এরশাদ শিকদার - গান গাইতে গাইতে খুন করতো যে সাইকো

স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসের পাতা উল্টালে বহু অপরাধী, গ্যাংস্টার কিংবা আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডনের নাম পাওয়া যায়। কিন্তু তাদের প্রত্যেকের অপরাধের পরিধি ও মানসিকতার সাথে একজন ব্যক্তির তুলনা করলে স্পষ্ট পার্থক্য ধরা পড়ে তিনি এরশাদ শিকদার। তিনি কেবল একজন সাধারণ খুনি বা স্থানীয় মাস্তান ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে পৈশাচিক সিরিয়াল কিলার, প্রভাবশালী টেন্ডারবাজ, মাদক সম্রাট, রাজনৈতিক প্রভাবশালী এবং রূপসা-ভৈরব তীরের মুকুটহীন এক ত্রাস।
নব্বইয়ের দশকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পনগরী খুলনায় এরশাদ শিকদার এমন এক আধিপত্য গড়ে তুলেছিলেন, যা রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা নীতিকে বহু বছর বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এসেছে। তার অপরাধের ধরণ কেবল ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়াই ছিল না, তার মধ্যে কাজ করত এক ভয়াবহ বিকৃত মনস্তত্ত্ব। মানুষের আর্তচিৎকার শোনা, খুনের সময় গান গাওয়া, কিংবা শত শত মানুষের চোখের সামনে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে আনন্দ পাওয়ার মতো ভয়ঙ্কর সব আচরণ ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস।
এই নিবন্ধে আমরা অনুসন্ধানী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশদভাবে আলোচনা করব কীভাবে নলছিটির এক অতি সাধারণ অভাবী ঘরের ছেলে অপরাধের অলিগলি পেরিয়ে খুলনার ত্রাস হয়ে উঠল, কীভাবে রাজনীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নিজের সুরক্ষাবলয় তৈরি করল এবং কীভাবে তার নিজেরই ঘনিষ্ঠ সহযোগীর রাজসাক্ষী হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই রক্তস্নাত সাম্রাজ্যের পতন ঘটল।
শৈশব ও অপরাধের সূচনা: নলছিটি থেকে খুলনার ৪ নম্বর ঘাট
১৯৫৪ সালে তৎকালীন বরিশাল (বর্তমান ঝালকাঠি) জেলার নলছিটি উপজেলার মাদারঘোনা গ্রামে জন্ম নেন এরশাদ শিকদার। তার বাবার নাম ছিল বন্দে আলী শিকদার। গ্রামীণ প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা এরশাদের শৈশব ছিল চরম অভাব-অনটনে ঘেরা। খুব অল্প বয়সেই পড়াশোনার ইতি টেনে বেঁচে থাকার তাগিদে কাজের সন্ধানে নামতে হয় তাকে।
১৯৭৬ বা ১৯৭৭ সালের দিকে তৎকালীন শিল্প শহর খুলনায় ভাগ্য অন্বেষণে পাড়ি জমান তরুণ এরশাদ। সে সময় খুলনার ভৈরব নদীর তীরবর্তী ৪ নম্বর ঘাট এলাকা ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য ও মালামাল উঠা-নামার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে কুলির কাজ দিয়ে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন তিনি।
'রাঙা চোর' নামের উৎপত্তি
ঘাটে কুলিগিরি করার সময়ই এরশাদ শিকদারের নজর পড়ে কীভাবে খাটুনি ছাড়া দ্রুত বিপুল অর্থের মালিক হওয়া যায়। তিনি ছোটখাটো চুরির ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন। বিশেষ করে ঘাট ও রেলস্টেশন সংলগ্ন রেললাইনের অত্যন্ত মূল্যবান লোহার পাত, স্লিপার এবং মালবাহী ওয়াগন থেকে মালামাল চুরি করা ছিল তার প্রাথমিক পেশা।
গায়ের রঙ ফর্সা হওয়ার কারণে এবং চুরির সময় ধাওয়া খেলে অদ্ভুত চটপটে ভঙ্গিতে পালিয়ে যাওয়ার দক্ষতার কারণে স্থানীয় চোরদের দল তাকে ডাকত 'রাঙা চোর' বলে। এই ছিঁচকে 'রাঙা চোর' নামটি যে একদিন পুরো দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের রাতে ঘুমানোর ভয় তৈরি করবে, তা তৎকালীন স্থানীয় প্রশাসন বা সাধারণ ডক শ্রমিকদের কল্পনাতীত ছিল।
নিজস্ব বাহিনী গঠন
