এরশাদ শিকদার - গান গাইতে গাইতে খুন করতো যে সাইকো

Jan 28, 2026

বাংলার অপরাধ জগতের ইতিহাসে এমন কোনো নাম নেই যা ‘এরশাদ শিকদার’ নামের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে বহু অপরাধী এসেছে, চলেও গেছে। কিন্তু এরশাদ শিকদারের মতো এতটা বিকৃতমস্তিষ্ক, নৃশংস এবং ক্ষমতাধর খুনি আর দ্বিতীয়টি জন্ম নেয়নি। গত ৫২ বছরে বাংলাদেশ অনেক অপরাধী দেখেছে, কিন্তু এরশাদ শিকদারের মতো নৃশংসতা, ধূর্ততা এবং ক্ষমতার দম্ভ আর কারো মধ্যে দেখা যায়নি। তিনি কেবল একজন খুনি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাধারে মাদক সম্রাট, টেন্ডারবাজ, ধর্ষক এবং ঘাটের মুকুটহীন রাজা।

তার জীবনকাহিনী শুনলে আজও মানুষের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। আজ আমরা এই কুখ্যাত সিরিয়াল কিলারের জীবন, তার উত্থান, ভয়াবহ অপরাধসমূহ এবং তার পতন নিয়ে এক বিস্তারিত ও তথ্যবহুল আলোচনায় প্রবেশ করব।

শৈশব থেকে ‘রাঙা চোর’

১৯৫৪ সালে ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার মাদারঘোনা গ্রামে জন্ম নেন এরশাদ শিকদার। তার পিতার নাম ছিল বন্দে আলী শিকদার। এক অতি সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া এরশাদের শৈশব ছিল আর দশটা সাধারণ গ্রামীণ কিশোরের মতোই। অভাবের তাড়নায় হোক বা ভাগ্য অন্বেষণের নেশায়, ১৯৭৬-৭৭ সালের দিকে তিনি ঘর ছেড়ে পাড়ি জমান শিল্পনগরী খুলনায়।

সে সময় খুলনার ঘাট এলাকা ছিল কর্মসংস্থানের বড় কেন্দ্র। এরশাদ শিকদার সেখানে গিয়ে কুলি হিসেবে কাজ শুরু করেন। তবে তার শারীরিক পরিশ্রমের চেয়ে বেশি ঝোঁক ছিল কৌশলে অল্প সময়ে অনেক টাকার মালিক হওয়া। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাই তাকে ধীরে ধীরে অপরাধের অন্ধকার গলিতে নিয়ে যায়।

কেন তাকে ‘রাঙা চোর’ বলা হতো? খুলনায় আসার পর সে ছোটখাটো চুরিতে জড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে রেললাইনের মূল্যবান লোহার পাত চুরি করে বিক্রি করা ছিল তার প্রধান কাজ। শোনা যায়, চুরির সময় ধরা পড়লে বা পালানোর সময় তার অদ্ভুত এক ক্ষিপ্রতা ছিল। এই ছিঁচকে চুরির মাধ্যমেই অপরাধ জগতে তার হাতেখড়ি। ছোটখাটো চুরিতে পারদর্শিতা আর তার গায়ের রঙের কারণে স্থানীয়ভাবে তার নাম হয়ে যায় ‘রাঙা চোর’। এই তুচ্ছ নামটির আড়ালে যে একদিন বাংলার ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস সিরিয়াল কিলার লুকিয়ে ছিল, তা তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

কিন্তু এরশাদ শিকদার শুধু ছিঁচকে চোর হয়ে থাকতে চাননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, একলা চলায় কোনো বড় সাফল্য নেই। তাই তিনি ঘাট এলাকার উঠতি মাস্তানদের নিয়ে একটি ছোট গ্যাং বা বাহিনী গড়ে তোলেন। এই বাহিনী ব্যবহার করে তিনি রেলস্টেশন ও ৪-৫ নম্বর ঘাট এলাকায় নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেন।

রাজনীতির বিষবৃক্ষে ক্ষমতার চূড়ায়

অপরাধ জগতে এরশাদ শিকদারের দ্রুত উত্থানের পেছনে মূল কারিগর ছিল তৎকালীন অস্থির রাজনীতি। আশির দশকের শুরুতে যখন জেনারেল এইচ এম এরশাদ সামরিক শাসন জারি করেন, তখন চতুর এরশাদ শিকদার বুঝতে পারেন যে টিকে থাকতে হলে রাজনৈতিক ছাতার নিচে যেতেই হবে।

