্রজন্ম

আমেরিকার নেক্সট জেনারেশন এয়ার ডোমিনেন্স (NGAD) প্রজেক্টের আওতায় তৈরি হচ্ছে Boeing F-47। এটি কেবল একটি বিমান নয়, এটি একটি "পরিবার"। বিমানের সাথে থাকবে একাধিক এআই ড্রোন (Loyal Wingman), যা শত্রু সীমানার ভেতরে ঢুকে আগে থেকে বোমাবর্ষণ করবে এবং প্রধান বিমানকে সুরক্ষা দেবে।

২৬. টিম টেম্পেস্ট / GCAP: যুক্তরাজ্য, ইতালি ও জাপানের মেগা প্রজেক্ট

যুক্তরাজ্য, ইতালি এবং জাপান একসাথে হাত মিলিয়ে তৈরি করছে ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান Tempest (Global Combat Air Programme)। এতে কোনো ফিজিক্যাল ড্যাশবোর্ড বা ডায়াল থাকবে না; পাইলট কেবল ভার্চুয়াল রিয়েলিটি গ্লাসের সাহায্যে ককপিট নিয়ন্ত্রণ করবেন। ২০৩৫ সালের মধ্যে এটি সার্ভিসে আসার কথা রয়েছে।

২৭. এফ/এ-এক্সএক্স: মার্কিন নৌবাহিনীর ষষ্ঠ প্রজন্মের ক্যারিয়ার ফাইটার

মার্কিন নৌবাহিনী তাদের সুপার হর্নেট বহরকে প্রতিস্থাপন করতে F/A-XX প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। এটি বিমানবাহী জাহাজ থেকে পরিচালিত হবে এবং সম্পূর্ণ টেল-লেস (লেজবিহীন) ডিজাইন ব্যবহার করবে যাতে এটি সব দিক থেকেই রাডারে অদৃশ্য থাকে।

২৮. কেএফ-২১ বোরামাই: দক্ষিণ কোরিয়ার এশীয় বিস্ময়

দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার যৌথ প্রচেষ্টায় তৈরি KF-21 Boramae। যদিও এটি ৪.৫ প্রজন্মের হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে, তবে এর ব্লকে ৩ আপগ্রেডে এটি অভ্যন্তরীণ ওয়েপন বে যুক্ত করে সম্পূর্ণ ৫ম ও ৬ষ্ঠ প্রজন্মের স্টেলথ ফাইটারে রূপান্তরিত হবে।

২৯. হাল এএমসিএ (HAL AMCA): ভারতের স্টেলথ স্বপ্ন

ভারত তাদের নিজস্ব ৫ম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান AMCA (Advanced Medium Combat Aircraft) তৈরির কাজে দ্রুত গতি এনেছে। এটি হবে জোড়া ইঞ্জিনের স্টেলথ ফাইটার, যাতে দেশীয় 'উত্তম' AESA রাডার এবং অন-বোর্ড অক্সিজেন মেকানিজম যুক্ত থাকবে। ২০৩০-এর দশকে এর প্রোটোটাইপ উড়ার কথা রয়েছে।

৩০. লেজার ওয়েপন ও ড্রোন সোয়ার্মিং (Swarm Drones)

ষষ্ঠ প্রজন্মের বিমানে প্রথাগত মিসাইলের স্থান দখল করতে যাচ্ছে ডায়রেক্টেড এনার্জি ওয়েপন (DEW) বা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেজার। এই লেজার রশ্মি সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে শত্রুর মিসাইল বা বিমানকে জ্বালিয়ে দিতে পারবে। পাশাপাশি একটি ফাইটার জেট থেকে একঝাঁক ছোট ছোট এআই ড্রোন (Swarm Drones) ছেড়ে দিয়ে পুরো শত্রুর এয়ার ডিফেন্স নেটওয়ার্ককে জ্যাম করে দেওয়া হবে।

