ইযউদ্দীন আল-কাসসাম - হামাসের ছোড়া প্রতিটি মিসাইলে যার নাম খোদাই করা

আজকের একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে, বিশেষ করে পশ্চিমা মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো যখনই ফিলিস্তিনের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতাকামী আন্দোলন কিংবা গাজার সশস্ত্র প্রতিরোধ নিয়ে আলোচনা করে, তখনই তারা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও কৌশলী ভাষায় কিছু তকমা ব্যবহার করে ‘সন্ত্রাসী’, ‘উগ্রপন্থী’ কিংবা ‘শান্তি বিনষ্টকারী’। কিন্তু ইতিহাসের ধূলিজাল ও প্রপাগান্ডার আড়ালে তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যে নামটি মুছে ফেলতে চায়, তা হলো শায়খ ইযউদ্দীন আল-কাসসাম (Shaykh Izz ad-Din al-Qassam)।
তিনি কোনো আধুনিক সামরিক অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষিত পেশাদার জেনারেল ছিলেন না, ছিলেন না কোনো সুবিশাল সাম্রাজ্যের সশস্ত্র অধিনায়ক। তিনি ছিলেন তৎকালীন ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক বন্দরাঞ্চল হাইফা (Haifa)-র এক অতি সাধারণ মসজিদের খতিব ও সমাজসংস্কারক। জুম্মার মিম্বরে দাঁড়িয়ে যিনি কেবল তাসাউফ, ব্যক্তিগত পরকাল কিংবা তোষামোদমূলক বয়ান পেশ করে শাসকশ্রেণী ও তৎকালীন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ লাটসাহেবদের হাততালি কুড়াতে পারতেন, তিনি বেছে নিয়েছিলেন এক অন্য পথ। একটি কঠিন, আত্মত্যাগী ও কণ্টকাকীর্ণ পথ।
পশ্চিমা শাসক ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক পরাশক্তিগুলো ভেবেছিল, ১৯৩৫ সালের নভেম্বরে জেনিনের গভীর পাহাড়ে এই বৃদ্ধ প্রচারককে ঝাঁঝরা করে দিলে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার স্বপ্ন চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। কিন্তু তারা জানত না—তারা কেবল রক্তমাংসের এক মানুষকে হত্যা করেছিল, যা দিনশেষে রূপান্তরিত হয়েছিল একটি অবিনশ্বর এবং অদম্য প্রতিরোধ মতাদর্শে (Endless Ideology)।
আজ এক শতাব্দী পরেও যখন তেল আবিবের আকাশে রকেট গর্জে ওঠে কিংবা গাজার সমুদ্রসৈকত থেকে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, তখন সেই প্রতিরোধ মিসাইলের গায়ে এই সাধারণ খতিবের নামটাই খোদাই করা থাকে- 'কাসসাম' (Al-Qassam)।
প্রাক-জীবন ও প্রেক্ষাপট: সিরিয়ার জাবলে থেকে আল-আজহার ও ফিলিস্তিনে আগমন
শায়খ ইযউদ্দীন আল-কাসসামের পুরো নাম মুহম্মদ ইযউদ্দীন ইবনে আবদে আল-কাদির আল-কাসসাম। ১৮৮২ (মতান্তরে ১৮৮৩) খ্রিষ্টাব্দে তদানীন্তন উসমানীয় (ওসমানীয়) সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা উত্তর সিরিয়ার সমুদ্র উপকূলীয় শহর 'জাবলে' (Jableh)-তে এক সম্ভ্রান্ত ও ধার্মিক সুফি পরিবারে তাঁর জন্ম হয়।
আল-আজহারের শিক্ষা ও রাজনৈতিক চেতনা
শৈশবে পিতার পরিচালিত মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের পর তরুণ কাসসাম তৎকালীন ইসলামী চিন্তাধারার প্রাণকেন্দ্র মিশরের কায়রোতে অবস্থিত বিশ্ববিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে (Al-Azhar University) গমন করেন। কায়রোতে অবস্থানকালে তিনি উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত মুজাদ্দিদ ও চিন্তাবিদদের সংস্কারমুখী সাহিত্য ও মতাদর্শ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন।
