বেগম রোকেয়ার জন্মের আগে নারীরা কি অশিক্ষিত ছিলেন?

যে কারণে মেয়েরা বেশি বয়সী পুরুষদের জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ করে

একুশ শতকের আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক সমাজে দাঁড়িয়ে যখন নারী জাগরণ, নারী অধিকার কিংবা নারী শিক্ষার প্রসারের কথা আলোচনা করা হয়, তখন বিশ্বব্যাপী এক ধরনের একপেশে ও ইতিহাস-বিচ্ছিন্ন বয়ান উপস্থাপন করতে দেখা যায়। সাধারণ মানুষের মনে অবচেতনভাবেই এমন একটি ধারণা প্রোথিত করে দেওয়া হয়েছে যে, উনবিংশ বা বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের পূর্বে পৃথিবীর নারী সমাজ সার্বিকভাবে চরম অজ্ঞতা, অশিক্ষা ও সামাজিক অবদমন এবং অন্ধকারের গহ্বরে নিমজ্জিত ছিল। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের ক্ষেত্রে এটি প্রায় একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে যে, আধুনিক পাশ্চাত্য কিংবা ঔপনিবেশিক শিক্ষার সংস্পর্শে আসার আগে মুসলিম নারী সমাজ জ্ঞানচর্চার সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিল।

আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে যখনই নারী শিক্ষার আলোকবর্তিকা বা পথপ্রদর্শকদের নাম স্মরণ করা হয়, তখন স্বভাবতই প্রাতঃস্মরণীয় মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন-এর অবদানকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে উপস্থাপন করা হয়। নিঃসন্দেহে তৎকালীন অবক্ষয়গ্রস্ত, সামাজিক কুসংস্কার ও অচলায়তনে বন্দি মুসলিম সমাজের নারীদের মুক্ত করতে বেগম রোকেয়ার ভূমিকা ছিল বীরত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক। তবে এই ইতিহাসকে দেখতে গিয়ে যখন এটি ধরে নেওয়া হয় যে, বেগম রোকেয়ার পূর্বে কিংবা ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে মুসলিম নারীরা অশিক্ষিত ও গৃহবন্দি ছিলেন তখন তা ইতিহাসের এক বিশাল ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে অস্বীকার করার নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়।

ইতিহাসের নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ দলিল আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বিস্ময়কর এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ইসলামি সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই জ্ঞানচর্চাকে কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গ বা সামাজিক শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে আরবের মরুভূমিতে যে বিপ্লব সাধিত হয়েছিল, তা কেবল তাওহীদের বাণী প্রচার করেনি, বরং তৎকালীন নারী জাতিকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে এনে জ্ঞান, মর্যাদা ও রাষ্ট্র পরিচালনার রাজকীয় আসনে সমাসীন করেছিল। মদিনার প্রথম রাষ্ট্র থেকে শুরু করে মধ্যযুগের বাগদাদ, কর্ডোভা, কায়রো, দামেস্ক কিংবা ফেস শহর পর্যন্ত সর্বত্রই মুসলিম নারীরা কেবল বিদ্যার্থী ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, ফকিহ (আইনজ্ঞ), চিকিৎসক, সংগঠক এবং পৃথিবীর প্রথম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা।

এই বিশদ নিবন্ধে আমরা গভীর অনুসন্ধানী দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করব কীভাবে ইসলাম নারী শিক্ষাকে একটি ঐশী ও সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল, সাহাবি ও তাবেয়ীদের যুগে নারীরা কীভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শীর্ষে অবস্থান করেছিলেন এবং কীভাবে উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে বেগম রোকেয়ার আন্দোলন মূলত ইসলামের সেই হারিয়ে যাওয়া সুবর্ণ ঐতিহ্যকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার এক সংগ্রামী প্রয়াস ছিল।

জ্ঞানার্জন কোনো বিশেষ অধিকার নয়, বরং বাধ্যতামূলক দায়িত্ব

ইসলামি সভ্যতায় নারী শিক্ষার বিকাশ বোঝার জন্য সর্বপ্রথম ইসলামের মৌলিক দর্শনের দিকে তাকাতে হবে। অইসলামি ও প্রাক-ইসলামি সমাজগুলোতে নারীকে দেখা হতো একটি উপজাত (By-product) বা পুরুষের অধীনস্থ ভোগ্যবস্তু হিসেবে। প্রাচীন গ্রিক, রোমান কিংবা জাহেলি আরবে নারীর নিজস্ব কোনো আইনি, সামাজিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তা স্বীকার করা হতো না। কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়াকে চরম লজ্জার বিষয় মনে করে জীবিত কবর দেওয়া হতো।

এমন এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আগমন ঘটেছিল নারী জাতির পরম মুক্তিদাতা হিসেবে। ইসলাম ঘোষণা করল মানব হিসেবে পুরুষ ও নারী আল্লাহর কাছে আত্মিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যায়নে সমান

