মিশরের ‘ইউনিট-৭৭৭’ - বিশ্বের সবচেয়ে বাজে স্পেশাল ফোর্স ইউনিট

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এলিট স্পেশাল ফোর্স বা কমান্ডো ইউনিটের কথা উঠলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ব্রিটিশ SAS, মার্কিন Navy SEALs, কিংবা ইসরায়েলের Sayeret Matkal-এর মতো অত্যন্ত দক্ষ ও সফল বাহিনীর ছবি। জিম্মি উদ্ধার কিংবা চরম ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশনে এদের নিখুঁত পরিকল্পনা আর কার্যকারিতা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। কিন্তু সামরিক ইতিহাসের পাতা উল্টালো জানা যায়, সব স্পেশাল ফোর্সের গল্প সাফল্যের আলোয় মোড়ানো থাকে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অতি-উৎসাহ, ভুল পরিকল্পনা এবং সমন্বয়হীনতা এমন বিপর্যয় ডেকে আনে যা ইতিহাসের পাতায় চিরকালের জন্য কলঙ্কিত হয়ে থাকে।
আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, "পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে বা ব্যর্থ স্পেশাল ফোর্স ইউনিট কোনটি?" তবে এর কোনো সরাসরি উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ সামরিক পরিভাষায় কোনো ইউনিটকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সবচেয়ে বাজে’ তকমা দেওয়া হয় না এবং সব দেশের স্পেশাল ফোর্সেরই কম-বেশি ব্যর্থতার রেকর্ড রয়েছে। তবে কাউন্টার-টেরোরিজম এবং জিম্মি উদ্ধারের ইতিহাসে মিশরের এলিট কমান্ডো ইউনিট ‘Unit-777’ (ইউনিট-৭৭৭)-এর দুটি অপারেশনকে অন্যতম চরম বিপর্যয় এবং ট্র্যাজেডি হিসেবে গণ্য করা হয়। আজ আমরা আলোচনা করব মিশরের এই বিশেষ বাহিনীর এমন দুটি কুখ্যাত ও লোমহর্ষক অপারেশন নিয়ে, যা স্পেশাল ফোর্সের ইতিহাসে এক বড় শিক্ষা হয়ে রয়েছে।
ইউনিট-৭৭৭: পটভূমি ও গঠন
সত্তর ও আশির দশকে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিমান ছিনতাই এবং ফিলিস্তিনী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা চরম আকার ধারণ করেছিল। এই ধরনের আধুনিক ও জটিল সন্ত্রাসী হামলা মোকাবিলা করার জন্য মিশরের তৎকালীন সরকার একটি অত্যন্ত চটপটে, আধুনিক এবং বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কাউন্টার-টেরোরিজম ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এর ফলেই ১৯৭৭ সালে মিশরের সামরিক বাহিনীর অধীনে গঠিত হয় ‘ইউনিট-৭৭৭’।
এদের মূল দায়িত্ব ছিল বিমান ছিনতাই ঠেকানো, জিম্মি উদ্ধার এবং দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা। কিন্তু যথাযথ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং নিখুঁত রণকৌশল রপ্ত করার আগেই এই ইউনিটটিকে এমন কিছু জটিল অপারেশনে নামিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলাফল হয়েছিল অত্যন্ত করুণ।
সাইপ্রাসের লারনাকা বিমানবন্দরে কমান্ডো হামলা (১৯৭৮)
মিশরের স্পেশাল ফোর্সের ইতিহাসের প্রথম বড় ধাক্কাটি আসে ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এটি ছিল সাইপ্রাসের মাটিতে চালানো এক অননুমোদিত এবং চরম বিশৃঙ্খল সামরিক অভিযান।
ঘটনার সূত্রপাত
১৯৭৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। সাইপ্রাসের রাজধানী নিকোসিয়ার হিলটন হোটেলে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন চলছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং বিখ্যাত মিশরীয় সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ ইউসেফ এল-সেবাই। আচমকা একদল ফিলিস্তিনী সশস্ত্র সন্ত্রাসী হোটেলে হামলা চালায় এবং ইউসেফ এল-সেবাইকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর তারা সেখানে উপস্থিত বেশ কয়েকজন প্রতিনিধিকে জিম্মি করে এবং একটি বিমানে করে পালানোর চেষ্টা করে।
