শহীদ ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি - পেশাগত সাফল্য তুচ্ছ করে দেশপ্রেমের জন্য জীবন দিলেন

যে কারণে মেয়েরা বেশি বয়সী পুরুষদের জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ করে

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যে কয়েকজন অনন্য মেধা ও প্রজ্ঞার অধিকারী শহীদ বুদ্ধিজীবী কালজয়ী রূপ ধারণ করে আছেন, তাঁদের মধ্যে ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। তিনি কেবল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বা গোটা আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অন্যতম সেরা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ (Cardiologist) ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একজন প্রগতিশীল চিন্তাবিদ, সমাজসংস্কারক, প্রখ্যাত গবেষক এবং নিবেদিতপ্রাণ দেশপ্রেমিক।

বিলাসবহুল বৈশ্বিক ক্যারিয়ার, রাজকীয় জীবনযাপন এবং অঢেল অর্থের হাতছানি তুচ্ছ করে তিনি কেবল মাতৃভূমির টানে, সাধারণ মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। মাত্র ৪২ বছরের সংক্ষিপ্ত কিন্তু দীপ্যমান জীবনে তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞান, সামাজিক দর্শন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে যে অসামান্য অবদানের স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তা আজ সাড়ে পাঁচ দশক পরও বাংলাদেশের চিকিৎসা ইতিহাসে এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস। মেধা, গভীর প্রজ্ঞা এবং মানবতা যখন নিখাদ দেশপ্রেমের সাথে একীভূত হয়, তখনই শহীদ ডা. ফজলে রাব্বির মতো মহান পুরুষের জন্ম হয়।

শৈশব, পারিবারিক পটভূমি ও শিক্ষা জীবনের অবিস্মরণীয় সূচনা (১৯৩২–১৯৫৫)

ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বির জন্ম ১৯৩২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, পাবনা জেলার হেমায়েতপুরের ছাতিয়ানী গ্রামে। প্রখ্যাত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া ফজলে রাব্বির শৈশব থেকেই ছিল এক ব্যতিক্রমী তীক্ষ্ণ ধীশক্তি, প্রখর কৌতূহল এবং জানার প্রতি গভীর অদম্য আগ্রহ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজে মেধার রাজকীয় স্বাক্ষর

১৯৫০ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চিকিৎসা শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা মেডিকেল কলেজে (ডিএমসি) ভর্তি হন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কঠিন ও জটিল বিষয়গুলো তিনি যেভাবে অনুধাবন করতেন, তা দেখে তাঁর শিক্ষক ও সহপাঠীরা বিস্ময় প্রকাশ করতেন।

ডাবল ডিস্টিংশন ও গোল্ড মেডেল: এমবিবিএস অধ্যয়নকালে প্রথম পেশাগত (Professional) পরীক্ষায় অ্যানাটমি (Anatomy) এবং ফার্মাকোলজিতে (Pharmacology) সম্মানসহ (Distinction) কৃতিত্ব অর্জন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র: ১৯৫৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এমবিবিএস চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক 'স্বর্ণপদক' (Gold Medal) লাভ করেন। এই অসামান্য সাফল্যই প্রমাণ করেছিল যে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ এক নতুন অধ্যায়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও ছাত্রজীবনের প্রগতিশীল সামাজিক চেতনা

ডা. ফজলে রাব্বি কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের বইয়ের পাতা বা অ্যানাটমি ল্যাবে নিজেকে বন্দি রাখেননি। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সামাজিক ও রাজনৈতিক অসঙ্গতি তাঁকে সর্বদা তাড়িত করত।

বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন: ১৯৫২ সালে যখন মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা উত্তাল হয়ে উঠেছিল, তখন ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারির সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে তরুণ মেডিকেল ছাত্র ফজলে রাব্বি রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। রাজপথে মিছিলে অংশগ্রহণের পাশাপাশি আহত আন্দোলনকারীদের গোপনে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি উদ্যোগী ছিলেন।

সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ: তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন প্রকৃত চিকিৎসকের শুধু রোগ নিরাময়ের জ্ঞান থাকলেই চলে না, তাঁর হৃদয়ে দেশের সংস্কৃতি, ভাষা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ থাকতে হয়। এই সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চেতনাই তাঁর ভেতর "গণমুখী চিকিৎসাসেবা"র বীজ বপন করে দিয়েছিল।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: লন্ডনের রয়্যাল কলেজ, বিশ্বরেকর্ড ও হ্যামারস্মিথ অভিজ্ঞতা

