বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর - যিনি শহীদি মৃত্যুকে খুঁজেছিলেন

Dec 11, 2025

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মাত্র দুইজন বীরশ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধার খুব স্পষ্ট, স্টুডিওতে তোলা বা ফরমাল ফটোগ্রাফ সচরাচর চোখে পড়ে। একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান, আর অন্যজন - ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। ছবিতে শান্ত, সৌম্য, আর মায়াবী যে চোখ দুটো আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, কে জানত সেই চোখের মালিকের ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর বারুদ? তাঁর সহযোদ্ধারা তাঁকে বারবার বলতেন, "স্যার, আপনি অসতর্ক যুদ্ধ করেন, বেপরোয়া যুদ্ধ করেন। আত্মরক্ষার কথা ভাবেন না।" যেন তিনি মরিয়া হয়ে ছিলেন শহিদ হওয়ার জন্য। আর সেই শহীদি মৃত্যু তাঁর হাতে ধরা দিয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সকাল নয়টায় - বিজয়ের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে।

এই প্রবন্ধ সেই অসম্ভব সুদর্শন, অকুতোভয় বীরের গৌরবোজ্জ্বল জীবন, চরম ঝুঁকি নিয়ে দেশপ্রেমের টানে রণাঙ্গনে ফেরা এবং বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে তাঁর মর্মান্তিক আত্মাহুতির কাহিনি নিয়ে।

শান্ত চেহারার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বারুদ

ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের ফটোগ্রাফটি কেবল একটি ছবি নয়, এটি যেন এক মহাকাব্যের নীরব প্রচ্ছদ। সেই শান্ত, মায়াবী চোখ দুটি দেখে কল্পনা করা কঠিন - এই মানুষটিই রণাঙ্গনে ছিলেন এক ভয়ংকর যোদ্ধা, যিনি মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও হাসতেন।

জন্ম ও প্রাথমিক জীবন: মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের জন্ম ১৯৪৯ সালের ৭ মার্চ বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার সন্তান। উচ্চশিক্ষার পর তিনি ১৯৬৭ সালে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ইঞ্জিনিয়ার্স কোরে কমিশন লাভ করেন।

বিচ্ছিন্নতা ও বেদনা: ১৯৭১ সালে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে (তৎকালীন শিয়ালকোট সীমান্ত) কর্মরত ছিলেন। চোখের সামনে মাতৃভূমির ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নিপীড়ন ও গণহত্যা মেনে নিতে পারেননি তিনি। একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে নিজের দেশের ওপর হওয়া অত্যাচার দেখে তাঁর হৃদয়ে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে।

ক্যাপশন: মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (ডান দিক থেকে দ্বিতীয়) পরনে পাকিস্তানী পাঠান পোশাক। এই পোশাকে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। পরে জনৈক ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা তার সাথে ছবিটি তুলেন। আর পরের ছবিটি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তোলা।

দেশের টানে ঝুঁকি নিয়ে দেশপ্রেমিকের পলায়ন

জুলাই মাসে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর যে সিদ্ধান্তটি নেন, তা ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ এবং সামরিক ইতিহাসে বিরল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন কমিশনড অফিসার হিসেবে তাঁর জীবন ছিল সুরক্ষিত, কিন্তু তিনি সেই নিরাপত্তা ত্যাগ করে মাতৃভূমির ডাকে সাড়া দিলেন।

দুর্গম পথ পাড়ি

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি দুর্গম পথ পাড়ি দেন। শিয়ালকোট সীমান্ত হয়ে তিনি ভারতে প্রবেশ করেন। এই যাত্রাপথে তিনি শুধু নিজের সামরিক মর্যাদা নয়, বরং নিজের জীবনকেও বাজি রেখেছিলেন।

যোগদান: ভারতে পৌঁছানোর পর তিনি দ্রুত রণাঙ্গনে যোগ দেন। তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয় ৭ নম্বর সেক্টরে।

দায়িত্ব: মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের ওপর বিশেষভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমা মুক্ত করার, যা ছিল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক এলাকা।