বিভিন্ন দেশে অবতরণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর, ছিনতাইকৃত বিমানটি অবশেষে ১৯ ফেব্রুয়ারি সাইপ্রাসের লারনাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে অবতরণ করে।
কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও মিশরের তাড়াহুড়ো
সাইপ্রাস সরকার এই সংকটটি আলোচনার মাধ্যমে এবং রক্তপাতহীনভাবে সমাধান করার চেষ্টা করছিল। সাইপ্রাসের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট স্পাইরোস কিপ্রিয়ানু নিজে বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে সন্ত্রাসীদের সাথে নেগোসিয়েশন বা আলোচনা চালাচ্ছিলেন।
কিন্তু কায়রোতে বসে মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত তাঁর প্রিয় বন্ধুর হত্যাকাণ্ডে এবং জিম্মি সংকটে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও অধৈর্য হয়ে পড়েন। সাইপ্রাস সরকারের ওপর ভরসা না করে তিনি নিজেই সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সাইপ্রাস সরকারের কোনো রকম আনুষ্ঠানিক অনুমতি বা পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই মিশর থেকে একটি C-130 হারকিউলিস পরিবহন বিমানে করে ৭৫ জন কমান্ডো পাঠায় মিশর।
বিমানবন্দরের রণক্ষেত্র ও চরম ব্যর্থতা
মিশরীয় কমান্ডোদের বহনকারী C-130 বিমানটি লারনাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর সাইপ্রাস কর্তৃপক্ষ মনে করেছিল এটি হয়তো মিশরের কোনো কূটনৈতিক দল। কিন্তু বিমান থেকে নেমেই মিশরীয় কমান্ডোরা সরাসরি ছিনতাইকৃত বিমানের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে।
সাইপ্রাসের ন্যাশনাল গার্ড এবং নিরাপত্তা বাহিনী এই অননুমোদিত সশস্ত্র বাহিনীকে দেখে মনে করে এটি হয়তো অন্য কোনো সন্ত্রাসী দল বা বিদেশি আক্রমণ। সাইপ্রাসের সেনারা মিশরীয় কমান্ডোদের থামার নির্দেশ দেয়, কিন্তু কমান্ডোরা তা উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতে থাকে।
মুহূর্তের মধ্যে লারনাকা বিমানবন্দর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। তবে এই যুদ্ধ সন্ত্রাসীদের সাথে ছিল না, বরং যুদ্ধটি হয়েছিল সাইপ্রাসের নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং মিশরের এলিট কমান্ডোদের মধ্যে! সাইপ্রাসের ন্যাশনাল গার্ড অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে মিশরীয় কমান্ডোদের ওপর ভারী মেশিনগান ও অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল দিয়ে গুলি চালাতে শুরু করে।
ফলাফল
কয়েক মিনিটের তীব্র গোলাগুলিতে মিশরের এই বিশেষ অভিযানটি সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সংঘর্ষে ১৫ জন মিশরীয় কমান্ডো ঘটনাস্থলেই নিহত হন। মিশরের C-130 বিমানটি গ্রাউন্ডেই সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। বহু মিশরীয় সেনা গুরুতর আহত ও বন্দী হন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পুরো সংঘর্ষে সাইপ্রাসের নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো সদস্য নিহত হননি এবং জিম্মি ও সন্ত্রাসীরা অক্ষত ছিল।
পরবর্তীতে সাইপ্রাস সরকারই আলোচনার মাধ্যমে জিম্মিদের মুক্ত করে এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে। এই ঘটনার পর মিশর ও সাইপ্রাসের কূটনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘ সময়ের জন্য ছিন্ন হয়ে যায়।
ইজিপ্ট এয়ার ফ্লাইট ৬৪৮ ট্র্যাজেডি (১৯৮৫)
লারনাকা বিমানবন্দরের ঘটনার ৭ বছর পর, ১৯৮৫ সালে ইউনিট-৭৭৭ আবার বিশ্বমঞ্চে আসে। এবার তারা যে অপারেশনটি চালায়, তা কাউন্টার-টেরোরিজমের ইতিহাসে অন্যতম রক্তক্ষয়ী ও নির্মম জিম্মি উদ্ধার অভিযান হিসেবে পরিচিত।
