শহীদ ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি - পেশাগত সাফল্য তুচ্ছ করে দেশপ্রেমের জন্য জীবন দিলেন
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি ছিলেন এক অনন্য নাম। তিনি শুধু একজন বিশ্বখ্যাত কার্ডিওলজিস্টই ছিলেন না, ছিলেন এক মানবপ্রেমী, প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক চিকিৎসক, যিনি নিজের পেশাগত জীবনের সর্বোচ্চ সাফল্য এবং বিলাসবহুল জীবন তুচ্ছ করে জীবনের শেষ রক্তবিন্দু উৎসর্গ করেছিলেন এই দেশের মানুষের জন্য। মাত্র ৪২ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি যে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার ছাপ রেখে গেছেন, তা আজও বাংলাদেশের চিকিৎসা ইতিহাসে এক অনুপ্রেরণার নাম। তাঁর জীবনগাথা প্রমাণ করে, মেধা ও মানবতা যখন দেশপ্রেমের সঙ্গে একীভূত হয়, তখনই জন্ম নেয় সত্যিকারের বীর।
মেধা, মনন ও দেশপ্রেমের অপূর্ব সমন্বয়
ডা. ফজলে রাব্বি ছিলেন সেই বিরল প্রতিভা, যিনি শিক্ষা, গবেষণা এবং চিকিৎসা প্রতিটি ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিলেন। তাঁর জন্ম ১৯৩২ সালে পাবনার হেমায়েতপুরের ছাতিয়ানীতে। কিন্তু তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিল বিশ্বব্যাপী। তবুও তিনি বিদেশ বিভুঁইয়ে উচ্চ বেতনের লোভ ছেড়ে মাতৃভূমির টানে ফিরে এসেছিলেন।
তিনি ছিলেন কেবল একজন চিকিৎসক নন, তিনি ছিলেন প্রগতিশীল চিন্তাধারার একজন অনুসারী, যিনি নিজের পেশাকে 'গণমুখী' বা সমাজের সব স্তরের মানুষের সেবায় নিয়োজিত করতে চেয়েছিলেন।
আত্মত্যাগ: ১৯৭১ সালের চূড়ান্ত মুহূর্তে তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ড ছিল বাঙালি জাতির ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর চালানো জঘন্যতম বুদ্ধিবৃত্তিক গণহত্যার প্রতীক।
অবিস্মরণীয় ছাত্রজীবন - মেধার স্ফুরণ ও ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ
ডা. ফজলে রাব্বির ছাত্রজীবন ছিল মেধার এক ধারাবাহিক স্ফুরণ। তাঁর শৈশব থেকেই ছিল ব্যতিক্রমী তীক্ষ্ণতা এবং অনুসন্ধিৎসু মন।
১৯৪৮ সালে পাবনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং পরে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি অসাধারণ ফলাফল করেন।
চিকিৎসা শিক্ষায় স্বর্ণপদক: ১৯৫০ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে (ডিএমসি) এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হন। সেখানেও তিনি তাঁর মেধার স্বাক্ষর রাখেন। প্রথম পার্টে অ্যানাটমি ও ফার্মাকোলজিতে সম্মানসহ ফাইনালে তিনি শীর্ষস্থান অধিকার করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণপদক লাভ করেন। এই সাফল্যই তাঁর ভবিষ্যৎ পেশাগত জীবনের ভিত্তি গড়ে দেয়।
প্রগতিশীল চেতনা ও ৫২-এর আন্দোলন
ডা. ফজলে রাব্বি কেবল বইয়ের পাতায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। ছাত্রজীবনেই তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এই অংশগ্রহণই প্রমাণ করে, তাঁর দেশপ্রেমের বীজ বপন হয়েছিল কৈশোরেই। তিনি ছিলেন সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডের অগ্রভাগে। এই সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা তাঁকে সমাজের অসঙ্গতিগুলো উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছিল।
আন্তর্জাতিক খ্যাতি - লন্ডনের রয়্যাল কলেজ ও বিরল রেকর্ড
মেডিকেল কলেজের পড়াশোনা শেষে ডা. ফজলে রাব্বি উচ্চতর শিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। তাঁর আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সাফল্য আজও শিক্ষণীয়।
এমআরসিপি অর্জন ও রেকর্ড
১৯৬২ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ান (Royal College of Physicians)-এর অধীনে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারনাল মেডিসিন ও কার্ডিওলজিতে এমআরসিপি (MRCP) ডিগ্রি অর্জন করেন।
