ঢাকার প্রথম আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন গাল কাটা কামাল

Jan 29, 2026

বাংলার অপরাধ জগতের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যারা শুনলে আজও পুরান ঢাকার গলিপথগুলোতে শিহরণ জেগে ওঠে। কিন্তু সেই আতঙ্কের গল্পের আড়ালে যদি লুকিয়ে থাকে এক সুমধুর কণ্ঠস্বর? যদি জানা যায়, যে হাতে সপাং করে রামদা চলত, সেই হাতই একসময় হারমোনিয়ামের রিডে তুলত ভৈরবী বা টপ্পার সুর? বলছি আশির দশকের ঢাকার মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধী আবুল হাসনাত কামাল, যাকে পুরো দেশ চিনত ‘গাল কাটা কামাল’ নামে।

তার গলায় ছিল জাদুকরী সুর, আর হাতে ছিল তপ্ত আগ্নেয়াস্ত্র। একদিকে তিনি সিনেমার প্লেব্যাক সিঙ্গার, অন্যদিকে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র অধিপতি। একজন মানুষ, যার হওয়ার কথা ছিল প্লেব্যাক সিঙ্গার, তিনি কেন হয়ে উঠলেন খুনি? কেনই বা তার গলার সুরের চেয়ে মানুষের গলা কাটার নেশা প্রবল হয়ে উঠল? আজ আমরা ডুব দেব সেই রক্তক্ষয়ী ইতিহাসে, যেখানে সুর আর বারুদ মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।

এক কিশোরের স্বপ্নভঙ্গের গল্প

ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে রাজত্ব করার অনেক আগে, কামালের পরিচয় ছিল একেবারেই ভিন্ন। ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার এক নিভৃত গ্রাম কার্তিকপুর। যেখানে পদ্মা নদীর ঢেউয়ের শব্দ আর বিশাল সবুজ ধানের ক্ষেত মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকতো। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই শান্ত গ্রামেই জন্ম নেন আবুল হাসনাত কামাল। তার বাবা আবুল হোসেন খান ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, অত্যন্ত নীতিবান মানুষ। তিনি আগে পুলিশের চাকরি করলেও পরে তা ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা এবং হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় মনোনিবেশ করেন।

কামাল ছিল পরিবারের পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় এবং ভাইদের মধ্যে বড়। তার পরিবার ছিল সংস্কৃতিমনা। ছোটবেলা থেকেই কামালের মধ্যে এক অদ্ভুত শৈল্পিক প্রতিভা দেখা যায়। পরিবারের সবাই গান-বাজনা পছন্দ করতেন, আর কামাল শৈশবেই হারমোনিয়ামের দখল নিয়েছিলেন। তার গানের গলা ছিল চমৎকার, যা পাড়ার সবাইকে মুগ্ধ করে রাখতো।

সকাল-সন্ধ্যা হারমোনিয়াম নিয়ে বসে যাওয়া কামালকে দেখে কেউ ভাবেনি এই ছেলেটিই একদিন রাজপথে দুই হাতে পিস্তল নিয়ে ‘কাউবয়’ স্টাইলে গুলি চালাবে। তার কণ্ঠ ছিল এতটাই মুগ্ধকর যে, পরবর্তী জীবনে তিনি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করার সুযোগও পেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের ললাটলিখন ছিল হয়তো কোনো ট্র্যাজেডি ফিল্মের চেয়েও ভয়াবহ। সেই সময়ে কেউ ভাবতেও পারেনি, এই সুরেলা কণ্ঠের অধিকারীর হাতেই একদিন শত শত মানুষের রক্ত লাগবে।

যুদ্ধ এবং রাজনীতির অস্থির আবর্ত

১৯৭১ সালে যখন মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, কামাল তখন নবম শ্রেণীর ছাত্র। কিশোর কামালের রক্তে তখন স্বাধীনতার নেশা। কিশোর বয়সেই সে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বলে দাবি করা হয়। তিনি ভারতের বাঘাবাড়িতে গিয়ে ট্রেনিং নেন এবং মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার মতিনের অধীনে যুদ্ধ করেন বলে জানা যায়। যদিও তার মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীতে অনেক বিতর্ক হয়েছে এবং কোনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, কিন্তু সেই উত্তাল সময়ের বারুদের গন্ধ কামালের মনে এক গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