এমবিবিএস শেষ করে কিছুদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজে ইন্টার্নশিপ ও চাকরি করার পর, উচ্চতর শিক্ষার সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁকে নিয়ে যায় যুক্তরাস্ট্র ও যুক্তরাজ্যে।

মাত্র ৩০ বছর বয়সে MRCP অর্জন

১৯৬২ সালে তিনি লন্ডনের প্রখ্যাত রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস (Royal College of Physicians) থেকে ইন্টারনাল মেডিসিন ও কার্ডিওলজিতে এমআরসিপি (MRCP) ডিগ্রি অর্জন করেন।

সর্বকনিষ্ঠ রেকর্ড: এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাত্র ৩০ বছর বয়সে কার্ডিওলজির মতো জটিল বিষয়ে এই ডিগ্রি লাভ করা তৎকালীন কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর চিকিৎসকদের জন্য এক বিরল ঐতিহাসিক ঘটনা ছিল। রয়্যাল কলেজের নথিপত্রে তাঁর এই কনিষ্ঠ বয়সে ডিগ্রি অর্জনের বিষয়টি একটি অনন্য রেকর্ড হিসেবে দীর্ঘদিন সংরক্ষিত ছিল।

বিখ্যাত হ্যামারস্মিথ হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল চমক

যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত হ্যামারস্মিথ হাসপাতালে (Hammersmith Hospital) তিনি সিনিয়র রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগ দেন। সেখানে ইউরোপীয় ও ব্রিটিশ চিকিৎসকদের সঙ্গে কাজ করার সময় তাঁর রোগ নির্ণয়ের অসাধারণ দূরদর্শিতা (Clinical Diagnosis) সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল।

একটি ঐতিহাসিক ঘটনা: ডা. ফজলে রাব্বির উপাধি ছিল "রাব্বি" (Rabbee)। তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গ রোগীরা অনেক সময় অ-শ্বেতাঙ্গ এশীয় চিকিৎসকদের দ্বারা চিকিৎসা নিতে দ্বিধা বোধ করত। কিন্তু ডা. রাব্বির চিকিৎসা দক্ষতা এতই নিখুঁত ছিল যে, হাসপাতালের অনেক সহকর্মী কৌতুক করে বলতেন "রোগীদের বলো ইনি একজন ইহুদি (Jew/Rabbi) বিশেষজ্ঞ!" জাতিগত পরিচয়ের জটিলতা পেরিয়ে তাঁর জ্ঞান ও দক্ষতাই হয়েছিল ইউরোপের বুকে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।

বিলাসী জীবন প্রত্যাখ্যান: মাতৃভূমির টানে প্রত্যাবর্তন ও কার্ডিওলজির নবযুগ

যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে ডা. ফজলে রাব্বির সামনে খোলা ছিল বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা, বিলাসবহুল জীবনযাপন, কোটি টাকার বেতন এবং গবেষণার অঢেল সুযোগ। কিন্তু কোনো অর্থ বা সুখ্যাতি তাঁকে বিদেশে আটকে রাখতে পারেনি।

বিলাসবহুল ইউরোপীয় ক্যারিয়ার ──► সব সুযোগ প্রত্যাখ্যান ──► ১৯৬৩: মাতৃভূমি পূর্ব পাকিস্তানে ফেরা

ঢাকা মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগে যোগদান

পূর্ব পাকিস্তানে কার্ডিওলজির নবদিগন্ত সূচনা

কার্ডিওলজির সমার্থক নাম

১৯৬৩ সালে সমস্ত আন্তর্জাতিক সুযোগ-সুবিধা পেছনে ফেলে ডা. ফজলে রাব্বি জন্মভূমিতে ফিরে আসেন এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (Associate Professor) হিসেবে যোগ দেন।