বিমান ছিনতাই
১৯৮৫ সালের ২৩ নভেম্বর। ইজিপ্ট এয়ারের 'ফ্লাইট ৬৪৮' বিমানটি গ্রিসের এথেন্স থেকে মিশরের কায়রোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। বিমানটিতে ৯২ জন যাত্রী এবং ৬ জন ক্রুসহ মোট ৯৮ জন আরোহী ছিলেন। আকাশে ওড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই কুখ্যাত সন্ত্রাসী আবু নিদাল অর্গানাইজেশনের (ANO) তিনজন ফিলিস্তিনী হাইজ্যাকার বিমানটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।
বিমানের ভেতরে থাকা মিশরের একজন সিকিউরিটি গার্ড সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন এবং গুলি চালিয়ে একজন হাইজ্যাকারকে হত্যা করেন, কিন্তু তিনিও নিজে পাল্টা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান। এই গোলাগুলির কারণে বিমানের বডিতে ছিদ্র হয়ে যায় এবং ভেতরের বাতাসের চাপ কমে যেতে থাকে। ফলে পাইলট বিমানটিকে জরুরি ভিত্তিতে ভূমধ্যসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র মাল্টার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করাতে বাধ্য হন।
মাল্টায় অচলাবস্থা ও সন্ত্রাসীদের নিষ্ঠুরতা
মাল্টা সরকার প্রথমে বিমানটিকে অবতরণের অনুমতি দিতে চায়নি, কিন্তু পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে তারা অনুমতি দেয়। গ্রাউন্ডে মাল্টা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বহুবার নেগোসিয়েশন বা সমঝোতার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু হাইজ্যাকারদের নেতা ওমর রেজাখ অত্যন্ত নৃশংস প্রকৃতির ছিল। সে দাবি করে, বিমানটিতে অনতিবিলম্বে জ্বালানি রিফুয়েলিং করতে হবে, অন্যথায় প্রতি ১০ মিনিট পর পর একজন করে জিম্মিকে হত্যা করা হবে।
সন্ত্রাসীরা তাদের দাবি আদায়ে ইসরায়েলি ও আমেরিকান যাত্রীদের টার্গেট করে। তারা একে একে ৫ জন যাত্রীকে মাথার পেছনে গুলি করে রানওয়েতে ফেলে দেয়, যাদের মধ্যে দুজন অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। এই চরম পরিস্থিতিতে মিশরের সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা আর অপেক্ষা করবে না এবং মাল্টায় তাদের এলিট ফোর্স পাঠাবে।
ইউনিট-৭৭৭ এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের আগমন
মিশরের অনুরোধে মাল্টা সরকার তাদের মাটিতে মিশরীয় কমান্ডোদের অবতরণের অনুমতি দেয়। মিশরের ২৫ জনের একটি বিশেষ ইউনিট এবং চারজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা মাল্টায় পৌঁছান। মার্কিন কর্মকর্তারা মূলত দূর থেকে নজরদারি এবং ইন্টেলিজেন্স সহায়তার জন্য এসেছিলেন। কিন্তু মিশরীয় কমান্ডো দল কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ছাড়াই দ্রুত অ্যাকশনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা প্রায় এক দিন অপেক্ষা করার পর, ২৪ নভেম্বর রাতে কোনো রকম চূড়ান্ত সতর্কতা বা প্রস্তুতি ছাড়াই বিমানটিতে রেইড করার সিদ্ধান্ত নেয়।
সেমটেক্স বিস্ফোরণ এবং বিমানের ভেতরে নরক
মিশরীয় কমান্ডোদের এই অপারেশনের মূল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ছিল চরম আনাড়ি ও অপেশাদারিত্বে ভরা। বিমানের দরজাগুলো খোলার জন্য তারা অত্যন্ত শক্তিশালী সেমটেক্স (Semtex) নামক প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ বা বিস্ফোরক চার্জ ব্যবহার করে।
এই বিস্ফোরণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, দরজা ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি বিমানের ছাদ ও ভেতরের কেবিনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বিস্ফোরণের সাথে সাথেই বিমানের ভেতরে থাকা বেশ কয়েকজন যাত্রী সরাসরি মারা যান এবং বিমানের ইন্টেরিয়রে তাৎক্ষণিকভাবে আগুন ধরে যায়। শুধু তাই নয়, বিমানের বডির নিচের দিক থেকেও আরেকটি বিস্ফোরক চার্জ ব্লাস্ট করা হয়।
