ক্যাম্প বুকা ও আইএস - যে মার্কিন কারাগারে জন্ম নিয়েছিলো ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম সন্ত্রাসী সংগঠন

ক্যাম্প বুকা ও আইএস - যে মার্কিন কারাগারে জন্ম নিয়েছিলো ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম সন্ত্রাসী সংগঠন

একুশ শতকের আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ইতিহাসে 'ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দ্য শাম' বা আইএস (ISIS)-এর চেয়ে বেশি নৃশংস, ধ্বংসাত্মক ও প্রভাববিস্তারকারী কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের দেখা মেলেনি। সিরিয়া ও ইরাকের বিশাল ভূখণ্ড দখল করে তথাকথিত 'খিলাফত' ঘোষণা করা, নির্বিচারে মানবজাতি হত্যা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে হত্যা ও দাস বানানো এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া ভয়াবহ আতঙ্কের রাজত্ব এই সংগঠনটিকে রাতারাতি আলোচনার শীর্ষে নিয়ে আসে।

আইএসের উত্থান ও এর প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদিকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল, রহস্য ও নানা রূপকথার জন্ম হয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে প্রায়শই প্রশ্ন জাগে কীভাবে রাতারাতি একটি বিদ্রোহী দল পৃথিবীর সবচেয়ে সুসংগঠিত, অর্থবিত্তে ধনী এবং সামরিক দিক থেকে প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসী বাহিনীতে পরিণত হলো?

ইন্টারনেটের বিভিন্ন পাতায় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগদাদিকে নিয়ে অসংখ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বা কনস্পিরেসি থিওরি ঘুরে বেড়ায়। উদাহরণস্বরূপ: বাগদাদির আসল নাম নাকি 'শিমন এলিয়ট', সে আসলে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা 'মোসাদ'-এর একজন এজেন্ট, কিংবা মার্কিন সিনেটর জন ম্যাককেইনের সাথে তার গোপন বৈঠকের ছবি ইত্যাদি। তবে ঐতিহাসিক ও গোয়েন্দা তথ্যের কষ্টিপাথরে এই দাবিগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট এবং ভুয়া অপপ্রচার ছাড়া আর কিছুই নয়।

কিন্তু বাগদাদি ইসরায়েলি কিংবা মার্কিন এজেন্ট না হলেও, আইএসের মতো চরমপন্থী সংগঠনের জন্ম ও বিকাশলাভের পেছনে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি এবং পরোক্ষ নীতিগত ভুল, অবৈধ দখলদারিত্ব এবং চরম গাফিলতি দায়ী ছিল তা কোনো কল্পকাহিনী নয়, বরং এক কঠোর ও নির্মম ঐতিহাসিক সত্য।

এই ঐতিহাসিক সত্যের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দু হলো দক্ষিণ ইরাকের মরুভূমিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক বাহিনী পরিচালিত কারাগার 'ক্যাম্প বুকা' (Camp Bucca)। ২০০৪ সালে এই কারাগারে প্রায় ১০ মাস বন্দী ছিলেন আবু বকর আল-বাগদাদি। শুধু বাগদাদিই নন, পরবর্তীতে আইএসের শীর্ষ পর্যায় নেতৃত্ব দেওয়া অন্তত ৯ থেকে ১৮ জন উচ্চপদস্থ খলিফা ও সামরিক কমান্ডার এই একই কারাগারে বন্দিদশা কাটিয়েছিলেন। মূলত মার্কিন সেনাদের নজরদারির ভেতরেই চরমপন্থী নেতারা সাধারণ বন্দী ও সাবেক সাদ্দাম হোসেন সরকারের সামরিক অফিসারদের উগ্রপন্থায় দীক্ষিত করার অভাবনীয় সুযোগ পেয়েছিল।

সাবেক বুকা বন্দী ও পরবর্তীতে আইএসের শীর্ষ পর্যায়ে কাজ করা আবু আহমেদের ভাষায়:

"যদি ইরাকে কোনো মার্কিন কারাগার না থাকত, তবে আজ আইএসের কোনো অস্তিত্বই থাকত না। ক্যাম্প বুকা ছিল একটি কারখানা যা আমাদের তৈরি করেছে, আমাদের মতাদর্শকে শাণিত করেছে এবং পুরো নেতৃত্বকে এক ছাদের নিচে এনে দিয়েছে।"

২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসন ও উগ্রপন্থার উর্বর জমিন তৈরি

আইএস এবং ক্যাম্প বুকার সমীকরণ বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ২০০৩ সালে, যখন 'গণবিধ্বংসী অস্ত্র' (WMD)-এর মিথ্যা অজুহাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রবাহিনী কোনো আন্তর্জাতিক অনুমোদন ছাড়াই ইরাক আক্রমণ করে এবং সাদ্দাম হোসেনের বাথিস্ট সরকারের পতন ঘটায়।

ডি-বাথিফিকেশন (De-Ba'athification) ও সেনাবাহিনী বিলুপ্তি: মার্কিন প্রশাসক পল ব্রেমার ইরাকে ক্ষমতায় এসে দুটি চরম ভুল সিদ্ধান্ত নেন:

প্রথমত, বাথ পার্টির সাথে যুক্ত যেকোনো সরকারি কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা।দ্বিতীয়ত, তৎকালীন পেশাদার ইরাকি সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে পুরোপুরি বিলুপ্ত ঘোষণা করা।

এই সিদ্ধান্তের ফলে রাতারাতি ইরাকের লাখ লাখ সুন্নি মুসলিম যুবক, সামরিক অফিসার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা বেকার হয়ে পড়ে। তাদের হাতে অস্ত্র ছিল, সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল, কিন্তু কোনো রুজি-রোটি বা সম্মানজনক জীবন ছিল না। মার্কিনদের এই অনভিপ্রেত সিদ্ধান্ত তাদেরকে চরম ক্ষুব্ধ ও বিদ্রোহী করে তোলে।

সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন: সাদ্দামের পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়াদের হাতে একক ক্ষমতা তুলে দেয়। শিয়া নেতৃত্বাধীন নুরি আল-মালিলির সরকার সুন্নি জনগোষ্ঠীকে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম বৈষম্য ও নির্যাতনের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ফলে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা ও দখলদার মার্কিন সেনাদের তাড়াতে ইরাকের সুন্নি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে ছোট ছোট সশস্ত্র প্রতিরোধ গ্রুপ গড়ে ওঠে। এই বিশৃঙ্খলা ও হতাশার আগুনকেই পরবর্তীতে আল-কায়েদা এবং আইএস তাদের উগ্র মতাদর্শ ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।

ইবরাহিম থেকে 'বাগদাদি': একজন শান্ত স্বভাবের প্রচারকের রূপান্তর

আইএসের প্রধান হিসেবে বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেওয়া আবু বকর আল-বাগদাদির শুরুর জীবনটা এমন ছিল না। তার উত্থানের ইতিহাস মূলত একজন ধার্মিক, নিঃসঙ্গ ও শান্ত যুবকের চরমপন্থী মতাদর্শে ধাপে ধাপে রূপান্তরিত হওয়ার ইতিহাস।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন: বাগদাদির জন্ম ১৯৭১ সালে ইরাকের ঐতিহ্যবাহী সামার্রা শহরে। তার আসল নাম ছিল ইবরাহিম আওফ ইবরাহিম আল-বাদরি আল-সামার্রি। তার বাবা ছিলেন স্থানীয় মসজিদের একজন কুরআন তেলাওয়াতের শিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই ইবরাহিম ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও একা থাকতে পছন্দ করা একজন তরুণ।

তার ভাই শামসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইবরাহিম ক্লাসের বাইরে বেশির ভাগ সময় কাটাতেন মসজিদে। বাড়ি ফিরে পরিবারের কেউ ধর্মীয় নিয়ম ভাঙলে বা সামান্য অনৈসলামিক কাজ করলে কড়া গলায় তিরস্কার করতেন। তার তেলাওয়াত ছিল সুরেলা, যে কারণে তাকে এলাকায় 'খাশা' (বিনয়ী ও ধার্মিক) বলে ডাকা হতো।

মুসলিম ব্রাদারহুড থেকে চরমপন্থা: বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এবং পরবর্তীতে সাদ্দাম ইউনিভার্সিটি ফর ইসলামিক স্টাডিজ থেকে কুরআন তেলাওয়াত ও ইসলামী আইন বিষয়ে মাস্টার্স এবং পিএইচডি সম্পন্ন করার সময় তিনি কট্টরপন্থার দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন।

প্রথমে তিনি তার চাচার মাধ্যমে মধ্যপন্থী রাজনৈতিক সংগঠন 'মুসলিম ব্রাদারহুড'-এ যোগ দেন। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্রাদারহুডের নমনীয় ও রাজনৈতিক কৌশল তার পছন্দ হয়নি। তিনি ব্রাদারহুডকে "কাজে নয়, শুধুই কথায় বিশ্বাসী দল" হিসেবে আখ্যা দিয়ে বের হয়ে আসেন। তার বড় ভাই জুমা এবং আফগান যুদ্ধে অংশ নেওয়া উগ্রপন্থী সালাফি শিক্ষক মুহাম্মদ হারদানের প্রভাবে ইবরাহিম সরাসরি সশস্ত্র সালাফি-জিহাদীদের উগ্র মতাদর্শ গ্রহণ করেন।

২০০৩ এর পর সশস্ত্র প্রতিরোধ: ২০০৩ সালে যখন মার্কিন বাহিনী বাগদাদে প্রবেশ করে, তখন বাগদাদি বাগদাদের টোবিচির একটি ছোট মসজিদে মুয়াজ্জিন ও ছোটদের কুরআন তেলাওয়াতের শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। মার্কিন আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর তিনি অন্যান্য সুন্নি তরুণদের সংগঠিত করে 'জাইশ আল-সুন্নাহ ওয়াল-জামা'আ' নামক একটি ছোট প্রতিরোধ সেল গঠন করেন।

২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ফাল্লুজাতে তার এক বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে তিনি মার্কিন সেনাদের হাতে গ্রেপ্তার হন। সে সময় মার্কিন সেনারা কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়াই শুধুমাত্র সন্দেহভাজন বা চেহারা দেখে যেকোনো তরুণকে তুলে নিত। বাগদাদির যে বন্ধুকে ধরতে মার্কিন সেনারা অভিযান চালিয়েছিল, সে মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকলেও বাগদাদির বিরুদ্ধে তখনো মার্কিন গোয়েন্দাদের খাতায় বড় কোনো অভিযোগ ছিল না। তাকে 'বেসামরিক আটককৃত ব্যক্তি' (Civilian Detainee) হিসেবে তালিকাভুক্ত করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ক্যাম্প বুকা কারাগারে।

কী এই ক্যাম্প বুকা? আবু গারিবের বিকল্প হিসেবে গড়ে ওঠা 'আদর্শ' কারাগার

দক্ষিণ ইরাকের উম্ম কাসর শহরের কাছে কুয়েত সীমান্তের মরুভূমিতে অবস্থিত ছিল ক্যাম্প বুকা। ২০০৩ সালে মার্কিন বাহিনী এই বিশাল বন্দিশালাটি তৈরি করে। ২০০৪ সালে বিশ্বরাজনীতিতে এক বিরাট ধাক্কা লাগে যখন বাগদাদের 'আবু গারিব' কারাগারে মার্কিন সেনাদের দ্বারা ইরাকি বন্দীদের ওপর নির্মম শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও মিডিয়ায় ফাঁস হয়ে যায়।

বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার মুখে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের হারানো ভাবমূর্তি উদ্ধার করতে ক্যাম্প বুকাকে একটি 'নমুনা বা আদর্শ কারাগার' (Model Prison) হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়।