যুদ্ধের পর শান্তির সময়ে সে যেন আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছিল না। তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক অস্থির সত্তা তাকে অন্ধকারের দিকে টানতে শুরু করে। তবে এলাকাবাসীর কাছে সে সময় সে একজন ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবেই সম্মান পেত।

১৯৭৩ সালে ডামুড্যা হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করার পর কামাল উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় পা রাখেন। ভর্তি হন তৎকালীন বিখ্যাত জগন্নাথ কলেজে (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)। কিন্তু ভাগ্য তার সহায় ছিল না। বাবার অভাবের সংসারে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কামালের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাভাব তার নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। এই অর্থকষ্ট এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ তাকে ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে শুরু করে।

‘গাল কাটা কামাল’ নামের উৎপত্তি

জগন্নাথ কলেজে পড়াকালীন একদিন বন্ধুদের সাথে আড্ডায় তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে কয়েকজন বখাটের সঙ্গে কামালের কথা কাটাকাটি হয়। সেই আড্ডায় তার বন্ধু ফিরোজ আল মামুন আকস্মিকভাবে একটি সেভেনআপের কাঁচের ভাঙা বোতল দিয়ে কামালের বাম গালে সজোরে আঘাত করে। সেই ক্ষতটি ছিল গভীর, যা সেলাই করার পরও গালে একটি স্থায়ী বীভৎস দাগ রেখে যায়। সেই গভীর ক্ষতটি কামালের চেহারায় এক স্থায়ী দাগ ফেলে দেয়।

শুরুতে বন্ধু মহলে শুরুতে তাকে নিয়ে মজা করে ডাকা হতো ‘গাল কাটা কামাল’। এরপর পাড়ার ছেলেরা দুষ্টুমি করে তাকে ‘গাল কাটা কামাল’ বলে ডাকতো। কিন্তু সেই সাধারণ উপহাসটিই একদিন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড নেমে পরিণত হবে, তা কেউ ভাবেনি।

সোর্স থেকে অপরাধী

ঢাকার জীবনে কামালের শুরুর দিকটা ছিল সংগ্রামের। ঢাকায় এসে শুরুতে টিকে থাকার লড়াইয়ে কামাল মোহাম্মদপুরে তার খালার বাসায় থাকতেন। খালার বাসায় থেকে কয়েক জন ছাত্র-ছাত্রীকে গান শেখাত সে। তিন-চারজন ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে ভালোই চলছিল। ১৯৭৫ সালে খালাতো বোন বিউটিকে বিয়ে করে গেণ্ডারিয়ায় নতুন সংসার পাতেন কামাল।

তার অপরাধ জগতে প্রবেশের পথটা ছিল বিচিত্র। তার এক আত্মীয় পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। সেই সূত্র ধরে কামাল নিজেও পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করেন। পুলিশের সাথে সখ্যতার কারণে তাকে একটি মোটরসাইকেলও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আইনের পথে থেকে পেট চালানো কামালের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছিল। লোভের বশবর্তী হয়ে কামাল মাদক কেনাবেচার সাথে জড়িয়ে পড়েন। পুলিশের মোটরসাইকেল নিয়ে মাদক সরবরাহ করার অভিযোগে এবং মোটরসাইকেলটি থানায় ফেরত না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দেওয়ায় তাকে প্রথমবার জেলে যেতে হয়। এটাই ছিল তার জীবনের প্রথম জেলযাত্রা। জেলখানা থেকেই তার আসল ‘ক্রিমিনাল প্রোফাইল’ তৈরি হতে থাকে।