তিনি আল-আজহারে প্রখ্যাত সংস্কারক মুহম্মদ আবদুহ এবং রশিদ রিদা-র সান্নিধ্য পান।এখানে পাঠকালেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, বিশুদ্ধ ইসলামী শিক্ষা কেবল কিতাবের পাতায় বন্দি রাখার বিষয় নয়; এটি অত্যাচারী সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে সোচ্চার হওয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার।
ইতালীয় ও ফরাসি বিরোধী প্রথম প্রতিরোধ সংগ্রাম
১৯০৯ সালে আল-আজহার থেকে শিক্ষা শেষ করে তিনি জন্মভূমি জাবলেতে ফিরে আসেন এবং একজন শিক্ষক ও মসজিদের ইমাম হিসেবে জীবন শুরু করেন। কিন্তু বিশ্ব ভূ-রাজনীতি তখন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল।
ইতালির ত্রিপোলি আক্রমণ (১৯১১): ১৯১১ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে ইতালি যখন উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া (ত্রিপোলি) আক্রমণ করে, তখন শায়খ আল-কাসসাম চুপ করে বসে থাকেননি। তিনি স্থানীয় তরুণদের একত্র করে লিবিয়ায় ইতালীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ফান্ড সংগ্রহ করেন এবং নিজ হাতে যুদ্ধের স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করেন।
ফরাসিদের বিরুদ্ধে সিরীয় ফ্রন্ট (১৯১৯-১৯২১): প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে এবং ব্রিটিশ-ফরাসি চুক্তির (সাইকস-পিকোট চুক্তি) মাধ্যমে ফারসিরা যখন সিরিয়ার ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে (French Mandate), তখন কাসসাম জাবলের পাহাড়ি অঞ্চলে নিজস্ব গেরিলা বাহিনী গঠন করে ফরাসিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ফরাসি সামরিক আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলে তিনি কৌশলগতভাবে ফিলিস্তিনে হিজরত করেন।
ফিলিস্তিনের তৎকালীন পরিস্থিতি: ১৯২০-১৯৩০-এর দশকে ঔপনিবেশিক চক্রান্ত
১৯২১ সালে শায়খ ইযউদ্দীন আল-কাসসাম যখন ফিলিস্তিনের বন্দরনগরী হাইফা (Haifa)-য় এসে পৌঁছান, তখন ফিলিস্তিন ভূখণ্ড ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল।
বেলফোর ঘোষণা ও ব্রিটিশ ম্যান্ডেট (British Mandate)
১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড আর্থার বেলফোর তাঁর কুখ্যাত ‘বেলফোর ঘোষণা’ (Balfour Declaration)-র মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব ভূখণ্ডে এক ইহুদি জাতীয় আবাসস্থল (National Home for the Jewish People) গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে উসমানীয়দের পতনের পর জাতিসংঘ লীগ অফ নেশনস ব্রিটিশদের হাতে ফিলিস্তিনের 'ম্যান্ডেট' শাসনভার তুলে দেয়।
৩.২ ইউরোপীয় জায়নবাদী অন প্রবেশ ও কৃষকদের দুর্দশা
১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে ব্রিটিশ সরকারের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক, আইনি ও সামরিক সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে ইউরোপ থেকে লাখ লাখ জায়নবাদী ইহুদিকে জাহাজে করে এনে ফিলিস্তিনের মাটিতে নামানো হতে থাকে।
ভূখণ্ড দখল: বহিরাগত জায়নবাদী সংগঠনগুলো (যেমন: Jewish National Fund) ফিলিস্তিনিদের উর্বর কৃষিজমিগুলো চড়া দামে অথবা আইন বানিয়ে দখল করতে থাকে।
ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ: এর ফলে হাজার হাজার শতাব্দী প্রাচীন ফিলিস্তিনি কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে দিনমজুর ও সর্বস্বান্ত শরণার্থীতে পরিণত হতে থাকে।
এলিট আরব শাসকদের তোষামোদ ও ব্যর্থ কূটনীতি
যে সময়টাতে সাধারণ ফিলিস্তিনি কৃষক ও মজুরেরা নিজেদের জমি হারিয়ে উদ্বাস্তু হচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে তথাকথিত পরাক্রান্ত আরবের সুন্নি অভিজাত বর্গ ও নেতারা (যেমন জেরুজালেমের গ্র্যান্ড মুফতি আমিন আল-হুসাইনি ও অন্যান্য ভূস্বামী পরিবারগুলো) ব্রিটিশ লাটসাহেবদের সাথে করমর্দন ও আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্মারকলিপি পাঠাতে ব্যস্ত ছিলেন। তারা মনে করতেন ব্রিটিশদের তোষামোদ করে এবং টেবিল টকে বসে বুঝি জায়নবাদী আগ্রাসন থামানো যাবে! কিন্তু আল-কাসসাম খুব দ্রুতই বুঝতে পেরেছিলেন যে, তোষামোদ আর আইনি আবেদনের এই নপুংসক রাজনীতি দিয়ে কখনোই কোনো সাম্রাজ্যবাদকে হটানো যায় না।
মিম্বর থেকে সশস্ত্র দল: ‘আল-কাফ আল-আসওয়াদ’ ও অর্গানাইজিং কৌশল
হাইফায় আসার পর শায়খ আল-কাসসাম বিখ্যাত ‘আল-ইস্তিকলাল’ (Al-Istiklal) মসজিদে ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে তিনি কেবল গতানুগতিক আলেমদের মতো কিতাবি বয়ানের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি।
বস্তি ও শ্রমজীবী মানুষদের একত্রিত করা
কাসসাম হাইফার সবচেয়ে দরিদ্র ও নিঃস্ব বস্তিগুলোতে ঘুরে ঘুরে ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত কৃষক, কুলি, রেলওয়ে শ্রমিক ও দিনমজুরদের খুঁজে বের করেন। তিনি দেখতে পান, এই সাধারণ মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি শোষিত কিন্তু তাদের মধ্যেই রয়েছে দেশপ্রেম ও বিশ্বাসের আসল শক্তি। তিনি নাইট স্কুল খুলে তাদের নিরক্ষরতা দূর করেন, ইসলামী নৈতিক শিক্ষা দেন এবং তাদের মধ্যে জায়নবাদী বিপদ সম্পর্কে রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে তোলেন।
‘ব্ল্যাক হ্যান্ড’ স্কোয়াড (Al-Kaff al-Aswad) গঠন
১৯২৮ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে শায়খ আল-কাসসাম অত্যন্ত সাবধানে একটি গোপন সশস্ত্র সেল গঠন করেন, যা ইতিহাসে ‘ব্ল্যাক হ্যান্ড’ (Black Hand / Al-Kaff al-Aswad) বা ‘কাসসামিয়া’ (Al-Qassamiyyun) নামে পরিচিত।
অর্থায়ন ও অস্ত্র সংগ্রহ: আল-কাসসাম কোনো বিদেশি পরাশক্তি বা আরবের ধনী দরবারি শাসকদের কাছে হাত পাতেননি। তিনি নিজ পকেটের টাকা এবং সাধারণ কৃষকদের জমানো খুচরো টাকা দিয়ে গোপনে ব্ল্যাক মার্কেট থেকে রাইফেল ও গোলাবারুদ ক্রয় করেন।
কঠোর গোপনীয়তা ও সেল ব্যবস্থা: তিনি তাঁর সংগঠনকে অত্যন্ত সুসংগঠিত ছোট ছোট সেলে (Cell Structure) বিভক্ত করেন। প্রতিটি সেলে ৫ থেকে ৭ জন বিশ্বস্ত সদস্য থাকত। এক সেলের সদস্যরা অন্য সেলের পরিচয় জানতে পারত না, যেন ব্রিটিশদের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে কেউ গোপনীয়তা ফাঁস করে দিতে না পারে।
জেনিনের অসম যুদ্ধ ও শায়খ আল-কাসসামের শাহাদাত (১৯৩৫)
১৯৩৫ সালের নভেম্বর মাস। ফিলিস্তিনে ইউরোপীয় জায়নবাদীদের অনুপ্রবেশ তখন অনিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। ব্রিটিশ ও তাদের গড়ে তোলা সামরিক বাহিনী হাগানাহ (Haganah)-র অত্যাচারে ফিলিস্তিনিরা অতিষ্ঠ। শায়খ আল-কাসসাম অনুভব করলেন, আর গোপনে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় নেই; এবার সময় এসেছে সরাসরি মুক্তিসংগ্রাম ও সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দেওয়ার।
