দুখু মিয়া কবি নজরুলের দু:খ দারিদ্র্যে ভরা শেষ জীবন

Dec 24, 2025

বাংলার সাহিত্যাকাশের উজ্জ্বলতম ধ্রুবতারা কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর জীবন যেমন ঝোড়ো হাওয়ার মতো উত্তাল, তেমনি করুণ রসে সিক্ত এক মহাকাব্য। যে মানুষটি তাঁর কলম দিয়ে ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন, যাঁর কণ্ঠে বেজে উঠেছিল বিদ্রোহের রণতূর্য, জীবনের শেষ পর্যায়ে সেই মানুষটিই শিকার হয়েছিলেন চরম অবহেলা ও একাকিত্বের। সম্প্রতি ইত্তেফাক সাময়িকীতে প্রকাশিত নজরুলের পারিবারিক জীবন, অসুস্থতা এবং শেষ দিনগুলো নিয়ে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা আমাদের জাতীয় চেতনার এক গভীর ক্ষতে আঘাত করে। নজরুলকে নিয়ে আমাদের প্রচলিত আবেগ আর তাঁর জীবনের রূঢ় বাস্তবের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান, তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একজন কবি বা সংগীতজ্ঞ নন, তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। অথচ তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে সীমাহীন দুঃখ আর বঞ্চনা। তাঁর বাল্যকাল থেকে শুরু করে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত প্রতিটি বাঁক যেন ট্র্যাজেডির এক একটি অঙ্ক।

প্রথম বিবাহের সেই ঝোড়ো অধ্যায়

নজরুলের দাম্পত্য জীবনের সূচনাটি ছিল বেশ নাটকীয় এবং রহস্যময়। ১৯২১ সালে কুমিল্লার দৌলতপুরে সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিসের সঙ্গে তাঁর প্রথম বিয়ে হয়। নার্গিস ছিলেন নজরুলের প্রকাশক আলী আকবর খানের ভাগ্নি। কিন্তু সেই বিয়ে স্থায়ী হয়েছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। বাসর রাতেই কোনো এক অজ্ঞাত কারণে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে নজরুলের তীব্র বিবাদ বাধে। নজরুল এতটাই ক্ষুব্ধ ও অপমানিত বোধ করেছিলেন যে, বিয়ের আসর ছেড়ে সেই রাতেই মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে পায়ে হেঁটে কয়েক মাইল পথ পাড়ি দিয়ে চলে যান। নজরুলের এই জেদ ও আত্মসম্মানবোধ তাঁর চরিত্রের এক অনন্য দিক ছিল। অনেকে মনে করেন, ঘরজামাই থাকার শর্ত আরোপ করাই ছিল সেই বিবাদের মূল কারণ।

প্রমীলা দেবী - অভাব ও আবেগের এক ছায়াসঙ্গী

নার্গিসের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর নজরুলের জীবনে আসেন প্রমীলা দেবী। তাঁদের বিয়ে ছিল সেই সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সাহসী একটি পদক্ষেপ। আন্তঃধর্মীয় এই বিবাহ নজরুল ও প্রমীলা দুজনের জন্যই অনেক লাঞ্ছনা বয়ে এনেছিল। তাঁদের বিবাহিত জীবন ছিল চরম অভাব আর দারিদ্র্যে মোড়ানো।

নজরুল তাঁর প্রতিভার গুণে সেই সময়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। গ্রামোফোন কোম্পানি, সাহিত্য পত্রিকা আর রাজকীয় সম্মানী সবই ছিল। কিন্তু কবির ছিল ‘ভোলাভালা’ স্বভাব। বিষয়বুদ্ধি বা সঞ্চয় করার মানসিকতা তাঁর কোনোকালেই ছিল না। এর প্রধান কারণ হতে পারে তাঁর ভবঘুরে শৈশব। নজরুলের শৈশব কেটেছে চরম অনিশ্চয়তায়। তিনি ছিলেন তাঁর বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীর ষষ্ঠ সন্তান। বাড়ির মায়া ত্যাগ করে তিনি কখনো লেটো দলে, কখনো রুটির দোকানে, কখনোবা অনাথ আশ্রমে কাটিয়েছেন। ঘরসংসার কীভাবে সামলাতে হয়, সেই পারিবারিক শিক্ষা তিনি কখনোই পাননি।

সন্তানশোক ও ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর’

নজরুল ও প্রমীলার জীবনে শোকের ছায়া বারবার নেমে এসেছে। তাঁদের প্রথম সন্তান ‘আজাদ কামাল’ অকালেই মারা যায়। সেই শোক সামলে ওঠার আগেই দ্বিতীয় সন্তান ‘বুলবুল’ও চলে যায় পৃথিবী ছেড়ে। বিশেষ করে বুলবুলের মৃত্যু নজরুলকে মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। বুলবুলের মৃত্যুর পরই তিনি হৃদয়ের গভীর বেদনা দিয়ে লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত গান:

“শূন্য এ বুকে পাখি মোর আর ফিরে আয় ফিরে আয়...”