১৯৮২ সালে যখন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক শাসন জারি করেন, তখন এই খুনি কৌশলে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেয়। তৎকালীন সরকারের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের সাথে সখ্য গড়ে তুলে তিনি সাধারণ কুলি থেকে বনে যান ‘ঘাটের সর্দার’। ডক শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতে। ৩-৪ হাজার শ্রমিকের এই বিশাল বাহিনীকে সে রাজনৈতিক মিছিলে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করত। সরকারের যেকোনো সভা-সমাবেশে লোক সরবরাহের মূল দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। বিনিময়ে প্রশাসন তার অপকর্মের দিকে চোখ বন্ধ করে রাখত।

এরশাদ শিকদার কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাস করতেন না; তার একমাত্র আদর্শ ছিল ‘ক্ষমতা’।

১৯৮২ সাল: এরশাদ শিকদার জাতীয় পার্টিতে যোগ দেয়।

১৯৯১ সাল: বিএনপি ক্ষমতায় এলে সে ভোল পাল্টে বিএনপিতে নাম লেখায়।

১৯৯৬ সাল: আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সে দ্রুত দল পরিবর্তন করে। যদিও সমালোচনার মুখে আওয়ামী লীগ তাকে বহিষ্কার করেছিল, কিন্তু ততদিনে তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে শিকড় গেঁড়ে ফেলেছেন।

তার প্রভাব এতটাই ছিল যে, তিনি খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার হিসেবে টানা কয়েকবার নির্বাচিত হন। জনগণের ভোট নয়, বরং পেশিশক্তি আর ভয়ের সংস্কৃতি ব্যবহার করে তিনি ব্যালট বক্স দখল করতেন।

ভয়ংকর ‘স্বর্ণকমল’ বিলাসবহুল নরকপুরী

এরশাদ শিকদারের বিলাসিতা ছিল আকাশচুম্বী। খুলনার মজিদ সরণিতে সে নির্মাণ করেছিল ‘স্বর্ণকমল’ নামে এক রাজকীয় প্রাসাদ। খুলনার রূপসা তীরের সেই কুখ্যাত 'স্বর্ণকমল' এখন হয়তো কেবলই এক জরাজীর্ণ অট্টালিকা, কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এই নামটি শুনলে খুলনাবাসী আতংকিত হতো।

এই বাড়িটি ছিল সে সময়কার আধুনিক স্থাপত্যের এক নিদর্শন। বাইরে থেকে দেখলে একে কোনো রাজকীয় প্রাসাদ মনে হতো, কিন্তু এর দেয়ালের ভেতরে লুকিয়ে ছিল বীভৎস সব কাহিনী। আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি এই বাড়িতে এরশাদ শিকদার তার নিজস্ব সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। বাড়ির ভেতর ছিল গোপন বাঙ্কার এবং অস্ত্রাগার।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, সেই বাড়ি থেকে প্রায় ৭০টি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল। বাড়িটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছিল যে, এর ভেতরে কী ঘটছে তা বাইরের কেউ কল্পনাও করতে পারত না। এই বাড়িতেই সে তার নিজস্ব আদালত বসাত। কেউ যদি তার অবাধ্য হতো, তাকে স্বর্ণকমলের ভেতরে ধরে এনে অমানুষিক নির্যাতন করা হতো। এমনকি তুচ্ছ কারণেও সে মানুষ খুন করতে দ্বিধা করত না।

এরশাদ শিকদারের নিষ্ঠুরতা ছিল প্রবাদপ্রতিম। একবার তার প্রতিবেশী এক ব্যক্তি বাড়ি নির্মাণের সময় সীমানা নিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, এরশাদ শিকদার সেই ব্যক্তিকে স্বর্ণকমলের ভেতরে ধরে নিয়ে গিয়ে জীবন্ত কবর দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সামান্য বিরোধের জেরে তিনি অবলীলায় মানুষের প্রাণ নিতেন।