ইয়া’বাদের জঙ্গল ও ঘিরে ফেলা
১৯৩৫ সালের মধ্য নভেম্বরে শায়খ আল-কাসসাম তাঁর সবচেয়ে বিশ্বাসী ১২ থেকে ১৫ জন সশস্ত্র যোদ্ধাকে নিয়ে জেনিনের কাছে ‘ইয়া’বাদ’ (Ya'bad) পর্বতের ঘন পাইন বনাঞ্চলে গিয়ে অবস্থান নেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষকে ব্রিটিশ ও জায়নবাদীদের বিরুদ্ধে এক যোগে সশস্ত্র বিদ্রোহ বা 'জিহাদ'-এর উদাত্ত আহ্বান জানানো।
কিন্তু ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে ব্রিটিশ পুলিশ খবর পেয়ে যায়। ১৯৩৫ সালের ২০শে নভেম্বর ভোরে প্রায় ৫০০ এর বেশি সুসজ্জিত ব্রিটিশ রাজকীয় সেনা, অশ্বারোহী পুলিশ এবং রয়্যাল বিমান বাহিনীর নজরদারির মাধ্যমে পুরো ইয়া’বাদ পর্বত ঘিরে ফেলে।
"আমরা কখনো আত্মসমর্পণ করব না"
১২-১৫ জন রাইফেলধারী জরাজীর্ণ কৃষকের বিরুদ্ধে ৫০০ সশস্ত্র ব্রিটিশ সৈন্যের সেই মুখোমুখি সংঘাত ছিল ইতিহাসের অন্যতম এক অসম লড়াই। ব্রিটিশ কমান্ডার লাউডস্পিকারে শায়খ আল-কাসসামকে বার্তা পাঠায়:
"তোমরা চারপাশ থেকে ঘেরাও হয়ে গিয়েছ! নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে চাইলে অবিলম্বে অস্ত্র সমর্পণ করে আত্মসমর্পণ করো!"
ব্রিটিশদের সেই আত্মম্ভরিতাপূর্ণ আদেশের জবাবে বৃদ্ধ শায়খ আল-কাসসাম মিম্বরের সেই সিংহবিক্রম গলায় পাহাড় কাঁপিয়ে যে ঐতিহাসিক উক্তি করেছিলেন, তা ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামের মূল ভিত্তি হয়ে রয়েছে:
"আমরা কখনো আত্মসমর্পণ করব না! এটি আত্মসমর্পণ করার জায়গা নয়; এটি আমাদের এবং জান্নাতের মাঝখানের পরম সেতু! চলো, আমরা আমাদের পরাক্রান্ত মহান রবের জন্য শহীদ হয়ে যাই!"
শাহাদাত ও শোক মিছিলের বিপ্লব
টানা চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা সেই বীরত্বপূর্ণ অসম বন্দুকযুদ্ধের পর ব্রিটিশদের নির্বিচার গুলিবর্ষণে শায়খ ইযউদ্দীন আল-কাসসাম এবং তাঁর কয়েকজন অনুসারী শাহাদাত বরণ করেন।
ব্রিটিশ রাজকীয় সেনারা ভেবেছিল পাহাড়ের নির্জনতায় একজন বৃদ্ধ খতিবের রক্তমাখা লাশ ফেলে রাখলে হয়তো ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রাম চিরতরে নিভে যাবে। কিন্তু ব্রিটিশদের সেই ধারণা ছিল চরম ভুল।
হাইফায় যখন আল-কাসসামের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, তখন ইতিহাসের সবচেয়ে সুবিশাল জনস্রোত সেখানে আছড়ে পড়ে। হাজার হাজার সাধারণ ফিলিস্তিনি তাঁর কফিনের পেছনে হেঁটে শপথ নেয়।
তাঁর এই শাহাদাতই মূলত জন্ম দেয় ১৯৩৬-১৯৩৯ সালের ‘দ্য গ্রেট প্যালেস্টাইন রিভোল্ট’ (The Great Arab Revolt) যা ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
উত্তরাধিকারের রূপান্তর: 'কাসসাম' যেভাবে একটি অমর মতাদর্শে পরিণত হলো
ব্রিটিশরা শায়খ আল-কাসসামের জৈবিক দেহকে হত্যা করতে পেরেছিল ঠিকই, কিন্তু তারা হত্যা করতে পারেনি তাঁর আদর্শকে। সময়ের আবর্তে শায়খ আল-কাসসাম একটি নির্দিষ্ট নাম থেকে সমগ্র ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের সর্বজনীন প্রতীকে পরিণত হন।
ইযউদ্দীন আল-কাসসাম ব্রিগেডের উত্থান (১৯৯১)
