বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট, ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনা ও জ্বালানি রূপান্তর

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট, ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনা ও জ্বালানি রূপান্তর

একুশ শতকের বিকাশমান অর্থনীতির যুগে যেকোনো রাষ্ট্রের জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং সামগ্রিক সামাজিক জীবনযাত্রার মান নির্ধারণে ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’ (Energy Security) মৌলিক শর্ত হিসেবে কাজ করে। দক্ষিণ এশিয়ার বিকাশমান অর্থনীতির অন্যতম উদীয়মান শক্তি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই জ্বালানি নিরাপত্তার মূল ভিত্তিপ্রস্তর গড়ে উঠেছে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর। গত চার দশক ধরে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, ভারী ও ক্ষুদ্র শিল্পকারখানা, বস্ত্র ও পোশাক খাত, সার কারখানা এবং গৃহস্থালি রান্নার কাজে প্রাকৃতিক গ্যাসই ছিল প্রাথমিক ও প্রধান প্রাথমিক জ্বালানি (Primary Energy Source)।

তবে সময়ের বিবর্তনে বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক ও ভয়াবহ জ্বালানি মোড় বা ট্রানজিশন পয়েন্টে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে দেশের অর্থনৈতিক পরিধি সম্প্রসারণের সাথে সাথে বিদ্যুৎ ও শিল্পের গ্যাসের চাহিদা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্রগুলোর প্রাকৃতিক মজুত আশঙ্কাজনক হারে ফুরিয়ে আসছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে দীর্ঘদিনের নীতিগত স্থবিরতা, গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানের অভাব এবং শুধুমাত্র তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) আমদানির ওপর অতিরিক্ত অন্ধ-নির্ভরতা দেশের পুরো জ্বালানি খাতকে এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

দৈনিক উৎপাদনে বিশাল ঘাটতি, বিশ্ববাজার থেকে চড়ামূল্যে এলএনজি কেনার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চোখধাঁধানো চাপ এবং তার জেরে বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সব মিলিয়ে এটি আর কেবল কোনো একক ‘জ্বালানি খাত’-এর সমস্যা নয়, বরং এটি এখন বাংলাদেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক টেকসইতার জন্য চরম হুমকি। এই বিস্তৃত নিবন্ধে আমরা অনুসন্ধানী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করব বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের বর্তমান মজুত, উৎপাদন হ্রাসের সুনির্দিষ্ট কারণ, আমদানিনির্ভরতার বহুমুখী প্রভাব, অফশোর ও অনশোর ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনা এবং সংকট উত্তরণে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী টেকসই রূপরেখা।

বাংলাদেশের প্রাক-ঐতিহাসিক ও বর্তমান গ্যাস মজুত

ভূ-তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে পরিচিত 'বেঙ্গল বেসিন' (Bengal Basin) বা একটি অতি গভীর হাইড্রোকার্বন সমৃদ্ধ পলি অববাহিকার ওপর অবস্থিত। সুরমা অববাহিকা থেকে শুরু করে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তলদেশ পর্যন্ত সুপ্রাচীন নদীব্যবস্থার মাধ্যমে কোটি কোটি বছর ধরে জমে থাকা পলি ও জৈব পদার্থ বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছিল প্রমিজিং প্রাকৃতিক গ্যাস।

ঐতিহাসিক মাইলফলক ও আবিষ্কৃত মজুত

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের আনুষ্ঠানিক ইতিহাসের যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৫ সালে সিলেট (হরিপুর)-এ প্রথম বাণিজ্যিক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের মাধ্যমে। এরপর থেকে গত সাত দশকে দেশে মোট ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি ক্ষেত্র বর্তমানে সচল বা উৎপাদনশীল অবস্থায় রয়েছে এবং অবশিষ্ট ৯টি ক্ষেত্র প্রেশার কমে যাওয়া, অর্থনৈতিকভাবে লোকসান বা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।

রাষ্ট্রীয় সংস্থা পেট্রোবাংলার (Petrobangla) হালনাগাদ ভূ-তাত্ত্বিক সমীক্ষা ও সার্বিক তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী:

মোট প্রাক্কলিত ও প্রমাণিত মজুত (2P Reserves): দেশে মোট আবিষ্কৃত প্রমাণিত ও সম্ভাব্য গ্যাসের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮.৭৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (TCF)

ইতিমধ্যে উত্তোলিত গ্যাস: ১৯৫৫ সাল থেকে শুরু করে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত প্রায় ২০.৩৩ টিসিএফ গ্যাস ইতিমধ্যে ব্যবহার ও নিঃশেষ করা হয়ে গেছে।

বর্তমান অবশিষ্ট নিট মজুত: বর্তমানে আমাদের হাতে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৮.৪৬ টিসিএফ বা তার কাছাকাছি পরিমাণ গ্যাস।

অবশিষ্ট ৮.৪৬ টিসিএফ গ্যাসের আয়ুষ্কাল কতদিন?

