পবিত্র আখেরী চাহার সোম্বা ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক দিনের তাৎপর্য

যে কারণে মেয়েরা বেশি বয়সী পুরুষদের জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ করে

ইসলামী ইতিহাসের ক্যানভাসে এমন কিছু দিন ও মুহূর্ত খোদিত রয়েছে, যা সরাসরি কোনো ফরজ বা ওয়াজিব ইবাদতের সাথে যুক্ত না হলেও মুসলিম উম্মার আবেগ, সংস্কৃতি, ইতিহাসচেতনা এবং নবীপ্রেমের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এমনই একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন হলো ‘আখেরী চাহার সোম্বা’ (Akhiri Chahar Shomba)। ফার্সি শব্দগুচ্ছ ‘আখেরী’ (শেষ), ‘চাহার’ (চার বা বুধবার) এবং ‘সোম্বা’ (বুধবার) এই তিনের সমন্বয়ে গঠিত আখেরী চাহার সোম্বার শাব্দিক অর্থ হলো ‘সফর মাসের শেষ বুধবার’

হিজরি সনের দ্বিতীয় মাস সফর মাসের শেষ বুধবার সাব্যস্ত এই দিনটি ইসলামী ঐতিহ্যে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে স্মরণ করা হয়। এটি মূলত শেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের অন্তিম ইবাদত-বন্দেগি, তাঁর দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য অসুস্থতা থেকে সাময়িক নিরাময় লাভ করে সাহাবিদের সাথে জামাতে শরিক হওয়া এবং মদিনার মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে নেমে আসা অপার আনন্দের স্মৃতিবহ একটি দিন। এই সুদীর্ঘ প্রবন্ধে আমরা আখেরী চাহার সোম্বার ঐতিহাসিক উৎস, সহিহ হাদিসের প্রেক্ষাপট, সাহাবিদের দানশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, শরিয়াহর দৃষ্টিতে এর বৈধতা ও সীমারেখা, দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতিতে এর প্রভাব এবং আধুনিক যুগে এর সামাজিক উপযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত ও সুগভীর আলোচনা করব।

হিজরি ১১ সালের সফর মাস ও নবীজির অসুস্থতা

আখেরী চাহার সোম্বার মূল শিকড় প্রোথিত রয়েছে হিজরি একাদশ শতকের শেষভাগে, যখন ইসলামের মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নবুওয়তি দায়িত্বের চরম পূর্ণতা সাধন করে রফিকে আলার (মহান আল্লাহর সান্নিধ্যের) দিকে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

অসুস্থতার তীব্রতা ও নামাজের ইমামতি

ইসলামী ইতিহাসের বিশ্বস্ত এবং প্রামাণ্য গ্রন্থ যেমন ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম সংকলিত হাদিস গ্রন্থ এবং ইবনে হিশামের 'সিরাতুন নবী'-তে বর্ণিত হয়েছে যে, হিজরি ১১ সালের সফর মাসের প্রথমার্ধ থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুতর শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হন। তাঁর শরীরে প্রচণ্ড জ্বর ও শারীরিক দুর্বলতা এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, নিজ ঘরে দাঁড়িয়ে বা বসে নামাজ আদায় করাও তাঁর জন্য দুরূহ হয়ে পড়েছিল।

মুসলিম উম্মাহর কাণ্ডারি হিসেবে তিনি মসজিদের জামাত যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্য সাহাবিদের নির্দেশ দেন যেন তাঁর অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু ও প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) মসজিদের নববীতে নামাজের ইমামতি করেন। এই কয়েক দিন হযরত আবু বকর (রা.)-এর ইমামতিতে সাহাবিরা জামাতে নামাজ আদায় করেন, যা পুরো মদিনার মুসলিম সমাজে এক ধরনের গভীর উদ্বেগ ও মনস্তাত্ত্বিক উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছিল। সাহাবিদের মনে আশঙ্কা দানা বেঁধেছিল যে, তাঁদের প্রিয় নবী ও মদিনার অভিভাবক হয়তো চিরকালের মতো তাঁদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।

