লোহার প্রাচীর ও অবাধ্য এক জাতি - কুরআন ও হাদিসের আলোকে ইয়াজুজ-মাজুজের বন্দিত্ব ও মুক্তি

লোহার প্রাচীর ও অবাধ্য এক জাতি - কুরআন ও হাদিসের আলোকে ইয়াজুজ-মাজুজের বন্দিত্ব ও মুক্তি

মানব সভ্যতার দীর্ঘ পরিক্রমায় এমন কিছু রহস্যময় অধ্যায় রয়েছে, যা যুগে যুগে মানুষকে যেমন শিহরিত করেছে, তেমনি চিন্তার অন্তহীন খোরাক জুগিয়েছে। অনাগত ভবিষ্যতের ভয়াবহতম ফিতনা এবং কিয়ামতের অন্যতম মহাপ্রলয়ঙ্করী আলামত হিসেবে যেসব ঘটনার কথা আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) এবং পবিত্র কুরআনে সতর্ক করা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় হলো ‘ইয়াজুজ ও মাজুজ’ (Gog and Magog) জাতির আত্মপ্রকাশ।

এরা কারা? পৃথিবীর কোন দূরবর্তী ভূখণ্ডে বা দুর্গম গিরিপথে লুকিয়ে রয়েছে এই অগণিত ও হিংস্র মানবজাতি? কেন এবং কীভাবে এক মহাপরাক্রমশালী, ন্যায়পরায়ণ শাসক তাদেরকে বিশালাকার লোহা ও তামার সংকর প্রাচীরের আড়ালে চিরতরে বন্দি করে রেখেছিলেন? আর কিয়ামতের ঠিক প্রাক্কালে, যখন পৃথিবীর সমস্ত শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে, তখন কীভাবে এই শৃঙ্খলমুক্ত জাতি পঙ্গপালের মতো ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর সমস্ত পানীয় জল শুষে নেবে এবং মানবজাতিকে এক মহাবিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে?

পবিত্র কুরআনুল কারীমের সূরা আল-কাহাফ এবং সূরা আল-আনবিয়া-এর পাশাপাশি একাধিক সহীহ হাদিসে ইয়াজুজ-মাজুজের উৎপত্তি, বন্দিত্ব, মুক্তি এবং তাদের চূড়ান্ত ধ্বংসের বিশদ বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে। এই দীর্ঘ নিবন্ধে আমরা ইসলামিক পাণ্ডিত্য, নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থ, সহীহ হাদিস এবং আধুনিক ভৌগোলিক অনুসন্ধানের আলোকে এই অবাধ্য জাতির আদি-অন্ত এবং তাদের বন্দিত্বের রোমাঞ্চকর ও আধ্যাত্মিক ইতিহাস বিস্তারিতভাবে উদঘাটন করব।

বাদশাহ জুলকারনাইন - এক ন্যায়পরায়ণ মুমিন সম্রাটের উপাখ্যান

ইয়াজুজ ও মাজুজের ঘটনা বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের সেই মহান শাসকের দিকে, যিনি বিশ্বজুড়ে এক তাওহীদী সাম্রাজ্য কায়েম করেছিলেন এবং যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা ইয়াজুজ-মাজুজকে বন্দি করার অলৌকিক ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি হলেন বাদশাহ জুলকারনাইন

'জুলকারনাইন' শব্দের শাব্দিক ও রূপক অর্থ

‘জুলকারনাইন’ (ذُو الْقَرْنَيْنِ) একটি আরবী যৌগিক শব্দ। ‘জু’ (ذُو) শব্দের অর্থ ‘অধিকারী’ এবং ‘করনাইন’ (قَرْنَيْنِ) হলো ‘ক্বরন’ (قرن) শব্দের দ্বিবচন, যার অর্থ ‘দুইটি শিং’ বা ‘দুইটি যুগ’ অথবা ‘দুইটি প্রান্ত’।

ভৌগোলিক সীমানা নির্দেশক: অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, তিনি পৃথিবীর উদয়াচল (পূর্ব প্রান্ত) এবং অস্তাচল (পশ্চিম প্রান্ত) এই দুই দিগন্তের ওপর কর্তৃত্ব লাভ করেছিলেন বলে তাঁকে ‘জুলকারনাইন’ বা ‘দুই প্রান্তের অধিপতি’ বলা হয়।

মুকুট বা নেতৃত্বের প্রতীক: প্রাচীন রাজকীয় মুকুটে দুই শিং-এর আকৃতির নকশা থাকত, যা তাঁর সুবিশাল সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতীক ছিল।

পবিত্র কুরআনে জুলকারনাইনের বর্ণনা

সূরা আল-কাহাফের ৮৩ নম্বর আয়াত থেকে ৯৮ নম্বর আয়াত পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা জুলকারনাইনের মহৎ চরিত্র ও অভিযানের বিবরণ দিয়েছেন:

"তারা আপনাকে জুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন: আমি তোমাদের কাছে তাঁর কিছু বিবরণ পাঠ করব। আমি তাকে পৃথিবীতে ক্ষমতা দান করেছিলাম এবং তাকে সবকিছুর উপায়-উপকরণ দান করেছিলাম।" - (সূরা আল-কাহাফ: ৮৩-৮৪)

কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, জুলকারনাইন ছিলেন এক একনিষ্ঠ মুমিন, ন্যায়পরায়ণ এবংপ্রকৌশলবিদ্যায় পারদর্শী বীর শাসক। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সুবিশাল সেনাবাহিনী, প্রজ্ঞা এবং পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভ্রমণের অবারিত সুযোগ দিয়েছিলেন।

জুলকারনাইনের ঐতিহাসিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক

ইতিহাসবিদ এবং মুফাসসিরগণের মধ্যে জুলকারনাইনের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে তিনটি প্রধান মতবাদ প্রচলিত রয়েছে:

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট (গ্রিক সম্রাট)

অনেকে ভুলবশত মনে করেন জুলকারনাইন হলেন মেসেডোনিয়ার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার (Alexander the Great)। তবে ইবনে কাছীর (রঃ), ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) সহ বিশিষ্ট আলেমগণ এই মতকে সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করেছেন। কারণ আলেকজান্ডার ছিলেন একজন পৌত্তলিক ও বহুশ্বৈরবাদী (Polytheist) গ্রিক শাসক, অন্যদিকে কুরআনের জুলকারনাইন ছিলেন এক আল্লাহতে বিশ্বাসী পরম পরহেজগার মুমিন।

পারস্যের সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেট (খসরু/Cyrus the Great):

আধুনিক যুগের প্রখ্যাত গবেষক ও পণ্ডিত মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'তাফসীর তরজুমানুল কুরআন' এবং তাফসীরে মাআরিফুল কুরআনে জোরালো প্রমাণসহ উপস্থাপন করেছেন যে, পারস্যের হাকামানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মহান সাইরাসই (Cyrus II) ছিলেন কুরআনে বর্ণিত জুলকারনাইন। সাইরাস ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ, একশ্বৈরবাদী এবং পূর্ব ও পশ্চিমে বিশাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। প্রাচীন পারস্যের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে সাইরাসের একটি পাথরের মূর্তি পাওয়া গেছে, যার মাথায় দুই শিং-বিশিষ্ট রাজমুকুট বিদ্যমান।

ইয়ামানের হিমিয়ারীয় বংশের রাজা:

আল-মারজুফী ও ইবনে হিশামের মতে, তিনি ছিলেন ইয়ামানের 'তুব্বা' বা হিমিয়ারীয় বংশের কোনো এক রাজা, যাদের নামের শুরুতে ‘জু’ শব্দ যুক্ত থাকত (যেমন: জু-নুয়াস, জু-ইয়াজান)।

তবে তাঁর পরিচয় যেটাই হোক না কেন, ইসলামী আকীদা অনুযায়ী মূল বিষয় হলো তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত এক সুমহান, ন্যায়পরায়ণ বিশ্বনেতা।

ইয়াজুজ ও মাজুজ - পরিচয়, বংশলতিকা ও দৈহিক গঠন

আরবী ভাষায় ‘ইয়াজুজ’ (يَأْجُوجُ) এবং ‘মাজুজ’ (مَأْجُوجُ) শব্দ দুটি মূলত ‘আজিজ’ (أَجِيج) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ—‘আগুনের লেশিহান শিখা’ বা ‘দাউ দাউ করে জ্বলা আগুন’। আবার কেউ কেউ মনে করেন এটি ‘আজাজ’ (أَجَاج) থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘অত্যন্ত লবণাক্ত ও ক্ষারীয় উত্তপ্ত পানি’

ভাষাবিদদের মতে, এই জাতির নাম তাদের হিংস্র, অদম্য এবং ধ্বংসাত্মক স্বভাবের সাথেই হুবহু মিলে যায়। আগুনের শিখা যেমন সামনে যা পায় তা-ই পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়, ইয়াজুজ-মাজুজ জাতিও তেমনই তাদের যাত্রাপথে যা পাবে তা-ই ধ্বংস করে দেবে।

নূহ (আ.)-এর বংশলতিকা

┌───────────────────┼───────────────────┐

▼ ▼ ▼

সাম (Shem) হাম (Ham) ইয়াফেস (Japheth)

(আরব ও হিব্রু জাতি) (আফ্রিকান জাতি) │

ইয়াজুজ ও মাজুজ

(তুর্কী ও মঙ্গোলীয় মূল)

বংশলতিকা: এরা কি মানুষ নাকি অন্য কিছু?

কিছু কিছু অমূল গল্পের ওপর ভিত্তি করে ধারণা করা হয় যে, ইয়াজুজ-মাজুজ হয়তো জিন, ভিনগ্রহের প্রাণী (Alien) বা কোনো দৈত্য-দানব। তবে আলেমদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইয়াজুজ ও মাজুজ হলো আদম (আ.)-এরই সরাসরি বংশধর মানবজাতি।

সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, মহাপ্লাবনের পর হযরত নূহ (আ.)-এর তিন পুত্র থেকে মানবজাতির নতুন বংশধারা শুরু হয়:

সাম (Shem): যার বংশে আরব ও হিব্রু জাতির জন্ম।

হাম (Ham): যার বংশে কৃষ্ণাঙ্গ ও আফ্রিকান জাতির জন্ম।

ইয়াফেস (Japheth): যার বংশধর হলো তুর্কী, মঙ্গোলীয় এবং এই ইয়াজুজ-মাজুজ জাতি।

ইমাম ইবনে কাছীর (রঃ) তাঁর 'আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া' গ্রন্থে নিশ্চিত করেছেন যে, ইয়াজুজ-মাজুজ হলো ইয়াফেস ইবনে নূহের বংশোদ্ভূত মানব সম্প্রদায়।

