মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ৩০ লাখ শহীদ – কেন এই সংখ্যা নিয়ে তর্ক করা অর্থহীন?

Nov 10, 2025

ফেনীর ফুলগাজীর জামুড়া গ্রাম। আজও সেখানে বেঁচে আছেন একজন বৃদ্ধ। নাম করিমুল হক। তাঁর চোখে মুক্তিযুদ্ধ মানে কোনো বইয়ের পাতা নয়, বরং এক রাতের কান্না। ১৯৭১ সালের ১২ মে রাতে পাকিস্তানি সেনা আর রাজাকাররা তাঁর বাড়িতে ঢুকে একাই গুলি করে মেরে ফেলে ২৭ জনকে। বাবা, মা, পাঁচ ভাই-বোন, নানী, দুই মামা, মামী, খালা, ফুফা - সবাই। করিমুল হক সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন শুধু কারণ তিনি বাড়িতে ছিলেন না। আজ তিনি যখন কথা বলেন, তখন কোনো রাগ নেই, শুধু একটা প্রশ্ন - “আমি কি ২৭ জনের কথা ভুলে যাবো?”

আমরা অনেকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তর্ক করি। কেউ বলেন ৩ হাজার, কেউ বলেন ৩ লাখ, কেউ বলেন ৩০ লাখ। কিন্তু করিমুল হকের মতো লাখো মানুষের কাছে এই সংখ্যা কোনো তর্কের বিষয় নয়। এটা তাদের জীবনের রক্তাক্ত অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধ গবেষণায় বিভিন্ন সময় অনেক তথ্য উঠে এসেছে - যা প্রমাণ করে, শহীদের সংখ্যা ৩০ লাখের কম নয়। এই ব্লগে আমরা সেই রক্তাক্ত পাতাগুলো উল্টে দেখব।

চুকনগর গণহত্যা: একদিনে ১২ হাজারের বেশি শহীদ

১৯৭১ সালের ২০ মে। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর। সকাল থেকে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছে। তারা শরণার্থী খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, ফরিদপুর থেকে পালিয়ে আসা হিন্দু-মুসলিম নিরীহ গ্রামবাসী। উদ্দেশ্য একটাই ভারত সীমান্ত পেরিয়ে প্রাণ বাঁচানো। চুকনগর তখন নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু বেলা ১১টায় এসে হাজির হলো পাকিস্তানি সেনার এক প্লাটুন। তারা শুরু করল অন্ধের মতো গুলি। মেশিনগানের আওয়াজে কেঁপে উঠল চার মাইল এলাকা। মাত্র ৪-৬ ঘণ্টায় শেষ হয়ে গেল ১২ হাজারের বেশি মানুষের জীবন।

১. চুকনগর কেন হয়ে উঠল শরণার্থীদের আশ্রয়?

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পরপরই পাকিস্তানি সেনার অত্যাচারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ পালাতে শুরু করে। খুনে, লুট, ধর্ষণ—সবকিছু থেকে বাঁচতে তারা ছুটল ভারতের দিকে। চুকনগর ছিল সীমান্তের কাছে, ভদ্রা নদীর তীরে। এখান থেকে সাতক্ষীরা রোড ধরে ভারত যাওয়া সহজ। ১৫ মে থেকে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতে থাকে।

প্রত্যক্ষদর্শী শেখ বাহারুল ইসলাম বলেন, “লোকে লোকারণ্য হয়ে গিয়েছিল। বাজার, মাঠ, নদীর তীর - সর্বত্র মানুষ।” তারা ভেবেছিল এখানে নিরাপদ। কিন্তু আত্লিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন পাকিস্তানি সেনাকে খবর দিয়েছিল - “এখানে হাজার হাজার শরণার্থী জড়ো হয়েছে।” এটি ছিল পরিকল্পিত। পাকিস্তানি সেনা চেয়েছিল এক জায়গায় জড়ো করে মেরে ফেলতে।

২. সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা – রক্তের ঝড়

২০ মে সকাল ১১টা। দুটি ট্রাক আর একটি জিপে করে আসে পাকিস্তানি সেনা। তাদের সঙ্গে রাজাকার। তারা ঝাউতলায় নেমে শুরু করে গুলি। লাইট মেশিনগান, রাইফেল - সবকিছু দিয়ে অন্ধের মতো ফায়ার। মানুষ দৌড়াতে শুরু করে। কিন্তু কোথায় পালাবে? চারদিকে নদী, মাঠ। মেশিনগানের আওয়াজে কেঁপে উঠল চার মাইল এলাকা। মাত্র ৪-৬ ঘণ্টায় শেষ হয়ে গেল ১২ হাজারের বেশি মানুষের জীবন। গুলি চলে দুপুর ৩টা পর্যন্ত। তারপর গুলি ফুরিয়ে যায়। সেনারা চলে যায়। পুরো এলাকা লাশে ভর্তি। ভদ্রা নদীতে লাশ ভাসছে। ভদ্রা নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয়। তাই সঠিক সংখ্যা কখনো পাওয়া যায়নি।

৩. শহীদের সংখ্যা – ১০ হাজার নাকি ১৫ হাজার?

