বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর - যিনি শহীদি মৃত্যুকে খুঁজেছিলেন

বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর - যিনি শহীদি মৃত্যুকে খুঁজেছিলেন

মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্রের ইতিহাসে যদি গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করা যায়, তবে একটি অদ্ভুত ও হৃদয়স্পর্শী সত্য সামনে ফুটে ওঠে। স্বাধীন বাংলাদেশের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে মাত্র দুইজন বীরের খুব স্পষ্ট, স্টুডিওতে তোলা বা পরিপাটি ফরমাল আলোকচিত্র আমরা দেখতে পাই। তাঁদের একজন হলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান, আর অন্যজন ৭ নম্বর সেক্টরের কিংবদন্তি সেনানি ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর

ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফ্রেমের সেই সাদা-কালো ছবিতে শান্ত, সৌম্য আর একজোড়া অদ্ভুত মায়াবী চোখ আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই অবয়বে কোনো হিংস্রতা নেই, নেই কোনো পেশিশক্তির হুঙ্কার। কিন্তু এই বাহ্যিক শান্ত ও কোমল চেহারার আড়ালেই যে লুকিয়ে ছিল মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য এক ভয়ংকর, অপ্রতিরোধ্য অগ্নিগিরি তা কেবল তাঁর সহযোদ্ধারাই রণাঙ্গনে প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

রণাঙ্গনে তাঁর সহযোদ্ধারা তাঁকে প্রায়ই আকুল হয়ে বলতেন,

"স্যার, আপনি বড্ড অসতর্কভাবে যুদ্ধ করেন! আপনি এভাবে বেপরোয়া হয়ে সামনে চলে যান কেন? নিজের আত্মরক্ষার কথা অন্তত একবার ভাবুন।"

কিন্তু ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের মনে যেন জ্বলছিল অন্য এক আগুন। মৃত্যুভীতি যাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি, তিনি তো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুত ছিলেন দেশমাতৃকার মুক্তির মূল্যে। আর সেই কাঙ্ক্ষিত শহীদি মৃত্যু তাঁর হাতে এসে ধরা দিয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সকাল ঠিক নয়টায় যখন সমগ্র বাঙালি জাতি বিজয়ের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা দূরত্বে দাঁড়িয়ে চূড়ান্ত উৎসবের প্রহর গুনছিল।

এই প্রবন্ধ সেই অসম্ভব সুদর্শন, রণকৌশলী, অকুতোভয় বীরের গৌরবোজ্জ্বল জীবন, নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে মাতৃভূমির টানে রণাঙ্গনে ফেরা এবং বিজয়ের একদম দ্বারপ্রান্তে তাঁর মহাকাব্যিক আত্মাহুতির কাহিনি।

শৈশব, শিক্ষা ও সেনাজীবনের প্রারম্ভিক অধ্যায়

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার সুগন্ধা ও সন্ধ্যা নদীর পলিধোয়া রহিমপুর গ্রামে ১৯৪৯ সালের ৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। পিতা আব্দুল মোতালেব হাওলাদার এবং মাতা সাফিয়া বেগমের সন্তান জাহাঙ্গীর ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত ধীরস্থির, মেধাবী ও স্বাবলম্বী স্বভাবের।

শিক্ষাজীবন ও আদর্শের ভিত: জাহাঙ্গীরের প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে তিনি মুলাদী মাহমুদজান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪ সালে মেট্রিকুলেশন (এসএসসি) পাস করেন। এরপর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বরিশালের ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে ১৯৬৬ সালে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বিএম কলেজে পড়ার সময় থেকেই তাঁর ভেতরে কাজ করত গভীর দেশপ্রেম, আত্মমর্যাদাবোধ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানসিকতা।