২৮ সফর: সাময়িক নিরাময় ও মহাআনন্দ

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ওই মাসের শেষ বুধবার অর্থাৎ ২৮ সফর, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকস্মিক ও উল্লেখযোগ্যভাবে শারীরিক উন্নতি ও সুস্থতা অনুভব করেন। জ্বর কিছুটা কমে আসে এবং দেহে শক্তি ফিরে পান।

মসজিদে নববীতে গমন: সেদিন জোহর বা অন্য কোনো ওয়াক্তের নামাজে তিনি গায়ে পানি ঢেলে গোসল করেন এবং দুই সাহাবির কাঁধে ভর দিয়ে বা দুর্বল শরীরে হেঁটে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করেন।

শেষ ইমামতি: হযরত আবু বকর (রা.) যখন নবীজিকে দেখতে পান, তখন তিনি পেছনের দিকে সরে আসতে উদ্যত হন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশারায় তাঁকে নিজের জায়গায় থাকতে বলেন এবং তিনি নিজে আবু বকর (রা.)-এর পাশে বা তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো মদিনাবাসীর উদ্দেশ্যে নামাজে ইমামতি সম্পন্ন করেন।

এই দৃশ্য দেখার পর মদিনার সর্বস্তরের মানুষের মনে যে স্বস্তি ও আনন্দের হিল্লোল বয়ে গিয়েছিল, তা বর্ণনাতীত। প্রিয় নবীর সুস্থতার খবর দাবানলের মতো পুরো মদিনায় ছড়িয়ে পড়েছিল।

মদিনার মানুষের শুকরিয়া ও সাহাবিদের ঐতিহাসিক দানশীলতা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাময়িক সুস্থতার সংবাদে মদিনার আনসার ও মুহাজির সাহাবিরা আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। তাঁদের কাছে এটি ছিল অলৌকিক রহমত ও আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিরাট নিয়ামত। এই কৃতজ্ঞতাবোধ প্রকাশের জন্য সাহাবিগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অভাবী ও দরিদ্রদের মাঝে প্রচুর ধন-সম্পদ দান-সদকা করেন।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও তারিখগ্রন্থ (যেমন তারিখে তাবারি ও অন্যান্য প্রাচীন সিরাত সাহিত্য) সূত্রে জানা যায়, ওই বিশেষ দিনে শীর্ষস্থানীয় সাহাবিরা শুকরিয়া স্বরূপ যে অসামান্য দান করেছিলেন, তার বিবরণ নিম্নরূপ:

১. হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.): আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে তিনি তৎক্ষণাৎ ৫,০০০ দিরহাম দান করেন।

২. হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.): তিনি দান করেন ৭,০০০ দিরহাম

৩. হযরত ওসমান ইবনে আফফান (রা.): তাঁর অঢেল সম্পদের মধ্য থেকে তিনি এক লাফে ১০,০০০ দিরহাম সদকা করেন।

৪. হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.): তিনি দান করেন ৩,০০০ দিরহাম

৫. হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.): বিত্তশালী এই সাহাবি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একবারে ১০০টি উট এবং প্রচুর পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী দান করেন।

এছাড়াও সাধারণ সাহাবিরা তাঁদের সাধ্যমতো নগদ অর্থ, খেজুর, গম এবং নিজেদের মালিকানাধীন অনেক দাস-দাসীকে আল্লাহর ওয়াস্তে মুক্ত করে দেন। ইসলামে দাসমুক্তিকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও পুণ্যের কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই বিশাল দানযজ্ঞ ও শুকরিয়া আদায় প্রমাণ করে যে, সাহাবিদের কাছে রাসূলের সুস্থতা ছিল তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়।

আখেরী চাহার সোম্বার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ও শরিয়াহর দৃষ্টিভঙ্গি

আখেরী চাহার সোম্বার ইতিহাস যতই আবেগপূর্ণ হোক না কেন, ইসলামী শরিয়াহর দৃষ্টিতে এর মৌলিক বিধান ও মূল্যায়ন পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি।