ক্যাম্প বুকার পরিবেশ ও অবকাঠামো

মার্কিন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা এখানে বন্দীদের ওপর কোনো অত্যাচার করবে না, বরং তাদের ভালো আচরণের জন্য বিভিন্ন সুবিধা দেবে:

মনোরঞ্জনের সুযোগ: ভালো আচরণ করলে বন্দীদের চা, সিগারেট, রেডিও বা টিভি দেখার অনুমতি দেওয়া হতো।

স্বজনদের সাথে দেখা: স্বজনদের সাথে নিয়মিত সাক্ষাৎ এবং চিঠিপত্র আদান-প্রদানের সুযোগ ছিল।

শিক্ষা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা: বন্দীদের নিজেদের মধ্যে ধর্মীয় তালিম, কুরআন শিক্ষা এবং সাধারণ শিখন-প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানোর পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল।

স্বায়ত্তশাসন: ২৬,০০০ বন্দী ধারণক্ষমতা বিশিষ্ট এই কারাগারটি ২৬টি স্বতন্ত্র ক্যাম্পে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি ক্যাম্পে ১,০০০ জন করে বন্দী থাকত। মার্কিন সেনারা বাইরে পাহারা দিত, আর ভেতরের প্রশাসনিক ও অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য বন্দীরা নিজেরাই নিজেদের 'আমির' বা নেতা নির্বাচন করতে পারত!

২০০৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত খোলা থাকা এই কারাগারে মোট ১ লাখেরও বেশি ইরাকি বন্দী জীবন কাটিয়েছেন। এদের একটি ছোট অংশ ছিল উসামা বিন লাদেনের অনুসারী বা আল-কায়েদার উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী। কিন্তু সিংহভাগই ছিল সাধারণ অপরাধী, স্বজন হারানোর ক্ষোভে অস্ত্র তুলে নেওয়া সুন্নি যুবক এবং নিরাপরাধ সাধারণ নাগরিক যাদের কেবল সন্দেহের বশে রাস্তা থেকে তুলে আনা হয়েছিল।

'সন্ত্রাসবাদের বিশ্ববিদ্যালয়': মার্কিন চোখের সামনেই উগ্রপন্থার চর্চা

মার্কিন সেনাবাহিনী মনে করেছিল, বন্দীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ দিলে কারাগারে শান্তি বজায় থাকবে। কিন্তু বাস্তবে এই সুযোগটি উগ্রপন্থী আল-কায়েদা নেতাদের জন্য এক অভাবনীয় স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছিল।

গবেষক জেরেমি সুরি এবং সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু থম্পসনের ভাষায়:

"ক্যাম্প বুকা ছিল এক কথায় 'সন্ত্রাসবাদের বিশ্ববিদ্যালয়' (University of Terror)। কট্টর মৌলবাদী আল-কায়েদা নেতারা ছিল সেখানকার প্রফেসর, সাধারণ হাজার হাজার বন্দী ছিল তাদের অনুগত শিক্ষার্থী, আর মার্কিন কারারক্ষীরা ছিল শুধুই শ্রেণীকক্ষের অনুপস্থিত ও অন্ধ কর্তৃপক্ষ।"

মার্কিনদের চোখের সামনেই উগ্রপন্থার কারখানা

২০০৯ সালে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম 'আল-জাজিরা' ক্যাম্প বুকা নিয়ে এক বিস্ফোরক তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে আদেল জাসেম মোহাম্মদ নামের এক সাবেক বন্দী জানান, কারাগারের শেডগুলোর ভেতরে আল-কায়েদার কট্টরপন্থী সদস্যরা ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে একে অন্যকে বোমা তৈরি করা, বন্দুকের আধুনিক কৌশল এবং আত্মঘাতী হামলার নিয়মকানুন শেখাত। মার্কিন কারারক্ষীরা তা দেখেও না দেখার ভান করত, কারণ তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল কারাগারের ভেতরে যেন কোনো দাঙ্গা বা বিদ্রোহ না হয়।

অন্তর্বাসের ইলাস্টিকে ভবিষ্যতের নেটওয়ার্ক

কারাগারের কঠোর নিরাপত্তা এড়াতে বন্দীরা এক অভিনব কৌশল উদ্ভাবন করেছিল। যেহেতু কাগজ বা নোটবুক সাথে রাখা বিপজ্জনক ছিল, তাই তারা কারামুক্ত হওয়ার পর বাইরে গিয়ে কীভাবে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করবে, তার জন্য গোপন ঠিকানা ও ফোন নম্বরগুলো নিজেদের অন্তর্বাসের (Underwear) ভেতরের ইলাস্টিক ফিতায় বা কাপড়ের ভাঁজে বিশেষ কোডে লিখে রাখত।

সাবেক আইএস সদস্য আবু আহমেদ Guardain-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন:

"ক্যাম্প বুকার সেই অন্তর্বাসের ফিতাগুলোই পরবর্তীতে আমাদের বাইরের যুদ্ধে জয়লাভ করতে এবং নতুন সংগঠন গড়ে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল। আমরা কারাগারেই অঙ্গীকার করেছিলাম যে বের হয়ে আমরা আবার একত্র হব।"

ক্যাম্প বুকায় বাগদাদির ভূমিকা: ধূর্ত মধ্যস্থতাকারী থেকে উদীয়মান নেতা

২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ডিসেম্বর এই ১০ মাস বাগদাদি যখন ক্যাম্প বুকায় ছিলেন, তখনো তিনি আল-কায়েদার মূলধারার কোনো শীর্ষ নেতা ছিলেন না। কিন্তু তাঁর ইসলামী শরীয়াহ ও কুরআনের ওপর গভীর জ্ঞান এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কুরাইশ বংশের সাথে পারিবারিক যোগসূত্রের দাবি তাকে অন্য সাধারণ বন্দীদের চেয়ে একধাপ এগিয়ে রাখে।