সামরিক প্রশিক্ষণ বনাম স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ

ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর ছিলেন প্রশিক্ষিত সামরিক কর্মকর্তা। যুদ্ধের সব নিয়ম, কৌশল, এবং আত্মরক্ষার নীতি তাঁর জানা ছিল। কিন্তু রণাঙ্গনে তিনি যেন প্রশিক্ষণকে ছাপিয়ে এক স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তাঁর এই আচরণ তাঁর সহযোদ্ধাদের মধ্যে বিস্ময় ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল।

রণাঙ্গনে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর - মৃত্যুঞ্জয়ী এক কমান্ডার

রণাঙ্গনে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ছিলেন এক বিস্ময়ের নাম। তাঁর ক্ষিপ্রতা, সাহস এবং বেপরোয়া রণনীতি তাঁকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিল।

যুদ্ধের সাধারণ নিয়ম হলো - কমান্ডার নিজে নিরাপদ দূরত্বে থেকে কভার ফায়ার দেওয়া বা অধীনস্থ সেনাদের কমান্ড করা। কিন্তু মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ছিলেন মৃত্যুঞ্জয়ী। তিনি যুদ্ধ করতেন সব নিয়ম উপেক্ষা করে, একেবারে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন

সহযোদ্ধাদের উদ্বেগ: তাঁর সহযোদ্ধা এবং অধীনস্থ মুক্তিযোদ্ধারা প্রায়ই শঙ্কিত হয়ে পড়তেন। তারা তাঁকে বারবার অনুরোধ করতেন, "স্যার, আপনি মাথা নিচু করুন, আপনি আরেকটু সাবধানে থাকুন। আপনি মারা গেলে আমাদের কী হবে?"

উত্তরে তিনি কেবল হাসতেন। তাঁর কমরেডরা লিখে গেছেন - তাঁর এই আচরণ ছিল অদ্ভুত। কখনো কখনো মনে হতো, তিনি যেন কোনো এক অলৌকিক টানে বা আধ্যাত্মিক নেশায় শহিদি মৃত্যুকে খুঁজে ফিরছেন।

হয় বিজয়, নয়তো মৃত্যু

তাঁর ক্ষিপ্রতা আর বেপরোয়া সাহস দেখে মনে হতো, তাঁর অভিধানে হয় বিজয়, নয়তো মৃত্যু - তৃতীয় কোনো পথ তার জানা নেই। তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণার এক জীবন্ত উৎস। তাঁর উপস্থিতিতে সাধারণ সৈন্যরাও ভয়কে জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পেত। এই মানসিকতাই তাঁকে তাঁর সহকর্মীদের কাছে অনন্য করে তুলেছিল।

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ - বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে চূড়ান্ত আঘাত

দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর। বিজয়ের সূর্য তখন আক্ষরিক অর্থে পূর্বাকাশে উঁকি দিচ্ছে। চারদিকে পাকিস্তানি বাহিনী কোণঠাসা। মিত্র ও মুক্তিবাহিনী একের পর এক এলাকা মুক্ত করে রাজধানী ঢাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ মুক্ত করার পরিকল্পনা

কৌশলগত কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর দ্রুত মুক্ত করা ছিল অপরিহার্য। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর চূড়ান্ত পরিকল্পনা করলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, মহানন্দা নদী অতিক্রম করে শত্রুর ঘাঁটিতে সরাসরি আঘাত হানবেন।

ভোরবেলা। কুয়াশায় মোড়ানো মহানন্দার তীর। সহযোদ্ধাদের নিয়ে নদী পার হয়ে তিনি অবস্থান নিলেন রেহাইচর এলাকায়।

তীব্র গুলিবর্ষণ চলছে। কিন্তু তিনি পিছিয়ে যাওয়ার লোক ছিলেন না। যথারীতি সবার আগে, সবার সামনে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর

এক হাতে এসএমজি (সাব-মেশিনগান), অন্য হাতে গ্রেনেড। বাঙ্কারের পর বাঙ্কার দখল করে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর আগ্রাসী আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে।