সাধারণ হিসাব মতে, বর্তমানে দেশে দৈনিক অভ্যন্তরীণ উৎপাদন হারের (দৈনিক প্রায় ২,০০০-২,০৮০ মিলিয়ন ঘনফুট) সাথে যদি মোট বার্ষিক চাহিদা ও আমদানিকৃত এলএনজির পরিমাণ হিসাব করা হয়, তবে ৮.৪৬ টিসিএফ গ্যাস বড়জোর আগামী ৮ থেকে ১০ বছর সরবরাহ করা সম্ভব। অর্থাৎ, নতুন কোনো বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত ও জাতীয় গ্রিডে যুক্ত না হলে ২০৩৫ সালের আগেই দেশীয় গ্যাস উৎপাদন শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসবে।

বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র: একক নির্ভরশীলতা ও চরম ঝুঁকির ছায়া

বাংলাদেশের পুরো গ্যাস ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো একক কতিপয় বড় ক্ষেত্র, বিশেষ করে হবিগঞ্জের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র (Bibiyana Gas Field)-এর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা।

আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি শেভরন (Chevron) পরিচালিত বিবিয়ানা ক্ষেত্র থেকে একাই দৈনিক উৎপাদিত হয় প্রায় ১,২৩২ মিলিয়ন ঘনফুট (MMCFD) গ্যাস। এটি দেশের মোট দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৬০%

তবে ভূ-তাত্ত্বিক রিপোর্ট সতর্ক করছে যে, বিবিয়ানার প্রেশারও দ্রুত কমছে এবং এর অবশিষ্ট মজুত ১ টিসিএফ-এর নিচে নেমে এসেছে। কোনো কারণে বিবিয়ানায় কারিগরি বিপর্যয় বা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক উৎপাদন বন্ধ হলে পুরো দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাত মুহূর্তে স্থবির হয়ে পড়বে।

প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন হ্রাসের মনস্তত্ত্ব ও কারিগরি কারণ

বাংলাদেশের গ্যাস সংকট হঠাৎ করে একদিনে তৈরি হয়নি। এটি গত দেড় থেকে দুই দশকের নীতিগত অবহেলা, অনুসন্ধানে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর অতিরিক্ত ব্যবহারের এক অবধারিত পরিণতি।

প্রাকৃতিক অবক্ষয় (Natural Depletion Rate)

যেকোনো হাইড্রোকার্বন রিজার্ভারের একটি নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল থাকে। বছরের পর বছর টানা অতিরিক্ত টানে গ্যাস তোলার কারণে মূল রেজোভায়ারের চাপ (Reservoir Pressure) আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।

হবিগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্র: একসময় হবিগঞ্জের মূল মজুত ধরা হয়েছিল ২,৬৪৭ বিলিয়ন ঘনফুট (BCF)। অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে বর্তমানে এর উৎপাদন এতই কমেছে যে, ৯৯% মজুতই নিঃশেষিত হয়ে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ১২ বিলিয়ন ঘনফুট।

মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্র: প্রায় একই চিত্র মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্রে, যা এখন পুরোপুরি নিঃশেষের দ্বারপ্রান্তে।

তিতাস ও বাখরাবাদ: দেশের অন্যতম প্রধান ও প্রাচীন ক্ষেত্র তিতাস ও বাখরাবাদেরও ড্রপ-ডাউন প্রেশার ঠেকাতে এখন কম্প্রেসর বসিয়ে কোনোমতে গ্যাস টানতে হচ্ছে।

উৎপাদন বনাম চাহিদার বিশাল ব্যবধান

২০১৫ সালে যেখানে দেশে দৈনিক দেশীয় গ্যাস উৎপাদন হতো প্রায় ২,৭০০ এমএমসিএফডি (MMCFD), ২০২৪-২৫ সালে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২,০৮০ এমএমসিএফডি-তে। অর্থাৎ গত এক দশকে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমেছে প্রায় ২৫%।

অন্যদিকে, শিল্পায়ন ও বিদ্যুতের চাহিদার কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রাক্কলিত মোট দৈনিক গ্যাসের চাহিদা দাঁড়িয়েছে ৩,৭৭৭ এমএমসিএফডি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৩,৯৯০ এমএমসিএফডি। বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন (২,০৮০ এমএমসিএফডি) ও আমদানিকৃত এলএনজি (প্রায় ৩৭০-৬০০ এমএমসিএফডি) মিলে গড়ে সর্বমোট সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে ২,৪৫০ থেকে ২,৭০০ এমএমসিএফডি। ফলে প্রতিদিন ১,৩০০ থেকে ১,৫০০ এমএমসিএফডি গ্যাসের প্রকাণ্ড ঘাটতি থেকে যাচ্ছে, যা শিল্পে তীব্র 'লোডশেডিং' ও গ্যাস সংকটের মূল কারণ।

এলএনজি (LNG) আমদানিনির্ভরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর 'নীরব মহামারী'

অভ্যন্তরীণ উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার সহজ সমাধান হিসেবে বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সাল থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি (Liquefied Natural Gas) আমদানির সহজ কিন্তু মারাত্মক ব্যয়বহুল পথে পা বাড়ায়। মধ্যপ্রাচ্যের কাতার (QatarEnergy) ও ওমান (OQ Trading)-এর সাথে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক খোলা বাজার বা 'স্পট মার্কেট' (Spot Market) থেকে এলএনজি কেনা শুরু হয়।