এই অল্প বয়সে এমন উচ্চমানের ডিগ্রি অর্জন করা ছিল এক বিরল ঘটনা। তাঁর এই রেকর্ড আজও রয়্যাল কলেজে অক্ষুণ্ণ আছে, যা তাঁর ব্যতিক্রমী মেধার সাক্ষ্য দেয়।
হ্যামারস্মিথ হাসপাতালে দক্ষতা
যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত হ্যামারস্মিথ হাসপাতালে (Hammersmith Hospital) তিনি সিনিয়র রেজিস্ট্রার হিসেবে কাজ করার সময় তাঁর রোগ নির্ণয়ের অসাধারণ দক্ষতায় সবাই মুগ্ধ হয়েছিলেন।
জাতিগত পরিচয়ের ভ্রান্তি: এমনকি তাঁর নাম "রাব্বি" হওয়ায় শ্বেতাঙ্গ রোগীদের কাছে তাঁকে অনেক সময় “Jew” (ইহুদি) হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দেওয়া হতো, যাতে তাঁরা তাঁর চিকিৎসা গ্রহণে দ্বিধাগ্রস্ত না হন। এই তথ্যটি প্রমাণ করে, জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তাঁর চিকিৎসা দক্ষতা কতটা স্বীকৃত ছিল।
মাতৃভূমির ডাক - বিলাসী জীবন উপেক্ষা করে প্রত্যাবর্তন
বিদেশে তাঁর ছিল উচ্চবেতনের চাকরি, বিশ্বব্যাপী খ্যাতি এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের সুযোগ। কিন্তু তাঁর হৃদয়ে ছিল প্রিয় মাতৃভূমি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য গভীর টান।
ফিরে আসা ও কার্ডিওলজির সমার্থক
১৯৬৩ সালে তিনি সমস্ত সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাখ্যান করে দেশে ফিরে আসেন।
দেশে ফিরে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এরপর থেকেই তাঁর নাম দ্রুত পূর্ব পাকিস্তানে কার্ডিওলজি বা হৃদরোগ চিকিৎসার সমার্থক হয়ে ওঠে। তিনি ছিলেন সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ কার্ডিওলজিস্টদের একজন।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় অবদান
ডা. ফজলে রাব্বি কেবল চিকিৎসা সেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তাঁর গবেষণাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
রোগ নির্ণয়ে অবদান: ১৯৬৪ সালে তাঁর বিখ্যাত গবেষণা প্রবন্ধ "A case of congenital hyperbilirubinaemia (Dubin-Johnson Syndrome) in Pakistan" প্রকাশিত হয় আন্তর্জাতিক জার্নাল Journal of Tropical Medicine Hygiene-এ।
ফুসফুস গবেষণা: ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয় “Spirometry in tropical pulmonary eosinophilia”, যা British Journal of Diseases of the Chest এবং The Lancet, এই দুই খ্যাতনামা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল। The Lancet ছিল সেই সময়ে বিশ্বখ্যাত হাতে গোনা কয়েকটি চিকিৎসা জার্নালের মধ্যে অন্যতম।
পুরস্কার প্রত্যাখ্যান ও প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর
১৯৭০ সালে তিনি পাকিস্তানের সেরা অধ্যাপক নির্বাচিত হন, যা তাঁর বয়সের আর কেউ অর্জন করতে পারেননি। এই সম্মান ছিল তাঁর বৈজ্ঞানিক ও পেশাগত শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত স্বীকৃতি।
বঞ্চনার প্রতিবাদ: কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি বৈষম্য এবং বঞ্চনার প্রতিবাদে তিনি সেই জাতীয় পুরস্কার ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেন। এই ঘটনা তাঁর নৈতিক দৃঢ়তা এবং দেশপ্রেমের গভীরতা তুলে ধরে।
গণমুখী চিকিৎসা - এক অনন্য সামাজিক দর্শন
ডা. ফজলে রাব্বি কেবল চিকিৎসা করতেন না, তিনি স্বাস্থ্যসেবার সামাজিক দর্শন নিয়ে চিন্তা করতেন। তাঁর চিন্তাধারা ছিল সময়ের চেয়েও অনেক এগিয়ে।
Socialised Public Medicine এর প্রবক্তা
১৯৬৯ সালের প্রস্তাব: ১৯৬৯ সালে তিনি "গণমুখী চিকিৎসা" (Socialised Public Medicine) বা অনন্য এক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রস্তাব করেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, দারিদ্র্যই ছিল উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার সবচেয়ে বড় বাধা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য করার আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্যবিমা ও প্রযুক্তি: তিনি স্বাস্থ্যবিমা (Health Insurance) এবং উন্নত প্রযুক্তি (যেমনঃ আধুনিক ইসিজি মেশিন) দেশে আনার বিষয়ে জোর দিতেন। তাঁর এই দর্শনই তাঁকে প্রমাণ করে তিনি ছিলেন একজন আধুনিক, প্রগতিশীল সমাজ সংস্কারক।