মার্কিন কারারক্ষীদের চোখ ফাঁকি দেওয়া

অন্যান্য কট্টরপন্থী নেতাদের মতো বাগদাদি মার্কিন সেনাদের সামনে কখনো উচ্চবাচ্য বা সহিংস আচরণ করতেন না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধূর্ত ও শান্ত স্বভাবের। মার্কিন কারারক্ষীরা তাকে একজন 'শান্তিকামী ধর্মীয় শিক্ষক' হিসেবে মনে করত। ফলে মার্কিনদের কাছে তার এক ধরণের প্রবেশাধিকার ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়।

বিরোধ নিষ্পত্তিকারী ও রাজনৈতিক চাল

কারাগারের ভেতরে বিভিন্ন উপদল বা সুন্নি গ্রুপগুলোর মধ্যে কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘাত বা বিরোধ তৈরি হলে মার্কিন সেনারা বাগদাদিকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ডাকত।

সাবেক বন্দী আবু আহমেদের বর্ণনামতে:

"বাগদাদি সব সময় সভার কেন্দ্রে থাকতেন। তিনি মূলত উভয় পক্ষের মধ্যে বিভেদ মেটানোর বাহানায় নিজের অবস্থান ও পরিচিতি বাড়াচ্ছিলেন। তিনি বন্দীদের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠছিলেন, আবার আমেরিকানদের কাছেও ভালো সাজছিলেন। তার এই দ্বি-মুখী কৌশল চমৎকার কাজ করেছিল।"

মুক্তির মুহূর্ত ও সুদূরপ্রসারী লাভ

বাগদাদির বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত থাকার শক্ত কোনো প্রমাণ মার্কিন গোয়েন্দাদের কাছে না থাকায় ২০০৪ সালের ৮ ডিসেম্বর তাকে 'ঝুঁকিহীন' বিবেচনা করে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার আগেই বাগদাদি ক্যাম্প বুকার বন্দিশালায় বসেই আল-কায়েদার শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সাথে স্থায়ী সখ্যতা ও কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছিলেন।

বাথিস্ট ও সালাফি-জিহাদীদের অনাকাঙ্ক্ষিত মৈত্রী

আইএস কেবল একটি ধর্মীয় উগ্রপন্থী উগ্র দল ছিল না, এটি একটি আধুনিক রাষ্ট্রের মতোই প্রশাসন, রাজস্ব ব্যবস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা এবং উচ্চপর্যায়ের সামরিক ব্যাটালিয়ন পরিচালনা করত। প্রশ্ন হলো কুরআন তেলাওয়াত করা সাধারণ জিহাদীরা এত দক্ষ সামরিক কৌশল শিখলো কীভাবে?

এর মূল উত্তর লুকিয়ে আছে ক্যাম্প বুকার ভেতরে গড়ে ওঠা এক অদ্ভুত ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৈত্রীর মধ্যে।

যখন 'ধর্মীয় কট্টরপন্থী' ও 'ধর্মনিরপেক্ষ সৈনিক' এক হলো

সাদ্দাম হোসেনের অনুসারী বাথ পার্টির অফিসাররা ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ এবং পশ্চিমা স্টাইলের সামরিক শিক্ষায় শিক্ষিত। অন্যদিকে আল-কায়েদার জিহাদীরা বাথিস্টদের 'কাফের' বলে গণ্য করত।

কিন্তু ক্যাম্প বুকা কারাগারের চার দেয়ালের ভেতর এই দুই সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী মেরুর মানুষদের এনে এক করে দেয় তাদের সাধারণ শত্রু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং শিয়া সরকার।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'সুফান গ্রুপ' (Soufan Group)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী:

বাথিস্টদের লাভ: চাকরি হারিয়ে দিশেহারা সাবেক জেনারেলরা জিহাদীদের মধ্যে খুঁজে পান এক অন্ধ অনুগত আত্মঘাতী বিশাল বাহিনী এবং মার্কিনদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার আদর্শ প্ল্যাটফর্ম।

জিহাদীদের লাভ: কট্টরপন্থী উগ্রবাদীরা বাথিস্ট জেনারেলদের কাছ থেকে পায় আধুনিক সামরিক যুদ্ধকৌশল, ট্যাংক ও ভারী অস্ত্র পরিচালনার বিদ্যা, গুপ্তচরবৃত্তি এবং একটি দেশ পরিচালনার জটিল প্রশাসনিক জ্ঞান।

পরবর্তীতে আইএসের সর্বোচ্চ সামরিক পরিষদের প্রধান পদগুলোতে যারা বসেছিলেন যেমন হাজী বকর (সাবেক সাময়িক কর্নেল), আবু মুসলিম আল-তুর্কমানি, আবু আইমান আল-ইরাকি তারা প্রত্যেকেই ছিলেন সাদ্দামের সাবেক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা এবং ক্যাম্প বুকার সাবেক বন্দী। এই সামরিক দক্ষতা ছাড়া আইএসের পক্ষে রাতারাতি ইরাক ও সিরিয়ার একের পর এক শহর দখল করা অসম্ভব হতো।

আল-কায়েদা থেকে আইএসে রূপান্তর

২০০৪ সালে ক্যাম্প বুকা থেকে মুক্ত হয়েই বাগদাদি সরাসরি তৎকালীন আল-কায়েদা ইন ইরাক (AQI)-এর প্রধান আবু মুসাব আল-জারকাওইর দলে যোগ দেন। এখান থেকেই মূলত আইএসের রক্তক্ষয়ী যাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

বিবর্তনের ধাপসমূহ:

আল-কায়েদা ইন ইরাক (২০০৪-২০০৬): আবু মুসাব আল-জারকাওই অত্যন্ত রক্তপিপাসু ও শিয়া বিদ্বেষী ছিলেন। তিনি শিয়াদের ওপর নির্বিচারে বোমা হামলা চালানো শুরু করেন। ২০০৬ সালে মার্কিন বিমান হামলায় জারকাওই নিহত হন।