অবিশ্বাস্য মূল্য পার্থক্য ও রিজার্ভের ওপর চাবুক: দেশীয় গ্যাসের প্রতি ঘনমিটার উত্তোলন ও সরবরাহ খরচ যেখানে মাত্র ৩ টাকা, সেখানে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করা এলএনজির ল্যান্ডিং কস্ট বা পুনঃরূপান্তর খরচ পড়ে প্রতি ঘনমিটারে সর্বনিম্ন ৫৫ টাকা (স্পট মার্কেটে যা চরম অস্থিরতার সময় ২০০ টাকাও ছাড়িয়ে যায়)।

২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ কাতার, ওমান ও স্পট মার্কেট থেকে সর্বমোট ৫.০৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন এলএনজি আমদানি করে। কেবল এই পরিমাণ এলএনজি আমদানির বিল মেটাতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে খরচ করতে হয় ৪,৫৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৪৫,০০০ কোটি টাকার বেশি)।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও স্পট মার্কেটের চরম অস্থিরতা: ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ান পাইপলাইন গ্যাস ছেড়ে আন্তর্জাতিক এলএনজি মার্কেটে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর ফলে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম রাতারাতি লাফিয়ে ওঠে।

২০২০ সালে যেখানে স্পট এলএনজির দাম ছিল প্রতি মিলিয়ন বিটিইউ (MMBtu) মাত্র ২ মার্কিন ডলার, ২০২১-২২ সালে তা রেকর্ড ভেঙে দাঁড়ায় ৫৬ ডলারে! এই মাত্রাতিরিক্ত দরবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ খোলা বাজার থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়, যার ফলে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে মারাত্মক গ্যাস বিপর্যয় দেখা দেয়।

ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিদ্যুৎ খাতের সিস্টেমিক ক্ষতি: বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (BPDB) তথ্যমতে, ২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে ২২,৪৮২ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও, গ্যাসের অভাবে বহু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসিয়ে রাখতে হয়েছিল। ফলে জাতীয় উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৬৬% ব্যবহার করা সম্ভব হলেও, বেসরকারি ও বিদেশি আইপিপি (IPP) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে চুক্তি অনুযায়ী হাজার হাজার কোটি টাকার ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ (Capacity Charge) গুণতে হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের ওপর এক বিশালাকার ভর্তুকির বোঝা চেপে দিয়েছে।

বাংলাদেশের গ্যাস খাতের একনজরে পরিসংখ্যান

নিচে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের বর্তমান ক্ষেত্র, মজুত, উৎপাদন, আমদানির ব্যয় এবং চাহিদার সামগ্রিক চিত্র একটি সংকলিত সারণীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

সূচক ও খাতের বিবরণ

ঐতিহাসিক/পূর্বতন তথ্য

বর্তমান সাময়িক পরিসংখ্যান (২০২৪-২৫)

ভবিষ্যৎ প্রাক্কলন ও মন্তব্য

মোট আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র

২৮টি (২০২৩ পর্যন্ত)

২৯টি (সিলেটের নতুন তেল-গ্যাসসহ)

নতুন অনুসন্ধানে সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

উৎপাদনশীল সচল গ্যাসক্ষেত্র

২৬টি (অতীতের সর্বোত্তম সময়)

২০টি

৯টি ফিল্ড প্রেশার কমে বন্ধ বা নিষ্ক্রিয়।

মোট প্রমাণিত ও সম্ভাব্য মজুত (2P)

২৮.৭৯ টিসিএফ

২৮.৭৯ টিসিএফ

মোট ঐতিহাসিক আবিষ্কৃত প্রাথমিক সঞ্চয়।

ইতিমধ্যে উত্তোলিত গ্যাসের পরিমাণ

১৫.৫০ টিসিএফ (২০১৫ পর্যন্ত)

২০.৩৩ টিসিএফ

মোট মজুতের প্রায় ৭০%-এর বেশি ইতিমধ্যে শেষ।

অবশিষ্ট নিট উত্তোলনযোগ্য মজুত

১৩.২৯ টিসিএফ (২০১৫)

৮.৪৬ টিসিএফ

বর্তমান হারে ব্যবহার করলে ৮-১০ বছরে নিঃশেষ হবে।

দৈনিক দেশীয় গ্যাস উৎপাদন

২,৭০৮ এমএমসিএফডি (২০১৫)

২,০৮০ এমএমসিএফডি

প্রধান প্রধান প্রধান ক্ষেত্রগুলোর প্রাকৃতিক ক্ষয় প্রাপ্তি।

দৈনিক মোট গ্যাসের জাতীয় চাহিদা

৩,০০০ এমএমসিএফডি (২০২০)

৩,৭৭৭ এমএমসিএফডি

২০২৫-২৬ সালে চাহিদা দাঁড়িয়ে প্রায় ৩,৯৯০ এমএমসিএফডি।

দৈনিক আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহ

০ এমএমসিএফডি (২০১৭ এর আগে)