শরিয়াহর পরিভাষায় এর অবস্থান

কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে আখেরী চাহার সোম্বা পালনের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট ফরজ, ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা আমল বর্ণিত হয়নি। অর্থাৎ, শবে বরাত, শবে কদর বা দুই ঈদের মতো এটি কোনো শরিয়াহ নির্ধারিত উৎসব বা ইবাদতের রাত/দিন নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা তাঁর খুলাফায়ে রাশেদিন এই দিনটিকে বিশেষভাবে কোনো বাৎসরিক উৎসব বা শরিঅতসম্মত মিলাদ দিবস হিসেবে উদযাপনের নির্দেশ দিয়ে যাননি।

নবীপ্রেম ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ

তবে শরিয়াহর মূল কাঠামোর ভেতরে থেকে নবীপ্রেম প্রকাশ করা সম্পূর্ণ জায়েজ ও মুস্তাহাব। প্রখ্যাত মুফাসসির ও ইসলামী পন্ডিতগণ উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলের জীবনের যেকোনো ঐতিহাসিক আনন্দঘন মুহূর্তকে স্মরণ করা, তাঁর সুমহান আদর্শ আলোচনা করা এবং তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করা স্বভাবগতভাবেই একজন মুমিনের ঈমানকে শাণিত করে।

প্রখ্যাত মনীষী ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তাঁর অমর গ্রন্থ 'হিয়া উলুমিদ্দিন'-এ উল্লেখ করেছেন যে, নবীর জীবনের স্মৃতিচারণ ও তাঁর প্রতি ভালোবাসা মুমিনের অন্তরে আত্মিক প্রশান্তি আনে।

মিসরের মর্যাদাপূর্ণ আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফতোয়া বোর্ড এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্যেষ্ঠ ফকিহগণের মতে, যদি কেউ এই দিনটিকে শরিঅত নির্ধারিত কোনো বাধ্যতামূলক উৎসব (Bid'ah Sayyi'ah) মনে না করে, বরং সাধারণ একটি ঐতিহাসিক দিন হিসেবে রাসূলের প্রতি ভালোবাসা, দান-সদকা ও বেশি বেশি দরুদ পাঠের উপলক্ষ বানায়, তবে তা নিন্দনীয় নয়; বরং সাধারণ নেক আমলের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

আখেরী চাহার সোম্বার আমল ও সামাজিক রীতিনীতি

দক্ষিণ এশিয়া তথা বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আখেরী চাহার সোম্বা উপলক্ষে কিছু নির্দিষ্ট ধর্মীয় ও সামাজিক আমল প্রচলিত রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে মূলত সাধারণ মুসলমানরা তাদের নবীপ্রেম জাহির করে থাকেন।

অধিক পরিমাণে দরুদ ও সালাম পাঠ

এই দিনে মুমিন মুসলমানগণ ঘরে বা মসজিদে বসে নবীজির প্রতি মহব্বত প্রকাশ করতে করতে অধিক পরিমাণে দরুদ শরিফ পাঠ করেন যেমন “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ” অথবা ইব্রাহিমি দরুদ।

দান-সদকা ও এতিমদের সেবা

যেহেতু সাহাবিরা এই দিনে প্রচুর দান করেছিলেন, তাই এই সুন্নাতকে অনুসরণ করে ধর্মপ্রাণ মানুষরা গরিব, দুঃখী, মিসকিন এবং এতিমখানায় সাধ্যমতো আর্থিক সাহায্য, খাদ্য ও পোশাক বিতরণ করেন।

নফল ইবাদত ও শুকরিয়া নামাজ

আল্লাহর রহমতের শুকরিয়া স্বরূপ দুই বা চার রাকাত নফল শোকরানা নামাজ আদায় করা এবং দীর্ঘ সেজদায় উম্মতে মুহাম্মদির নিরাপত্তা ও ঐক্যের জন্য চোখের পানি ফেলে দোয়া করা হয়।

সীরাত আলোচনা ও মিলাদ মাহফিল

মসজিদ ও মাদ্রাসায় বিশেষ সীরাতুন্নবী মাহফিলের আয়োজন করা হয়, যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রোগমুক্তি, সিরাতের শেষাংশের শিক্ষা এবং তাঁর মহানুভবতা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতিতে আখেরী চাহার সোম্বার প্রভাব ও বিতর্ক