বরফকলের বিভীষিকা

খুলনার ৪ নম্বর ঘাটের আইস ফ্যাক্টরি বা বরফকলটি ছিল এরশাদ শিকদারের ত্রাসের রাজত্বের প্রধান কেন্দ্র। ১৯৯১ সালে এরশাদ শিকদার পেশিশক্তির জোরে রফিক নামক এক ব্যবসায়ীকে উচ্ছেদ করে এই কারখানাটি দখল করে নেয়। বরফ তৈরির জন্য স্থাপিত এই কারখানাটি রাতারাতি হয়ে ওঠে লাশের কারখানা।

সাধারণ মানুষের কাছে যা ছিল বরফ উৎপাদন কেন্দ্র, এরশাদের কাছে তা ছিল তার শত্রুদের শেষ ঠিকানা। এই বরফকলের ভেতরেই চলত অবর্ণনীয় নির্যাতন। এর চার দেয়ালের ভেতরে ঠিক কতজন মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে, তার সঠিক হিসাব আজও অজানা। তবে যারা সেই সময়কার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন, তাদের বর্ণনায় এই বরফকল ছিল এক বিভীষিকাময় জঞ্জাল।

এরশাদ শিকদারের খুনের ধরনে ছিল এক ধরণের বিকৃত শৈল্পিকতা এবং চরম পাশবিকতা। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সে যখন কাউকে হত্যা করত, তখন তার মুখে থাকত অদ্ভুত এক শান্ত ভাব। সে গুনগুন করে গান গাইত আর তার শিকারকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিত। খুনের পর লাশের বুকের ওপর উঠে লাফানো ছিল তার এক পৈশাচিক অভ্যাস, যা সে বিজয়ের উল্লাস হিসেবে পালন করত।

গান গাইতে গাইতে খুন: খুন করার সময় সাধারণ অপরাধীরা যেখানে আতঙ্কিত থাকে, এরশাদ ছিল তার উল্টো। সে যখন কাউকে হত্যা করত, তখন খুব শান্ত ভঙ্গিতে গান গাইত। আর্তচিৎকার আর রক্তের মাঝে তার এই গান গাওয়া উপস্থিত সহযোগীদের মনেও ত্রাসের সৃষ্টি করত। খুনের পর লাশের বুকে উঠে লাফানো ছিল তার বিকৃত আনন্দের একটি অংশ।

২০ কেজি ওজনের মুগুর: বরফ ভাঙার জন্য ব্যবহৃত ২০ কেজি ওজনের লোহার মুগুর ছিল তার প্রিয় অস্ত্র। এই মুগুর দিয়ে সে জীবন্ত মানুষের হাড়গোড় গুঁড়ো করে দিত। তার লক্ষ্য ছিল শিকারকে সরাসরি মেরে না ফেলে দীর্ঘক্ষণ যন্ত্রণা দেওয়া। মুগুরের প্রতিটি আঘতে মানুষের হাড় যখন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেত, তখন সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ত।

দুধ দিয়ে গোসল: এরশাদ শিকদারের কর্মকাণ্ডে অদ্ভুত এক আধ্যাত্মিক বিকৃতিও লক্ষ্য করা যেত। প্রতিটি খুনের পর সে বালতি বালতি দুধ দিয়ে গোসল করত। তার এক বিচিত্র বিশ্বাস ছিল যে, মানুষের রক্ত শরীরে লাগলে তা কেবল পানি দিয়ে ধুয়ে যায় না। সে মনে করত, দুধ দিয়ে গোসল করলে শরীরের রক্তের গন্ধ এবং খুনের 'পাপ' ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে। এটি তার এক ভয়াবহ মানসিক বৈকল্যের প্রমাণ।

লাশ গুমের কৌশল

লাশ গুম করার ক্ষেত্রে এরশাদ শিকদার ছিল অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনাকারী। প্রমাণ লোপাট করতে সে সব সময় আধুনিক ও নৃশংস পদ্ধতি ব্যবহার করত। অধিকাংশ লাশ সে ভারী সিমেন্টের বস্তায় ভরে ভৈরব নদীতে ডুবিয়ে দিত। এতে করে লাশগুলো আর ভেসে ওঠার সুযোগ পেত না।

ডিএনএ বা কোনো প্রকার প্রমাণ যেন অবশিষ্ট না থাকে, সেজন্য সে মাঝেমধ্যে লাশগুলো ইটভাটায় পুড়িয়ে ফেলত। আগুনের লেলিহান শিখায় মিশে যেত মানুষের অস্তিত্ব।