এরপর তাঁদের আরও সন্তান হয় সব্যসাচী ও অনিরুদ্ধ। কিন্তু পারিবারিক জীবনে সুখের চেয়ে শোকের পাল্লাই ছিল বেশি ভারী।

১৯৪১ - সুরের জাদুকরের মৌনতা

১৯৪১ সালে নজরুল যখন সাফল্যের মধ্যগগনে, তখন থেকেই তাঁর শরীরে অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেয়। ১৯৪২ সাল নাগাদ তিনি পুরোপুরি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। যে কণ্ঠ একসময় ব্রিটিশ রাজের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, সেই কণ্ঠে চিরস্থায়ী নীরবতা নেমে আসে।

এই সময়টি ছিল নজরুলের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। যখন নজরুল সুস্থ ছিলেন, তখন তাঁকে ঘিরে থাকত বিশাল এক বন্ধুবৃত্ত। আড্ডা, গান আর চায়ের আসরে নজরুলের উপস্থিতি ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু কবির দুর্দিনে সেই ‘সুসময়ের বন্ধুরা’ একে একে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করতে শুরু করে। দীর্ঘ দশ বছর তিনি প্রায় বিনা চিকিৎসায় পড়ে ছিলেন। এমনকি তাঁর নিকটাত্মীয়রাও তাঁর চিকিৎসার ব্যাপারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। কেবল অসুস্থ স্ত্রী প্রমীলা দেবীই ছিলেন কবির একমাত্র সেবিকা।

চিকিৎসার ব্যর্থতা ও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর উদ্যোগ

দীর্ঘ এক দশক অবহেলার পর ভারতের স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে নজরুলের চিকিৎসার জন্য একটি বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন রাজনৈতিক নেতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ‘নজরুল চিকিৎসা কমিটি’ গঠিত হয়। সংগৃহীত অর্থে ১৯৫৩ সালে নজরুলকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন ও ভিয়েনায় পাঠানো হয়।

কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বিদেশের বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে জানান, নজরুল ‘পিকস ডিজিজ’ (Pick's Disease) নামক এক দুরারোগ্য মস্তিষ্কের ব্যাধিতে ভুগছেন। চিকিৎসকরা স্পষ্ট বলে দেন, এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। ব্যর্থ মনোরথ হয়ে কবিকে দেশে ফিরে আসতে হয়। এর মধ্যেই প্রমীলা দেবীও শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। দারিদ্র্য আর একের পর এক ধকল তাঁর শরীরকে কঙ্কালসার করে দিয়েছিল।

উত্তরাধিকারের বৈপরীত্য ও অমীমাংসিত রহস্য

নজরুলের শেষ জীবনে তাঁর দুই ছেলে কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধর ভূমিকা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ আছে যে, নজরুলের রয়্যালটির মোটা অঙ্কের টাকা তাঁদের হাতে আসত, কিন্তু কবির সুচিকিৎসার চেয়ে বিলাসিতা বা আমোদ-প্রমোদেই সেই টাকা বেশি খরচ হতো।

এখানে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার নজরুলের নামে মোটা অঙ্কের ভাতা পাঠাত। কেন পাকিস্তান সরকার এই টাকা দিত আর ভারত সরকারই বা কেন তা অনুমোদন করত, তার কোনো সঠিক ঐতিহাসিক উত্তর আজও পাওয়া যায়নি। ১৯৭১ সালে নজরুলের ছেলেরা সেই টাকা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা এতটাই ‘ইতিহাস বিস্মৃত’ যে, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এবং মানবিক অধ্যায়গুলো নিয়ে কখনোই গভীর কোনো গবেষণা হয়নি।

“প্রমীলা দেবী ইসলাম” - এক অলৌকিক অটোগ্রাফ

নজরুলের মস্তিষ্ক যখন প্রায় অচল, তখন সব্যসাচী মাঝে মাঝে দর্শকদের নিয়ে এসে বাবাকে বিরক্ত করতেন। একবার একজন অটোগ্রাফ শিকারীর জোরাজুরিতে সব্যসাচী নজরুলের হাতে কাগজ-কলম গুঁজে দিয়ে চিৎকার করে সই করতে বলেন। কাজী সব্যসাচী বললেন
- বাবা একটা সই করে দাও।
নজরুল ফ্যাল ফ্যাল করে তাঁর দিকে তাকালেন। কিছুই বুঝতে পারছেন না তাকে কি করতে বলা হচ্ছে। সব্যসাচী বললেন
- কি হল সই করো।
তাতেও কোন কাজ হল না। সব্যসাচী তাঁর হাতে জোর করে কাগজ কলম গুঁজে দিয়ে চিৎকার করে বললেন
- বাবা সই বাবা সই

