লোহার প্রাচীর ও অবাধ্য এক জাতি - ইয়াজুজ-মাজুজের বন্দিত্ব ও মুক্তি
রহস্যে ঘেরা এক প্রাচীন অধ্যায় মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু রহস্য রয়েছে যা হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের মনে বিস্ময় আর ভীতি জাগিয়ে রেখেছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘ইয়াজুজ ও মাজুজ’। পবিত্র কুরআন এবং বিভিন্ন সহীহ হাদিসে এই জাতির কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা কারা? কোথায় তাদের বসবাস? কেন এক মহাপরাক্রমশালী রাজা তাদের লোহার প্রাচীরের আড়ালে বন্দি করে রেখেছিলেন? আর কিয়ামতের আগে তাদের মুক্তি পৃথিবীকে কীভাবে ওলটপালট করে দেবে? আজকের এই প্রবন্ধে আমরা ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে সেই অবাধ্য জাতির আদি-অন্ত এবং তাদের বন্দিত্বের রোমাঞ্চকর কাহিনী বিস্তারিত জানব।
কে এই রাজা জুলকারনাইন?
ইয়াজুজ-মাজুজের কাহিনী আলোচনা করতে গেলে যার নাম সবার আগে আসে, তিনি হলেন বাদশাহ জুলকারনাইন। পবিত্র কুরআনের সূরা কাহাফে তাঁর বীরত্ব ও ন্যায়পরায়ণতার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
জুলকারনাইন কি সিকান্দার শাহ? ঐতিহাসিকদের মধ্যে জুলকারনাইনের পরিচয় নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন তিনি গ্রিক বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, আবার কারো মতে তিনি পারস্যের সম্রাট সাইরাস বা খসরু। তবে অধিকাংশ ইসলামি চিন্তাবিদ ও মুফাসসিরগণের মতে, তিনি ছিলেন আল্লাহর একজন একনিষ্ঠ ও মুমিন বান্দা, যাকে আল্লাহ পৃথিবী শাসনের অবারিত ক্ষমতা এবং বিশেষ জ্ঞান দান করেছিলেন। তাঁর নামের অর্থ ‘দুই শিং-বিশিষ্ট’ বা ‘দুই যুগের অধিকারী’, যা মূলত তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যের বিস্তৃতিকে নির্দেশ করে।
জুলকারনাইন কেবল রাজ্য জয় করতে বের হননি; তাঁর উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীতে আল্লাহর তৌহিদ প্রতিষ্ঠা করা এবং মজলুমদের রক্ষা করা। তিনি পশ্চিমের শেষ প্রান্ত থেকে পূর্বের শেষ দিগন্ত পর্যন্ত ভ্রমণ করেছিলেন। এই সফরের এক পর্যায়ে তিনি পৃথিবীর এমন এক দুর্গম অঞ্চলে পৌঁছান, যেখানে পাহাড়ের আড়ালে এক আর্তনাদ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল।
দুই পাহাড়ের সন্ধিক্ষণে - এক বর্বর জাতির মুখোমুখি
ভ্রমণ করতে করতে জুলকারনাইন এক বিশাল পাহাড়ি উপত্যকায় এসে পৌঁছান। সেখানকার অধিবাসীরা ছিল অত্যন্ত সহজ-সরল এবং তারা জুলকারনাইনের ভাষা খুব একটা বুঝতে পারছিল না। তবুও তারা ইশারায় এবং দোভাষীর মাধ্যমে তাদের করুণ আর্তি তুলে ধরল।
ইয়াজুজ-মাজুজের পরিচয়
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
“তারা বলল, হে জুলকারনাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে...” (সূরা কাহাফ: ৯৪)