জেট প্রোপালশন ও ইঞ্জিনিয়ারিং: মেকানিক্স ও থার্মোডাইনামিক্স

যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিনের ক্ষমতা সাধারণ বাণিজ্যিক বিমানের তুলনায় বহুগুণ বেশি। একটি আধুনিক ফাইটার জেটকে শব্দের চেয়ে ২-৩ গুণ দ্রুত উড্ডয়ন করাতে হলে অতি-উচ্চ তাপ ও চাপ সহ্য করতে পারে এমন প্রোপালশন সিস্টেমের প্রয়োজন হয়।

লো-বাইপাস টার্বোফ্যান ইঞ্জিন (Low-Bypass Turbofan)

বাণিজ্যিক বিমানগুলো হাই-বাইপাস টার্বোফ্যান ইঞ্জিন ব্যবহার করে যা জ্বালানি সাশ্রয়ী কিন্তু কম গতিশীল। পক্ষান্তরে, ফাইটার জেটে ব্যবহৃত হয় লো-বাইপাস টার্বোফ্যান (Low-Bypass Turbofan)। এতে সামনের ফ্যান দিয়ে প্রবেশ করা অধিকাংশ বাতাস সরাসরি দহন চেম্বারে (Combustion Chamber) প্রবেশ করে। এর ফলে ইঞ্জিনের ব্যাস ছোট রাখা সম্ভব হয়, যা বিমানের ফ্রন্টাল প্রফাইল কমিয়ে অ্যারোডাইনামিক দ্রুতি বজায় রাখে।

আফটারবার্নার (Afterburner / Reheat System)

যখন পাইলটকে দ্রুত গতি বাড়াতে হয় বা কম দূরত্বের মধ্যে টেক-অফ করতে হয়, তখন আফটারবার্নার অন করা হয়। দহন চেম্বার অতিক্রম করে আসা অতিরিক্ত অক্সিজেনের সাথে এগজস্ট পাইপের (Exhaust Pipe) ভেতরে সরাসরি অতিরিক্ত কাঁচা জ্বালানি স্প্রে করে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।

এর ফলে ইঞ্জিনের থ্রাস্ট (ধাক্কা দেওয়ার ক্ষমতা) মুহূর্তের মধ্যে ৫০% থেকে ৭০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তবে এতে জ্বালানি খরচের হার এতটাই বেড়ে যায় যে একটি ফাইটার জেট মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে তার সম্পূর্ণ ফুয়েল ট্যাংক খালি করে ফেলতে পারে।

থ্রাস্ট ভেক্টরিং (Thrust Vectoring Controls - TVC)

প্রথাগত বিমানে গতিপথ পরিবর্তনের জন্য কেবল ডানার অ্যারোন এবং লেজের রাডার (Rudder) ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সু-৩৫ বা এফ-২২-এর মতো আধুনিক বিমানে যুক্ত থাকে ৩ডি থ্রাস্ট ভেক্টরিং (3D TVC)। ইঞ্জিনের পেছনের গ্যাস নির্গমনের নোযল বা মুখটি যেকোনো দিকে (ডানে, বামে, ওপরে, নিচে) ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি পর্যন্ত বাঁকানো যায়।

এর ফলে বিমানটি বাতাসে ডানা না নাড়িয়েও কেবল ইঞ্জিনের পেছনের ধাক্কার দিক পরিবর্তন করে মুহূর্তে সাপের মতো মোড় নিতে পারে।

রাডার যুদ্ধ, স্টিলথ এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার (EW)

আধুনিক আকাশযুদ্ধ আর চোখে দেখার ওপর নির্ভর করে না; এটি খেলা হয় তড়িৎ-চৌম্বকীয় বর্ণালীর (Electromagnetic Spectrum) অদৃশ্য জগতে।