এরশাদ শিকদার দ্রুতই অনুধাবন করেন যে একাকী চুরি করে বড় অপরাধী হওয়া সম্ভব নয়। ঘাটের ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী প্রয়োজন। সেই চিন্তা থেকে তিনি স্টেশন ও ঘাট এলাকার উদীয়মান বখাটে ও মাস্তানদের একছত্র ছাতার নিচে এনে একটি অনুগত গ্যাং তৈরি করেন। এই বাহিনীর সাহায্যে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ৪ ও ৫ নম্বর ঘাট এলাকার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন।
রাজনীতির বিষবৃক্ষ: চতুরতার সাথে ক্ষমতার চূড়ায় আরোহণ
অপরাধ জগতে এরশাদ শিকদারের যে দ্রুততম উত্থান ঘটেছিল, তার প্রধান চালিকাশক্তি ছিল তৎকালীন দেশের অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, পুলিশ এবং প্রশাসনের হাত থেকে বাঁচতে হলে রাজনৈতিক পরিচয়ই সবচেয়ে বড় চালের অস্ত্র।
জাতীয় পার্টিতে যোগদান ও ঘাটের সর্দার হওয়া
১৯৮২ সালে যখন জেনারেলে এইচ এম এরশাদ সামরিক শাসন জারি করেন, তখন খুনি এরশাদ শিকদার কৌশলে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। সরকারের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের সাথে গভীর সখ্য তৈরি করে তিনি সাধারণ কুলির পরিচয় মুছে ফেলে নিজেকে 'ঘাটের সর্দার' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
নৌঘাট ও ডক এলাকায় তিন থেকে চার হাজার শ্রমিকের ওপর তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়। এই বিশাল শ্রমিক বাহিনীকে তিনি রাজনৈতিক মিছিল, মিটিং এবং প্রতিপক্ষ দমনে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করতেন। বিনিময়ে স্থানীয় প্রশাসন তার যেকোনো অপরাধকে আমল না দিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকত।
দল বদলের রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধির মুখোস
রাজনীতিতে এরশাদ শিকদারের কোনো নীতি বা আদর্শ ছিল না। তার একমাত্র আদর্শ ছিল 'ক্ষমতা'। সরকারের পরিবর্তন ঘটার সাথে সাথেই তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে নিজের রাজনৈতিক খোলস বদলে ফেলতেন:
১৯৮২ সাল: সামরিক শাসক এরশাদের আমলে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে ক্ষমতার স্বাদ পান।
১৯৯১ সাল: বিএনপি ক্ষমতায় আসলে রাতারাতি বিএনপিতে নাম লেখান এবং স্থানীয় নেতাদের অর্থ ও পেশিশক্তি দিয়ে নিজের বশে রাখেন।
১৯৯৬ সাল: আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি দ্রুত ভোল পাল্টে ক্ষমতাসীন দলে ভেড়ার চেষ্টা করেন। যদিও ব্যাপক সমালোচনার মুখে আওয়ামী লীগ তাকে দল থেকে বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়, কিন্তু ততদিনে তার স্থানীয় ক্ষমতার শিকড় অত্যন্ত গভীরে পৌঁছে গিয়েছিল।
পেশিশক্তি, ভয় এবং অস্ত্রের মুখে তিনি খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের (পরবর্তীতে ৮ নম্বর ওয়ার্ড) কাউন্সিলর/কমিশনার হিসেবে টানা একাধিকবার নির্বাচিত হন। ব্যালট বাক্স দখল, ভোটারদের ভয় দেখানো এবং প্রতিপক্ষ প্রার্থীকে হুমকি দিয়ে তিনি জনপ্রতিনিধির আসনটি দখল করে রাখতেন।
'স্বর্ণকমল' বিলাসবহুল প্রাসাদ নাকি এক নরকপুরী?
খুলনার মজিদ সরণিতে এরশাদ শিকদার গড়ে তুলেছিলেন তার স্বপ্নের রাজপ্রাসাদ, যার নাম দিয়েছিলেন 'স্বর্ণকমল'। বাইরে থেকে অপরূপ সৌন্দর্যের এই বাড়িটি ছিল নব্বইয়ের দশকে খুলনার সাধারণ মানুষের কাছে চরম আতঙ্ক ও কৌতূহলের এক কেন্দ্রবিন্দু।
স্থাপত্যের আড়ালে গোপন বাঙ্কার ও অস্ত্রাগার: স্বর্ণকমল কেবল একটি বিলাসবহুল বাড়ি ছিল না, এটি ছিল একটি দুর্গ। বাড়িটির নকশা এমনভাবে করা হয়েছিল যেন বাইরে থেকে ভেতরের কর্মকাণ্ড বিন্দুমাত্র টের পাওয়া না যায়। তদন্তকারীদের পরবর্তী তথ্য অনুযায়ী, এই বাড়ির ভেতরে ছিল গোপন বাঙ্কার এবং আধুনিক অস্ত্রাগার। অভিযান চালানোর সময় সেখান থেকে প্রায় ৭০টিরও বেশি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল।
নিজস্ব আদালত ও সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার: স্বর্ণকমলের ভেতরে এরশাদ শিকদার তার নিজস্ব 'ক্যাঙ্গারু কোর্ট' পরিচালনা করতেন। খুলনা বা তার আশেপাশের এলাকায় কেউ যদি তার অবাধ্য হতো, কিংবা তার ব্যবসায় বাধা হয়ে দাঁড়াত, তবে তাকে রাতের অন্ধকারে তুলে আনা হতো এই স্বর্ণকমলে।
