মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক - স্বাধীন দূরদর্শী নাকি পশ্চিমা চক্রান্তের পুতুল?

১৯২৪ সালের ৩ মার্চ। আধুনিক ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের গতিপথ এক মুহূর্তে বদলে গেল। তুর্কি গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে (TBMM) পাস হলো এক যুগান্তকারী ও নজিরবিহীন প্রস্তাব উসমানীয় খিলাফতের (Ottoman Caliphate) প্রাতিষ্ঠানিক বিলুপ্তি। শেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদকে সপরিবারে নির্বাসনে পাঠানো হলো। রাতারাতি, প্রায় চার শতাব্দী ধরে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে টিকে থাকা উসমানীয় খিলাফতের সূর্য অস্তমিত হলো।
এই ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারিগর ছিলেন মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক (Mustafa Kemal Atatürk) আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম রাষ্ট্রপতি। এক কলমের খোঁচায় তিনি কেবল চার শতাব্দীর উসমানীয় ঐতিহ্যকেই মুছে দেননি, বরং ১৪০০ বছরের ইসলামী খিলাফতের ধারণাকেই বিশ্বরাজনীতি থেকে বিলুপ্ত করেছিলেন।
আতাতুর্ক কি সত্যিই এক ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন, রাষ্ট্রনায়কসুলভ দূরদর্শী নেতা ছিলেন, যিনি নিশ্চিত বিনাশের হাত থেকে তুর্কি জাতিকে রক্ষা করে একবিংশ শতাব্দীর যোগ্য আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন স্রেফ সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা শক্তির নীল নকশা বাস্তবায়নকারী এক পুতুল, যিনি উম্মাহর রাজনৈতিক পিঠস্থানকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিলেন?
এই নিবন্ধে আমরা আবেগ ও অন্ধ আনুগত্যকে দূরে ঠেলে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের প্রেক্ষাপট, আতাতুর্কের উত্থান, খিলাফত বিলুপ্তির কারণ, তাঁর বৈপ্লবিক সংস্কারমালা এবং তাঁর ঐতিহাসিক মূল্যায়নের এক নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করব।
উসমানীয় সাম্রাজ্য ও খিলাফতের ইতিহাস: গৌরবের চরম শিখর থেকে পতনের তলানি
আতাতুর্কের সিদ্ধান্তকে গভীরভাবে বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে যেতে হবে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, যার ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েছিল আধুনিক তুর্কি প্রজাতন্ত্র।
কনস্টান্টিনোপল বিজয় ও মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব: ১৪৫৩ সালে সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদের (মেহমেদ আল-ফাতিহ) হাত ধরে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের মাধ্যমে উসমানীয় সাম্রাজ্য এক বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়। এর প্রায় এক শতাব্দী পর, ১৫১৭ সালে সুলতান প্রথম সেলিম মিসরের মামলুক খিলাফতকে পরাজিত করে মক্কা ও মদিনার পবিত্র দুই মসজিদের চাবি ও খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ইউরোপের দোরগোড়ায় ভিয়েনার প্রাচীর থেকে শুরু করে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই সাম্রাজ্য তিন মহাদেশে ন্যায়বিচার, বিজ্ঞান, শিল্প ও সামরিক শক্তির এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
পতনের ক্ষণগণনা - 'ইউরোপের রুগ্ন মানুষ': অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লব ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে ইউরোপ যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন উসমানীয় রাজপ্রাসাদ ও আলেম সমাজ সংস্কারের বিরোধিতা করে পিছিয়ে পড়ে। অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, জানিসারি (Janissary) সামরিক বাহিনীর বিদ্রোহ, দুর্বল অর্থনৈতিক নীতি এবং বলকান অঞ্চলের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কারণে সাম্রাজ্য ক্রমাগত ভূখণ্ড হারাতে থাকে।
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিমা শক্তিগুলো এই ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যকে উপহাস করে নামকরণ করে 'ইউরোপের রুগ্ন মানুষ' (The Sick Man of Europe)।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও 'সেভ্রে চুক্তি' (Treaty of Sèvres): উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয় ১৯১৪ সালে শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। তৎকালীন 'ইত্তিহাদ ভে তরাক্কি' (Young Turks) সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে উসমানীয়রা জার্মানির অক্ষশক্তিতে যোগ দেয়। মিত্রশক্তির (যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইতালি) জয়ে যুদ্ধশেষে উসমানীয় সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