রাডার ক্রস-সেকশন (RCS) কমানোর ফিজিক্স

কোনো বস্তুর ওপর রাডার তরঙ্গ আঘাত করে ফিরে আসলে রাডার স্ক্রিনে বস্তুটির যে আকার ফুটে ওঠে, তাকে RCS (Radar Cross-Section) বলা হয়। একটি বাণিজ্যিক ৭৪৭ বিমানের RCS প্রায় ১০০ বর্গমিটার, কিন্তু এফ-২২-এর RCS মাত্র ০.০০০১ বর্গমিটার (একটি মার্বেলের সমান)। এটি অর্জনে প্রধান ৩টি কৌশল ব্যবহৃত হয়: ১. প্ল্যানফর্ম অ্যালাইনমেন্ট (Planform Alignment): বিমানের ডানার প্রান্ত, ক্যানার্ড এবং লেজের কোণগুলো এমনভাবে একই সমান্তরালে রাখা হয় যাতে রাডার সিগন্যাল উৎসের দিকে না ফিরে সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে চলে যায়। ২. RAM (Radar Absorbent Material): বিমানের বহিরাবরণে কার্বন-ফেরাইট উপাদানযুক্ত কোটিং দেওয়া হয়, যা আপতিত রাডার তরঙ্গের শক্তি শুষে নিয়ে তা তাপে রূপান্তর করে দেয়। ৩. ইনলেট এস-ডাক্ট (S-Duct): বিমানের ইঞ্জিনের ফ্যান ব্লেড রাডার তরঙ্গের বড় প্রতিফলক। তাই বাতাস প্রবেশের পথটিকে সর্পিল বা 'S' আকৃতির করা হয় যাতে রাডার তরঙ্গ সরাসরি ইঞ্জিনের ব্লেড ছুঁতে না পারে।

AESA রাডার বনাম PESA রাডার

PESA (Passive Electronically Scanned Array): এতে একটিমাত্র কেন্দ্রীয় ট্রান্সমিটার থাকে যা থেকে সিগন্যাল বিভিন্ন এন্টেনায় ভাগ হয়ে যায়।

AESA (Active Electronically Scanned Array): আধুনিকতম এই রাডারে হাজার হাজার (১,০০০ থেকে ২,০০০টি) ক্ষুদ্র টি/আর (Transmitter/Receiver) মডিউল থাকে। প্রতিটি মডিউল স্বাধীনভাবে ভিন্ন ভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে কাজ করতে পারে। ফলে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী সিগন্যাল পাঠাতে পারে, শত্রুর জ্যামিং সহ্য করতে পারে এবং অত্যন্ত কম শক্তিতে সিগন্যাল পাঠিয়ে LPI (Low Probability of Intercept) প্রযুক্তির সাহায্যে শত্রু রাডার সংকেত না জানিয়েই লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে।

চ্যাফ (Chaff) ও ফ্লেয়ার (Flare)

চ্যাফ (Chaff): যখন কোনো শত্রু বিমান বা এয়ার ডিফেন্স রাডার-গাইডেড মিসাইল নিক্ষেপ করে, তখন বিমান থেকে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল বা কাঁচের তন্তুর কোটিংযুক্ত হাজার হাজার ক্ষুদ্র কুচি বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এটি রাডার স্ক্রিনে এক প্রকাণ্ড কৃত্রিম মেঘের সৃষ্টি করে মিসাইলকে মূল বিমান থেকে দূরে সরিয়ে নেয়।

ফ্লেয়ার (Flare): ইনফ্রারেড বা তাপ-সংবেদনশীল মিসাইল (Heat-seeking Missile) থেকে বাঁচতে বিমান থেকে ম্যাগনেসিয়াম দহনের অতি-উচ্চ তাপমাত্রার (১,০০০°C+) জ্বলন্ত ফ্লেয়ার ছোড়া হয়। মিসাইল বিমানের ইঞ্জিনের উত্তাপ ছেড়ে এই অধিক উত্তপ্ত ফ্লেয়ারের দিকে ধাবিত হয়।