সর্বজনীন জ্ঞানের ঘোষণা

ইসলামের দ্বিতীয় প্রধান উৎস হাদিস শরীফে জ্ঞানার্জনকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকার হিসেবে রাখা হয়নি। রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বিশ্ববিখ্যাত একটি নির্দেশনায় বর্ণিত হয়েছে:

طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ

"জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলিমের (নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে) জন্য আবশ্যক বা ফরজ।" - (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৪)

কুরআন ও হাদিসের পরিভাষায় যখন 'মুসলিম' বা 'মানুষ' শব্দ ব্যবহার করে কোনো মৌলিক ইবাদতের নির্দেশ দেওয়া হয়, তা সমানভাবে পুরুষ ও নারী উভয়ের ওপর প্রযোজ্য হয়। সালাত, সিয়াম ও জাকাতের মতো 'জ্ঞানার্জন' করাও একজন মুসলিম নারীর জন্য ঐশীভাবে নির্ধারিত ফরজ দায়িত্ব। ইসলামি আইনের (ফিকহ) মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো নারী যদি তার প্রয়োজনীয় ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয়, তবে তা কেবল একটি সামাজিক অন্যায় নয়, বরং তার ওপর চেপে বসা একটি ধর্মীয় অপরাধ বা হকের বরখেলাপ।

জাহেলিয়াতের বিনাশ ও কন্যাসন্তানের শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব

জাহেলি যুগের কন্যাসন্তানকে জীবিত প্রোথিত করার কুপ্রথা উচ্ছেদ করে মহানবী ﷺ ঘোষণা করলেন যে, কন্যাসন্তান হলো পিতা-মাতার জন্য জান্নাতের মাধ্যম। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের অসংখ্য হাদিসে কন্যাসন্তানকে সুশিক্ষিত করার বিশেষ সওয়াব ও মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যার ঘরে কোনো কন্যাসন্তান বা দাসী থাকে, আর সে তাকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়, সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে এবং অতপর তাকে উপযুক্ত স্থানে বিবাহ দেয় তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ পুরস্কার (প্রতিদান)।" - (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৯৭)

এই একটি বিপ্লবী ঘোষণাই তৎকালীন আরব সমাজের চিত্র বদলে দিয়েছিল। যে সমাজে কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়া ছিল অভিশাপের, সেই সমাজেই কন্যাসন্তানকে সুশিক্ষিত করা হয়ে উঠল জান্নাতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সান্নিধ্য পাওয়ার প্রধান চাবিকাঠি।

নবুওয়াতের প্রাক্কালে ও মদিনা রাষ্ট্রে নারী শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা

ইসলামে নারী শিক্ষা কেবল তত্ত্বীয় উপদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবদ্দশাতেই মদিনা রাষ্ট্রে নারী শিক্ষার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন।

নারীদের জন্য পৃথক শিক্ষাদিবস নির্ধারণ

সাধারণত রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মজলিসে পুরুষ সাহাবিদের সমাগম বেশি থাকত। কিন্তু মদিনার নারীরা তাঁদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে চাননি। তারা সরাসরি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে গিয়ে তাঁদের জন্য শিক্ষার পৃথক ও সুনির্দিষ্ট সময় দাবির অধিকার উপস্থাপন করেন। সহীহ বুখারীর একটি বিখ্যাত হাদিসে এই প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ আছে:

হযরত আবু সাঈদ আল- khudri (রা.) থেকে বর্ণিত, এক নারী সাহাবি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দরবারে এসে বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল! পুরুষেরা আপনার কাছ থেকে সমস্ত জ্ঞান আয়ত্ত করে নিচ্ছে। আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একটি দিন নির্ধারণ করে দিন, যাতে আমরাও আপনার কাছে উপস্থিত হতে পারি এবং আল্লাহ আপনাকে যা শিখিয়েছেন তা থেকে আমাদের শিক্ষা দিতে পারেন।"

রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন: "তোমরা অমুক অমুক দিন একত্র হবে।"

অতঃপর নারীরা নির্ধারিত দিনে একত্র হতেন এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ সেখানে তাশরিফ নিয়ে যেতেন ও তাঁদেরকে কুরআন, ফিকহ ও নৈতিকতার শিক্ষা দিতেন। - (সহীহ বুখারী, হাদিস: ১০১)

এই ঘটনাটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বে মদিনা রাষ্ট্রে নারী শিক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট ক্লাসরুম বা সাপ্তাহিক প্রাতিষ্ঠানিক কর্মশালার সূচনা করা হয়েছিল। এটি ছিল সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত নারী শিক্ষা কার্যক্রম।

