ঢাকার প্রথম আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন গাল কাটা কামাল

বাংলার অপরাধ জগতের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যা উচ্চারণ করলে আজও পুরান ঢাকার সংকীর্ণ গুলিগুলির অন্ধকার কোণে এক ধরণের ঠান্ডা শিহরণ জেগে ওঠে। বুড়িগঙ্গার তপ্ত বাতাস কিংবা সদরঘাটের পলিমাখা ঘাটে সেদিনের সেই রক্তাক্ত দিনগুলোর স্মৃতি আজও ধূসর হয়ে মুছে যায়নি। কিন্তু সেই বীভৎস আতঙ্কের গল্পের নেপথ্যে যদি লুকিয়ে থাকে এক সুমধুর, মোহনীয় কণ্ঠস্বর? যদি জানা যায়, যে হাত দিয়ে নির্দ্বিধায় রামদা চলত কিংবা রিভলভার থেকে তপ্ত সীসা নিঃসৃত হতো, সেই হাতই একসময় গভীর অনুরাগে হারমোনিয়ামের রিডে তুলত ভৈরবী, ইমন কিংবা ধ্রুপদী টপ্পার সুর?
বলছি সত্তোর ও আশির দশকের ঢাকার মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধী আবুল হাসনাত কামাল-এর কথা, যাকে পুরো দেশ একনামে চিনত ‘গাল কাটা কামাল’ নামে।
তিনি ছিলেন এক অদ্ভূত মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্যের জলজ্যান্ত উদাহরণ। একদিকে তিনি ঢাকার চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক সিঙ্গার ও উদীয়মান কণ্ঠশিল্পী, অন্যদিকে তৎকালীন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র, নিষ্ঠুর অধিপতি। একজন মানুষ, যার কণ্ঠের জাদুতে বুঁদ হয়ে থাকার কথা ছিল সঙ্গীতপ্রেমীদের, তিনি কেন হয়ে উঠলেন দুর্ধর্ষ খুনি? কেনই বা স্বরগ্রামের সুমধুর সুরের চেয়ে মানুষের গলার রগ কাটার নেশা তার কাছে বেশি প্রবল হয়ে উঠল? এই বিস্তৃত প্রবন্ধে আমরা উন্মোচন করব সুর ও বারুদের সেই জটিল মহাকাব্য, যেখানে সঙ্গীত, রাজনীতি, প্রেম, এবং অন্ধকারের রক্তক্ষয়ী সংঘাত মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
কিশোর কামালের স্বপ্ন ও প্রারম্ভিক জীবন
ঢাকার রাজপথে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দাপিয়ে বেড়ানোর অনেক আগে, আবুল হাসনাত কামালের পরিচয় ছিল একেবারেই ভিন্ন। ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার এক নিভৃত, শান্ত গ্রাম কার্তিকপুর। যে গ্রামটিতে পদ্মার বিশাল ঢেউয়ের গর্জন আর মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সবুজ ধানের ক্ষেত মিলেমিশে এক অদ্ভুত প্রাকৃতি সৌন্দর্য তৈরি করে রাখত। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই কার্তিকপুর গ্রামেই এক সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্ম নেন আবুল হাসনাত কামাল।
পারিবারিক পটভূমি
কামালের বাবা আবুল হোসেন খান ছিলেন একজন অত্যন্ত নীতিবান ও সুশৃঙ্খল মানুষ। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে চাকরি করতেন। তবে পরবর্তীতে সেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি স্বাধীন ব্যবসা এবং স্থানীয় পর্যায়ে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় মনোনিবেশ করেন। পরিবারে কামালের অবস্থান ছিল পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয়, আর ভাইদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ফলে বাবার নীতিবোধ আর সংসারের দায়িত্ব দুটোই ছোটবেলা থেকে তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
সুরের প্রতি সহজাত আকর্ষণ
কামালদের পরিবারটি ছিল অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা। ঘরে সাহিত্য ও সঙ্গীতের একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ ছিল। ছোটবেলা থেকেই কিশোর কামালের মধ্যে দেখা যায় এক বিরল শৈল্পিক প্রতিভা। পরিবারের সবাই গান-বাজনা ভালোবাসতেন, কিন্তু কামালের ঝোঁক ছিল ব্যাকরণগত সঙ্গীতের দিকে।
স্কুলে পড়ার বয়সেই সে স্বপ্রণোদিত হয়ে হারমোনিয়ামের ওপর দারুণ দখল এনে ফেলে। তার গলার স্বর ছিল স্বাভাবিকভাবেই গমগমে, মিষ্টি ও নমনীয়। পাড়ার যেকোনো ঘরোয়া অনুষ্ঠান বা স্কুলে সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় কামাল ছিল প্রথম সারির আকর্ষণ। সকাল-সন্ধ্যা যে ছেলেটি হারমোনিয়াম সামনে নিয়ে রেওয়াজ করতে বসত, তার দিকে তাকিয়ে গ্রামের বয়োবৃদ্ধরা ভাবতেন এই ছেলে একদিন রেডিও বা টেলিভিশনের নামকরা গায়ক হবে। কেউ স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি, এই কোমল গলার অধিকারী কিশোরটির হাতেই একদিন রক্তাক্ত হবে শত মানুষের ভবিষ্যৎ।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, অস্থির সময় এবং আদর্শচ্যুতি