কারাগারের সেই দিনগুলো কামালের ভেতরের অবশিষ্ট কোমলতাটুকু শুষে নেয়। এরই মধ্যে তার খালাতো ভাই জামান এক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, যা কামালের মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ঠিক সেই সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তাল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। কামাল তখন জগন্নাথ কলেজের প্রতাপশালী ছাত্রনেতা আব্দুল হালিমের আশ্রয়ে চলে যায়। ছাত্রনেতা আব্দুল হালিমের আশ্রয়ে কামাল পুরোপুরি অপরাধ জগতে পা রাখেন।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের রাজা এবং ‘কাউবয়’ স্টাইলে সন্ত্রাস

১৯৭৪ সালে ফরিদপুরের স্থানীয় এমপি নুরুল হকের খুনের ঘটনায় কামালের নাম জড়িয়ে পড়ে। শোনা যায়, জাসদের এক নেতার ভাড়াটে খুনি হিসেবে সে এই কাজ করেছিল। কিন্তু চুক্তির পুরো টাকা না পাওয়ায় সে ওই নেতার সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। রাজনীতি আর অপরাধের এই জটিল সমীকরণে কামাল বুঝে গিয়েছিল টিকে থাকতে হলে গডফাদার প্রয়োজন।

১৯৭৭ সালে কামাল বুঝতে পারেন, পুলিশ আর প্রশাসনের হাত থেকে বাঁচতে হলে শক্তিশালী রাজনৈতিক ঢাল প্রয়োজন। তিনি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের জাতীয় গণতান্ত্রিক দল (জাগদল)-এ যোগ দেন এবং সূত্রাপুর থানার সভাপতি হন। ১৯৭৮ সালে জাগদল বিলুপ্ত হয়ে বিএনপি গঠিত হলে তিনি যুবদলে যোগ দেন এবং কোতোয়ালি থানা যুবদলের সভাপতির পদ বাগিয়ে নেন। এই রাজনৈতিক পরিচয়ই তাকে পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করত এবং চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির লাইসেন্স করে দেয়। রাজনীতির আশ্রয়ে কামালের অপরাধের মাত্রা চরমে পৌঁছায়।

সত্তরের দশকের শেষভাগে কামাল ছিলেন ঢাকার ডন। পুরান ঢাকার সদরঘাট, ওয়াইসঘাট, নয়াবাজার থেকে শুরু করে মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও মতিঝিল এক সময় কামালের নাম শুনলে দোকানপাটের শাটার নেমে যেত। সে সময় ঢাকার ডনদের মধ্যে গাল কাটা কামাল ছিল আলাদা। তার চলাফেরা ও স্টাইল ছিল অনেকটা হলিউড সিনেমার ভিলেনদের মতো।

মোটরসাইকেল এবং জোড়া রিভলভার: কামাল সবসময় একটি হোন্ডা চালাতেন। তার কোমরে হলিউডি কাউবয়দের মতো দুই পাশে দুটি হোলস্টার থাকত, যাতে দুটি লোডেড রিভলভার গোঁজা থাকত।

অপারেশন স্টাইল: তিনি চলন্ত মোটরসাইকেল থামিয়ে দুই হাতে গুলি ছুড়তেন। এত দ্রুত তিনি কাজ শেষ করে পালিয়ে যেতেন যে, ভিকটিম বা প্রত্যক্ষদর্শীরা কিছু বোঝার আগেই সব শেষ হয়ে যেত। লক্ষ্যভেদ ছিল তার অত্যন্ত নিখুঁত।

একক আধিপত্য: চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং ঘাট দখলের নেশায় তিনি পুরান ঢাকার একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠেন।

দিলা-মোখলেস দ্বন্দ্ব এবং প্রতিদিনের রুটিন

কামালের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল সোহরাওয়ার্দী কলেজের দুই ছাত্রনেতা দিলা ও মোখলেস। পুরান ঢাকার প্রভাবশালী ছাত্রনেতা দিলা ও মোখলেসের সাথে কামালের শত্রুতা ছিল কিংবদন্তি সমতুল্য। ১৯৭৬ সালে সদরঘাটের ওয়াইসঘাট ইজারা নেওয়াকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্বের শুরু। তাদের মধ্যে সম্পর্কটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, ‘দেখা মাত্র গুলি’ করার নিয়ম চালু হয়ে যায়।