বাস্তব ঘটনা: এরশাদ শিকদারের এক প্রতিবেশী তার নিজস্ব জমির ওপর বাড়ি নির্মাণ করছিলেন। সীমানা নিয়ে সামান্য তর্কের জেরে এরশাদ শিকদার তাকে রাতে তুলে এনে স্বর্ণকমলের গোপন কক্ষে আটকে রাখেন এবং জীবন্ত কবর দেওয়ার চেষ্টা চালান। পরে বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং জমির মালিকানা লিখে নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
৪ নম্বর ঘাটের আইস ফ্যাক্টরি পৈশাচিকতার মূল কেন্দ্র
এরশাদ শিকদারের অপরাধ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বিভৎস ও রক্তঝরা অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল খুলনার ৪ নম্বর ঘাটের বরফকলে। ১৯৯১ সালে তিনি গায়ের জোরে স্থানীয় ব্যবসায়ী রফিককে তাড়িয়ে দিয়ে এই বরফকল বা আইস ফ্যাক্টরিটি দখল করে নেন।
২০ কেজি ওজনের লোহার মুগুর
বরফ জমাট বাঁধার পর তা ভাঙার জন্য কারখানায় ব্যবহৃত হতো বিশাল বিশাল লোহার মুগুর। এরশাদ শিকদার এগুলোকে মানুষের হাড়গোড় গুঁড়ো করার কাজে ব্যবহার করতে শুরু করেন। তার কাছে কোনো বন্দীকে আনা হলে সে সরাসরি তাকে গুলি করে মারত না। সে চাইত শিকার তিলে তিলে যন্ত্রণায় ছটফট করে মরুক। ২০ কেজি ওজনের ওই লোহার মুগুর দিয়ে আঘাত করে করে মানুষের হাত-পায়ের হাড় চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া হতো।
খুনের সময় গান গানো ও লাশের ওপর লাফানো
সাধারণত পেশাদার খুনিরা অপরাধ করার সময় ভয়ে বা তাড়াহুড়োর মধ্যে থাকে। কিন্তু এরশাদ শিকদার ছিলেন এক সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী সাইকোপ্যাথ। তিনি যখন বরফকলের অন্ধকোঠায় কাউকে নির্মমভাবে পিটিয়ে মারতেন, তখন তার মুখে থাকত অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি খুব নিখুঁত সুর তুলে গান গাইতেন। ভিকটিমের গোঙানি এবং আর্তচিৎকারের সাথে মিশে যেত তার গান। আর প্রাণবায়ু বের হয়ে যাওয়ার পর উল্লাসে লাশের বুকের ওপর উঠে লাফানো ছিল তার আরেক বিকৃত আনন্দ।
দুধ দিয়ে গোসলের অন্ধকার বিশ্বাস
প্রতিটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর এরশাদ শিকদারের একটি নির্দিষ্ট মানসিক রিচুয়াল ছিল—তিনি বালতি বালতি খাঁটি দুধ দিয়ে গোসল করতেন। তার মধ্যে এক চরম অন্ধবিশ্বাস কাজ করত যে, মানুষের রক্ত শরীরে লাগলে তা কেবল পানি দিয়ে ধুলে রক্তমাংসের গন্ধ এবং খুনের 'পাপ' মোছে না। দুধ দিয়ে শরীর ধুলে তিনি নাকি পবিত্র হয়ে যেতেন। এই ঘটনাটি তার মানসিক বৈকল্যের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ।
লাশ গুমের ভয়াবহ সব কৌশল
খুন করার চেয়েও লাশ গুম করার কাজে এরশাদ শিকদার ছিলেন অতিমাত্রায় ধূর্ত। তার হাতে নিহত মানুষের লাশ গুম করতে তিনি তিনটি প্রধান পদ্ধতি ব্যবহার করতেন:
ভৈরব নদীতে বস্তাবন্দী প্রথা: লাশ ভারী সিমেন্টের বস্তায় পুরে সাথে ভারী ইট বা পাথর বেঁধে রাতের অন্ধকারে ভৈরব নদীর সবচেয়ে গভীর অংশে ডুবিয়ে দেওয়া হতো।
ইটভাটার আগুনের লেলিহান শিখা: প্রমাণ পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে অনেক লাশ রাতের আঁধারে স্থানীয় ইটভাটার জ্বলন্ত চুল্লিতে ফেলে দেওয়া হতো, যাতে সামান্য ছাইটুকুও অবশিষ্ট না থাকে।
পুকুরের মাংসখেকো মাগুর মাছ: রূপসা ও ঘাটের মানুষের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত ছিল যে, এরশাদ শিকদার তার নিজস্ব পুুকুরে বিশাল আকারের মাগুর মাছ পুষতেন এবং তাদের মানুষের মাংস কেটে খাওয়াতেন। এটি খুলনাবাসীর মনে এক গভীর সাইকোলজিক্যাল আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল।
চাঞ্চল্যকর কয়েকটি হত্যাকাণ্ড
অফিসিয়ালি আদালতে এরশাদ শিকদারের বিরুদ্ধে ২৪টি হত্যাকাণ্ডের তথ্যপ্রমাণ ও তথ্য উঠে এসেছিল। তবে বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তার হাতে অন্তত ৬০ থেকে ৭০ জন মানুষ নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন। তার মধ্যে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড নিচে তুলে ধরা হলো:
যুবলীগ নেতা খালিদ হোসেন হত্যাকাণ্ড (১৬ মে ১৯৯৯)
এই হত্যাকাণ্ডটিই ছিল এরশাদ শিকদারের অপরাজেয় সাম্রাজ্যে প্রথম বড় ধরনের আঘাত এবং তার পতনের মূল চাবিকাঠি। ১৯৯৯ সালের ১৬ মে রাতে খুলনার রূপসা এলাকার জনপ্রিয় যুবলীগ নেতা খালিদ হোসেনকে খুব চতুরতার সাথে ডেকে নিয়ে আসেন এরশাদ শিকদার।
প্রথমে তাকে বরফকলে বসিয়ে মিষ্টি খাওয়ানো হয়। খাওয়া শেষ হতেই এরশাদ শিকদার তার আসল রূপ ধারণ করেন। তাকে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে জিম্মি করে ২০ কেজির সেই বিখ্যাত লোহার মুগুর দিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্যাতনের পর খালিদের মৃতদেহ বস্তায় ভরে ভৈরব নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। তবে অলৌকিকভাবে পুলিশ এই একটি লাশের সন্ধান পায়, যা এরশাদ শিকদারকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানোর প্রধান প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ চাকলাদার হত্যা (১৯৯৮)
ঢাকার লালবাগের নামকরা ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ চাকলাদারকে ১৯৯৮ সালে ঢাকা থেকে কৌশলে অপহরণ করে খুলনায় নিয়ে আসা হয়। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও চাঁদার দাবিতে তাকে স্বর্ণকমল ও বরফকলে রেখে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। তার লাশ এমনভাবে গুম করা হয় যে আজ পর্যন্ত তার অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়নি। এই মামলাটির দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ২০২০ সাল পর্যন্ত গড়িয়েছিল।
নিজস্ব সহযোগী জয়নাল হত্যা
অপরাধ সাম্রাজ্যে কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। এরশাদ শিকদারের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন জয়নাল। যখন পুলিশি নজরদারি বাড়তে শুরু করে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত শুরু করে, তখন এরশাদ শিকদার সন্দেহ করেন যে জয়নাল হয়তো পুলিশের কাছে মুখ খুলতে পারে। নিজের সুরক্ষার জন্য তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে তার বছরের পর বছরের বিশ্বস্ত সঙ্গী জয়নালকেও হত্যা করে ভৈরব নদীতে ভাসিয়ে দেন।
নারীদের প্রতি পাশবিক লালসা ও বিকৃত মানসিকতা
এরশাদ শিকদারের অন্ধকার জগতের একটি অত্যন্ত বীভৎস দিক ছিল নারীদের প্রতি তার অনিয়ন্ত্রিত আসক্তি এবং নির্যাতন। স্বর্ণকমলের ভেতরে এমন কিছু গোপন কক্ষ ছিল, যা কেবল নারীদের জিম্মি করে রাখার কাজে ব্যবহার করা হতো।
এক পরিবারের বন্দিদশা: এক অসহায় নারীকে চুরির অপবাদ দিয়ে স্বর্ণকমলে এনে বহু বছর আটকে রাখা হয়। সেখানে তার ওপর নিয়মিত পাশবিক নির্যাতন চালানো হতো। সেই বন্দিনী নারীর গর্ভে এরশাদ শিকদারের দুটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু তার বিকৃতি এখানেই থেমে থাকেনি; সেই কন্যাসন্তানেরা যখন ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে, তাদের ওপরও সে একই অত্যাচার চালায়।
এমনকি নিজের বডিগার্ড নূরে আলমের স্ত্রী সুন্দরী হওয়ায় তার ওপরও নজর পড়ে এরশাদ শিকদারের। নূরে আলমকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি রেখে তার চোখের সামনে নিজের স্ত্রীকে লাঞ্ছিত করার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটিয়েছিলেন এই দানব। এই চরম অপমানই পরবর্তীতে নূরে আলমকে রাজসাক্ষী হতে বাধ্য করে।
রাজসাক্ষী নূরে আলম: ১০ বছরের গোপন ডায়েরি ও পতনের রূপকার
যেকোনো স্বৈরাচারী বা অপরাধ সাম্রাজ্যের পতনের পেছনে ভেতর থেকে উঠে আসা কোনো মুখই প্রধান ভূমিকা পালন করে। এরশাদ শিকদারের ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তিটি ছিলেন তার দীর্ঘ ১০ বছরের বডিগার্ড নূরে আলম।