১৯২০ সালে বিজয়ী মিত্রশক্তি শেষ উসমানীয় সুলতান ষষ্ঠ মেহমেদকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নেয় অপমানজনক 'সেভ্রে চুক্তি' (Treaty of Sèvres)। এই চুক্তির মাধ্যমে:
ইস্তাম্বুল ও ক্যাপিটাল অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রাধীনে আনা হয়। ইজমির ও থ্রেস অঞ্চল গ্রিসকে দিয়ে দেওয়া হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত আরব ভূখণ্ড (সিরিয়া, ইরাক, ফিলিস্তিন, হিজাজ) ব্রিটিশ ও ফরাসিদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে দেওয়া হয়। মূল আনাতোলিয়া বা তুর্কি ভূখণ্ডকে ইতালি, ফ্রান্স ও গ্রিসের মধ্যে খণ্ড-বিখণ্ড করার পরিকল্পনা করা হয়।
তুর্কি জাতি তখন অস্তিত্বের চরম সংকটে দাঁড়িয়েছিল। ঠিক এই অগ্নিগর্ভ মুহূর্তে ইতিহাস তৈরি করেন একজন সামরিক সাধারণ কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল।
মোস্তফা কামালের উত্থান: গালিপোলির নায়ক থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান স্থপতি
১৮৮১ সালে সালোনিকায় (বর্তমান গ্রিসের থেসালোনিকি) জন্মগ্রহণকারী মোস্তফা কামাল ছিলেন একজন প্রখর মেধা ও সামরিক প্রতিভার অধিকারী অফিসার। উসমানীয় সামরিক একাডেমিতে তাঁর দক্ষতার কারণে শিক্ষক তাঁর নামের সাথে 'কামাল' (যার অর্থ নিখুঁত বা উৎকৃষ্ট) শব্দটি যুক্ত করেছিলেন।
গালিপোলির যুদ্ধ (১৯১৫)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রশক্তি ইস্তাম্বুল দখল করে উসমানীয় সাম্রাজ্যকে এক ধাক্কায় নিশ্চিহ্ন করার জন্য দার্দানেলে প্রণালীতে বিশাল নৌ ও পদাতিক হামলা চালায়। এটিই বিখ্যাত গালিপোলির যুদ্ধ (Battle of Gallipoli)।
এই যুদ্ধে মোস্তফা কামালের রণকৌশল ও জীবন বাজি রাখা নেতৃত্বের কারণে মিত্রশক্তি চরম পরাস্ত হয়। তাঁর ঐতিহাসিক নির্দেশ ছিল: "আমি তোমাদের আক্রমণের নির্দেশ দিচ্ছি না, আমি তোমাদের মরার নির্দেশ দিচ্ছি।" এই যুদ্ধে জয়ের পর তিনি সমগ্র তুর্কি জাতির কাছে 'আনাফার্তালার নায়ক' হিসেবে পরিচিতি পান।
তুর্কি স্বাধীনতা যুদ্ধ
১৯১৯ সালে যখন ইস্তাম্বুলে সুলতানের সরকার মিত্রশক্তির নির্দেশে আত্মসমর্পণ করেছিল, তখন আতাতুর্ক রাজপ্রাসাদের নির্দেশ অমান্য করে ১৯১৯ সালের ১৯ মে আনাতোলিয়ার স্যামসুন (Samsun) বন্দরে অবতরণ করেন। তিনি ইস্তাম্বুলের পুতুল সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে সাধারণ তুর্কি জনগণ, কৃষক ও সামরিক অফিসারদের নিয়ে গড়ে তোলেন জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ আন্দোলন।
কামালীয় বাহিনীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গ্রীক বাহিনীকে সাকারিয়া ও ডুমলুপিনারের যুদ্ধে চূড়ান্ত পরাজিত করে সমুদ্রের জলে নিক্ষেপ করা হয়। ফরাসি ও ইতালীয় বাহিনীকে আনাতোলিয়া ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়। মিত্রশক্তির তৈরি 'সেভ্রে চুক্তি'কে তুর্কিরা নিজেদের রক্ত দিয়ে খাতা থেকে মুছে ফেলে।
১৯২৩ সালে মিত্রশক্তি নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং স্বাক্ষরিত হয় 'লোজান চুক্তি' (Treaty of Lausanne)। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এক স্বাধীন ও সার্বভৌম তুরস্ককে স্বীকার করে নেয়। একই বছরের ২৯ অক্টোবর মোস্তফা কামাল আনুষ্ঠানিকভাবে 'তুর্কি প্রজাতন্ত্র' (Republic of Turkey) ঘোষণা করেন এবং এর প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
খিলাফত বিলুপ্তির রক্তঝরা তিন ধাপ
তুরস্ক স্বাধীন হওয়ার পর আতাতুর্কের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল সুদীর্ঘকালের উসমানীয় রাজনৈতিক কাঠামো। তিনি বুঝেছিলেন, পুরনো সুলতানি ও খিলাফত টিকে থাকলে তাঁর আধুনিকতাবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। তাই তিনি এক মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ৩টি ধাপে খিলাফতকে নিশ্চিহ্ন করেন।
ধাপ ১: সালতানাত বিলুপ্তি (১ নভেম্বর, ১৯২২)
আতাতুর্ক প্রথমে রাজনৈতিক শাসনযন্ত্র এবং ধর্মীয় প্রধানকে আলাদা করার কৌশল নেন। ১৯২২ সালের ১ নভেম্বর ইস্তাম্বুলের উসমানীয় সালতানাত বিলুপ্ত করা হয়। শেষ সুলতান ষষ্ঠ মেহমেদ ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজে চড়ে দেশত্যাগ করেন। এর মাধ্যমে উসমানীয় রাজতন্ত্রের রাজনৈতিক বিলুপ্তি ঘটে।