৩৭০ - ৬০০ এমএমসিএফডি

মহেশখালীর ২টি ভাসমান FSRU টার্মিনালের মাধ্যমে।

দৈনিক নিট গ্যাস সরবরাহ ঘাটতি

৩০০-৫০০ এমএমসিএফডি

১,৩০০ - ১,৫০০ এমএমসিএফডি

শিল্পে লোডশেডিং ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার প্রধান কারণ।

উত্তোলন/আমদানি প্রতি ঘনমিটার খরচ

দেশীয় গ্যাস: ~৩ টাকা

আমদানিকৃত এলএনজি: ৫৫ থেকে ২০০ টাকা

বিপুল ভ্যালু গ্যাপ যা জাতীয় রিজার্ভ খালি করছে।

এলএনজি ও জলবায়ু সংকট: পরিবেশগত ও মিথেন ট্র্যাপ

বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক খতিয়ানের বাইরে গিয়ে এলএনজি আমদানির আরও একটি অন্ধকার ও ধ্বংসাত্মক দিক রয়েছে, তা হলো পরিবেশগত বিপর্যয় এবং মিথেন নির্গমন (Methane Emissions)

মিথেন গ্যাস ও গ্লোবাল ওয়ার্মিং: যদিও প্রাকৃতিক গ্যাসকে কয়লা বা অপরিশোধিত তেলের চেয়ে 'তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন' (Cleaner Fossil Fuel) হিসেবে বাজারজাত করা হয়, কিন্তু প্রযুক্তিগত সত্য হলো প্রাকৃতিক গ্যাসের ৯৫% এর বেশি উপাদানই হলো মিথেন। আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্যানেল (IPCC)-এর মতে, বায়ুমণ্ডলে মিথেন গ্যাসের তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা (Global Warming Potential) কার্বন ডাই অক্সাইডের চেয়ে ২০ বছরের সময়সীমার স্কেলে অন্তত ৮৬ গুণ বেশি!

এলএনজি সাপ্লাই চেইনের কার্বন ফুটপ্রিন্ট: কূপ থেকে দেশীয় পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের চেয়ে এলএনজির প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিলাকার ও পরিবেশবান্ধব নয়। প্রাকৃতিক গ্যাসকে মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় প্রচণ্ড চাপে কৃত্রিমভাবে ঠান্ডা করে তরল বানাতে বিপুল পরিমাণ শক্তি খরচ হয়। এরপর তা বিশালাকার জাহাজে করে হাজার হাজার মাইল পরিবাহিত করে আবার ভাসমান টার্মিনালে (FSRU) গ্যাসে রূপান্তর করা হয়। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় যে 'মিথেন ভেন্টিং' ও 'ফ্লেয়ারিং' হয়, তা পৃথিবীর উষ্ণায়ন বাড়াতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ বিশ্ব জলবায়ু ফোরামে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর দাবি তুললেও, নিজস্ব এলএনজি আমদানি বাড়াতে গিয়ে অপ্রত্যক্ষভাবে বৈশ্বিক জলবায়ু দূষণের অংশীদার হচ্ছে।

বঙ্গোপসাগরের অব্যাখ্যিত রত্নভাণ্ডার ও অফশোর অনুসন্ধান

বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের সবচেয়ে করুণ বাস্তবতা হলো দেশ যখন গ্যাসের অভাবে হাহাকার করছে, ঠিক তখন দেশের পাশেই বঙ্গোপসাগরের তলদেশে পড়ে রয়েছে শত কোটি টিসিএফ গ্যাসের অফুরন্ত সম্ভাবনা!

সমুদ্রসীমা বিজয় এবং অব্যবহৃত সুযোগ: ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত (ITLOS)-এর মাধ্যমে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সাথে ঐতিহাসিক সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ তার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে (EEZ) প্রায় ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা লাভ করে।

ভূ-তাত্ত্বিক বিন্যাস অনুযায়ী সমুদ্রকে ২৬টি বা ২৭টি গভীর ও অগভীর অফশোর ব্লকে (Offshore Blocks) ভাগ করা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক সীমানা জয়ের এক দশকের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও, বাংলাদেশ এই অফশোর ব্লকে কার্যকর কোনো মাল্টি-ক্লায়েন্ট সেসমিক সার্ভে (Multi-Client Seismic Survey) বা আন্তর্জাতিক দরপত্র (PSC Bidding Round) আহ্বান করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

প্রতিবেশীদের সাফল্য বনাম বাংলাদেশের স্থবিরতা: যেখানে একই বঙ্গোপসাগরীয় অববাহিকা বা বেঙ্গল ফ্যান ব্যবহার করে মিয়ানমার তার ‘শেউই’ (Rakhine Basin / Shwe Project) গ্যাসক্ষেত্র থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করে চীনে রপ্তানি করছে, এবং ভারত তাদের 'কৃষ্ণা-গোসাওয়ারি' (KG Basin) অববাহিকা থেকে প্রচুর গ্যাস তুলে নিজেদের চাহিদা মেটাচ্ছে সেখানে সীমান্ত ঘেঁষা বাংলাদেশের ব্লকে কোনো কাজের কাজই হয়নি। অনুসন্ধানে এই স্থবিরতার নেপথ্যে ছিল আইওসি (IOC)-দের জন্য আকর্ষণীয় উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি (PSC) তৈরিতে ব্যর্থতা এবং অতিরিক্ত আমদানিনির্ভর আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি।

