ফকল্যান্ডের যুদ্ধ ১৯৮২: দক্ষিণ আটলান্টিকের বুকে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মর্যাদার লড়াই

দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের হিমশীতল ও উত্তাল তরঙ্গের মাঝে অবস্থিত একটি নির্জন দ্বীপপুঞ্জ ফকল্যান্ড (আর্জেন্টাইনদের কাছে যা ‘লাস মালভিনাস’ নামে পরিচিত)। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন, প্রায় ৭৭৮টি ছোট-বড় দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত এই অঞ্চলটির মোট আয়তন মাত্র ৪,৭০০ বর্গমাইল। এর মধ্যে প্রধান দুটি দ্বীপের নাম পূর্ব ফকল্যান্ড এবং পশ্চিম ফকল্যান্ড।
১৯৮২ সালের প্রাক্কালে এই দ্বীপপুঞ্জের মোট জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১,৮২০ জন মানুষ এবং মানুষের সংখ্যার তুলনায় বহুগুণ বেশি প্রায় ৪ লক্ষ ভেড়া। প্রাকৃতিকভাবে দুর্গম, প্রায় গাছপালাহীন এবং তীব্র বাতাস আক্রান্ত এই শান্ত দ্বীপপুঞ্জকে ঘিরে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম অভাবনীয় ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হবে, তা হয়তো তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির অনেক বিশেষজ্ঞও কল্পনা করতে পারেননি।
কিন্তু ১৯৮২ সালের এপ্রিল মাসে বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে সেখানে বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিই ছিল প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাত, যেখানে অত্যাধুনিক নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী সরাসরি চালকের আসনে থেকে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। একদিকে ছিল স্বৈরাচারী সামরিক জান্তার নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত সূর্য অস্ত না যাওয়া সাবেক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি যুক্তরাজ্য। এটি কেবল ৪,৭০০ বর্গমাইলের কোনো ভৌগোলিক ভূখণ্ডের যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জাতীয় মর্যাদার এক জীবন-মরণ লড়াই।
১৬৯০ থেকে ১৯৮১ - মালিকানার দীর্ঘ দ্বিমুখী টানাপোড়েন
ফকল্যান্ড বা মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ কে প্রথম আবিষ্কার করেছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে আজ অবধি সুনির্দিষ্ট ঐকমত্য তৈরি হয়নি। তবে রেকর্ড অনুযায়ী:
১৬৯০-১৭৬৭: আবিষ্কার, নামকরণ ও ঔপনিবেশিক প্রতিযোগিতা: ফকল্যান্ড বা মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ কে প্রথম আবিষ্কার করেছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ঐকমত্য তৈরি হয়নি। ইংরেজি পর্যটক জন ডেভিস (১৫৯২) কিংবা ওলন্দাজ নাবিক সেবাল্ড ডি উইর্ট (১৬০০) প্রথম এই দ্বীপের সন্ধান পেয়েছিলেন বলে অনেক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তবে লিখিত রেকর্ড অনুযায়ী, ১৬৯০ সালে ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির ক্যাপ্টেন জন স্ট্রং ‘এইচএমএস ওয়েলফেয়ার’ জাহাজে চেপে প্রথম এই দ্বীপে পা রাখেন। তিনি দ্বীপপুঞ্জের মধ্যবর্তী প্রণালীটির নামকরণ করেন তৎকালীন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ৫ম ভিসকাউন্ট ফকল্যান্ড, অ্যান্থনি ক্যারে-এর সম্মানার্থে ‘ফকল্যান্ড সাউন্ড’। পরবর্তীতে পুরো দ্বীপপুঞ্জই ‘ফকল্যান্ডস’ নামে পরিচিতি পায়।
আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে এখানে ফরাসি ও স্প্যানিশদের আগমন ঘটে। ১৭৬৪ সালে ফরাসি অভিযাত্রী লুই-অঁতোয়ান দ্য বুগেনভিল পূর্ব ফকল্যান্ডে প্রথম স্থায়ী বসতি ‘পোর্ট লুইস’ স্থাপন করেন। ফরাসি বন্দর ‘সেন্ট মালো’ (Saint-Malo)-এর নাবিক ও বণিকদের নামানুসারে ফরাসিরা এই দ্বীপের নাম দেয় ‘মালউইনেস’ (Îles Malouines)। এর পরের বছর ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন জন বাইরন পশ্চিম ফকল্যান্ডে এসে ‘পোর্ট এগমন্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ব্রিটেনের সার্বভৌমত্ব দাবি করেন। ১৭৬৭ সালে ফরাসিরা স্পেনের কাছে তাদের বসতি বিক্রি করে দিলে স্প্যানিশরা ফরাসি ‘মালউইনেস’ শব্দটিকে স্প্যানিশ রূপ দিয়ে নাম রাখে ‘মালভিনাস’ (Las Islas Malvinas) এবং ‘পোর্ট লুইস’-এর নাম বদলে রাখে ‘প্যুর্তো সোলেদাদ’।
১৭৭০-১৮৩৩: সংঘাত, কূটনৈতিক সংকট ও ১৮৩৩ সালের ব্রিটিশ দখলদারিত্ব: ১৭৭০ সালে স্প্যানিশ নৌবাহিনী পোর্ট এগমন্ট থেকে ব্রিটিশদের খেদিয়ে দিলে দুই দেশের মধ্যে ‘ফকল্যান্ড সংকট’ তৈরি হয়, যা যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়। ১৭৭১ সালে এক কূটনৈতিক সমঝোতায় ব্রিটেন পোর্ট এগমন্ট ফেরত পেলেও কৌশলগত ও আর্থিক অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের কারণে ১৭৭৪ সালে তারা সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। তবে প্রস্থানকালে একটি ধাতব ফলক রেখে যায়, যেখানে দ্বীপের ওপর যুক্তরাজ্যের অবিরত সার্বভৌমত্ব দাবি করা হয়েছিল।
১৮১৬ সালে স্পেন থেকে আর্জেন্টিনার স্বাধীনতা লাভের পর বুয়েনস আয়ার্স দাবি করে যে, ‘উতি পোসিদেতিস জুরিস’ (Uti possidetis juris) আন্তর্জাতিক আইনি নীতি অনুযায়ী সাবেক স্প্যানিশ ভূখণ্ডের উত্তরসূরি হিসেবে ফকল্যান্ডের মালিকানা আর্জেন্টিনার। ১৮২০ সালে আর্জেন্টাইন ক্যাপ্টেন ডেভিড জিউয়েট দ্বীপে দেশটির পতাকা উত্তোলন করেন এবং ১৮২৯ সালে লুইস ভের্নেতকে ফকল্যান্ডের গভর্নর নিয়োগ করা হয়। ভের্নেত দ্বীপে অবৈধ সিল শিকার নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে মার্কিন জাহাজের সাথে বিরোধে জড়ান, যার জের ধরে ১৮৩১ সালে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস লেক্সিংটন’ আর্জেন্টাইন বসতি তছনছ করে দেয়।
এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে, ১৮৩৩ সালের ৩ জানুয়ারি ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ ‘এইচএমএস ক্লিও’ এর ক্যাপ্টেন জন জেমস অনস্লোর নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী দ্বীপটিতে নামেন। রক্তপাত ছাড়াই তারা আর্জেন্টাইন সামরিক বাহিনীকে দ্বীপ ত্যাগ করতে বাধ্য করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটেনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে একে ‘ব্রিটিশ প্রোটেক্টোরেট’ ও পরবর্তীতে ‘ক্রাউন কলোনি’ হিসেবে ঘোষণা করেন। দক্ষিণ আমেরিকার ভৌগোলিক সান্নিধ্য ও ঐতিহাসিক যুক্তির কারণে আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই এই দখলদারিত্বকে অবৈধ অ্যাখ্যা দিয়ে দ্বীপটিকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে আসছিল।