ইসলামিক স্টেট অব ইরাক - ISI (২০০৬-২০১০): জারকাওইর মৃত্যুর পর দলটির নাম বদলে হয় 'ইসলামিক স্টেট অব ইরাক'। এ সময় বাগদাদি তার ইসলামী আইনের ডিগ্রির কারণে দলের শরীয়াহ কমিটির প্রধান হন এবং বিশ্বস্ততার সাথে ওসামা বিন লাদেনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে থাকেন।

বাগদাদির ক্ষমতায়ন (২০১০): ২০১০ সালে যৌথ সামরিক অভিযানে আইএসআই প্রধান আবু ওমর আল-বাগদাদি নিহত হলে, ক্যাম্প বুকার সাবেক বন্ধুদের সমর্থনে আবু বকর আল-বাগদাদি সংগঠনটির শীর্ষ আমির পদে আসীন হন।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ ও আইসিস (২০১১-২০১৩): ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে বাগদাদি তার ডেপুটি আবু মোহাম্মদ আল-জুলানিকে আল-নুসরা ফ্রন্ট গঠনের জন্য সিরিয়া পাঠান। কিন্তু পরবর্তীতে জুলানি আল-কায়েদার মূল নেতা আইমান আল-জাওয়াহিরির অনুগত থেকে গেলে, ২০১৩ সালে বাগদাদি তাকে অগ্রাহ্য করে 'ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দ্য শাম' (ISIS) গঠন করেন।

খিলাফত ঘোষণা (২০১৪): ২০১৪ সালের জুনে আইএসের যোদ্ধারা ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মোসুল দখল করে নেয়। বিখ্যাত আল-নুরি মসজিদ থেকে বাগদাদি নিজেকে সমস্ত মুসলিম জাহানের 'খলিফা ইব্রাহিম' হিসেবে ঘোষণা করেন।

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও মার্কিন নীতিগত ব্যর্থতার দায়ভার

আইএসের জন্ম নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত মিথ ও সত্যের পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

মার্কিন নীতিগত ব্যর্থতা বনাম সরাসরি সৃষ্টি

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ নিজে কোনো গোপন ল্যাবরেটরিতে আইএস বানায়নি। কিন্তু তাদের গৃহীত ভুল সিদ্ধান্ত ও নীতিগুলোই আইএসের মতো বিষবৃক্ষ রোপণের জন্য সবচেয়ে উর্বর জমি সরবরাহ করেছিল:

অবৈধ আগ্রাসন: কোনো প্রমাণ ছাড়া একটি স্বাধীন দেশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে কোটি কোটি মানুষকে গৃহহীন ও ক্ষুব্ধ করা।

অপেশাদার বন্দিশালা: চরমপন্থী সন্ত্রাসী এবং সাধারণ নাগরিকদের একসাথে এক কারাগারে বছরের পর বছর আটকে রাখা।

নিয়ন্ত্রণহীন বাকস্বাধীনতা ও তালিম: মার্কিনদের কঠোর তদারকির অভাবে ক্যাম্প বুকাকে সন্ত্রাসীদের সংগঠিত হওয়ার ফ্রিতে মিটিং প্লেস বানাতে দেওয়া।

সুন্নিদের প্রান্তিকীকরণ: শিয়া চরমপন্থী সরকারকে অন্ধ সমর্থন দিয়ে সুন্নিদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেওয়া।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি ইচ্ছাকৃতভাবেও আইএস বানাতে চাইত, তবুও হয়তো তারা ক্যাম্প বুকার চেয়ে ভালো কোনো কাঠামোগত কারখানা তৈরি করতে পারত না!

এক নজরে ক্যাম্প বুকা ও আইএস সৃষ্টির মূল চালচিত্র

নিচে ক্যাম্প বুকা কারাগার, বাগদাদির অবস্থান এবং আইএসের উৎপত্তি সংক্রান্ত যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

বিষয় ও ক্ষেত্র

মূল তথ্য ও বিশদ বিশ্লেষণ

আইএসের উত্থানে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব

কারাগারের নাম ও অবস্থান

ক্যাম্প বুকা (Camp Bucca); উম্ম কাসর, দক্ষিণ ইরাক (কুয়েত সীমান্ত এলাকা)।

উগ্রপন্থীদের জন্য সুরক্ষিত ও নিরাপদ নেটওয়ার্কিং হাব হিসেবে কাজ করেছে।

পরিচালনাকারী ও মেয়াদ

মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী; ২০০৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চালু ছিল।

মার্কিন নজরদারির অভাবেই ভেতরে কট্টরপন্থী আদর্শ ছড়িয়ে পড়ে।

বাগদাদির বন্দিদশা

ফেব্রুয়ারি ২০০৪ – ডিসেম্বর ২০০৪ (প্রায় ১০ মাস)। 'সিভিলিয়ান ডিটেইনি' হিসেবে আটক।

মূলধারার আল-কায়েদা শীর্ষ নেতাদের সাথে ব্যক্তিগত সখ্য তৈরি হয়।

ক্যাম্প বুকার বন্দী ধারণক্ষমতা

২৬টি স্বতন্ত্র কম্পাউন্ডে মোট ২৬,০০০ বন্দী (৬ বছরে মোট ১ লাখের বেশি বন্দী)।

বিপুলসংখ্যক অপরাধী ও সাধারণ নাগরিককে এক ছাদের নিচে এনে দেয়।

শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি

বাগদাদিসহ আইএসের শীর্ষ ৯ থেকে ১৮ জন উচ্চপদস্থ সামরিক কমান্ডার এখানে বন্দী ছিল।

কারাগারেই আইএসের ভবিষ্যৎ খিলাফতের মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়ে যায়।

বাথিস্ট-জিহাদি জোট

সাদ্দামের সাবেক সামরিক অফিসার এবং সালাফি-জিহাদীদের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক মেলবন্ধন।