১৯৭১ সালে যখন সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ, কামাল তখন ফরিদপুরের ডামুড্যা অঞ্চলের হাইস্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র। কিশোর কামালের রক্তে তখন স্বাধীনতার তীব্র উন্মাদনা।
১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধ ও বাঘাবাড়ি ট্রেইনিং ─► বারুদের অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা
│
▼
১৯৭৩: জগন্নাথ কলেজে ভর্তি ও অর্থকষ্ট ◄─ মানসিক অস্থিরতা ও অন্ধকার জগতের দিকে যাত্রা
যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন
দাবি করা হয়, কৈশোরের সীমা পার না হতেই কামাল যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তিনি ভারতের বাঘাবাড়িতে গিয়ে সামরিক ট্রেনিং গ্রহণ করেন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মতিনের অধীনে বেশ কয়েকটি গেরিলা অপারেশনে অংশ নেন। যদিও পরবর্তী সময়ে তাঁর এই মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সনদ নিয়ে কিছু ঐতিহাসিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তবে উত্তাল একাত্তরের রণক্ষেত্রের গোলাবারুদ, রক্তের গন্ধ এবং অস্ত্রের ব্যবহার কিশোর কামালের মনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ছাপ ফেলেছিল। যুদ্ধের পর সাধারণ নিস্তরঙ্গ জীবনে মানিয়ে নেওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
ঢাকার বুকে আগমন ও ঢাকা জীবনের সংগ্রাম
১৯৭৩ সালে ফরিদপুরের ডামুড্যা হাইস্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাস করার পর, উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন এবং সঙ্গীতে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কামাল ঢাকায় পা রাখেন। তিনি ভর্তি হন তৎকালীন ঢাকার স্বনামধন্য ও রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত প্রতিষ্ঠান জগন্নাথ কলেজে (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)।
কিন্তু ঢাকায় এসে কামাল এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হন। তার বাবার সীমিত আয়ে বিশাল পরিবারের খরচ চালিয়ে ঢাকায় কামালের পড়াশোনা চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। চরম অর্থাভাব তার নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। মেসে থাকার টাকা না থাকায় সে মোহাম্মদপুরে তার এক খালার বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। এই তীব্র অর্থনৈতিক টানাটেনির মুখে পড়ে কামালের মন থেকে পড়াশোনার সুবাতাস ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে থাকে এবং স্থান করে নেয় এক তীব্র ক্ষোভ।
একটি ভাঙা বোতল ও ‘গাল কাটা কামাল’ নামের উৎপত্তি
জগন্নাথ কলেজে পড়ার সময় পর্যন্ত কামালের শান্ত-শিষ্ট ও গায়ক পরিচয়টি বজায় ছিল। কিন্তু কলেজের এক একটি তুচ্ছ ঘটনাই তার জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ উল্টে দেয়।
জগন্নাথ কলেজের আড্ডা ও তর্ক
│
▼
ফিরোজ আল মামুন কর্তৃক সেভেনআপের বোতল দিয়ে আঘাত
│
▼
বাম গালে বীভৎস ও চিরস্থায়ী ক্ষতচিহ্ন (Scar)
│
▼
'গাল কাটা কামাল' ব্র্যান্ড নামের নৃশংস আত্মপ্রকাশ
সেই অভিশপ্ত দিনের ঘটনা
একদিন বিকেলে জগন্নাথ কলেজের ক্যাম্পাসের কাছেই বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বসেছিল কামাল। আড্ডার একপর্যায়ে কোনো এক তুচ্ছ বিষয় নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন উঠতি যুবকের সাথে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। কথা কাটাকাটি গড়ায় হাতাহাতিতে।
সেই আড্ডাতেই উপস্থিত ছিল কামালেরই একসময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফিরোজ আল মামুন। উত্তেজনার বশে ফিরোজ পাশেই পড়ে থাকা একটি সেভেনআপের কাঁচের বোতল কুড়িয়ে নিয়ে ভাঙেন এবং সেই ভাঙা বোতলের ধারালো অংশ দিয়ে সজোরে আঘাত করেন কামালের বাম গালে।
চিরস্থায়ী ক্ষত ও উপহাস থেকে ব্র্যান্ড নেম
বোতলের আঘাতে কামালের বাম গালটি কান থেকে ঠোঁটের কাছাকাছি পর্যন্ত ফালাফালা হয়ে কেটে যায়। রক্তাক্ত কামালকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা গালে অনেকগুলো সেলাই দেন। কিন্তু ক্ষতটি এতটাই গভীর ও বড় ছিল যে, সুস্থ হওয়ার পরও তার বাম গালে এক বীভৎস ও চিরস্থায়ী চওড়া দাগ থেকে যায়।