১৯৪৫-১৯৬৫: জাতিসংঘ ও ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৪৫) পর বিশ্বজুড়ে যখন ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের পতন ঘটছিল এবং জাতিসংঘের মাধ্যমে একের পর এক উপনিবেশ স্বাধীন হচ্ছিল, তখন আর্জেন্টিনা সার্বভৌমত্বের দাবি নতুন করে বৈশ্বিক মঞ্চে তোলে। তারা জাতিসংঘের ‘বিশেষ ঔপনিবেশিকতাবিরোধী কমিটি’ (Decolonization Committee)-র কাছে ব্রিটিশ দখলের বিরুদ্ধে তাদের দাবি নিয়মিতভাবে উপস্থাপন করতে থাকে।
এর ফলে ১৯৬৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ‘রেজোলিউশন ২০৬৫’ গ্রহণ করে। এই প্রস্তাবে ফকল্যান্ড/মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জের ওপর যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যে সার্বভৌমত্ব কেন্দ্রিক বিরোধের কথা স্বীকার করা হয় এবং উভয় দেশকে দ্বীপবাসীর স্বার্থ বজায় রেখে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানানো হয়।
১৯৭০-১৯৮১: লিজব্যাক (Leaseback) প্রস্তাব ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা: ১৯৭০-এর দশকে দুই দেশের মধ্যে কিছু ব্যবহারিক চুক্তি সম্পাদিত হয়, যার অধীনে আর্জেন্টিনা দ্বীপটিতে জ্বালানি ও বিমান পরিষেবা প্রদান শুরু করে। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের সরকার এবং বিশেষ করে পররাষ্ট্র দপ্তরের জুনিয়র মন্ত্রী নিকোলাস রিডলি দ্বীপটির সার্বভৌমত্ব সমাধানের জন্য ‘লিজব্যাক’ (Leaseback) নামক এক বিশেষ প্রস্তাব পেশ করেন। এই পরিকল্পনার মূল বিষয়বস্তু ছিল:
দ্বীপের আনুষ্ঠানিক সার্বভৌমত্ব আর্জেন্টিনার কাছে হস্তান্তর করা হবে।
কিন্তু যুক্তরাজ্য দীর্ঘমেয়াদে (যেমন ৯৯ বছরের জন্য) ইজারা নিয়ে দ্বীপটির শাসনভার ও প্রশাসন পরিচালনা বজায় রাখবে।
তবে এই আলোচনা দুটি প্রধান কারণে ভেস্তে যায়:
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের তীব্র বিরোধিতা: ব্রিটিশ আইনপ্রণেতারা কোনো ধরনের সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরকে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী ও ব্রিটিশ ভূখণ্ডের মর্যাদা ক্ষুণ্নকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে মনে করে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
অধিবাসীদের মতামত ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার: দ্বীপের প্রায় শতভাগ অধিবাসী ছিল ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল যে তারা আর্জেন্টাইন শাসনের অধীনে যাবে না এবং ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ও যুক্তরাজ্যের পতাকাতলেই জীবনযাপন করতে চায়।
এই রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে ১৯৮১ সালের মধ্যে কূটনৈতিক সমস্ত পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, যা পরবর্তী সামরিক উত্তেজনার বীজ বপন করে।

আর্জেন্টিনার 'ডার্টি ওয়ার' ও সামরিক জান্তার বিপজ্জনক চাল
১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার অভ্যন্তরে পরিস্থিতি ছিল চরম অস্বস্তিকর ও টালমাটাল। ১৯৭৪ সাল থেকে দেশটিতে চলছিল ‘ডার্টি ওয়ার’ (Dirty War)। ক্ষমতা দখল করে বসেছিল জেনারেল লিওপোল্ডো গালতিয়েরি-র নেতৃত্বাধীন এক নিষ্ঠুর সামরিক জান্তা।
মানবাধিকার লঙ্ঘন: রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্মমভাবে দমন করা হচ্ছিল। লা প্লাতা নদীতে সামরিক বিমান থেকে হাজার হাজার মানুষকে জীবন্ত ফেলে দিয়ে গুম করা হতো।
অর্থনৈতিক ধস: তীব্র মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং চরম অর্থনৈতিক মন্দায় একসময়ের বিশ্বের অন্যতম ধনী এই দেশটির জনগণ ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছিল।