জিহাদীদের উগ্রবাদের সাথে বাথিস্টদের পেশাদার সামরিক কৌশলের সংমিশ্রণ।

প্রধান ঐতিহাসিক শিক্ষা

শক্তির জোরে আগ্রাসন ও অবিবেচক বন্দিনীতি কেবল চরমপন্থাকেই উস্কে দেয়।

বিশ্বরাজনীতিতে 'ক্যাম্প বুকা' চরম ব্যর্থ পররাষ্ট্রনীতির এক কালো অধ্যায়।

ক্যাম্প বুকার ভেতরের ভয়ংকর 'শরিয়াহ আদালত' ও অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস

ক্যাম্প বুকায় মার্কিন কারারক্ষীরা ক্যাম্পের বাইরের চারদেয়াল ও পরিখা পাহারা দিত, কিন্তু শেড বা কম্পাউন্ডের ভেতরের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল কট্টরপন্থী বন্দীদের হাতে। সেখানে তারা নিজেদের তৈরি উগ্র নিয়মকানুন চালুর উদ্দেশ্যে 'অভ্যন্তরীণ শরিয়াহ আদালত' প্রতিষ্ঠা করেছিল।

তাকফিরি বিচারব্যবস্থা: যেসব ইরাকি বন্দী ধূমপান করত, রেডিও শুনত, মার্কিন সেনাদের সাথে কথা বলত বা আল-কায়েদার উগ্র মতাদর্শ মানতে অস্বীকার করত, তাদের এই অভ্যন্তরীণ আদালতে ‘তাকফির’ (ধর্মত্যাগী) হিসেবে আখ্যা দেওয়া হতো।

শারীরিক নির্যাতন ও শাস্তি: রাতে কম্বলের নিচে হাত-পা বেঁধে সাধারণ বন্দীদের চোখ উপড়ে ফেলা, হাড় ভেঙে দেওয়া বা ধারালো কাঁচ/পাত দিয়ে হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটত।

মার্কিনদের উদাসীনতা: বুকার তৎকালীন কারা-কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, অভ্যন্তরীণ দাঙ্গা বা হত্যাকাণ্ড না ঘটলে মার্কিন বাহিনী ভেতরের বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাত না। এর ফলে সাধারণ বন্দীরা জীবন বাঁচাতে কট্টরপন্থীদের আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য হতো।

মাস্টারমাইন্ড 'হাজী বকর' এবং আইএসের গোপন 'ব্লুপ্রিন্ট'

অনেক ইতিহাসবিদ বাগদাদিকে আইএসের দৃশ্যমান 'মুখপোট' (Public Face) মনে করলেও, এই সংগঠনের আসল রূপকার বা মাস্টারমাইন্ড ছিলেন সাদ্দাম হোসেনের বিমানবাহিনীর সাবেক গোয়েন্দা অফিসার সমীর আবদ মোহাম্মদ আল-খলিফাওই, যিনি 'হাজী বকর' নামে পরিচিত ছিলেন। তিনিও ক্যাম্প বুকার বন্দী ছিলেন।

স্মারক দলিল ও গোপন নথি: ২০১৪ সালে জার্মান সাময়িকী 'দের স্পিগেল' (Der Spiegel)-এর সাংবাদিক ক্রিস্টোফ রয়টার সিরিয়ার তাল রিফাত শহরে হাজী বকরের বাড়ি থেকে ৩১ পৃষ্ঠার গোপন নথি উদ্ধার করেন।

পুলিশি রাষ্ট্রের নকশা: এই নথিতে দেখা যায়, আইএস কেবল ধর্মীয় আবেগে তৈরি হয়নি; বরং এটি পূর্ব জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থা 'স্টাসি' (Stasi)-র আদলে তৈরি একটি ভয়ংকর নজরদারিনির্ভর গোয়েন্দা রাষ্ট্র ছিল। কোথায় কীভাবে ব্ল্যাকমেইল করতে হবে, স্থানীয় সর্দারদের মেয়েদের বিয়ে করে ব্ল্যাঙ্ক সাপোর্ট নিতে হবে এবং প্রতিপক্ষকে কীভাবে নিশ্চিহ্ন করতে হবে তার পুরো ছক হাজী বকর নিজ হাতে একেছিলেন।

প্রোপাগান্ডা মেশিন ও 'এমনি' (Emni): পশ্চিমা বিশ্বে হামলার মাস্টারমাইন্ড

ক্যাম্প বুকার আরেক বন্দী আবু মোহাম্মদ আল-আদনানি ছিলেন আইএসের মূল মুখপাত্র এবং এর আন্তর্জাতিক অপারেশন শাখা 'এমনি' (Emni)-র প্রধান।

এইচডি প্রোপাগান্ডা ও 'দাবিক' (Dabiq): আদনানির নেতৃত্বে আইএস 'আল-হাইয়াত মিডিয়া সেন্টার' গড়ে তোলে। তারা হলিউড স্টাইলের হাই-ডেফিনিশন (HD) ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (টুইটার, টেলিগ্রাম) এবং ইংরেজি/ফরাসি ভাষায় 'দাবিক''রুমিয়াহ' নামক ম্যাগাজিন প্রকাশ করে বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার তরুণকে আকর্ষণ করে।

'লোন উলফ' (Lone Wolf) হামলা: আদনানি পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বিখ্যাত এক অডিও বার্তায় ঘোষণা করেছিলেন:

"যদি তোমাদের কাছে বোমা বা বন্দুক না থাকে, তবে কাফেরদের মাথায় পাথর ছুড়ে মারো, ছুরি দিয়ে জবাই করো, কিংবা গাড়ি চালিয়ে তাদের পিষে দাও।"

এই আহ্বানের পরপরই প্যারিস হামলা (২০১৫), ব্রাসেলস হামলা (২০১৬) এবং নিস ও বার্লিনে ট্রাক চাপা দিয়ে মানুষ হত্যার মতো ঘটনাগুলো ঘটেছিল।

