চীনে উইঘুর সংকট ও অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায় - বিচ্ছিন্নতাবাদ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব

চীনে উইঘুর সংকট ও অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায় - বিচ্ছিন্নতাবাদ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও পশ্চিমা সংবাদ শিরোনামের দিকে চোখ রাখলে সচরাচর মনে হতে পারে, গণচীন সরকার বোধহয় সামগ্রিকভাবে ইসলাম ধর্ম এবং সমস্ত মুসলিমদের বিরুদ্ধে এক চিরন্তন দমননীতি বা ক্রুসেড পরিচালনা করছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনকে প্রায়শই একটি "মুসলিমবিরোধী" বা "ইসলামবিরোধী" শক্তি হিসেবে রূপায়িত করা হয়।

কিন্তু বাস্তবতার গভীর ও বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধানে নামলে একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ ও বৈচিত্র্যময় চিত্র ফুটে ওঠে। চীন কেবল একটি একক মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ নয়; বরং এখানে অন্তত ১০টি প্রধান ও স্বীকৃত মুসলিম জাতিগোষ্ঠী (Ethnic Groups) শতাব্দী থেকে শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসছে।

প্রশ্ন ওঠে চীন যদি সত্যিই সব মুসলিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে থাকত, তবে দেশের সর্ববৃহৎ মুসলিম জাতিগোষ্ঠী 'হুই' (Hui) কিংবা অন্যান্য ক্ষুদ্র মুসলিম সম্প্রদায়গুলো কীভাবে বেইজিংয়ের রাজধানী থেকে শুরু করে সমগ্র চীনে শত শত বছর ধরে শান্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ধর্মপালন করে আসছে? কেন কেন্দ্রীয় বেইজিং সরকারের মূল নিরাপত্তা অভিযানের চোখ কেবল জিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলিমদের দিকেই নিবদ্ধ?

এই প্রশ্নের উত্তর কেবল ধর্মীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এর মূল প্রোথিত রয়েছে ভূ-রাজনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা, বিচ্ছিন্নতাবাদ, কৌশলগত খনিজ সম্পদ, বৈদেশিক শক্তির হস্তক্ষেপ এবং আধুনিক 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI)-এর সুরক্ষার মধ্যে। একজন নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে নিচে এই সংকট ও বেইজিংয়ের কৌশলের বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।

চীনের ১০টি মুসলিম জাতিগোষ্ঠী: জাতিগত ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য

চীনে সরকারীভাবে ৫৬টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা 'জাতীয় সংখ্যালঘু' (National Minorities) স্বীকৃত। এর মধ্যে অন্তত ১০টি জাতিগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে ইসলামের অনুসারী। এদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটির কাছাকাছি, যা বিশ্বের অনেক স্বাধীন মুসলিম দেশের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।

চীনে বিদ্যমান ১০টি মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

১. হুই (Hui): চীনের সর্ববৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠী (জনসংখ্যা ১ কোটির বেশি)। এরা মূলত চীনা ভাষায় (মান্দারিন) কথা বলে এবং শারীরিক অবয়বে হ্যন চায়নিজদের মতোই। এরা সমগ্র চীনের বিভিন্ন শহর ও নংশিয়া হুই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে।

২. উইঘুর (Uyghur): চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জাতিগোষ্ঠী (জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ)। এরা তুর্কি বংশোদ্ভূত এবং জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের আদি অধিবাসী। এদের ভাষা তুর্কি ভাষার গোত্রভুক্ত এবং স্ক্রিপ্ট আরবি বর্ণমালা ভিত্তিক।

৩. কাজাখ (Kazakh): জিনজিয়াংয়ের উত্তর সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী যাযাবর বংশোদ্ভূত তুর্কি মুসলিম।

৪. কিরগিজ (Kyrgyz): কাজাখদের মতোই পামির ও তিয়েন শান পর্বতমালার পাদদেশে বসবাসকারী তুর্কি বংশোদ্ভূত ঐতিহ্যবাহী মুসলিম।

৫. উজবেক (Uzbek): জিনজিয়াংয়ের শহরাঞ্চলে বসবাসকারী তুর্কি ভাষার আরেকটি ছোট মুসলিম সম্প্রদায়।

৬. তাতার (Tatar): ইউরোপীয় ও তুর্কি সংমিশ্রণে গঠিত অত্যন্ত শিক্ষিত ও ক্ষুদ্র এক মুসলিম জনগোষ্ঠী।

৭. তাজিক (Tajik): একমাত্র ফার্সি বা ইরানি ভাষাভিত্তিক সংমিশ্রণ থেকে আসা শিয়া-ইসমাঈলি মতাবলম্বী মুসলিম সম্প্রদায়, যারা পামির মালভূমি এলাকায় বাস করে।