বাংলাদেশ এবং ভারতের সংস্কৃতিতে আখেরী চাহার সোম্বার একটি ঐতিহ্যবাহী শেকড় রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে এবং প্রাচীন সুফি ও মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে এই দিনটি বেশ ঘটা করে পালিত হতো।

সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মেলবন্ধন

স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার ছুটি: ব্রিটিশ আমল এবং পাকিস্তান আমল তো বটেই, এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রাথমিক পর্যায়েও সরকারি বা আধা-সরকারি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে এই দিনে বিশেষ ছুটি বা বিশেষ আলোচনা সভার প্রচলন ছিল।

গ্রামীণ মেলা ও জিলাপি সংস্কৃতি: বাংলাদেশের বহু অঞ্চলে (যেমন পুরান ঢাকা, চট্টগ্রাম বা বিভিন্ন প্রাচীন জনপদে) এই দিনকে কেন্দ্র করে পাড়ায় পাড়ায় মিলাদ পড়া এবং তবারক হিসেবে মিষ্টি বা বিশেষ খাবার বিতরণের রেওয়াজ আজও বিদ্যমান।

সমাজমানসে বিতর্কের স্বরূপ

যেকোনো সংস্কৃতির মতো এই দিনটি নিয়েও সমাজে দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ও দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে:

সালাফি ও রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি: একদল আলেম ও গবেষক মনে করেন, কোরআন বা সহিহ হাদিসে যেহেতু সফর মাসের শেষ বুধবারের কোনো ফযিলত বা বিশেষ আমলের কথা বলা নেই, তাই একে আলাদা কোনো বিশেষ ফজিলতপূর্ণ দিন মনে করা বা ঘটা করে উৎসব পালন করা বিদআত (Bid'ah) বা দ্বীনের মধ্যে নতুন সংযোজন। তাদের মতে, এটি মানুষকে শরিওতের আসল সুন্নাত থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।

হানাফি, সুফি ও প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি: অন্যদিকে, হানাফি মাজহাবের অনুসারী অধিকাংশ আলেম ও সুফি সাধকগণ মনে করেন, সাহাবিদের আমল দ্বারা যেহেতু এই দিনে দান-সদকা করার নজির প্রমাণিত আছে, তাই একে সামগ্রিকভাবে বিদআত বলা ভুল। এটিকে স্রেফ একটি ঐতিহাসিক ও আত্মিক মোটিভেশন হিসেবে নিয়ে নেক আমল করলে কোনো সমস্যা নেই।

আধুনিক প্রেক্ষাপট: কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড ও ডিজিটাল সচেতনতা

একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর যুগে আখেরী চাহার সোম্বা পালনের ধরন এবং এর পরিধি অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। কট্টর প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে বর্তমান প্রজন্মের মুসলিমরা এই দিনটিকে সামাজিক কল্যাণ এবং ডিজিটাল নবীপ্রেমের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নবীপ্রেমের প্রকাশ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব এবং টিকটকের কল্যাণে এখন আর দিনটি শুধু চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মুসলিমরা এই দিনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীভিত্তিক কোটেশন, ভিডিও ক্লিপ এবং তাঁর সুমহান আদর্শ শেয়ার করেন। অনেক অনলাইন পেজ ও ইসলামিক সংগঠন এই দিনে লাইভ কোরআন তিলাওয়াত ও বিশেষ সীরাত সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করে।

চ্যারিটি ও আধুনিক সমাজসেবা

আধুনিক যুগে তরুণ সমাজ আখেরী চাহার সোম্বাকে সামাজিক সেবামূলক কাজের একটি উপলক্ষ বানিয়েছে:

ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প: অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই দিনে গ্রামীণ ও বস্তি এলাকায় দরিদ্র মানুষের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ওষুধ বিতরণের ক্যাম্প আয়োজন করে।

রক্তদান কর্মসূচি: মানবতার কল্যাণে যুবসমাজ এই দিনে রক্তদান কর্মসূচি পরিচালনা করে, যা ইসলাম নির্দেশিত সামগ্রিক মানবসেবার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ: এতিমখানা বা অবহেলিত শিশু সদনে খাতা, কলম ও বই বিতরণ করে এই দিনটি উদযাপন করা হয়।