সবচেয়ে ভয়াবহ ও ঘৃণ্য তথ্যটি হলো তার বাড়ির পুকুর নিয়ে। অনেক সাক্ষী দাবি করেছিলেন, এরশাদ তার পুকুরের মাগুর মাছগুলোকে মানুষের মাংস খাওয়াত। এই ধারণাটি খুলনার মানুষের মনে দীর্ঘকাল এক গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করে রেখেছিল।

কিছু চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড

অফিশিয়ালি তার নামে ২৪টি খুনের মামলা প্রমাণিত হয়েছিল, কিন্তু লোকমুখে এবং বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে যে, তার পৈশাচিক লালসার বলি হয়েছিল অন্তত ৬০ থেকে ৭০ জন মানুষ। তার নৃশংসতার কিছু উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:

ক) যুবলীগ নেতা খালিদ হোসেন হত্যাকাণ্ড

১৯৯৯ সালের ১৬ মে এই তারিখটি ছিল এরশাদ শিকদারের সাজানো সাম্রাজ্যের পতনের প্রথম ধাপ। সেই রাতে সে খুলনার রূপসা এলাকার যুবলীগ নেতা খালিদ হোসেনকে অত্যন্ত সুকৌশলে তার বরফকলে ডেকে নিয়ে আসে। অপরাধ জগতের নিয়ম অনুযায়ী, এরশাদ শিকদার প্রথমে তার শিকারকে আশ্বস্ত করত। খালিদকেও প্রথমে আদর-আপ্যায়ন করে মিষ্টি খাওয়ানো হয়।

কিন্তু মিষ্টি খাওয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই এরশাদ তার আসল রূপ ধারণ করে। সে তার রাইফেল বের করে খালিদকে জিম্মি করে। এরপর শুরু হয় মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন। একটি ২০ কেজি ওজনের লোহার মুগুর দিয়ে সে খালিদকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পিটিয়ে আধমরা করে ফেলে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সেই রাতে ভৈরব নদীর পাড়ে খালিদের আর্তচিৎকার আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু এরশাদের ভয়ে কেউ এগিয়ে আসার সাহস পায়নি।

শেষ পর্যন্ত মৃত্যু নিশ্চিত করে লাশটি বস্তাবন্দী করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। মজার ব্যাপার হলো, এরশাদ শিকদার অসংখ্য মানুষকে খুন করে লাশ গুম করলেও, খালিদ হোসেনের লাশটিই পুলিশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল। আর এই একটি লাশই পরবর্তীতে তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।

খ) ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ চাকলাদার হত্যা

ব্যবসায়িক আধিপত্য এবং ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে এরশাদ শিকদার কতটা মরিয়া ছিল, তার প্রমাণ হলো ঢাকার লালবাগের ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ চাকলাদার হত্যাকাণ্ড। ১৯৯৮ সালে তাকে ঢাকা থেকে অপহরণ করে খুলনায় নিয়ে আসা হয়।

এরশাদ শিকদারের বাহিনী আজিজ চাকলাদারকে তুলে নিয়ে আসার পর তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায় এবং শেষ পর্যন্ত তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশটি এমনভাবে গুম করা হয় যে তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এই মামলাটি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী মামলা।

তথ্যসূত্র: আজিজ চাকলাদার হত্যা মামলাটি ১৯৯৮ সালে শুরু হলেও এর চূড়ান্ত রায় আসতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। এমনকি ২০২০ সালেও এই মামলার বাকি আসামিদের সাজা বহাল রাখার মাধ্যমে এর আইনি প্রক্রিয়া চলমান ছিল। এরশাদের ফাঁসি হয়ে গেলেও তার সহযোগীরা দীর্ঘ সময় ধরে আইনের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করেছিল।

গ) নিজের সহযোগী জয়নাল হত্যা

একজন অপরাধী যখন ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছায়, তখন সে কাউকেই বিশ্বাস করতে পারে না। এরশাদ শিকদারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তার অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী ছিল জয়নাল। কিন্তু নিজের চামড়া বাঁচাতে এরশাদ তার এই ঘনিষ্ঠ বন্ধুকেও ছাড় দেয়নি।

