ফুরিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত?
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও শিল্প উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং গৃহস্থালি কাজে গ্যাসের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত দ্রুত হ্রাস এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ একটি গুরুতর জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি এবং এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই লেখায় আমরা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত এর বর্তমান অবস্থা, উৎপাদন হ্রাসের কারণ, আমদানিনির্ভরতার প্রভাব এবং এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপগুলো বিশ্লেষণ করব।
প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত বর্তমান অবস্থা
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রথম বাণিজ্যিক আবিষ্কার হয় ১৯৫৫ সালে সিলেটে। তখন থেকে দেশে মোট ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, যার মধ্যে ২০টি বর্তমানে উৎপাদনশীল। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের প্রমাণিত প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত ছিল ২৮.৭৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ), যার মধ্যে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ২০.৩৩ টিসিএফ উত্তোলন করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে অবশিষ্ট মজুত মাত্র ৮.৪৬ টিসিএফ। এই পরিমাণ গ্যাস বর্তমান চাহিদা এবং উৎপাদনের হার বিবেচনায় প্রায় ৮-১০ বছরের জন্য যথেষ্ট।
বাংলাদেশের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র হচ্ছে হবিগঞ্জ জেলার বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র, যেখান থেকে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১,২৩২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হয়, যা দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৬০%। তবে এই গ্যাসক্ষেত্রের মজুতও দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বিবিয়ানায় আরও প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত থাকতে পারে, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদী চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট নয়।
প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন হ্রাস
বাংলাদেশের গ্যাস উৎপাদন গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০১৫ সালে দেশের দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ছিল প্রায় ২,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি), যা ২০২৩ সালে নেমে এসেছে ২,০৮০ এমএমসিএফডি তে। এটি ২০১২ সালের তুলনায় ৫.২৬% কম। এই হ্রাসের প্রধান কারণ হলো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর প্রাকৃতিক মজুতের ক্ষয় এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে ব্যর্থতা। হবিগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রের মূল মজুত ২,৬৪৭ বিলিয়ন ঘনফুট থেকে মাত্র ১২ বিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে যা ৯৯% হ্রাস। একইভাবে মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্র সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে গেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৭৭৭ এমএমসিএফডি, যা ২০২৫-২৬ সালে বেড়ে ৩,৯৯০ এমএমসিএফডি তে পৌঁছাবে। তবে বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন এবং আমদানিকৃত এলএনজি (লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস) মিলিয়ে মোট উৎপাদন মাত্র ২,৪৫০ এমএমসিএফডি, যার মধ্যে ৩৭০ এমএমসিএফডি এলএনজি। এই বিশাল ঘাটতি দেশের জ্বালানি সংকটকে আরও তীব্র করছে।
গ্যাস আমদানি নির্ভরতা
গ্যাস মজুতের হ্রাস এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করে। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশটি কাতার, ওমান এবং স্পট মার্কেট থেকে ৫.০৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন এলএনজি আমদানি করে, যার মূল্য ছিল ৪,৫৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এলএনজির দাম দেশীয় গ্যাসের তুলনায় অনেক বেশি। যেখানে দেশীয় গ্যাসের প্রতি ঘনমিটার উৎপাদন খরচ প্রায় ৩ টাকা, সেখানে আমদানিকৃত এলএনজির খরচ ৫৫ টাকা বা তার বেশি। এই উচ্চ খরচ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভোজ্যতেল, চিনি এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর এলএনজির দাম বিশ্ববাজারে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। ২০২০ সালে এলএনজির দাম ছিল ২ মার্কিন ডলার প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ), যা ২০২১ সালের অক্টোবরে ৫৬ ডলারে পৌঁছে। এই মূল্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গৃহস্থালি খাতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে।
এছাড়া এলএনজি আমদানির উপর নির্ভরতা দেশের বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২২,৪৮২ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও ব্যবহারের হার ছিল মাত্র ৬৬%। এর ফলে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হয়েছে, যা অর্থনীতির উপর অতিরিক্ত বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবেশগত প্রভাব
প্রাকৃতিক গ্যাস তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হলেও এলএনজির ব্যবহার জলবায়ু পরিবর্তনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এলএনজি প্রধানত মিথেন নিয়ে গঠিত, যা কার্বন ডাই অক্সাইডের তুলনায় ২০ বছরে ৮৬ গুণ বেশি তাপ উৎপন্ন করে। এই পরিবেশগত প্রভাব বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সরকারের পদক্ষেপ ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ সরকার গ্যাস সংকট মোকাবিলায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের মতে, সরকার তিনটি কৌশল গ্রহণ করেছে। পেট্রোবাংলা পুরনো এবং পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্রে পুনঃখনন এবং গভীর কূপ খননের পরিকল্পনা করছে। মোবারকপুর, শ্রীকাইল, তিতাস, বাখরাবাদ এবং রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্রে গভীর কূপ খননের মাধ্যমে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থল ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর জন্য সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সিলেটে নতুন তেল ও গ্যাস মজুত আবিষ্কৃত হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন ৫০০-৬০০ ব্যারেল তেল এবং ২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার কক্সবাজারের মহেশখালীতে দ্বিতীয় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে, যা আমদানি সক্ষমতা বাড়াবে।
তবে এই পদক্ষেপগুলোর বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর (আইওসি) উপর নির্ভরতা এবং প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) এর জটিলতা অনুসন্ধান কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। দ্বিতীয়ত গত এক দশকে মাত্র একটি বিডিং রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা তিনটি গভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য ছিল। এই ধীরগতির অনুসন্ধান কার্যক্রম নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে বাধা সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশে গ্যাসের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক গঠন, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (ইইজেড), গ্যাস ও তেল মজুতের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। ভূতাত্ত্বিকদের মতে এই অঞ্চলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তম গ্যাস মজুত রয়েছে। ২০১২ ও ২০১৪ সালে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশের ইইজেডে ২৭টি অনুসন্ধান ব্লক উন্মুক্ত হয়েছে। তবে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং সুরক্ষাবাদী নীতির কারণে এই সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার করা যায়নি।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির কারণে। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। সরকারের ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যান (আইইপিএমপি) ২০২২ অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০% নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আসবে। তবে গ্যাস এখনও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩০% সরবরাহ করবে। এই লক্ষ্য অর্জনে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ বৃদ্ধি জরুরি।
বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব জোরদার করতে হবে। এছাড়াও গ্যাস চুরি ও অপচয় রোধে কঠোর নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমামের মতে, বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধানে গতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির অভাব রয়েছে। তিনি ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রমের উপর জোর দিয়েছেন।
উপসংহার
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে আগামী এক দশকের মধ্যে গ্যাস মজুত নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। আমদানিকৃত এলএনজির উপর নির্ভরতা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে একটি টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, Gas Outlook, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার




