আনসার নারীদের প্রশংসনীয় অদম্য স্পৃহা

জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে কোনোপ্রকার কৃত্রিম লজ্জা বা সামাজিক বাধা যে অন্তরায় হতে পারে না, মদিনার আনসার নারীরা তা প্রমাণ করেছিলেন। তারা দ্বীনের সূক্ষ্ম ও জটিল প্রশ্নগুলো (যেমন- পরিচ্ছন্নতা, পারিবারিক আইন, মাতৃত্ব, অর্থনীতি ইত্যাদি) রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে নিঃসঙ্কোচে জিজ্ঞাসা করতেন।

হযরত আয়েশা (রা.) আনসার নারীদের এই একাডেমিক স্পৃহার প্রশংসা করে বলেছিলেন:

"আনসারী নারীরা কতই না উত্তম নারী! দ্বীনের জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে লজ্জা ও দ্বিধা কখনোই তাঁদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।" - (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৩৩২)

হযরত আয়েশা (রা.): বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নারী শিক্ষিকা ও আইনের মহীরুহ

বিশ্ব নারী শিক্ষার কথা বলতে গেলে যাঁর নাম ইতিহাসের স্বর্ণাঙ্কিত শিখরে জ্বলজ্বল করে, তিনি হলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)। তিনি কেবল রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রিয়তমা সহধর্মিণীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন তৎকালীন মানবজাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ আইনজ্ঞ, মুহাদ্দিস, গবেষক এবং বহুশাস্ত্রবিদ পণ্ডিত (Polymath)।

বহুমুখী বিদ্যায় অগাধ পান্ডিত্য

তাবেয়ী হযরত হিশাম ইবনে উরওয়াহ (রহ.) তাঁর পিতা উরওয়াহ ইবনে জুবায়ের (রহ.)-এর সূত্রে হযরত আয়েশা (রা.)-এর জ্ঞানের গভীরতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন:

"আমি কুরআন পাঠ, উত্তরাধিকার আইন (ফারায়েজ), হালাল-হারাম সম্পর্কিত জ্ঞান, ফিকহ, কাব্যচর্চা, আরবের ইতিহাস, বংশবিদ্যা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে হযরত আয়েশা (রা.)-এর চেয়ে অধিক জ্ঞানী আর কাউকেই দেখিনি।" - (তাযকিরাতুল হুফফাজ, ইমাম যাহাবি)

তিনি কেবল ধর্মীয় শাস্ত্রে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। আরবের প্রাচীন কবিদের কাব্য, ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ এবং তৎকালীন ইউনানি ও অ্যারাবিয়ান চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর অগাধ দখল ছিল। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অসুস্থতার সময় আগত চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন ও ভেষজ ওষুধের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করেই তিনি চিকিৎসাবিদ্যা আয়ত্ত করেছিলেন।

শিক্ষিকা ও একাডেমিক সেন্টার হিসেবে তাঁর গৃহ

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ২,২১০টি। হাদিস বর্ণনার দিক থেকে সাহাবিদের মধ্যে তাঁর অবস্থান প্রথম সারিতে (আসহাবে মুকাসসিরুন)। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে হযরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরা مبارকে মদিনার এক বিশাল একাডেমিক সেন্টারে পরিণত হয়েছিল।

বয়োবৃদ্ধ সাহাবি থেকে শুরু করে তৎকালীন উঠতি তাবেয়ীরা জটিল থেকে জটিলতর আইনি সমস্যার সমাধানের জন্য তাঁর শরণাপন্ন হতেন।

খলিফা হযরত উমর (রা.) ও হযরত ওসমান (রা.)-এর আমলে রাষ্ট্রীয় আইন ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত কোনো জটিলতা দেখা দিলে হযরত আয়েশা (রা.)-এর ফতোয়াকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করা হতো।

ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্র ও ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ২০০ জনেরও বেশি, যারা পরবর্তীতে গোটা মুসলিম বিশ্বে প্রখ্যাত আলেম ও বিচারক হিসেবে পরিচিতি পান।

ইমাম জুহরি (রহ.) এক ঐতিহাসিক উক্তি করেছিলেন:

"যদি তামাম বিশ্বের সমস্ত পুরুষের জ্ঞানকে এক পাল্লায় রাখা হয়, আর হযরত আয়েশা (রা.)-এর জ্ঞানকে অপর পাল্লায় রাখা হয়, তবে হযরত আয়েশা (রা.)-এর পাল্লাটিই ভারী হবে।" - (মুস্তাদরাকে হাকিম)

সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে নারী সাহাবিদের বহুমুখী অবদান

ইসলামি সভ্যতায় নারী শিক্ষা কেবল ঘরোয়া ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সাহাবি যুগে নারী সাহাবিরা চিকিৎসা, শল্যচিকিৎসা (Surgery), বাজার নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশি তদারকি, কুটির শিল্প এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজে অভূতপূর্ব পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মিলিটারি সার্জারিতে রুফাইদা আল-আসলামিয়াহ (রা.)

ইতিহাসের প্রথম মুসলিম নার্স, চিকিৎসক ও সার্জন হিসেবে স্বীকৃত ব্যক্তিত্ব হলেন হযরত রুফাইদা আল-আসলামিয়াহ (রা.)