ডগফাইট ম্যানুভারস ও আকাশযুদ্ধের রণকৌশল

দৃশ্যমান সীমার মধ্যে (Within Visual Range - WVR) যখন দুটি শত্রু ফাইটার জেট মুখোমুখি মুখোমুখি হয়, তখন একে ডগফাইট (Dogfight) বলা হয়। ডগফাইটে জয়ী হওয়া বিমানের গতির চেয়ে পাইলটের সিদ্ধান্ত এবং ম্যানুভারিং কৌশলের ওপর নির্ভর করে।

ওওডিএ লুপ (OODA Loop)

মার্কিন বিমানবাহিনীর কর্নেল জন বয়ড আকাশযুদ্ধের জন্য OODA Loop তত্ত্ব আবিষ্কার করেন:

Observe (নিরীক্ষণ): সেন্সর ও চোখে মাধ্যমে শত্রুর অবস্থান দেখা।
Orient (পরিস্থিতি অনুধাবন): নিজের এবং শত্রুর গতি, উচ্চতা ও শক্তি বিশ্লেষণ করা।
Decide (সিদ্ধান্ত গ্রহণ): আক্রমণের কৌশল নির্ধারণ করা।
Act (বাস্তবায়ন): মিসাইল ছোড়া বা ম্যানুভার করা। যে পাইলট বা বিমানের কম্পিউটার এই ৪টি ধাপ প্রতিপক্ষের চেয়ে সামান্য কয়েক মিলিসেকেন্ড দ্রুত সম্পন্ন করতে পারে, সেই বিমানেই জয় আসে।

আইকনিক কিছু ডগফাইট ম্যানুভার

পুগাচেভস কোবরা (Pugachev's Cobra): বিমান সোজা উড়ার সময় হঠাৎ নাক খাড়া করে ৯০০ থেকে ১২০০ কোণে তুলে গতি এক লহমায় শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনে। এতে পেছনে তাড়া করে আসা শত্রু বিমান গতির কারণে মূল বিমানকে ওভারশুট করে সামনে চলে যায়, এবং পেছনের বিমানটি মুহূর্তে আক্রমণকারীতে পরিণত হয়।

হাই-ইয়ো-ইয়ো (High-Yo-Yo): কোনো শত্রু বিমানের পেছনে তাড়া করার সময় গতি বেশি থাকলে ওভারশুট এড়াতে পাইলট হঠাৎ বিমানকে ওপরের দিকে তুলে উচ্চতা অর্জন করেন (গতি কমে যায়), এরপর মোড় নিয়ে নিচে ডাইভ মেরে শত্রু বিমানের ঠিক পেছনে নিখুঁত কোণে অবস্থান নেন।

হার্বস্ট ম্যানুভার (Herbst Maneuver): পোস্ট-স্টল (Post-stall) গতিতে থ্রাস্ট ভেক্টরিং ব্যবহার করে বিমানের গতির সর্বনিম্ন পর্যায়ে অত্যন্ত ছোট বৃত্তে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে উল্টো দিকে মুখ করে নেওয়া।

বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং ও পাইলট ফিজিওলজি

যুদ্ধবিমান যতই উন্নত হোক না কেন, এর চূড়ান্ত সীমা নির্ধারিত হয় ককপিটে বসা মানুষের শরীরের সক্ষমতা দিয়ে।

জি-ফোর্স (G-Force) এবং G-LOC-এর ফিজিক্স

সাধারণ অবস্থায় আমরা ১G (পৃথিবীর স্বাভাবিক মাধ্যাকর্ষণ) অনুভব করি। কিন্তু একটি ফাইটার জেট যখন তীব্র গতিতে বাঁক নেয়, তখন পাইলটের শরীরে ৯G পর্যন্ত বল প্রযুক্ত হতে পারে। এর অর্থ হলো ৯জি শক্তিতে পাইলটের ৮০ কেজি ওজনের শরীর মুহূর্তের জন্য ৭২০ কেজি ভারী অনুভব করবে!

