বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র যে ১০টি জেলার মানুষ
আপনি কি জানেন, বাংলাদেশে এমন কিছু জেলা আছে যেখানে দুই বেলার খাবার জোটে না বহু মানুষের ঘরে? যেখানে শিশুরা স্কুলে কিংবা খেলার মাঠে নয়, জীবিকার তাগিদে মাঠে যায় কাজ করতে? অথবা এমন পরিবার আছে যারা মাসের পর মাস নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কিনতে হিমশিম খায়? স্বপ্নের সোনার বাংলায় একদিকে যখন মেট্রোরেল ছুটছে মাথার ওপর দিয়ে, অন্যদিকে তখন দেশের কিছু প্রান্তিক জেলা আজও যেন আটকে আছে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে। বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র যে ১০টি জেলা র মানুষ।
একদিকে মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার আর ডিজিটাল বাংলাদেশ – আর অন্যদিকে আজও কিছু জেলা রয়েছে যেখানে প্রতিদিনের জীবন মানেই যুদ্ধ, সংগ্রাম, আর অজস্র সীমাবদ্ধতা। আজকে আমরা জানবো বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র ১০টি জেলার কথা – যেসব জেলার মানুষ প্রতিদিন সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার জন্য। আমরা তুলে ধরবো জেলাগুলোতে দারিদ্র্যের হার কত এবং কেন এই জেলাগুলো পিছিয়ে আছে।
আপনার যদি দেশের উন্নয়ন, বৈষম্য, কিংবা সামাজিক ন্যায়ের বিষয়ে আগ্রহ থাকে – তাহলে এই ভিডিও আপনার জন্য। ভিডিওটি শেষ পর্যন্ত দেখুন, চোখ রাখি দেশের বাস্তবতায় এবং বুঝে নেই – দারিদ্র্যের মানচিত্রে কোথায় দাঁড়িয়ে আমাদের বাংলাদেশ।
১. মাদারীপুর
বাংলাদেশের একটি দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা মাদারীপুর, যা পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত। মাদারীপুর জেলা এক সময় রাজনৈতিক প্রভাবশালী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত হলেও, বর্তমানে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র জেলা। এ জেলার দারিদ্র্যের হার ৫৪.৪%! প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৬০ জন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। বিশেষ করে ডাসার উপজেলা, যেখানে দারিদ্র্যের হার ৬৩.২% এবং এ উপজেলা বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চল।
পিছিয়ে পড়ার কারণ: মাদারীপুরের অর্থনীতি প্রধানত কৃষিনির্ভর। নৌপথনির্ভর এই জেলায় শিল্পায়ন ও আধুনিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম না থাকায় কর্মসংস্থানের ঘাটতি দারিদ্রতার বড় কারণ। পদ্মা নদীর কারণে জেলার বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল। বন্যা ও নদীভাঙন নিয়মিত ক্ষতি করে। কৃষি জমি হারিয়ে মানুষ ভূমিহীন হয়ে পড়ে, জীবিকা হারায়। শিক্ষার হার কম ও প্রবাসী কম থাকায় এই অঞ্চলে বেকারত্ব অনেক বেশি। মাদারীপুর জেলার এই ভয়াবহ দারিদ্র্যতা শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়, বরং এটি জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ায় মাদারীপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শিল্প ও বাণিজ্য উন্নতকরণ এবং প্রবাসী আয় বৃদ্ধি করলে দারিদ্রতা অনেক কমতে পারে।
২. নরসিংদী
ঢাকার কাছাকাছি হলেও নরসিংদী জেলায় দারিদ্র্য মারাত্মকভাবে দৃশ্যমান। শিল্প ও কৃষিতে সম্ভাবনাময় হলেও এটা বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ দরিদ্র জেলা। নরসিংদীতে দারিদ্র্যের হার ৪৩.৭%। উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার পরও এই জেলার দারিদ্র্যতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। নরসিংদী জেলার বেলাবো উপজেলা বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরিদ্র অঞ্চল, যেখানে দারিদ্র্যের হার ৪৯.৫%।
পিছিয়ে পড়ার কারণ: নরসিংদীর শহর ও শিল্পাঞ্চল উন্নত হলেও গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকাগুলো উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। এই জেলা শিল্পপ্রধান হলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায় না। শিক্ষার হার অনেক কম হওয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠী উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত হতে পারে না। সড়ক, স্বাস্থ্যসেবা ও বিদ্যুৎ এর অনেক সমস্যা এই জেলার দারিদ্রতার অন্যতম কারণ। শিল্পসমৃদ্ধ জেলা হয়েও নরসিংদী জেলার উচ্চ দারিদ্র্যের হার জাতীয় উদ্বেগের বিষয়।