শহীদের সঠিক সংখ্যা কখনো জানা যায়নি। কারণ লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে ১২ হাজারের বেশি। মুনতাসীর মামুনের বই “১৯৭১ চুকনগরে গণহত্যা”য় বলা হয়েছে ১০ হাজার। ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর এর গবেষণায় দেখা গেছে, চুকনগরে শহীদের সংখ্যা ১৫ হাজারের কাছাকাছি। এটি বিশ্বের ইতিহাসে একদিনে সবচেয়ে বড় গণহত্যাগুলোর একটি। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, শহীদদের অধিকাংশ হিন্দু। কিন্তু মুসলিমও কম নয়। শিশু, নারী, বৃদ্ধ - কেউ রেহাই পায়নি।

চট্টগ্রাম – ১১৬টি বধ্যভূমি শুধু এক শহরে

চট্টগ্রাম। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী, বন্দরনগরী, পাহাড়-সমুদ্রের মিলনস্থল। কিন্তু ১৯৭১ সালে এই শহর ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কসাইখানা। শুধু চট্টগ্রাম শহরেই বধ্যভূমির সংখ্যা ১১৬টি - একটি সংখ্যা যা শুনলে গা শিউরে ওঠে। প্রতিটি বধ্যভূমি একেকটি গণকবর, যেখানে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে গুলি করে, কুপিয়ে, জ্যান্ত পুঁতে ফেলা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সাম্প্রতিক খননকাজে নতুন গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। দামপাড়া থেকে পাহাড়তলী, শিয়ালবাড়ি থেকে বেলতলী। কেন চট্টগ্রাম এত বেশি বধ্যভূমির শহর?

১. চট্টগ্রাম কেন হয়ে উঠল হত্যাকাণ্ডের কেন্দ্র?

চট্টগ্রাম বন্দর ছিল পাকিস্তানের অর্থনৈতিক লাইফলাইন। এখান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে যেত অস্ত্র, গোলাবারুদ। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি সেনারা প্রথম আঘাত হানে এখানে। ২৫ মার্চ রাতে চট্টগ্রামে অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসেবে শুরু হয় গণহত্যা। শহরের বিহারী অধ্যুষিত এলাকা থেকে রাজাকাররা সাহায্য করে। পাকিস্তানিরা মনে করত, চট্টগ্রাম দখল করলে পূর্ব পাকিস্তান দখল করা সহজ হবে। ফলে শহরের প্রতিটি কোণে গড়ে ওঠে টর্চার সেল, বধ্যভূমি। ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভের রিপোর্টে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম জেলায় বধ্যভূমি ও গণকবরের সংখ্যা ১২৬টি ছাড়িয়েছে। শুধু শহরে ৭৪টি। এর মধ্যে অনেকগুলো এখনো অরক্ষিত, কিছুতে গড়ে উঠেছে বাড়ি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।

২. দামপাড়া – যেখানে মাজারের নিচে লুকিয়ে আছে হাজারো খুলি

দামপাড়া বধ্যভূমি। বর্তমানে গরিবুল্লাহ শাহ মাজারের জায়গা। ১৯৭১ সালে এটি ছিল পাকিস্তানি সেনাদের প্রধান হত্যাকেন্দ্র। প্রতি রাতে ট্রাক ভর্তি মানুষ আনা হতো। তাদের দিয়ে গর্ত খোঁড়ানো হতো, তারপর গুলি। এক গর্ত পূর্ণ হলে খুলি সরিয়ে নতুন গর্ত। এখানে শহীদ হয়েছেন প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। স্বাধীনতার পর খননকাজে পাওয়া গিয়েছিল হাজার হাজার খুলি। কিন্তু আজ মাজারের ভক্তরা জানেন না, তাদের পায়ের নিচে কত রক্তের দাগ। ২০১৬ সালের ডেইলি স্টার রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই বধ্যভূমিগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

৩. পাহাড়তলী – এক গর্তে ১০৮২টি খুলি

পাহাড়তলী বধ্যভূমি। চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় গণকবর। এখানে পাওয়া গিয়েছিল ১০০টি গর্ত। একটি গর্তেই ১,০৮২টি খুলি। মোট শহীদের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যায়। পাকিস্তানিরা এখানে বুদ্ধিজীবী, মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষ - সবাইকে নিয়ে আসত। রাতের অন্ধকারে গুলির শব্দ আর চিৎকারে কেঁপে উঠত পুরো এলাকা। ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খননকাজে আরও ৮টি গর্তের সন্ধান পাওয়া গেছে। গবেষকরা বলছেন, এখানে এখনো অনেক লাশ মাটির নিচে। কিন্তু জায়গাটি এখন ইউএসটিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস।