সংকট উত্তরণে সরকারের উদ্যোগ ও বিদ্যমান কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ

সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট চরম আকার ধারণ করায় বাংলাদেশ সরকার এবং পেট্রোবাংলা বেশ কিছু অনশোর (স্থলভাগ) অনুসন্ধান ও ওয়ার্কওভার প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বর্তমান উপদেষ্টাগণ এবং পেট্রোবাংলা সংকট মোকাবিলায় তিন স্তরের কৌশলপত্র বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন।

স্থলভাগে ড্রিলিং প্রজেক্ট (২০২৫-২৮)

পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (BAPEX) এবং বিদেশী ড্রিলিং ঠিকাদারদের মাধ্যমে ২০২৫-২৮ সালের মধ্যে প্রায় ৫০টি নতুন অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভার (Workover) কূপ খননের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

গভীর কূপ খনন (Deep Drilling): তিতাস, শ্রীকাইল, বাখরাবাদ, রশিদপুর ও মোবারকপুর ফিল্ডের গভীর স্তরে (৪,০০০ থেকে ৫,০০০ মিটারের নিচে) ড্রিলিং করে অতিরিক্ত ১০০-১৫০০ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।

সিলেটের নতুন তেল-গ্যাস আবিষ্কার (২০২৩-২৪): সিলেট ১০ নম্বর কূপে ড্রিলিং চালিয়ে দৈনিক প্রায় ২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং ৫০০-৬০০ ব্যারেল তেল পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা গেছে, যা অনশোরে এখনো সম্ভাবনা থাকার প্রমাণ।

অফশোর পিএসসি (Offshore PSC 2024)

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকার অফশোর ব্লকগুলোর জন্য নতুন ও তুলনামূলক নমনীয় পিএসসি (Production Sharing Contract 2023/2024) অনুমোদন করেছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি (যেমন- ExxonMobil, Chevron, CNOOC, POSCO) গুলোকে বঙ্গোপসাগরের গভীর ও অগভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

পরিকাঠামোগত ও আমলাতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ

তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে বড় বাধাগুলো হলো:

বাপেক্সের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা: দেশের একমাত্র খননকারী সংস্থা বাপেক্সের পর্যাপ্ত গভীর ড্রিলিং রিগ (Rig) ও উচ্চ প্রযুক্তির অভাব রয়েছে।

দীর্ঘায়িত চুক্তি প্রক্রিয়া: অফশোর ব্লকে আজ কোনো বিদেশী কোম্পানি অনুসন্ধানের দায়িত্ব পেলেও, সেখান থেকে প্রথম ড্রপ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আসতে অন্তত ৭ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে। সুতরাং মধ্যমেয়াদী সংকট এতে তৎক্ষণাৎ মিটবে না।

সুরমা অববাহিকা থেকে উপকূলীয় ফোল্ড বেল্ট

বাংলাদেশের মোট ২৯টি আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রকে তাদের ভূ-তাত্ত্বিক গঠন (Stratigraphy & Tectonics) এবং ভৌগোলিক বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে মূলত তিনটি প্রধান ভূ-তাত্ত্বিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়:

সুরমা অববাহিকা (Surma Basin): এটি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (সিলেট, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া) অবস্থিত এবং বাংলাদেশের আবিষ্কৃত গ্যাস মজুতের ৮০%-এরও বেশির উৎস। মূলত মায়োসিন (Miocene Epoch) যুগের বেলেপাথর বা স্যান্ডস্টোন রেজার্ভায়ারে (Sandstone Reservoir) ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ মিটার গভীরতায় এসব গ্যাস সঞ্চিত রয়েছে।

ইস্টার্ন ফোল্ড বেল্ট (Eastern Fold Belt): পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সংলগ্ন কুমিল্লা-ফেনী অঞ্চল এই বেল্টের অন্তর্গত। এখানকার ভূ-গঠন ভাঁজযুক্ত (Anticline Structure)। বাখরাবাদ ও সাঙ্গু এই ভূ-গঠনের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

বেঙ্গল ফোরডিপ ও উপকূলীয় অঞ্চল (Bengal Foredeep & Coastal Zone): দক্ষিণের জেলাসমূহ এবং ভোলা দ্বীপ এলাকা এর অন্তর্ভুক্ত। ভোলার 'শাহবাজপুর' ও 'ভোলা উত্তর' ক্ষেত্র দুটি মূলত প্রথাবহির্ভূত ডেল্টা ফিল প্রসেসের অংশ, যা ভোলাকে ভূ-তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় করে তুলেছে।