১৯৮৭ সালে যখন ফিলিস্তিনের মাটিতে ১ম ইন্তিফাদা (Intifada) বা পাথর বিপ্লব শুরু হয় এবং ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন 'হামাস' (Hamas) আত্মপ্রকাশ করে, তখন তারা তাদের নবগঠিত আনুষ্ঠানিক সশস্ত্র সামরিক শাখার (Military Wing) নামকরণের জন্য বেছে নেয় এই মহান শহীদের নাম- ‘কাতায়িব আশ-শহীদ ইযউদ্দীন আল-কাসসাম’ (Ezzedeen Al-Qassam Brigades)।
'কাসসাম রকেট' (Qassam Rocket): ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রযুক্তিগত প্রতীক
২০০১ সালে গাজা ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধারা যখন সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে প্রথম লোহার পাইপ ও সারের বারুদ দিয়ে তৈরি স্বল্পপাল্লার রকেট নির্মাণ করে, তখন সেই রকেটের নামকরণ করা হয় ‘কাসসাম-১’ (Qassam-1)।
আজ এক শতাব্দী পর ২০২৬ সালেও যখন আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের অংশ হিসেবে তেল আবিব কিংবা দখলদার ভূখণ্ডের সামরিক ঘাটিগুলোর দিকে প্রতিরোধ মিসাইল ছোঁড়া হয়, তখন প্রতিটি মিসাইল ও রকেটের গায়ে খোদাই করা থাকে এই খতিবের নাম।
কাসসাম-১, ২, ৩ ও ৪: শূন্য থেকে শুরু হওয়া প্রযুক্তি আজ শত শত কিলোমিটার দূরপাল্লার গাইডেড মিসাইলে রূপ নিয়েছে।
প্রতীকের শক্তি: এই রকেটগুলো কেবল বিস্ফোরক নয়; এগুলো প্রমাণ করে যে, একজন খতিব যেভাবে খালি হাতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, ঠিক তেমনি এক শতাব্দী ধরে অবরুদ্ধ থাকা ফিলিস্তিনিরাও কোনো আধুনিক সেনাবহর ছাড়া বিশ্ব মোড়লদের চোখের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
ইতিহাস বনাম প্রপাগান্ডা: আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ
শায়খ ইযউদ্দীন আল-কাসসামের সংগ্রাম, তাঁর মূল দর্শন এবং কীভাবে আধুনিক সংবাদমাধ্যম ও বিশ্ব রাজনৈতিক শক্তিগুলো তাঁকে মূল্যায়ন করে তার একটি নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক বিবরণী তুলে ধরা প্রয়োজন।
নিচে শায়খ আল-কাসসামের আদর্শ, তৎকালীন প্রেক্ষাপট এবং আধুনিক রূপায়নের একটি পূর্ণাঙ্গ সারণী পেশ করা হলো:
বিচার্য বিষয় | পশ্চিমা প্রপাগান্ডা ও বিশ্ব রাজনৈতিক বয়ান | ঐতিহাসিক সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন |
মূল পরিচয় | 'উগ্রপন্থী প্রচারক', 'সন্ত্রাসের জনক' বা রাজনৈতিক চরমপন্থী। | হাইফার মসজিদের খতিব, সমাজসংস্কারক, শিক্ষক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বীর। |
সশস্ত্র আন্দোলনের কারণ | অহেতুক সহিংসতা সৃষ্টি ও উগ্র ধর্মীয় হিংসা ছড়ানো। | ব্রিটিশদের বেলফোর ঘোষণা, অবৈধ ইউরোপীয় জায়নবাদী দখলদারিত্ব ও ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের প্রতিরোধ। |
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি | উগ্র ধর্মীয় মতাদর্শ ছড়ানো। | সাধারণ শোষিত শ্রমিক, নিরক্ষর কৃষক ও সর্বস্বান্ত মানুষের অধিকার রক্ষা ও শিক্ষা প্রদান। |
সামরিক কৌশল | 'সন্ত্রাসবাদী স্কোয়াড' গঠন। | ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে অর্থায়িত আত্মরক্ষামূলক 'গুরুত্বপূর্ণ গেরিলা সেল'। |
পরবর্তী প্রভাব | এক মৃত বিদ্রোহী, যার আন্দোলন ১৯৩৫-এ শেষ হয়েছে। | এক কালজয়ী অবিনশ্বর মতাদর্শ (Endless Ideology), যা আজকের আধুনিক প্রতিরোধের প্রধান প্রেরণা। |
কাজী বা ‘ম্যারেজ রেজিস্টার’ হিসেবে ছদ্মবেশী নেটওয়ার্ক নির্মাণ