দেশে ফেরার পরপরই তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আধুনিক হৃদরোগ চিকিৎসার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে "ডা. ফজলে রাব্বি" নামটি চিকিৎসা অঙ্গনে ও সাধারণ মানুষের কাছে হৃদরোগ বিজ্ঞানের সমার্থক হয়ে ওঠে। দূর-দূরান্ত থেকে জটিল রোগীরা কেবল তাঁর স্পর্শ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসার আশায় ঢাকা মেডিকেল কলেজে কিংবা তাঁর ব্যক্তিগত চেম্বারে ছুটে আসতেন।

আন্তর্জাতিক গবেষণা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা

ডা. ফজলে রাব্বি কেবল প্র্যাকটিসিং ফিজিশিয়ান ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ বৈজ্ঞানিক গবেষক। তাঁর লিখিত ও পরিচালিত গবেষণাপত্র বিশ্বসেরা মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের চিকিৎসাবিজ্ঞানকে আন্তর্জাতিক দরবারে মর্যাদার আসনে বসিয়েছিল।

ডুবিন-জনসন সিন্ড্রোম (Dubin-Johnson Syndrome) গবেষণা (১৯৬৪)

১৯৬৪ সালে বিশ্বখ্যাত মেডিকেল সাময়িকী Journal of Tropical Medicine and Hygiene-এ তাঁর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়: "A case of congenital hyperbilirubinaemia (Dubin-Johnson Syndrome) in Pakistan"। জন্মগত জন্ডিসের এই বিরল জেনেটিক রোগের ওপর ক্লিনিক্যাল বিশ্লেষণ করে তিনি বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ান।

বিশ্বসেরা জার্নাল 'দ্য ল্যানসেট'-এ গবেষণা (১৯৭০)

১৯৭০ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশ্ববরেণ্য জার্নাল The Lancet এবং British Journal of Diseases of the Chest-এ তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা প্রকাশিত হয়: "Spirometry in tropical pulmonary eosinophilia"

গবেষণার গুরুত্ব: ক্রান্তীয় অঞ্চলের ফুসফুসের বিশেষ রোগ (TPE)-এ ফুসফুসের সক্ষমতা বা স্পাইরোমেট্রির প্রভাব নিয়ে তাঁর নির্দেশিত তত্ত্ব সারা বিশ্বে গ্রহণযোগ্যতা পায়। তৎকালীন অবহেলিত পূর্ব পাকিস্তান থেকে 'দ্য ল্যানসেট'-এর মতো বিশ্বশীর্ষ সাময়িকীতে একক বা প্রধান গবেষক হিসেবে নিবন্ধ প্রকাশিত হওয়া ছিল এক অসামান্য ঐতিহাসিক অর্জনের নাম।

নৈতিকতার চূড়ান্ত পরীক্ষা: পাকিস্তানের সেরা অধ্যাপকের পদক প্রত্যাখ্যান (১৯৭০)

১৯৭০ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ডা. ফজলে রাব্বিকে "পাকিস্তানের সেরা অধ্যাপক" (Best Professor of Pakistan) হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। অত্যন্ত অল্প বয়সে এই পদক পাওয়া ছিল যেকোনো চিকিৎসকের জন্য পেশাগত সাফল্যের চরম স্বীকৃতি।

১৯৭০: 'পাকিস্তান সেরা অধ্যাপক' খেতাব ঘোষণা ─► বাঙালি জাতির ওপর শোষণের অনুভব ─► ঘৃণা ভরে খেতাব প্রত্যাখ্যান

প্রতিবাদের সাহসী কণ্ঠ: কিন্তু তৎকালীন সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং বাঙালিদের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক ও দমনপীড়ন নীতির প্রতিবাদে তিনি সেই জাতীয় পুরষ্কার ও সম্মাননা ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেন।

নৈতিক বার্তা: এই নজিরবিহীন ঘটনা প্রমাণ করে, তাঁর কাছে নিজের লাভ-ক্ষতি বা সরকারি খেতাবের চেয়ে স্বজাতির স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা ছিল অনেক ওপরে।

'গণমুখী চিকিৎসা' (Socialised Public Medicine): সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক দর্শন

ডা. ফজলে রাব্বির চিকিৎসাদর্শন কেবল ওষুধ লেখা বা প্রেসক্রিপশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন মূলত একজন সমাজসংস্কারক চিকিৎসক।

১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক প্রস্তাবনা

১৯৬৯ সালে তিনি সর্বজনীন স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করতে "Socialised Public Medicine" বা "গণমুখী চিকিৎসা ব্যবস্থা"-র একটি বিস্তৃত রূপরেখা পেশ করেন।

