বেগম রোকেয়া বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত নাকি র্যাডিক্যাল চিন্তার স্রষ্টা?
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০–১৯৩২) বাংলা সাহিত্য ও সমাজ-সংস্কারের ইতিহাসে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম। তাঁকে আমরা সাধারণত “নারী জাগরণের অগ্রদূত”, “মুসলিম নারী শিক্ষার পথিকৃৎ”, “সুলতানার স্বপ্ন”-এর স্রষ্টা হিসেবে চিনি। কিন্তু তাঁর রচনাবলির গভীরে প্রবেশ করলে যে ছবি উঠে আসে তাকে অনেকেই এড়িয়ে যান। সেখানে দেখা যায় ধর্মগ্রন্থ, নবী-রাসূল, পুরুষজাতি ও বিবাহ প্রথার প্রতি তীব্র সমালোচনা; এমনকি সন্তানধারণকেও তিনি “পাশবিক কাজ” বলে অভিহিত করেছেন। আজকের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বেগম রোকেয়ার এই চিন্তাধারা শুধু নারীবাদীই নয়, সরাসরি ধর্মবিশ্বাস-বিরোধী ও নাস্তিকতার দিকে হেলে পড়া র্যাডিক্যাল নারীবাদের প্রথম দৃষ্টান্ত।
ঐতিহ্যগত ছবি ও তার বাইরে
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পাঠ্যপুস্তকে বেগম রোকেয়াকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয় তাতে তিনি একজন সংস্কারবাদী মুসলিম নারী, যিনি পর্দার ভেতর থেকেই শিক্ষার আলো ছড়িয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর নিজের লেখা পড়লে দেখা যায়, তিনি পর্দা, বোরখা, ধর্মীয় বিধান ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মূলেই আঘাত করেছিলেন। তাঁর কলম ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং কখনো কখনো বিদ্রূপে ভরা।
ধর্মগ্রন্থ ও নবী-রাসূল সম্পর্কে রোকেয়ার স্পষ্ট বক্তব্য
১৯২৮-এ প্রকাশিত “আমার জীবনকথা” ও পরবর্তী রচনাবলিতে তিনি লিখেছেন:
“তারপর মহাত্মা মহম্মদ আইন প্রস্তুত করিলেন যে, ‘রমনী সর্বদাই নরের অধীনে থাকিবে… বিবাহের পূর্বে পিতা কিংবা ভ্রাতার অধীনা, বিবাহের পর স্বামীর অধীনা, স্বামীর অভাবে পুত্রের অধীনা থাকিবে’। আর মূর্খ নারী নতমস্তকে ঐ বিধান মানিয়া লইল।” (রোকেয়া রচনাবলি, পৃ. ৬১০–৬১১)
একইভাবে তিনি যিশু খ্রিস্ট (ঈসা আ.) প্রসঙ্গে লিখেছেন:
“ক্রমে জগতের বুদ্ধি বেশি হওয়ায় সুচতুর প্রতিভাশালী পুরুষ দেখিলেন যে, ‘পয়গম্বর’ বলিলে আর লোকে বিশ্বাস করেনা। তখন মহাত্মা ঈসা আপনাকে অবতারের অংশবিশেষ (ইশ্বরের পুত্র) বলিয়া পরিচিত করিয়া ইঞ্জিল গ্রন্থ রচনা করিলেন। তাহাতে লেখা হইলো ‘নারী পুরুষের সম্পূর্ণ অধীনা’।”
“মহাত্মা” শব্দটি এখানে স্পষ্ট বিদ্রূপাত্মক। একইভাবে তিনি ঈসা (আ.)-কে “সুচতুর প্রতিভাশালী পুরুষ” বলে বর্ণনা করেছেন যিনি নিজেকে “ইশ্বরের পুত্র” বলে প্রচার করেছেন। এই ভাষা সরাসরি নবুওয়তের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে।
এ ধরনের বক্তব্য আজকের দিনেও ব্লাসফেমি আইনে শাস্তিযোগ্য। কিন্তু ১৯০৫-১৯৩২ সালের মধ্যে একজন মুসলিম নারী এই ভাষায় লিখেছিলেন, এটাই তাঁর র্যাডিক্যাল চরিত্রের প্রমাণ।
ধর্মকে পুরুষের তৈরি শাসনব্যবস্থা বলে চিহ্নিত করা
