বখতিয়ার খলজির সমাধি - গঙ্গারামপুরের অবহেলিত ইতিহাস
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি বঙ্গের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর অতর্কিত বাংলা বিজয় কেবল একটি শাসক বংশের পরিবর্তন ছিল না, বরং তা ছিল এই ভূখণ্ডের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিশাল মোড় পরিবর্তন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাংলায় মুসলিম শাসনের এই গোড়াপত্তনকারীর শেষ শয্যা আজ লোকচক্ষুর আড়ালে, চরম অবহেলায় ধুলোয় মিশে যাচ্ছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর সংলগ্ন পীরপাল গ্রামে শায়িত এই বীরের সমাধি নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক, রহস্য এবং স্থানীয় জনপদের অদ্ভুত সব লোকবিশ্বাস। আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা বখতিয়ার খলজির উত্থান, তাঁর বিতর্কিত তিব্বত অভিযান এবং দেবকোটের নির্জন প্রান্তরে তাঁর অবহেলিত সমাধিস্থলের আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করব।
বখতিয়ার খলজির আদি পরিচয় ও রাজনৈতিক উত্থান
বখতিয়ার খলজির পুরো নাম ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি। তিনি ছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভূত এবং তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন বর্তমান আফগানিস্তানের গরমশির বা আধুনিক হেলমান্দ অঞ্চলের বাসিন্দা। ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, বখতিয়ার ছিলেন শারীরিকভাবে কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির - খর্বকায়, দীর্ঘবাহু এবং চেহারায় আভিজাত্যের অভাব। এই শারীরিক গঠনের কারণে প্রথম জীবনে তিনি গজনী বা দিল্লির রাজদরবারে সেনাপতির পদে জায়গা পাননি।
তবে প্রতিকূলতা তাঁর দু:সাহসকে দমাতে পারেনি। ভাগ্যান্বেষণে তিনি অযোধ্যার শাসক হুসামুদ্দিনের কাছে যান। হুসামুদ্দিন তাঁর তেজ ও রণকৌশল দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বর্তমান মির্জাপুর জেলার ‘ভগবত’ ও ‘ভিউলা’ নামক দুটি পরগনা জায়গির হিসেবে প্রদান করেন। এটিই ছিল তাঁর রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির ভিত্তিভূমি। এখান থেকেই তিনি ছোট ছোট অভিযান চালিয়ে নিজের এক দুর্ধর্ষ বাহিনী গড়ে তোলেন।
বিহার ও বাংলা বিজয়
বখতিয়ার খলজির নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে (কিংবা কারো কারো মতে রক্তাক্ষরে) লেখা হয় ১২০৩-১২০৪ খ্রিষ্টাব্দের ঘটনাবলির মাধ্যমে। দিল্লির সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেকের পরোক্ষ সমর্থনে তিনি প্রথমে বিহার জয় করেন। ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজের ‘তবকাত-ই-নাসিরি’ গ্রন্থে বখতিয়ারের বিহার বিজয়ের বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়।
নদীয়া আক্রমণ ও লক্ষ্মণ সেনের পলায়ন
১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী নিয়ে বখতিয়ার খলজি বাংলার তৎকালীন রাজধানী নদীয়া আক্রমণ করেন। রাজা লক্ষ্মণ সেন তখন মধ্যাহ্নভোজে ব্যস্ত ছিলেন। আক্রমণের আকস্মিকতায় তিনি বিচলিত হয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বিক্রমপুরে পালিয়ে যান। বিনা যুদ্ধে নদীয়া দখলের পর বখতিয়ার উত্তরবঙ্গের লক্ষ্মণাবতী বা গৌড় দখল করেন। তিনি গৌড়কে তাঁর প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন এবং এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘লখনৌতি’। তাঁর এই বিজয়ের মাধ্যমেই বাংলায় প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছরের মুসলিম শাসনের সূচনা ঘটে।
তিব্বত অভিযান - এক ট্র্যাজিক মহাপ্রয়াণ
বাংলার শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পর বখতিয়ারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাঁকে হিমালয়ের ওপারে তিব্বত অভিযানের দিকে ঠেলে দেয়। ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রায় ১০ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে তিনি উত্তরবঙ্গ হয়ে তিব্বতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু এই অভিযানটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে প্রমাণিত হয়।
তিব্বতের দুর্গম পাহাড়ি পথ, তীব্র শীত এবং স্থানীয় কামরূপ ও তিব্বতি উপজাতিদের ‘গেরিলা’ আক্রমণের মুখে বখতিয়ারের সেনাবাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ফেরার পথে ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের সংযোগস্থলে বিষাক্ত জঙ্গল এবং খাদ্যাভাবের কারণে তাঁর বিশাল বাহিনীর মাত্র কয়েকশ সৈন্য বেঁচে ফেরে। এই পরাজয় বখতিয়ারকে মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার করে দেয়। তিনি অসুস্থ অবস্থায় তাঁর প্রিয় দেবকোটে (বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর) ফিরে আসেন।
মৃত্যুর রহস্য - স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি হত্যাকাণ্ড?
