দুঃখভারাক্রান্ত নদীদের গল্প - বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া জল পথ
‘আমার একটা নদী ছিল, জানলো না তো কেউ / এই খানে এক নদী ছিল, জানলো না তো কেউ।’ শিল্পী পথিক নবীর এই হাহাকার আজ যেন কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ের প্রতিধ্বনি। এক সময় যে নদী ছিল আমাদের জীবনের স্পন্দন, আজ সেই নদীগুলোই নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে মানচিত্র থেকে। তেরোশত নদীর এই দেশ আজ তার পরিচয় সংকটে ভুগছে। কবি সৈয়দ শামসুল হক লিখেছিলেন - ‘আমি বাংলার আলপথ দিয়ে হাজার বছর চলি... তেরশত নদী সুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে?’ কবির সেই তেরোশত নদীর অধিকাংশই আজ কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ।
নদীমাতৃক বাংলাদেশ
বাংলাদেশকে বলা হতো ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশ’। বাংলাদেশ ও নদী এই দুটি সত্তা একে অপরের পরিপূরক। মানচিত্রের দিকে তাকালে মনে হয় যেন এক নিপুণ শিল্পী তুলির আঁচড়ে অসংখ্য নীল রেখা টেনে দিয়েছেন। এই রেখাগুলোই আমাদের ধমনী, আমাদের প্রাণশক্তি। কিন্তু আজ সেই প্রাণশক্তি ধুঁকছে। একসময়ের প্রমত্তা নদীগুলো আজ কেন মৃত্যুর প্রহর গুনছে, তা নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।
বাংলাদেশকে বলা হয় পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ। এই ভূখণ্ডের জন্মই হয়েছে নদীর হাত ধরে। হিমালয় থেকে নেমে আসা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার মতো অসংখ্য নদ-নদীর বয়ে আনা পলিমাটি হাজার হাজার বছর ধরে জমা হয়ে সৃষ্টি করেছে এই উর্বর জনপদ। নদী এবং বাংলাদেশ এই দুটি শব্দ যেন একটি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
আমাদের লোকজ সংস্কৃতি, গান (ভাটিয়ালি, সারিগান), কবিতা, কথাসাহিত্য এমনকি চলচ্চিত্র সবকিছুই আবর্তিত হয়েছে নদীকে কেন্দ্র করে। নদী শুধু একটি জলধারা নয়, বরং আমাদের জাতীয় পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি
নদীর গুরুত্ব শুধু এর নান্দনিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড দাঁড়িয়ে আছে এই নদীগুলোর ওপর। নদীর বয়ে আনা পলি আমাদের কৃষিজমিকে দিয়েছে অভাবনীয় উর্বরতা। বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি মূলত নদীনির্ভর।
ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সেচ ব্যবস্থার প্রধান উৎস হলো নদী। অভ্যন্তরীণ নৌপথ এখনো পণ্য পরিবহনের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আমিষের চাহিদা মেটাতে মৎস্য সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার হিসেবে নদীগুলো আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে।
নদী বিপর্যয়ের করুণ আখ্যান
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এক সময়ের প্রমত্তা বাংলাদেশ এখন নদী বিপর্যয়ের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ নদী আজ তাদের স্বাভাবিক নাব্যতা, গভীরতা এবং আকার-আকৃতি হারাচ্ছে। যে নদীগুলোতে এক সময় বড় বড় জাহাজ চলত, সেগুলো আজ শীর্ণ খালে পরিণত হয়েছে। অনেক নদী তো মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাওয়ার পথে। এই বিপর্যয় কেবল প্রকৃতির ক্ষতি নয়, বরং আমাদের অস্তিত্বের ওপর এক বিরাট আঘাত।
বাংলাদেশের নদীগুলো আজ মূলত দুটি প্রধান কারণে বিপন্ন। একদিকে যেমন রয়েছে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি, অন্যদিকে রয়েছে আমাদের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা।
১. সীমান্তের উজানে বাঁধ ও পানি কূটনীতি
আমাদের অধিকাংশ বড় নদীর উৎস সীমান্তের ওপারে। আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে উজানে বিভিন্ন নদীতে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে ভারত থেকে আসা পানি প্রবাহ একতরফাভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়। যখন আমাদের পানির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখন নদীগুলো হয়ে পড়ে পানিশূন্য, যার ফলে উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল মরুভূমি সদৃশ পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে।
২. পলি জমা ও ড্রেজিংয়ের অভাব
উজানে পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর স্রোত বা বেগ কমে যায়। ফলে নদী তার সাথে বয়ে আনা পলি সাগরে নিয়ে যেতে পারে না। এই পলি নদীর তলদেশে জমতে জমতে গভীরতা কমিয়ে দিচ্ছে। নিয়মিত এবং বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং বা খনন কাজের অভাবে নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে, যা বর্ষাকালে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে।
৩. দখল ও দূষণের কালো থাবা
দেশের ভেতরে নদীগুলো মানুষের সৃষ্ট অত্যাচারে জর্জরিত। প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় নদীর জমি দখল করে গড়ে উঠছে বিশাল সব অট্টালিকা ও কলকারখানা। শহর ও শিল্পাঞ্চলের অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা বা তুরাগের দিকে তাকালে আজ আর নদী চেনা যায় না; সেখানে বইছে কেবল বিষাক্ত কালো পানি।
পরিসংখ্যানের গোলকধাঁধা: আমাদের নদী আসলে কয়টি?