সহধর্মিণী ডা. জাহানারা রাব্বি
১৯৫৭ সালে তিনি বিয়ে করেন ডা. জাহানারা রাব্বি-কে, যিনি ছিলেন তাঁর আদর্শের সহযাত্রী। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা, দৃঢ়, মেধাবী এবং অনন্য একজন নারী। তাঁর জীবন বাংলাদেশের নারী স্বাধীনতা ও প্রগতিশীলতার এক অসামান্য প্রতীক। এই আদর্শিক জুটিই পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
একাত্তরের রণাঙ্গনে - অস্ত্র হাতে নয়, মমতার সেবায়
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ডা. ফজলে রাব্বি নীরব দর্শক না থেকে সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।
আহতদের সেবায় নিবেদিত
তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিতে থাকেন। তিনি জানতেন, এই কাজ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি নিজের অর্থ ও ঔষধ দান করে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন।
গোপন আশ্রয়: এমনকি তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে আশ্রয় ও চিকিৎসা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তাঁর স্ত্রী ডা. জাহানারা রাব্বিও পুরো সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় যুক্ত ছিলেন। তাঁদের বাড়িটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয় ও নিরাময় কেন্দ্র।
১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ - শেষ যাত্রা ও স্বপ্নের পূর্বাভাস
দেশ স্বাধীন হওয়ার কাছাকাছি সময়ে, যখন বিজয় প্রায় সুনিশ্চিত, তখনই পাকিস্তানি বাহিনী তাদের শেষ ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে: বুদ্ধিজীবী হত্যা।
স্বপ্নের অদ্ভুত পূর্বাভাস
দেশ স্বাধীন হওয়ার কাছাকাছি সময়ে, ডা. জাহানারা রাব্বি এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেন, যেখানে তিনি সন্তানদের নিয়ে কাবা শরিফে ঘুরছেন, সবাই কালো পোশাকে।
স্বপ্নের কথা শোনার পর ডা. ফজলে রাব্বি শান্ত স্বরে বলেন, "তুমি মনে হয় আমার কবর দেখেছ।" এই বাক্যটি যেন ছিল তাঁর আসন্ন ভাগ্যলিপির এক শান্ত স্বীকারোক্তি।
অপহরণ ও নির্মম পরিণতি
ঠিক সেদিনই পাকিস্তানি সেনা ও তাদের স্থানীয় সহযোগী আল-বদর সদস্যরা তাদের বাসায় আসে। ফজলে রাব্বি কোনো প্রতিরোধ না করেই বলেন, "আমাকে ধরতে হবে না, আমি যাচ্ছি।" বিকেল চারটায় তাঁকে মাইক্রোবাসে তোলা হয়। আর সেটিই ছিল তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা।
বধ্যভূমিতে মরদেহ: পরবর্তীতে ১৮ ডিসেম্বর, বিজয়ের মাত্র দুই দিন পর, রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে তাঁর ক্ষত-বিক্ষত মরদেহ পাওয়া যায়। চরম নির্যাতন করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল।
অনুপ্রেরণার প্রতীক
ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি ছিলেন একজন ব্যক্তি, যিনি “Simple living and high thinking” (সরল জীবনযাপন ও উচ্চচিন্তা)-এ বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, পেশাগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার পরও কীভাবে নিজের দেশের প্রতি, দরিদ্র মানুষের প্রতি নৈতিক দায়বদ্ধতা রাখা যায়।
দেশপ্রেম, মানবতা, এবং সততার প্রতীক এই মানুষটি আজও বাংলাদেশের চিকিৎসা ইতিহাসে এক অনুপ্রেরণার নাম। তাঁর আদর্শ, ত্যাগ, ও মানবিকতা আমাদের প্রজন্মকে নতুন পথ দেখায়। শেখায় কীভাবে জ্ঞান ও মমতার মাধ্যমে এক জাতি গড়ে ওঠে। শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি আমাদের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান থাকবেন।




