পৃথিবীর ইতিহাসেক সবচেয়ে ধনী সন্ত্রাসী সংগঠন

আইএস কেবল সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী ছিল না, এটি তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী সন্ত্রাসী সংগঠনে পরিণত হয়েছিল। তাদের আয়ের প্রধান উৎসগুলো ছিল:

তেল চোরাচালান: সিরিয়া ও ইরাকের দখলকৃত তেলক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কালোবাজারে বিক্রি করে তারা প্রতিদিন গড়ে ১ থেকে ৩ মিলিয়ন ডলার আয় করত।

মোসুল কেন্দ্রীয় ব্যাংক লুণ্ঠন: ২০১৪ সালে মোসুল দখলের পর তারা স্থানীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় ৪২৫ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের নগদ ক্যাশ ও সোনা লুট করে।

প্রত্নসম্পদ পাচার: ইউনেস্কো স্বীকৃত ঐতিহাসিক স্থান পালমিরা (Palmyra) ও নিমরুদে ধ্বংসস্তূপ চালিয়ে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ইউরোপের কালোবাজারে বিক্রি করে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেছিল।

আইএসের পতন ও বর্তমান হুমকি: 'আইএস-কে' (ISIS-K)

২০১৭ সালে মার্কিন সমর্থিত যৌথ বাহিনী এবং সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোোর্সের (SDF) টানা অভিযানে মোসুল ও রাক্কার পতন ঘটে।

বাগদাদির মৃত্যু (২০১৯): ২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর সিরিয়ার ইদলিবে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের 'অপারেশন কায়লা মুলার' অভিযানের সময় ধরা পড়ার মুখোমুখি হয়ে একটি সুড়ঙ্গে নিজের আত্মঘাতী ভেস্ট বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বাগদাদি আত্মহত্যা করে।

বর্তমান বাস্তবতা: ভৌগোলিক 'খিলাফত' ধ্বংস হলেও আইএসের মতাদর্শ পুরোপুরি মুছে যায়নি। বর্তমানে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় এদের শাখা 'আইএস-খোরসান' (ISIS-K) এবং পশ্চিম আফ্রিকায় 'আইএসডব্লিউএপি' (ISWAP) অত্যন্ত সক্রিয় ও বিপজ্জনক রূপ ধারণ করেছে (যেমন: ২০২৪ সালে মস্কোর ক্রোকাস সিটি হলে হামলা)।

ইয়াজিদি গণহত্যা ও 'মধ্যযুগীয় যৌন দাসপ্রথা'

২০১৪ সালের আগস্টে আইএসের যোদ্ধারা ইরাকের সিনজার (Sinjar) পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী প্রাচীন সংখ্যালঘু ইয়াজিদি (Yazidi) সম্প্রদায়ের ওপর এক নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। জাতিসংঘ পরবর্তীতে এই ঘটনাকে অফিসিয়ালি 'গণহত্যা' (Genocide) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

পুরুষদের হত্যা ও নারী বন্দীকরণ: সিনজার দখলের পর কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৫,০০০ থেকে ৭,০০০ ইয়াজিদি পুরুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।

'সাবায়া' (Sabaya) বা যৌনদাসী বাজার: প্রায় ৬,০০০-এর বেশি ইয়াজিদি নারী ও শিশুকে বন্দী করে সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সুনির্দিষ্ট দাম নির্ধারণ করে তাদের কেনাবেচার জন্য আনুষ্ঠানিক 'দাস বাজার' (Slave Markets) তৈরি করা হয়েছিল।

ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও প্রোপাগান্ডা: আইএস কেবল অপরাধ হিসেবে এটি করেনি, বরং তাদের ম্যাগাজিন 'দাবিক' (Dabiq)-এ কুরআন ও হাদিসের উগ্র ও ভুল ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে অমুসলিম নারীদের দাস বানানোকে 'ইসলামসম্মত' হিসেবে প্রচার করেছিল।

'আল-হোল' ক্যাম্প: ভবিষ্যতের নতুন 'ক্যাম্প বুকা ২.০'

আইএসের ভৌগোলিক খিলাফতের পতন হলেও এর বিষবৃক্ষ যে এখনো জীবন্ত, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার 'আল-হোল' (Al-Hol) এবং 'আল-রোজ' (Al-Roj) শরণার্থী ক্যাম্প।

কারাগারের নতুন রূপ: সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (SDF)-এর নিয়ন্ত্রণে থাকা আল-হোল ক্যাম্পে বর্তমানে প্রায় ৫০,০০০-এর বেশি মানুষ বন্দী রয়েছে, যার সিংহভাগই সাবেক আইএস যোদ্ধাদের স্ত্রী ও সন্তান।

পুনর্বাসনের অভাব: পশ্চিমা দেশগুলো তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে এই বন্দীদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। ফলে ক্যাম্পের ভেতরে আবার নতুন করে আইএসের কট্টরপন্থী নারী সদস্যরা নিজস্ব শরিয়াহ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সঠিকভাবে এদের পুনর্বাসন না করা হলে আল-হোল ক্যাম্পই তৈরি করবে আইএসের 'দ্বিতীয় প্রজন্ম'।

অভূতপূর্ব সামরিক কৌশল: SVBIED, ড্রোন ও সুড়ঙ্গ যুদ্ধ

ঐতিহ্যবাহী গেরিলা যুদ্ধের বাইরে এসে আইএস এমন কিছু সামরিক কৌশল তৈরি করেছিল, যা সাধারণ সামরিক বাহিনীর জন্য মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন ছিল:

SVBIED (আত্মঘাতী সাঁজোয়া যান): আইএস বাণিজ্যিক বুলডোজার, লরি বা পিকআপ ভ্যানকে নিজদের ওয়ার্কশপে মোটা স্টিল ও আয়রন প্লেট দিয়ে বুলেটপ্রুফ বানিয়ে বিস্ফোরকে ভরে ফেলত। চালক সেই সাঁজোয়া যান নিয়ে শত্রুপক্ষের ভারী চেকপয়েন্ট বা ঘাঁটিতে গিয়ে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটাত। এটি যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষুদ্রাকৃতির কোনো ক্রুজ মিসাইলের মতো ধ্বংসক্ষমতা তৈরি করত।