পুরো বিমান মুহূর্তের মধ্যে বিষাক্ত ধোঁয়া এবং দাউ দাউ আগুনে ছেয়ে যায়। এই তীব্র আগুন, তাপ এবং ধোঁয়ার যন্ত্রণায় বাঁচার তাগিদে আতঙ্কিত যাত্রীরা তাদের সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ান এবং দরজার দিকে দৌড়াতে শুরু করেন।
নির্বিচারে গুলি ও চূড়ান্ত বিপর্যয়
বিমানের ভেতরে তখন চরম বিশৃঙ্খলা। একদিকে হাইজ্যাকাররা কমান্ডোদের লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়ছিল এবং যাত্রীদের ওপর গুলি চালাচ্ছিল। অন্যদিকে, বিমানের বাইরে পজিশন নেওয়া মিশরের ইউনিট-৭৭৭-এর কমান্ডোরা চরম ভুল করে বসেন। ধোঁয়ার মধ্য থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা আতঙ্কিত যাত্রীদের তারা ভুলবশত হাইজ্যাকার বা সন্ত্রাসী মনে করেন।
কমান্ডোরা বিমানের দরজা ও জানালা দিয়ে ভেতরের দিকে এবং বেরিয়ে আসা যাত্রীদের ওপর নির্বিচারে ব্রাশফায়ার শুরু করে। ভেতরে জ্বলতে থাকা আগুন, সন্ত্রাসীদের গ্রেনেড আর বাইরে থেকে আসা কমান্ডোদের বুলেটের আঘাতে বিমানটি একটি জীবন্ত নরকে পরিণত হয়।
ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান
অপারেশনটি যখন শেষ হয়, তখন যা দেখা গেল তা ছিল এক বিভীষিকাময় দৃশ্য। বিমানের মোট ৯৮ জন আরোহীর মধ্যে ৬০ জন যাত্রীই নিহত হন। নিহতদের মধ্যে বহু নারী ও শিশু ছিল, যারা মূলত বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এবং কমান্ডোদের গুলিতে মারা যান। তিনজন হাইজ্যাকারের মধ্যে দুজন মারা যায় এবং প্রধান হাইজ্যাকার ওমর রেজাখ আহত অবস্থায় ধরা পড়ে।
ইতিহাসে খুব কম জিম্মি উদ্ধার অভিযানই রয়েছে যেখানে উদ্ধারকারী দলের হাতেই এত বিপুল সংখ্যক জিম্মির মৃত্যু হয়েছে। এই অপারেশনের পর বিশ্বজুড়ে ইউনিট-৭৭৭-এর রণকৌশল এবং যোগ্যতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও নিন্দা ঝড় ওঠে।
দুই ঐতিহাসিক ব্যর্থ অপারেশনের তুলনামূলক ছক
নিচে মিশরের ইউনিট-৭৭৭ এর এই দুটি কুখ্যাত অপারেশনের মূল তথ্যগুলো একটি টেবিল ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
বিষয়/প্যারামিটার | অপারেশন ১: সাইপ্রাস লারনাকা বিমানবন্দর (১৯৭৮) | অপারেশন ২: ইজিপ্ট এয়ার flight ৬৪৮ (১৯৮৫) |
তারিখ ও বছর | ১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৮ | ২৪ নভেম্বর, ১৯৮৫ |
স্থান | লারনাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সাইপ্রাস | লুক্কা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, মাল্টা |
মূল লক্ষ্য | ফিলিস্তিনী সন্ত্রাসীদের হাত থেকে জিম্মি উদ্ধার | অপহৃত মিশরীয় বিমানের যাত্রী ও ক্রুদের উদ্ধার |
প্রধান ভিলেন/সন্ত্রাসী গোষ্ঠী | ফিলিস্তিনী সশস্ত্র গোষ্ঠী (আবু নিদাল সংশ্লিষ্ট) | আবু নিদাল অর্গানাইজেশন (ANO) |
কমান্ডোদের প্রধান ভুল | স্বাগতিক দেশের অনুমতি ছাড়া হামলা এবং স্থানীয় বাহিনীর সাথে যুদ্ধ | অতিরিক্ত শক্তিশালী বিস্ফোরক ব্যবহার ও জিম্মিদের ওপর নির্বিচারে গুলি |
মিশরীয় কমান্ডোদের ক্ষয়ক্ষতি | ১৫ জন কমান্ডো নিহত, ১টি C-130 বিমান ধ্বংস | কয়েকজন কমান্ডো আহত, ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমালোচনা |
জিম্মিদের ক্ষয়ক্ষতি | কোনো জিম্মি মারা যায়নি (পরবর্তীতে সাইপ্রাস উদ্ধার করে) | ৬০ জন জিম্মি নিহত (মোট ৯৮ জনের মধ্যে) |
অপারেশনের চূড়ান্ত ফলাফল | সম্পূর্ণ ব্যর্থ এবং কূটনৈতিক বিপর্যয় | চরম বিপর্যয় ও ট্র্যাজেডি (ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী রেইড) |
কেন এই এলিট ফোর্স বারবার ব্যর্থ হয়েছিল?