গোটানো প্রভাব (Blackout): ৯জি টানের ফলে শরীর থেকে রক্ত দ্রুত নিচের পায়ে এবং পেটে নেমে যায়। ফলে মস্তিষ্কে এবং চোখের রেটিনায় রক্তসংবহন বন্ধ হয়ে আসে। এতে পাইলট প্রথমে রঙ দেখার ক্ষমতা হারান (Greyout), তারপর সম্পূর্ণ অন্ধকার দেখেন (Blackout)।

G-LOC (G-induced Loss of Consciousness): মস্তিষ্কে রক্ত পৌঁছানো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে পাইলট ককপিটেই বেহুঁশ হয়ে পড়েন। এটি প্রতিরোধে পাইলটদের Anti-G Suit পরতে হয়। এই স্যুটটি তীব্র জি-টানের সাথে সাথে পাম্পের সাহায্যে পাইলটের পা ও পেটের ভেতরের ব্লাডারগুলোতে হাওয়া ভরে চিপে ধরে, যাতে রক্ত নিচের দিকে নামতে না পারে।

মার্টি-বেকার ইজেকশন সিট (Zero-Zero Ejection Seat)

বিমানে আগুন ধরে গেলে বা ধ্বংস হওয়ার মুখে পড়লে পাইলটকে বাঁচায় ইজেকশন সিট (যেমন Martin-Baker MK16)। আধুনিক ইজেকশন সিটগুলোকে বলা হয় "Zero-Zero" সিট। এর অর্থ হলো বিমান যখন মাটি স্পর্শ করে সম্পূর্ণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকবে (০ গতি ও ০ উচ্চতা), তখনও ইজেকশন বাটন চাপলে এটি কাজ করবে।

বাটন টানার সাথে সাথেই ককপিটের ওপরের কাঁচের ক্যানোপি রকেট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয় এবং ইজেকশন সিটের পেছনের ক্ষুদ্র রকেট মোটর জ্বলে উঠে পাইলটকে ১৫ থেকে ২০জি শক্তিতে ০.২ সেকেন্ডের মধ্যে বিমান থেকে ১০০ ফুট ওপরে ছুড়ে দেয়, এরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্যারাশুট খুলে যায়।

বিশেষায়িত মিশন ও রিফুয়েলিং সায়েন্স

যুদ্ধবিমান কেবল নিজেদের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও অস্ত্র নিয়ে সব মিশন শেষ করতে পারে না। এজন্য প্রয়োজন পড়ে বিশেষ সাপোর্ট প্ল্যাটফর্মের।

এয়ার-টু-এয়ার রিফুয়েলিং (Air-to-Air Refueling)

মাঝআকাশে জ্বালানি ভরার জন্য প্রধানত দুটি পদ্ধতি রয়েছে: ১. Flying Boom System (মার্কিন বিমানবাহিনী): ট্যাংকার বিমানের পেছনের একজন অপারেটর মেকানিক্যাল বুম (শক্ত পাইপ) নিয়ন্ত্রণ করে ফাইটার জেটের রিসেপ্টাকলে সংযোগ দেন। এতে প্রতি মিনিটে সর্বোচ্চ ৬,০০০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি দ্রুত স্থানান্তরিত হয়। ২. Probe-and-Drogue System (মার্কিন নৌবাহিনী ও ইউরোপ): ট্যাংকার বিমান থেকে নমনীয় হোস বা পাইপ ছেড়ে দেওয়া হয়, যার মাথায় একটি প্যারাসুটের মতো ঝুড়ি (Drogue) থাকে। ফাইটার জেটের পাইলট নিজের বিমানের সামনের দীর্ঘ রড (Probe) সাবধানে সেই ঝুড়ির ভেতরে ঢুকিয়ে জ্বালানি নেন।

ওয়াইল্ড উইজেল (Wild Weasel / SEAD) মিশন

SEAD (Suppression of Enemy Air Defenses) মিশন হলো আকাশযুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক অপারেশন। এর মূল উদ্দেশ্য শত্রুর রাডার এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা। 'ওয়াইল্ড উইজেল' নামে পরিচিত বিশেষ বিমানগুলো (যেমন F-16CJ) ইচ্ছা করে শত্রুর বিপজ্জনক রাডার সীমানায় প্রবেশ করে নিজেদের টার্গেট বানায়।