উচ্চমাধ্যমিকের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা ও দেশসেবার তীব্র আকর্ষণ তাঁকে বেশি টানে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান: ১৯৬৭ সালে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। সফল সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৬৮ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর 'কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স'-এ কমিশন লাভ করেন। একজন সামরিক প্রকৌশলী হিসেবে তাঁর জ্ঞান, মেধা ও কৌশলগত দক্ষতা ছিল অত্যন্ত উঁচুমাপের। তাঁর সমসাময়িক অফিসাররা সবসময় স্বীকার করতেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কেবল একজন দক্ষ সেনাই ছিলেন না, বরং সামরিক কৌশল ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জটিল হিসেব-নিকেশেও ছিলেন সমান পারদর্শী।

১৯৭১: পাকিস্তানের বন্দিশালা ও বিবেকের রক্তক্ষরণ

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন ঢাকায় নারকীয় 'অপারেশন সার্চলাইট' চালিয়ে হাজার হাজার নিরপরাধ বাঙালিকে হত্যা করে, তখন ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কর্মরত ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের শিয়ালকোট সীমান্তে (১৭৩ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন)।

দূর পরবাসে স্বদেশের রক্তক্ষরণ: শিয়ালকোটের সুরক্ষিত ব্যারাকে বসে যখন তিনি সংবাদমাধ্যমে এবং গোপন সূত্রে খবর পাচ্ছিলেন যে তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি আজ শ্মশানে পরিণত হচ্ছে, পাকিস্তানি সেনারা বাঙালি নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাচ্ছে আর বুদ্ধিজীবী-ছাত্রদের হত্যা করছে, তখন তাঁর ভেতরের দেশপ্রেমিক সত্তা বিদ্রোহ করে ওঠে।

একজন কমিশনড অফিসার হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে তাঁর ভবিষ্যৎ ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত। পদোন্নতি, আকর্ষণীয় বেতন, সুযোগ-সুবিধা আর নিরাপদ জীবন সবই তাঁর হাতের মুঠোয় ছিল। কিন্তু স্বদেশের বুক যখন শত্রুর বুটের তলে পিষ্ট হচ্ছিল, তখন এই সব বৈষয়িক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তাঁর কাছে চরম অপমানজনক ও অর্থহীন মনে হয়েছিল।

বিদ্রোহের গোপন সিদ্ধান্ত: পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙালি অফিসারদের ওপর তখন কড়া গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হচ্ছিল। সামান্যতম সন্দেহ হলেই তাঁদের বন্দী বা হত্যা করা হতো। এই চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর ছক কষতে থাকেন যেকোনো মূল্যে তাঁকে সীমান্ত টপকে ভারতে পৌঁছাতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে হবে।

ক্যাপশন: মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (ডান দিক থেকে দ্বিতীয়) পরনে পাকিস্তানী পাঠান পোশাক। এই পোশাকে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। পরে জনৈক ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা তার সাথে ছবিটি তুলেন। আর পরের ছবিটি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তোলা।

সীমান্ত অতিক্রম: পাকিস্তান থেকে দুঃসাহসিক পলায়নের মহাকাব্য

সামরিক ইতিহাসে কোনো শত্রুভাবাপন্ন দেশের অভ্যন্তর থেকে কড়া পাহারা এড়িয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে নিজের দেশে ফিরে এসে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর যে দুঃসাহসিক সিদ্ধান্তটি নেন, তা ছিল এক রোমাঞ্চকর ও প্রাণপণ সামরিক অভিযানের মতো।

চার সূর্যসন্তানের ঐতিহাসিক যাত্রা

জুলাইয়ের ৩ তারিখে শিয়ালকোটের সামরিক ঘাঁটি থেকে চারজন বাঙালি সামরিক অফিসার এক অভূতপূর্ব দুঃসাহসিক যাত্রা শুরু করেন। তাঁরা হলেন:

  • ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর

  • ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজ (বীর উত্তম)

  • ক্যাপ্টেন এনামুল হক

  • ক্যাপ্টেন শাহজাহান মজুমদার

তারা নিজেদের সামরিক পোশাক খুলে ফেলে পরিধান করেন স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী পাঠানি পোশাক। গায়ে চাদর জড়িয়ে সাধারণ পথিকের ছদ্মবেশে রাতের আঁধারে তারা শিয়ালকোট সীমান্ত অভিমুখে রওনা হন।