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ইয়াজুজ ও মাজুজ হলো নূহ (আ.)-এর পুত্র ইয়াফেসের বংশধর। তারা কোনো জিন বা ভিনগ্রহের প্রাণী নয়, বরং তারা মানুষেরই একটি বিশেষ জাতি। তবে তাদের স্বভাব ছিল পশুর চেয়েও হিংস্র। তারা যখনই পাহাড়ের ওপার থেকে আসত, ফসলের মাঠ ধ্বংস করত, জনপদ লুণ্ঠন করত এবং মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করত। তাদের সংখ্যা ছিল অগনিত এবং শারীরিক গড়ন ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও অদ্ভুত।
সাহায্যের আবেদন ও জুলকারনাইনের উদারতা
বিপন্ন মানুষেরা জুলকারনাইনকে প্রস্তাব দিল যে, তারা তাকে বিপুল পরিমাণ কর (টাকা) দেবে যদি তিনি তাদের এবং সেই বর্বর জাতির মাঝখানে একটি স্থায়ী দেয়াল তৈরি করে দেন। কিন্তু আল্লাহর প্রিয় বান্দা জুলকারনাইন প্রতি উত্তরে যা বললেন, তা আজও মানবজাতির জন্য এক মহান শিক্ষা:
“আমার পালনকর্তা আমাকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন, তা-ই যথেষ্ট। সুতরাং তোমরা আমাকে শুধু শারীরিক শ্রম দিয়ে সাহায্য করো, আমি তোমাদের ও তাদের মাঝে এক নিশ্ছিদ্র প্রাচীর তৈরি করে দেব।”
প্রকৌশলবিদ্যার বিস্ময় - লোহার সেই দুর্ভেদ্য প্রাচীর
জুলকারনাইন কেবল একজন যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ প্রকৌশলী। তিনি এমন এক প্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা করলেন যা ভাঙা বা যার ওপর চড়া ছিল অসম্ভব।
প্রাচীর নির্মাণের প্রক্রিয়া
১. লোহার স্তূপ: তিনি আদেশ দিলেন দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানটি লোহার বিশাল বিশাল পাত বা খণ্ড দিয়ে ভরাট করে ফেলতে।
২. আগুনের প্রচণ্ড তাপ: এরপর সেই লোহার স্তূপে বিশাল হাপর দিয়ে দম দেওয়া হলো। প্রচণ্ড তাপে লোহা যখন লাল টকটকে হয়ে আগুনের গোলার মতো হয়ে গেল, তখন শুরু হলো দ্বিতীয় ধাপ।
৩. গলিত তামা: জুলকারনাইন লোহাকে আরও মজবুত করতে এবং মরচে থেকে বাঁচাতে গলিত তামা (কপার) সেই লোহার ফাঁকে ফাঁকে ঢেলে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।
ফলাফল হিসেবে তৈরি হলো ‘রদমা’ (Radm) যা সাধারণ দেয়াল বা ‘সাদ’ (Sadd) এর চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। এটি ছিল মসৃণ, দুর্ভেদ্য এবং সুউচ্চ। ইয়াজুজ-মাজুজ সেই দেয়ালে ফুটো করার কোনো যন্ত্রপাতি পায়নি এবং দেয়ালে চড়ার মতো কোনো খাঁজও সেখানে ছিল না।
বন্দিত্বের হাজার বছর - প্রতিদিনের ব্যর্থ প্রচেষ্টা
আল্লাহর নির্দেশে সেই প্রাচীরের ওপাড়ে ইয়াজুজ-মাজুজ এখন পর্যন্ত বন্দি অবস্থায় রয়েছে। সহীহ হাদিস থেকে জানা যায়, তারা এই প্রাচীর থেকে মুক্তির জন্য প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করে।
‘ইনশাআল্লাহ’র অলৌকিক শক্তি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ইয়াজুজ-মাজুজ প্রতিদিন সেই প্রাচীর খুঁড়তে থাকে। তারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি দেয়। খুঁড়তে খুঁড়তে যখন দেয়ালটি এমন পাতলা হয়ে যায় যে ওপাড়ে সূর্যের আলো দেখা যায়, ঠিক তখনই তাদের সর্দার বলে, “আজ চল, বাকিটুকু কাল শেষ করব।”