৮. ডংশিয়াং (Dongxiang): গানসু ও নিংশিয়া অঞ্চলে বসবাসকারী মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম সম্প্রদায়।

৯. সালার (Salar): ছিংহাই ও গানসু প্রদেশে বসবাসকারী ওঘুজ তুর্কি বংশোদ্ভূত মুসলিম জনগোষ্ঠী।

১০. বোনান (Bonan): গানসু প্রদেশের একটি অতি ক্ষুদ্র মঙ্গোলীয় ভাষাভাষী মুসলিম সম্প্রদায়।

দ্য কেস অব 'হুই' (Hui): অনুগত ও একীভূত মুসলিম সম্প্রদায়

উইঘুর সংকট বোঝার জন্য প্রথমে হুই (Hui) মুসলিমদের অবস্থান বোঝা অপরিহার্য। হুই মুসলিমরা প্রমাণ করে যে, বেইজিংয়ের মূল সমস্যা ইসলাম ধর্মের সাথে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সাথে।

সাংস্কৃতিক সামঞ্জস্য ও 'চীনায়িত ইসলাম': হুই মুসলিমরা সিল্ক রোড ধরে আসা আরব, পার্সিয়ান ও তুর্কি বণিকদের সাথে স্থানীয় হ্যন চীনাদের সংমিশ্রণে সৃষ্ট এক জাতি। তারা পোশাক-আশাক, খাদ্যভ্যাস এবং ভাষায় সম্পূর্ণভাবে চীনা সংস্কৃতির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। তাদের মসজিদগুলোর স্থাপত্যশৈলী প্রাচীন চীনা প্যাগোডা ভবনের মতো, যা বাহ্যিকভাবে দেখলে কোনো তাওবাদী বা বৌদ্ধ মন্দিরের সাথে মিলে যায়।

ঐতিহাসিক আনুগত্য ও রাষ্ট্রীয় অংশীদারিত্ব: মিং ও ছিন রাজবংশ থেকে শুরু করে আধুনিক চীন প্রজাতন্ত্রের সময়ও হুই সামরিক কমান্ডার ও জেনারেলরা চীন সরকারের হয়ে যুদ্ধ করেছেন। ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (CCP) এবং কুওমিনতাং উভয়ের মিলিটারিতেই বিখ্যাত হুই মুসলিম জেনারেলরা (যেমন 'মা ক্লিন' বা Ma Clique) গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

হুই মুসলিমরা কখনোই বেইজিংয়ের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করেনি, কখনো চীনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন দেশের দাবি তোলেনি এবং কোনো সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়নি। ফলে, বেইজিং সরকার হুইদের নিজেদের "বিশ্বস্ত নাগরিক" মনে করে এবং তাদের মসজিদ, মাদ্রাসা ও হালাল ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা দেয় না।

উইঘুরদের স্বতন্ত্র পরিচিতি ও ইতিহাস: সংঘাতের মূল বীজ

হুইদের বিপরীত মেরুতে অবস্থান উইঘুর জনগোষ্ঠীর। উইঘুররা কোনোভাবেই নিজেদের চীনা সংস্কৃতির অংশ মনে করে না; বরং তারা নিজেদের সেন্ট্রাল এশিয়া বা মধ্য এশিয়ার ঐতিহাসিক তুর্কি সভ্যতার অংশ মনে করে।

'জিনজিয়াং' নামের ঐতিহাসিক মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত: উইঘুররা তাদের মাতৃভূমিকে বলে 'পূর্ব তুর্কিস্তান' (East Turkestan)। অন্যদিকে, আঠারো শতকে ছিন (Qing) রাজবংশ যখন এই অঞ্চলটিকে সাম্রাজ্যভুক্ত করে, তখন তারা এর নাম দেয় 'জিনজিয়াং' (Xinjiang) যার চীনা অর্থ হলো "নতুন সীমানা" বা "New Frontier"।

উইঘুরদের মতে, "জিনজিয়াং" নামটিই তাদের ওপর এক সাম্রাজ্যবাদী চাপানো নাম। ১৯৩৩ এবং ১৯৪৪ সালে রাশিয়ার সহায়তায় উইঘুররা দু'বার সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য স্বাধীন 'পূর্ব তুর্কিস্তান প্রজাতন্ত্র' গঠন করেছিল। কিন্তু ১৯৪৯ সালে মাও সে তুংয়ের পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA) রাজ রক্তপাত ছাড়াই এই অঞ্চলটিকে আধুনিক চীনের অধীনে নিয়ে আসে।

সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বিচ্ছিন্নতা: উইঘুররা মান্দারিন ভাষায় কথা বলে না; তাদের নিজস্ব তুর্কিভিত্তিক ভাষা রয়েছে। তারা উইঘুর আরবি স্ক্রিপ্টে লেখে। তাদের চেহারা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস ও রীতিনীতি মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান ও তুরস্কের সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত। এই নৃতাত্ত্বিক ও সামাজিক ফারাক তাদের মধ্যে একটি প্রখর "পৃথক জাতীয়তাবাদী চেতনা" জাগ্রত রাখে, যা পরবর্তীতে উগ্র বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম দিয়েছে।

বিচ্ছিন্নতাবাদ, সহিংসতা ও বেইজিংয়ের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট

নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মধ্য এশিয়ায় যখন কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তানের মতো স্বাধীন তুর্কি রাষ্ট্রগুলোর জন্ম হয়, তখন জিনজিয়াংয়ের উইঘুরদের মধ্যেও স্বাধীন 'পূর্ব তুর্কিস্তান' গড়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে।

সশস্ত্র আন্দোলনের উত্থান ও ETIM

এই সময় গড়ে ওঠে 'ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট' (ETIM) বা বর্তমানে যা 'তুর্কিস্তান ইসলামিক পার্টি' (TIP) নামে পরিচিত। এই সংগঠনটি একটি সশস্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে সহিংস পথ বেছে নেয়। জাতিসংঘ এবং একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ETIM-কে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল।

রক্তক্ষয়ী ঘটনাবলী ও বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু

২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে চীনের মূল ভূখণ্ড ও জিনজিয়াংয়ে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা ঘটে, যা বেইজিং সরকারের নিরাপত্তা ভাবনায় বড় আঘাত হানে:

২০০৯ সালের উরুমচি দাঙ্গা (Urumqi Riots): জিনজিয়াংয়ের রাজধানী উরুমচিতে হ্যন ও উইঘুরদের মধ্যে ভয়াবহ জাতিগত দাঙ্গায় ১৯৯ জন মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে সিংহভাগই ছিলেন সাধারণ হ্যন অসামরিক নাগরিক।

২০১৩ তিয়েনআনমেন স্কয়ার হামলা: বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক তিয়েনআনমেন স্কয়ারে পর্যটকদের ওপর গাড়ি তুলে দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, যার দায় নেয় উইঘুর বিচ্ছিন্নতাবাদীরা।

২০১৪ কুমিং ট্রেন স্টেশন হামলা: দক্ষিণ চীনের কুমিং রেলওয়ে স্টেশনে মাস্ক পরা উইঘুর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এলোপাতাড়ি চাপাতির হামলায় ৩১ জন সাধারণ যাত্রী নিহত এবং ১৪০ জনের বেশি আহত হন। বেইজিং এটিকে চীনের "৯/১১" হিসেবে আখ্যা দেয়।

এই চরমপন্থী হামলাগুলোর পর চীন সরকার উপলব্ধি করে যে, উইঘুরদের একাংশের এই সংঘাত কেবল কোনো আঞ্চলিক অসন্তোষ নয়, এটি চীনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অখণ্ডতার জন্য এক প্রত্যক্ষ হুমকি।

ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা: জিনজিয়াংয়ের অতুলনীয় গুরুত্ব

অনেকে প্রশ্ন তোলেন, উইঘুররা যদি আলাদা হতে চায়, তবে চীন কেন জিনজিয়াং ছেড়ে দিচ্ছে না? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে অঞ্চলটির অপার প্রাকৃতিক সম্পদ এবং আধুনিক চীনের অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে।

প্রাকৃতিক সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার

জিনজিয়াং প্রদেশের আয়তন সমগ্র চীনের ছয় ভাগের এক ভাগ (১৬ লাখ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি)। এটি আয়তনে প্রায় যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি তিনটির সম্মিলিত আয়তনের সমান।

তেল ও গ্যাস: চীনের মোট আবিষ্কৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ বা রিজার্ভের এক-তৃতীয়াংশ এবং খনিজ তেলের ৪০ শতাংশই রয়েছে জিনজিয়াংয়ে।

কয়লা ও বিরল খনিজ: চীনের কয়লা রিজার্ভের ৪০% এবং নবায়নযোগ্য সৌর প্যানেল ও ব্যাটারি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিরল খনিজ পলি-সিলিকনের সিংহভাগ জোগান দেয় এই অঞ্চল।