“স্ত্রীজাতির অবনতি” (১৯০৪) প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন:
“যখনই কোন ভগ্নি মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছেন তখনই ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচন-রূপ অস্ত্রাঘাতে তাহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে… আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন… তবেই দেখিতেছেন, এই ধর্মগ্রন্থগুলো পুরুষ রচিত বিধি ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে।”
এখানে “ঐ ধর্মগ্রন্থগুলো” বলতে তিনি হিন্দু শাস্ত্রের পাশাপাশি কুরআন-হাদিসকেও বোঝাচ্ছেন। পুরো প্রবন্ধের কনটেক্সটে তিনি মুহাম্মাদ (সা.)-এর আইনকে “মহাত্মা মহম্মদ” রচিত বলে উল্লেখ করেছেন এবং নারীদের তা মেনে নেওয়াকে “মূর্খতা” বলেছেন।
এই বক্তব্য আজকের সেক্যুলার ফেমিনিজমের ভাষার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। রোকেয়া স্পষ্টভাবে বলছেন ধর্মগ্রন্থ ঈশ্বরপ্রেরিত নয়, পুরুষের রচিত শাসননীতি।
ধর্মগ্রন্থের সমালোচক, নাকি ধর্ম-বিদ্বেষী?
বেগম রোকেয়ার লেখাগুলোর আগে-পরের অংশ সামনে রাখলে রোকেয়ার এই অনুচ্ছেদের সারাংশ দাঁড়ায়-
পবিত্র কুরআন এবং রাসূল মুহাম্মাদ (স.) এর হাদিস ও সুন্নাহ বানোয়াট (নাউযুবিল্লাহ)।
আল্লাহর সঙ্গে সেসবের কোনো সম্পর্ক নেই (নাউযুবিল্লাহ)।
মুহাম্মাদ সাঃ আল্লাহর প্রেরিত নবী ছিলেন না (নাউযুবিল্লাহ)।
যেহেতু মুহাম্মাদ (স.) আল্লাহর প্রেরিত কেউ নন, বস্তুত তিনি একজন ভণ্ড, প্রতারক ও মিথ্যুক (নাউযুবিল্লাহ)।
উম্মাহাতুল মুমিনীন সহ নারী সাহাবীগণ সকলেই ছিলেন মূর্খ। নতুবা তারা মুহাম্মাদ (স.) এর বানোয়াট বিধান বিনা বাক্যে মেনে নিতেন না (নাউযুবিল্লাহ)।
পুরুষজাতির প্রতি তীব্র ঘৃণা ও বিদ্রূপ
তাঁর বিদ্রূপের তীর ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। কয়েকটি উদাহরণ:
“কুকুরজাতি পুরুষাপেক্ষা অধিক বিশ্বাসযোগ্য।” (ডেলিশিয়া-হত্যা)
“নারীস্থানে স্বয়ং শয়তানকেই (পুরুষ জাতি) শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়াছেন, দেশে আর শয়তানী থাকিবে কি রূপে?” (সুলতানার স্বপ্ন)
“নারী যাহা দশ বৎসরে করিতে পারে, পুরুষ তাহা শতবর্ষেও করিতে অক্ষম।”
এ ধরনের ভাষা আজকের র্যাডিক্যাল ফেমিনিস্টদের লেখাতেও দুর্লভ।
সন্তানধারণ ও মাতৃত্বকে “পাশবিক কাজ” বলা
হুমায়ুন আজাদ সম্পাদিত “নারী” গ্রন্থে (১৯৯২) রোকেয়ার একটি অংশ উদ্ধৃত হয়েছে:
“নারীর গর্ভধারণ একান্ত পাশবিক কাজ… পুরুষতন্ত্রের শিক্ষার ফলে নারী আজো মনে করে গর্ভধারণেই তার জীবনের সার্থকতা… আমূল নারীবাদীরা মনে করেন মানবপ্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নারীর নয়, পুরুষকে উদ্ভাবন করতে হবে সন্তানসৃষ্টির বিকল্প পথ।”
এই চিন্তা ১৯০৫-৩০ এর দশকে এসেছে যখন শুক্লা ফায়ারস্টোনের “The Dialectic of Sex” (১৯৭০) বা আধুনিক ট্রান্সহিউম্যানিস্ট ফেমিনিজমও জন্মায়নি।
রোকেয়ার চিন্তার উৎস কোথায়?