৪. শিয়ালবাড়ি, শিরনিরটেক, আলোকদী – কুয়ায় ভর্তি লাশ

মিরপুর নয়, চট্টগ্রামের শিয়ালবাড়িতে পাওয়া গিয়েছিল ৬০ বস্তা খুলি। শিরনিরটেকে ৩ হাজার শহীদ। আলোকদী গ্রামে ৮টি কুয়া ভর্তি লাশ। পাকিস্তানিরা গ্রামবাসীকে জড়ো করে কুয়ায় ফেলে গুলি করত। আজ সেই কুয়াগুলো শুকিয়ে গেছে, কিন্তু স্মৃতি শুকায়নি। মিরপুরে (চট্টগ্রামের অংশ) নতুন খননকাজে আরও ৩টি গণকবর পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা বলেন, “রাতে এখনো শুনি চিৎকার।”

৫. বেলতলী – সিগারেট ফ্যাক্টরি যা হত্যাপুরী

লাকসামের কাছে বেলতলী সিগারেট ফ্যাক্টরি। ১৯৭২ সালের পূর্বদেশ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল - “এই ফ্যাক্টরির কোণায় কোণায় অত্যাচার, ধর্ষণ, গণহত্যা—পৃথিবীতে বিরল।” এখানে শহীদ ১০ হাজারের বেশি। ফ্যাক্টরির ছাদে, সেলে, কক্ষে - সর্বত্র লাশ। আজ ফ্যাক্টরি বন্ধ, কিন্তু দেয়ালে এখনো রক্তের দাগ।

৬. সিটি গেইট, শুলকবহর, জেনারেল হাসপাতাল – আরও নামহীন কবর

সিটি গেইট বধ্যভূমি। শুলকবহর হামদু মিয়া সড়ক। জেনারেল হাসপাতালের লাশ মর্গ। চট্টগ্রাম সরকারি ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত এই স্থানগুলোতে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। অনেক জায়গায় এখন রাস্তা, বাড়ি, মার্কেট। কিন্তু মাটির নিচে লুকিয়ে আছে স্মৃতি।

চট্টগ্রামের ১১৬টি বধ্যভূমি শুধু সংখ্যা নয়। এটা হাজার হাজার মায়ের কান্না, বাবার অসহায়ত্ব, শিশুর চিৎকার। আমরা বন্দর দেখি, পাহাড় দেখি, কিন্তু মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা খুলিগুলো দেখি না।

গাবতলী ব্রিজ – ঢাকার মৃত্যুকূপ

ঢাকার গাবতলী আজ শহরের ব্যস্ততম প্রবেশদ্বার। কিন্তু ১৯৭১ সালে এই গাবতলীর পুরনো স্টিল ব্রিজ ছিল পাকিস্তানি সেনা আর তাদের স্থানীয় দোসরদের জন্য এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুকূপ। রাতের অন্ধকারে ট্রাক ভর্তি মানুষ আনা হতো। ব্রিজের বাতি নিভিয়ে গুলি চালানো হতো। একের পর এক লাশ পড়ত তুরাগ নদীতে। স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যেত সেই লাশ। এক প্রত্যক্ষদর্শী মাঝি বলেছিলেন, “পুরো যুদ্ধে এমন একটা রাতও ছিল না, যেদিন এখানে মানুষ মারা হয়নি।”

১. গাবতলী ব্রিজের অবস্থান – কেন এটি নির্বাচন করা হয়েছিল হত্যার জন্য?

গাবতলী ব্রিজ তুরাগ নদীর ওপর। ১৯৭১ সালে এটি ছিল পুরনো স্টিলের সরু ব্রিজ। চারদিকে জলাভূমি, ঝোপঝাড়। রাতে নির্জন। পাকিস্তানি সেনা আর বিহারী সহযোগীরা এটিকে বেছে নিয়েছিল কারণ লাশ ফেলে দিলে স্রোতে ভেসে যেত। কোনো প্রমাণ থাকত না। মিরপুর এলাকা তখন বিহারী অধ্যুষিত। তারা পাকিস্তানি সেনাদের সাহায্য করত মানুষ ধরে আনতে।

প্রতি রাতে শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ট্রাক ভর্তি করে আনা হতো বাঙালি যুবক, বুদ্ধিজীবী, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক। ব্রিজের মাঝখানে থামানো হতো। বাতি নিভিয়ে গুলি। শব্দ শুনে আশপাশের লোকজনও ভয়ে চুপ থাকত। এক গবেষণায় বলা হয়েছে, মিরপুর পুরোটা ছিল এক বিশাল কিলিং ফিল্ড। গাবতলী তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ব্রিজে শহীদ হয়েছেন কমপক্ষে ১৫ হাজার মানুষ। কিন্তু সঠিক সংখ্যা কখনো জানা যাবে না, কারণ নদী সব গোপন করে ফেলেছে। একটি সাধারণ ব্রিজ হয়ে উঠল গণহত্যার প্রতীক।

২. রাতের পর রাত গুলির শব্দ – প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতি

মোহাম্মদ আলী নামে এক মাঝি তুরাগের ওপার থেকে দেখতেন সব। তিনি বলেছেন, “ট্রাক আসত। মানুষ চিৎকার করত। তারপর গুলি। লাশ পড়ত জলে। স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যেত।” ১৯৭১ সালে এই ব্রিজে প্রতি রাতে শত শত মানুষ হত্যা হতো। মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ড. এমএ হাসান বলেছেন, “গাবতলী ব্রিজ ছিল পাকিস্তানি সেনাদের প্রিয় কিলিং গ্রাউন্ড।” তুরাগ নদীতে ড্রেজিংয়ের সময় পাওয়া গেছে আরও শত শত খুলি। এগুলোর ডিএনএ টেস্টে প্রমাণিত হয়েছে, এরা একাত্তরের শহীদ। কিন্তু সরকারিভাবে এখনো এটিকে বধ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