ধাপ ২: নামসর্বস্ব খলিফা নির্বাচন (১৯২২-১৯২৪)
সালতানাত বিলুপ্ত হলেও বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ ও তুর্কি জনগণের সেন্টিমেন্টের কথা ভেবে আতাতুর্ক খিলাফতকে তাৎক্ষণিকভাবে রদ করেননি। তিনি উসমানীয় রাজপরিবারের প্রিন্স দ্বিতীয় আবদুল মজিদকে রাজনৈতিক ক্ষমতাহীন কেবল এক 'আধ্যাত্মিক খলিফা' হিসেবে নিযুক্ত করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল উম্মাহকে বোঝানো যে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বহাল আছে, কিন্তু সরকার পরিচালনা করবে আঙ্কারার পার্লামেন্ট।
ধাপ ৩: চূড়ান্ত খিলাফত বিলুপ্তি (৩ মার্চ, ১৯২৪)
কিন্তু দ্বৈত ক্ষমতার কেন্দ্র বেশিদিন চলেনি। যখন খলিফা আবদুল মজিদ বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সাথে দেখা করতে শুরু করেন এবং বিশ্ব মুসলিম নেতারা (বিশেষ করে ভারতের খিলাফত আন্দোলনের নেতা আগা খান ও আমীর আলী) তুর্কি সরকারকে খিলাফতের মর্যাদা রক্ষার জন্য চিঠি পাঠান, তখন আতাতুর্ক ক্ষিপ্ত হন। তিনি একে আঙ্কারা সরকারের স্বায়ত্তশাসনের ওপর সরাসরি বিদেশি হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দেন।
১৯২৪ সালের ৩ মার্চ তুর্কি গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে প্রবর্তিত হয় আইন নং ৪৩১। আইনটি পাসের সাথে সাথে ১৪০০ বছরের খিলাফত ব্যবস্থার চূড়ান্ত প্রাতিষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে। খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদ ও উসমানীয় রাজপরিবারের সমস্ত সদস্যকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তুরস্ক থেকে নির্বাসিত করা হয়। খিলাফতের সমস্ত তহবিল ও সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করা হয়।
কামালিজম (Kemalism): আতাতুর্কের বৈপ্লবিক সংস্কার ও 'ধর্মনিরপেক্ষতা'
খিলাফত বিলুপ্তির পর আতাতুর্ক এক চরমপন্থী আধুনিকীকরণ ও পশ্চিমাকরণ ড্রাইভ চালু করেন, যা ইতিহাসে 'কামালিজম' (Kemalism) বা 'ছয়টি মূলনীতি' (The Six Arrows) নামে পরিচিত। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তুরস্ককে সামন্তবাদী সমাজ থেকে এক ধাক্কায় ইউরোপীয় ধাঁচের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করা।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের রূপান্তর
সশরীরে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ: তিনি 'শাইখুল ইসলাম' দপ্তর ও ওয়াকফ মন্ত্রণালয় বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে 'দিয়ানেত' (Diyanet) বা ধর্মীয় বিষয়ক অধিদপ্তর তৈরি করেন। এখন থেকে ইমামদের বেতন ও জুমার খুতবা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
সুফি দরবার নিষিদ্ধ: দরবেশদের খানেকাহ, সুফি তরীকা এবং টেক্কেগুলো সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষণা করা হয়।
পোশাক বিধি ও কালচারাল শক
টুপির আইন (Hat Law of 1925): ইসলামিক ঐতির্যের প্রতীক ঐতিহ্যবাহী 'ফেজ টুপি' (Fez) নিষিদ্ধ করা হয়। এর পরিবর্তে পশ্চিমা ধাঁচের হ্যাট বা ক্যাপ পরা পুরুষের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়। কেউ এই আইনের বিরোধিতা করলে কঠোর শাস্তি বা ফাঁসি দেওয়া হতো।
পর্দার ওপর নিষেধাজ্ঞা: সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের হিজাব ও বোরকা পরা নিষিদ্ধ করা হয়।
ভাষা ও বর্ণমালার আমূল পরিবর্তন (১৯২৮)
আতাতুর্কের সবচেয়ে বিতর্কিত সামাজিক সংস্কার ছিল তুর্কি ভাষার বর্ণমালা পরিবর্তন। শত শত বছর ধরে ব্যবহৃত আরবি ও ফার্সি বর্ণমালা রাতারাতি বাতিল করে লাতিন (রোমান) বর্ণমালা গ্রহণ করা হয়।
এর ফলে তুর্কি জনগণ রাতারাতি তাদের অতীতের শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাস, সাহিত্য, ইসলামী স্থাপত্যের ক্যালিগ্রাফি ও ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ১৯৩২ সালে আতাতুর্ক মসজিদে আরবি ভাষায় আজান দেওয়া নিষিদ্ধ করেন এবং তুর্কি ভাষায় আজান দেওয়ার নির্দেশ দেন (যা ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল)।
আইনি কাঠামো ও নারী অধিকার
ইসলামী আইন ব্যবস্থা 'মে জেল্লে' (Mecelle) সম্পূর্ণ বাতিল করে ১৯২৬ সালে গৃহীত হয় সুইজারল্যান্ডের সিভিল কোড এবং ইতালির ফৌজদারি আইন। বহুগামিতা নিষিদ্ধ করা হয় এবং বিবাহবিচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমান অধিকার দেওয়া হয়। ফ্রান্স বা সুইজারল্যান্ডের আগেই আতাতুর্ক ১৯৩৪ সালে তুর্কি নারীদের পূর্ণ ভোটাধিকার এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার প্রদান করেন।
নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের সারণী: আতাতুর্ক ও খিলাফত বিলুপ্তির সার্বিক চিত্র
আতাতুর্কের চরিত্র, তাঁর সিদ্ধান্ত, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং আধুনিক ও ঐতিহ্যবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর সংস্কারের একটি তুলনামূলক নিরপেক্ষ সারসংক্ষেপ সারণী নিচে উপস্থাপন করা হলো:
আলোচনার মাত্রা / বিচার্য বিষয় | ঐতিহাসিক সত্যতা ও প্রেক্ষাপট | আধুনিকতাবাদী / সমর্থকদের দৃষ্টিভঙ্গি | ঐতিহ্যবাদী / সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি |
সাম্রাজ্যের সংকট ও স্বাধীনতা | প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয়দের পরাজয় ও 'সেভ্রে চুক্তি'র মাধ্যমে তুর্কি ভূখণ্ড দখলের বিভীষিকা। | আতাতুর্ক ছিলেন তুর্কি জাতির রক্ষা করার একক নায়ক; তিনি তুর্কি ভূখণ্ডকে গ্রীক ও ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীন করেন। | তিনি রাজপ্রাসাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ইসলামী খিলাফতের কেন্দ্রবিন্দুকে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল করেছিলেন। |
খিলাফত বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত | ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ আইন পাসের মাধ্যমে খিলাফত পদ বিলুপ্ত করা এবং রাজপরিবারকে নির্বাসন। | খিলাফত কেবল নামসর্বস্ব অনগ্রসর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল; স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য এটি জরুরি ছিল। | বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীককে ধুলোয় মিশিয়ে মুসলিম বিশ্বকে অভিভাবকহীন করা হয়েছে। |
ভাষা ও বর্ণমালা পরিবর্তন | ১৯২৮ সালে আরবি বর্ণমালা বাতিল করে রোমান হরফ গ্রহণ এবং তুর্কি ভাষার বিশুদ্ধকরণ। | শিক্ষার হার দ্রুত বৃদ্ধি এবং তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তিগত ও পশ্চিমা জ্ঞান অর্জনে সাহায্য করেছে। | তুর্কি জাতিকে তাদের হাজার বছরের উসমানীয় ও ইসলামিক মূল পাণ্ডুলিপি ও ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। |
ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক সংস্কার | পোশাক আইন (হ্যাট ল), হিজাব নিয়ন্ত্রণ, ইউরোপীয় সিভিল কোড ও নারীদের ভোটাধিকার। | মধ্যযুগীয় গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে নারীকে আধুনিক নাগরিক অধিকার দান এবং রাষ্ট্রকে মুক্তচিন্তার পথ দেখানো। | জোরপূর্বক পশ্চিমা সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং জনগণের ইসলামিক চেতনাকে দমন করা হয়েছে। |
রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ | ১৯২৩-১৯৩৮ পর্যন্ত আতাতুর্কের 'সিএইচপি' (CHP) দলের একচ্ছত্র একদলীয় শাসনব্যবস্থা। | বিশৃঙ্খলা ও প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন রুখে একটি নতুন রাষ্ট্র তৈরি করতে কঠোর রাষ্ট্রনায়কত্ব অপরিহার্য ছিল। | তিনি ছিলেন একনায়ক; আলেম ও বিরোধীদের দমনে প্রখর বলপ্রয়োগ ও ফাঁসির মঞ্চ ব্যবহার করেছেন। |
ইস্তাম্বুল বনাম আঙ্কারা: দুই সরকারের অভ্যন্তরীণ স্নায়ুযুদ্ধ (১৯১৯–১৯২২)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্কে একই সাথে দুটি বিপরীতমুখী সরকার ব্যবস্থা কার্যকর ছিল:
ইস্তাম্বুলের সুলতান সরকার: যা ব্রিটিশ ও মিত্রশক্তির প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পুতুল সরকারে পরিণত হয়েছিল।
আঙ্কারার গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি: যা মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে স্বাধীনতাকামী জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছিল।
ফতোয়া বনাম পাল্টা ফতোয়ার যুদ্ধ
ইস্তাম্বুলের শাইখুল ইসলাম মুস্তফা সাবরি এফেন্দি একটি সরকারি ফতোয়া জারি করেন, যেখানে মোস্তফা কামাল ও তাঁর সঙ্গীদের "বিদ্রোহী" এবং "ইসলামের শত্রু" হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাঁদের হত্যা করা জায়েজ ঘোষণা করা হয়।
এর জবাবে মোস্তফা কামাল আঙ্কারার মুফতি রিফাত বোরেকচি (Rıfat Börekçi) এবং ১৫০ জন প্রবীণ আলেমের স্বাক্ষর নিয়ে পাল্টা ফতোয়া জারি করেন। সেই ফতোয়ায় বলা হয় "যে সুলতান বা খলিফা কাফের শক্তির বন্দি হয়ে কাজ করছেন, তাঁর আদেশ মানা উম্মাহর জন্য বাধ্যতামূলক নয়।" এই ধর্মীয় মতাদর্শিক যুদ্ধ আনাতোলিয়ার সাধারণ জনগণকে কামালের পক্ষে নিয়ে আসতে সাহায্য করেছিল।