হাদিসের বর্ণনায় ইয়াজুজ-মাজুজের দৈহিক বৈশিষ্ট্য ও সংখ্যাধিক্য

সহীহ হাদিসে ইয়াজুজ-মাজুজের শারীরিক গঠন ও তাদের বিপুল জনসংখ্যার বিবরণ পাওয়া যায়:

দৈহিক গঠন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, তাদের মুখমণ্ডল হবে ঢালের মতো চ্যাপ্টা ও গোলাকার (کَالْمَجَانِّ الْمُؤَصْلَدَةِ), চোখগুলো হবে ছোট ছোট, চুল হবে লালচে বা তামাতে রঙের এবং তাদের নাক হবে কিছুটা চ্যাপ্টা। (মুসনাদে আহমাদ)

সুবিশাল সংখ্যাধিক্য: সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হাদিসে কুদসীতে এসেছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)-কে বলবেন, "তোমার সন্তানদের মধ্য থেকে জাহান্নামীদের বের করো।" আদম (আ.) জিজ্ঞেস করবেন, "কাদের বের করব?" আল্লাহ বলবেন, "প্রতি ১,০০০ জনের মধ্যে ৯৯৯ জনকে।" সাহাবীগণ এই কথা শুনে আঁতকে উঠলেন এবং তাঁদের চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁদের অভয় দিয়ে বললেন:

"তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো! কারণ সেই ৯৯৯ জন হবে ইয়াজুজ ও মাজুজ জাতি থেকে, আর মাত্র ১ জন হবে তোমাদের মধ্য থেকে!" (সহীহ বুখারী: ৩৩৪৮)

এই হাদিস থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, সাধারণ মানবজাতির তুলনায় ইয়াজুজ-মাজুজের সংখ্যা এতই বিপুল যে তা গণনার বাইরে। তারা প্রধানত হাজার হাজার উপজাতিতে বিভক্ত।

দুই পাহাড়ের সন্ধিক্ষণে দুর্ভেদ্য প্রাচীর নির্মাণ

জুলকারনাইন তাঁর সুদূর অভিযানে পশ্চিমের সীমানা (কাদামাখা জলাশয়) এবং পূর্বের সীমানা অতিক্রম করে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী এক উপত্যকায় এসে পৌঁছান।

আর্তপীড়িত মানুষের করুণ আবেদন

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, জুলকারনাইন যখন সেই দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী অঞ্চলে পৌঁছালেন, তখন তিনি সেখানে এমন এক মানবগোষ্ঠীর মুখোমুখি হলেন, যারা জুলকারনাইনের ভাষা প্রায় বুঝতেই পারছিল না। তারা ছিল অত্যন্ত দুর্বল ও অনগ্রসর।

তারা ইশারায় ও দোভাষীর মাধ্যমে তাদের ওপর হওয়া বর্বরোচিত নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে বলল:

"তারা বলল: হে জুলকারনাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। অতএব, আমরা কি আপনাকে কিছু কর (অর্থ) দেব এই শর্তে যে, আপনি আমাদের ও তাদের মাঝে একটি প্রাচীর তৈরি করে দেবেন?" - (সূরা আল-কাহাফ: ৯৪)

ইয়াজুজ-মাজুজ মাঝেমধ্যেই পাহাড়ি সংকীর্ণ পথ দিয়ে নেমে এসে তাদের শস্যক্ষেত ধ্বংস করত, পশুসম্পদ লুণ্ঠন করত এবং নিরীহ মানুষদের হত্যা করত।

পাহাড় ১ ═══════════════════════════════════ পাহাড় ২

▲ ▲

│ লোহা │

│ + তামা │ (সংকর ধাতু)

▼ ▼

জুলকারনাইনের দুর্ভেদ্য ‘রদমা’

জুলকারনাইনের নিঃস্বার্থতা ও তাওয়াক্কুল

জুলকারনাইন ছিলেন এক সত্যিকারের ঈমানদার শাসক। তিনি কোনো রাজকীয় ট্যাক্স বা অর্থের লোভ করলেন না। তিনি বললেন:

"আমার রব আমাকে যে সামর্থ্য ও ক্ষমতা দিয়েছেন, তা-ই উত্তম। সুতরাং তোমরা আমাকে শারীরিক শ্রম দিয়ে সাহায্য করো, আমি তোমাদের ও তাদের মাঝে এক নিচ্ছিদ্র প্রাচীর নির্মাণ করে দেব।" - (সূরা আল-কাহাফ: ৯৫)

প্রাচীন প্রকৌশলবিদ্যার চরম বিস্ময়: ‘রদমা’ নির্মাণ প্রক্রিয়া

জুলকারনাইন সাধারণ কোনো মাটির বা পাথরের দেয়াল তৈরি করেননি, যা সহজে ভেঙে ফেলা যায়। কুরআনের পরিভাষায় তিনি তৈরি করেছিলেন ‘রদমা’ (رَدْمًا)। আরবী ভাষায় ‘সাদ’ (سَدّ) মানে সাধারণ দেয়াল, আর ‘রদমা’ মানে হলো একাধিক স্তরে নির্মিত অতি পুরু, মসৃণ ও দুর্ভেদ্য বাঁধ।