একটি বিশেষ হত্যা মামলায় যখন পুলিশের তদন্ত এরশাদের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তখন সে জয়নালকে 'বলির পাঁঠা' বানানোর পরিকল্পনা করে। জয়নাল জানত এরশাদের অনেক গোপন তথ্য, আর এই তথ্য গোপন করার জন্যই এরশাদ শিকদার তাকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় খুন করে। এটি ছিল তার সংগঠনের ভেতরের মানুষদের কাছে একটি বার্তা যে, আনুগত্য বদলালে বা বিপদের কারণ হলে তার পরিণতি হবে মৃত্যু।

নারীর প্রতি লালসা ও বিকৃত মানসিকতা

এরশাদ শিকদারের পৈশাচিকতা কেবল খুনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তার বিকৃত যৌন লালসা ছিল ভয়াবহ। তার বিলাস বহুল বাড়ি 'স্বর্ণকমল'-এ ছিল গোপন কক্ষ, যা মূলত ব্যবহার করা হতো নারীদের ওপর নির্যাতনের জন্য।

বডিগার্ড নূরে আলমের স্ত্রীর ওপর লাঞ্ছনা

এরশাদ শিকদারের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ছিল নূরে আলম। অথচ সেই নূরে আলমের সুন্দরী স্ত্রীর ওপর কুনজর পড়ে এরশাদের। সে নূরে আলমকে বাধ্য করত তার নিজের চোখের সামনেই তার স্ত্রীকে লাঞ্ছিত করতে দেখতে। এই চরম অপমান নূরে আলমের ভেতরে তিল তিল করে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে এরশাদের বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হতে তাকে প্ররোচিত করে।

একটি পরিবারের মা ও মেয়েদের ওপর নির্যাতন

এরশাদ শিকদারের জীবনের সবচেয়ে ঘৃণ্যতম অধ্যায় হলো এক নারীকে মিথ্যা চুরির অপবাদে ধরে আনা। সেই নারীকে দীর্ঘ বছর ধরে স্বর্ণকমলের একটি গোপন কক্ষে বন্দী করে রাখা হয় এবং নিয়মিত ধর্ষণ করা হয়।

সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হলো, সেই বন্দিনী নারীর গর্ভে এরশাদের দুটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু এরশাদ শিকদারের বিকৃতি এতটাই প্রবল ছিল যে, সেই মেয়েরা যখন বড় হয়, সে তখন তাদের ওপরেও পাশবিক নির্যাতন চালায়। এই ঘটনাটি ছিল সহ্যের সীমার বাইরে। এই চরম অবমাননা এবং মানবিকতার স্খলন দেখে তার অনুগত বডিগার্ড নূরে আলম শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছে মুখ খোলার সাহস পায়।

নূরে আলম - যে রাজসাক্ষীর বর্ণনায় খুলেছিল রহস্যের জট

এরশাদ শিকদারের দানবীয় সাম্রাজ্যের পতনের নেপথ্যে ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি দীর্ঘ ১০ বছর এরশাদের ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। তিনি আর কেউ নন, এরশাদের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী নূরে আলম

নূরে আলম কেবল একজন বডিগার্ড ছিলেন না, তিনি ছিলেন এরশাদ শিকদারের অন্ধকার জগতের জীবন্ত ডায়েরি। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এক দশক তিনি এরশাদের প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করেছেন। এই ১০ বছরে এরশাদ শিকদার যতগুলো হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তার প্রায় সবগুলোরই প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন নূরে আলম।

এরশাদ শিকদার ছিল অত্যন্ত চতুর। সে জানত কীভাবে তথ্যপ্রমাণ লোপাট করতে হয়। তার হাতে খুন হওয়া মানুষগুলোর লাশ কখনো শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেওয়া হতো, আবার কখনো নিজের বরফ কল বা বাড়ির আঙিনায় পুঁতে ফেলা হতো। পুলিশের কাছে এরশাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ থাকলেও প্রমাণের অভাবে তাকে সাজা দেওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। ঠিক এই জায়গাটিতেই তুরুপের তাস হয়ে দাঁড়ান নূরে আলম।

সে আদালতে দাঁড়িয়ে একের পর এক ২৪টি খুনের বর্ণনা দেয়। নূরে আলমের সাক্ষ্য ছাড়া এরশাদ শিকদারকে সাজা দেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। কারণ এরশাদ কোনো তথ্যপ্রমাণ রাখত না।