শায়খ আল-কাসসাম কেবল একজন খতিব ছিলেন না; ১৯২৯ সালে তিনি হাইফা শরিয়া আদালতের অধীনে একজন 'কাজী' বা বিবাহ নিবন্ধক (Marriage Registrar) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি ছিল তাঁর গোপন সংগঠন গড়ে তোলার সবচেয়ে চতুর কৌশল।
গ্রামীণ ফিলিস্তিনে প্রবেশাধিকার: বিবাহ নিবন্ধক হওয়ার কারণে ব্রিটিশ পুলিশ বা গোয়েন্দাদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ না জাগিয়ে তিনি অবাধে ফিলিস্তিনের এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরে বেড়াতে পারতেন।
ব্যক্তি বাছাই ও সাক্ষাৎকার: বিয়ে রেজিস্ট্রি করার বাহানায় তিনি স্থানীয় যুবকদের সামাজিক অবস্থান, চরিত্র ও মানসিক দৃঢ়তা গোপনীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি দেখতেন কে ব্রিটিশ বা জায়নবাদীদের তোষামোদ করছে আর কে পৈতৃক ভিটেমাটি হারানোর যন্ত্রণায় ছটফট করছে।
নেটওয়ার্ক বিস্তার: এই কাজীর ছদ্মবেশেই তিনি হাইফার আশপাশের প্রায় ৬০টি গ্রামে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কিন্তু গোপন সামরিক ও সামাজিক সেল গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন।
‘সরসুক চুক্তি’ ও সাধারণ কৃষকদের চরম ট্র্যাজেডি
আল-কাসসামের আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল ১৯২০-এর দশকে ফিলিস্তিনের কৃষকদের চরম সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়, যার নেপথ্যে ছিল কুখ্যাত ‘সরসুক পরিবার বিক্রি’ (Sursock Purchase)।
বৈরুতের অভিজাত সরসুক পরিবার যখন ফিলিস্তিনের সবচেয়ে উর্বর 'মার্জ ইবনে আমের' (Jezreel Valley) অঞ্চলের জমি জায়নবাদী সংস্থাদের কাছে বিক্রি করে দেয়, তখন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি কৃষক রাতারাতি উচ্ছেদ হয়ে পড়ে।
গৃহহীন এসব কৃষক পরিবার হাইফা শহরের উপকণ্ঠে টিনের তৈরি বস্তিতে (যা স্থানীয়ভাবে নুরউড বা টিনপট্টি নামে পরিচিত ছিল) চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস শুরু করে। আল-কাসসাম এই উচ্ছেদ হওয়া ও সর্বস্বান্ত কৃষকদের একত্রিত করে তাঁদের আত্মমর্যাদা ও অধিকার সচেতন করে তোলেন।
আল-কাসসামের ‘পাঁচ ধাপের সামরিক ডকট্রিন’
শায়খ আল-কাসসাম তাঁর গোপন সামরিক সংগঠনকে কঠোর শৃঙ্খলা ও ধাপে ধাপে গড়ে তুলেছিলেন। আধুনিক সামরিক গবেষকেরা তাঁর কৌশলকে ৫টি প্রধান ধাপে বিভক্ত করেন:
রুহানি ও আত্মশুদ্ধির স্তর: সংগঠনের কোনো সদস্যকে শুরুতেই অস্ত্র দেওয়া হতো না। প্রথম কয়েকমাস তাঁকে নৈতিকতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং ধর্মীয় শৃঙ্খলার শিক্ষা দেওয়া হতো।
কঠোর গোপনীয়তা (Compartmentalization): তিনি ৫ থেকে ৭ জন সদস্য বিশিষ্ট ক্ষুদ্র সেল গঠন করেন, যাকে বলা হতো ‘উসরা’ (Usra)। এক সেলের সদস্য জানত না অন্য সেলে কে কে আছে।
আত্মঅর্থায়ন: আল-কাসসাম কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে কোনো রাজনৈতিক নেতা বা বহিরাগত ফান্ডের টাকা নেওয়া যাবে না। শ্রমিকেরা তাঁদের অতি সামান্য আয় থেকে প্রতি মাসে ২০ থেকে ৫০ মিলস (তৎকালীন ব্রিটিশ মুদ্রার অংশ) চাঁদা দিয়ে নিজেদের অস্ত্র নিজেরা কিনতেন।
নৈশ সামরিক মহড়া: হাইফা শহরের পেছনে অবস্থিত 'কারমেল পর্বত' (Mount Carmel)-এর গভীর জঙ্গলে রাতের আঁধারে ফিলিস্তিনি যুবকদের আধুনিক রাইফেল চালানো, গ্রেনেড ছোড়া এবং যুদ্ধের কলাকৌশল শেখানো হতো।