তিনি প্রাচীর নির্মাণের যে বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলগত পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন, তা তৎকালীন যুগের বিচারে অবিশ্বাস্য:

লোহার বিশাল খণ্ড সাজানো (Iron Blocks): জুলকারনাইন আদেশ দিলেন বিশাল বিশাল লোহার পাত ও খণ্ড নিয়ে আসতে। তিনি দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানটি নিচ থেকে উপর পর্যন্ত লোহার খণ্ড দিয়ে ভরাট করে ফেললেন, যতক্ষণ না তা দুই পাহাড়ের চূড়ার সমান উঁচু হলো।

অগ্নিশিখা সৃষ্টি (Heating Process): এরপর তিনি পাহাড়ের উভয় দিক থেকে বিশাল হাপর (Bellows) দিয়ে বাতাস ফুঁকে আগুন জ্বালানোর নির্দেশ দিলেন। প্রচণ্ড তাপে লোহা যখন আগুনের মতো লাল টকটকে হয়ে গলিত অবস্থায় রূপ নিল, তখন শুরু হলো পরবর্তী ধাপ।

গলিত তামার সংমিশ্রণ (Molten Copper): এবার তিনি নির্দেশ দিলেন গলিত তামা (قِطْر) সেই উত্তপ্ত লোহার ওপর ঢেলে দিতে। লোহা ও গলিত তামা একসাথে মিলে এক উচ্চমাত্রার শক্ত সংকর ধাতু (Alloy / Bronze) তৈরি করল।

লোহার মজবুতি (Iron's Strength) + তামার মরিচা-রোধক মসৃণতা (Copper's Smoothness) = দুর্ভেদ্য ধাতব প্রাচীর (Impenetrable Alloy Wall)

ফলাফল হিসেবে এমন এক দেয়াল তৈরি হলো যা ছিল পাহাড়ের মতোই উঁচু, অতিরিক্ত মসৃণ এবং যেকোনো অস্ত্রের আঘাত সহ্য করতে সক্ষম। কুরআন ঘোষণা করে:

"অতঃপর তারা (ইয়াজুজ-মাজুজ) সেই প্রাচীর অতিক্রম করতে পারল না এবং তা ছিদ্র করতেও সক্ষম হলো না।" - (সূরা আল-কাহাফ: ৯৭)

প্রাচীরটি সম্পন্ন হওয়ার পর অহংকার করার পরিবর্তে জুলকারনাইন আল্লাহর দরবারে সেজদানত হয়ে বললেন: "এটি আমার রবের এক বিশেষ রহমত।" (সূরা আল-কাহাফ: ৯৮)

বন্দিত্বের হাজার বছর ও ‘ইনশাআল্লাহ’-র অলৌকিক শক্তি

দেয়ালটি নির্মিত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত ইয়াজুজ ও মাজুজ সম্প্রদায় সেই প্রাচীরের ওপারে অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। তবে তারা কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে নেই।

প্রতিদিনের আক্লান্ত ব্যর্থ প্রচেষ্টা

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণিত এক অত্যন্ত সহীহ হাদিসে ইয়াজুজ-মাজুজের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের বিবরণ পাওয়া যায়। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ﷺ) বলেছেন:

ইয়াজুজ ও মাজুজ প্রতিদিন সেই প্রাচীর খুঁড়তে থাকে। খুড়তে খুড়তে তারা যখন দেয়ালটিকে এত পাতলা করে ফেলে যে, অপর প্রান্তের সূর্যের আলো বা সূর্যালোক দেখা যেতে শুরু করে, তখন তাদের সর্দার বা দলপতি বলে "আজকের মতো কাজ বন্ধ করো, চলো ফিরে যাই! কাল এসে বাকি অংশটুকু খুঁড়ে শেষ করব।"

কিন্তু তারা ‘ইনশাআল্লাহ’ (যদি আল্লাহ চান) বলে না। ফলে তারা যখন পরদিন সকালে ফিরে আসে, তখন দেখে যে আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরতে সেই ধাতব প্রাচীরটিকে আগের চেয়েও বেশি মোটা, শক্ত ও অক্ষত করে দিয়েছেন!

হাজার হাজার বছর ধরে প্রতিদিন তাদের এই কঠোর পরিশ্রম ও ব্যর্থতার চক্র অনবরত চলছে। কেবল একটি মাত্র পবিত্র বাক্য বা তাওহীদী স্বীকৃতি না বলার কারণে তারা প্রতিদিন তাদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছে।

প্রতিদিনের ব্যর্থতার চক্র

সকাল: প্রাচীর খনন শুরু ──► সন্ধ্যা: প্রাচীর পাতলা হওয়া ──► সর্দারের ঘোষণা ("কাল শেষ করব")

──► 'ইনশাআল্লাহ' না বলা ──► পরদিন সকাল: অলৌকিকভাবে প্রাচীর পূর্বের ন্যায় মজবুত হওয়া

ঐতিহাসিক সেই দিন: 'ইনশাআল্লাহ'-র বরকতে মুক্তি

কিয়ামতের ঠিক আগে, যখন আল্লাহর নির্ধারিত সময় উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের হৃদয়ে 'ইনশাআল্লাহ' শব্দটি উচ্চারণ করার অনুপ্রেরণা দেবেন।