এক ঐতিহাসিক স্মারক: পাকিস্তান থেকে পালিয়ে ভারতে প্রবেশ করার ঠিক পর মুহূর্তেই পথিমধ্যে জনৈক ভারতীয় সেনা কর্মকর্তার সাথে ছদ্মবেশী পোশাক পরা অবস্থায় (ডান দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে বসা) মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের ঐতিহাসিক ছবিটি তোলা হয়েছিল। সেই ছবিতে তাঁর পরনে ছিল পাঠানি পোশাক যা পাকিস্তান থেকে তাঁর দুঃসাহসিক পলায়নের এক অমূল্য দলিল হয়ে আছে।

মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভারতের মাটিতে

পাকিস্তানি সীমান্তরক্ষী ও টহলদারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দুর্গম পাহাড়, নদী ও জঙ্গল অতিক্রম করে তারা শেষ পর্যন্ত ভারতের সীমান্তে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। ভারতে পৌঁছানোর পর তাঁরা সোজা কলকাতায় গিয়ে মুক্তিবাহিনী প্রধান কর্নেল এ. জি. ও. ওসমানীর কাছে রিপোর্ট করেন। একজন প্রশিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ারিং অফিসারের আগমন সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে ছিল মুক্তিবাহিনীর জন্য বিরাট এক সম্পদ।

৭ নম্বর সেক্টর ও মেহদীপুর সাব-সেক্টরের অকুতোভয় নেতৃত্ব

ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয় মুক্তিযুদ্ধের ৭ নম্বর সেক্টরে। এই সেক্টরের আওতাধীন ছিল মালদহ, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া এবং দিনাজপুর জেলার অংশবিশেষ। সেক্টর কমাণ্ডার মেজর নাজমুল হক (পরে সড়ক দুর্ঘটনায় শহীদ হলে দায়িত্ব নেন মেজর কাজী নুরুজ্জামান) তাঁকে মেহদীপুর সাব-সেক্টরের কমাণ্ডার হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেন।

রণকৌশলে ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞানের ব্যবহার

মেহদীপুর সাব-সেক্টরের দায়িত্বে এসে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর তাঁর সামরিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যার শতভাগ প্রয়োগ ঘটাতে শুরু করেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর উত্তর সীমানায় পাকিস্তানি বাহিনী যেসব দুর্ভেদ্য কংক্রিটের বাঙ্কার ও মাইনফিল্ড তৈরি করেছিল, সেগুলোকে নিখুঁত কৌশলে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেন তিনি।

তিনি সাধারণ ছাত্র, কৃষক ও শ্রমিকদের নিয়ে গঠিত মুক্তিবাহিনীকে স্বল্প সময়ে আধুনিক মাইন অপসারণ, গ্রেনেড চার্জিং এবং সারপ্রাইজ অ্যাটাকের প্রশিক্ষণ দেন। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত একাধিক অপারেশনে পাকিস্তানি বাহিনীর রসদ সরবরাহ লাইন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।

রণাঙ্গনের 'বেপরোয়া' কমাণ্ডার: মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব

সামরিক শাস্ত্রের প্রচলিত নিয়ম হলো একজন কমাণ্ডার সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে নিরাপদ দূরত্বের কোনো বাঙ্কার বা কমাণ্ড পোস্ট থেকে অধীনস্থ সেনাদের পরিচালনা করবেন এবং কভার ফায়ার নির্দেশ করবেন। কিন্তু ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ছিলেন প্রচলিত সামরিক নিয়মের সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।

সামনে থেকেই আক্রমণ

তিনি কখনোই পেছনে বসে নির্দেশ দিতেন না। প্রতিটা রেইড, প্রতিটা সম্মুখযুদ্ধে তিনি সাব-মেশিনগান (SMG) হাতে সবার সামনে থাকতেন। তাঁর এই বেপরোয়া সাহস দেখে সহযোদ্ধারা বিস্মিত ও শঙ্কিত হয়ে পড়তেন।

মুক্তিযোদ্ধারা প্রায়ই হাতজোড় করে বলতেন,

"স্যার, আপনি দয়া করে মাথা নিচু করুন! শত্রু স্নাইপার কিন্তু লক্ষ্য করে বসে আছে। আপনার কিছু হয়ে গেলে এই সেক্টরের কী হবে? আমরা কাকে নিয়ে এগোব?"

ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর তাঁদের এই উদ্বেগের উত্তরে কেবল এক চিলতে মিটিমিটি শান্ত হাসি দিতেন। তাঁর সেই হাসির পেছনে লুকানো থাকত এক অদম্য জেদ মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার তাগিদ।

আত্মরক্ষাকে উপেক্ষা করার রহস্য

সহযোদ্ধাদের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, জাহাঙ্গীরের আচরণে মনে হতো তিনি যেন জীবনের মায়াকে অনেক আগেই পেছনে ফেলে এসেছেন। তিনি জানতেন, শীর্ষ নেতৃত্ব যদি ভয় পেয়ে পেছনের লাইনে থাকে, তবে তরুণ সহযোদ্ধারা সামনের দিকে এগোতে ভয় পাবে। তাই সৈন্যদের রক্তে সাহসের উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলতেই তিনি নিজেকে ঢাল বানিয়ে সবার সামনে দাঁড়াতেন। তাঁর অভিধানে 'পরাজয়' বা 'পশ্চাদপসরণ' বলে কোনো শব্দ ছিল না; তাঁর নীতি ছিল স্পষ্ট হয় বিজয়, নয়তো বীরোচিত শাহাদাত

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১: চাঁপাইনবাবগঞ্জ মুক্ত করার মহাকাব্যিক শেষ যুদ্ধ

ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সমগ্র দেশে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় ত্বরান্বিত হয়ে এসেছিল। যৌথ বাহিনীর আক্রমণে চারদিকে শত্রু কোণঠাসা। কিন্তু কৌশলগত কারণে রাজশাহী অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমা মুক্ত করা মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল।

মহানন্দার বুকে বরফশীতল রাতে অভিযান: চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরকে শত্রুমুক্ত করার মূল দায়িত্ব নিলেন ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর নিজে। শহরটির তিন দিকে নদী বেষ্টিত এবং পাকিস্তানি সেনারা মহানন্দা নদীর তীরে অত্যন্ত শক্ত প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তুলেছিল। রেহাইচর এলাকায় ছিল তাদের প্রধান বাঙ্কার নেটওয়ার্ক।

১৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে কুয়াশায় ঢাকা কনকনে ঠাণ্ডা রাতে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর তাঁর বিশ্বস্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে চুপিচুপি মহানন্দা নদী অতিক্রম করেন। ১৪ ডিসেম্বর ভোরে কুয়াশার চাদর যখনো পুরোপুরি মেলেনি, তখন তিনি রেহাইচর এলাকায় নদীর তীরে পৌঁছান এবং শত্রুর ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানেন।

বাঙ্কারের পর বাঙ্কার ধ্বংস: সকাল হতেই শুরু হয় আমরণ লড়াই। মুখোমুখি লড়াইয়ে পাকিস্তানি সেনাদের ভারী মেশিনগানের গুলির মুখে সাধারণ সৈন্যদের পক্ষে সামনে এগোনো অসম্ভব হয়ে উঠছিল।

ঠিক এই চরম সংকট মুহূর্তে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে এক হাতে সাব-মেশিনগান এবং অন্য হাতে গ্রেনেড নিয়ে এক বাঙ্কার থেকে অন্য বাঙ্কারে লাফিয়ে পড়তে থাকেন। তাঁর হিংস্র ও ক্ষিপ্র আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটতে শুরু করে। একটি একটি করে শত্রুবাঙ্কার ধ্বংস করে তিনি যখন একেবারে শেষ বাঙ্কারের কাছাকাছি পৌঁছে যান, তখন জয়ের লাল সূর্য দৃশ্যমান হচ্ছিল।

