বেগম রোকেয়ার জন্মের আগে নারীরা কি অশিক্ষিত ছিলেন?

Dec 25, 2025

ইসলামি সভ্যতায় নারী শিক্ষার শেকড় অত্যন্ত গভীর এবং সুদৃঢ়। আধুনিক যুগে যখন নারী জাগরণ বা নারী অধিকারের কথা বলা হয়, তখন প্রায়শই এমন একটি ধারণা দেওয়া হয় যে, বিংশ শতাব্দীর আগে নারী সমাজ সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে বেগম রোকেয়ার অবদানকে যেভাবে মহিমান্বিত করা হয়, তাতে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে তবে কি বেগম রোকেয়ার আগে মুসলিম নারীরা অশিক্ষিত ছিলেন? ইতিহাস কিন্তু আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং গৌরবোজ্জ্বল এক সত্যের মুখোমুখি করে। ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগে জ্ঞানচর্চা কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সাহাবিদের আমল থেকে শুরু করে মধ্যযুগ পর্যন্ত মুসলিম নারীরা ছিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের একেকটি আলোকবর্তিকা।

বর্তমান সময়ের একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, ইসলাম বুঝি নারী শিক্ষার পথে অন্তরায়। অথচ আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে আরবের মরুভূমিতে যখন কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, তখন ইসলাম এসে ঘোষণা করেছিল— “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের (নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে) জন্য ফরজ।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৪)। ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞানার্জন কোনো সুযোগ নয়, বরং এটি একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল এক বিশাল সভ্যতা, যেখানে মহিয়সী নারীরা শুধু ছাত্র হিসেবে নয়, বরং শিক্ষক, ফকিহ, মুহাদ্দিস এবং বিজ্ঞানী হিসেবে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে নারী শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ

ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ নারী শিক্ষার জন্য বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তিনি কেবল মৌখিক নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং নারীদের জন্য বিশেষ শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন।

সহীহ বুখারীর (হাদিস ১০১) একটি বর্ণনা অনুযায়ী, এক নারী সাহাবি এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! পুরুষরা আপনার কাছ থেকে অনেক শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। আমাদের জন্য আলাদা একটি দিন নির্ধারণ করে দিন, যাতে আমরাও আপনার কাছ থেকে শিখতে পারি।” রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদের এই দাবিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন এবং নারীদের জন্য পৃথক একটি দিন নির্ধারণ করেন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি রাষ্ট্রে নারী শিক্ষার বিষয়টি ছিল একটি রাষ্ট্রীয় ও সাংগঠনিক অধিকার।

হযরত আয়েশা (রা.) ইসলামের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ নারী শিক্ষিকা

নারী শিক্ষার ইতিহাসে হযরত আয়েশা (রা.)-এর নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি কেবল রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সহধর্মিণী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম বড় আইনজ্ঞ (ফকিহ) ও হাদিস বিশারদ।

তাবেয়ী হযরত হিশাম ইবনে উরওয়াহ (রহ.) বলেন, “আমি কুরআন, ফারায়েজ (উত্তরাধিকার আইন), হালাল-হারাম, কাব্যিকতা, আরবের ইতিহাস ও বংশ বিদ্যায় হযরত আয়েশা (রা.)-এর চেয়ে অধিক জ্ঞানী আর কাউকে দেখিনি।” (তাযকিরাতুল হুফফাজ, ইমাম যাহাবি)।

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ২,২১০টি। তাঁর কাছে মদিনার বড় বড় সাহাবিরা জটিল মাসআলা ও আইনের ব্যাখ্যা জানার জন্য আসতেন। তিনি শুধু ঘরোয়া শিক্ষায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং তাঁর ঘরটি ছিল একটি সমৃদ্ধ বিদ্যাপীঠ, যেখান থেকে পরবর্তী প্রজন্মের বড় বড় আলেম ও মুহাদ্দিস তৈরি হয়েছেন।

সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে নারী সাহাবিদের বহুমুখী অবদান

ইসলামি স্বর্ণযুগে নারীরা শুধু ধর্মীয় জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং তাঁরা চিকিৎসা, প্রশাসন এবং সমাজসেবায় অভাবনীয় দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে রুফাইদা আল-আসলামিয়াহ (রা.)

ইতিহাসের প্রথম মুসলিম নার্স ও সার্জন হিসেবে পরিচিত রুফাইদা আল-আসলামিয়াহ (রা.)। খন্দকের যুদ্ধে তিনি একটি ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল পরিচালনা করতেন এবং আহতদের অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করতেন। তাঁর এই দক্ষতা ও সাহসিকতা প্রমাণ করে যে, ইসলাম নারীদের পেশাগত জ্ঞান অর্জনে কখনো বাধা দেয়নি।

প্রশাসনিক দায়িত্বে শিফা বিনত আব্দুল্লাহ (রা.)