নজরুল কাঁপা কাঁপা হাতে কাগজ কলম নিয়ে অনেক ক্ষণ ধরে লিখলেন। কাগজ হাতে নিয়ে অটোগ্রাফ শিকারী হতভম্ব। আঁকাবাঁকা অক্ষরে এইভাবে লেখা আছে।
প্রমীলা
দে
বী


লা

এর থেকে বোঝা যায় স্ত্রীর জন্য তাঁর মনে কত বড় জায়গা ছিল। তিনি নিজের নাম লেখেননি; বরং লিখেছেন “প্রমীলা দেবী ইসলাম”। নিজের অস্তিত্ব ভুলে গেলেও প্রিয়তমা স্ত্রীর নাম তিনি ভোলেননি। ১৯৬২ সালে প্রমীলা দেবীর মৃত্যুর পর নজরুল নির্বাক থাকলেও তাঁর অস্থিরতা ছিল অবর্ণনীয়। তিনি তাঁর স্ত্রীর বিছানার শূন্য জায়গায় হাত চাপড়াতেন আর নিঃশব্দে কাঁদতেন। প্রমীলার প্রতি নজরুলের এই ভালোবাসা পৃথিবীর যেকোনো প্রেমের উপাখ্যানকে হার মানায়।

বাংলাদেশে নজরুল - সম্মান নাকি প্রদর্শন?

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। তাঁকে দেওয়া হয় ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদা। শুরুতে ধানমন্ডির এক বিশাল দোতলা বাড়িতে তাঁকে রাখা হয়েছিল। নজরুলের আগমনে সারা দেশে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু অভিযোগ ওঠে যে, সেই সময়ে নজরুলকে মানুষের কাছে একটি ‘শোপিস’ বা প্রদর্শনীর বস্তু হিসেবে তুলে ধরা হতো। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই মানুষের আগ্রহ চলে গেল। এই নজরুল তো সেই নজরুল নয়। এতো মূক জড় একটি বৃদ্ধ।

যখন মানুষের প্রাথমিক উন্মাদনা কমে গেল, তখন কবিকে সেই দোতলা বাড়ি থেকে সরিয়ে অপেক্ষাকৃত একটি ছোট এবং কম সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন বাড়িতে স্থানান্তর করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, নজরুল সেই বড় বাড়িটি ছেড়ে যেতে চাননি; তিনি সিঁড়ির রেলিং আঁকড়ে ধরে অব্যক্ত প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এর কিছুদিন পরই ১৯৭৬ সালে ৭৭ বছর বয়সে এই মহান কবির মহাপ্রয়াণ ঘটে।

শেষ ইচ্ছার অপমৃত্যু

নজরুল তাঁর গানে লিখেছিলেন “মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই”। তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর আরেকটি মানসিক আকুতি অপূর্ণ থেকে গেছে। নজরুল চেয়েছিলেন মৃত্যুর পর তাঁকে যেন তাঁর স্ত্রীর পাশে সমাধিস্থ করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, প্রমীলা দেবীর সমাধি ভারতের চুরুলিয়ায় আর নজরুলের সমাধি বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে। রাজনীতির কাঁটাতার আর ভৌগোলিক সীমারেখা দুই চিরন্তন প্রেমিককে মৃত্যুর পর আর এক হতে দেয়নি।

আমাদের ঋণ ও দায়বদ্ধতা

কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জন্য যা রেখে গেছেন, তার বিনিময়ে আমরা তাঁকে কেবল ‘অবহেলার বিষ’ দিয়েছি। তাঁর শেষ জীবনের করুণ দৃশ্যগুলো আমাদের জাতীয় লজ্জা। বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা আজ বর্তমান নিয়ে এতটাই মশগুল যে, ইতিহাসের কারিগরদের কষ্টার্জিত জীবনগাথা আমাদের স্পর্শ করে না। নজরুলের জীবন আমাদের শেখায় যে, প্রতিভার কদর আমরা দিতে পারলেও, মানুষের কদর দিতে আমরা বারবার ব্যর্থ হই।

নজরুল বেঁচে থাকবেন তাঁর বিদ্রোহে, তাঁর প্রেমে। কিন্তু তাঁর শেষ জীবনের এই অব্যক্ত বেদনাগুলো ইতিহাসের পাতায় এক একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন হয়ে চিরকাল ঝুলে থাকবে।

(ইত্তেফাক সাময়িকীতে প্রকাশিত)

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.