কামাল এতটাই বেপরোয়া ছিল যে, সে প্রতিদিন নিয়ম করে দিলা ও মোখলেসের বাসার সামনে গিয়ে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে আসত। এটি ছিল তার এক অদ্ভুত জেদ। পুলিশ বা প্রশাসন কেউই তাকে এই কাজ থেকে বিরত রাখতে পারতো না। আজাদ সিনেমা হলের সামনে একবার প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে তিনি পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন।

গাল কাটা কামালের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডসমূহ

গাল কাটা কামালের নৃশংসতার কোনো সীমা ছিল না। তার জীবনে দুটি হত্যাকাণ্ড সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়:

১. জাফরের হত্যাকাণ্ড

গাল কাটা কামালের অপরাধজীবনের সবচেয়ে ভয়ানক অধ্যায় হলো মতিঝিলের জুয়াড়ি সিরাজের ভাড়াটে খুনি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া। মতিঝিল ক্লাব পাড়ার তৎকালীন প্রভাবশালী জুয়াড়ি সিরাজের সঙ্গে জাফরের ঝামেলা বাঁধে। জাফর একবার জনসম্মুখে সিরাজকে অপমান করে মাটিতে থুথু ফেলে তা চাটতে বাধ্য করেছিল। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে সিরাজ ভাড়াটে খুনি হিসেবে কামালকে নিয়োগ করেন। কামাল জনাকীর্ণ গুলিস্তান কামান পয়েন্ট এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মানুষের সামনে জাফরকে গুলি করে হত্যা করেন এবং অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে মোটরসাইকেল নিয়ে চলে যান।

২. বন্ধু ফিরোজকে শিরশ্ছেদ

এরপর শুরু হয় তার নিজের বন্ধুদের ওপর প্রতিশোধ। এক সময়ের বন্ধু ফিরোজ আল মামুন কামালের গালে আঘাত করেছিলেন, কামাল তাকে ভোলেননি। একদিন যাত্রাবাড়ী থেকে ফিরোজ এবং আব্দুল মালেক রানাকে একটি জিপে তুলে নিয়ে যান কামাল। অভয় দাস লেনের একটি স্কুলে তাদের নিয়ে গিয়ে তিনি এক বীভৎস কাণ্ড ঘটান।

শোনা যায়, কামাল হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতে গাইতে নিজের হাতে তার দুই বন্ধুকে জবাই করে মাথা বিচ্ছিন্ন করেন। সেই কাটা মাথাগুলো জগন্নাথ কলেজের মাঠে ফেলে আসা হয়। এই ঘটনা পুরো ঢাকা শহরকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

রূপালি পর্দা ও পতনের শুরু

কামালের জীবনের সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা ছিল তার শিল্পীসত্তা। অদ্ভুত বিষয় হলো, অপরাধ জগতের শীর্ষে থেকে এত রক্তের নেশার মাঝেও কামালের গানের প্রতি ভালোবাসা মরেনি। ১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রসের বাইদানী’ চলচ্চিত্রে তিনি প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে গান গেয়েছিলেন। এমনকি ছবিতে তাকে ছোট একটি রোলে অভিনয় করতেও দেখা যায়। সেই চলচ্চিত্রের প্রচারণার সময় তার ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়।

পত্রিকায় তার ছবি এবং চলচ্চিত্রের প্রচারণা দেখে পুলিশ নড়েচড়ে বসে। ততদিনে এরশাদের সামরিক শাসন জারি হয়েছে। সামরিক আদালত কামালের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করে। কামালের মতো একজন দুর্ধর্ষ অপরাধী যে কি না সিনেমার রঙিন জগতে বিচরণ করছে, এটা তৎকালীন প্রশাসনের জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