কিন্তু তারা ‘ইনশাআল্লাহ’ (যদি আল্লাহ চান) বলে না। ফলে অলৌকিকভাবে পরদিন সকালে এসে তারা দেখে, আল্লাহর হুকুমে প্রাচীরটি আগের চেয়েও বেশি মোটা এবং মজবুত হয়ে গেছে। হাজার হাজার বছর ধরে এই চক্র চলছে। আল্লাহর ইচ্ছা না হওয়া পর্যন্ত তারা এই ছোট কিন্তু শক্তিশালী একটি শব্দ বলতে ভুলে যাচ্ছে।
কিয়ামতের ঠিক আগে, যখন দাজ্জালকে হত্যা করা হবে এবং হযরত ঈসা (আ.) পৃথিবীতে শাসন করবেন, তখন আল্লাহর ইচ্ছায় তাদের সর্দার বলবে “চলো আজ ফিরে যাই, ইনশাআল্লাহ কাল বাকিটা শেষ করব।” এই একটি মাত্র শব্দের বরকতে পরদিন তারা দেখবে প্রাচীরটি ঠিক তেমনই আছে যেমনটি তারা রেখে গিয়েছিল। সেদিন তারা লোহার প্রাচীর ভেঙে পঙ্গপালের মতো জনপদে ছড়িয়ে পড়বে।
মহাপ্লাবনের মতো আগমন - কিয়ামতের মহাফিতনা
ইয়াজুজ-মাজুজের বের হওয়া কিয়ামতের ১০টি বড় আলামতের মধ্যে একটি। তারা যখন বের হবে, তখন পৃথিবীর অবস্থা হবে অত্যন্ত নাজুক।
হাদিসে এসেছে, ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রথম দলটি যখন ফিলিস্তিনের তিবিরিয়া হ্রদ (Sea of Galilee) পার হবে, তখন তারা পিপাসার চোটে হ্রদের সমস্ত পানি পান করে ফেলবে। তাদের দ্বিতীয় দলটি যখন সেখানে পৌঁছাবে, তখন তারা শুকনো কাদা দেখে বলবে, “এখানে কি কখনো পানি ছিল?”
তাদের সংখ্যা এত বেশি হবে যে মানুষ ভয়ে শহরে ও দুর্গে আশ্রয় নেবে। তারা সামনে যা পাবে তা-ই ধ্বংস করবে। এমনকি তারা দম্ভভরে বলবে, “জমিনের সবাইকে আমরা শেষ করেছি, এবার আসমানের অধিপতিকে মারব।” তারা আকাশের দিকে তীর ছুড়বে এবং আল্লাহ তাদের পরীক্ষা করার জন্য সেই তীরগুলোকে রক্তমাখা অবস্থায় নিচে পাঠাবেন। এতে তারা আরও অহংকারী হয়ে উঠবে।
চূড়ান্ত পরিণতি - একটি ক্ষুদ্র কীটের জয়
যখন পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করবে, তখন হযরত ঈসা (আ.) এবং তাঁর সাথে থাকা মুমিনরা তুর পাহাড়ে আশ্রয় নেবেন। সেখানে তাঁরা খাদ্যাভাব ও অবরোধের মুখে পড়বেন। নিরুপায় হয়ে ঈসা (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন।
আল্লাহর হুকুমে ইয়াজুজ-মাজুজের ঘাড়ের পেছন দিকে এক প্রকার বিশেষ কীট (যাকে হাদিসে ‘নাগাফ’ বলা হয়েছে) সৃষ্টি হবে। এই ক্ষুদ্র কীটের কামড়ে বা সংক্রমণে এক রাতের ব্যবধানে কোটি কোটি ইয়াজুজ-মাজুজ মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে একসাথে মারা যাবে। পৃথিবী তখন তাদের লাশে ভরে যাবে।
এত বিপুল পরিমাণ লাশের গন্ধে পৃথিবীতে বাস করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তখন ঈসা (আ.) পুনরায় দোয়া করবেন। আল্লাহ বিশালাকার পাখি পাঠাবেন, যারা লাশগুলো তুলে নিয়ে সাগরে ফেলে দেবে। এরপর মুষলধারে বৃষ্টি হবে যা পুরো পৃথিবীকে ধুয়ে মুছে আয়নার মতো স্বচ্ছ ও পবিত্র করে দেবে।
আধুনিক বিজ্ঞান ও ভৌগোলিক প্রেক্ষিত - প্রাচীরটি কোথায়?