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) এবং CPEC-এর প্রবেশদ্বার

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের স্বপ্নের প্রজেক্ট 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI)-এর মূল প্রাণকেন্দ্র হলো জিনজিয়াং। চীন যদি সমুদ্রপথে যুদ্ধের মুখোমুখি হয় (যেমন প্রণালী বা Strait of Malacca অবরুদ্ধ হওয়া), তবে চীনের স্থলভাগের প্রধান বাণিজ্য পথ যাবে এই জিনজিয়াং দিয়েই।

জিনজিয়াংয়ের ঐতিহাসিক কাশগর (Kashgar) শহর থেকেই শুরু হয়েছে বহু বিলিয়ন ডলারের পাক-চীন অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC), যা চীনকে সরাসরি ভারত মহাসাগরে পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরের সাথে যুক্ত করেছে।

কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রই তার জিও-স্ট্র্যাটেজিক মূল কেন্দ্রবিন্দু এবং প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর ১৬ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বা বিদেশি ফান্ডের মাধ্যমে হাতছাড়া হতে দেবে না। এটি চীনের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

রাজকীয় আনুগত্য বনাম স্বায়ত্তশাসন: বেইজিংয়ের দমননীতির গতিপ্রকৃতি

জিনজিয়াংয়ে চীন যে কঠোর পদক্ষেপগুলো নিয়েছে যেমন ব্যাপক নজরদারি (Surveillance State), বায়োমেট্রিক ট্র্যাকিং, কারিগরি শিক্ষা ও পুনর্গঠন কেন্দ্র (Vocational Re-education Camps) সেগুলোর লক্ষ্য ও শিকার কারা?

রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের সমীকরণ: বেইজিংয়ের নীতি স্পষ্ট "তুমি যেকোনো ধর্মের অনুসারী হতে পারো, কিন্তু সবার আগে তোমাকে চাইনিজ নাগরিক হতে হবে এবং বেইজিংয়ের সার্বভৌমত্ব মেনে নিতে হবে।"

জিনজিয়াংয়ে যেসব উইঘুর মুসলিম বেইজিংয়ের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি অনুগত, রাজনীতি ও বিচ্ছিন্নতাবাদ থেকে দূরে থেকে সাধারণ কাজ বা ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন, তারা মূল ধারার অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন। অনেক উইঘুর বেইজিং ও সাংহাইয়ে রেস্তোরাঁ চালাচ্ছেন, সংস্কৃতি ও পর্যটনে কাজ করছেন এবং সেনাবাহিনীতে পর্যন্ত যোগ দিচ্ছেন।

সমস্যা সৃষ্টি হয় সেইসব অঞ্চল ও উইঘুর গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে, যারা এখনো তুরস্ক বা মধ্যপ্রাচ্যের কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠীর ফাণ্ডিংয়ে স্বাধীন 'পূর্ব তুর্কিস্তান' গঠনের সশস্ত্র সংঘাত টিকিয়ে রাখতে চাচ্ছে।

বিদেশ থেকে অর্থায়ন ও তুরস্কের ভূমিকা: উইঘুর আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিল তুরস্ক। ভৌগোলিক ও ভাষাগত মিল থাকায় উসমানীয় ধারার তুর্কি জাতীয়তাবাদীরা উইঘুরদের নিজেদের "ভাই" মনে করে। আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরে উইঘুর রাজনৈতিক শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে এবং 'প্যান-তুর্কিজম' ভাবধারায় ইন্ধন জুগিয়েছে।

তুরস্কের এই ভূমিকা বেইজিং অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে দেখেছে। ফলস্বরূপ, বেইজিং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে তুরস্ককে উইঘুর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদ দেওয়া থেকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে।

চীনের প্রধান প্রধান মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর তুলনামূলক সারণী

চীনের মুসলিম সংকট বোঝার সুবিধার্থে এবং প্রধান প্রধান জাতিগোষ্ঠীগুলোর রাষ্ট্রীয় অবস্থান ফুটিয়ে তুলতে নিচে একটি সংকলিত প্রামাণ্য সারণী প্রদান করা হলো:

জাতিগোষ্ঠী (Ethnic Group)

মূল ভাষা ও উৎপত্তি

প্রধান বাসস্থান / প্রদেশ

চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আনুগত্যের ইতিহাস

বেইজিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি

হুই (Hui)

মান্দারিন (চীনা); আরব-পার্সিয়ান ও হ্যন মিশ্রণ

নিংশিয়া, গানসু, সমগ্র চীনের প্রধান শহরগুলো

সম্পূর্ণ অনুগত; শত শত বছর ধরে চীনের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সাথে একীভূত

ঝুঁকিমুক্ত: শান্তিকামী অনুগত নাগরিক; মসজিদ ও সংস্কৃতি স্বায়ত্তশাসিত।

উইঘুর (Uyghur)