শত্রুর রাডার যখন বিমানটিকে শনাক্ত করার জন্য সিগন্যাল অন করে (Radar Lock), তখনই ফাইটার জেট থেকে AGM-88 HARM (High-speed Anti-Radiation Missile) নিক্ষেপ করা হয়। এই মিসাইলটি শত্রু রাডারের নির্গত রেডিও তরঙ্গ ধরে সরাসরি তার এন্টেনায় গিয়ে আঘাত হানে।

ইতিহাসের ৩টি যুগান্তকারী আকাশযুদ্ধ ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা

যুদ্ধবিমানের নকশা ও যুদ্ধের নীতি পরিবর্তনে ৩টি ঐতিহাসিক যুদ্ধ বড় ভূমিকা রেখেছিল:

অপেরেশন মোল ক্রিকেট ১৯ (১৯৮২)

লেবাননের বেকা উপত্যকায় ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ও সিরীয় বিমানবাহিনীর মধ্যে এই যুদ্ধ ঘটে। এটি ইতিহাসে সবচেয়ে একপাক্ষিক আকাশযুদ্ধ হিসেবে পরিচিত, যেখানে ইসরায়েল সিরিয়ার ৮২টি ফাইটার জেট (MiG-21 ও MiG-23) ধ্বংস করে একটি বিমানও না হারিয়ে (৮২:০ স্কোর!)।

ইসরায়েল প্রথমবার রিয়েল-টাইমে ড্রোন (UAV), ই-২সি হাওকি (AWACS) এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্ল্যাটফর্ম একসাথে ব্যবহার করে সিরিয়ার রাডার ও যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিকল করে দিয়েছিল। এই যুদ্ধ আধুনিক নেটওয়ার্ক-সেন্ট্রিক ওয়ারফেয়ারের ভিত্তি স্থাপন করে।

ফকল্যান্ডস যুদ্ধ (১৯৮২)

আর্জেন্টিনার শক্তিশালী ফরাসি-নির্মিত মিরাজ-৩ (Mirage III) এবং সুপার ইটেনডার্ড জেটের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের ছোট আকারের Sea Harrier (VSTOL) জেটের লড়াই। সিয়া হ্যারিয়ার ডানা ঘুরিয়ে সোজা ওপরে উঠতে বা বাতাসে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে পারত (Vectoring In Forward Flight - VIFF)।

হ্যারিয়ার বিমানগুলো কম গতি থাকা সত্ত্বেও অভিনব অ্যারোডাইনামিক ম্যানুভারিং এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা উন্নত 'AIM-9L Sidewinder' মিসাইল ব্যবহার করে ২১টি আর্জেন্টাইন বিমান ধ্বংস করে দেয়।

গালফ ওয়ার (১৯৯১)

প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে আমেরিকার F-117 Nighthawk স্টেলথ ফাইটার দিয়ে বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ স্টেলথ আক্রমণ পরিচালিত হয়। বাগদাদের অত্যন্ত সুরক্ষিত আধুনিক সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার (IADS) চোখ এড়িয়ে এফ-১১৭ বিমানগুলো শহরের প্রাণকেন্দ্রে কোনো ক্ষতি ছাড়াই নিখুঁত লেজার-গাইডেড বোমা ফেলে কমান্ড সেন্টার ধ্বংস করে দেয়। এই যুদ্ধ বিশ্বকে বার্তা দেয় যে স্টেলথ প্রযুক্তি ছাড়া ভবিষ্যতে আকাশযুদ্ধ অসম্ভব।

আকাশযুদ্ধের এই বিবর্তন প্রমাণ করে যে ফাইটার জেট কেবল একটি আক্রমণাত্মক হাতিয়ার নয়, এটি আধুনিক বিজ্ঞানের জটিলতম পরীক্ষাগার। অ্যারোডাইনামিকসের সূক্ষ্ম ভারসাম্য, রাডার সিগন্যালের আড়াল এবং ককপিটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোজন মানবসভ্যতাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যেখানে আকাশ জয়ের লড়াই মানুষ এবং অ্যালগরিদমের যৌথ প্রচেষ্টায় পরিচালিত হচ্ছে।