১৯৮৯ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত নূরে আলম ছিলেন এরশাদ শিকদারের সবচেয়ে কাছের মানুষ। এরশাদ কাকে মারছেন, কোথায় লাশ ফেলছেন, কার সম্পত্তি দখল করছেন তার সবকিছুর জীবন্ত তথ্যপ্রমাণ ছিল নূরে আলমের মস্তিষ্কে।
দীর্ঘ ১০ বছর ভয়ে চুপ থাকলেও যখন এরশাদ শিকদার নূরে আলমের নিজের পরিবারের ওপর হাত বাড়ান, তখন তার ভেতরের প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে। ১৯৯৯ সালে পুলিশ তাকে হেফাজতে নিলে তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজসাক্ষী (Approver) হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আদালতে দাঁড়িয়ে নূরে আলম যখন একের পর এক লোমহর্ষক ২৪টি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন আদালতের বিচারক, আইনজীবী এবং উপস্থিত জনতা শিউরে উঠেছিল। নূরে আলমের এই অকাট্য সাক্ষ্য ছাড়া প্রমাণের অভাবে হয়তো এরশাদ শিকদারকে কোনোদিনই সাজা দেওয়া সম্ভব হতো না।
পতন, গ্রেফতারি অভিযান ও রাজকীয় পতন
১৬ মে ১৯৯৯ সালে যুবলীগ নেতা খালিদ হোসেনকে হত্যার পর খুলনাজুড়ে অভূতপূর্ব জনরোষ সৃষ্টি হয়। মিডিয়ার ব্যাপক তৎপরতা এবং সুশীল সমাজের চাপের কারণে তৎকালীন সরকার এরশাদ শিকদারকে আড়াল করার সুযোগ হারিয়ে ফেলে।
পুলিশি অভিযান ও আত্মসমর্পণ
পুলিশ যখন স্বর্ণকমল ও বরফকল ঘিরে ফেলে, তখন উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও নির্যাতনের সরঞ্জাম। বিপদ টের পেয়ে ছদ্মবেশে আত্মগোপনে চলে যান এরশাদ শিকদার।
সে সময় তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক পরিচিতরা তাকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বলেন: "তুমি এখন আত্মসংযম করে আদালতে আত্মসমর্পণ করো। পরিস্থিতি শান্ত হলে আমরা মামলা দুর্বল করে তোমাকে জামিনে বের করে আনবো।"
ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ এরশাদ শিকদার এই কথায় বিশ্বাস করে ১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে খুলনা আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তিনি ভেবেছিলেন অর্থের জোরে ও রাজনৈতিক প্রভাবে কয়েক মাস পরেই তিনি আবার মুক্ত আকাশে বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি তার সম্পূর্ণ প্রতিকূলে চলে গিয়েছিল।

বিচার প্রক্রিয়া, ফাঁসির রায় ও শেষ প্রহর
আদালতে এরশাদ শিকদারের বিরুদ্ধে মোট ৪৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। নূরে আলমের জবানবন্দী, উদ্ধারকৃত খালিদের লাশ এবং শত শত সাক্ষীর সাহসের ওপর ভর করে বিচার কাজ দ্রুত গতিতে এগোতে থাকে।
২০০০ সালের ৩০ এপ্রিল খুলনার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত খালিদ হত্যা মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। পরবর্তীতে হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টও এই ফাঁসির রায় বহাল রাখে। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করা হলেও অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি তা নাকচ করে দেন।
ফাঁসির সেই অন্ধকার রাত (১০ মে ২০০৪)
২০০৪ সালের ১০ মে রাত। খুলনা জেলা কারাগার তখন তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। দীর্ঘ সময় পর নিশ্চিত হয় যে আজ রাতেই শেষ হতে চলেছে এই কুখ্যাত সিরিয়াল কিলারের অধ্যায়।
মৃত্যুপরোয়ানা শোনানোর পর সাধারণ অপরাধীদের মতো কঁদে কেটে ভাসাননি এরশাদ শিকদার। তিনি শেষ ইচ্ছা হিসেবে খাসি ও মুরগির মাংস দিয়ে ভরপেট রাতের খাবার খেতে চান। জেল কর্তৃপক্ষ তার সেই ইচ্ছা পূরণ করে।
রাত ১২টা ১ মিনিটে জল্লাদ শাহজাহান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে তাকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ফাঁসির মঞ্চের দিকে হেঁটে যাওয়ার সময়ও তিনি তার স্বভাবসুলভ নাটকীয়তায় প্রিয় গানের কলি গুনগুন করে গাইছিলেন:
"আমি তো মরে যাবো, চলে যাবো, রেখে যাবো সবি..."