অনেকেই প্রশ্ন করেন, দীর্ঘ ১০ বছর কেন নূরে আলম চুপ ছিলেন? এর উত্তর নূরে আলম নিজেই আদালতে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "আমি ভয়ে চুপ থাকতাম, কিন্তু যখন সে আমার স্ত্রীর ওপর হাত বাড়াল, তখন আমি বুঝলাম এই দানবকে না থামালে কেউ রক্ষা পাবে না।"

এরশাদ শিকদারের লালসার হাত যখন তার নিজের বিশ্বস্ত বডিগার্ডের পরিবারের ওপর পড়ল, তখনই নূরে আলমের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজসাক্ষী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি একের পর এক ২৪টি খুনের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন, যা শুনে খোদ বিচারক ও আইনজীবীরাও শিউরে উঠেছিলেন। নূরে আলমের সেই অকাট্য সাক্ষ্যই এরশাদের গলায় ফাঁসির দড়ি নিশ্চিত করেছিল।

এরশাদ শিকদার গ্রেফতার হয় কিভাবে?

১৯৯৯ সালে যুবলীগ নেতা খালিদ হোসেন হত্যাকাণ্ড ছিল তার পতনের শুরু। এর আগে এরশাদ শিকদার অনেক মানুষকে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল বা গুম করেছিল, যার কোনো চিহ্ন পাওয়া যেত না। কিন্তু খালিদ হোসেনের ক্ষেত্রে পাশা উল্টে যায়।

এই খুনের ঘটনায় পুলিশ দ্রুত লাশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। আগের খুনের ঘটনাগুলোতে কেউ মুখ খোলার সাহস না পেলেও, খালিদ হত্যার পর সাহসী কিছু প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী দিতে রাজি হন। সেই সময় জাতীয় মিডিয়ায় এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ফলে প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়তে থাকে।

খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যে, সরকার ও প্রশাসনের পক্ষে এরশাদ শিকদারকে আর আড়াল করা সম্ভব ছিল না।

পুলিশি অভিযান ও 'স্বর্ণকমল' রহস্য

খালিদ হত্যা মামলার পর পুলিশ নড়েচড়ে বসে। খুলনায় এরশাদ শিকদারের প্রভাব খর্ব করতে শুরু হয় একের পর এক রেইড। সবার নজর পড়ে তার বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদ 'স্বর্ণকমল'-এর দিকে।

পুলিশ যখন স্বর্ণকমল ঘিরে ফেলে, তখন বেরিয়ে আসে লোমহর্ষক সব তথ্য। সেই বাড়ির ভেতরে ছিল গোপন বাঙ্কার এবং বিশেষ নির্যাতনকেন্দ্র। সেখানে মানুষকে ধরে এনে অমানুষিক নির্যাতন করে হত্যা করা হতো। উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এরশাদ শিকদার আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। সে বুঝতে পেরেছিল, এবারের লড়াই তার একার পক্ষে সামলানো সম্ভব নয়। সারা দেশে যখন তার নাম নিয়ে ছি ছি পড়ে গেছে, তখন সে ছদ্মবেশে আত্মগোপন করার চেষ্টা করে।

রাজনৈতিক মিথ্যা আশ্বাস ও আত্মসমর্পণ

এরশাদ শিকদার কেবল একজন খুনি ছিল না, সে ছিল খুলনা সিটি করপোরেশনের তৎকালীন ৮ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার। তার সাথে তৎকালীন প্রভাবশালী বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার গভীর সখ্য ছিল। যখন সে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল, তখন তার কাছে কিছু মধ্যস্থতাকারী ও রাজনৈতিক নেতার পক্ষ থেকে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়।

রাজনৈতিক নেতারা তাকে বোঝান যে, প্রকাশ্যে আত্মসমর্পণ করলে মামলাগুলো হালকা করে দেওয়া হবে। তাকে বলা হয়েছিল:

"তুমি আত্মসমর্পণ করো। পরিস্থিতি এখন উত্তপ্ত, আত্মসমর্পণ করলে জনরোষ কমবে। পরে আমরা মামলা দুর্বল করে দেব এবং কয়েকদিন পর তুমি জামিনে বেরিয়ে আসতে পারবে।"