৩. কতজন শহীদ? সংখ্যার রহস্য

সঠিক সংখ্যা কেউ বলতে পারে না। গবেষকরা বলেন ১৫ হাজারের বেশি। কারণ নদীতে ফেলা লাশ ভেসে গেছে। কিছু লাশ মাছ খেয়েছে। কিছু পচে গলে মিশে গেছে মাটিতে। ১৯৭২ সালে যখন খোঁজা হয়, তখন পাওয়া যায় হাজার হাজার খুলি। কিন্তু সব না। ২০২৩ সালের ডেইলি স্টারের রিপোর্টে বলা হয়েছে, গাবতলী একাই মিরপুরের অনেকগুলো কিলিং ফিল্ডের একটি। পুরো মিরপুরে শহীদ লাখের ওপর।

মিরপুর – কসাইখানার শহর

ঢাকার মিরপুর আজ এটি একটি জমজমাট শহরী এলাকা। কিন্তু ১৯৭১ সালে এই মিরপুর ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের কসাইখানা। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে মিরপুরে বধ্যভূমির সংখ্যা ছিল ২৩টি - যা ঢাকার মধ্যে সর্বোচ্চ। এখানে হাজার হাজার বাঙালিকে গুলি করে, কুপিয়ে, জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। লাশ ফেলা হয়েছে কুয়ায়, নদীতে, জঙ্গলে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও মিরপুরের মাটি যেন চিৎকার করে বলে - “আমাকে ভুলে যেও না।” মিরপুরের অনেক বধ্যভূমি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বহুতল ভবন, মসজিদ, মার্কেট গড়ে উঠেছে তার ওপর। কিন্তু কিছু স্মৃতি এখনো বেঁচে আছে - জল্লাদখানা, শিয়ালবাড়ি, শিরনিরটেক, আলোকদী।

১. মিরপুর কেন হয়ে উঠল হত্যাকাণ্ডের কেন্দ্র?

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে মিরপুর ছিল মূলত উর্দুভাষী বিহারীদের বসতি। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর বিহার থেকে আগত এই সম্প্রদায় পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছিল। যুদ্ধ শুরু হলে তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মিরপুরের জঙ্গল, খালি জমি, পাম্প হাউস - সবকিছু হয়ে উঠল টর্চার সেল ও বধ্যভূমি।

পাকিস্তানি সেনারা বিহারীদের অস্ত্র দিয়েছিল। তারা “কিলিং স্কোয়াড” গঠন করে। রাতে ট্রাক ভর্তি বাঙালি ধরে আনা হতো। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, “কে কতজন মারল, সেটা নিয়ে প্রতিযোগিতা হতো।” মিরপুরে প্রথম গণহত্যার শিকার হন কবি মেহেরুননেসা ও তার পরিবার। তারপর নয় মাস ধরে চলল নারকীয় হত্যাকাণ্ড। লক্ষাধিক বাঙালি শহীদ হয়েছেন শুধু মিরপুরেই।

২. জল্লাদখানা – কুয়ায় ভর্তি লাশের স্মৃতি

মিরপুরের জল্লাদখানা (পাম্প হাউস) ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বধ্যভূমি। ১৯৯৯ সালে খোঁড়াখুঁড়ির সময় পাওয়া গিয়েছিল ৭০টি খুলি ও ৫৩৯২টি হাড়। দুটি কুয়ায় লাশ ফেলা হতো। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, “কুয়ায় লাশের ওপর লাশ পড়ত। জায়গা না হলে খুলি সরিয়ে নতুন লাশ ফেলা হতো।” ২০০৭ সালে এখানে স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলা হয়। কিন্তু এটি অবহেলিত। চারদিকে আবর্জনা, দেয়ালে গ্রাফিতি। মিউজিয়ামে রাখা আছে শহীদদের জুতো, চুলের ক্লিপ, প্রার্থনার মালা। প্রতি বছর কয়েক হাজার দর্শনার্থী আসেন, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্মৃতি মলিন হয়ে যাচ্ছে।

৩. শিয়ালবাড়ি – যেখানে মানুষের হাড় কিমা করা হয়েছে

শিয়ালবাড়ি (বর্তমান রূপনগর) ছিল জঙ্গলাকীর্ণ এলাকা। এখানে হাজার হাজার মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ১৯৭২ সালে গিয়ে লিখেছিলেন, “কসাইখানায় গোস্ত কিমা করতে দেখেছি। শিয়ালবাড়িতে মানুষের হাড় কিমা করা হয়েছে।” স্বাধীনতার পর পাওয়া গিয়েছিল ৬০ বস্তা খুলি। আজ শিয়ালবাড়ি একটি পরিবারিক কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। স্মৃতিফলক নেই। স্থানীয়রা বলেন, “আমরা জানি এখানে কী হয়েছে, কিন্তু কথা বললে সমস্যা হয়।” বধ্যভূমি সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই।