সাঙ্গু অফশোর গ্যাসক্ষেত্রের দ্রুত পতন এবং তার থেকে অর্জিত শিক্ষা

বাংলাদেশের একমাত্র অফশোর (সমুদ্রস্থিত) বাণিজ্যিক গ্যাসক্ষেত্র ছিল ‘সাঙ্গু’ (ব্লক-১৬), যা চট্টগ্রাম উপকূল থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত।

সাঙ্গুর শিক্ষা ও নীতিগত ভুল:

অতিরিক্ত টান ও ভুল প্রাক্কলন: সাঙ্গু থেকে অতি দ্রুত বিপুল পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করায় রেজার্ভারের ভেতরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং কূপগুলোতে পানি ঢুকতে (Water Seepage) শুরু করে।

পরবর্তী পদক্ষেপের অভাব: ২০১৩ সালে সাঙ্গু পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পর বাংলাদেশ আর কোনো অফশোর কূপে ড্রিলিং পরিচালনা করেনি। সাঙ্গুর ব্যর্থতার ভয় দেখিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বঙ্গোপসাগরে অফশোর অনুসন্ধান প্রায় থমকে রাখা হয়েছিল, যা বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক কারণ।

খাতভিত্তিক গ্যাস ব্যবহারের শতকরা হার

বাংলাদেশে দৈনিক সরবরাহকৃত গ্যাসে কোন খাত কতটুকু অংশ ব্যবহার করে, তার একটি আনুপাতিক হিসাব নিচে দেওয়া হলো:

বিদ্যুৎ খাত (Power Sector): জাতীয় গ্রিডের অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যুৎ এখনও গ্যাসভিত্তিক পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে আসে।

শিল্প ও ক্যাপটিভ পাওয়ার (Industries & Captive Power): টেক্সটাইল, নিটওয়্যার, সিরামিক, রি-রোলিং ও স্টিল মিলগুলোতে সার্বক্ষণিক নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য নিজস্ব 'ক্যাপটিভ জেনারেটর' ব্যবহার করা হয়। গ্যাসের প্রেসার (PSI) কমে গেলে এসব রপ্তানিমুখী কারখানার অপূরণীয় ক্ষতি হয়।

সার কারখানা (Fertilizer Plants): ইউরিয়া সার তৈরির মূল কাঁচামাল হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। গ্যাসের অভাবে দেশের প্রধান প্রধান সার কারখানা (যেমন যমুনা, শাহজাজাল সার কারখানা) বছরের বড় একটি সময় বন্ধ রাখতে হয়, ফলে চড়ামূল্যে সার আমদানি করতে হয়।

ভোলা গ্যাসক্ষেত্রের 'স্ট্র্যান্ডেড গ্যাস' (Stranded Gas) বিতর্ক

ভোলা দ্বীপে আবিষ্কৃত ‘শাহবাজপুর’ এবং ‘ভোলা উত্তর’ গ্যাসক্ষেত্রে প্রায় ১.৫ থেকে ২ টিসিএফ গ্যাস মজুত রয়েছে। কিন্তু এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে কোনো কাজে আসছে না। একে প্রযুক্তিগত ভাষায় 'স্ট্র্যান্ডেড গ্যাস' (Stranded Gas) বা বিচ্ছিন্ন গ্যাস বলা হয়।

যদি দ্রুত ভোলা থেকে মূল ভূখণ্ডে গভীর নদীর তলদেশ দিয়ে পাইপলাইন (HDD Method) স্থাপন করা যায়, তবে জাতীয় গ্রিডে অন্তত ২০০-৩০০ এমএমসিএফডি গ্যাস তৎক্ষণাৎ যুক্ত করা সম্ভব।

এলএনজি অবকাঠামোর কারিগরি সীমাবদ্ধতা ও এফএসআরইউ (FSRU) ঝুঁকি

আমদানিকৃত এলএনজিকে জাহাজে করে এনে গ্যাসে রূপান্তর (Regasification) করার জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি FSRU (Floating Storage and Regasification Unit) রয়েছে:

এক্সিলারেট এনার্জি FSRU: ক্ষমতা দৈনিক ৫০০ এমএমসিএফডি।
সামিট গ্রুপ FSRU: ক্ষমতা দৈনিক ৫০০ এমএমসিএফডি।

এফএসআরইউ-এর মূল কারিগরি সংকট:

ঘূর্ণিঝড় ও আবহাওয়া সংকট: বঙ্গোপসাগরে যখনই কোনো ট্রপিক্যাল সাইক্লোন বা তীব্র নিম্নচাপ সৃষ্টি হয় (যেমন ঘূর্ণিঝড় মোখা বা রিমাল), তখন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ভাসমান FSRU জাহাজগুলোকে গভীর সমুদ্রে সরিয়ে নিতে হয়। এর ফলে টানা ২ থেকে ৩ সপ্তাহ সারা দেশে এলএনজি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং শিল্প ও বিদ্যুতে মারাত্মক হাহাকার তৈরি হয়।

ল্যান্ড বেসড টার্মিনালের অভাব: ভাসমান টার্মিনালের পরিবর্তে যদি মহেশখালী বা পায়রায় একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল (Land-based LNG Terminal) নির্মাণ করা হতো, তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগেও দেশের গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব হতো।