মিশরের এই স্পেশাল ফোর্সের ব্যর্থতার পেছনে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছেন:
কূটনৈতিক অহংকার ও সমন্বয়হীনতা: সাইপ্রাসের অপারেশনে মিশরীয় সরকার মনে করেছিল তারা যেকোনো দেশে গিয়ে সরাসরি অপারেশন চালিয়ে চলে আসতে পারবে। স্থানীয় আইন বা সামরিক বাহিনীর সাথে কোনো সমন্বয় না করায় নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ বেধে যায়।
গোয়েন্দা তথ্যের অভাব (Poor Intelligence): ১৯৮৫ সালের মাল্টা অপারেশনে বিমানের ভেতরে যাত্রীরা কে কোথায় বসা ছিল, হাইজ্যাকারদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান কী ছিল সে সম্পর্কে কমান্ডোদের কাছে কোনো সঠিক তথ্য ছিল না।
অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ (Excessive Force): জিম্মি উদ্ধারের মূল নীতি হলো সূক্ষ্মতা ও নিখুঁত নিশানা (Precision)। কিন্তু ইউনিট-৭৭৭ বিমানের মতো একটি বন্ধ ও সংবেদনশীল জায়গায় সেমটেক্সের মতো শক্তিশালী এক্সপ্লোসিভ ব্যবহার করে মারাত্মক ভুল করেছিল, যা জিম্মিদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ধৈর্য ও মনস্তাত্ত্বিক দক্ষতার অভাব: কাউন্টার-টেরোরিজম অপারেশনে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের ক্লান্ত করা একটি বড় কৌশল। কিন্তু মিশরের কমান্ডোরা অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ও ওয়ার্নিং ছাড়াই আক্রমণ করে বসেছিল।
পরবর্তী রূপান্তর - শিক্ষা ও আধুনিকায়ন
১৯৮৫ সালের এই ভয়ংকর ট্র্যাজেডির পর মিশরের সামরিক কমান্ড বুঝতে পারে যে, তাদের এই স্পেশাল ফোর্সের পুরো সিস্টেমে বড় ধরনের গলদ রয়েছে। এরপর ইউনিট-৭৭৭-কে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজানো হয়।
নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা আন্তর্জাতিক সহায়তার দ্বারস্থ হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এলিট ফোর্স Delta Force এবং ফ্রান্সের বিখ্যাত কাউন্টার-টেরোরিজম ইউনিট GIGN-এর ট্রেইনারদের এনে ইউনিট-৭৭৭-কে আধুনিক যুদ্ধকৌশল, জিম্মি উদ্ধার ও নিখুঁত অপারেশনের উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
পরবর্তী দশকগুলোতে তারা নিজেদের পুরোনো ইমেজ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় এবং মিশরের অন্যতম প্রধান ও নির্ভরযোগ্য কাউন্টার-টেরোরিজম ইউনিট হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে।
উপসংহার
মিশরের ইউনিট-৭৭৭-এর এই দুটি অপারেশনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সামরিক শক্তি বা ‘এলিট’ তকমা থাকলেই সব অপারেশনে জয়ী হওয়া যায় না। সঠিক পরিকল্পনা, পরিস্থিতি বিবেচনা, সহনশীলতা এবং জিম্মিদের জানমালের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দিলে যেকোনো উদ্ধার অভিযানই একটি নরককুণ্ডে পরিণত হতে পারে। সামরিক ইতিহাসের পাতায় মিশরের এই দুটি অপারেশন আজীবন স্পেশাল ফোর্সগুলোর জন্য একটি ক্লাসিক গাইডবুক বা 'কী করা উচিত নয়' তার অন্যতম বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে।




