বাংলাদেশে প্রকৃত নদীর সংখ্যা কত, তা নিয়ে খোদ সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যেই রয়েছে মতভেদ। আমাদের দেশে ঠিক কতটি নদী এখনো জীবিত আছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান কোনো একক সংস্থার কাছে নেই। নদী রক্ষা কমিশন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় কিংবা নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের তথ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
২০১৩ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠিত হলেও আজ পর্যন্ত তারা এমন কোনো নিখুঁত ডেটাবেজ তৈরি করতে পারেনি যা বিতর্কহীন। ফলে নদীর সংখ্যা নিয়ে এক ধরণের 'পরিসংখ্যানের গোলকধাঁধা' তৈরি হয়েছে। এই বিভ্রান্তি কেবল সংখ্যার নয়, বরং নদী ব্যবস্থাপনায় আমাদের উদাসীনতারও বহিঃপ্রকাশ।
নদীর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করার বদলে বিভিন্ন সংস্থার ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সাধারণ মানুষকে আরও দ্বিধান্বিত করে তোলে। নিচে প্রধান সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্যের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
১. উইকিপিডিয়া ও সাধারণ প্রচলিত তথ্য: সাধারণত পাঠ্যপুস্তক এবং উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, শাখা-প্রশাখাসহ বাংলাদেশে প্রায় ৮০০ নদ-নদী প্রবাহিত হয়েছে। এই বিশাল জলপথ প্রায় ২৪,১৪০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। তবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং দখল-দূষণে এই তালিকার বড় একটি অংশ এখন কেবল কাগজে-কলমে টিকে আছে।
২. পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবি) অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসাব: সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য নিয়ে।
২০০৫ সালের তথ্য: পাউবি জানিয়েছিল দেশে নদীর সংখ্যা ৩১০টি।
২০১১ সালের অনুসন্ধান: দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তারা ছয় খণ্ডে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করে, যেখানে নদীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৪০৫টি উল্লেখ করা হয়।
একই সংস্থার তথ্যে কয়েক বছরের ব্যবধানে এই বিশাল পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, আমাদের নদী শুমারিতে বড় ধরণের কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে।
অঞ্চলভিত্তিক নদীর বিন্যাস
পানি উন্নয়ন বোর্ড তাদের ২০১১ সালের জরিপে অঞ্চলভেদে নদীর যে বিন্যাস দেখিয়েছে, তা নিম্নরূপ:
অঞ্চল | নদীর সংখ্যা |
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল | ১০২টি |
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল | ১১৫টি |
উত্তর-পূর্বাঞ্চল | ৮৭টি |
উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চল | ৬১টি |
পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চল | ১৬টি |
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল | ২৪টি |
যদিও এই তালিকায় ৪০৫টি নদীর নাম এসেছে, কিন্তু স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের মতে, প্রকৃত নদীর সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি ছিল। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই তালিকার অনেক নদী এখন মৃতপ্রায় বা কেবল বর্ষাকালে সচল থাকে।
নদী হারানোর নীরব মিছিল
পরিসংখ্যানের এই খেলার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক করুণ বাস্তবতা। গত কয়েক দশকে মানচিত্র থেকে নীরবে হারিয়ে গেছে অসংখ্য নদী। এই হারিয়ে যাওয়াকে গবেষকরা 'নদী হত্যা' হিসেবেও অভিহিত করেন।
২০১০ সালে বাংলাদেশ দুর্যোগ ফোরামের একটি সমীক্ষায় আঁতকে ওঠার মতো তথ্য বেরিয়ে আসে। তাদের হিসেবে, ১৯৬৩ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত মাত্র ৫৭ বছরে বাংলাদেশে ১৫৮টি নদী সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩টি করে নদী আমাদের মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে গেছে।
বর্তমান মৃতপ্রায় নদীর চিত্র
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের গবেষকদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের অন্তত ১১৫টি নদী বর্তমানে মৃতপ্রায়। অন্যদিকে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কর্মরত বেসরকারি সংস্থা ‘উত্তরণ’-এর তথ্য আরও ভয়াবহ। তাদের গবেষণা বলছে, ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে অর্থাৎ মাত্র ২০ বছরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৪৩টি নদী পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে।
কেন হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের নদী?