৪. শিরনিরটেক ও আলোকদী – কুয়ায় ভর্তি লাশ

শিরনিরটেকে হত্যা করা হয়েছে ৩ হাজার মানুষকে। আলোকদী গ্রামে ২৪-২৫ এপ্রিল এক রাতে শহীদ ৩ হাজার। ৮টি কুয়া ভর্তি হয়ে গিয়েছিল লাশে। আজ আলোকদীতে কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। শিরনিরটেকে একটি ছোট ফলক আছে, কিন্তু চারদিকে আবর্জনা। ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খননকাজে চট্টগ্রামের মিরপুরে নতুন গণকবর পাওয়া গেছে, কিন্তু ঢাকার মিরপুরে এখনো পূর্ণাঙ্গ খনন হয়নি।

৫. লোহার ব্রিজ ও মুসলিম বাজার – নদীতে ভাসানো লাশ

মিরপুরের লোহার ব্রিজ (তুরাগ নদীর ওপর) ছিল “জলাবধ্যভূমি”। প্রতি রাতে লাশ ফেলা হতো নদীতে। প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “নদীতে পা রাখার জায়গা ছিল না।” শহীদ ১৫ হাজারের বেশি। মুসলিম বাজারে মসজিদের নিচে বধ্যভূমি। ২০২২ সালে খননকাজে হাড় পাওয়া গিয়েছিল, পরে সমাধিস্থ করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে।

৬. মিরপুর মুক্ত দিবস – ৩১ জানুয়ারি, স্বাধীনতার ৪৫ দিন পর

১৬ ডিসেম্বর সারা দেশ স্বাধীন হলেও মিরপুরে বিহারী ও রাজাকাররা অবরোধ করে রাখে। ৩১ জানুয়ারি ১৯৭২ সেনাবাহিনীর অভিযানে মুক্ত হয়। এতে শহীদ হন ৪১ সেনা ও ৮২ পুলিশ। জাহিদ রায়হান এখানে শহীদ হন। প্রতি বছর ৩১ জানুয়ারি মিরপুর মুক্ত দিবস পালিত হয়। কিন্তু বধ্যভূমিগুলো অবহেলিত। ২৩টির মধ্যে ১৩টি নিখোঁজ।

লাকসামের বেলতলী – হত্যাপুরী

লাকসাম রেলওয়ে জংশনের দক্ষিণে, রেললাইনের ধার ঘেঁষে একটি প্রাচীন বেলগাছের তলা। স্থানীয়রা এটিকে বলেন বেলতলী বধ্যভূমি। কিন্তু ১৯৭১ সালে এই জায়গাটি ছিল না কোনো শান্তিময় ছায়াঘেরা স্থান। এটি ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আর তাদের দোসর রাজাকারদের হত্যাপুরী। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে এখানে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে ধরে এনে গুলি করে, জবাই করে, নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে, কখনো ফেলে দেওয়া হয়েছে নদীতে।

১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর এর গবেষণায় বেলতলীতে শহীদের সংখ্যা অনুমান করা হয় ২,০০০ থেকে ৩,০০০। কিন্তু স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, সংখ্যা আরও বেশি।

১. লাকসামের ভৌগোলিক অবস্থান – যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু কেন হয়েছিল

লাকসাম উপজেলা কুমিল্লা জেলার দক্ষিণে অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় রেলওয়ে জংশন। ১৯৭১ সালে এখান দিয়ে চট্টগ্রাম-ঢাকা-সিলেট রুটের যোগাযোগ চলত। পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য এটি ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তারা লাকসামকে ব্যবহার করেছিল সেনা সরবরাহের জন্য। আর স্থানীয় রাজাকাররা এখানে ক্যাম্প গড়ে তুলেছিল।

বেলতলী বধ্যভূমি রেলজংশনের দক্ষিণে রেললাইনের ধারে। পাশেই ছিল থ্রি-এ সিগারেট ফ্যাক্টরি - যা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের প্রধান ঘাঁটি হয়ে উঠেছিল। এই ফ্যাক্টরির বিভিন্ন কক্ষ, ছাদ, সেল - সবকিছুতে চলত নির্যাতন। ১৯৭২ সালের দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, “এই ফ্যাক্টরির বিভিন্ন কোণায় যে অত্যাচার, নারী ধর্ষণ ও গণহত্যা চলেছিল, তার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।” এরপর থেকে পাকিস্তানি সেনা আর রাজাকাররা গ্রামে গ্রামে অভিযান চালাতে থাকে। সন্দেহভাজন মুক্তিযোদ্ধা, হিন্দু, ছাত্র, শিক্ষক - যাকে পায় তাকেই ধরে আনে বেলতলীতে।