মহানন্দার তীরে শেষ নিঃশ্বাস: বিজয়ের ৪৮ ঘণ্টা আগের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি

ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ঠিক ৯টা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর শত্রুমুক্ত হওয়া কেবল কয়েক মিনিটের ব্যাপার মাত্র।

সেই ঘাতক বুলেট: চূড়ান্ত জয়ের আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে শত্রুবাঙ্কারের ওপর শেষ আঘাতটি হানার জন্য যখন ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর নিজের মাথাটি একটু উঁচু করলেন, ঠিক তখনই পাশেই লুকিয়ে থাকা এক পাকিস্তানি ঘাতক স্নাইপারের গান থেকে ছুটে এল একটি মরণঘাতী বুলেট।

ছবিতে যে মায়াবী চোখ দুটো দিয়ে আমরা ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরকে দেখি, সেই ডান চোখের ঠিক নিচেই এসে বিদ্ধ হলো ঘাতকের বুলেটটি। মুহূর্তের মধ্যে সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। যে চোখ দিয়ে তিনি স্বাধীন বাংলার উদিত সূর্য দেখার স্বপ্ন বুনেছিলেন, সেই চোখ বুজে গেল চিরকালের জন্য। মহানন্দা নদীর তীরের ধূলিকণায় লুটিয়ে পড়লেন বাংলার এই অমর সূর্যসন্তান। তাঁর তাজা রক্তে লাল হয়ে গেল মহানন্দার পবিত্র জলরাশি।

বিজয়ের অব্যক্ত বেদনা: সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর জেনে যেতে পারলেন না যে, তাঁর এই রক্তের বিনিময়ে মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পর ১৬ই ডিসেম্বর সূর্যোদয়ের সাথে সাথে তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে!

যে বিজয়ের জন্য তিনি পাকিস্তান থেকে নিজের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন, যে বিজয়ের জন্য তিনি রণাঙ্গনে সিংহের মতো লড়াই করেছিলেন সেই বিজয়ের উৎসবে তিনি নিজে অনুপস্থিত রয়ে গেলেন।

ছোট সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে চিরনিদ্রা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

১৪ই ডিসেম্বর মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের শাহাদাতের পর তাঁর সহযোদ্ধারা উদভ্রান্তের মতো শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং ১৫ই ডিসেম্বর সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়। সহযোদ্ধারা অত্যন্ত অশ্রুসজল নয়নে তাঁদের প্রিয় কমাণ্ডারের মরদেহ উদ্ধার করেন।

ঐতিহাসিক সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে শেষ শয্যা: ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহাসিক ছোট সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে। তাঁরই মুক্ত করা স্বাধীন বাংলার মাটিতে, মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন সোনা মসজিদের আঙিনায় তাঁকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। কাকতালীয়ভাবে, তাঁর কবরটি স্থাপন করা হয় ৭ নম্বর সেক্টরের প্রথম কমাণ্ডার মেজর নাজমুল হকের কবরের ঠিক পাশে।

আজও সোনা মসজিদের শান্ত প্রাঙ্গণে গেলে মনে হয় দুই বীর সেনানি যেন আজও সজাগ দৃষ্টিতে পাহারা দিচ্ছেন স্বাধীন বাংলাদেশের সীমানা।

সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক 'বীরশ্রেষ্ঠ': স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য সাহসিকতা, অতুলনীয় কৌশলগত নেতৃত্ব এবং সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান 'বীরশ্রেষ্ঠ' উপাধিতে ভূষিত করে।

একনজরে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর

নিচে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের জীবন, সামরিক কর্মজীবন এবং মুক্তিযুদ্ধে অবদানের একটি সংক্ষেপিত সারণী দেওয়া হলো:

বিষয় বা ক্ষেত্র

বিস্তারিত ঐতিহাসিক তথ্য

পূর্ণ নাম

বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর।

জন্ম তারিখ ও স্থান

৭ই মার্চ, ১৯৪৯; গ্রাম: রহিমপুর, উপজেলা: বাবুগঞ্জ, জেলা: বরিশাল।

পিতা ও মাতা

পিতা: আব্দুল মোতালেব হাওলাদার; মাতা: সাফিয়া বেগম।

শিক্ষাগত যোগ্যতা

এইচএসসি (ব্রজমোহন কলেজ, বরিশাল); পরিসংখ্যান বিভাগ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় - অসমাপ্ত)।

সামরিক কমিশনিং

১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান; ১৯৬৮ সালে 'কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স'-এ কমিশন প্রাপ্তি।

পাকিস্তান থেকে পলায়ন

৩ই জুলাই, ১৯৭১ (পাকিস্তানের শিয়ালকোট সীমান্ত অতিক্রম করে ভারত গমন)।

মুক্তিযুদ্ধে পদবি ও সেক্টর

৭ নম্বর সেক্টর; মেহদীপুর সাব-সেক্টরের অকুতোভয় কমাণ্ডার।

প্রধান লড়াইয়ের স্থানসমূহ

কানসাট, আরগাড়া বাজার, শাহপুর, মহানন্দা নদীর তীর ও রেহাইচর।

শাহাদাত বরণের তারিখ ও সময়

১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ (সকাল ঠিক ৯:০০ টায়)।

শাহাদাতের স্থান

রেহাইচর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ (মহানন্দা নদীর তীরে শত্রু স্নাইপারের বুলেটে)।

সমাধিস্থল

ঐতিহাসিক ছোট সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা

বীরশ্রেষ্ঠ (মুক্তিযুদ্ধের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব)।

এক অনির্বাপণীয় আক্ষেপ ও আধুনিক প্রজন্মের দায়বদ্ধতা

আজ এত বছর পরেও যখন আমরা ছোট সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের শান্ত সমাধিসৌধের দিকে তাকাই, কিংবা সেই দুর্লভ ছবিটিতে তাঁর চোখ দুটোর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করি তখন বুকের ভেতর কেমন যেন এক হাহাকার জেগে ওঠে।

মনে মনে একটি আক্ষেপের সুর বারবার প্রতিধ্বনিত হয়:

"ইশ! আর মাত্র ৪৮টি ঘণ্টা যদি তিনি বেঁচে থাকতেন! বিজয়ের সেই আনন্দমিছিল, ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পতপত করে ওড়া লাল-সবুজের স্বাধীন পতাকা যদি তিনি নিজ চোখে একবার দেখে যেতে পারতেন!"

কিন্তু পরক্ষণেই বোধোদয় হয় ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীররা হয়তো কোনোদিন বিজয় উৎসবের অংশ হতে আসেননি; তাঁরা এসেছিলেন নিজেদের রক্ত দিয়ে সেই বিজয়ের রথ টেনে নিয়ে আসতে। তাঁদের এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগই আমাদের শিখিয়ে যায় দেশপ্রেমের চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই, আর স্বদেশের পতিকার সম্মান রক্ষা করার চেয়ে বড় কোনো কর্তব্য নেই।

ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের রেখে যাওয়া এই রক্তঋণ কখনো শোধ হওয়ার নয়। একুশ শতকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমাদের একমাত্র দায়িত্ব হলো যে স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক, ন্যায়ভিত্তিক ও স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তিনি নিজের তরুণ জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশকে বুকের গভীরে লালন করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তাঁর এই মহাকাব্যিক বীরত্বগাথাকে সগৌরবে পৌঁছে দেওয়া।

বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর বেঁচে থাকবেন মহানন্দার কলতানে, বেঁচে থাকবেন চিরকাল রক্তে কেনা লাল-সবুজ পতাকার প্রতিটা সুতোয়।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.