শেষ লড়াই - এগারো দেয়ালের সেই ধাওয়া

১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাস। কামাল তখন এফডিসি থেকে বেরিয়ে তেজগাঁওয়ের দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ পুলিশের একটি দল তাকে ঘিরে ফেলে। সেদিন কামালের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। শুরু হয় এক রুদ্ধশ্বাস ধাওয়া।

তেজগাঁওয়ের ঘিঞ্জি গলির ভেতর দিয়ে কামাল দৌড়াতে শুরু করে। সামনে এক বিশাল দেয়াল। সে অনায়াসেই সেই দেয়াল টপকে ওপারে চলে যায়। পুলিশও পিছু ছাড়ে না। এভাবে একে একে এগারোটি দেয়াল টপকে কামাল পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ দেয়ালটি পার হওয়ার সময় ভাগ্য তার সহায় ছিল না। লাফ দেওয়ার সময় তার জুতার হিল ভেঙে যায় এবং সে মাটিতে আছড়ে পড়ে। সেই আছাড়েই তার পালানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ তাকে জাপটে ধরে। পরে তার বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় দুটি বিদেশি রিভলভার।

বিচার ও মৃত্যুদণ্ড

তৎকালীন সামরিক আদালতে কামালের বিচার হয়। জাফর, ফিরোজ এবং রানাসহ একাধিক খুনের মামলায় তার ফাঁসির রায় দেওয়া হয়। ফাঁসির দিন যখন ঘনিয়ে এল, কামাল যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে তার জীবন এভাবে শেষ হতে পারে।

কারাগারে শেষবার যখন তার মা দেখা করতে যান, কামাল অবাক হয়ে বলেছিল, "মা, এটা শেষ দিন হতে পারে না। তুমি জেলারের সাথে কথা বলো, কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে।" মা জেলারের কাছে গিয়ে জানতে পারেন মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে করা প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হয়ে গেছে। মা আর ফিরে এসে ছেলেকে সেই দুঃসংবাদ দেওয়ার সাহস পাননি।

১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি এক নিঝুম রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কার্যকর করা হয় গাল কাটা কামালের ফাঁসি। যে কণ্ঠে এক সময় সুরের মায়াজাল তৈরি হতো, সেই কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায় ফাঁসির দড়িতে। এর মাধ্যমেই সমাপ্তি ঘটে এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের।

তথ্য ছক

বিবরণ

আসল নাম

আবুল হাসনাত কামাল

জন্মস্থান

কার্তিকপুর, ফরিদপুর

পেশা

সোর্স, আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন, প্লেব্যাক সিঙ্গার

রাজনৈতিক পরিচয়

সভাপতি, কোতোয়ালি থানা যুবদল

বিখ্যাত অপরাধ

ফিরোজ ও রানার শিরচ্ছেদ

মৃত্যু

১৯৮২ (ফাঁসি)

এক বিফল জীবনের সুর

গাল কাটা কামালের গল্পটি কোনো বীরত্বগাথা নয়, বরং একটি প্রতিভার অপচয় এবং অপরাধের করুণ পরিণতির দলিল। দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা আর প্রতিশোধপরায়ণতা কীভাবে একজন সম্ভাবনাময় শিল্পীকে দানবে রূপান্তর করতে পারে, কামাল তার জীবন্ত উদাহরণ। আজ পুরান ঢাকার পুরনো বাসিন্দাদের কাছে গাল কাটা কামাল কেবল একটি নাম নয়, বরং একটি বিভীষিকাময় অধ্যায়। তার স্ত্রী-সন্তানরা হয়তো আজও সেই বিষাদ বয়ে বেড়াচ্ছেন, আর ঢাকার আকাশ-বাতাসে মিশে আছে এক অদ্ভুত হাহাকার যা হয়তো কোনো এক রাতে কামালের গাওয়া কোনো সুর হয়ে ফিরে আসে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন
ছবি: পত্রিকা ও এআই দিয়ে এনহেন্সড

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.