লোজান চুক্তি (১৯২৩) ও 'গোপন শর্তের' ইতিহাসিক বিতর্ক
১৯২৩ সালে সুইজারল্যান্ডের লোজানে ইসমত ইনোনু (তুর্কি প্রতিনিধি) এবং ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড কার্জনের (Lord Curzon) মধ্যে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিশাল বিতর্ক রয়েছে।
ব্রিটিশদের সবচেয়ে বড় ভয় ছিল তৎকালীন তাদের অধীনস্থ উপনিবেশগুলোতে (বিশেষ করে ভারত ও মিসরে) বসবাসকারী কোটি কোটি মুসলিমকে নিয়ে। উসমানীয় খিলাফত যদি কার্যকর থাকত, তবে একজন খলিফার এক আদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ঘটতে পারত।
অনেকে দাবি করেন, লর্ড কার্জন লোজান চুক্তিতে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির বিনিময়ে আতাতুর্ককে খিলাফত বিলুপ্তির শর্ত দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তৎকালীন বিতর্কে লর্ড কার্জন বলেছিলেন:
"আমরা তুরস্কের মূল ভিত্তিই ধ্বংস করে দিয়েছি। সেই ভিত্তি আর কখনো জেগে উঠবে না, কারণ আমরা তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ঐক্যের প্রতীক খিলাফতকে বিনাশ করেছি।"
কামালিস্ট দমননীতি ও প্রধান অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহসমূহ
খিলাফত বিলুপ্ত করা এবং পশ্চিমা আইনি কাঠামো চাপিয়ে দেওয়া সাধারণ তুর্কি জনগণ ও আলেম সমাজ খুব সহজে মেনে নেননি। আতাতুর্ক কঠোর হাতে এই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিরোধগুলো দমন করেন।
শাইখ সাইদ বিদ্রোহ (Sheikh Said Rebellion, 1925): ১৯২৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব আনাতোলিয়ায় নকশবন্দী সুফি তরীকার বিখ্যাত পীর শাইখ সাইদ-এর নেতৃত্বে এক প্রকাণ্ড সশস্ত্র বিদ্রোহ গড়ে ওঠে। তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং শরিয়া আইন পুনর্বহাল করা। আতাতুর্কের সরকার সেনাবাহিনী পাঠায় এবং বিমান হামলা চালিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এই বিদ্রোহ দমন করে। শাইখ সাইদসহ ৪৭ জন আলেমকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়।
আতিফ হোজা ও পোশাক আইনের ট্র্যাজেডি: ইসলামী চিন্তাবিদ ইস্কিলিপলি আতিফ হোজা (İskilipli Atıf Hoca) ১৯২৪ সালে একটি বই লিখেছিলেন Frenk Mukallitliği ve Şapka (ইউরোপীয় অনুকরণ ও টুপি)। সেখানে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে মুসলিমদের জন্য অমুসলিমদের ধর্মীয় ও সামাজিক পোশাক অন্ধভাবে অনুকরণ করা অনুচিত।
এর এক বছর পর, ১৯২৫ সালে যখন আতাতুর্ক 'টুপি আইন' (Hat Law) পাস করেন, তখন আতিফ হোজাকে পেছন ফিরে পুরনো বই লেখার অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়। 'ইস্তিকলাল মাহকেমেলেরি' (Independence Tribunals) বা বিশেষ আদালতে কোনো আপিলের সুযোগ না দিয়ে ১৯২৬ সালে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
আতাতুর্কের ব্যক্তিগত জীবন ও মানসিক দর্শন: ফরাসি 'লাইসিতে' (Laïcité)
মোস্তফা কামাল যে ধর্মনিরপেক্ষতা (Secularism) তুরস্কে প্রয়োগ করেছিলেন, তা কিন্তু ব্রিটিশ বা আমেরিকান ধাঁচের "ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ" ছিল না; বরং তা ছিল উগ্র ফরাসি ধাঁচের 'লাইসিতে' (Laïcité)।
ধর্মকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্র ও ধর্ম স্বাধীনভাবে আলাদা থাকে। কিন্তু আতাতুর্কের সিস্টেমে ধর্মকে সমাজ থেকে মুছে ফেলে পুরোপুরি রাষ্ট্রের অধীনে আনাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
পজিটিভিজম (Positivism)-এর প্রভাব: তিনি ফরাসি দার্শনিক অ আগস্ট কোঁত (Auguste Comte) এবং ভলতেয়ারের দর্শন দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে বিজ্ঞান ও যুক্তিই হলো একমাত্র পথ, এবং ধর্ম হলো অনগ্রসরতার মূল কারণ।
'নুসুক' (Nutuk) বা ঐতিহাসিক বক্তৃতা: ১৯২৭ সালে আতাতুর্ক তুর্কি গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে টানা ৬ দিন ধরে মোট ৩৬ ঘণ্টার একটি দীর্ঘ বক্তৃতা দেন, যা ইতিহাসে 'নুসুক' নামে পরিচিত। এই বক্তৃতায় তিনি কিভাবে উসমানীয় সাম্রাজ্যকে সরিয়ে নতুন প্রজাতন্ত্র তৈরি করেছিলেন, তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি লিপিবদ্ধ করে যান।
মূল বিতর্ক: স্বাধীন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক নাকি পশ্চিমা চক্রান্তের পুতুল?
মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক সম্পর্কে ইতিহাসবিদদের মধ্যে প্রধানত দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী মতবাদ বিদ্যমান।
প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি: স্বাধীন ও বাস্তববাদী দূরদর্শী নেতা
এই মতবাদের সমর্থক (যাদের মধ্যে আধুনিক তুর্কি, আধুনিকতাবাদী মুসলিম ও অনেক পশ্চিমা ইতিহাসবিদ রয়েছেন) আতাতুর্ককে এক অসামান্য দূরদর্শী দূরদর্শী নেতা মনে করেন। তাঁদের যুক্তিগুলো হলো:
বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া: ১৯২০-এর দশকে উসমানীয় খিলাফত কেবল কাগজে-কলমে টিকে ছিল। খলিফার নিজের দেশেই কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ইস্তাম্বুলে ব্রিটিশ ও ফরাসি সেনারা টহল দিত। এই মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠান আঁকড়ে ধরে থাকলে আঙ্কারার স্বাধীন সরকার টিকে থাকতে পারত না।
উম্মাহর ধারণার পতন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মক্কার শরীফ হুসাইন যখন উসমানীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের (লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া) সাথে হাত মিলিয়ে আরব বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন, তখনই 'ইসলামী উম্মাহর একতা' ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আতাতুর্ক অনুধাবন করেছিলেন যে, আরবরা নিজেরাই যখন খিলাফত চায় না, তখন তুর্কিদের এককভাবে এই ভারী বোঝা বইবার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
তুর্কি জাতীয়তাবাদের জয়: আতাতুর্ক 'প্যান-ইসলামিজম' বা সাম্রাজ্যবাদের অববাস্তব কাল্পনিক স্বপ্ন ছেড়ে দিয়ে 'তুর্কি জাতীয়তাবাদ'-এর ওপর ভিত্তি করে এক সুনির্দিষ্ট, শক্তিশালী ও সার্বভৌম ভূখণ্ড গড়ে তুলেছিলেন।
আধুনিক তুরস্কের অস্তিত্ব: আজকের তুরস্ক যদি অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রযুক্তিগতভাবে ইসলামী বিশ্বে এবং ন্যাটোর (NATO) মধ্যে অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠে থাকে, তবে তার বীজ আতাতুর্কের আধুনিকতাবাদী নীতিতেই প্রোথিত ছিল।
দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি: সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা চক্রান্তের পুতুল বা অনুঘটক
বিপরীত মতবাদের সমর্থকরা (যাদের মধ্যে ঐতিহ্যবাদী ইসলামী চিন্তাবিদ, খিলাফত সমর্থক এবং অনেক সমালোচক লেখক রয়েছেন) মনে করেন আতাতুর্ক জেনে বা না-জেনে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁদের যুক্তিগুলো হলো:
লোজান চুক্তির গোপন শর্তের অভিযোগ: অনেক ইতিহাসবিদের মতে, মিত্রশক্তি (বিশেষ করে গ্রেট ব্রিটেন) ১৯২৩ সালের লোজান চুক্তিতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিনিময়ে আতাতুর্কের সামনে চারটি শর্ত রেখেছিল:
খিলাফত সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে।
খলিফাকে সপরিবারে নির্বাসিত করতে হবে।
খিলাফতের সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে।
তুরস্ককে শতভাগ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে।
পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা ভালো করেই জানত যে সামরিকভাবে তুর্কিদের পরাজিত করা অসম্ভব, তাই তারা অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের মাধ্যমে খিলাফতকে খতম করেছিল।
সায়েক্স-পিকো চুক্তির পূর্ণতা: ব্রিটিশ ও ফরাসিদের প্রধান লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বকে ছোট ছোট খণ্ডরাজ্যে রূপান্তর করা। খিলাফত ধ্বংস হওয়ায় সমগ্র মুসলিম বিশ্ব অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে, যার ফলে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা এবং আরব বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়ে যায়।
সংস্কৃতি নিধন ও একনায়কতন্ত্র: নিজের দেশের সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মকে জোরপূর্বক মুছে ফেলে বিজাতীয় পশ্চিমা সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া কোনো স্বাধীন দূরদর্শিতার লক্ষণ হতে পারে না। যাঁরা তাঁর নীতির বিরোধিতা করেছিলেন (যেমন প্রখ্যাত আলেম শাইখ সাইদ, আতিফ হোজা প্রমুখ), তাঁদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল বা নির্বাসিত করা হয়েছিল।