শিক্ষকতা ও চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শী শিফা বিনত আব্দুল্লাহ (রা.)-কে খলিফা হযরত উমর (রা.) মদিনার বাজারের 'মুহতাসিব' বা বাজার পরিদর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এটি ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বিচারিক দায়িত্ব। অর্থনৈতিক লেনদেন তদারকি করা এবং ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করার মতো জটিল কাজে একজন নারীর নিযুক্তি প্রমাণ করে যে, শিক্ষিত মুসলিম নারীরা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও আসীন ছিলেন।

মধ্যযুগের নারী মুহাদ্দিস ও স্কলারদের জয়যাত্রা

ইসলামি স্বর্ণযুগ ও মধ্যযুগে হাজার হাজার নারী মুহাদ্দিসের নাম পাওয়া যায়। ইমাম যাহাবি এবং ইবনে হাজার আসকালানির মতো জগদ্বিখ্যাত আলেমদের জীবনী পড়লে দেখা যায়, তাঁদের অনেকেরই শিক্ষক ছিলেন মহিয়সী নারীরা।

ফাতিমা বিনত আবদুল্লাহ আল-জুযদানিয়াহ (রহ.): তিনি ছিলেন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে আসাকিরের শিক্ষক। তাঁর স্মৃতিশক্তি ও ইলম এতই গভীর ছিল যে, দূর-দূরান্ত থেকে স্কলাররা তাঁর দরবারে আসতেন।

কারিমা আল-মারওয়াজিয়াহ (রহ.): ইমাম বুখারীর ‘সহীহ বুখারী’র অন্যতম শ্রেষ্ঠ বর্ণনাকারী ছিলেন এই মহিয়সী নারী। তাঁর বর্ণনা এতটাই বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য ছিল যে, তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ আলেমগণ তাঁর কাছ থেকে সনদ নেওয়ার জন্য মক্কায় ভিড় করতেন।

বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের জননী ফাতিমা আল-ফিহরি

মুসলিম নারী শিক্ষার অনন্য এক কীর্তি হলো মরক্কোর 'আল-কারাওইয়ীন বিশ্ববিদ্যালয়'। ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে ফাতিমা আল-ফিহরি নামক এক দূরদর্শী নারী তাঁর সমস্ত সম্পদ দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন।

ইউনেস্কো এবং গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, এটি বিশ্বের প্রাচীনতম নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়। অক্সফোর্ড বা ক্যামব্রিজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার শত শত বছর আগে একজন মুসলিম নারীর হাতে পৃথিবীর প্রথম উচ্চশিক্ষা কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল। এটি কেবল নারী শিক্ষার ইতিহাস নয়, বরং গোটা মানবজাতির শিক্ষার ইতিহাসে মুসলিম নারীর শ্রেষ্ঠত্বের এক অমর স্বাক্ষর।

বাংলার প্রেক্ষাপটে বেগম রোকেয়া বনাম দীর্ঘ ইতিহাস

এখন প্রশ্ন আসে বাংলার নারী জাগরণের প্রেক্ষাপট নিয়ে। বেগম রোকেয়া যে সময়টিতে কাজ করেছেন, তখন মুসলিম সমাজ ইংরেজদের আগ্রাসন এবং বিভিন্ন সামাজিক কুসংস্কারের কারণে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছিল। সেই স্থবিরতা কাটাতে বেগম রোকেয়ার অবদান অনস্বীকার্য।

তবে মনে রাখতে হবে, বেগম রোকেয়ার প্রচেষ্টা কোনো নতুন ধর্মের প্রবর্তন ছিল না, বরং তা ছিল ইসলামের সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। ইসলামি ইতিহাসে নারী শিক্ষা সবসময়ই সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু একাদশ বা দ্বাদশ শতাব্দীর পর বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উপনিবেশবাদের প্রভাবে মুসলিম সমাজ যখন অবক্ষয়ের শিকার হয়, তখন নারীদের গৃহবন্দি করার একটি অনৈসলামিক সংস্কৃতি ডালপালা মেলে। বেগম রোকেয়া সেই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধেই লড়াই করেছিলেন, ইসলামের বিরুদ্ধে নয়।

ইসলামি শিক্ষার ধরণ - পর্দা বনাম জ্ঞান

ইসলাম নারী শিক্ষার অন্তরায় এই দাবি ইতিহাস ও যুক্তিবিরোধী। তবে ইসলাম শিক্ষার সেই রূপটির ওপর জোর দেয় যা নৈতিকতা এবং শ্লীলতাহানির ঊর্ধ্বে। ইসলামি সভ্যতায় নারীরা শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, কিন্তু তাঁরা পর্দার মর্যাদা রক্ষা করে এবং সুস্থ পরিবেশ বজায় রেখে সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রেখেছেন। শ্লীলতাহানি, পর্দা লঙ্ঘন বা নৈতিক অবক্ষয় কখনোই ইসলামি শিক্ষার অংশ ছিল না।

আলোর শেকড় যেখানে

পরিশেষে বলা যায়, বেগম রোকেয়া দক্ষিণ এশিয়ায় নারী শিক্ষার যে আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত করেছেন, তার জ্বালানি সংগৃহীত হয়েছিল চৌদ্দশ বছর আগের সেই মদিনার রাষ্ট্র থেকে। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে শুরু করে ফাতিমা আল-ফিহরি পর্যন্ত মুসলিম নারীরা জ্ঞানচর্চায় যে নেতৃত্বের আসনে ছিলেন, তা আজ ইতিহাস স্বীকৃত সত্য।

তাই নারী শিক্ষাকে ইসলামে কোনো “আধুনিক সংযোজন” বা “বাইরে থেকে আসা সংস্কার” বলা ভুল। বরং এটি ইসলামের মূল কাঠামো ও ঐতিহ্যেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ইসলাম নারীকে শুধু অক্ষরজ্ঞান দেয়নি, বরং তাঁদেরকে জ্ঞানের শিখরে আরোহণ করার দায়িত্ব ও অধিকার উভয়ই প্রদান করেছে।

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.