গভীর সমুদ্রের ২৬টি ব্লক এবং নতুন অফশোর পিএসসি

বঙ্গোপসাগরের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে (EEZ) বাংলাদেশের মোট ২৬টি ব্লক রয়েছে:

অগভীর সমুদ্রের ব্লক (Shallow Water Blocks): ১১টি (SS-01 থেকে SS-11)
গভীর সমুদ্রের ব্লক (Deep Water Blocks): ১৫টি (DS-08 থেকে DS-22)

অতীতের পিএসসিগুলোতে গ্যাসের নির্ধারিত দাম অত্যন্ত কম থাকায় (প্রতি এমএমবিটিইউ ২.৫ থেকে ৩ ডলার) এক্সনমোবিল বা শেভরনের মতো বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো (IOC) গভীর সমুদ্রে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগে আগ্রহী হয়নি। নতুন পিএসসি-তে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সাথে গ্যাসের বিক্রয়মূল্য যুক্ত করায় বড় বিদেশি বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বাপেক্স (BAPEX)-এর সীমাবদ্ধতা ও পুনর্গঠন

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (BAPEX) ১৯৮৯ সালে গঠিত হওয়ার পর থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনশোর গ্যাসক্ষেত্র (যেমন- সুন্দলপুর, শ্রীকাইল, রূপগঞ্জ, ভোলা উত্তর) আবিষ্কার করেছে। তবে জাতীয় এই প্রতিষ্ঠানের সামনে বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে:

রিগ ও প্রযুক্তির স্বল্পতা: বাপেক্সের নিজস্ব খনন রিগ (Rig) সংখ্যা সীমিত এবং চার কিলোমিটারের বেশি গভীরে ড্রিল করার মতো আধুনিক প্রযুক্তি ও 'থ্রি-ডি সেসমিক ডাটা প্রসেসিং'-এর উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জনবলের অভাব রয়েছে।

আর্থিক সক্ষমতার অভাব: বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যেখানে একটি কূপ খননে ৫০-১০০ মিলিয়ন ডলার ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ করতে পারে, সেখানে বাপেক্সকে পুরোপুরি সরকারি বাজেটের ফান্ডিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়।

যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজন (Joint Venture): আন্তর্জাতিক মানের তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর সাথে বাপেক্সের যৌথ উদ্যোগে (JVC) কাজ করার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি, যাতে প্রযুক্তির হস্তান্তর ঘটে।

অনপ্রথাবহির্ভূত জ্বালানি সম্ভাবনা: সিবিএম (CBM) ও টাইট গ্যাস (Tight Gas)

ঐতিহ্যবাহী স্যান্ডস্টোন ছাড়াও বাংলাদেশে অনপ্রথাবহির্ভূত (Unconventional) জ্বালানির সুবিশাল সম্ভাবনা রয়েছে যা এখনও স্পর্শ করা হয়নি:

কোল বেড মিথেন (CBM): জয়পুরহাটের জামালগঞ্জসহ উত্তরবঙ্গের কয়লা ক্ষেত্রগুলোর হাজার ফুট গভীরে কোটি কোটি টন কয়লা সঞ্চিত রয়েছে। এই কয়লার স্তর থেকে সরাসরি মিথেন গ্যাস (CBM) বের করে আনার প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

টাইট গ্যাস (Tight Gas): বিদ্যমান তিতাস বা বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের ৫,০০০ মিটারেরও বেশি গভীরে 'টাইট শিলাস্তর' রয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত চাপে গ্যাস আটকে আছে। উন্নত 'হাইড্রোলিক ফ্র্যাকচারিং' (Hydraulic Fracturing) প্রযুক্তির সাহায্যে এই গ্যাস বের করা সম্ভব।

বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকট থেকে রক্ষা করতে এবং আগামী এক দশকের মধ্যে জ্বালানি খাতকে স্থিতিশীল করতে হলে নিচের ৩টি ধাপে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি রোডম্যাপ: নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আইইপিএমপি (IEPMP 2023)

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হলে শুধু গ্যাসের ওপর নির্ভর করে থাকা যাবে না; বরং দেশের জ্বালানি মিশ্রে (Energy Mix) আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।

Integrated Energy and Power Master Plan (IEPMP 2023)

সরকারের হালনাগাদ মাস্টারপ্ল্যান (IEPMP)-এ দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:

নবায়নযোগ্য জ্বালানি (Renewable Energy): ২০৫০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ৪০% আসবে পরিবেশবান্ধব সৌর (Solar), বায়ু (Wind) ও জলবিদ্যুৎ থেকে।

গ্যাসের যৌক্তিক ব্যবহার: ২০৫০ সাল পর্যন্ত দেশের সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার মূল বেসব্যান্ড (Base load) হিসেবে গ্যাস অন্তত ৩০% ভূমিকা রাখবে। তবে তা হতে হবে প্রধানত দক্ষ শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে, বাসাবাড়িতে এলপিজি (LPG) দিয়ে প্রতিস্থাপন করার মাধ্যমে।