জনগণের এই তীব ক্ষোভ ও অসন্তোষ থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে এবং জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে জেনারেল গালতিয়েরি এক বিপজ্জনক সামরিক চাল চাললেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আর্জেন্টাইনদের বহুদিনের আবেগ 'লাস মালভিনাস' অস্ত্রের জোরে দখল করে নেবেন।
গ্যালতিয়েরির অ্যাডমিরাল হোর্হে আনিয়া হিসাব করেছিলেন যে, লন্ডন থেকে প্রায় ১৩,০০০ কিলোমিটার দূরের এক নগণ্য দ্বীপের জন্য অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ব্রিটেন যুদ্ধ করতে আসবে না। তারা ভেবেছিলেন, ব্রিটিশ সরকার হয়তো মুখে প্রতিবাদ জানিয়েই ক্ষান্ত হবে। এই ভুল সামরিক গণনার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয় যুদ্ধের ছক।
অপারেশন রোসারিও (Operación Rosario): ১৯৮২ সালের ২ এপ্রিলের আকস্মিক আক্রমণ
১৯৮২ সালের ২ই এপ্রিল ভোরে 'অপারেশন রোসারিও' (যার প্রাথমিক কোডনেম ছিল 'অপারেশন আজুল') নামাঙ্কিত সামরিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে আর্জেন্টাইন সশস্ত্র বাহিনী ফকল্যান্ড দ্বীপে পূর্ণাঙ্গ হামলা চালায়। আর্জেন্টিনার তৎকালীন সামরিক জান্তা প্রধান জেনারেল লিওপোল্দো গালতিয়েরি এবং অ্যাডমিরাল হোর্হে আনায়ার পরিকল্পনায় অভ্যন্তরীণ তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও সরকারবিরোধী আন্দোলন থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতে এই দখলের ছক কষা হয়েছিল।
অভিযানের অংশ হিসেবে আর্জেন্টিনার উভচর রণতরী 'এআরএ কাবো সান আন্তোনিও' এবং ধ্বংসাত্মক যুদ্ধজাহাজ 'এআরএ সান্তিসিমা ত্রিনিদাদ' থেকে প্রায় ৬০০ জন সুসজ্জিত আর্জেন্টাইন কমান্ডো ও পদাতিক সেনা ফকল্যান্ডের মূল ভূখণ্ডে অবতরণ করে। লফটিনেন্ট কমান্ডার গুইলেরমো সানচেজ-সাবোরাতসের নেতৃত্বে কমান্ডোরা দ্রুত দ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পয়েন্টগুলো ঘিরে ফেলে।
সেই সময় ফকল্যান্ডের রাজধানী পোর্ট স্ট্যানলিতে ব্রিটিশ গভর্নর রেক্স হান্টের অধীনে মাত্র ৫৭ জন রয়েল মেরিন সৈন্য, ১১ জন নাবিক এবং কয়েকজন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন ছিলেন। মেজর মাইক নরম্যানের নেতৃত্বে ব্রিটিশ রয়েল মেরিনরা গভর্নর হাউসে প্রতিরোধ ব্যুহ গড়ে তোলে। স্বল্প অস্ত্রশস্ত্র থাকা সত্ত্বেও ব্রিটিশ সেনারা আক্রমণকারীদের সাথে কয়েক ঘণ্টা গোলাগুলি চালায়। এই সংঘাতের সময় আর্জেন্টাইন কমান্ডো দলনেতা লেফটেনেন্ট কমান্ডার পেদ্রো হিয়াকিনো নিহত হন, যিনি ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রথম হতাহত হিসেবে চিহ্নিত। তবে আর্জেন্টাইনদের বিশাল সামরিক বহর, আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (APC) এবং বিমান হামলার হুমকির মুখে বেসামরিক নাগরিকদের রক্তপাত এড়াতে গভর্নর রেক্স হান্ট ব্রিটিশ বাহিনীকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। আর্জেন্টাইন সেনারা গভর্নর হাউস দখল করে নেয়, গভর্নর হান্টকে বন্দি করে যুক্তরাজ্যে ফেরত পাঠায় এবং রাজপথে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা পতাকা উত্তোলন করে দ্বীপটিকে নিজেদের 'মালভিনাস' প্রদেশ হিসেবে ঘোষণার বন্দোবস্ত করে।