জল্লাদ শাহজাহানের হাত থেকে লিভারটি পড়ে যাওয়ার সাথে সাথে দড়ির টানে ইতি ঘটে বাংলাদেশের অপরাধ ইতিহাসের সবচেয়ে ভীতিকর এক দানবীয় জীবনের।
এক নজরে এরশাদ শিকদারের জীবন ও অপরাধপঞ্জি
নিচে এরশাদ শিকদারের পুরো জীবনকাল, অপরাধের ধরণ, বিচার প্রক্রিয়া এবং আনুষঙ্গিক তথ্যাদি সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
প্রধান বিষয়াবলি | বিস্তারিত তথ্য ও বিবরণ |
পূর্ণ নাম ও পরিচিতি | এরশাদ শিকদার (ওরফে 'রাঙা চোর')। |
জন্ম ও জন্মস্থান | ১৯৫৪ সাল; মাদারঘোনা গ্রাম, নলছিটি, ঝালকাঠি। |
অপরাধের প্রধান কেন্দ্র | ৪ ও ৫ নম্বর ঘাট এলাকা, রূপসা, মজিদ সরণি (খুলনা)। |
প্রারম্ভিক পেশা | খুলনার নদীর ঘাটে কুলি এবং রেলস্টেশনের লোহা চোর। |
রাজনৈতিক পরিচয় | জাতীয় পার্টি (১৯৮২), বিএনপি (১৯৯১), আওয়ামী লীগ (১৯৯৬ - পরবর্তীতে বহিষ্কৃত)। |
জনপ্রতিনিধিত্ব | কমিশনার/কাউন্সিলর, ২১ নম্বর ওয়ার্ড (পরবর্তীতে ৮ নম্বর ওয়ার্ড), খুলনা সিটি কর্পোরেশন। |
বিখ্যাত আস্তানা | 'স্বর্ণকমল' (মজিদ সরণির বিলাসবহুল প্রাসাদ) ও ৪ নম্বর ঘাটের বরফকল (আইস ফ্যাক্টরি)। |
প্রধান অস্ত্র ও নির্যাতনের মাধ্যম | ২০ কেজি ওজনের লোহার মুগুর, অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র এবং গোপন বাঙ্কার। |
প্রমাণিত ও আনুমানিক হত্যা | প্রমাণিত মামলা: ২৪টি; আনুমানিক মোট হত্যাকাণ্ড: ৬০ থেকে ৭০টি। |
মৌলিক মোড় ঘোড়ানো ঘটনা | যুবলীগ নেতা খালিদ হোসেন হত্যা (১৬ মে ১৯৯৯) ও বডিগার্ড নূরে আলমের রাজসাক্ষী হওয়া। |
গ্রেফতার / আত্মসমর্পণ | নভেম্বর ১৯৯৯ (খুলনা জেলা আদালতে)। |
চূড়ান্ত বিচারিক রায় | মৃত্যুদণ্ড (৩০ এপ্রিল ২০০০, খুলনার জজ কোর্ট)। |
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ | ১০ মে ২০০৪ (রাত ১২:০১ মিনিট); খুলনা জেলা কারাগার। |
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী জল্লাদ | জল্লাদ শাহজাহান ভূঁইয়া। |
'স্বর্ণকমল'-এর অপ্রকাশিত প্রযুক্তি ও সুরক্ষিত স্থাপত্য
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের মফস্বল শহরে আধুনিক প্রযুক্তি বা উন্নত নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রচলন ছিল না বললেই চলে। কিন্তু এরশাদ শিকদার তার প্রাসাদ 'স্বর্ণকমল'-কে এমনভাবে রূপদান করেছিলেন, যা ছিল সে সময়কার সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে।
গোপন সিসিটিভি ও মনিটরিং রুম: স্বর্ণকমলের চারপাশের প্রতিটি প্রবেশপথ ও গলিতে লুকানো সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিল। বাড়ির ভেতর একটি বিশেষ কক্ষে মনিটর বসিয়ে তিনি পুরো এলাকার আনাগোনা পর্যবেক্ষণ করতেন।
সাউন্ডপ্রুফ ঘর ও গোপন পথ: প্রাসাদের মাটির নিচে এমন একটি গোপন কক্ষ নির্মিত হয়েছিল যা সম্পূর্ণ শব্দরোধী (Soundproof)। ভেতরে ভিকটিমদের চিৎকার বা আকুতি বাইরের কেউ শুনতে পেত না। এছাড়া জরুরী মুহূর্তে ভৈরব নদীতে পালিয়ে যাওয়ার জন্য ড্রেনেজ লাইনের সাথে যুক্ত একটি গোপন সুড়ঙ্গ পথ ছিল বলে স্থানীয় অনুসন্ধানী রিপোর্টে উল্লেখ পাওয়া যায়।
বিদেশি ফিটিংস ও চরম বিলাসিতা: স্বর্ণকমলের বাথরুম ও ড্রয়িংরুমে ইতালি ও থাইল্যান্ড থেকে আনা মূল্যবান টাইলস, গোল্ড-প্লেটেড (সোনা দিয়ে মোড়ানো) ট্যাপ ও ফিটিংস এবং বিশাল আকৃতির রাজকীয় ঝাড়বাতি ব্যবহার করা হয়েছিল।
গান ও সংগীতের প্রতি পৈশাচিক আসক্তি
এরশাদ শিকদারের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ও রহস্যময় দিক ছিল তার গান গাওয়ার ও গান লেখার নেশা। একজন রক্তপিপাসু খুনি কীভাবে সুর ও সংগীতের ভক্ত হতে পারে, তা তৎকালীন সময়ে মনোবিজ্ঞানীদেরও ধাঁধায় ফেলে দিয়েছিল।