খন্দকের যুদ্ধ এবং খাইবার যুদ্ধের সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশে তিনি মদিনার মসজিদে নববীতে একটি ভ্রাম্যমাণ ফিল্ড হাসপাতাল (Mobile Tent Hospital) স্থাপন করেছিলেন। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সাহাবিদের ব্যান্ডেজ করা, ক্ষত পরিষ্কার করা এবং অস্ত্রোপচার (Surgery) করতেন।

হযরত সাআদ ইবনে মুয়াজ (রা.) খন্দকের যুদ্ধে মারাত্মকভাবে আহত হলে রাসুলুল্লাহ ﷺ নির্দেশ দিয়েছিলেন, "তাঁকে রুফাইদার তাঁবুতে নিয়ে যাও, যেন আমি কাছ থেকে তাঁকে পর্যবেক্ষণ করতে পারি।"

রুফাইদা (রা.) কেবল একাই কাজ করতেন না, বরং তিনি অন্যান্য নারী সাহাবিদের চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সেবাকার্যের প্রশিক্ষণ দিতেন। যা আধুনিক নার্সিং ও ইনস্টিটিউশনাল মেডিকেল এডুকেশনের আদি রূপ।

অর্থনৈতিক প্রশাসন ও বিচার বিভাগে শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ (রা.)

প্রশাসনিক ক্ষেত্রে শিক্ষিত নারীর অংশগ্রহণের অনন্য দৃষ্টান্ত হলেন হযরত শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ (রা.)। তিনি প্রাক-ইসলামি আমলেই স্বাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন এবং গণিত ও অর্থনীতিতে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। তিনি মদিনার অন্যতম শীর্ষ শিক্ষিকা ছিলেন, যিনি হযরত হাফসা (রা.)-সহ বহু নারীকে মৌলিক শিক্ষা দান করেছিলেন।

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা.) তাঁর অসাধারণ বিচক্ষণতা, সততা এবং অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশে দক্ষতার কারণে তাঁকে মদিনার প্রধান বিচারিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র- 'মদিনা ট্রাঙ্ক মার্কেটের মুহতাসিব' (Chief Inspector of Market & Commerce) হিসেবে নিয়োগ দান করেন।

তাঁর কাজ ছিল বাজারের অর্থনৈতিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা, ভেজাল প্রতিরোধ করা, দাম নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং কোনো বাণিজ্যিক প্রতারণা হলে তা স্পট-ট্রায়ালের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তি করা। একজন নারীর অধীনে পুরো রাজধানীর বাজার প্রশাসন ন্যস্ত করার এই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসলামি রাষ্ট্রে নারী শিক্ষাকে সর্বোচ্চ মাত্রার পেশাদারিত্বে রূপ দেওয়া হয়েছিল।

মধ্যযুগীয় ইসলামি স্বর্ণযুগ: হাজার বছরের মহীয়সী মুহাদ্দিস ও নারী স্কলারদের জয়যাত্রা

সাহাবিদের যুগের পর ইসলাম যখন এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিশাল ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে, তখন ইসলামি স্বর্ণযুগে (Golden Age of Islam) হাজার হাজার নারী স্কলারের উদ্ভব ঘটেছিল। আধুনিক প্রাচ্যবিদ (Orientalist) ড. আকরাম নদভী তাঁর দীর্ঘ ৪০ বছরের গবেষণায় লিখিত ৪০ খণ্ডের বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-মুহাদ্দিসাত' (Al-Muhaddithat: The Female Scholars in Islam)-এ প্রায় ৮,০০০ (আট হাজার) প্রখ্যাত মুসলিম নারী স্কলার, ফকিহ ও মুহাদ্দিসের প্রামাণ্য জীবনী সংকলন করেছেন।

কারিমা আল-মারওয়াজিয়াহ (রহ.): সহীহ বুখারীর নির্ভরযোগ্যতার প্রতীক

একাদশ শতকের (৫ম হিজরি) অন্যতম সেরা মুহাদ্দিস ছিলেন কারিমা বিনতে আহমাদ আল-মারওয়াজিয়াহ (রহ.)। তিনি মক্কায় অবস্থান করে সহীহ বুখারীর অধ্যাপনা করতেন।

তাঁর বর্ণিত সহীহ বুখারীর পান্ডুলিপিটি (Manuscript) এতটাই নির্ভুল, বিশুদ্ধ ও মানসম্মত ছিল যে, তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পুরুষ আলেম, যেমন- ইমাম খতিব আল-বাগদাদি, আবুবকর ইবনে মানসুর প্রমুখ তাঁর নিকট মক্কায় গিয়ে সহীহ বুখারীর সনদ গ্রহণ করতেন।

কারিমা আল-মারওয়াজিয়াহ ছাড়া সহীহ বুখারীর সনদের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা অসম্ভব ছিল।

ফাতিমা বিনতে আবদুল্লাহ আল-জুযদানিয়াহ (রহ.)