সেদিন সন্ধ্যায় প্রাচীর খনন শেষে তাদের সর্দার বলবে: "আজ ফিরে চলো, 'ইনশাআল্লাহ' কাল আমরা এটি ভেঙে বাইরে যাব।"

পরদিন সকালে তারা এসে দেখবে, প্রাচীরটি ঠিক তেমনই পাতলা অবস্থায় রয়ে গেছে যেমনটি তারা আগের দিন রেখে গিয়েছিল। এরপর তারা সামান্য আঘাত করতেই দুর্ভেদ্য লোহার প্রাচীর ধসে পড়বে এবং তারা হুড়মুড় করে মানব লোকালয়ে বেরিয়ে আসবে।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঐতিহাসিক দুঃস্বপ্ন ও আরবের সংকট

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, একবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অত্যন্ত চিন্তিত ও আরক্তিম চেহারায় ঘুম থেকে উঠে বললেন:

"আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই! আরবদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য সেই ক্ষতিকর ফিতনার কারণে যা নিকটে এসে গেছে! আজ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রাচীরে এতটুকু গর্ত হয়ে গেছে!"

(এ কথা বলে তিনি তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী আঙুল দিয়ে একটি বৃত্তাকার রিং বানিয়ে দেখালেন)।

উম্মুল মুমিনীন হযরত জয়নব বিনতে জাহাশ (রা.) ভীতিগ্রস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন: "হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মাঝে সৎ ও সালেহ লোক থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব?" রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জবাব দিলেন: "হ্যাঁ! যখন সমাজে পাপ, ব্যভিচার ও অশ্লীলতা চরম আকার ধারণ করবে।" (সহীহ বুখারী: ৩৩৪৬)

মহাপ্রলয়ের প্রাক্কালে বন্দিদশা থেকে মুক্তি ও বিশ্বব্যাপী ফিতনা

কিয়ামতের ১০টি সর্বপ্রধান আলামতের (Major Signs of Qiyamah) মধ্যে ইয়াজুজ-মাজুজের আত্মপ্রকাশ অন্যতম। তবে তাদের বের হওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিক সময়কাল রয়েছে।

শেষ জামানার প্রধান ঘটনাক্রম

১. মহাযুদ্ধ ও দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ

২. হযরত ঈসা (আ.)-এর আসমান থেকে আগমন ও দাজ্জাল নিধন

৩. ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীর ভাঙন ও আত্মপ্রকাশ

৪. 'নাগাফ' কীটের মাধ্যমে ইয়াজুজ-মাজুজের বিনাশ

৫. বিশ্বজুড়ে ইসলামি শান্তি ও নজিরবিহীন সমৃদ্ধির যুগ

তিবিরিয়া হ্রদের সুপেয় পানি শূন্যকরণ

আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আ.)-কে ওহীর মাধ্যমে নির্দেশ দেবেন: "আমি আমার এমন কিছু বান্দাকে বের করেছি, যাদের সাথে যুদ্ধ করার ক্ষমতা কারও নেই। সুতরাং আপনি আমার মুমিন বান্দাদের নিয়ে তূর পাহাড়ে আত্মরক্ষা করুন।" (সহীহ মুসলিম)

হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, ইয়াজুজ ও মাজুজ যখন পাহাড়ি উঁচুমুখ থেকে পঙ্গপালের মতো দ্রুতবেগে নেমে আসবে, তখন তাদের প্রথম দলটি ফিলিস্তিনের বিখ্যাত তিবিরিয়া হ্রদ (Sea of Galilee / Lake Tiberias) অতিক্রম করবে।

তাদের জনসংখ্যা এতই ভয়াবহ হবে যে, প্রথম দলটি হ্রদের সমস্ত সুপেয় পানি পান করে শেষ করে ফেলবে! যখন তাদের শেষ দলটি সেই হ্রদের পাশ দিয়ে যাবে, তখন শুকনো কাদা দেখে বিস্ময়ে বলবে: "এখানে মনে হয় কোনো এক সময় পানি ছিল!"

তিবিরিয়া হ্রদ পান করার কালানুক্রম

প্রথম দল ──► হ্রদের সমস্ত পানি পান করে শেষ করা

মধ্যম দল ──► এক ফোটা পানিও না পেয়ে সামনে অগ্রসর হওয়া

শেষ দল ──► শুকনো কাদা দেখে বলা: "এখানে কি কখনো পানি ছিল?"

বিশ্বব্যাপী তাণ্ডব ও ঈসা (আ.)-এর অবরুদ্ধ অবস্থা

তারা পথিমধ্যে যা পাবে মানুষ, পশু, ফসল সব ধ্বংস ও ভক্ষণ করবে। শহরের মানুষ ভয়ে দুর্গ ও ঘরে বন্দি হয়ে যাবে। পুরো পৃথিবীতে তাণ্ডব চালানোর পর তাদের অহংকার আকাশচুম্বী হয়ে উঠবে। তারা দম্ভভরে বলবে:

"জমিনের সমস্ত অধিবাসীকে তো আমরা হত্যা করেছি! এবার চলো আসমানের অধিপতিকে (নাউজুবিল্লাহ) হত্যা করি!"