নিজস্ব ক্যাসেট প্রকাশ: তিনি খুলনার স্থানীয় অডিও স্টুডিওতে গিয়ে বিপুল অর্থ ঢেলে নিজের কণ্ঠে গান রেকর্ড করাতেন। সেই গানগুলোর অডিও ক্যাসেট তৈরি করে তিনি নিজের অনুসারীদের উপহার হিসেবে দিতেন।
গানটি কার লেখা?: তার বহুল আলোচিত গান "আমি তো মরে যাবো, চলে যাবো, রেখে যাবো সবি / একজন এরশাদ শিকদারের ছবি" গানটি তিনি নিজের জীবনের ওপর ভিত্তি করে গাইতেন। স্থানীয় গীতিকারদের দিয়ে তিনি নিজের মহিমান্বিত রূপ ফুটিয়ে তোলার জন্য বিভিন্ন লিরিক তৈরি করাতেন।
ফাঁসির পর ক্যাসেট বিক্রি: ২০০৪ সালে তার ফাঁসির পর খুলনা ও রূপসা ঘাট এলাকায় তার রেকর্ড করা গানের অডিও ক্যাসেট চড়া দামে বিক্রি হয়েছিল। সাধারণ মানুষ কৌতূহলবশত সেই গানগুলো শুনত।
পারিবারিক জীবন ও সন্তানদের করুণ ট্র্যাজেডি
এরশাদ শিকদারের পারিবারিক জীবন ছিল চরম গোপনীয়তা ও নির্যাতনে ভরা। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে অন্তত ৬ থেকে ৭ জন স্ত্রী বা সঙ্গিনী ছিল (যেমন: রেশমা, শোভা, লতা, সানজিদা ইত্যাদি)।
স্ত্রীদের বন্দিদশা: স্বর্ণকমলের ভেতরে তার স্ত্রীদেরও অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা ছিল না। এরশাদ শিকদারের অনুমতি ছাড়া তাদের কারও সাথে দেখা করা বা বাইরে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।
মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশীর আত্মহত্যা (২০২২): এরশাদ শিকদারের দ্বিতীয়/অন্যতম স্ত্রী শোভার গর্ভে জন্ম নিয়েছিল মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশী (বা তাসনোভা এরশাদ)। ২০২২ সালের মে মাসে ঢাকার গুলশানের একটি ফ্ল্যাট থেকে তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তে জানা যায়, বাবার অপরাধমূলক অতীত পরিচয়, মানসিক অবসাদ এবং পারিবারিক টানাপোড়েনের কারণে তিনি আত্মহত্যা করেন। কুখ্যাত এক কুখ্যাত অপরাধীর অভিশপ্ত অতীত কীভাবে বহু বছর পরও তার সন্তানের জীবনকে করুণ পরিণতিতে ঠেলে দিয়েছিল, এটি ছিল তারই এক বাস্তব উদাহরণ।
অপরাধের অর্থনৈতিক মডেল: 'শিকদার ট্যাক্স'
এরশাদ শিকদার কেবল পেশিশক্তি দিয়ে চলতেন না, তিনি একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন:
ঘাটের টোল ও তোলা আদায়: ৪ ও ৫ নম্বর ঘাটে প্রতিটি চাল, মাছ বা মালামালবাহী ট্রলার ভিড়লেই বস্তাপ্রতি নির্দিষ্ট টাকা 'শিকদার ট্যাক্স' হিসেবে দিতে হতো। প্রতিদিন সেখান থেকে তৎকালীন সময়ে লাখ লাখ টাকা নগদ উঠত।
রেজিস্টার খাতা মেইনটেইন: এরশাদ শিকদারের নিজস্ব একদল হিসাবরক্ষক ছিল। তারা কোন ব্যবসায়ী কত টাকা চাঁদা দিয়েছে, কার বকেয়া কত এবং কার সম্পত্তি কতটুকু দখল করা হয়েছে তার জন্য বাঁধাই করা রেজিস্টার খাতা সংরক্ষণ করত।
জমি দখলের ব্ল্যাকমেইল: খুলনার মজিদ সরণি ও এর আশপাশের দামি জমিগুলো তিনি সামান্য মূল্যে বা অস্ত্রের মুখে বায়না করে নিজের বা তার অনুসারীদের নামে লিখে নিতে বাধ্য করতেন।
ক্রিমিনাল সাইকোলজি: মনোবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে এরশাদ শিকদার
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এরশাদ শিকদার সাধারণ অপরাধী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন 'স্যাডিস্টিক সাইকোপ্যাথ' (Sadistic Psychopath)।
মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য: ১. পরপীড়ন সুখ (Sadism): অন্যকে শারীরিক বা মানসিকভাবে চরম যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখে তিনি এক ধরণের বিকৃত আনন্দ পেতেন। ২. অপরাধবোধহীনতা (Lack of Remorse): শত শত অমানুষিক কর্মকাণ্ডের পরও তার মধ্যে কোনো অপরাধবোধ বা অনুশোচনা কাজ করত না। ৩. নার্সিসিজম (Narcissistic Personality): তিনি নিজেকে অপরাজেয় এবং আইনের ঊর্ধ্বে মনে করতেন, যার প্রমাণ মেলে তার রাজপ্রাসাদ 'স্বর্ণকমল' নির্মাণ ও নিজের নামে গান রেকর্ড করানোর মধ্যে।
রাজসাক্ষী নূরে আলমের পরবর্তী জীবন