উইঘুর (তুর্কি গোত্রীয়); আরবি বর্ণমালা ব্যবহারকারী

জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল

ঐতিহাসিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাত; 'পূর্ব তুর্কিস্তান' আন্দোলনের ভিত্তি

উচ্চ ঝুঁকি: চরম নিরাপত্তা নজরদারি, ডি-র্যাডিক্যালাইজেশন ড্রাইভ।

কাজাখ (Kazakh)

কাজাখ (তুর্কি গোত্রীয়)

উত্তর জিনজিয়াং ও কাজাখস্তান সীমান্ত এলাকা

মূলত শান্তিকামী; তবে জাতিগত কারণে উইঘুর সংকটের কিছু প্রভাব রয়েছে

মধ্যম-কম ঝুঁকি: কাজাখস্তানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের স্বার্থে সতর্ক নীতি।

ডংশিয়াং (Dongxiang)

ডংশিয়াং (মঙ্গোলীয় গোত্রীয়)

গানসু ও ছিংহাই প্রদেশ

অনুগত; চীনা সংস্কৃতির সাথে ঐতিহাসিকভাবে মিশে গেছে

ঝুঁকিমুক্ত: কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বা রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস নেই।

সালার (Salar)

সালার (ওঘুজ তুর্কি গোত্রীয়)

ছিংহাই ও গানসু প্রদেশ

সম্পূর্ণ অনুগত; রাষ্ট্রীয় নীতি মেনে চলা সম্প্রদায়

ঝুঁকিমুক্ত: শান্তিপূর্ণ ধার্মিক জীবনযাপন ও ব্যবসার সুবিধা।

তাজিক (Tajik)

তাজিক (ইরানি/ফার্সি গোত্রীয়)

পামির মালভূমি, সীমান্তে অবস্থিত ত্যাশখুরগান

অত্যন্ত অনুগত; চীনা সীমান্তে নিরাপত্তার কাজে স্বেচ্ছায় নিয়োজিত

বিশেষ মিত্র: চীনা বর্ডার গার্ডদের সহযোগী হিসেবে অত্যন্ত বিশ্বস্ত।

'সিনিকাইজেশন' (Zhongguohua): সমাজতান্ত্রিক চীনায়করণের দর্শন

চীনের রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় কাঠামোর মূল দর্শন হলো 'সিনিকাইজেশন' (Sinicization) বা চীনা ভাষায় 'ঝুংগুওহুয়া' (中国化)। এর সহজ অর্থ হলো: চীনে প্রচলিত যেকোনো ধর্মকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে চীনা সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং কমিউনিস্ট পার্টির অনুশাসনের সাথে মানানসই করে পুনর্গঠন করা।

ধর্মের পাঁচ ফ্রন্ট ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ: চীনা সংবিধানে ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা কাগজ-কলমে স্বীকৃত হলেও রাষ্ট্র কেবল পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় সংস্থাকে আইনি বৈধতা দেয়:

১. দ্য ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন অফ চায়না
২. দ্য চাইনিজ বৌদ্ধ অ্যাসোসিয়েশন
৩. দ্য তাওইস্ট অ্যাসোসিয়েশন
৪. দ্য প্রোটেস্ট্যান্ট থ্রি-সেলফ প্যাট্রিওটিক মুভমেন্ট
৫. দ্য চাইনিজ ক্যাথলিক প্যাট্রিওটিক অ্যাসোসিয়েশন

কোনো নাগরিকে এই স্বীকৃত রাষ্ট্রীয় সংস্থার বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত বা গোপনীয়ভাবে কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষা পরিচালনা করার অনুমতি নেই।

'আরবীকরণ' (Arabization) রোধের নীতি: বেইজিংয়ের নীতি অনুসারে, চীনভিত্তিক ইসলামকে হতে হবে 'চীনা বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল'। গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্য বা পেট্রোডলারের প্রভাবে যেসব আরবি ভাষাভিত্তিক মাদ্রাসা, কঠোর ওয়াহাবি বা সালাফি মতাদর্শ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের স্থাপত্যশৈলী চীনে প্রবেশ করেছিল, বেইজিং সেগুলোকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর বহিরাগত আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিংতুয়ান (XPCC): জিনজিয়াং শাসনের বিশেষ আধা-সামরিক সংস্থা

জিনজিয়াং শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে অনন্য ও পরাক্রমশালী সংস্থাটির নাম হলো 'বিংতুয়ান' (Bingtuan - 兵团), যার পোশাকি নাম 'জিনজিয়াং প্রোডাকশন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কর্পস' (XPCC)