ঘটনার পর শুরুতে সহপাঠী ও বন্ধু মহলে তাকে একপ্রকার উপহাস করেই আড়ালে ডাকতে শুরু করে ‘গাল কাটা কামাল’। পুরান ঢাকার পাড়া-মহল্লার উঠতি ছেলেরাও দুষ্টুমি করে তাকে এই নামে ডাকত। সাধারণ চেহারার কামাল গালে এই বিশালাকার কাটা দাগ আর উপহাসের কারণে চরম এক হীনমন্যতা ও মানসিক বিকৃতিতে ভুগতে শুরু করেন। এই উপহাসের বদলা নিতেই তার ভেতরের সুপ্ত হিংস্র সত্তাটি জেগে ওঠে। যে নামটি তাকে উপহাস করতে ব্যবহৃত হতো, কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই ‘গাল কাটা কামাল’ নামটিকেই তিনি রূপান্তর করেন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড় ও আতঙ্কের নাম হিসেবে।
অপরাধ জগতের প্রথম পদক্ষেপ: সোর্স, সংসার ও কারাবাস
ঢাকায় জীবন ধারণের জন্য কামাল শুরুতে সঙ্গীতের ওপরই ভরসা করেছিলেন। খালার বাসায় থেকে তিনি পুরান ঢাকা ও মোহাম্মদপুর এলাকার ৩-৪ জন ছাত্র-ছাত্রীকে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান শেখাতেন। এতে যে সামান্য টাকা পেতেন, তা দিয়ে নিজের ছোটখাটো খরচ চলত।
১৯৭৫ সালে কামাল তার খালাতো বোন বিউটিকে ভালোবেসে বিয়ে করেন এবং গেণ্ডারিয়া এলাকায় একটি ছোট ঘর ভাড়া নিয়ে নতুন সংসার পাতেন। কিন্তু সংসারে খরচ বাড়তে থাকলে গায়কের সামান্য আয়ে তা সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
পুলিশের সোর্স থেকে মাদকের জালে
কামালের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় তৎকালীন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ইনফর্মার বা 'সোর্স' হিসেবে কাজ করতেন। তার হাত ধরেই কামাল সোর্স হিসেবে পুলিশের সাথে কাজ শুরু করেন। পুলিশের সাথে চলাফেরার কারণে অপরাধীদের মনস্তত্ত্ব এবং আইনের ফাঁকফোকর তিনি দ্রুত শিখে ফেলেন। পুলিশ প্রশাসন তাকে চলাচলের সুবিধার্থে একটি মোটরসাইকেলও দিয়েছিল।
কিন্তু অতি দ্রুত ধনী হওয়ার লোভ কামালকে গ্রাস করে। তিনি সোর্সের আড়ালে পুলিশের দেওয়া মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করেই পুরান ঢাকায় ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ নানা ধরণের মাদকের চালান সরবরাহ করা শুরু করেন।
প্রথম জেলযাত্রা ও অপরাধের প্রথম পাঠ
একসময় কামালের এই অবৈধ কারবারের কথা পুলিশের গোচরে আসে। একই সাথে পুলিশের দেওয়া মোটরসাইকেলটি থানায় ফেরত না দিয়ে নিজের দখলে রেখে দেওয়ায় কামালের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ১৯৭৬ সালের শেষের দিকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। এটাই ছিল তার জীবনের প্রথম জেলযাত্রা।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দি জীবন কামালের ভেতরে অবশিষ্ট থাকা সামান্যতম মানবিক কোমলতাটুকুও শুষে নেয়। কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরে বসেই তৎকালীন ঢাকার বাঘা বাঘা অপরাধী, পেশাদার খুনি এবং রাজনৈতিক ক্যাডারদের সাথে কামালের সখ্য গড়ে ওঠে। জেলখানা থেকে মুক্ত হয়ে যখন তিনি বের হন, তখন তিনি আর কেবল একজন ব্যর্থ গায়ক বা পুলিশের সাধারণ সোর্স নন; তিনি তখন অপরাধ জগতের এক উদীয়মান ক্রিমিনাল।
রাজনীতির অন্ধকার অলিগলি: জাসদ, জাগদল থেকে যুবদল
কারাগার থেকে বের হওয়ার পর কামাল বুঝতে পেরেছিলেন, অপরাধ জগতে টিকে থাকতে হলে এবং প্রশাসনের হাত থেকে রেহাই পেতে হলে শক্তিশালী রাজনৈতিক গডফাদার ও ক্যাডার পরিচয়ের কোনো বিকল্প নেই।
১৯৭৪ সালের এমপি হত্যা ও জাসদ কানেকশন
কারাগারে যাওয়ার আগেই ১৯৭৪ সালে ফরিদপুরের তৎকালীন প্রভাবশালী এমপি নুরুল হকের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই খুনের নেপথ্যে কামালের নাম প্রথমবারের মতো বড় করে উঠে আসে। অভিযোগ ছিল, তৎকালীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) এক প্রভাবশালী নেতার সুনির্দিষ্ট কন্ট্রাক্ট বা ভাড়ায় কামাল এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। তবে চুক্তির পুরো অর্থ না পাওয়ায় কামাল পরবর্তীতে সেই নেতার সাথেও চরম দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন।
রাজনৈতিক আশ্রয়ের সন্ধান
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। এই অস্থির পটভূমিতে কামাল জগন্নাথ কলেজের তৎকালীন প্রতাপশালী ছাত্রনেতা আব্দুল হালিম-এর বলয়ে যোগ দেন। আব্দুল হালিমের হাত ধরেই কামাল পুরান ঢাকার ছাত্র রাজনীতির আড়ালে অস্ত্রবাজির নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন।