এরশাদ শিকদারের সাম্রাজ্য ধ্বংসের পেছনে মূল কারিগর তার দেহরক্ষী নূরে আলমকে বিচারের পর চরম নিরাপত্তার মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছিল। এরশাদ শিকদারের ফাঁসি হলেও তার অনুসারী ও গ্যাং সদস্যরা নূরে আলমের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল।
সরকারের বিশেষ পাহারায় তাকে দীর্ঘদিন গোপন স্থানে রাখা হয়। পরবর্তীতে তিনি নিজের নাম-পরিচয় গোপন রেখে খুলনা ছেড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জায়গায় সাধারণ জীবনযাপন শুরু করেন।
জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও সাহিত্যে এরশাদ শিকদার
এরশাদ শিকদারের উত্থান, পৈশাচিকতা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার এতটাই রোমহর্ষক ছিল যে তা পরবর্তীতে দেশের নাটক, সিনেমা ও সাহিত্যে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল।
চলচ্চিত্র: 'খুনী শিকদার' (২০০৪)
এরশাদ শিকদারের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পরপরই ২০০৪ সালে বড় পর্দায় মুক্তি পায় মনোয়ার খন্দকার পরিচালিত আলোচিত সিনেমা 'খুনী শিকদার'। চলচ্চিত্রটিতে এরশাদ শিকদারের ছায়া অবলম্বনে নির্মিত 'শাহজাহান শিকদার' প্রধান চরিত্রে রূপদান করেছিলেন চিত্রনায়ক শাকিব খান। একজন নির্মম সাইকোপ্যাথ খুনি হিসেবে শাকিব খানের সেই অভিনয় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা নেতিবাচক অভিনয় হিসেবে স্বীকৃত।
ওয়েব সিরিজ: 'বরফ কলের গল্প' (২০২১)
আধুনিক ওটিটি (OTT) যুগে এসে ২০২১ সালে মুক্তি পায় ডার্ক থ্রিলার ওয়েব সিরিজ 'বরফ কলের গল্প'। খুলনার বরফকল এবং এরশাদ শিকদারের জীবনের সত্যি ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত এই সিরিজে 'নওশাদ' চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেন আনিসুর রহমান মিলন। বরফকলের নীরব পৈশাচিকতা সিরিজে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও সাহিত্য
ক্রাইম পেট্রোল (Crime Patrol): ভারতের অত্যন্ত জনপ্রিয় ট্রু-ক্রাইম টেলিভিশন শো 'ক্রাইম পেট্রোল'-এ 'খুনি এরশাদ শিকদার' শিরোনামে একটি বিশেষ দুই পর্বের সংস্করণ তৈরি করা হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও তার অপরাধের বিবরণ তুলে ধরে।
উপন্যাস 'কাল ভৈরবের ঘাট': প্রখ্যাত ভারতীয় লেখক বিনোদ ঘোষাল তার রোমাঞ্চকর উপন্যাস 'কাল ভৈরবের ঘাট'-এ এরশাদ শিকদারের উত্থান, ভৈরব নদীর সন্ত্রাস এবং ক্ষমতার রাজনীতিকে কাল্পনিক রূপকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।
ইতিহাস ও প্রকৃতির চিরন্তন বিচার
এরশাদ শিকদারের জীবনকাহিনী কেবল কোনো রোমাঞ্চকর গল্পের বই নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের রাজনীতি, বিচার ব্যবস্থা এবং অপরাধ জগতের এক গভীর সামাজিক শিক্ষা। একজন সামান্য কুলি থেকে কীভাবে কেবল পেশিশক্তি ও ক্ষমতার রাজনীতি ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার মালিক এবং অঘোষিত রাজা হওয়া যায়, আবার কীভাবে নিজের অপরাধের বোঝা ভারী হয়ে গেলে চরম অপমানের সাথে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হয় তার জ্বলন্ত প্রমাণ এই ইতিহাস।
আজ মজিদ সরণির সেই জাঁকজমকপূর্ণ 'স্বর্ণকমল' তার জৌলুস হারিয়ে এক পরিত্যক্ত ও অভিশপ্ত স্মৃতির স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। রূপসা ও ভৈরব নদীর ঢেউ অনেক রক্ত ধুয়ে নিয়ে গেছে, কিন্তু মানুষের মন থেকে এরশাদ শিকদার নামের আতঙ্ক আজও মুছে যায়নি। অপরাধী যতই শক্তিশালী, ধূর্ত বা ক্ষমতার ছায়াতলে থাকুক না কেন প্রকৃতির বিচার এবং আইনের হাত থেকে যে কারো নিস্তার নেই, এরশাদ শিকদারের জীবন ও পতন তা চিরকালের জন্য স্মরণ করিয়ে দেয়।





