ভবিষ্যতের আকাশযুদ্ধ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, হাইপারসোনিক ও ড্রোন সোয়ার্মিং

যুদ্ধবিমানের ভবিষ্যৎ রূপরেখা কেবল গতি বা স্টেলথের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হচ্ছে না; এটি পরিচালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ ডিজিটাল নেটওয়ার্কিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দ্বারা।

ম্যানড-আনম্যানড টিমিং (MUM-T)

ভবিষ্যতের বিমানযুদ্ধে একজন মানব পাইলট একা যুদ্ধ করবেন না। তাঁর বিমানের সাথে কম্পিউটারের দ্বারা যুক্ত থাকবে ৩ থেকে ৬টি এআই-চালিত চালকহীন যুদ্ধবিমান (Loyal Wingmen)। পাইলট ককপিটে বসে কেবল মূল সিদ্ধান্ত দেবেন, আর এআই ড্রোনগুলো বিপজ্জনক জোনে ঢুকে প্রাক-আক্রমণ চালাবে, রাডার জ্যাম করবে অথবা নিজের জীবন দিয়ে মানব পাইলটের বিমানকে শত্রুর মিসাইল থেকে রক্ষা করবে।

হাইপারসোনিক অস্ত্রের ব্যবহার

শব্দের চেয়ে ৫ গুণ বা তারও বেশি দ্রুতগতিসম্পন্ন (ম্যাক ৫+) হাইপারসোনিক গ্লাইড ভেহিকল এবং ক্রুজ মিসাইল এখন যুদ্ধবিমানের মূল অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। এই মিসাইলগুলোর গতি এত বেশি এবং এগুলো আকাশেই গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে বলে পৃথিবীর বিদ্যমান কোনো এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম (যেমন Patriot বা S-400) এদের আটকাতে পারে না।

অ্যাডাপটিভ সাইকেল ইঞ্জিন (Adaptive Cycle Engine)

প্রথাগত জেট ইঞ্জিনগুলো হয় বেশি গতি দেয়, না হয় জ্বালানি বাঁচায়। কিন্তু আধুনিক অ্যাডাপটিভ ইঞ্জিনগুলো উড়ার মাঝপথে নিজেদের ভেতরের বাতাস প্রবাহের পথ (Bypass Ratio) পরিবর্তন করতে পারে। যখন বিমানটি দূরবর্তী গন্তব্যে যাবে, তখন এটি সাধারণ বাণিজ্যিক বিমানের মতো কম জ্বালানি খরচ করবে; আবার যখনই যুদ্ধ শুরু হবে, এটি মুহূর্তেই নিজেকে হাই-থ্রাস্ট সুপারসনিক ইঞ্জিনে রূপান্তর করে নেবে।

প্রথম রাইট ব্রাদার্সের মাত্র ১২ সেকেন্ডের কাঠের কাঠামোর উড্ডয়ন থেকে শুরু করে আজকের এআই-চালিত, লেজার সজ্জিত এবং শব্দের চেয়ে বহু গুণ দ্রুতগতির ষষ্ঠ প্রজন্মের ফাইটার জেট মানবধর্মী প্রযুক্তিগত বিবর্তনের এক অবিশ্বাস্য মহাকাব্য। আকাশ জয় করার এই প্রচেষ্টা কেবল সামরিক শক্তিমত্তার প্রতিযোগিতা নয়, এটি পদার্থবিজ্ঞান, মেটেরিয়াল সায়েন্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চরম পরীক্ষার ক্ষেত্র। প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতি যেমন মানবসমাজকে বিস্ময়াবিষ্ট করে, তেমনই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আকাশ সীমানা নয়, বরং আকাশ হলো প্রযুক্তির অসীম সম্ভাবনার এক উন্মুক্ত ক্যানভাস।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.