২. বেলতলীর নির্যাতন – হত্যা, ধর্ষণ, টর্চার সেল

বেলতলী শুধু বধ্যভূমি ছিল না, এটি ছিল টর্চার সেল। সিগারেট ফ্যাক্টরির ছাদে, কক্ষে, সেলে - প্রতিটি জায়গায় চলত অমানুষিক নির্যাতন। মানুষকে বিবস্ত্র করে ঝুলিয়ে রাখা হতো, বিদ্যুৎ শক দেওয়া হতো, নখ উপড়ে ফেলা হতো। নারীদের ধর্ষণ করা হতো পুরুষ স্বজনদের সামনে। ১৯৭২ সালের প্রতিবেদনে লেখা হয়, ফ্যাক্টরির মেঝেতে রক্ত জমে ৩ ইঞ্চি পুরু হয়ে গিয়েছিল। শহীদদের মধ্যে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক, আবুল খায়েরসহ অনেকে। আবুল খায়েরকে লাকসাম সিগারেট ফ্যাক্টরিতে নিয়ে বুকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

৩. শহীদের সংখ্যা – ২-৩ হাজার, কিন্তু আরও বেশি?

অফিসিয়াল হিসেবে বেলতলীতে শহীদ ২-৩ হাজার। কিন্তু স্থানীয়রা বলেন, সংখ্যা ১০ হাজারের কাছাকাছি। কারণ অনেক লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে মুক্তির পর খোঁড়াখুঁড়ি করে অনেক খুলি পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সব গর্ত খোঁড়া হয়নি। গণহত্যা আর্কাইভের গবেষণায় লাকসামে ৪টি গণকবর চিহ্নিত হয়েছে - বেলতলী, রেলজংশন, পশ্চিমগাঁও, বিড়ি ফ্যাক্টরি।

গল্লামারী বধ্যভূমি – খুলনার কসাইখানা

খুলনা শহরের গল্লামারী। ১৯৭১ সালে এটি ছিল পাকিস্তানি সেনাদের সবচেয়ে বড় হত্যাকেন্দ্র। প্রতি রাতে ট্রাক ভর্তি মানুষ আনা হতো। গুলি, ছুরি, বেয়নেট - সবকিছু দিয়ে হত্যা। লাশ ফেলা হতো ভৈরব নদীতে। স্থানীয়রা বলেন, “নদীর পানি লাল হয়ে যেত।” ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক লুইস সাইমনস ১৯৭২ সালে গিয়ে লিখেছিলেন - “এখানে লাশের স্তূপ দেখে মনে হয়, মানুষ নয়, পশু জবাই হয়েছে।”

আনুমানিক শহীদের সংখ্যা ২৫ হাজারের বেশি। কিন্তু সঠিক হিসাব? নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ায় অনেক লাশ হারিয়ে গেছে। লিবারেশন ওয়ার মিউজিয়ামের খননকাজে গল্লামারী থেকে আরও ৫টি গণকবর পাওয়া গেছে, যেখানে ১,৭৬৬টি হাড়ের টুকরো উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে অনেক নারী ও শিশুর। এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেছিলেন, “পাকিস্তানিরা হাসতে হাসতে গুলি করত। বলত, আজকের স্কোর ৫০।”

গল্লামারীতে শুধু হত্যা নয়, ধর্ষণও ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। অনেক নারীকে ক্যাম্পে আটকে রেখে মাসের পর মাস নির্যাতন করা হতো। আজ গল্লামারীতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ আছে, কিন্তু স্থানীয়রা বলেন - “এটা যথেষ্ট নয়। এখানে প্রতি বছর নতুন হাড় উঠে আসে।”

ফতুল্লার হরিহরপাড়া – শীতলক্ষ্যার লাশের ভেলা

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে হরিহরপাড়া গ্রাম। এটি ছিল পাকিস্তানি সেনাদের “পারফেক্ট কিলিং মেশিন”। প্রিজন, এক্সিকিউশন স্পট, আর লাশ ফেলার জায়গা - সব একসাথে। ওয়াশিংটন পোস্টের লুইস সাইমনস ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি গিয়ে লিখেছিলেন - “এই গ্রামে তিনটি জিনিস আছে: জেল, হত্যাস্থল, আর নদীতে লাশ ফেলা।” শহীদের সংখ্যা আনুমানিক ২০ হাজার।

পাকিস্তানিরা মানুষ ধরে আনত ট্রাকে। তারপর নির্যাতন। তারপর গুলি করে নদীতে ফেলা। নদীর পানি লাল হয়ে যেত। স্থানীয় মাঝিরা বলতেন, “মাছ ধরতে গেলে লাশের টুকরো উঠত জালে।” সাম্প্রতিক সময়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে ড্রেজিংয়ের সময় আরও ৪৫০টি খুলি পাওয়া গেছে। গণহত্যা আর্কাইভের গবেষকরা বলছেন, হরিহরপাড়ায় শহীদের সংখ্যা ২৫ হাজারের কাছাকাছি হতে পারে।

এখানে হিন্দু সম্প্রদায়কে বিশেষভাবে টার্গেট করা হয়েছিল। অনেক বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। নারীদের ধর্ষণ করে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। আজ হরিহরপাড়ায় একটি স্মৃতিফলক আছে, কিন্তু গ্রামবাসী বলেন - “আমরা এখনো নদীর পানি দেখলে ভয় পাই।”