১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠা ও বিংতুয়ানের ক্ষমতা

১৯৫৪ সালে চেয়ারম্যান মাও সে তুংয়ের নির্দেশে পিপলস লিবারেশন আর্মির (PLA) হাজার হাজার সেনাসদস্যকে ডিমোবিলাইজ করে এই বিশেষ সংস্থাটি গঠন করা হয়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল: সীমান্ত রক্ষা করা, অনাবাদী জমি উদ্ধার করা এবং হ্যন চীনাদের জিনজিয়াংয়ে বসতি গঠনে সহায়তা করা।

রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র: বিংতুয়ান একটি সাধারণ কোম্পানির মতো কাজ করে, আবার একই সাথে এটি একটি শক্তিশালী আধা-সামরিক বাহিনী। এদের নিজস্ব পুলিশ বাহিনী, নিজস্ব আদালত, কারাগার, বিশ্ববিদ্যালয়, পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে।

বিশাল অর্থনীতি: জিনজিয়াং প্রদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কৃষিজমি এবং উৎপাদিত তুলার ৮০ শতাংশের বেশি সরাসরি বিংতুয়ানের নিয়ন্ত্রণে। এমনকি জিনজিয়াংয়ের বেশ কয়েকটি নতুন আধুনিক শহর (যেমন- শিয়াহেজি) সরাসরি বিংতুয়ানের মাধ্যমে শূন্য থেকে নির্মিত হয়েছে।

বিংতুয়ানের এই বিপুল জনসংখ্যার উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে যেন জিনজিয়াংয়ে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কোনো অবস্থাতেই শিথিল না হয়।

হাই-টেক সারভেইল্যান্স স্টেট: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও 'আইজেওপি' (IJOP)

একবিংশ শতাব্দীতে জিনজিয়াং হয়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত এবং নিবিড় ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ বা 'হাই-টেক সারভেইল্যান্স স্টেট' (High-Tech Surveillance State)-এর প্রয়োগক্ষেত্র।

আইজেওপি (Integrated Joint Operations Platform - IJOP)

জিনজিয়াংয়ে ব্যবহৃত কেন্দ্রীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সিস্টেমটির নাম IJOP (体化联合作战平台)। এই সিস্টেমটি নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের বিপুল ডেটা একসাথে বিশ্লেষণ করে:

বায়োমেট্রিক ডেটা সংগ্রহ: নাগরিকদের ডিএনএ (DNA), রক্তের গ্রুপ, ভয়েস প্রিন্ট (কণ্ঠস্বরের স্যাম্পল) এবং চোখের আইরিস স্ক্যান করে কেন্দ্রীয় ডেটাবেসে রাখা হয়।

স্মার্টফোন ট্র্যাকিং: ফোনে কোনো অননুমোদিত মেসেজিং অ্যাপ (যেমন- হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম) বা ওয়াই-ফাই ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্ক্যান করে পেন্টাগন স্টাইলের এই সিস্টেম সংকেত পাঠায়।

'গ্রিড ম্যানেজমেন্ট' (Grid Management System)

শহর ও গ্রামগুলোকে ছোট ছোট 'গ্রিড' বা ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। প্রতি ১০০-২০০ মিটার পর পর স্থাপন করা হয়েছে পলিটিক্যাল চেকপয়েন্ট। রাস্তায় হাঁটার সময় ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা এবং হাঁটার ধরণ দেখে এআই অ্যালগরিদম চিহ্নিত করে দেয় কে সম্ভাব্য "ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিক"।

শুধু উইঘুর নয়: 'হুই' এলাকাতেও গম্বুজ অপসারণ অভিযান (Dome Removal Drive)

অনেকে মনে করেন সাংস্কৃতিক রূপান্তর কেবল উইঘুরদের ওপরই প্রযোজ্য। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে চীনের শান্তিকামী হিসেবে পরিচিত 'হুই' (Hui) মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও একই ধরনের স্থাপত্যভিত্তিক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

লিনশিয়া (Linxia) ও নিংশিয়ার রূপান্তর

গানসু প্রদেশের লিনশিয়া (Linxia) শহরটিকে বলা হতো "চীনের ছোট মক্কা"। এখানে বহু প্রাচীন ও দৃষ্টিবান্ধব গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ ছিল।

২০১৮ থেকে পরবর্তী বছরগুলোতে রাষ্ট্রীয় নীতি অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যের পেঁয়াজ আকৃতির সবুজ বা সোনালী গম্বুজ এবং মিনারগুলো ভেঙে ফেলে সেখানে ঐতিহ্যবাহী চীনা রাজপ্রাসাদ বা প্যাগোডা স্টাইলের চাল বসানো হয়।