দারিদ্র্য যেন মৃত্যুর কারণ না হয়: তিনি স্পষ্টভাবে বলতেন "চিকিৎসা কোনো ব্যবসা বা বিলাসবহুল পণ্য হতে পারে না। এটি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার।"

হেলথ ইন্স্যুরেন্স ও আধুনিক প্রযুক্তি: তিনি প্রস্তাব করেছিলেন যে, রাষ্ট্রকে হেলথ ইন্স্যুরেন্স বা জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা চালু করতে হবে, যাতে একজন হতদরিদ্র কৃষকও যেন হৃদরোগের মতো জটিল রোগের আধুনিকতম চিকিৎসা (যেমন তৎকালীন ইসিজি বা কার্ডিয়াক টেস্ট) সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পেতে পারে। আজকের উন্নত বিশ্বের 'Universal Healthcare'-এর ধারণা তিনি আজ থেকে ৫০ বছর আগেই এই দেশে বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

জীবনসঙ্গিনী ডা. জাহানারা রাব্বি ও প্রগতিশীল নীড়

১৯৫৭ সালে ডা. ফজলে রাব্বি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. জাহানারা রাব্বি-র সঙ্গে। ডা. জাহানারা রাব্বি নিজেও ছিলেন একজন অত্যন্ত মেধাবী, স্বাধীনচেতা, সুশিক্ষিত ও প্রগতিশীল নারী।

প্রগতির তীর্থস্থান: ধানমন্ডির ১১/এ সড়কে অবস্থিত তাঁদের বাসভবনটি ছিল তৎকালীন মুক্তবুদ্ধির চর্চা, সংস্কৃতিসেবী, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী এবং চিকিৎসকদের এক মিলনমেলা। এই আদর্শিক দম্পতি তাঁদের সমস্ত মেধা ও সম্পদ দেশের ও মানুষের কল্যাণে অকাতরে বিলিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেননি।

১৯৭১-এর অগ্নিঝরা দিনগুলো: সাদা অ্যাপ্রোনে যুদ্ধক্ষেত্রের বীর সেনানী

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদারের 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর মাধ্যমে শুরু হয় ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা। এই কঠিন পরিস্থিতিতে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি দেশ ছাড়লেও ডা. ফজলে রাব্বি ঢাকা ছেড়ে কোথাও যাননি। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজকে বানিয়েছিলেন চিকিৎসাসেবা ও গেরিলা সমর্থনের এক গোপন ঘাঁটি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজে বীরত্ব

তিনি জানতেন, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দেওয়া মানেই নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড। তবুও তিনি ও তাঁর টিম শত শত আহত গেরিলা ও সাধারণ মানুষকে গোপনে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। পাকিস্তানি সেনা অফিসাররা প্রায়ই হাসপাতালে তল্লাশি চালাতে আসত। ডা. রাব্বি তাঁর অসামান্য বুদ্ধিমত্তা দিয়ে রেজিস্টার খাতায় নাম ও রোগের তথ্য বদলে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাঁচিয়েছেন।

রসদ ও গোপন আশ্রয়

তিনি নিজের উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ মুক্তিযোদ্ধাদের ওষুধ, ব্যান্ডেজ, ব্ল্যাড ব্যাগ এবং যুদ্ধের রসদ কেনার জন্য দান করে দিতেন। ধানমন্ডির তাঁর নিজের বাসভবনে তিনি ও তাঁর স্ত্রী ডা. জাহানারা রাব্বি রাতে গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিতেন, খাবার দিতেন এবং অসুস্থদের চিকিৎসা করতেন।

১৪ই ডিসেম্বর ১৯৭১: স্বপ্নের পূর্বাবাস, নির্মম অপহরণ ও বধ্যভূমিতে শাহাদাত

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ। যৌথবাহিনীর তীব্র আক্রমণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের পরাজয় যখন একেবারেই সুনিশ্চিত, ঠিক তখনই তারা মেতে ওঠে এক বাঙালি জাতিকে মেধা শূন্য করার ঘৃণ্য নীলকৌশলে।