সশস্ত্র প্রকাশ্য সংগ্রাম: যা ১৯৩৫ সালের নভেম্বরে জেনিনের ইয়া’বাদ পাহাড় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে।
ফরাসিদের বিরুদ্ধে সিরিয়ার পাহাড়ি গেরিলা যুদ্ধ (১৯১৯–১৯২১)
ফিলিস্তিনে আসার আগে শায়খ আল-কাসসাম সিরিয়াতে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, যা ইতিহাসে প্রায়শই চোখ এড়িয়ে যায়।
পাহাড়ি ফ্রন্ট গঠন: ফারসি বাহিনী সিরিয়া দখল করলে আল-কাসসাম নিজ জন্মভূমি জাবলের উত্তর-পশ্চিমের 'আলাউই পর্বতমালার' (Alawite Mountains) উপজাতীয় যুবকদের সংগঠিত করে গেরিলা দল গঠন করেন।
ইব্রাহিম হানানুর সাথে জোট: সিরিয়ার বিখ্যাত স্বাধীনতাকামী নেতা ইব্রাহিম হানানু (Ibrahim Hananu) এবং ওমর আল-বিতার-এর সাথে মিলে তিনি ফরাসি সামরিক ঘাঁটি ও সাপ্লাই লাইনে একাধিক আকস্মিক হামলা চালানো পরিচালনা করেন।
মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা: ১৯২০ সালে ফরাসি সামরিক আদালত তাঁকে সিরিয়ায় রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও সশস্ত্র বিদ্রোহের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। ফরাসি বাহিনীর চরম ধাওয়া সত্ত্বেও তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান এবং পরবর্তীতে ফিলিস্তিনে হিজরত করেন।
আল-কাসসামের প্রধান সহযোদ্ধা ও উত্তরসূরিগণ
১৯৩৫ সালে আল-কাসসাম শাহাদাত বরণ করলেও তাঁর গড়ে তোলা নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়নি। তাঁর বিশ্বস্ত উত্তরসূরিরা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যান:
শেখ ফারহান আল-সাদী (Farhan al-Sadi): আল-কাসসামের মৃত্যুর পর তাঁর গোপন সংগঠনের দায়িত্ব নেন ৮০ বছর বয়সী বীর আলেম শেখ ফারহান আল-সাদী। ১৯৩৬ সালের এপ্রিল মাসে ব্রিটিশ ও জায়নবাদী কনভয়ে হামলা চালিয়ে তিনি বিখ্যাত ‘১৯৩৬-১৯৩৯ গ্রেট আরব রিভোল্ট’-এর প্রথম ফায়ারিং সূচনা করেন। ১৯৩৭ সালে রোজা রাখা অবস্থায় ৮২ বছর বয়সে ব্রিটিশরা তাঁকে ফাঁসি দেয়।
সুবহি ইয়াসিন (Subhi Yasin): আল-কাসসামের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক শিষ্য। তিনি পরবর্তীকালে কাসসামি আন্দোলনের ইতিহাস এবং সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর বিস্তারিত বই লিখে গিয়েছেন।
আবু ইব্রাহিম আল-কাবীর (Abu Ibrahim al-Kabir): ১৯৩৬-৩৯ সালের বিপ্লবে উত্তর ফিলিস্তিনের গালিলি (Galilee) অঞ্চলে কাসসামি গেরিলা বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে কাজ করেন।
ফিলিস্তিনের রাজনীতিতে কাসসামের দ্বিমুখী মূল্যায়ন
ইতিহাসের ক্যানভাসে আল-কাসসামকে ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক দলগুলো ভিন্ন ভিন্ন কোণ থেকে দেখে থাকে:
ধর্মনিরপেক্ষ বা জাতীয়তাবাদী ধারা (PLO / Fatah): তারা আল-কাসসামকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের গণ্ডিতে না রেখে ‘সর্বজনীন ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী বীর’ হিসেবে দেখে, যিনি প্রথম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দেশীয় বন্দুক তুলে নিয়েছিলেন।
ইসলামী প্রতিরোধ ধারা (Hamas / PIJ): তারা আল-কাসসামকে আধুনিক ইসলামী স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র আন্দোলনের মূল রূপকার এবং আদর্শিক স্থপতি মনে করে।