উসমানীয় পরবর্তী মুসলিম বিশ্বে খিলাফত বিলুপ্তির দীর্ঘমেয়াদী প্রতিক্রিয়া
১৯২৪ সালে আতাতুর্ক যখন খিলাফত বিলুপ্ত ঘোষণা করেন, তখন সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এক নজিরবিহীন শূন্যতা ও শকওয়েভ তৈরি হয়েছিল।
ভারতীয় উপমহাদেশ ও খিলাফত আন্দোলনের পতন: ভারতে মাওলানা মোহাম্মদ আলী জোহর, মাওলানা শওকত আলী এবং মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত বিখ্যাত 'খিলাফত আন্দোলন' আতাতুর্কের এই এক সিদ্ধান্তে গভীর ধাক্কা খায়। ভারতীয় মুসলিমরা উসমানীয় খিলাফত রক্ষার জন্য কোটি কোটি টাকা ও সমর্থন পাঠাচ্ছিলেন। কিন্তু যখন খোদ তুর্কিরাই খিলাফত ছুঁড়ে ফেলে দেয়, তখন ভারতে খিলাফত আন্দোলন দিশেহারা হয়ে এক অনিশ্চিত সমাপ্তির মুখোমুখি হয়।
কায়রো সম্মেলন ও আরব বিশ্বের শূন্যতা: ১৯২৬ সালে মিসরের কায়রোতে বিশ্বের প্রধান প্রধান মুফতি ও আলেমদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল নতুন একজন খলিফা নির্বাচন করা। কিন্তু রাজা ফুয়াদ, মক্কার শরীফ হুসাইন এবং ইবনে সাউদের রাজনৈতিক বিরোধ ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে কোনো একক খলিফা নির্বাচনে মুসলিম বিশ্ব ব্যর্থ হয়।
রাজনৈতিক ইসলামের (Political Islam) উত্থান: খিলাফতের পতনের পর মুসলিম বিশ্বের শাসনব্যবস্থায় যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করতেই পরবর্তীতে গঠিত হয় বিভিন্ন আন্দোলন। ১৯২৮ সালে মিসরে প্রখ্যাত চিন্তাবিদ হাসান আল-বান্না প্রতিষ্ঠা করেন 'ইখওয়ানুল মুসলিমিন' (Muslim Brotherhood), যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী সমাজ পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় শরিয়ার প্রয়োগ।
খিলাফত বাতিলের তাৎক্ষণিক ভূরাজনৈতিক শূন্যতা
১৯২৪ সালের ৩ মার্চ খিলাফত বিলুপ্ত হওয়ার পর বিশ্বরাজনীতিতে যে বিশাল ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো এসেছিল:
হিজাজ ও সউদী আরবের উত্থান: খিলাফত বিলুপ্ত হওয়ার মাত্র তিনদিন পর (৬ মার্চ, ১৯২৪) মক্কার শরীফ হুসাইন বিন আলী নিজেকে সমগ্র বিশ্বের খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু মিসর, ভারত বা আরব বিশ্বের মুসলিমরা তাঁকে গ্রহণ করেনি। এর কিছুদিন পর নাজদের ইবনে সউদ হিজাজ আক্রমণ করে শরীফ হুসাইনকে তাড়িয়ে দেন এবং ১৯৩২ সালে আধুনিক সউদী আরব প্রতিষ্ঠা করেন।
ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের নিশ্চিত পতন: উসমানীয় খিলাফতের পতনের পর ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠনের পথ উন্মুক্ত হয়। সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ১৯০১ সালে থিওডোর হার্জেলকে ফিলিস্তিনে জমি বিক্রির প্রস্তাব বাতিল করে দিয়েছিলেন। কিন্তু খিলাফত না থাকায় ব্রিটিশ ম্যান্ডেট খুব সহজেই ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে বিযয়োনিস্টদের পুনর্বাসিত করতে সক্ষম হয়।
মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক ঐতিহাসিক বিচারে এমন এক চরিত্র, যাঁকে একটিমাত্র ছকে বাঁধা অসম্ভব। সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিনি নিশ্চিত বিনাশের হাত থেকে তুর্কি জাতিকে রক্ষা করে এক সার্বভৌম রাষ্ট্র দিয়েছিলেন। কিন্তু সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিচারে তিনি হাজার বছরের ইতিহাস ও বিশ্বাসের শিকড় কেটে ফেলেছিলেন, যার ক্ষত ও রাজনৈতিক মেরুকরণ আধুনিক তুরস্কে আজও সমানভাবে বিদ্যমান।
একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক তুরস্ক: আতাতুর্ক পরবর্তী যুগ ও এরদোয়ান ফ্যাক্টর
আতাতুর্ক ১৯৩৮ সালের ১০ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর প্রায় আট দশক ধরে সামরিক বাহিনী নিজেকে "কামালিজম ও ধর্মনিরপেক্ষতার রক্ষক" হিসেবে স্থাপন করে বারবার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্যু (Military Coup) পরিচালনা করেছে।
তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসে রেজেপ তাইয়িপ এরদোয়ান (Recep Tayyip Erdoğan) এবং তাঁর দল 'একে পার্টি' (AKP)-র ক্ষমতায় আসার পর তুরস্কের রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন মোড় এসেছে।
উসমানীয় ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ: এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন তুরস্ক একদিকে আতাতুর্কের তৈরি অর্থনৈতিক ও সামরিক ভিত্তিকে কাজে লাগাচ্ছে, অন্যদিকে তাদের উসমানীয় ও ইসলামিক ইতিহাসকে সানন্দে পুনরায় আপন করে নিচ্ছে।
আয়া সোফিয়ার রূপান্তর: ১৯৩৪ সালে আতাতুর্ক কর্তৃক জাদুঘরে রূপান্তরিত বিখ্যাত 'আয়া সোফিয়া' (Hagia Sophia)-কে ২০২০ সালে এরদোয়ান সরকার পুনরায় মসজিদে রূপান্তর করে। এটিকে অনেকেই আতাতুর্কের কামালিস্ট নীতির ওপর এক বড় সাংস্কৃতিক মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া পদক্ষেপ হিসেবে মনে করেন।
ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট: আজ একবিংশ শতাব্দীর তুরস্ক আতাতুর্কের তৈরি আধুনিক, শক্তপোক্ত সামরিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং অতীতের উসমানীয় ইসলামিক গৌরবের এক অদ্ভুত মিশ্রণে নিজেকে বিশ্বমঞ্চে 'নব্য-উসমানীয়' (Neo-Ottoman) শক্তি হিসেবে জাহির করছে।
সংক্ষেপণ ও চূড়ান্ত বিচার: দূরদর্শী নেতা নাকি পুতুল?
ইতিহাস কোনোদিন সাদা কিংবা কালো ফ্রেমের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না; ইতিহাস সর্বদাই ধূসর (Grey)। মোস্তফা কামাল আতাতুর্ককে কেবল "হিরো" কিংবা কেবল "ভিলেন" হিসেবে একপাক্ষিক ফ্রেমে ফ্রেমবন্দী করা ইতিহাস পাঠের এক চরম অপূর্ণতা।
সামরিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে: আতাতুর্ক নিঃসন্দেহে একজন অসাধারণ স্বাধীন ও প্রজ্ঞাবান সামরিক দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। গালিপোলির যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে আনাতোলিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ তিনি না থাকলে আজ মানচিত্রে 'তুরস্ক' নামক কোনো স্বাধীন দেশের অস্তিত্বই থাকত না; তুর্কি জাতি হয়তো গ্রীক বা ব্রিটিশদের দাসত্বে পিষ্ট হতো।
সংস্কৃতি ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে: আতাতুর্কের আধুনিকীকরণের মাত্রা ছিল চরমপন্থী ও অনমনীয়। খিলাফত বিলুপ্ত করা রাজনৈতিক প্রয়োজন ছিল কি না তা বিতর্কিত, কিন্তু নিজ দেশের বর্ণমালা বদলে দেওয়া, শত শত বছরের ইসলামিক ঐতিহ্যকে রাতারাতি অপরাধে পরিণত করা এবং জনগণের আকাক্সক্ষার তোয়াক্কা না করে ওপর থেকে অতি-পশ্চিমাকরণ চাপিয়ে দেওয়া এক ধরনের একনায়কত্ব ও আত্ম পরিচয়ের সংকট তৈরি করেছিল।
তিনি কি পশ্চিমা চক্রান্তের পুতুল ছিলেন?
সরাসরি বিচারে তিনি কোনো দেশের মাইনে করা বা সুতোয় টানা "পুতুল" ছিলেন না। কারণ তিনি পশ্চিমা শক্তিগুলোর (গ্রিস, ব্রিটেন, ফ্রান্স) সাথেই যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর চিন্তাভাবনা ও মানসিকতা ছিল পশ্চিমা অনুকরণপ্রবণতায় আচ্ছন্ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ইউরোপীয় ধাঁচের বিজ্ঞান, ধর্মনিরপেক্ষতা ও পোশাক গ্রহণ না করলে প্রাচ্যের কোনো জাতি টিকে থাকতে পারে না।
ফলস্বরূপ, তিনি না চেয়েও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের সেই মহৎ উদ্দেশ্যকেই সফল করে দিয়েছিলেন যা হলো বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে চিরতরে একক রাজনৈতিক নেতৃত্বহীন ও বিচ্ছিন্ন করে রাখা।
মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক তাই ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেওয়া এক জটিল, প্রভাবশালী ও বিতর্কিত চরিত্র। এক কলমের খোঁচায় তিনি উসমানীয় খিলাফতের পতন ঘটিয়ে উম্মাহর ইতিহাসকে ক্ষতবিক্ষত করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই সাথে এক ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে গড়ে তুলেছিলেন আধুনিক, স্বাবলম্বী ও পরাক্রমশালী তুর্কি রাষ্ট্র। মানব ইতিহাসের সেই ধূসর ক্যানভাসে তিনি আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন কারো কাছে বীর রূপকার, আর কারো কাছে এক বেদনার প্রতীক হিসেবে!



