ইসফাহানের এই মহান নারী স্কলার ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিস হাফেজ ইবনে আসাকির (রহ.)-এর প্রধান শিক্ষিকা। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে মুসনাদে আহমাদ ও আল-মু'জামুল কবির-এর মতো বিশাল বিশাল হাদিস গ্রন্থ হাজার হাজার ছাত্রের সামনে মুখস্থ পাঠ করাতেন।

ফাতিমা আল-সমরকন্দি (রহ.): ফিকহ জগতের আলোকবর্তিকা

দ্বাদশ শতকের প্রখ্যাত ফকিহ ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ আল-সমরকন্দি (রহ.) ছিলেন হানাফি ফিকহের অন্যতম প্রামাণ্য ব্যক্তিত্ব। তিনি তাঁর পিতা আলাউদ্দিন সমরকন্দির বিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ 'তুহফাতুল ফুকাহা' পুরোপুরি মুখস্থ রেখেছিলেন।

যখন কোনো জটিল ফতোয়া বিচারক বা বাদশাহর কাছে আসত, তখন ফাতিমা (রহ.) এবং তাঁর পিতা যৌথভাবে সনদে স্বাক্ষর করতেন।

পরবর্তীতে তাঁর বিবাহ হয় বিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ 'বাদায়িউস সানায়ি'-এর রচয়িতা আল-কাসানি (রহ.)-এর সাথে। বিয়ের পর কোনো ফতোয়ায় যদি ফাতিমা (রহ.)-এর স্বাক্ষর না থাকত, তবে দামেস্ক ও আলেপ্পোর আলেমরা তা গ্রহণ করতেন না।

ফাতিমা আল-ফিহরি ও পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়

জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মানব সভ্যতার ইতিহাসে মুসলিম নারীদের শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে বড় ও উজ্জ্বলতম প্রমাণটি অবস্থিত উত্তর আফ্রিকার মরক্কোর ঐতিহাসিক ফেস (Fez) নগরীতে।

৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে (২৪৫ হিজরি) একজন দূরদর্শী, বিত্তশালী ও সুশিক্ষিত মুসলিম নারী ফাতিমা আল-ফিহরি (Fatima al-Fihri) পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ও ডিগ্রিদায়ক বিশ্ববিদ্যালয়- 'ইউনিভার্সিটি অব আল-কারাওইয়ীন' (University of al-Qarawiyyin) প্রতিষ্ঠা করেন।

নিঃস্বার্থ দান ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি: ফাতিমা আল-ফিহরি তাঁর পিতা মুহাম্মদ আল-ফিহরির কাছ থেকে প্রাপ্ত সুবিশাল ধন-সম্পদ কোনো বিলাসবহুল জীবনযাপনে ব্যয় না করে, পুরো অর্থ উৎসর্গ করেছিলেন সমাজ ও শিক্ষার কল্যাণে। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যত দিন না পর্যন্ত এই মসজিদের নির্মাণকাজ শেষ হচ্ছে, তত দিন তিনি প্রতিদিন রোজা রাখবেন।

তিনি যে কেবল একটি সাধারণ মসজিদ ও মাদ্রাসা তৈরি করেছিলেন তা নয়; বরং তিনি এমন এক উন্মুক্ত জ্ঞানপীঠের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, যেখানে:

কুরআন, হাদিস ও ফিকহের পাশাপাশি গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা (Astronomy), ব্যাকরণ, চিকিৎসাবিজ্ঞান, রসায়ন, ভূগোল ও বিভিন্ন ভাষা শেখানো হতো। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা ইজাজাহ (Degree/Diploma) প্রদান করা হতো।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও আধুনিক প্রভাব: ইউনেস্কো (UNESCO) এবং গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস (Guinness World Records) দাপ্তরিকভাবে স্বীকার করেছে যে, মরক্কোর আল-কারাওইয়ীন বিশ্ববিদ্যালয় হলো বিশ্বের প্রাচীনতম নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত ডিগ্রি প্রদানকারী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

ইউরোপের বিখ্যাত অক্সফোর্ড (১১৬৭ খ্রি.), কেমব্রিজ (১২০৯ খ্রি.) কিংবা বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বহু শতক পূর্বে একজন মুসলিম নারীর হাত ধরে উচ্চশিক্ষার এই সূর্য উদিত হয়েছিল।

এই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল মুসলিমদের কেন্দ্র ছিল না; মধ্যযুগে খ্রিস্টান পণ্ডিত পোপ সিলেভেস্টার দ্বিতীয় (Pope Sylvester II), যিনি ইউরোপে আরবি সংখ্যা (Arabic Numerals) ও শূন্যের ব্যবহার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, এবং ইহুদি দার্শনিক মাইমোনাইডস (Maimonides) এই কারাওইয়ীন বিশ্ববিদালয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করতে এসেছিলেন।