নদী হারানোর এই মহোৎসবের পেছনে প্রাকৃতিক কারণের চেয়ে মানবসৃষ্ট কারণই বেশি দায়ী। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে নদীর মৃত্যু হয়েছে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। অপরিকল্পিত ব্রিজ, কালভার্ট এবং স্লুইস গেট নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
ষাটের দশকে নির্মিত পোল্ডার বা বেড়িবাঁধগুলো দীর্ঘমেয়াদে নদীর পলি জমার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে, যার ফলে নদীগুলো নাব্যতা হারিয়ে ভরাট হয়ে গেছে। শিল্পবর্জ্য এবং অবৈধ দখলের কারণে নদীর বুক সংকুচিত হয়ে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে সেখানে স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে।
দূষণে বিষাক্ত হচ্ছে নীল জলরাশি
নদী কেবল পানিশূন্য হয়ে মরছে না, বরং টিকে থাকা নদীগুলো বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অনেক নদীতে পানিপ্রবাহ থাকলেও তা এখন মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বুড়িগঙ্গা, বালু, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী - এই চারটি নদী বর্তমানে বিষাক্ত তরলের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বুড়িগঙ্গার তীরে এক সময় ঢাকা শহর গড়ে উঠেছিল এর নির্মল পানির জন্য। আজ সেই পানি এতোটাই দূষিত যে, অতিরিক্ত ক্লোরিন প্রয়োগ করেও তা শোধন করা সম্ভব হচ্ছে না। শিল্প-কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ার ফলে নদীর মাছ ও জলজ উদ্ভিদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
বাংলার প্রধান নদীগুলোর হারানো জৌলুস
পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও সুরমা এই নামগুলো শুনলেই চোখে ভাসে বিশাল জলরাশি আর ঢেউয়ের গর্জন। কিন্তু আধুনিক নগরায়ন আর জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় এই প্রধান নদীগুলোও আজ তাদের চিরচেনা রূপ হারিয়েছে। বর্ষাকালে কিছুটা পানি থাকলেও বছরের বাকিটা সময় এই নদীগুলোর বুক জুড়ে জেগে ওঠে বিশাল বিশাল চর। ফলে নৌ-চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং মৎস্য সম্পদ বিলুপ্তির পথে এগোচ্ছে।
সুরমা ও ব্রহ্মপুত্র: সুরমা বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৯৯ কিলোমিটার। অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র হচ্ছে এই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী নদ। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, বছরের অর্ধেক সময় এই নদী দুটির অনেক স্থানে বিশাল বিশাল চর জেগে থাকে। ভারত থেকে আসা পলির আধিক্য এবং নিয়মিত ড্রেজিংয়ের অভাব নদীগুলোর নাব্যতা কমিয়ে দিয়েছে। সুরমার তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই সিলেট অঞ্চলে এখন ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে, কারণ নদী আর পানি ধরে রাখতে পারছে না।
আমাদের কবি-সাহিত্যিকরা যেসব নদীকে অমর করে রেখে গেছেন, বাস্তবে সেগুলোর অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়।
কপোতাক্ষ: মাইকেল মধুসূদন দত্ত যে কপোতাক্ষ নদের টানে সুদূর ফ্রান্স থেকে আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, "সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে", সেই কপোতাক্ষ আজ অস্তিত্ব সংকটে। একসময়ের খরস্রোতা এই নদ এখন একটি মৃতপ্রায় খালে পরিণত হয়েছে। পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ হয়ে গেছে। যশোরের অনেক জায়গায় কপোতাক্ষের বুক এখন চাষাবাদের জমিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