ক্ষমতার লোভে অন্ধ এরশাদ শিকদার এই মিথ্যা আশ্বাস বিশ্বাস করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, অতীতের মতো এবারও হয়তো টাকার জোরে আর রাজনৈতিক প্রভাবে পার পেয়ে যাবেন।

অবশেষে ১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে এরশাদ শিকদার খুলনা আদালতে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণ করেন। তার আত্মসমর্পণের খবর ছড়িয়ে পড়লে খুলনার সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে, যদিও সে সময়ও তার অনুসারীরা আদালত পাড়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিল।

পতন ও বিচারের দীর্ঘ লড়াই

১৯৯৯ সাল ছিল এরশাদ শিকদারের দীর্ঘ ও নৃশংস রাজত্বের সমাপ্তির বছর। যে খুলনার ঘাট ও বরফ কল একসময় তার আঙুল হেলানো ইশারায় চলত, সেই খুলনাতেই তাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়তে হয়। গ্রেপ্তারের পর এরশাদ শিকদারের মনে বিন্দুমাত্র ভয় ছিল না। সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত, তার পেছনে থাকা রাজনৈতিক গডফাদাররা তাকে ঠিকই বের করে আনবে। ক্ষমতার অলিন্দে তার বিচরণ এবং প্রশাসনের গভীরে তার শিকড় এতটাই শক্ত ছিল যে, ধরা পড়েও সে ছিল অদ্ভুতভাবে আত্মবিশ্বাসী।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। এরশাদ শিকদারের অপরাধের মাত্রা এতটাই অমানবিক ও বীভৎস পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তৎকালীন সরকার বা বিচার বিভাগ কেউই কোনো আপস করতে রাজি ছিল না। তার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ আসতে শুরু করে এবং চূড়ান্তভাবে ৪৩টি মামলা দায়ের করা হয়।

তৎকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কড়া নজরদারির কারণে বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলে। খুলনার সেই 'ত্রাস' বুঝতে পারেন যে, এবার আর তার রাজনৈতিক রক্ষাকর্তারা পাশে নেই।

২০০০ সালের ৩০ এপ্রিল খুলনার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত একটি খুনের মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসির আদেশ দেন। পরবর্তীতে উচ্চ আদালত সেই রায় বহাল রাখে। জীবনের সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শেষ চেষ্টা হিসেবে এরশাদ শিকদার রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন জানান। কিন্তু অপরাধের নৃশংসতা বিবেচনা করে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সেই আবেদন নাকচ করে দেন। আর এর মাধ্যমেই তার জীবনের শেষ ঘণ্টাগুলো বাজতে শুরু করে।

ফাঁসির সেই রাত

২০০৪ সালের ১০ মে। খুলনা জেলা কারাগার তখন নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এটিই ছিল এরশাদ শিকদারের জীবনের শেষ রাত। যে মানুষটি অসংখ্য মানুষের রক্তে হাত রাঙিয়েছিল, তার নিজের রক্ত হিম হওয়ার সময় চলে এসেছিল।

ফাঁসি কার্যকরের ১২ ঘণ্টা আগে তাকে চূড়ান্তভাবে জানানো হয় যে, আজই তার শেষ সময়। সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল সে হয়তো কান্নাকাটি বা ভয় পাবে, কিন্তু এরশাদ শিকদার ছিলেন কিছুটা ব্যতিক্রম। মৃত্যু পরোয়ানা শোনার পরও সে বিচলিত না হয়ে তার শেষ ইচ্ছা হিসেবে খাসির মাংস ও মুরগির মাংস দিয়ে ভরপেট খাবার খাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। জেল কর্তৃপক্ষ তাকে সেই বিশেষ রাজকীয় ভোজের ব্যবস্থা করে দেয়।

ফাঁসির মঞ্চ ও জল্লাদ শাহজাহান

রাত ১২টা ১ মিনিট। চারিদিকে পিনপতন নীরবতা। জল্লাদ শাহজাহান ভুঁইয়ার নেতৃত্বে এরশাদ শিকদারকে নিয়ে যাওয়া হয় ফাঁসির মঞ্চে। মৃত্যুর খুব কাছে গিয়েও এরশাদ শিকদার তার স্বভাবসুলভ নাটকীয়তা বজায় রেখেছিলেন। লোকমুখে প্রচলিত যে, ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় তিনি তার প্রিয় একটি গানের কলি গুনগুন করে গেয়েছিলেন-

"আমি তো মরে যাবো, চলে যাবো, রেখে যাবো সবি..."