৩. পিরোজপুর
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত পিরোজপুর জেলা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও অর্থনৈতিকভাবে এখনো পিছিয়ে পড়া একটি অঞ্চল। এই জেলার জনগণের একটি বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। পিরোজপুর জেলা অবকাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এ জেলায় দারিদ্র্যের হার ৩৭.৯%। প্রতি ১০০ জন মানুষের মধ্যে প্রায় ৪০ জন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন।
পিছিয়ে পড়ার কারণ: পিরোজপুর উপকূলবর্তী জেলা হওয়ায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখানে প্রায় প্রতি বছরই ঘটে। বর্ষা মৌসুমে বহু এলাকা পানিবন্দী হয়ে পড়ে, ফলে জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হয়। এই জেলায় শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি বললেই চলে। ফলে কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে। প্রবাসী আয় কম, যোগাযোগ ও শিক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মক দুর্বল হওয়ায় এই জেলা উচ্চ দারিদ্র্যের মধ্যে আছে।
৪. গাইবান্ধা
গাইবান্ধা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পিছিয়ে রয়েছে এই অঞ্চল। নদী ও চরাঞ্চলজুড়ে গড়ে ওঠা গ্রামগুলোতে জীবনযাপন এখনো অনেক কঠিন। নদীভাঙন, বন্যা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট এই অঞ্চলে। এই জেলার দারিদ্র্যের হার ৩৬.৭%।
পিছিয়ে পড়ার কারণ: তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র এবং যমুনা নদীর অববাহিকায় হওয়ায় এই অঞ্চল প্রতি বছরই বন্যা ও নদীভাঙনের শিকার হয়। ফসলি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে হাজার হাজার মানুষজন নি:স্ব হয়। কৃষিনির্ভর অঞ্চল হলেও কৃষি প্রযুক্তির অভাব, সড়ক, বিদ্যুৎ ও শিল্পায়নের অভাব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দারিদ্রতার হার বেড়েছে। শিক্ষার হার কম ও প্রবাসী কম থাকায় এই অঞ্চলে বেকারত্ব বেশি।
৫. কিশোরগঞ্জ
কিশোরগঞ্জ জেলা ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা, যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। তবে এই জেলা দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ দারিদ্র্যপ্রবণ অঞ্চল। কিশোরগঞ্জ জেলার বেশিরভাগ এলাকা নদী ও হাওর অধ্যুষিত, যার কারণে বর্ষাকালে পানিতে নিমজ্জিত থাকে। এই জেলার অনেক গ্রাম এখনও বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য পিছিয়ে। এ জেলায় দারিদ্র্যের হার ৩৫.৩%। এ জেলার মিঠামইন উপজেলায় দারিদ্র্যের হার ৬১.২%।
পিছিয়ে পড়ার কারণ: বর্ষাকালে হাওর অঞ্চলে বন্যা ও জলাবদ্ধতা সাধারণ ঘটনা। ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী অঞ্চলগুলো বছরের ছয় মাসই পানিতে নিমজ্জিত থাকে। যা কৃষি উৎপাদন ও জনজীবন ব্যাহত করে।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে এ অঞ্চলে দারিদ্র্য প্রবণতা বেশি। দুর্গম হাওর অঞ্চলে সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পণ্য পরিবহনে সমস্যা হয়। বড় শিল্প-কারখানার অভাবে অধিকাংশ মানুষ কৃষি ও দিনমজুরির উপর নির্ভরশীল। শিক্ষার হার কম ও প্রবাসী কম হওয়ায় এ জেলায় বেকারত্ব বেশি।
৬. চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। এই জেলার অর্থনীতি কৃষিনির্ভর এবং আম উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। তবে এই জেলাটিও দেশের অন্যতম উচ্চ দারিদ্র্যপ্রবণ জেলা। সীমান্তবর্তী এই জেলা মাদকের করিডোর হিসেবেও পরিচিত। এ জেলায় দারিদ্র্যের হার ৩৪.৭%।
পিছিয়ে পড়ার কারণ: জেলার কৃষিনির্ভর অর্থনীতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মৌসুমি পরিবর্তনের কারণে ব্যাহত হয়।