ধানসিঁড়ি: জীবনানন্দ দাশের কবিতার সেই রূপময় ‘ধানসিঁড়ি’ নদী আজ শুধু নামেই বেঁচে আছে। যে নদীকে ঘিরে বাংলার রূপসী রূপ ফুটে উঠত, দখল আর দূষণে তা আজ সরু নালায় পরিণত হয়েছে। ঝালকাঠি দিয়ে প্রবাহিত এই নদীটির বর্তমান অবস্থা এতটাই করুণ যে, একে এখন নদী বলাও কঠিন; স্থানীয়রা একে 'কালো ড্রেন' হিসেবেই বেশি চেনে।
বড়াল ও চলন বিল: চলন বিলের প্রাণ হিসেবে পরিচিত বড়াল নদী। এই নদীটি একসময় যমুনার পানি বয়ে নিয়ে চলন বিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করত। কিন্তু উন্নয়নের নামে বড়াল নদীতে অপরিকল্পিতভাবে আড়াআড়ি বাঁধ (Cross-dam) দেওয়া হয়েছে। তিনটি সুইস গেট এবং বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরির ফলে নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে চলন বিল তার আগের ঐতিহ্য হারাচ্ছে এবং স্থানীয় কৃষি ও মৎস্য চাষ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
প্রান্তিক জনপদের মুমূর্ষু নদীগুলো
বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার মানচিত্র ঘাঁটলে দেখা যায় অসংখ্য নদীর হাহাকার। জেলাভিত্তিক এই নদীগুলোর করুণ দশা আমাদের পরিবেশগত বিপর্যয়ের সংকেত দেয়।
ফরিদপুরের কুমার ও রাজবাড়ীর গড়াই: পদ্মা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে এই নদীগুলো এখন পানিশূন্যতায় ভুগছে।
বগুড়ার করতোয়া ও কুমিল্লার গোমতী: একসময়ের তিব্র স্রোতের করতোয়া আজ দখলদারদের কবলে। গোমতীর দুই পাশ দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা।
পিরোজপুরের বলেশ্বর ও কুড়িগ্রামের ধরলা: এই নদীগুলোর পাড় ভাঙন এবং পলি জমার সমস্যা এতটাই প্রকট যে প্রতিবছর শত শত মানুষ গৃহহীন হচ্ছে, অথচ নদীর গভীরতা বাড়ছে না।
সোমেশ্বরী, কংশ, ভৈরব ও আত্রাই: উত্তরের সোমেশ্বরী নদীতে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে, ফলে নদীটি তার স্বাভাবিক গতিপথ হারিয়ে মৃত্যুর দিন গুনছে।
নদী রক্ষায় ব্যর্থতা - দায় আসলে কার?
প্রচলিত একটি কথা আছে "নদী কখনো মরে না, শুধু খাত পরিবর্তন করে।" কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই কথাটি আজ মিথ্যা প্রমাণিত হতে চলেছে। আমরা প্রাকৃতিকভাবে নয়, বরং কৃত্রিমভাবে নদীকে হত্যা করছি। নদী হত্যার প্রধান কারণসমূহ:
১. উৎস মুখ বন্ধ করা: উজানে বাঁধ নির্মাণ এবং শাখা নদীগুলোর মুখ পলি জমে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মূল প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
২. বালু উত্তোলন ও দখল: একশ্রেণির প্রভাবশালী মহল অবৈধভাবে নদীর বুক থেকে বালু উত্তোলন করছে এবং পাড় দখল করে কলকারখানা গড়ে তুলছে।
৩. অপরিকল্পিত অবকাঠামো: নদীর গতিপথ বিবেচনা না করে অপ্রয়োজনীয় সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের ফলে নদীর টুঁটি চেপে ধরা হচ্ছে।
৪. বর্জ্য নিষ্কাশন: শহরের সমস্ত ময়লা-আবর্জনা ও ড্রেনের পানি সরাসরি নদীতে ফেলায় নদীগুলো আজ বিষাক্ত ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
নদীর বাঁচার অধিকার আমাদের অস্তিত্বের অধিকার
বিশ্বব্যাপী সুপেয় বা স্বাদু পানির উৎস কমে যাচ্ছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো তাদের নদী ও জলাধার রক্ষায় কঠোর আইন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কিন্তু নদীমাতৃক বাংলাদেশের স্বাদু পানির এই বিশাল সম্পদ আমরা অবহেলায় ধ্বংস করছি। নদী শুকিয়ে গেলে কেবল মাছ বা পানি হারাবে না, বরং বাংলাদেশের জলবায়ু বদলে যাবে, মরুকরণ ত্বরান্বিত হবে এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের সভ্যতা হুমকির মুখে পড়বে।
নদীকে নদী হিসেবে থাকতে দেওয়া এবং এর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনাই হোক আমাদের প্রধান অঙ্গীকার। অন্যথায়, আগামী প্রজন্মের কাছে নদী কেবল গল্পের বইয়ের কোনো কাল্পনিক চরিত্র হয়েই থাকবে।




