জাগদল থেকে যুবদলের রাজনীতিতে উত্থান
১৯৭৭ সালে তৎকালীন বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের নেতৃত্বে গঠিত হয় 'জাতীয় গণতান্ত্রিক দল' (জাগদল)। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে কামাল জাগদলে যোগ দেন এবং অল্প দিনেই নিজের ক্ষমতার দাপটে সূত্রাপুর থানা জাগদলের সভাপতির পদ হাতিয়ে নেন।
পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠন করলে জাগদল বিলুপ্ত হয়ে যায়। কামাল তখন যুবদলে নাম লেখান এবং কোতোয়ালি থানা যুবদলের সভাপতির দায়িত্ব পদ লাভ করেন। এই সরকারি দলীয় পরিচয় তাকে একাধারে পুলিশি গ্রেফতার থেকে সুরক্ষা দেয় এবং পুরান ঢাকার ইজারা, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও ঘাট দখলের একচ্ছত্র প্রাতিষ্ঠানিক লাইসেন্স এনে দেয়।
পুরান ঢাকার একচ্ছত্র ডন: ‘কাউবয়’ স্টাইল ও ত্রাস
সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকে আশির দশকের শুরু পর্যন্ত ঢাকা শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ডে একাধিক ডনের উত্থান ঘটেছিল। কিন্তু তাদের সবার মধ্য থেকে ‘গাল কাটা কামাল’ নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক স্টাইলে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তার চলাফেরা ও অপারেশনের ধরণ ছিল হুবহু হলিউডের ক্লাসিক ওয়েস্টার্ন সিনেমার 'কাউবয়' ভিলেনদের মতো।
পোশাক ও বাইক চালনা
কামাল সবসময় একটি লাল রঙের দ্রুতগতির হোন্ডা মোটরসাইকেল চালাতেন। তার পরনে থাকত জ্যাকেট অথবা ঢিলেঢালা শার্ট। কোমরের দুই পাশে বিশেষ কায়দায় বানানো চামড়ার বেল্ট বা হোলস্টারে গোঁজা থাকত দুটি লোডেড রিভলভার।
অপারেশনের অনন্য কৌশল
কামাল কখনোই একা অপারেশনে যেতেন না, তবে মূল শটটি সে নিজেই নিত। সে সময় পুরান ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় হঠাৎ একটি মোটরসাইকেল বিকট শব্দে এসে থামত। কামাল বাইক থেকে নেমে বা বাইকে বসেই এক মুহূর্তের মধ্যে দুই হাত থেকে দুটি রিভলভার বের করে কাউবয় স্টাইলে টার্গেটের দিকে একটার পর একটা গুলি ছুড়তেন।
তার লক্ষ্যভেদ বা অ্যাকুরেসি ছিল প্রফেশনাল শুটারদের মতোই নিখুঁত। সাধারণ মানুষ বা প্রত্যক্ষদর্শীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই কামাল তার তপ্ত রিভলভার পুনরায় হোলস্টারে পুরে বিকট শব্দে বাইক চালিয়ে উধাও হয়ে যেতেন।
একচ্ছত্র সাম্রাজ্য
সদরঘাটের ব্যস্ততম লঞ্চ টার্মিনাল, ওয়াইসঘাটের ফল ও কাপড়ের আড়ত, নয়াবাজারের কাঠের বাজার থেকে শুরু করে মতিঝিলের বাণিজ্যিক এলাকা, এমনকি দূরে মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের পরিবহন টার্মিনাল পর্যন্ত কামালের নাম শুনলেই ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে দোকানের শাটার নামিয়ে দিত। প্রতি মাসে কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন কামাল।
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দিলা-মোখলেস দ্বন্দ্ব এবং প্রতিদিনের বিকেলের মহড়া
সত্তরের দশকের শেষভাগে পুরান ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা ছিল এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। কামালের এই একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তৎকালীন সোহরাওয়ার্দী কলেজের দুই প্রভাবশালী ছাত্রনেতা ও ক্যাডার দিলা এবং মোখলেস।
ওয়াইসঘাট ইজারা (১৯৭৬) ─► কামাল বনাম দিলা-মোখলেস শত্রুতা
│
▼
দৈনিক মহড়া: প্রতিপক্ষ ঘরের সামনে গুলি ◄─ আজাদ সিনেমা হল শুটিং ও রক্তপাত
দ্বন্দের সূচনা: ১৯৭৬ সালে পুরান ঢাকার অত্যন্ত লাভজনক ওয়াইসঘাটের ইজারা দখল করাকে কেন্দ্র করে কামালের সাথে দিলা ও মোখলেসের প্রথম সরাসরি সংঘর্ষ হয়। শুরু হয় এক দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী গ্যাং ওয়ার। পুরান ঢাকায় তখনকার নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল কামাল বনাম দিলা-মোখলেস গ্রুপ একে অপরকে ‘দেখা মাত্রই গুলি’ (Shoot on sight) করবে।