আখেরী চাহার সোম্বা বিষয়ক তুলনামূলক সারণী

নিচের সারণীতে আখেরী চাহার সোম্বার মূল ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় তথ্যসমূহ এক নজরে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয়বস্তু / ক্ষেত্র

ঐতিহাসিক ও শরিঅতসম্মত বিবরণ

শাব্দিক অর্থ

সফর মাসের শেষ বুধবার (ফার্সি শব্দ: আখেরী = শেষ, চাহার = চার/বুধবার, সোম্বা = বুধবার)

সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনা

হিজরি ১১ সালের সফর মাসের শেষভাগে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর গুরুতর অসুস্থতা এবং ২৮ সফর সাময়িক সুস্থতা লাভ করে শেষবারের মতো জামাতে ইমামতি করা

সাহাবিদের প্রতিক্রিয়া

আল্লাহর শুকরিয়া স্বরূপ হযরত আবু বকর, উমর, ওসমান ও আলী (রা.) কর্তৃক বিশাল অঙ্কের দান-সদকা প্রদান

শরিয়াহর বিধান

কোরআন বা সহিহ হাদিসে এই দিনের কোনো নির্দিষ্ট ফরজ, ওয়াজিব বা সুনির্দিষ্ট ইবাদত নির্ধারিত নেই

গ্রহণযোগ্য আমল

বেশি বেশি দরুদ পাঠ, দান-সদকা, নফল শোকরানা নামাজ, সীরাত আলোচনা ও এতিমদের সেবা

আলেকদের দৃষ্টিভঙ্গি

দুই মত: একাংশের মতে নির্দিষ্ট ফজিলত না থাকায় বাড়াবাড়ি পরিহারযোগ্য (বিদআত আশঙ্কা); অন্য অংশের মতে দান-সদকা ও নবীপ্রেমের প্রকাশ হিসেবে এটি জায়েজ ও মুস্তাহাব

সাংস্কৃতিক রূপ

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে মিলাদ মাহফিল, তবারক বিতরণ এবং গ্রামীণ উৎসবমুখর ভাব

আধুনিক পরিবর্তন

ডিজিটাল মাধ্যমে সীরাত প্রচার, রক্তদান কর্মসূচি, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প এবং চ্যারিটি কার্যক্রমের আধিক্য

উপসংহার

পবিত্র আখেরী চাহার সোম্বা কোনো গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতা বা নিছক কৌতূহলোদ্দীপক দিন নয়; এটি ইসলামী ইতিহাসের এমন এক কালজয়ী অধ্যায়, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের অন্তিম মুহূর্তগুলোর ঐতিহাসিক সংগ্রাম এবং সাহাবিদের সীমাহীন আত্মত্যাগ ও নবীপ্রেমকে।

শরিয়াহর মূল কাঠামোর বাইরে গিয়ে এই দিনটিকে কেন্দ্র করে কোনো মনগড়া বেদাত বা অতি-আড়ম্বরপূর্ণ প্রথা চালু করা যেমন শরিওতসম্মত নয়, তেমনি ঐতিহাসিক এই তাৎপর্যকে পুরোপুরি অবহেলা করাও নবীপ্রেমিক হৃদয়ের পরিচায়ক হতে পারে না। মধ্যপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি হলো এই দিনকে অতিরঞ্জিত কোনো উৎসব না বানিয়ে, সাহাবিদের অনুসরণে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা, বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পেশ করা এবং দুস্থ মানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা।

আখেরী চাহার সোম্বার মূল শিক্ষা হলো নবীর প্রতি ভালোবাসা কেবল মুখে বা স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাঁর আদর্শের বাস্তবায়ন, দরিদ্র ও এতিমদের সহায়তা এবং সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই প্রকৃত নবীপ্রেম প্রমাণিত হয়। আসুন, এই দিনটিকে বিতর্ক বা মতপার্থক্যের উপলক্ষ না বানিয়ে, মানবতার কল্যাণ এবং আত্মিক পরিশুদ্ধির একটি সুন্দর উসিলা হিসেবে গ্রহণ করি।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.