তারা তাদের তীর-ধনুক নিয়ে আকাশের দিকে তীর ছুড়বে। আল্লাহ তাআলা তাদের পরীক্ষা ও বিভ্রান্তি বাড়ানোর জন্য সেই তীরগুলোকে রক্তমাখা অবস্থায় নিচে ফিরিয়ে আনবেন। এতে তারা আরও আত্মহারা হয়ে উল্লাস করবে।

অন্যদিকে, হযরত ঈসা (আ.) এবং তাঁর সাথে থাকা অনুসারী মুমিন দল তূর পাহাড়ে (Mount Tur) চরম খাদ্যাভাব ও অবরোধের মুখে পড়বেন। পরিস্থিতি এতই ভয়াবহ হবে যে, একটি গরুর মাথা তাদের কাছে ১০০ স্বর্ণমুদ্রার চেয়েও বেশি মূল্যবান মনে হবে।

ঐশ্বরিক অলৌকিকত্ব - ক্ষুদ্র কীটের মাধ্যমে মহাধ্বংস

যখন মানবীয় সমস্ত শক্তি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়ে যাবে, তখন বিশ্বজাহানের মালিক আল্লাহ তাআলা তাঁর ঐশ্বরিক ক্ষমতার মহিমা প্রদর্শন করবেন।

হযরত ঈসা (আ.)-এর ব্যাকুল দোয়া

তূর পাহাড়ে অবরুদ্ধ অবস্থায় হযরত ঈসা (আ.) এবং তাঁর সঙ্গী মুমিনগণ অত্যন্ত আকুল হয়ে আল্লাহর দরবারে কঁদে কেঁদে দোয়া করবেন, যেন আল্লাহ মানবজাতিকে এই অভিশপ্ত অত্যাচারী শক্তির হাত থেকে রক্ষা করেন।

'নাগাফ' কীটের মহামারী ও এক রাতের মহা-বিনাশ

আল্লাহ তাআলা ঈসা (আ.)-এর দোয়া কবুল করবেন। কিন্তু তাদেরকে ধ্বংস করার জন্য আল্লাহ কোনো সুবিশাল সেনাবাহিনী বা আসমানী বজ্র পাঠাবেন না; বরং তিনি পাঠাবেন অত্যন্ত ক্ষুদ্র এক জীব।

আল্লাহ তাআলা ইয়াজুজ-মাজুজের ঘাড়ের পেছনে এক প্রকার বিশেষ অনুজীব বা পোকা সৃষ্টি করবেন, যাকে হাদিসের ভাষায় ‘নাগাফ’ (النَّغَف) বলা হয়েছে। (এটি মূলত গবাদিপশুর নাকে-ঘাড়ে হওয়া এক ধরণের বিশেষ প্যারাসাইট বা পোকা)।

ইয়াজুজ-মাজুজের চূড়ান্ত বিনাশ প্রক্রিয়া

ঈসা (আ.)-এর দোআ ──► ঘাড়ে 'নাগাফ' কীটের সংক্রমণ ──► এক রাতে কোটি কোটি মৃত্যু

──► বিশালাকার পাখির মাধ্যমে লাশ অপসারণ ──► রহমতের বৃষ্টিতে ধৌত পৃথিবী

এই ক্ষুদ্র কীটের সংক্রমণে মহামারী ছড়িয়ে পড়বে। অলৌকিকভাবে, মাত্র এক রাতের ব্যবধানে কোটি কোটি ইয়াজুজ-মাজুজ একসাথে মারা যাবে! রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "তারা এমনভাবে একরাতে মারা যাবে, যেন তারা কোনো একজনমাত্র ব্যক্তি ছিল।"

পঁচা লাশের দুর্গন্ধ ও বিশালাকার পাখির আগমন

পরদিন সকালে হযরত ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীরা তূর পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসবেন। কিন্তু তাঁরা গিয়ে দেখবেন, পুরো পৃথিবী ইয়াজুজ-মাজুজের পঁচা লাশ এবং চর্বিতে ঢেকে গেছে। লাশের তীব্র দুর্গন্ধ ও দূষণে পৃথিবীতে এক মুহূর্ত নিঃশ্বাস নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

তখন হযরত ঈসা (আ.) পুনরায় আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়ার বরকতে উটের ঘাড়ের মতো বিশালাকার এক ধরণের সুদীর্ঘ পাখি পাঠাবেন। সেই পাখিরা এসে ইয়াজুজ-মাজুজের ভারী লাশগুলোকে মুখে তুলে নিয়ে আল্লাহর নির্দেশিত কোনো দূরবর্তী স্থানে বা সাগরে নিক্ষেপ করবে।

রহমতের বৃষ্টি ও পৃথিবীর নজিরবিহীন বরকত

এরপর আল্লাহ তাআলা টানা মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। সেই বৃষ্টিতে পুরো পৃথিবী ধুয়ে-মুছে কাঁচের মতো আয়নার মতো স্বচ্ছ, পবিত্র ও মসৃণ হয়ে যাবে।

অতঃপর আল্লাহ তাআলা মাটিকে নির্দেশ দেবেন: "তোমার সমস্ত বরকত ও ফলমূল উৎপন্ন করো।" সে সময় একটি মাত্র ডালিম বা আনার পুরো এক দল মানুষ পেট পুরে খেতে পারবে এবং তার খোসার নিচে পুরো পরিবার ছায়া নিতে পারবে। দুগ্ধবতী একটি গাভীর দুধ দিয়ে পুরো গোত্রের চাহিদা মিটে যাবে। পৃথিবীতে নেমে আসবে এক নজিরবিহীন শান্তির স্বর্গীয় আমেজ।