অদ্ভুত প্রতিশোধের মহড়া: কামালের অহংকার ও জেদ ছিল চরম পর্যায়ের। শোনা যায়, প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে গুঁড়িয়ে দিতে কামাল প্রতিদিন বিকেলে তার লাল হোন্ডা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। তিনি সোজা চলে যেতেন দিলা এবং মোখলেসের বাসার গলির মুখে। সেখানে গিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে আকাশের দিকে ও ঘরের দেয়াল লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে হুঙ্কার দিতেন এবং বিকট শব্দে বাইক চালিয়ে চলে আসতেন।
এটি ছিল তার প্রতিদিনের এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক রুটিন। পুরান ঢাকার আজাদ সিনেমা হলের সামনে একবার প্রকাশ্য রাজপথে দিলা-মোখলেসের বাহিনীর সাথে কামালের বাহিনীর মুখোমুখি বন্দুকযুদ্ধ হয়। সেদিন কয়েক শত রাউন্ড গুলি বিনিময় হয়েছিল এবং পুরো এলাকা থমকে গিয়েছিল।
ঢাকা কাঁপানো চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডসমূহ
গাল কাটা কামালের অপরাধ জীবন ছিল অজস্র রক্তে রঞ্জিত। তবে এর মধ্যে দুটি রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তৎকালীন পুরো বাংলাদেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
মতিঝিলের প্রকাশ্য ট্র্যাজেডি: জাফর হত্যাকাণ্ড
মতিঝিলের ক্লাব পাড়া ও জুয়ার আড্ডা তখন নিয়ন্ত্রণ করত সিরাজ নামের এক প্রভাবশালী জুয়াড়ি। একবার কোনো এক টাকার হিসাব ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে মতিঝিলের তৎকালীন উঠতি মাস্তান জাফরের সাথে সিরাজের চরম ঝামেলা হয়।
অপমানের বদলা: জনাকীর্ণ এক আড্ডায় জাফর কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে প্রভাব শালী সিরাজকে চড় মারেন এবং মাটিতে থুথু ফেলে তা সিরাজকে চেটে পরিষ্কার করতে বাধ্য করেন। এই চরম অপমানের বদলা নিতে উন্মাদ হয়ে ওঠেন সিরাজ। তিনি তৎক্ষণাৎ তৎকালীন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও নিষ্ঠুর কন্ট্রাক্ট কিলার গাল কাটা কামালের শরণাপন্ন হন এবং তাকে মোটা অঙ্কের টাকায় হায়ার করেন।
দিবালোকে হত্যাকাণ্ড: দিনটি ছিল এক কর্মব্যস্ত দুপুর। ঢাকার গুলিস্তানের অত্যন্ত জনবহুল কামান পয়েন্টের কাছে জাফর দাঁড়িয়েছিলেন। হঠাৎ একটি মোটরসাইকেল এসে থামে। বাইক থেকে নামেন গাল কাটা কামাল। শত শত মানুষের চোখের সামনে কামাল পকেট থেকে রিভলভার বের করে জাফরের মাথায় ও বুকে তিন রাউন্ড গুলি চালান। জাফর রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
রক্তে ভেসে যাওয়া জাফরের নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে কামাল শান্তভঙ্গিতে পকেটে রিভলভার পুরেন এবং অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বাইক চালিয়ে ভিড়ের মধ্য দিয়ে সটে সটে কেটে পড়েন। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকার মানুষ বুঝতে পেরেছিল কামালের দুর্ধর্ষতার সীমানা কতদূর।
অভয় দাস লেনের বীভৎস রাত: হারমোনিয়ামের সুর ও বন্ধু ফিরোজকে শিরচ্ছেদ
গাল কাটা কামালের জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বিভীষিকাময় ও মনস্তাত্ত্বিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছিল তার পুরানো শত্রু তথা বন্ধু ফিরোজের ওপর যিনি বহু বছর আগে জগন্নাথ কলেজে কামালের গালে বোতল দিয়ে আঘাত করেছিলেন। কামাল সেই কাটা দাগের কথা ভুলেননি; তিনি বছরের পর বছর প্রতিশোধের আগুন বুকে পুষে রেখেছিলেন।
অপহরণের ছক: এক রাতে কামাল তার সঙ্গীদের নিয়ে জিপগাড়ি চেপে যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে তার এক সময়ের বন্ধু ফিরোজ আল মামুন এবং তার আরেক সহযোগী আব্দুল মালেক রানাকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করেন। জিপে তুলে তাদের হাত-পা ও মুখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় টিকাটুলির অভয় দাস লেনের একটি পরিত্যক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনে।
হারমোনিয়ামের সুর ও শিরচ্ছেদ: সেই পরিত্যক্ত ঘরের ভেতরে কামাল যে বীভৎস দৃশ্যপট তৈরি করেছিলেন, তা কোনো সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানায়। ঘরের মাঝখানে দুটি চেয়ারে ফিরোজ ও রানাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল। আর ঘরের এক কোণে একটি টেবিলে রাখা ছিল একটি হারমোনিয়াম।
কামাল ফিরোজের সামনে গিয়ে হারমোনিয়ামের বেলো চেপে সুর তোলেন। তিনি ভৈরবী রাগে একটি ক্লাসিক্যাল গান গাইতে শুরু করেন। গান গাইতে গাইতে একপর্যায়ে কামাল হারমোনিয়াম ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। তার হাতে উঠে আসে এক চকচকে ধারালো রামদা।