শিল্পায়নের অভাব এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষার হার কম ও প্রবাসী কম থাকায় এই অঞ্চলে বেকারত্ব বেশি।
৭. নেত্রকোনা
নেত্রকোনা জেলা বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক এলাকা। প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ হলেও, দারিদ্র্যতার কারণে পিছিয়ে পড়া একটি জেলা। নেত্রকোনা জেলা প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল। এই জেলা হাওর ও নদীভাঙনপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এই জেলার দারিদ্র্যের হার ৩৩.৯%।
পিছিয়ে পড়ার কারণ: বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছর বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সড়ক, সেতু, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো দুর্বল। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে বর্ষাকালে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বর্ষাকালে বন্যা ও নদী ভাঙ্গনে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হয়। শিক্ষার হার কম ও প্রবাসী কম থাকায় এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার বেশি। এই জেলায় পর্যটন শিল্প, খনিজ সম্পদ ও ক্ষুদ্র শিল্পকে কাজে লাগিয়ে দারিদ্রতা কমানো সম্ভব।
৮. ঝালকাঠি
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বরিশাল বিভাগের ছোট জেলা ঝালকাঠি। নদীবিধৌত জনপদ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য থাকলেও দারিদ্র্যতা এই জেলার প্রধান সমস্যা। ঝালকাঠি জেলার চারপাশে প্রবাহিত সুগন্ধা, বিষখালি ও ধানসিঁড়ি নদী প্রবাহিত। কৃষি ও মৎস এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর প্রধান জীবিকা। এই জেলার দারিদ্র্যের হার ৩৩.৫%।
পিছিয়ে পড়ার কারণ: কৃষিকাজে নির্ভর এই জেলার জনগোষ্ঠীর মূল সমস্যা কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ব্যাহত হওয়া। মাছের প্রাপ্যতা হ্রাস ঝালকাঠির জেলে সম্প্রদায় বছরের অধিকাংশ সময় বেকার থাকে। জেলে পাড়াগুলোতে এখন আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য নেই। সরকারি উন্নয়ন সংকট, প্রবাসী আয় কম, অর্থনৈতিক সংকট, শিক্ষার হার কম ও শিল্পায়ন না থাকায় এই জেলায় দারিদ্র্যের হার বেশি।
৯. পঞ্চগড়
বাংলাদেশের সর্বউত্তর প্রান্তে রংপুর বিভাগের অন্তর্গত পঞ্চগড় জেলা। পঞ্চগড়ের ভৌগোলিক অবস্থান ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাব এই অঞ্চলের দারিদ্রতার প্রধান কারণ। পঞ্চগড়ের অর্থনীতি প্রধানত কৃষিনির্ভর। এই জেলার দারিদ্র্যের হার ৩৩.২%।
পিছিয়ে পড়ার কারণ: তীব্র শীত ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাব এই অঞ্চলের বড় সমস্যা। উত্তরের সীমান্তবর্তী হওয়ায় এই অঞ্চল উন্নয়ন বঞ্চিত থাকে। বন্যা ও নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই অঞ্চলের কৃষি ও জীবনজীবিকা ব্যাহত করে।
১০. কুড়িগ্রাম
দেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত কুড়িগ্রাম জেলা বাংলাদেশের অন্যতম দরিদ্র জেলা। দারিদ্র্যের চিহ্ন যেন কুড়িগ্রামের নামের সাথেই জড়িয়ে আছে। নদীভাঙন ও বন্যা এখানকার মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। এই জেলার দারিদ্র্যের হার ৩১.৩%।
পিছিয়ে পড়ার কারণ: এই জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমারসহ বহু নদ-নদী। এই নদীগুলোর অববাহিকায় রয়েছে প্রায় ৪৫০টিরও বেশি চর। প্রতি বছর বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে হাজারো পরিবার গৃহহীন হয় এবং তাদের জীবিকা বন্ধ হয়। চরাঞ্চলের মানুষদের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি, বন্যায় তাদের নি:স্ব করে দেয়। শিক্ষার হার কম ও প্রবাসী কম থাকায় এই অঞ্চলে বেকারত্ব বেশি।
তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে কম দারিদ্র জেলা হলো নোয়াখালী, যেখানে দারিদ্র্যের হার মাত্র ৬.১% । জাতীয় গড় দারিদ্র্যের হার ১৯.২%।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের পত্রপত্রিকাসমূহ




