জ্বালানি রূপান্তরের তিনটি সুনির্দিষ্ট স্তম্ভ

সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ (Rooftop & Utility Scale Solar): বাংলাদেশে জমি স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও শিল্পকারখানার বিশাল ছাদ ব্যবহার করে 'রূফটপ সোলার' (Net Metering) চালুর মাধ্যমে দিনে কয়েক হাজার মেগাওয়াট গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুতের চাহিদা কমানো সম্ভব।

গ্যাস অপচয় ও চুরি রোধ: প্রাক্কলন অনুযায়ী, সিস্টেম লস, অবৈধ সংযোগ এবং বাসাবাড়িতে অপরিকল্পিত বার্নার ব্যবহারের কারণে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গ্যাস অপচয় হয়। শতভাগ প্রি-পেইড গ্যাস মিটার স্থাপন দ্রুত সম্পাদন করা জরুরি।

আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা (Regional Power Grid): প্রতিবেশী নেপাল ও ভূটান থেকে জলবিদ্যুৎ এবং ভারত থেকে ক্রস-বর্ডার গ্রিডের মাধ্যমে সরাসরি বিদ্যুৎ আমদানি করে গ্যাস ক্ষেত্রের ওপর সাময়িক চাপ কমানো সম্ভব।

বিশিষ্ট গবেষকদের মতামত ও নীতি-পরামর্শ

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে দেশের শীর্ষস্থানীয় ভূ-তত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতামত অত্যন্ত স্পষ্ট ও দিকনির্দেশনামূলক।

"বাংলাদেশে গ্যাস সংকট কোনো প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা নয়; এটি মূলত অনুসন্ধানে গতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির অভাব এবং পলিসি ফেলিউরের ফল। আমাদের ভূমিতে এবং সমুদ্রে এখনও প্রচুর গ্যাস লুকিয়ে রয়েছে। আমদানির সহজ কিন্তু আত্মঘাতী পথ ছেড়ে যদি আমরা সমুদ্রে আন্তর্জাতিক কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাপক অনুসন্ধানে নামি এবং বাপেক্সকে শক্তিশালী করি, তবে বাংলাদেশ আবারও নিজস্ব গ্যাসে স্বাবলম্বী হতে পারবে।" - অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদদের যৌথ মতানুসারে সংকট উত্তরণে অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপরূপরেখা বাস্তবায়ন করতে হবে:

জরুরি অফশোর ড্রিলিং: বিলম্ব না করে বঙ্গোপসাগরের অফশোর ব্লকগুলোতে দ্রুত আইওসি-দের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকমানের ২ডি ও ৩ডি সেসমিক সার্ভে সম্পন্ন করা।

গভীর অনশোর অনুসন্ধান: প্রথাগত ৩,০০০-৩,৫০০ মিটার গভীরতার নিচে নেমে ৪,৫০০-৫,৫০০ মিটার গভীরতায় 'টাইট গ্যাস' (Tight Gas) অনুসন্ধানে ড্রিলিং পরিচালনা করা।

এলএনজি চুক্তিতে বিচক্ষণতা: খোলা বাজার বা স্পট মার্কেটের অনিশ্চিত দরের ওপর নির্ভর না করে যৌক্তিক দীর্ঘমেয়াদী (Long-term Contract) হেজিং চুক্তির সংখ্যা বাড়ানো।

শক্তির অপচয় বন্ধ: তিতাস, বাখরাবাদ ও জালালাবাদ গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থার আওতাধীন সমস্ত শিল্প ও আবাসিক গ্রাহককে শতভাগ স্মার্ট প্রি-পেইড মিটারের আওতায় এনে সিস্টেম লস শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা।

একুশ শতকের টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার প্রত্যয়

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট আমাদের সাময়িক এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই সংকট একই সাথে আমাদের সামনে সুযোগ এনে দিয়েছে নিজেদের ঐতিহাসিক নীতিগত ভুল শুধরে নিয়ে এক নতুন, আধুনিক ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার।

কেবলমাত্র আমদানিকৃত অতি-ব্যয়বহুল এলএনজির ওপর ভিত্তি করে একটি বিকাশমান দেশের শিল্প খাত, পোশাক শিল্প ও রপ্তানি বাণিজ্য দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। বিশ্ববাজারে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা যে মুহূর্তে যেকোনো জ্বালানি পণ্যের দামকে বাড়িয়ে দিতে পারে, সে মুহূর্তে অভ্যন্তরীণ আত্মনির্ভরশীলতাই জাতীয় নিরাপত্তার একমাত্র গ্যারান্টি।

বঙ্গোপসাগরের বিশাল অববাহিকা এবং আমাদের দেশের মাটির গভীরে ঘুমিয়ে থাকা না-আবিষ্কৃত গ্যাস সম্পদকে প্রজ্ঞা, প্রযুক্তি এবং সঠিক রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে উদ্ধার করতে হবে। একই সাথে, নবায়নযোগ্য সৌর ও বায়ুশক্তি ব্যবহারের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে একটি সমন্বিত জ্বালানি ব্যবস্থা (Integrated Energy Mix) নিশ্চিত করতে হবে। তবেই ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও জ্বালানি-নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, Gas Outlook, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.