তাঁর চোখে তখন কেবল স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন এবং শত্রুর ঘাঁটিতে শেষ আঘাত হানা।

মহানন্দার তীরে শেষ নিঃশ্বাস - ৪৮ ঘণ্টার ট্র্যাজেডি

বিজয় যখন আক্ষরিক অর্থেই হাতের মুঠোয়, ঠিক তখনই ঘটল সেই মর্মান্তিক ঘটনা।

ঘড়িতে তখন সকাল ৯টা। বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি যখন শেষ আঘাতটি হানার জন্য মাথা তুললেন, ঠিক তখনই শত্রু পক্ষের একটি স্নাইপার বুলেট বা মেশিনগানের গুলি সরাসরি বিদ্ধ করল তার কপালে। যে চোখ দিয়ে তিনি স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই চোখের নিচেই আঘাত হানল ঘাতক বুলেট।

মহানন্দার পাড়ে লুটিয়ে পড়লেন বাংলার এই সূর্যসন্তান। রক্তে লাল হয়ে গেল মহানন্দার পানি।

বিজয়ের অব্যক্ত বেদনা

সবচেয়ে মর্মান্তিক সত্য হলো, ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর জানলেন না, আর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা - মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পর তাঁর প্রিয় জন্মভূমি বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে। তিনি জানলেন না, তাঁর রক্তে কেনা স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। তিনি শহীদি মৃত্যু পেলেন, কিন্তু বিজয়ের উল্লাস দেখার সুযোগ পেলেন না।

১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো। স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ল। কিন্তু সেই পতাকা দেখার জন্য ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর আর বেঁচে রইলেন না।

ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের আত্মত্যাগ কেবল তাঁর মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে আছে।

শেষ শয্যা

তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং তাঁকে বিশেষ সম্মান জানানো হয়। তাঁর বীরত্ব ও সর্বোচ্চ ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

এই মসজিদটি তাঁরই মুক্ত করা অঞ্চলের প্রতীক। ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং এই অঞ্চলে তাঁর ত্যাগের গভীরতা বিবেচনা করে এখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।

বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার সর্বোচ্চ সামরিক পদক 'বীরশ্রেষ্ঠ' উপাধিতে তাঁকে ভূষিত করে। তাঁর এই উপাধি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর অনন্য অবদানকে চিরস্থায়ী করেছে।

এক আক্ষেপের গল্প

আক্ষেপের গল্প: আজও ছোট সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে গেলে মনে হয়, এই অকুতোভয় বীর হয়তো আক্ষেপ করছেন - "ইশ, আর একটু যদি সময় পেতাম! বিজয়ের উল্লাসটা যদি একবার দেখে যেতে পারতাম!" এই মায়াবী ছবিটার দিকে তাকালে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। এত সুন্দর একটা জীবন, এত বড় একটা আত্মত্যাগ - সবই ছিল আমাদের এই পতাকার জন্য।

মৃত্যুঞ্জয়ী বীরের মহিমা

বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের জীবন ও মৃত্যু আমাদের শেখায়, দেশপ্রেমের কোনো বিকল্প নেই। একজন প্রশিক্ষিত সামরিক কর্মকর্তা যিনি জীবন বাজি রেখেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন - দেশের স্বাধীনতা জীবনের চেয়েও মূল্যবান।

তাঁর বেপরোয়া মনোভাব, যা সহযোদ্ধাদের কাছে 'মরিয়া' মনে হয়েছিল, তা আসলে ছিল স্বাধীনতার প্রতি তাঁর গভীরতম আবেগ এবং সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রতিজ্ঞা। এই আত্মত্যাগই প্রমাণ করে, আমাদের স্বাধীনতা কত রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে।

ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর এবং তাঁর মতো সকল শহীদের ঋণ কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়। তাঁর এই গৌরবোজ্জ্বল কাহিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমাদের অনুপ্রাণিত করবে, মনে করিয়ে দেবে - এই পতাকার প্রতিটি সুতোয় মিশে আছে তাঁর মতো সূর্যসন্তানদের রক্ত।

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.