রেস্তোরাঁ ও দোকানের সাইনবোর্ড থেকে আরবি ভাষার শব্দ (যেমন- Halal বা حلال) মুছে ফেলে চীনা অক্ষর (Qingzhen - 清真) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়।

বেইজিংয়ের ভাষ্যমতে, এটি কোনো ধর্মীয় নিধন নয়; এটি হলো চীনা ভূখণ্ডে গড়ে ওঠা স্থাপনাকে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে দৃষ্টিনন্দনভাবে মানানসই করার রাষ্ট্রীয় প্রজেক্ট।

অর্থনৈতিক রূপান্তর: শিল্পায়ন ও বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন

২০১৯-২০২০ সালের পর থেকে চীন সরকার জিনজিয়াং অঞ্চলের কৌশল পরিবর্তন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি "শিল্পায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন"-এর ওপর জোর দিয়েছে।

কারিগরি পুনর্বাসন থেকে শিল্প কারখানায় শ্রম স্থানান্তর

জিনজিয়াংয়ের অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের অধীনে স্থানীয় উইঘুর নাগরিকদের পোশাক শিল্প, সৌর প্যানেল কারখানা এবং টমেটো প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্টে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন "Uyghur Forced Labor Prevention Act (UFLPA)" পাস করে জিনজিয়াংয়ে উৎপাদিত পণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। তবে চীন সরকার পশ্চিমা এই নিষেধাজ্ঞার জবাবে তাদের বাণিজ্য গতিপথ ঘুরিয়ে দিয়েছে গ্লোবাল সাউথ-এর দিকে (যেমন আসিয়ানভুক্ত দেশসমূহ, মধ্যপ্রাচ্য, ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকা)।

জিনজিয়াং নিয়ন্ত্রণের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত স্তম্ভসমূহ

চীনের এই সামগ্রিক নিরাপত্তা ও পরিচালনা কাঠামোর বিভিন্ন উপাদান সংক্ষেপে নিচে সারণীতে তুলে ধরা হলো:

নিয়ন্ত্রণের স্তম্ভ / সংস্থা

মূল কাজ ও স্বরূপ

রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্যে এর অবদান

বিংতুয়ান (XPCC)

আধা-সামরিক, শিল্প ও কৃষি পরিচালনা সংস্থা

জনমিতির ভারসাম্য রক্ষা এবং অঞ্চলটির প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক খাত একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে রাখা।

IJOP ডেটা সিস্টেম

AI চালিত বায়োমেট্রিক ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং নেটওয়ার্ক

অপরাধ বা বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাভাবনা ঘটার পূর্বেই তা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

সিনিকাইজেশন আইন

গম্বুজ অপসারণ, আরবি বর্জন ও স্থানীয় পাঠ্যক্রম প্রয়োগ

চীনা ইসলামিক পরিচয়কে মধ্যপ্রাচ্য বা আন্তর্জাতিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা।

গ্রিড ম্যানেজমেন্ট

ক্ষুদ্র ব্লকে শহর ও গ্রাম বিভক্ত করে সার্বক্ষণিক নজরদারি

স্থানীয় পর্যায়ে যেকোনো প্রতিরোধ বা সমাবেশের সুযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া।

শিল্প স্থানান্তর প্রজেক্ট

স্থানীয়দের তৈরি পোশাক, সৌর ও কৃষি কারখানায় যুক্ত করা

দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মূলধারায় সংযুক্তকরণ।

কূটনৈতিক প্রতিরক্ষা: কেন মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্ব চীনের পাশে?

একটি বড় প্রশ্ন থেকে যায় পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যম যখন জিনজিয়াং নিয়ে সরব, তখন সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর বা ইরানের মতো প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলো কেন বেইজিংকে সমর্থন দেয়?

জ্বালানি নির্ভরতা: মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান প্রধান তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলো চীন। অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় কোনো দেশই বেইজিংকে চটাতে চায় না।

অ-হস্তক্ষেপ নীতি (Non-Interference Policy): চীন কখনো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মানবাধিকার বা গণতন্ত্র নিয়ে খোঁচা দেয় না। বিনিময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও চীনের জিনজিয়াং বা তাইওয়ান অভ্যন্তরীণ ইস্যু নিয়ে নীরব থাকে।

বিচ্ছিন্নতাবাদ সংক্রান্ত সাধারণ চিন্তা: মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের নিজেদেরও চরমপন্থা ও রাজনৈতিক ইসলাম নিয়ে নিজস্ব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ফলে তারা 'সন্ত্রাসবাদ দমন'-এ বেইজিংয়ের গৃহীত পদক্ষেপকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বাভাবিক অংশ বলে মনে করে।

