পবিত্র আখেরী চাহার সোম্বা ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক দিনের তাৎপর্য

Aug 20, 2025

পবিত্র আখেরী চাহার সোম্বা, যার বাংলা অর্থ ‘সফর মাসের শেষ বুধবার’ ইসলামী ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে স্মরণীয়। এই দিনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের একটি বিশেষ মুহূর্তের সঙ্গে জড়িত, যখন তিনি গুরুতর অসুস্থতা থেকে সাময়িকভাবে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন এবং শেষবারের মতো নামাজে ইমামতি করেছিলেন। এই ঘটনা মদিনার মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে অপার আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার সৃষ্টি করেছিল। যদিও শরিয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে এই দিনের কোনো বিশেষ ফজিলত বর্ণিত নেই, তবু নবীপ্রেমীদের কাছে এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই নিবন্ধে আখেরী চাহার সোম্বার ইতিহাস, তাৎপর্য এবং এর সঙ্গে জড়িত আমল ও সমাজে এর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

আখেরী চাহার সোম্বার ইতিহাস

আখেরী চাহার সোম্বা হিজরি সফর মাসের শেষ বুধবার। এই দিনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের শেষ দিনগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ইসলামী ইতিহাসের বিশ্বস্ত সূত্র, যেমন সহিহ বুখারি এবং সহিহ মুসলিম অনুসারে, হিজরি ১১ সালের সফর মাসে রাসূলুল্লাহ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর শারীরিক অবস্থা এতটাই অবনতি হয় যে তিনি নিয়মিত নামাজের ইমামতি করতে পারছিলেন না। তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) কে মসজিদে নববীতে নামাজের ইমামতির দায়িত্ব দেন। এই সময়ে মদিনার মুসলিম সম্প্রদায় গভীর উদ্বেগে ছিলেন।

২৮ সফর বুধবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাময়িকভাবে সুস্থ বোধ করেন। তিনি গোসল করেন এবং মসজিদে নববীতে গিয়ে শেষবারের মতো নামাজে ইমামতি করেন। এই ঘটনা মদিনাবাসীর মধ্যে অপার আনন্দ ছড়িয়ে দেয়। ইবনে হিশামের সিরাতুন নবী অনুসারে, এই খবর শুনে মদিনার মানুষ দলে দলে মসজিদে ছুটে আসেন এবং তাঁদের প্রিয় নবীকে একনজর দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। এই দিনটি তাঁদের কাছে আল্লাহর রহমত ও নবীর সুস্থতার প্রতীক হিসেবে উদযাপিত হয়।

মদিনার মানুষের প্রতিক্রিয়া

রাসূলুল্লাহর সুস্থতার খবরে মদিনাবাসী কৃতজ্ঞতা ও আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন। তাঁরা এই দিনকে আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায়ের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। অনেকে তাদের সাধ্যমতো দান-সদকা করেন, শুকরিয়া নামাজ আদায় করেন এবং দোয়া করেন। তারিখে তাবারি এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক সূত্র অনুসারে, বিশিষ্ট সাহাবিরা এই উপলক্ষে উল্লেখযোগ্য দান করেন।
এই দিনে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) ৫,০০০ দিরহাম দান করেন। হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা) ৭,০০০ দিরহাম দান করেন। হযরত ওসমান ইবনে আফফান (রা) ১০,০০০ দিরহাম দান করেন। হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা) ৩,০০০ দিরহাম দান করেন। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) ১০০টি উট দান করেন। এছাড়াও কেউ কেউ তাদের দাসদের মুক্ত করে দেন, যা ইসলামে একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই দান ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ ছিল রাসূলুল্লাহর প্রতি তাঁদের গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতিফলন।

আখেরী চাহার সোম্বার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

শরিয়াহর পরিভাষায় আখেরী চাহার সোম্বার কোনো নির্দিষ্ট ফজিলত বর্ণিত নেই। এটি কোনো বাধ্যতামূলক ধর্মীয় উৎসব বা ইবাদতের দিন নয়। তবে নবীপ্রেমীদের কাছে এই দিনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশের একটি বিশেষ সুযোগ। ইসলামী ঐতিহ্যে এই দিনে মানুষ বিভিন্ন আমলের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও নবীর প্রতি মহব্বত প্রকাশ করে।

এই আমলগুলোর মধ্যে রয়েছে দরিদ্র ও এতিমদের সাহায্য করা, রাসূলুল্লাহর উপর বেশি বেশি দুরুদ শরিফ পাঠ করা, কুরআন তিলাওয়াত করে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা, আল্লাহর রহমতের জন্য শুকরিয়া হিসেবে নফল নামাজ আদায় করা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুস্থতা ও তাঁর উম্মতের কল্যাণের জন্য দোয়া ও মুনাজাত করা।

ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তাঁর ইহয়া উলুমিদ্দিন এ উল্লেখ করেছেন যে, নবীর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর জীবনের ঘটনাগুলো স্মরণ করা মুমিনের ঈমানকে শক্তিশালী করে। আখেরী চাহার সোম্বা এই ভালোবাসা প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।

সমাজে আখেরী চাহার সোম্বার প্রভাব

বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া যেমন বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানে আখেরী চাহার সোম্বা বিভিন্নভাবে পালিত হয়। বাংলাদেশে এই দিনে মসজিদ, মাদ্রাসা এবং সম্প্রদায় কেন্দ্রে মিলাদ মাহফিল, দুরুদ পাঠ এবং দোয়ার আয়োজন করা হয়। অনেকে এতিম ও দরিদ্রদের মধ্যে খাদ্য ও অর্থ বিতরণ করে। বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় এই দিনে স্থানীয়ভাবে ‘মিলাদুন নবী’ বা ‘শুকরিয়া মাহফিল’ নামে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় যেখানে নবীর জীবনী আলোচনা করা হয়।

তবে এই দিন পালন নিয়ে কিছু বিতর্কও রয়েছে। কিছু আলেম মনে করেন, এই দিনের কোনো বিশেষ ফজিলত শরিয়াহতে নেই, তাই এটিকে উৎসব হিসেবে পালন করা বিদআত হতে পারে। অন্যদিকে হানাফি ও সুফি ঐতিহ্যের অনুসারীরা এটিকে নবীপ্রেমের প্রকাশ হিসেবে গ্রহণ করেন। আল-আজহার ইউনিভার্সিটির একটি প্রকাশনায় বলা হয়েছে, যদি এই দিনের আমল নিয়মিত ইবাদতের মধ্যে থাকে এবং শরিয়াহ বিরোধী কিছু না হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য।

আধুনিক প্রেক্ষাপটে আখেরী চাহার সোম্বা

আধুনিক যুগে আখেরী চাহার সোম্বা পালনের ধরন কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। সামাজিক মাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই দিনের তাৎপর্য ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম সম্প্রদায় এই দিনে দুরুদ শরিফ ও কুরআন তিলাওয়াতের লাইভ স্ট্রিমিং আয়োজন করে। বাংলাদেশে অনেক মসজিদ এবং ধর্মীয় সংগঠন এই দিনে দরিদ্রদের জন্য খাদ্য বিতরণ ও চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন করে।

এছাড়াও এই দিনে সামাজিক কল্যাণমূলক কাজের উপর জোর দেওয়া হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন এনজিও এবং সামাজিক সংগঠন আখেরী চাহার সোম্বার উপলক্ষে এতিমখানায় খাবার ও শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ করে। এই কার্যক্রমগুলো নবীর শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যিনি দরিদ্র ও এতিমদের প্রতি সদয় আচরণের উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

আখেরী চাহার সোম্বা পালনের নিয়ম

যারা এই দিনটি পালন করতে চান, তাদের জন্য কিছু আমল সুপারিশ করা হয়, যা শরিয়াহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ-

দুরুদ শরিফ পাঠ: রাসূলুল্লাহর উপর বেশি বেশি দরুদ পড়া, যেমন “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ”।
কুরআন তিলাওয়াত: কুরআন পড়া এবং এর তাৎপর্য নিয়ে চিন্তা করা।
দান-সদকা: দরিদ্র ও এতিমদের জন্য খাদ্য, পোশাক অথবা অর্থ দান করা।
নফল নামাজ: শুকরিয়া হিসেবে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায়।
মিলাদ মাহফিল: নবীর জীবনী ও শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করা।

তবে এই আমলগুলো করার সময় শরিয়াহ বিরোধী কোনো কাজ, যেমন গান-বাজনা বা অতিরঞ্জিত উৎসব এড়িয়ে চলতে হবে।

উপসংহার

আখেরী চাহার সোম্বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের একটি বিশেষ দিনের স্মৃতি বহন করে। এটি মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য কৃতজ্ঞতা ও মহব্বত প্রকাশের একটি সুযোগ। যদিও এই দিনের কোনো শরিয়াহভিত্তিক ফজিলত নেই, তবু নবীপ্রেমীদের কাছে এটি একটি আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বহন করে। এই দিনে দান-সদকা, দুরুদ পাঠ এবং কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে মুসলিমরা তাদের ঈমানকে পুনরুজ্জীবিত করেন। আধুনিক যুগে এই দিনটি সামাজিক কল্যাণ ও সম্প্রদায়ের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পালিত হচ্ছে। আখেরী চাহার সোম্বার মাধ্যমে আমরা শিখতে পারি যে, নবীর প্রতি ভালোবাসা ও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা আমাদের জীবনকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারে।

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.