দিনাজপুরের টিঅ্যান্ডটি অফিস – রক্তজমাট টর্চার সেল

দিনাজপুর শহরের টিঅ্যান্ডটি অফিস। ১৯৭১ সালে এটি ছিল পাকিস্তানিদের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর টর্চার সেল। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ অবজারভারের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল - “সেলের মেঝেতে ৩ ইঞ্চি পুরু জমাট রক্ত।” এখানে ১০ হাজারের বেশি বাঙালিকে নির্যাতন করা হয়েছে। পাকিস্তানিরা মানুষকে আটকে রাখত, বিদ্যুতের তার দিয়ে শক দিত, নখ উপড়ে ফেলত, চোখ তুলে নিত। অনেককে জ্যান্ত পুঁতে ফেলা হতো। এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেছিলেন, “চিৎকার শুনে রাতে ঘুম আসত না।”

দিনাজপুরে সাম্প্রতিক নতুন খননকাজে টিঅ্যান্ডটি অফিসের পিছনে আরও ২টি গণকবর পাওয়া গেছে, যেখানে ৫৩৯২টি হাড়ের টুকরো উদ্ধার হয়েছে। দিনাজপুরে হিন্দু ও মুসলিম উভয়কেই টার্গেট করা হয়েছিল। বিহারীদের সহায়তায় অনেক বাড়ি লুট করা হয়। আজ টিঅ্যান্ডটি অফিস একটি সরকারি ভবন, কিন্তু স্থানীয়রা এটাকে “হত্যাপুরী” বলে।

পাকিস্তানি অফিসারের দুঃস্বপ্ন – ১৪ হাজার মানুষের হত্যার নির্দেশদাতা

রাওয়ালপিন্ডির এক সামরিক হাসপাতাল। ১৯৭২ সাল। এক তরুণ পাকিস্তানি মেজরকে ভর্তি করা হয়েছে মানসিক রোগের জন্য। যুদ্ধ শেষে পাকিস্তান ফিরে তার ঘুম ভেঙে যেত দুঃস্বপ্নে। শরীরে খিঁচুনি, জ্বর। কেউ যেন বলত - “ফিরে যা বাংলাদেশে। হিন্দুদের মাটিতে মিশিয়ে দে।” এই অফিসার একাই নির্দেশ দিয়েছিলেন ১৪ হাজারের বেশি মানুষ হত্যার। পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী গওহর আইয়ুব খান তার বই “Glimpses Into the Corridors of Power” এ লিখেছেন, এই তথ্য তার বাবা আইয়ুব খানের ডায়েরি থেকে নেওয়া।

এই অফিসার একা নন। পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে “কিলিং স্কোয়াড” ছিল। ক্যাম্পে ফিরে তারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করত- “আজকের স্কোর কত?” স্কোর মানে কতজন বাঙালি মারা হয়েছে। তাদের কাছে বাঙালিরা ছিল “নিম্নমানের মুসলমান”, “হাফ হিন্দু”। হত্যা করা তাদের কাছে পুণ্যের কাজ।

৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা – মিথ নয়, ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত সত্য

“৩০ লাখ” – এই সংখ্যাটি শুনলেই মনে পড়ে যায় ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা। কিন্তু অনেকে প্রশ্ন তোলেন, এই সংখ্যা কোথা থেকে এলো? এটা কি শেখ মুজিবুর রহমানের “লাখ”কে “মিলিয়ন” বলে ভুল? অথবা সত্যিই কি এত মানুষ শহীদ হয়েছিলেন? কিন্তু ৩০ লাখ কোনো অতিরঞ্জিত সংখ্যা নয়, বরং এর চেয়ে বেশি হতে পারে।

১. প্রাভদা পত্রিকা – প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র প্রাভদা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় একটি প্রতিবেদন: “পূর্ব পাকিস্তানের উপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মমতা গোপন করা সম্ভব হয়নি”। এতে বলা হয়, ১৯৭১-এর গণহত্যায় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন। এটি ছিল বিশ্বের প্রথম বড় মিডিয়া যারা ৩০ লাখের সংখ্যা প্রকাশ করে।

প্রাভদা তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অফিসিয়াল পত্রিকা। ভারত-সোভিয়েত বন্ধুত্বের কারণে তারা বাংলাদেশের পক্ষে ছিল। কিন্তু এই সংখ্যা তারা কোথা থেকে পেল? গবেষকরা বলছেন, ভারতীয় শরণার্থী শিবিরের রিপোর্ট, মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য আর পাকিস্তানি অত্যাচারের প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য থেকে। প্রাভদার এই প্রতিবেদন বাংলাদেশে পৌঁছে যায় ইউরোপীয় নিউজ এজেন্সির মাধ্যমে। ৫ জানুয়ারি ১৯৭২-এ বাংলাদেশ অবজারভারসহ অনেক পত্রিকায় ছাপা হয়।

২. বঙ্গবন্ধুর উক্তি – প্রাভদা থেকে অনুপ্রাণিত?