চীনের উইঘুর ও সামগ্রিক মুসলিম নীতি কেবল কোনো আবেগপ্রবণ ধর্মীয় বিদ্বেষের ফসল নয়; এটি চরম বাস্তববাদী ও শীতল ভূ-রাজনৈতিক অংকের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

ভূ-রাজনৈতিক 'উইঘুর কার্ড' ও পশ্চিমা প্রচারণার আসল রূপ

একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার 'গ্রেট পাওয়ার রাইভালরি' বা নতুন স্নায়যুদ্ধ (Cold War) যখন চরম আকার ধারণ করেছে, তখন জিনজিয়াং ইস্যু পশ্চিমা শক্তির কাছে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্বের দ্বিমুখী নীতি (Double Standards): আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যে (ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া) কথিত "সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে" বা 'War on Terror'-এর নামে লাখ লাখ মুসলিম হত্যা করেছে এবং ড্রোন হামলায় শহরগুলো ছাই করে দিয়েছে, তারাই আজ উইঘুর মুসলিমদের মানবাধিকার রক্ষায় সবচেয়ে বেশি সোচ্চার!

পশ্চিমা নীতি নির্ধারকদের মূল উদ্দেশ্য মানবাধিকার রক্ষা নয়; বরং উইঘুর ইস্যুকে একটি "ভূ-রাজনৈতিক কার্ড" (Geopolitical Card) হিসেবে ব্যবহার করে চীনকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোণঠাসা করা এবং তাদের বিআরআই (BRI) প্রজেক্টকে বাধাগ্রস্ত করা।

ওআইসি (OIC) ও অধিকাংশ মুসলিম দেশের প্রকৃত অবস্থান: পশ্চিমা প্রচারণার বিপরীতে সবচেয়ে অদ্ভূত ঘটনা হলো বিশ্বের প্রধান প্রধান স্বাধীন মুসলিম দেশের অবস্থান। সৌদি আরব, ইরান, পাকিস্তান, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত এমনকি তুর্কি সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী OIC (অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন) আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় চীনের সন্ত্রাসবিরোধী ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সমর্থন করে চিঠি দিয়েছে।

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান থেকে শুরু করে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান স্পষ্ট করে বলেছেন:

"সন্ত্রাসবাদ দমন এবং রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষা করা প্রতিটি দেশের সার্বভৌম অধিকার। চীন তাদের ভূখণ্ডে চরমপন্থা দমনে যা করছে, তা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়।"

মুসলিম বিশ্ব ভালো করেই জানে যে, এটি ইসলামের সাথে চীনের যুদ্ধ নয়; এটি একটি সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সন্ত্রাসবাদ ও ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার এক কঠোর সরকারি অভিযান।

সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের হিসাব

সামগ্রিক বিশ্লেষণ শেষে আমরা একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি চীনে উইঘুর সংকটকে যারা নিছক "ধর্মীয় নিপীড়ন" হিসেবে দেখতে চান, তারা ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক সত্যকে অস্বীকার করেন।

উইঘুরদের সংকট ধর্মীয় নয়, জাতীয়তাবাদী: চীন যদি ইসলাম ধর্ম বা মুসলিমদের ধ্বংস করতে চাইত, তবে জিনজিয়াংয়ের বাইরের ১ কোটির বেশি 'হুই' মুসলিম কিংবা অন্যান্য ৮টি মুসলিম সম্প্রদায় চীনে পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতার সাথে নিরাপদে ব্যবসা-বাণিজ্য করে বসবাস করতে পারত না।

রাষ্ট্রীয় খণ্ডন রোধ: কোনো স্বাধীন দেশ তা সে আমেরিকা, ভারত, রাশিয়া কিংবা চীনই হোক নিজের সীমানার ভেতরে কোনো সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে মেনে নেয় না। বেইজিং নিজের অখণ্ডতা রক্ষায় কোনো ছাড় দেবে না, এটাই স্বাভাবিক রাজধর্ম।

উন্নয়নই মূল সমাধান: গত এক দশকে জিনজিয়াংয়ে অভাবনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণের ফলে নতুন প্রজন্মের উইঘুরদের মধ্যে চরমপন্থার প্রভাব অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। উরুমচি ও কাশগর আজ ইউরোপ-এশিয়ার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের হাব-এ পরিণত হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কঠিন দাবার বোর্ডে উইঘুর সংকট কেবল কতগুলো অমানবিক নীতির গল্প নয়; এটি মূলত একটি উদীয়মান বিশ্বশক্তির সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সম্পদ সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার তাগিদে গৃহীত কঠোর কিন্তু কৌশলগত এক মহা-বাস্তবতার প্রতিফলন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.