স্বপ্নের অলৌকিক পূর্বাভাস

দেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক দুই দিন আগে, ডা. জাহানারা রাব্বি এক অদ্ভুত ও করুণ স্বপ্ন দেখেন। তিনি স্বপ্নে দেখেন তিনি তাঁর সন্তানদের নিয়ে কাবা শরিফ তাওয়াফ করছেন, তবে সবার পরনে ঘন কালো পোশাক।

ঘুম ভাঙার পর যখন তিনি ডা. ফজলে রাব্বির কাছে ব্যাকুল হয়ে এই স্বপ্নের কথা বলেন, তখন প্রাজ্ঞ ডা. রাব্বি কোনো বিচলিত না হয়ে এক গভীর প্রশান্ত হাসি দিয়ে শান্ত স্বরে উত্তর দিয়েছিলেন:

"তুমি মনে হয় আমার কবর দেখেছ।"

এই একটি বাক্যই প্রমাণ করে, তিনি জানতেন দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁকে হয়তো নিজের প্রাণ দিতে হবে, এবং তিনি সেই নিয়তিকে পরম হাসিমুখে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলেন।

১৪ই ডিসেম্বরের সেই অভিশপ্ত অপরাহ্ন

১৪ই ডিসেম্বর ১৯৭১, দুপুর গড়িয়ে বিকেল ৪টা। ঢাকা তখন অবরুদ্ধ। ধানমন্ডির ১১/এ নম্বর বাড়িতে এসে থামে আল-বদর ও পাকিস্তানি সেনাদের কাদা মাখানো একটি মাইক্রোবাস।

তারা এসে যখন দরজা ধাক্কায়, তখন ডা. ফজলে রাব্বি পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কোনো অহেতুক প্রতিবাদ না করে বিন্দুমাত্র ভীত না হয়ে শান্ত পদক্ষেপে সামনে এগিয়ে আসেন এবং বলেন:

"আমাকে ধরতে হবে না, আমি যাচ্ছি।"

এটিই ছিল তাঁর পরিবারের সাথে শেষ দেখা। আল-বদর জল্লাদের দল তাঁকে চোখ বেঁধে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায় এক অজানা উদ্দেশ্যে।

রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে মরদেহ প্রাপ্তি

১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ মুক্ত ও স্বাধীন হয়। কিন্তু স্বাধীনতার আনন্দের মাঝেই স্বজনদের মনে ছিল নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের ফিরে পাওয়ার আকুল প্রতীক্ষা।

অবশেষে ১৮ই ডিসেম্বর, বিজয়ের দুই দিন পর, রায়েরবাজার ইটখোলার বিভীষিকাময় বধ্যভূমিতে উদ্ধার করা হয় শহীদ ডা. ফজলে রাব্বির ক্ষত-বিক্ষত মরদেহ। তাঁর হাত দুটি পেছনের দিকে শক্ত করে বাঁধা ছিল। আল-বদর ঘাতকরা তাঁর বুক বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে এবং কাছ থেকে গুলি করে এই মহান চিকিৎসককে হত্যা করেছিল। ঘাতকরা চেয়েছিল যে হাত দিয়ে তিনি মানুষকে জীবন দান করতেন, সেই হাতকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে।

পূর্ণাঙ্গ তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা সারণী

পাঠকদের সুবিধার্থে শহীদ ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বির জীবন, শিক্ষা, গবেষণা এবং অবদানের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে সংসংগঠিত সারণীতে উপস্থাপন করা হলো:

পরিমাপক / বৈশিষ্ট্য

বিস্তারিত বিবরণ ও ঐতিহাসিক তথ্য

পূর্ণ নাম

শহীদ ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি

জন্ম তারিখ ও স্থান

২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৩২; ছাতিয়ানী, হেমায়েতপুর, পাবনা জেলা

পেশাগত পরিচিতি

প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ (Cardiologist), অধ্যাপক ও সমাজসংস্কারক

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা

পাবনা জিলা স্কুল (ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৪৮); ঢাকা কলেজ (ইন্টারমিডিয়েট, ১৯৫০)

চিকিৎসা ডিগ্রি (মেডিকেল)

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (MBBS, ১৯৫৫); ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত

উচ্চতর ডিগ্রি (যুক্তরাজ্য)

MRCP (Internal Medicine & Cardiology), এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬২)

বিশ্বরেকর্ড (যুক্তরাজ্য)