বখতিয়ার খলজির মৃত্যু আজও ইতিহাসের এক অমীমাংসিত রহস্য। দেবকোটে ফিরে আসার কিছুদিন পর ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর কারণ নিয়ে মূলত দুটি প্রধান মতবাদ প্রচলিত:
মানসিক অবসাদ ও রোগ: তিব্বত অভিযানের গ্লানি এবং লজ্জিত বখতিয়ার শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন এবং প্রবল জ্বরে ভুগে স্বাভাবিকভাবে মারা যান।
আলী মর্দানের ষড়যন্ত্র: সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের মতে, বখতিয়ারের অন্যতম সেনাপতি আলী মর্দান খলজি সুযোগ বুঝে শয্যাশায়ী বখতিয়ারকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন এবং ক্ষমতা দখল করেন।
বখতিয়ার খলজির সমাধি - গঙ্গারামপুরের পীরপাল গ্রাম
বাংলার প্রথম মুসলিম বিজেতা আজ কোথায় শুয়ে আছেন, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা নেই। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর শহর থেকে প্রায় সাত-আট কিলোমিটার দূরে ‘পীরপাল’ নামক একটি নিভৃত গ্রামে তাঁর সমাধি অবস্থিত। এই স্থানটি এক সময় ঐতিহাসিক ‘দেবকোট’ বা ‘দমদমা’র অংশ ছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিক কাঠামো ও ‘বারো দুয়ারি’
পীরপাল গ্রামে একটি প্রাচীন স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে যা স্থানীয়ভাবে ‘বারো দুয়ারি’ নামে পরিচিত। এটি মূলত একটি পাথরের তৈরি প্রাচীন মসজিদ ছিল বলে ধারণা করা হয়। ১৮০৭ সালে ব্রিটিশ জরিপকারী স্যার ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিল্টন এই এলাকাটি পরিদর্শন করেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, বারো দুয়ারি কমপ্লেক্সের ভেতরে থাকা একটি উঁচু কবরই বখতিয়ার খলজির।
তবে বর্তমানে সেখানে একটি নতুন বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বারো দুয়ারির অদূরেই একটি খোলা চত্বরে দুটি কবর রয়েছে। স্থানীয় একটি সাইনবোর্ডে দাবি করা হয়েছে, দৃশ্যমান এই সমাধিটিই বখতিয়ার খলজির। অথচ প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, মূল কবরটি বারো দুয়ারি ঢিবির নিচেই চাপা পড়ে আছে।
অবহেলা ও বর্তমান দশা
যিনি বাংলার ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন, তাঁর সমাধি আজ চরম অযত্নে বিলীন হওয়ার পথে। পীরপাল গ্রামের সেই ঐতিহাসিক স্থানটি এখন ঝোপঝাড়ে পূর্ণ। কোনো সুনির্দিষ্ট সীমানা প্রাচীর নেই। বারো দুয়ারি মসজিদের খিলান ও কারুকাজ করা পাথরগুলো চুরি হয়ে যাচ্ছে কিংবা মাটির নিচে চাপা পড়ছে। ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ (ASI) স্থানটিকে সংরক্ষিত হিসেবে তালিকাভুক্ত করলেও মাঠ পর্যায়ে সংস্কারের কোনো চিহ্ন চোখে পড়ে না। পর্যটকদের জন্য কোনো দিকনির্দেশনা বা ইতিহাস সংবলিত বোর্ডও সেখানে নেই।
স্থানীয় লোকবিশ্বাস - মাটিতে ঘুমানোর সেই অদ্ভুত রীতি
বখতিয়ার খলজিকে কেন্দ্র করে পীরপাল ও আশেপাশের গ্রামগুলোতে এক অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর লোকবিশ্বাস শত শত বছর ধরে টিকে আছে। স্থানীয়দের কাছে তিনি কেবল একজন যোদ্ধা নন, বরং একজন ‘গাজী’ বা অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন পীর।
এখানকার মানুষ বিশ্বাস করেন, বখতিয়ার খলজি মাটির নিচে পরম শান্তিতে শুয়ে আছেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কিংবা অলৌকিক কোনো ভয়ে এই অঞ্চলের অনেক মুসলিম পরিবার আজও বাড়িতে খাট, পালঙ্ক বা উঁচু কোনো চৌকি ব্যবহার করেন না। তাঁরা মেঝেতে শীতলপাটি বা চাদর বিছিয়ে ঘুমান। এমনকি ধনাঢ্য পরিবারগুলোও এই রীতি মেনে চলে। তাঁদের বিশ্বাস, মাটির ওপর খাট ব্যবহার করলে বখতিয়ার খলজি অসন্তুষ্ট হতে পারেন। এই লোকতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যটি বখতিয়ারের সমাধিকে ঘিরে এক বিশেষ মরমি আবহ তৈরি করেছে।
ইতিহাসের দায় ও সংরক্ষণ
বখতিয়ার খলজি কোনো দেবদূত ছিলেন না, আবার কেবল একজন ধ্বংসকারীও ছিলেন না; তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের একজন সফল সমরনায়ক। তাঁর আগমনের ফলেই বাংলা বিশ্বের দরবারে এক নতুন রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে পরিচিতি পায়। গঙ্গারামপুরের এই অবহেলিত সমাধিটি কেবল একটি কবরের ধ্বংসাবশেষ নয়, এটি ৮০০ বছরের পুরনো এক ঐতিহ্যের সাক্ষী।
সরকারের উচিত পীরপাল গ্রামের এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে সংস্কার করে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা এবং সঠিক খননকার্যের মাধ্যমে বখতিয়ারের প্রকৃত সমাধিটি শনাক্ত করা। ইতিহাসকে ধুলোয় মিশে যেতে দিলে জাতির শিকড় আলগা হয়ে পড়ে। বখতিয়ার খলজির সমাধিটি আজ সংস্কারের দাবি রাখে যাতে আগামী প্রজন্ম জানতে পারে, বাংলার ইতিহাসের এই বিশাল রূপান্তরের নায়ক কোথায় নিভৃতে শুয়ে আছেন।




