৮ জানুয়ারি ১৯৭২। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডনে পৌঁছান। ডেভিড ফ্রস্টের ইন্টারভিউতে তিনি বলেন, “Three million of my people are dead.” এটি ছিল প্রথমবার বঙ্গবন্ধু মুখে ৩০ লাখের কথা বলা। বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্র সচিব সৈয়দ আব্দুল করিম তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, “৩০ লাখের সংখ্যা মুজিব প্রাভদার একটি আর্টিকেল থেকে নিয়েছিলেন।” কেউ কেউ বলেন, বঙ্গবন্ধু “তিন লাখ” বলতে গিয়ে “three million” বলে ফেলেছেন। কিন্তু ১০ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরে তিনি আবার বলেন ৩০ লাখ। প্রাভদার প্রতিবেদন তখন বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

৩. যুদ্ধকালীন আন্তর্জাতিক মিডিয়া – ৩০ লাখের পূর্বাভাস

প্রাভদার আগেও বিদেশি মিডিয়ায় বড় সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে:

  • এপ্রিল ১৯৭১: নিউজউইক – ৭ লাখ শহীদ।

  • অক্টোবর ১৯৭১: হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট এক্সপ্রেস – ২০ লাখ।

  • সেপ্টেম্বর ১৯৭২: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক – ৩০ লাখ।

এই রিপোর্টগুলো শরণার্থী শিবির, প্রত্যক্ষদর্শী আর মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য থেকে এসেছে।

৪. শরণার্থী শিবিরে কলেরায় ৬ লক্ষাধিক মৃত্যু – এরা কি শহীদ নন?

ভারতে ১ কোটি শরণার্থী। কলেরায় মারা যান ৬ লাখেরও বেশি মানুষ। এদের কখনো শহীদের তালিকায় রাখা হয়নি। কিন্তু তারা দেশ ছেড়েছিল পাকিস্তানি অত্যাচারের কারণে। গবেষকরা বলছেন, এদের হিসাব যোগ করলে ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।

৫. গণহত্যা আর্কাইভের গবেষণা – ৩৫-৩৬ লাখ পর্যন্ত

১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরের রিপোর্টে ৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা ও ১,১১৮টি টর্চার সেলের সন্ধান। পুরো দেশে হিসাব করলে ২৮,০০০+ গণহত্যা। প্রতি গণহত্যায় গড়ে ১০০-২০০ জন শহীদ ধরলে সংখ্যা ৩৫-৩৬ লাখ হয়।

৬. সমালোচনা ও কম সংখ্যার দাবি

কেউ বলেন ৩ লাখ (সিসন অ্যান্ড রোজ), কেউ ৫ লাখ (ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল)। হামুদুর রহমান কমিশন বলে ২৬ হাজার। কিন্তু এগুলো পাকিস্তানি সোর্স বা যুদ্ধের মাঝামাঝি হিসাব। গবেষক ডেভিড বার্গম্যান বলেন, ৩০ লাখ প্রোপাগান্ডা। কিন্তু তিনি স্বীকার করেন, সঠিক সংখ্যা ৫-১০ লাখের মধ্যে।

৩০ লাখের সংখ্যা প্রথম এসেছে প্রাভদা থেকে, বঙ্গবন্ধু তা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এটা কোনো ভুল নয়। গণহত্যা, শরণার্থী মৃত্যু, বধ্যভূমি – সব যোগ করলে ৩০ লাখের কম হয় না। যারা তর্ক করেন, তারা কি চুকনগরের ১৫ হাজার লাশ ভুলতে পারেন? কিংবা সারা দেশের ২৮,০০০+ গণহত্যার কথা? কিংবা করিমুল হকের ২৭ জন স্বজন?

উপসংহার: ৩০ লাখ নয়, এটা ৩০ লাখের বেশি মানুষের কান্না

মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা কখনো সঠিকভাবে বলা যাবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও সঠিক সংখ্যা নেই। কিন্তু যারা ৩ হাজার বলেন, তারা কি করিমুল হকের চোখে চোখ রেখে বলতে পারবেন - “আপনার ২৭ জন স্বজন মরেনি?” ৩০ লাখ কোনো রাজনৈতিক সংখ্যা নয়। এটা লাখো করিমুল হকের কান্না। এটা চুকনগরের ভদ্রা নদীর লাশ। এটা গাবতলী ব্রিজের রাতের গুলির শব্দ। আমরা তর্ক করতে পারি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের শহীদরা আর কথা বলতে পারেন না। তাদের হয়ে আমরাই বলি - ৩০ লাখ শহীদ অমর থাকুন। তাদের রক্তে গড়া এই দেশে এটা নিয়ে কোনো তর্ক নয়।

তথ্যসূত্র:

  1. Glimpses Into the Corridors of Power – Gohar Ayub Khan

  2. ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ

  3. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ

  4. মিরপুর গণকবর খনন প্রতিবেদন

  5. গণহত্যা আর্কাইভ – ৪০ জেলা রিপোর্ট

  6. লিবারেশন ওয়ার মিউজিয়াম

  7. ওয়াশিংটন পোস্ট ১৯৭২

  8. বাংলাদেশ অবজারভার ১৯৭২

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.