সুর ভাজতে ভাজতেই কামাল অতর্কিতে রামদা দিয়ে স্বজোরে কোপ বসান ফিরোজের ঘাড়ে। এক কোপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ফিরোজের মাথা! এরপর একই নৃশংসতায় গান গাইতে গাইতে তিনি কেটে ফেলেন আব্দুল মালেক রানার মাথাও।
বার্তা পৌঁছানো: হত্যার পর কামালের নির্দেশে সেই রক্তঝরা কাটা মাথা দুটি দুটি পলিথিনে পেঁচিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় জগন্নাথ কলেজের খোলা মাঠে। গভীর রাতে জগন্নাথ কলেজের মাঠে মাথা দুটি ফেলে আসা হয়, যাতে পরদিন সকালে পুরো পুরান ঢাকা বুঝতে পারে গাল কাটা কামালের সাথে শত্রুতার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
মেসোপটেমিয়ার রঙিন পর্দার হাতছানি: 'রসের বাইদানী' ও প্লেব্যাক সিঙ্গার কামাল
গাল কাটা কামালের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য ছিল অপরাধ জগতের শীর্ষ চূড়ায় অবস্থান করার পরও তার ভেতরের সুরের পিপাসা না মেটা। শত রক্তপাতের মাঝেও সে নিয়মিত গান রেওয়াজ করত এবং চলচ্চিত্রে গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশের স্বপ্ন দেখত।
এফডিসিতে যাতায়াত ও সুযোগ লাভ
আশির দশকের শুরুতে কামাল এফডিসি (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন)-র বিভিন্ন সুরকার ও পরিচালকদের সাথে যোগাযোগ তৈরি করেন। নিজের গ্যাংস্টার পরিচয় কিছুটা আড়ালে রেখে সে একজন তরুণ সম্ভাবনাময় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার চেষ্টা করে।
অবশেষে ১৯৮১ সালে মুক্তি প্রতীক্ষিত লোকজ ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্র ‘রসের বাইদানী’-তে গান গাওয়ার সুযোগ পান কামাল।
প্লেব্যাক ও অন-স্ক্রিন পারফরম্যান্স
১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'রসের বাইদানী' সিনেমায় কামাল অত্যন্ত নিখুঁত ও সুরেলা কণ্ঠে একটি লোকসংগীত গেয়েছিলেন, যা দর্শক ও সঙ্গীত বোদ্ধাদের প্রশংসা পেয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, সিনেমাটির পরিচালক কামালের অনুরোধে তাকে ছবিতে একটি ছোট ডাকাত বা মাস্তানের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগও দিয়েছিলেন।
রঙিন স্বপ্নই হয়ে উঠল কাল
সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার পর বাণিজ্যিক সাফল্য পায়। সিনেমার প্রচারণার অংশ হিসেবে তৎকালীন বিভিন্ন বিনোদন পত্রিকা ও দৈনিক পত্রিকায় অন্যান্য শিল্পীদের সাথে ‘চিত্রশিল্পী ও গায়ক’ আবুল হাসনাত কামালের ছবিও ছাপা হয়।
আর এটিই ছিল কামালের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। ততদিনে বাংলাদেশে সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ সামরিক শাসন জারি করেছেন এবং ঢাকা শহরের অপরাধীদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। পত্রিকায় ছবি দেখে সামরিক আদালত ও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন ঢাকার মোস্ট ওয়ান্টেড দুর্ধর্ষ খুনি গাল কাটা কামাল এফডিসিতে ঘুরে বেড়াবে আর সিনেমায় গান গাইবে, এটা প্রশাসন মেনে নিতে পারে না। প্রশাসন তাকে যেকোনো মূল্যে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেয়।
পতনের ঘণ্টা: এগারো দেয়ালের রুদ্ধশ্বাস ধাওয়া ও তেজগাঁওয়ের পতন
১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাস। সামরিক আইন জারির পর ঢাকা শহর জুড়ে চিরুনি অভিযান শুরু হয়েছে। গাল কাটা কামাল তখন তেজগাঁও ও এফডিসি এলাকায় আত্মগোপন করে ছিল।
রুদ্ধশ্বাস ধাওয়া: এক বিকেলে কামাল যখন এফডিসি থেকে একটি গোপনীয় কাজে বের হয়ে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার দিকে যাচ্ছিলেন, তখন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি বিশেষ চৌকস টিম তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে।
সেদিন এক আশ্চর্যজনক কাকতালীয় ঘটনায় কামালের সাথে তার নিত্যদিনের সঙ্গী রিভলভার দুটি ছিল না। নিজের কাছে অস্ত্র না থাকায় কামাল দৌড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। শুরু হয় ঢাকার অপরাধ ইতিহাসের অন্যতম রুদ্ধশ্বাস এক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া।