আল-কাসসামের ঐতিহাসিক তাৎপর্য কেবল ১৯৩৫ সালের জেনিনের পাহাড়ে শেষ হয়ে যায়নি; এটি এমন এক রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তিপ্রস্তর ছিল, যার ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তী প্রায় এক শতাব্দী ধরে ফিলিস্তিনিরা তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
শায়খ আল-কাসসামের জীবন থেকে সংগৃহীত রাজনৈতিক ও মানবিক শিক্ষা
শায়খ ইযউদ্দীন আল-কাসসামের ৮৩ বছরের জীবনের পথচলা ও অকাল শাহাদাত কেবল ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের জন্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের যেকোনো শোষিত ও নির্যাতিত জাতির স্বাধীনতার আন্দোলনের জন্য কিছু মৌলিক বার্তা দিয়ে যায়:
তোষামোদ নয়, আত্মমর্যাদাই একমাত্র পথ: আল-কাসসামের জীবন প্রমাণ করে যে, দখলদার বা ঔপনিবেশিক শক্তির কাছে আইনি অনুনয়-বিনয় বা তোষামোদ করে কখনো আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতা ফিরে পাওয়া যায় না। স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে আত্মত্যাগের মানসিকতা ও বাস্তবভিত্তিক প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই।
আলেম সমাজ ও সামাজিক দায়িত্ব: মসজিদের মিম্বর কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতের জায়গা নয়; এটি সমাজের প্রতিটি অন্যায়, শোষণ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সত্য বলার সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম। আল-কাসসাম দেখিয়ে গিয়েছেন কীভাবে একজন আলেম বা আলেম সমাজ কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে জাতির কঠিনতম সংকট মুহূর্তে সরাসরি ময়দানে নেতৃত্ব দিতে পারে।
সাধারণ মানুষের শক্তিতে বিশ্বাস: তিনি কোনো রাজা বা ধনী ভূস্বামীদের ওপর নির্ভর করেননি। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন সমাজের একদম নিচুতলার মানুষ কৃষক, মজুর ও সাধারণ তরুণের শক্তির ওপর। তিনি প্রমাণ করেছেন, ঈমান ও আত্মমর্যাদাবোধ থাকলে নিঃস্ব মানুষও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর ঘুম হারাম করে দিতে পারে।
এক অবিনশ্বর আদর্শের মৃত্যুহীন যাত্রা
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো অত্যাচারী ও সাম্রাজ্যবাদীরা সবসময় মনে করে কোনো আন্দোলনের নেতাকে হত্যা করতে পারলেই বুঝি সেই আন্দোলনকে কবর দেওয়া যায়। ১৯৩৫ সালের ২০শে নভেম্বর জেনিনের ইয়া’বাদ পাহাড়ে ব্রিটিশ সেনাদল যখন রক্তে ভেজা আল-কাসসামের নিথর দেহটি দেখে উল্লাস করেছিল, তখন তারা ভেবেছিল ফিলিস্তিনের কাসসাম-গল্প বুঝি সেখানেই শেষ হয়ে গেল।
কিন্তু তাঁরা বুঝতে ভুল করেছিল। তারা রক্তমাংসের এক মানুষকে হত্যা করেছিল ঠিকই, কিন্তু তারা জন্ম দিয়েছিল এক মৃত্যুহীন মতাদর্শের।
আজ ১৯৩৫ সালের সেই জেনিনের পাহাড় থেকে শুরু হওয়া রক্তধারা ২০২৬ সালের আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধের ময়দানে এসেও এতটুকু ফিকে হয়নি। আজ ফিলিস্তিনের গলি থেকে গলি, গাজার সুরঙ্গ থেকে সুরঙ্গ এবং আকাশসীমায় ছোঁড়া প্রতিটি মিসাইলে যে নামটি ক্ষোদাই হয়ে বিশ্বমোড়লদের বুকে কাঁপন ধরায়, তা সেই সাধারণ খতিবের নাম শায়খ ইযউদ্দীন আল-কাসসাম। তিনি মিম্বর থেকে উঠে এসেছিলেন, আর চিরদিনের জন্য ইতিহাসের অমর ক্যানভাসে নিজের নাম খোদাই করে দিয়ে গিয়েছেন।




