আধুনিক ভূগোল, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান

আজকের একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যখন গুগলের স্যাটেলাইট ম্যাপ (Google Earth), ড্রোন প্রযুক্তি এবং জিও-লোকেশন সিস্টেম দিয়ে পৃথিবীর প্রতি ইঞ্চি মাটি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব, তখন সাধারণ মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক: "লোহা ও তামার তৈরি সেই সুবিশাল প্রাচীরটি আজ কোথায় লুকিয়ে আছে? কেন স্যাটেলাইটে তা ধরা পড়ছে না?"

ইসলামী চিন্তাবিদ, ভূ-বিজ্ঞানী এবং গবেষকগণ এর উত্তরে কয়েকটি যুক্তিগ্রাহ্য ও চমৎকার বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন:

ককেশাস পর্বতমালা ও ডারিয়াল গিরিপথ (Darial Gorge)

অধিকাংশ প্রখ্যাত তাফসিরবিদ ও ইতিহাসবিদ (যেমন: মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি) মনে করেন, এই প্রাচীরটি জর্জিয়া ও রাশিয়ার সীমান্তে অবস্থিত ককেশাস পর্বতমালার (Caucasus Mountains) দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত।

সেখানে ‘ডারিয়াল গিরিপথ’ (Darial Gorge) নামে একটি স্থান রয়েছে, যাকে ঐতিহাসিকভাবে ‘কাস্পিয়ান গেটস’ (Caspian Gates) বা ‘জুলকারনাইনের কবাট’ বলা হতো। প্রাচীনকালে এই সরু গিরিপথ দিয়েই উত্তরের মঙ্গোলিয়ান ও স্কিথিয়ান বর্বর জাতিগুলো দক্ষিণে আক্রমণ চালাত। এই স্থানে প্রাচীন যুগে লোহা ও ধাতব পাতের অস্তিত্বের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

চীন প্রাচীর (Great Wall of China) - একটি ভুল ধারণা

অনেকে ভুলবশত চীনের প্রাচীরকে জুলকারনাইনের প্রাচীর মনে করেন। তবে আধুনিক গবেষকগণ এই দাবি সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন। কারণ:

চীনের প্রাচীর তৈরি হয়েছে ইট, মাটি ও পাথর দিয়ে; এতে গলিত তামার প্রলেপযুক্ত লোহার পাত নেই। এটি কোনো দুটি পাহাড়ের মাঝখানের সরু মুখ বন্ধ করার জন্য তৈরি হয়নি, বরং একটি দীর্ঘ সীমানা প্রাচীর। এটি নির্মাণ করেছেন চীনের সম্রাট শি হুয়াং তি, যিনি কোনো একশ্বৈরবাদী মুমিন ছিলেন না।

ভূ-গর্ভস্থ স্তর বা অন্য ডাইমেনশন (Dimensions)

একটি শক্তিশালী তত্ত্ব হলো আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশেষ কুদরতে সেই এলাকাটিকে মানবচক্ষু এবং আধুনিক প্রযুক্তির রাডার থেকে আড়াল করে রেখেছেন। যেমন জিবরাইল (আ.), ফেরেশতাকুল, জিন জাতি বা ইবলিস আমাদের পাশেই রয়েছে কিন্তু আমরা তাদের দেখতে পাই না। ঠিক তেমনি, নির্দিষ্ট সময় আসার আগে বরজখী বা ঐশ্বরিক পর্দার কারণে স্যাটেলাইট প্রযুক্তি তা সনাক্ত করতে পারছে না।

ইয়াজুজ-মাজুজ ও জুলকারনাইনের কাহিনীর পূর্ণাঙ্গ বিবরণী ছক

নিচে কুরআন ও সহীহ হাদিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যসমূহের এক নজরে সারসংক্ষেপ টেবিল আকারে তুলে ধরা হলো:

বিষয়/অধ্যায়

কুরআন ও হাদিসের মৌলিক তথ্য

ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

জুলকারনাইনের পরিচয়

ন্যায়পরায়ণ, তাওহীদী মুমিন বিশ্ব-সম্রাট (সূরা কাহাফ: ৮৩-৯৮)।

অধিকাংশ গবেষকের মতে পারস্যের সাইরাস দ্য গ্রেট (Cyrus the Great)।

ইয়াজুজ-মাজুজের উৎপত্তি

আদম (আ.) ও নূহ (আ.)-এর পুত্র ইয়াফেসের সরাসরি মানব বংশধর।

পূর্ব এশিয়া, তুর্কী ও মঙ্গোলীয় মূলের আদিম ও হিংস্র উপজাতি সম্প্রদায়।

দৈহিক গঠন

চ্যাপ্টা মুখমণ্ডল, ছোট চোখ, লালচে চুল, শক্ত দৈহিক কাঠামো।

অত্যন্ত দ্রুতগতিসম্পন্ন এবং হিংস্র স্বভাবের অধিকারী।

প্রাচীরের উপাদান

লোহা (حَدِيد) এবং গলিত তামা (قِطْر) দ্বারা তৈরি সংকর ধাতু।

মরিচা-রোধক, অতি মসৃণ, সুউচ্চ এবং ফুটো করা অসম্ভব এক বাঁধ।

দৈনন্দিন কাজ

প্রতিদিন প্রাচীর খনন করা এবং সন্ধ্যা হলে কাজ বন্ধ রাখা।

'ইনশাআল্লাহ' না বলার কারণে প্রতিদিনের কাজ পণ্ড হয়ে যাওয়া।

মুক্তির সুনির্দিষ্ট সময়

দাজ্জাল নিধনের পর হযরত ঈসা (আ.)-এর শাসনামলে।

'ইনশাআল্লাহ' বলার বরকতে ধাতব প্রাচীর ধসে বাইরে বেরিয়ে আসবে।

ধ্বংসের অদ্ভুত মাধ্যম

আল্লাহর প্রেরিত ঘাড়ের অনুজীব বা পোকা—‘নাগাফ’ (النَّغَف)

মহামারী সংক্রমণে এক রাতের মধ্যে কোটি কোটি মানুষের বিনাশ।

পৃথিবী পরিষ্কারের উপায়

বিশালাকার বিশেষ পাখি এবং একটানা মুষলধারে বৃষ্টিপাত।

বৃষ্টিতে ধুয়ে পৃথিবী কাঁচের মতো স্বচ্ছ ও উর্বর রূপ লাভ করবে।

মানবজাতির জন্য ঈমানী শিক্ষা ও করণীয়

ইয়াজুজ ও মাজুজের এই চমকপ্রদ ইতিহাস কেবল মনের কৌতূহল মেটানো বা রহস্য উদঘাটনের গল্প নয়; বরং এর পেছনে বিশ্ব জাহানের মালিক আল্লাহ তাআলা মানবজাতির জন্য গভীর আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বার্তা রেখে দিয়েছেন:

‘ইনশাআল্লাহ’ বাক্যের অলৌকিক শক্তি ও তাওয়াক্কুল

হাজার হাজার বছর ধরে একটি পরাক্রমশালী জাতি কোটি কোটি লোক নিয়ে একটি লোহা-তামার প্রাচীর ভাঙতে পারছে না কেবল একটি বাক্যের অভাবে ‘ইনশাআল্লাহ’ (যদি আল্লাহ চান)। এটি আমাদের শেখায় যে, মানুষের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই; আল্লাহর ইচ্ছা ও তাওফিক ছাড়া পৃথিবীর কোনো কাজই সফল হতে পারে না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যেকোনো কাজের পরিকল্পনায় ‘ইনশাআল্লাহ’ বলার অভ্যাস গড়ে তোলা আবশ্যক।

ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার ও বিনয়

বাদশাহ জুলকারনাইন ছিলেন সমগ্র পৃথিবীর একক শাসক। কিন্তু প্রকাণ্ড ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন চরম বিনয়ী। অসহায় মানুষ যখন তাঁকে প্রচুর অর্থ দিতে চাইল, তিনি তা প্রত্যাখান করে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের ওপর ভরসা করেছিলেন। প্রাচীর নির্মাণের মতো মহা-প্রকৌশলগত বিস্ময় অর্জনের পরও তিনি অহংকার না করে বলেছিলেন- "এটি আমার রবের রহমত।" শাসক ও ধনীদের জন্য এতে রয়েছে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার আদর্শ।

অহংকারের অবশ্যম্ভাবী পতন

ইয়াজুজ-মাজুজ তাদের বিশাল সংখ্যা ও শক্তি নিয়ে অহংকার করে আকাশে তীর ছুড়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদের ধ্বংস করতে কোনো বিশাল সেনাবাহিনী পাঠালেন না; ক্ষুদ্র একটি পোকা (নাগাফ) দিয়ে এক রাতে কোটি কোটি অহংকারীকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলেন। নমরুদকে মশা দিয়ে, আবরাহার হস্তীবাহিনীকে আবাবিল পাখি দিয়ে আর ইয়াজুজ-মাজুজকে কীট দিয়ে ধ্বংস করে আল্লাহ প্রমাণ করেছেন অহংকার কেবল আল্লাহরই সাজে, বান্দার অহংকার তার পতনের মূল।

শেষ জামানার চেতনা ও আমাদের ঈমানী প্রস্তুতি

ইয়াজুজ ও মাজুজের আগমনী বার্তা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, এই দৃশ্যমান পার্থিব জীবন চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলেছে এবং আল্লাহর ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হবে।

যে লোহার প্রাচীর জুলকারনাইন নির্মাণ করেছিলেন, তা একদিন আল্লাহর হুকুমে চূর্ণ-বিচূর্ণ হবেই। কিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিন আসার আগেই আমাদের প্রতিটি মানুষের উচিত নিজেদের ঈমানকে মজবুত করা, পাপাচার ও অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকা এবং সুরা আল-কাহাফের নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে শেষ জামানার সমস্ত ফিতনা থেকে নিজেদের রক্ষা করার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে দ্বীনের বুঝ দান করুন, শেষ জামানার সমস্ত ভয়াবহ ফিতনা থেকে রক্ষা করুন এবং কিয়ামতের দিন ঈমানের সাথে কামিয়াবি দান করুন। আমিন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.