এগারো দেয়ালের পরাক্রম: তেজগাঁওয়ের ঘিঞ্জি কারখানা এলাকা ও আবাসিক গলির ভেতর দিয়ে কামাল প্রাণপণে দৌড়াতে থাকেন। পেছনে পুলিশের হুইসেল ও গুলির শব্দ। দৌড়াতে দৌড়াতে কামালের সামনে এসে পড়ে এক বিশাল ইটের দেয়াল। কামাল চিতার মতো চটপটে ভঙ্গিতে এক লাফে সেই দেয়াল টপকে ওপারে চলে যান।
পুলিশের দলও পিছু ছাড়ে না। কামাল দৌড়াতে দৌড়াতে একে একে মোট ১১টি উঁচ দেয়াল টপকে পার হয়ে যান! তৎকালীন সময়ে একজন মানুষের পক্ষে টানা ১১টি উঁচু প্রাচীর ডিঙিয়ে পালানোর ঘটনা অলৌকিক বলে মনে হয়েছিল।
শেষ দেয়াল ও ভাগ্য বিপর্যয়: কিন্তু ১১ নম্বর দেয়ালটি পার হয়ে যখন কামাল ওপারে লাফ দেন, ঠিক তখনই ঘটে চূড়ান্ত বিপর্যয়। ল্যান্ডিংয়ের মুহূর্তে কামালের জুতার শক্ত হিলটি দুমড়ে ভেঙে যায়। ফলে ভারসাম্য হারিয়ে সে মুখে ভর দিয়ে রাস্তায় আছড়ে পড়ে। তার পায়ের গোড়ালি মচকে যায় এবং সে আর দাঁড়াতে পারছিল না।
পেছন থেকে ছুটে আসা পুলিশের দল এসে মাটিতে পড়ে থাকা কামালকে চেপে ধরে। পরে তাকে নিয়ে তার গেণ্ডারিয়ার বাসায় তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার করা হয় দুটি অত্যন্ত আধুনিক বিদেশি রিভলভার ও অজস্র গুলি। সমাপ্তি ঘটে 'গাল কাটা কামালের' মুক্ত জীবনের।
সামরিক আদালত, মায়ের শেষ কান্না ও ফাঁসিকাঠে স্তব্ধ সুর
গ্রেফতারের পর তৎকালীন সামরিক আদালতে (Martial Law Court) কামালের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তার বিরুদ্ধে আনা জাফর হত্যা, বন্ধু ফিরোজ ও রানা হত্যা এবং একাধিক অস্ত্র ও চাঁদাবাজির মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ শক্ত প্রমাণ তুলে ধরে।
ফাঁসির রায় ও কামালের অবিশ্বাস
সংক্ষিপ্ত বিচার প্রক্রিয়ায় বিচারক কামালের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ড অর্থাৎ ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকর করার রায় দেন। কিন্তু দাপুটে কামাল রায় শোনার পরও যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয়, ক্যাডার পাওয়ার এবং অপরাধ জগতের দাপটের কারণে সে মনে করেছিল কোনো না কোনো রাজনৈতিক গডফাদার বা অলৌকিক উপায়ে সে পার পেয়ে যাবে।
মায়ের শেষ সাক্ষাৎ ও বেদনার মুহূর্ত
ফাঁসির নির্দিষ্ট তারিখ চূড়ান্ত হওয়ার পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কামালের বৃদ্ধা মা তার সাথে শেষবার দেখা করতে যান। জেলের গরাদের ওপারে দাঁড়িয়ে মা কেঁদে আকুল হন। কামাল তখনো মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে বলেছিলেন:
"মা, তুমি কাঁদছ কেন? এটা আমার শেষ দিন হতে পারে না। এরা আমার ফাঁসি দিতে পারবে না। তুমি জেলারের সাথে গিয়ে কথা বলো, কোথাও নিশ্চয়ই বড় কোনো ভুল হচ্ছে! আমার রাজনৈতিক ভাইয়েরা আমাকে বের করে আনবেই।"
মা কেঁদে কেঁদে জেলের গেটে গিয়ে জেলারের কাছে জানতে পারেন, কামালের প্রাণভিক্ষার শেষ আবেদনও মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বাতিল হয়ে গেছে। বৃদ্ধা মা আর ফিরে এসে নিজের সন্তানকে সেই নিদারুণ দুঃসংবাদটি দেওয়ার সাহস পাননি।
জাদুকরী সুরের অন্তিম পরিণতি
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে এক নিঝুম, অন্ধকার রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কার্যকর করা হয় গাল কাটা কামালের ফাঁসি। ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত যে কণ্ঠে একসময় রাগের জটিল স্বরগ্রাম ও সুরের মায়াজাল তৈরি হতো, সেই কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায় ফাঁসির দড়ির নির্মম টানে। এর মাধ্যমেই সমাপ্তি ঘটে ঢাকার অপরাধ জগতের এক রক্তক্ষয়ী, ট্র্যাজিক ও বিভীষিকাময় অধ্যায়ের।
বিস্তারিত তথ্যসংক্ষেপ (টেবিল ছক)
পাঠকদের সুবিধার্থে আবুল হাসনাত কামাল ওরফে 'গাল কাটা কামাল'-এর সামগ্রিক জীবন, অপরাধ, রাজনীতি এবং ট্র্যাজেডির বিবরণ একটি সংগঠিত ছকে তুলে ধরা হলো:
পরিমাপক / জীবনের ক্ষেত্র | বিস্তারিত ঐতিহাসিক তথ্য ও বিবরণ |
পূর্ণ নাম | আবুল হাসনাত কামাল |
অপরাধ জগতের নাম | 'গাল কাটা কামাল' (Gal Kata Kamal) |
জন্মস্থান ও সন | কার্তিকপুর গ্রাম, সদরপুর উপজেলা, ফরিদপুর জেলা (১৯৫০-এর দশক) |
পারিবারিক পটভূমি | পিতা: আবুল হোসেন খান (সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার); মধ্যবিত্ত সুশীল পরিবার |
প্রাথমিক প্রতিভা | হারমোনিয়াম বাদন, উচ্চাঙ্গ সংগীত, ভৈরবী রাগ ও লোকসংগীতে অসামান্য দক্ষতা |