বাণিজ্যিক ড্রোনের সামরিক ব্যবহার: বাজারে কিনতে পাওয়া সাধারণ চার পাখার কমার্শিয়াল ড্রোন (Quadcopters) মডিফাই করে তারা যুদ্ধক্ষেত্রের ওপর নজরদারি চালাত। শুধু তা-ই নয়, ড্রোনের নিচে ছোট প্লাস্টিক টিউব লাগিয়ে তার ভেতরে ছোটখাটো মর্টার শেল বা গ্রেনেড ভরে শত্রুসেনাদের ওপর নিখুঁতভাবে বোমা ফেলত। ড্রোনকে এভাবে সস্তা বিমানবাহিনী হিসেবে ব্যবহারের কৌশল আইএসই প্রথম ব্যাপকভাবে চালু করে।

সুড়ঙ্গ শহর (Tunnel Warfare): মোসুল, রাক্কা ও সিনজারের মাটির নিচে তারা মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সুড়ঙ্গ জাল তৈরি করেছিল। এই সুড়ঙ্গগুলোতে আলো, অক্সিজেন, হাসপাতাল ও অস্ত্রাগার ছিল। ফলে মার্কিন বা রাশিয়ান যুদ্ধবিমান থেকে হাজার টন বোমাবর্ষণ করেও মাটির নিচে থাকা আইএস যোদ্ধাদের সহজে নিকেশ করা যেত না।

সাইবার খিলাফত, ডার্কওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি

পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন আইএসের সাধারণ ব্যাংকিং চ্যানেল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করা শুরু করে, তখন তারা ডিজিটাল প্রযুক্তির গভীরে প্রবেশ করে:

এনক্রিপ্টেড মেসেজিং (Telegram): সাধারণ সামাজিক মাধ্যম ছেড়ে তারা এনক্রিপ্টেড অ্যাপ 'টেলিগ্রাম'-এ হাজার হাজার গোপন চ্যানেল ও বট তৈরি করে। সেখানেই প্রোপাগান্ডা ছড়ানো, নতুন সদস্য রিক্রুট করা এবং নির্দেশিকা পাঠানো হতো।

ক্রিপ্টোকারেন্সি ফিন্যান্সিং: অর্থ লেনদেনের ওপর বিশ্বব্যাপী নজরদারি এড়াতে আইএস ডার্কওয়েব (Dark Web)-এ নিজেদের নেটওয়ার্ক বিস্তার করে এবং বিটকয়েন (Bitcoin)মনোরো (Monero)-র মতো ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সমর্থকদের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করা শুরু করে।

'বিদেশী যোদ্ধা' (Foreign Fighters) ও 'আইএস ব্রাইড'দের মনস্তত্ত্ব

বিশ্বের প্রায় ৮০টিরও বেশি দেশ থেকে ৪০,০০০-এর বেশি বিদেশী নাগরিক সবকিছু ছেড়ে সিরিয়া ও ইরাকে আইএসে যোগ দিতে এসেছিল। ইউরোপের ইতিহাসেও এত বড় আকারের সন্ত্রাসী হিজরত আগে কখনো দেখা যায়নি।

একনজরে বৈশ্বিক রিক্রুটমেন্টের উৎস:

তিউনিসিয়া ও সৌদি আরব: সর্বোচ্চসংখ্যক সশস্ত্র যোদ্ধা পাঠিয়েছিল।

রাশিয়া ও মধ্য এশিয়া (উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান): প্রায় ৮,০০০-এর বেশি কট্টরপন্থী যোদ্ধা তাদের ব্যাটালিয়ন পরিচালনা করত।

ইউরোপ (ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি): প্রায় ৫,০০০ তরুণ-তরুণী অনলাইন প্রোপাগান্ডায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যোগ দেয়।

ইতিহাস ও ভূ-রাজনীতির রক্তক্ষয়ী শিক্ষা

আজ ক্যাম্প বুকার কোনো অস্তিত্ব নেই। ২০০৯ সালে মার্কিন বাহিনী এই বিতর্কিত কারাগারটি বন্ধ করে দেয় এবং ভেঙে ফেলে। কিন্তু সেই মরুভূমির বালুচরে যে উগ্র মতাদর্শের বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল, তার খেসারত পুরো বিশ্বকে দিতে হয়েছে লাখ লাখ মানুষের তাজা রক্ত, কোটি কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়া এবং শতাব্দীর সেরা মানবিক বিপর্যয়ের মাধ্যমে।

ক্যাম্প বুকার ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, শুধুমাত্র সামরিক শক্তি বা আধুনিক অস্ত্র দিয়ে চরমপন্থা দমন করা যায় না। সুবিচার না করে কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর জোরপূর্বক দখলদারিত্ব চাপিয়ে দিলে, লাখ লাখ সামরিক অফিসারকে রাতারাতি বেকার করে দিলে এবং একটি সুনির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে নিপীড়নের মুখে ঠেলে দিলে তার প্রতিক্রিয়া কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার জ্বলন্ত প্রমাণ 'ক্যাম্প বুকা' এবং 'আইএস'।

আবু বকর আল-বাগদাদি ২০১৯ সালে মার্কিন সামরিক অভিযানে নিহত হয়েছেন, তার তথাকথিত 'খিলাফত' ভৌগোলিক ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু ক্যাম্প বুকার মতো বন্দিশালায় জন্ম নেওয়া সেই চরমপন্থার শিক্ষা বিশ্ব রাজনীতিতে আজও এক চরম সতর্কবার্তা হয়ে রয়ে গেছে: সন্ত্রাসবাদ দমন করার নামে যদি অন্যায় ও বৈষম্যের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়, তবে সেই অন্যায়ের গর্ভ থেকেই জন্ম নেয় ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম দানব!

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.