প্রচলিত জীবনীতে বলা হয়, ভাই ইব্রাহিম সাবের ও স্বামী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সহায়তায় তিনি সামান্য বাংলা-ইংরেজি শিখেছিলেন। কিন্তু এই সামান্য শিক্ষা থেকে কীভাবে এত র্যাডিক্যাল চিন্তার জন্ম হলো? সম্ভাব্য কয়েকটি উৎস:
ব্রাহ্ম আন্দোলনের প্রভাব (তাঁর পরিবারের সঙ্গে ব্রাহ্মদের ঘনিষ্ঠতা ছিল)
থমাস পেইন, মেরি ওলস্টোনক্রাফটের লেখা পরোক্ষভাবে পড়ার সম্ভাবনা
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা - ১৪ বছর বয়সে বিয়ে, স্বামীর মৃত্যুর পর একা সংগ্রাম
কোরআন নিজে পড়ে তার পুরুষতান্ত্রিক ব্যাখ্যার প্রতি ক্ষোভ
আজকের প্রেক্ষাপটে রোকেয়া
বেগম রোকেয়ার চিন্তা তসলিমা নাসরিন, আবুল কাশেম ফজলুল হক, আরিফুর রেহমান বা বাংলাদেশের আধুনিক নাস্তিক-মানবতাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে। তিনি প্রথম মুসলিম নারী যিনি:
ধর্মগ্রন্থকে পুরুষের রচনা বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন
নবী-রাসূলের আইনকে নারী-দমনের হাতিয়ার বলে চিহ্নিত করেন
বিবাহ ও মাতৃত্বকে দাসত্বের প্রতীক বলে প্রত্যাখ্যান করেন
বোরখা-পর্দাকে কারাগারের বেড়ি ও শিকলের সঙ্গে তুলনা করেন
আমরা কোন রোকেয়াকে চিনি?
বাংলাদেশে বেগম রোকেয়া দিবস পালন করা হয়, তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয় আছে, পদক আছে। কিন্তু তাঁর আসল লেখা পড়ানো হয় না। কারণ পড়ালে প্রশ্ন উঠবে - যে নারী নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আইনকে “মূর্খ নারী নতমস্তকে মানিয়া লইল” বলেছেন, তাঁকে কি সত্যিই “বেগম” উপাধি দিয়ে সম্মান করা যায়?
বেগম রোকেয়া ছিলেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে র্যাডিক্যাল চিন্তাবিদ - একজন নারী যিনি ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে একসঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি নারীবাদের অগ্রদূত ছিলেন বটে, কিন্তু সেই নারীবাদ ছিল সেক্যুলার, ধর্মবিরোধী এবং আজকের ভাষায় “এন্টি-থিইস্ট”।
তাই প্রশ্ন থেকে যায় - আমরা কি সত্যিই বেগম রোকেয়াকে চিনি? নাকি শুধু তাঁর একটা স্যানিটাইজড, ধর্মসম্মত, পুরুষতান্ত্রিকভাবে গৃহীত ভার্সনকে “জাতীয় নারী আইকন” বানিয়ে রেখেছি?




