শিক্ষাগত যোগ্যতা | ডামুড্যা হাইস্কুল থেকে এসএসসি (১৯৭৩); জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জবি)-এ অধ্যয়নরত |
'গাল কাটা' উপাধির উৎস | জগন্নাথ কলেজে পড়া অবস্থায় বন্ধু ফিরোজ কর্তৃক ভাঙা সেভেনআপের বোতলের আঘাতে গালের বীভৎস ক্ষত |
প্রথম অপরাধ ও কারাবাস | পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করার সময় সরকারি মোটরসাইকেল চুরি ও মাদক সরবরাহের অভিযোগে জেলযাত্রা (১৯৭৬) |
রাজনৈতিক রূপান্তর | জাসদের ক্যাডার (১৯৭৪) ➔ জাগদল সূত্রাপুর থানা সভাপতি (১৯৭৭) ➔ যুবদল কোতোয়ালি থানা সভাপতি (১৯৭৮) |
অপরাধের ধরণ ও স্টাইল | 'কাউবয় স্টাইল'; লাল হোন্ডা বাইক নিয়ে দুই হাতে জোড়া রিভলভার দিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে শুটিং |
নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চল | পুরান ঢাকার সদরঘাট, ওয়াইসঘাট, নয়াবাজার, গেণ্ডারিয়া, মতিঝিল, মিরপুর ও মোহাম্মদপুর |
চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডসমূহ | ১. গুলিস্তান কামান পয়েন্টে প্রকাশ্য দিবালোকে জাফর হত্যা ২. অভয় দাস লেনের স্কুলে গান গেয়ে বন্ধু ফিরোজ ও রানাকে কুপিয়ে শিরচ্ছেদ |
চলচ্চিত্রে ভূমিকা | ‘রসের বাইদানী’ (১৯৮২) চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে গান গাওয়া ও ডাকাত চরিত্রে অভিনয় |
গ্রেফতারের রোমাঞ্চকর ঘটনা | ১৯৮২ সালে তেজগাঁওয়ে পুলিশের ধাওয়ায় একাধারে ১১টি উঁচু দেয়াল টপকানোর পর ভাঙা জুতার হিলে পতন ও গ্রেফতার |
চূড়ান্ত পরিণতি | সামরিক আদালতে ফাঁসির রায়; আশির দশকের মাঝামাঝি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি কার্যকর |
সমাজ, রাজনীতি ও সুরের ট্র্যাজেডি: এক অপরাধীয় মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
গাল কাটা কামালের গল্পটি কোনো বীরত্বগাথা নয়, বরং এটি একটি অসামান্য শৈল্পিক প্রতিভার বিনাশ এবং অপরাধের করুণ পরিণতির এক ঐতিহাসিক দলিল।
মনস্তাত্ত্বিক দ্বৈততা (Dr. Jekyll and Mr. Hyde)
মনস্তত্ত্বের ভাষায় কামাল ছিলেন একজন ক্ল্যাসিক 'সাইকোপ্যাথিক স্প্লিট পার্সোনালিটি' বা দ্বৈত সত্তার অধিকারী। একই শরীরে অবস্থান করছিল একজন সুকোমল সুরের সাধক এবং একজন নির্দয়, করুণাহীন দানব। যে হাত দিয়ে তিনি হারমোনিয়ামের কোমল সুর তুলতেন, সেই হাত দিয়েই তিনি বন্ধুর মাথা কেটে তা পলিথিনে পুরে জগন্নাথ কলেজের মাঠে ফেলে আসতেন। সুর ও সহিংসতার এই বিপরীতমুখী অবস্থান প্রমাণ করে মানুষের মনস্তত্ত্ব কতটা জটিল হতে পারে।
সমাজ ও রাজনীতির দায়
একাত্তর-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অস্ত্র সংস্কৃতি এবং উদীয়মান অপরাধ জগতকে রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার করার যে প্রবণতা শুরু হয়েছিল, কামাল ছিলেন তারই এক বিষাক্ত ফসল। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজস্ব ক্ষমতা ধরে রাখতে কামালের মতো ক্যাডারদের ব্যবহার করেছে, তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছে এবং অবশেষে কাজ শেষে বিচার কিংবা ফাঁসির দড়িতে তাদের ঠেলে দিয়েছে।
উপসংহার
আজকের আধুনিক ঢাকায় আশির দশকের সেই আতঙ্ক কিংবা গাল কাটা কামালের রক্তক্ষয়ী অধ্যায় অনেকটাই হারিয়ে গেছে ইতিহাসের গর্ভে। পুরান ঢাকার যে গলিগুলোতে একসময় কামালের লাল হোন্ডার গর্জন আর রিভলভারের শব্দে থমকে যেত জনজীবন, সেখানে আজ বহুতল ভবন আর নতুন জীবনের কোলাহল।
কিন্তু গাল কাটা কামালের ইতিহাস আমাদের এই চিরন্তন শিক্ষাই দিয়ে যায় যে অপরাধ ও হিংসার পথ কখনোই কোনো শুভ পরিণতি আনতে পারে না। সুমধুর সুরের প্রতিভা, রাজনীতি আর অঢেল অর্থের পাওয়ার থাকা সত্ত্বেও কামালের জীবন শেষ হয়েছিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের এক নিঝুম রাতে ফাঁসির দড়িতে ঝুলন্ত অবস্থায়।
তার স্ত্রী-সন্তানরা হয়তো আজও সমাজে এক গভীর বিষাদ ও অপরাধবোধের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন। আর ঢাকার ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে ‘গাল কাটা কামাল’ কেবল একটি দুর্ধর্ষ নাম নয়, বরং এটি একটি প্রতিভার অপচয়, রাজনীতির কুৎসিত রূপ এবং সুরের করুণ মৃত্যুর এক চিরন্তন স্মারক।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন
ছবি: পত্রিকা ও এআই দিয়ে এনহেন্সড





