কালজয়ী মুসলিম নারী মনীষীদের তালিকা

নিচে ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন যুগের বিখ্যাত ও প্রভাবশালী নারী স্কলার, চিকিৎসাবিদ, শাসক ও সমাজসেবীদের অবদান একটি একক সারণীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

নাম ও পরিচয়

সময়কাল / যুগ

প্রধান জ্ঞানের ক্ষেত্র / পেশা

ঐতিহাসিক প্রভাব ও অবিস্মরণীয় অবদান

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)

১ম হিজরি (মদিনা)

হাদিস, ফিকহ, কাব্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞান

২,২১০টি হাদিস বর্ণনা; মদিনার শীর্ষ ৭ ফকিহের অন্যতম; মদিনা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা।

হযরত রুফাইدا আল-আসলামিয়াহ (রা.)

১ম হিজরি (মদিনা)

সামরিক নার্সিং, চিকিৎসা ও সার্জারি

ইতিহাসের প্রথম মুসলিম নার্স ও সার্জন; মসজিদে নববীতে প্রথম ফিল্ড হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা।

হযরত শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ (রা.)

১ম হিজরি (মদিনা)

জনপ্রশাসন, অর্থশাস্ত্র ও শিক্ষা

খলিফা হযরত উমর (রা.) কর্তৃক মদিনা ট্রাঙ্ক মার্কেটের প্রধান মুহতাসিব (পরিদর্শক) নিযুক্ত।

আমরা বিনতে আব্দুর রহমান (রহ.)

১ম-২য় হিজরি (মদিনা)

হাদিস ও ইসলামি আইন (ফিকহ)

হযরত আয়েশা (রা.)-এর প্রধান ছাত্রী; মদিনার খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আজিজের ফতোয়া প্রদানকারী।

ফাতিমা আল-ফিহরি (রহ.)

৩য় হিজরি (৮৫৯ খ্রি.)

দূরদর্শী স্থপতি, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী

মরক্কোর 'আল-কারাওইয়ীন বিশ্ববিদ্যালয়'-এর প্রতিষ্ঠাতা; ইউনেস্কো অনুযায়ী প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়।

কারিমা আল-মারওয়াজিয়াহ (রহ.)

৫ম হিজরি (মক্কা)

হাদিস শাস্ত্র (মুহাদ্দিস)

সহীহ বুখারীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও প্রামাণ্য পান্ডুলিপির রচয়িতা ও প্রধান শিক্ষক।

সুতাইতা আল-মহামালি (রহ.)

৪থ হিজরি (বাগদাদ)

উচ্চতর গণিত, বীজগণিত ও আইন

বাগদাদের গণিতবিদ; জটিল উত্তরাধিকার হিসাব (ফারায়েজ) ও গাণিতিক সমীকরণের সমাধানকারী।

ফাতিমা আল-সমরকন্দি (রহ.)

৬ষ্ঠ হিজরি (দামেস্ক)

ফিকহ (হানাফি আইন শাস্ত্র)

তুহফাতুল ফুকাহা মুখস্থকারী; দামেস্কের বাদশাহ ও ফকিহদের জন্য যৌথ ফতোয়া স্বাক্ষরকারী।

আয়েশা বিনতে ইবনে হাজর (রহ.)

৯হ হিজরি (কায়রো)

হাদিস ও উচ্চতর সনদ প্রদান

ইবনে হাজর আসকালানির কন্যা; তৎকালীন কায়রোর শীর্ষ পুরুষ আলেমদের সানাদ প্রদানকারী।

ঔপনিবেশিক অবক্ষয়, বঙ্গীয় রেনেসাঁ ও বেগম রোকেয়ার আসল সংগ্রাম

এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন সামনে আসে: ইসলামি সভ্যতায় নারী শিক্ষার যদি এত সমৃদ্ধ ও সুদীর্ঘ ইতিহাস থেকে থাকে, তবে উনিশ ও বিংশ শতাব্দীতে এসে ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ করে বাংলার মুসলিম নারীরা কেন চরম অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও শিক্ষাহীনতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো? কেন বেগম রোকেয়াকে লড়াই করতে হয়েছিল?

ঔপনিবেশিক শাসনের আঘাত ও ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্নতা

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বাংলা তথা ভারতের শাসনক্ষমতা দখল করে, তখন তারা মুসলিমদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ফার্সি ও আরবি কেন্দ্রিক সনাতন শিক্ষা ব্যবস্থা (মাদ্রাসা, মক্তব ও খানকা প্রতিষ্ঠান)-কে সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেয়।

১৮৩৭ সালে ফার্সি ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বাতিল করা হয়। মুসলিম ওয়াকফ সম্পত্তি (যা দিয়ে বিনামূল্যে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর নিখরচায় খাওয়া ও শিক্ষার ব্যবস্থা হতো) বাজেয়াপ্ত করা হয়।