মাত্র ৩০ বছর বয়সে কার্ডিওলজিতে MRCP অর্জন (রয়্যাল কলেজের তৎকালীন কনিষ্ঠ রেকর্ড)

কর্মক্ষেত্র (দেশ ও বিদেশ)

সিনিয়র রেজিস্ট্রার, হ্যামারস্মিথ হাসপাতাল (লন্ডন); সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

ঐতিহাসিক আন্দোলন

১৯৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলনে সরাসরি সক্রিয় অংশগ্রহণ

বিখ্যাত গবেষণাপত্র (১)

Journal of Tropical Medicine and Hygiene (১৯৬৪) - "Dubin-Johnson Syndrome"

বিখ্যাত গবেষণাপত্র (২)

The Lancet (১৯৭০) - "Spirometry in tropical pulmonary eosinophilia"

পুরস্কার প্রত্যাখ্যান

১৯৭০ সালে প্রাপ্ত "Pakistan's Best Professor" খেতাব শোষণের প্রতিবাদে প্রত্যাখ্যান

সামাজিক দর্শন

"Socialised Public Medicine" (১৯৬৯) - গণমুখী সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা

সহধর্মিণী

ডা. জাহানারা রাব্বি (প্রখ্যাত স্বাধীনচেতা চিকিৎসক ও সমাজকর্মী)

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা

আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা, নিজস্ব অর্থ ও ওষুধ প্রদান এবং আত্মগোপনে সাহায্য

শাহাদাতের তারিখ

১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ (অপহরণ); ১৮ই ডিসেম্বর (মরদেহ উদ্ধার, রায়েরবাজার বধ্যভূমি)

মরোণোত্তর সম্মাননা

ডাকটিকিট প্রকাশ, 'শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি হল' (ডিএমসি), ও স্মৃতিসৌধ নামাঙ্কন

জাতীয় স্মৃতিচিহ্ন, আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা ও শেষ কথা

শহীদ ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি আদর্শের নাম। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে:

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের প্রেরণা: ঢাকা মেডিকেল কলেজের অন্যতম প্রধান আবাসিক হলের নামকরণ করা হয়েছে 'শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি হল'। প্রতিদিন শত শত উদীয়মান চিকিৎসক এই হলের নাম দেখে মানবসেবা ও দেশপ্রেমের নতুন দীক্ষা পান।

স্মারক ডাকটিকিট: বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ১৯৯১ সালের বুদ্ধিজীবী দিবসে তাঁর ছবি সংবলিত বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে সম্মান প্রদর্শন করে।

আধুনিক বাংলাদেশে ডা. ফজলে রাব্বির আদর্শের প্রয়োজনীয়তা

আজকের একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যখন বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাসেবা দিন দিন বাণিজ্যিকীকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যখন চিকিৎসার পেছনে বিপুল ব্যয়ের কারণে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই ডা. ফজলে রাব্বির 'গণমুখী চিকিৎসা ব্যবস্থা' (Socialised Public Medicine) এবং "Simple living, high thinking"-এর দর্শন আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।

তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন পেশাগত সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করার পরও কীভাবে নিজের শিকড়, নিজের দেশ এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি নৈতিক দায়বদ্ধতা অক্ষুণ্ণ রাখতে হয়।

উপসংহার

শহীদ ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বির জীবনগাথা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের মেধা কখনো কেবল নিজের ব্যক্তিস্বার্থ বা অর্থের পিছে ঘোরে না; তা আলো ছড়ায় সমাজ, দেশ ও মানুষের কল্যাণে। ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর আল-বদর ঘাতকরা এই মহান মানবপ্রেমিকের দেহকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাঁর আদর্শ, তাঁর উদ্ভাবনী চিন্তা এবং তাঁর নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমকে তারা স্তব্ধ করতে পারেনি।

তিনি বেঁচে আছেন এবং বেঁচে থাকবেন প্রতিটি চিকিৎসকের বিবেকী পদক্ষেপে, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি স্বাস্থ্যসেবার নীতিতে এবং আমাদের হৃদয়ের পরম শ্রদ্ধার মনিকোঠায়। শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি আমাদের ইতিহাসে এক অমলিন, চিরভাস্বর ও দিক নির্দেশক আলোকবর্তিকা।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.