জল্লাদ শাহজাহান লিভার টানার সাথে সাথেই যবনিকা ঘটে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আতঙ্কিত ও কলঙ্কিত এক অপরাধী জীবনের।

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এরশাদ শিকদার

এরশাদ শিকদারের জীবনের উত্থান-পতন, রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার এবং ভয়াবহ খুনের ধরণ এতটাই রোমহর্ষক ছিল যে, তা বারবার বিনোদন জগতের নির্মাতাদের অনুপ্রাণিত করেছে। গল্প বা সেলুলয়েডের পর্দায় তাকে বারবার ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নামে।

১. সিনেমা - ‘খুনী শিকদার’ (২০০৪): এরশাদ শিকদারের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পরপরই বড় পর্দায় মুক্তি পায় সিনেমা ‘খুনী শিকদার’। এই সিনেমাটি ছিল সরাসরি তার জীবনের প্রতিচ্ছবি। চিত্রনায়ক শাকিব খান এতে ‘শাহজাহান শিকদার’ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। একজন নৃশংস খুনি হিসেবে শাকিবের সেই অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। আজও এটি শাকিব খানের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে বিবেচিত।

২. ওয়েব সিরিজ - ‘বরফ কলের গল্প’ (২০২১): আধুনিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মের যুগেও এরশাদ শিকদারের জীবনের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেনি। ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া ওয়েব সিরিজ ‘বরফ কলের গল্প’ নির্মিত হয় তার জীবনের ছায়া অবলম্বনে। এই সিরিজে ‘নওশাদ’ চরিত্রে অভিনয় করেন আনিসুর রহমান মিলন। খুলনার বরফ কলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তার সাম্রাজ্য এবং নৃশংস খুনের দৃশ্যগুলো এই সিরিজে অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে ফুটে উঠেছে।

৩. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে - ক্রাইম পেট্রোল: শুধুমাত্র বাংলাদেশেই নয়, এরশাদ শিকদারের অপরাধের কথা পৌঁছে গিয়েছিল আন্তর্জাতিক মহলেও। ভারতের জনপ্রিয় শো ‘ক্রাইম পেট্রোল’-এ ‘খুনি এরশাদ শিকদার’ শিরোনামে একটি বিশেষ পর্ব প্রচার করা হয়েছিল। এই পর্বটি বিশ্বজুড়ে দর্শকদের কাছে তার অপরাধের ভয়াবহতা ও নির্মমতা নতুন করে তুলে ধরে।

৪. সাহিত্যে এরশাদ শিকদার: সাহিত্যের পাতাতেও স্থান পেয়েছেন এই গ্যাংস্টার। প্রখ্যাত লেখক বিনোদ ঘোষাল তার উপন্যাস ‘কাল ভৈরবের ঘাট’-এ এরশাদ শিকদারের উত্থান ও পতনের এক রোমাঞ্চকর ও কাল্পনিক বর্ণনা দিয়েছেন। বাস্তবের ঘটনার সাথে কল্পনার মিশেলে উপন্যাসটি পাঠকদের এক অন্ধকার জগতের গল্প শোনায়।

অপরাধের অনিবার্য পরিণতি

এরশাদ শিকদারের গল্প আমাদের শেখায় যে, ক্ষমতার দাপট বা রাজনীতির ঢাল কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। একজন অতি সাধারণ কুলি থেকে কোটিপতি ডন হওয়া এবং শেষে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলা এই বৃত্তটি পূর্ণ হতে মাত্র কয়েক দশক সময় লেগেছে। আজ তার সেই ‘স্বর্ণকমল’ পরিত্যক্ত, তার গ্যাং বিলুপ্ত এবং তার নাম কেবল ঘৃণার সাথে উচ্চারিত হয়।

খুলনার ভৈরব নদীর পানি অনেক রক্ত ধুয়ে নিয়ে গেছে, কিন্তু মানুষের স্মৃতি থেকে এরশাদ শিকদারের পৈশাচিকতা মুছে যায়নি। অপরাধী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, প্রকৃতির বিচারে তাকে ধরা দিতেই হয়—এরশাদ শিকদার বাংলাদেশের ইতিহাসে এই সত্যেরই জীবন্ত প্রমাণ।

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.