অনেকে প্রশ্ন করেন, আজকের স্যাটেলাইট ও গুগল ম্যাপের যুগে কেন সেই প্রাচীর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? এর পেছনে কয়েকটি যুক্তি ও তত্ত্ব রয়েছে:
ভৌগোলিক অবস্থান: কেউ কেউ মনে করেন এই প্রাচীরটি ককেশাস পর্বতমালার কোনো এক দুর্গম গিরিপথে অবস্থিত (যেমন ডারিয়াল জর্জ)। আবার অনেকের মতে এটি মধ্য এশিয়া বা মঙ্গোলিয়ার কোনো অংশে হতে পারে।
আল্লাহর পর্দা: এটি হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলা এই প্রাচীরকে মানুষের দৃষ্টি থেকে কোনো অদৃশ্য পর্দার মাধ্যমে আড়াল করে রেখেছেন, যা কেবল নির্দিষ্ট সময়ের আগে দৃশ্যমান হবে না।
ভূ-গর্ভস্থ অবস্থান: অনেক গবেষকের মতে, তারা মাটির নিচে বা এমন কোনো ভূ-তাত্ত্বিক স্তরে আছে যা বর্তমান প্রযুক্তিরও নাগালের বাইরে।
গল্পের শিক্ষা ও আমাদের করণীয়
ইয়াজুজ-মাজুজের এই দীর্ঘ ইতিহাস কেবল কৌতূহল মেটানোর জন্য নয়, বরং এখান থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে:
ইনশাআল্লাহর গুরুত্ব: কোনো কাজ করার আগে আল্লাহর ওপর নির্ভর না করলে তাতে সফলতা আসে না। ইয়াজুজ-মাজুজ হাজার বছর পিছিয়ে আছে কেবল এই একটি শব্দ না বলার কারণে।
অহংকারের পতন: যারা নিজেদের অপরাজেয় ভাবে, আল্লাহ তাদের ক্ষুদ্র একটি পোকা দিয়ে ধ্বংস করতে পারেন। নমরুদকে মশা দিয়ে আর ইয়াজুজ-মাজুজকে কীট দিয়ে ধ্বংস করা এর প্রমাণ।
ঈমানের প্রস্তুতি: কিয়ামতের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ফিতনা তত বাড়ছে। ইয়াজুজ-মাজুজের মতো বড় ফিতনা থেকে বাঁচতে হলে আমাদের ঈমানকে মজবুত করতে হবে।
প্রতীক্ষিত সেই দিন
ইয়াজুজ ও মাজুজের কাহিনী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবী চিরস্থায়ী নয়। জুলকারনাইনের মতো প্রতাপশালী রাজারা চলে গেছেন, কিন্তু তাদের কীর্তি রয়ে গেছে। একইভাবে, আল্লাহ তাআলা যে বিধান রেখেছেন, তা অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হবে। লোহার প্রাচীর একদিন ভাঙবেই এবং পৃথিবীর চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হবে। সেই কঠিন সময়ে কেবল তারাই রক্ষা পাবে যারা আল্লাহর পথে অটল থাকবে।
সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করুন এবং কিয়ামতের ভয়াবহ ফিতনা থেকে রক্ষা করুন। আমিন।




