এর ফলে পুরো মুসলিম সমাজ রাতারাতি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সামাজিকভাবে চরম দেউলিয়া হয়ে পড়ে। পুরুষদের শিক্ষাই যখন বিপন্ন হয়ে পড়ল, তখন নারীদের প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

অনৈসলামিক কুসংস্কার ও 'পর্দা'র অপব্যাখ্যা

অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে তৎকালীন উপমহাদেশের অভিজাত ও মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় এক ধরনের রক্ষণশীল ও আত্মরক্ষামূলক খোলসের ভেতরে ঢুকে পড়ে। ইসলামি শরীয়াহ প্রদত্ত 'পর্দা' বা 'হিজাব' যা ছিল নারীর নিরাপত্তা, শালীনতা ও ব্যক্তিত্বের প্রতীক- তাকে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের 'অবরোধপ্রথা' বা 'পুরদাহ প্রথা'-এর সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়।

নারীদেরকে অক্ষরের আলো থেকে দূরে রাখা হতে লাগল এই মিথ্যা ভয়ে যে, তারা লিখতে শিখলে নাকি 'বেহায়াপনা' বা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়বে! কুরআন কেবল অর্থ না বুঝে তোতা পাখির মতো পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হলো। ইসলামি স্বর্ণযুগের উম্মুল মুমিনীন কিংবা ফাতিমা আল-ফিহরির ইতিহাস সাধারণ মুসলিমদের স্মৃতি থেকে মুছে গেল।

বেগম রোকেয়ার প্রকৃত সংগ্রাম: ইসলাম বিরোধিতা নয়, বরং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই

১৯০৯ সালে ভাগলপুরে এবং পরবর্তীতে ১৯১১ সালে কলকাতায় 'সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বেগম রোকেয়া যে বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন, তা পর্যালোচনা করলে আমরা তাঁর চিন্তা ও দর্শনে ইসলামের প্রকৃত রূপটিই দেখতে পাই।

আজকের অনেক তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ বা আধুনিক চিন্তাবিদ বেগম রোকেয়াকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে চান যেন তিনি ধর্ম বা ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। অথচ বেগম রোকেয়ার নিজের রচনায় এর সম্পূর্ণ বিপরীত প্রমান মেলে।

বেগম রোকেয়া তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ 'অবরোধবাসিনী'-তে যে প্রথার তীব্র সমালোচনা করেছেন, তা ইসলামের 'শরীয়াহসম্মত পর্দা' ছিল না; বরং তা ছিল তৎকালীন সমাজের অমানবিক, যুক্তিহীন ও অনৈসলামিক 'অবরোধপ্রথা'।

বেগম রোকেয়া তাঁর প্রবন্ধে পরিষ্কারভাবে লিখেছেন যে, ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা নারীকে পূর্ণ মানসিক, আইনি ও সামাজিক স্বাধীনতা এবং শিক্ষার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু পুরুষশাসিত সমাজ নিজেদের স্বার্থে ইসলামি নীতিকে বিকৃত করে নারীদের বন্দি করে রেখেছে। তিনি তাঁর স্কুলে মেয়েদের জন্য পর্দার সুব্যবস্থা রেখেই উচ্চতর আধুনিক ও নৈতিক শিক্ষার আয়োজন করেছিলেন।

অতএব, এটি অত্যন্ত পরিষ্কার যে- বেগম রোকেয়া দক্ষিণ এশিয়ায় নারী শিক্ষার যে আলো জ্বালিয়েছিলেন, তার প্রকৃত জ্বালানি ও অনুপ্রেরণা সংগৃহীত হয়েছিল চৌদ্দশ বছর আগের মদিনার রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দেওয়া সুমহান ইসলামি আদর্শ থেকেই। তিনি কোনো পাশ্চাত্য সংস্কৃতি আমদানি করেননি; বরং মুসলিম সমাজকে তাদের নিজেদের হারিয়ে যাওয়া 'ইসলামি ঐতিহ্য' স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন।

নৈতিকতা, পর্দা ও শিক্ষা: ইসলামি জ্ঞানচর্চার ভারসাম্যপূর্ণ ও আধুনিক রূপরেখা

বর্তমান সময়ে নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দুটি চরমপন্থী মতবাদ (Extreme views) দেখা যায়- ইসলামি সভ্যতা এই দুটি চরমপন্থার বিপরীতে একটি অত্যন্ত সুষম, ভারসাম্যপূর্ণ এবং টেকসই মডেল উপস্থাপন করে।

'পর্দা' কোনো শিকল নয়, এটি আত্মমর্যাদার বর্ম: ইসলামে পর্দা বা হিজাব কোনো প্রতিবন্ধকতা বা জ্ঞানের আলোর দেয়াল নয়। হযরত আয়েশা (রা.), হযরত শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ (রা.) কিংবা মধ্যযুগের কারিমা আল-মারওয়াজিয়াহ (রহ.) তাঁরা প্রত্যেকেই সর্বোচ্চ পর্যায়ের পর্দা ও হিজাব রক্ষা করেই জ্ঞানচর্চা করেছেন, পুরুষ স্কলারদের শিক্ষা দিয়েছেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় উপদেশ দিয়েছেন।

ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, পর্দা নারীর কণ্ঠ বা বুদ্ধিমত্তাকে রুদ্ধ করে না; বরং তা নারীকে একটি শালীন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে, যেন সমাজ তাকে কেবল একটি 'শারীরিক অবয়ব' বা 'ভোগ্যপণ্য' হিসেবে না দেখে একজন 'বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তা' হিসেবে সম্মান করে।

নৈতিকতাহীন শিক্ষার ভয়াবহতা বনাম ইসলামি মূল্যবোধ: আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা যখন কেবল সনদ অর্জনে এবং চরম ভোগবাদী ও অনৈতিক লাইফস্টাইল তৈরিতে ব্যস্ত, তখন ইসলামি শিক্ষার মূল দর্শন হলো জ্ঞান অর্জন হতে হবে নৈতিকতা, শালীনতা ও স্রষ্টানুভূতির সমন্বয়ে।

যে শিক্ষা মানুষকে অহংকারী বানায়, পিতা-মাতার অবাধ্য হতে শেখায় কিংবা সামাজিক শালীনতা ধ্বংস করে ইসলাম সেই শিক্ষাকে 'ক্ষতিকর জ্ঞান' (علم لا ينفع) হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ইসলাম এমন শিক্ষার কথা বলে যা নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটাবে, তাকে একজন সচেতন নাগরিক, দক্ষ পেশাদার এবং একটি সুশিক্ষিত ভবিষ্যতের প্রজন্মের জননী হিসেবে গড়ে তুলবে।

হারানো ঐতিহ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও ভবিষ্যৎ পথের দিশা

ইতিহাসের ধূলিমলিন পাতাগুলো উল্টালে এই সত্যটি সূর্যের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ইসলামি সভ্যতায় নারী শিক্ষা কোনো আধুনিক সংযোজন (Modern Addition), পাশ্চাত্য থেকে ধার করা কোনো ধারণা বা বাইরে থেকে আসা কোনো সংস্কার আন্দোলন নয়। বরং এটি ইসলামের আদি আকাইদ, মূল সমাজনীতি ও শরীয়াহর একটি অবিচ্ছেদ্য এবং শাশ্বত অঙ্গ।

আরবের মরভূমিতে অবহেলিত কন্যাসন্তানকে জীবনের অধিকার দিয়ে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, মদিনার মসজিদে নববীতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিবিড় তত্ত্বাবধানে যে নারী শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, হযরত আয়েশা (রা.)-এর অনন্য মেধা ও রুফাইদা আল-আসলামিয়াহ (রা.)-এর সার্জারি চিকিৎসায় যা পূর্ণতা পেয়েছিল, মরক্কোর ফাতিমা আল-ফিহরির হাতে বিশ্ববিদালয়ের রূপ ধরে যা মধ্যযুগীয় বিশ্বকে আলোকিত করেছিল, আর পরবর্তীতে বেগম রোকেয়ার সংগ্রামের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে যার নবজাগরণ ঘটেছিল- সেই ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ঐতিহ্যগতভাবেই মুসলিম নারীরা ছিলেন বিশ্বজ্ঞানচর্চার সম্মুখভাগের কারিগর।

আজকের একুশ শতকের মুসলিম সমাজের মূল দায়িত্ব হলো অপপ্রচার ও হীনমন্যতা থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের এই গৌরবোজ্জ্বল ব্যাকগ্রাউন্ডকে নতুন করে জানা এবং অনুধাবন করা। একদিকে ধর্মান্ধতা ও ধর্মীয় অপব্যাখ্যার নামে নারীদের শিক্ষাবঞ্চিত করার অনৈসলামিক মানসিকতাকে যেমন কঠোরভাবে নির্মূল করতে হবে; অন্যদিকে আধুনিকতা বা স্বাধীনতার নামে নৈতিকতাহীন অপসংস্কৃতির প্রভাবে যেন আমাদের নারীরা তাঁদের মৌলিক বিশ্বাস, শালীনতা ও আত্মপরিচয় হারিয়ে না ফেলেন সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

মুসলিম নারীরা যখন তাঁদের হাতে একাধারে কুরআন ও সুন্নাহর নৈতিক আলোকবর্তিকা এবং আধুনিক বিজ্ঞান, শিক্ষা ও প্রযুক্তির মশাল ধারণ করবেন ঠিক তখনই আবার গড়ে উঠবে এক নতুন 'আল-কারাওইয়ীন', উন্মোচিত হবে এক নতুন 'মদিনার বিদ্যাপীঠ' এবং বিশ্ব মানবতা ফিরে পাবে তার কাঙ্ক্ষিত শান্তি, ন্যায়বিচার ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.