এর পরদিনই, অর্থাৎ ৩ই এপ্রিল, পার্শ্ববর্তী সাউথ জর্জিয়া দ্বীপেও আর্জেন্টাইন বাহিনী হামলা চালায়। সেখানে অবস্থানরত ২২ জন ব্রিটিশ রয়েল মেরিন লফটিনেন্ট কিথ মিলসের নেতৃত্বে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং আর্জেন্টিনার একটি যুদ্ধজাহাজ ও একটি হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত করে। পরবর্তীতে বিপুল সংখ্যক আর্জেন্টাইন সেনার কাছে তারাও আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। পুরো আর্জেন্টিনাজুড়ে তখন জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা ও উল্লাসের জোয়ার বয়ে যায়। বুয়েনস আইরেসের প্লাজা দে মায়ো-তে সামরিক জান্তার সমর্থনে রাজপথে নেমে আসে লক্ষাধিক মানুষ, যারা ধরে নিয়েছিল ফকল্যান্ড চিরতরে আর্জেন্টিনার নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে।
‘লৌহ মানবী’ থ্যাচারের পাল্টা আঘাত ও টাস্ক ফোর্স গঠন
আটলান্টিকের দূরবর্তী এক ভূখণ্ডে নিজেদের সার্বভৌমত্বে আঘাত ও ব্রিটিশ নাগরিকদের বন্দি হওয়ার খবর লন্ডনে পৌঁছানো মাত্রই সেখানে নজিরবিহীন রাজনৈতিক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও ভূখণ্ড হারানোর দায় নিয়ে ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড ক্যারিং পদত্যাগ করেন এবং ৩ই এপ্রিল ব্রিটেনের হাউস অফ কমন্সে এক জরুরি অধিবেশন ডাকা হয়।
যুক্তরাজ্যের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, ‘লৌহ মানবী’ (Iron Lady) খ্যাত মার্গারেট থ্যাচার এই ঘটনাকে ব্রিটিশ জাতীয় অপমান হিসেবে গণ্য করেন। তিনি কোনো ধরনের কূটনৈতিক নমনীয়তা দেখাননি। সংসদীয় বিতর্কে রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি নিয়ে থ্যাচার ঘোষণা দেন, “ফকল্যান্ডে অবস্থানরত ব্রিটিশ নাগরিকদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাজ্য যা করা প্রয়োজন ঠিক তাই করবে।” থ্যাচার দ্রুত একটি সামরিক 'ওয়ার ক্যাবিনেট' গঠন করেন এবং সামরিক শক্তি প্রয়োগের চূড়ান্ত নির্দেশ দেন।
কূটনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য অত্যন্ত দ্রুত গতিতে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে:
জাতিসংঘে আন্তর্জাতিক চাপ প্রতিষ্ঠা: ৩ই এপ্রিল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাজ্য 'প্রস্তাব ৫০২' (UN Resolution 502) পাস করাতে সক্ষম হয়। এতে ফকল্যান্ড থেকে অবিলম্বে আর্জেন্টাইন সেনা প্রত্যাহার এবং আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত সমাধানের আহ্বান জানানো হয়। আর্জেন্টিনা এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানালে যুক্তরাজ্য একে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে।
মার্কিন মধ্যস্থতা ও সহযোগিতা: প্রাথমিক অবস্থায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যালেন হেইগ ‘শাটল ডিপ্লোমেসি’র মাধ্যমে যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করলেও থ্যাচারের অটল অবস্থানের কারণে তা ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান সরাসরি ব্রিটেনের পক্ষে অবস্থান নেন এবং ব্রিটিশ বাহিনীকে স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্য ও জ্বালানি সহায়তা প্রদান শুরু করেন।
'অপারেশন কর্পোরেট' ও টাস্ক ফোর্স রওনা: ৫ই এপ্রিল যুক্তরাজ্য 'অপারেশন কর্পোরেট' নামক মূল সামরিক অভিযান শুরু করে। সি-ইন-সি অ্যাডমিরাল স্যার জন ফিল্ডহাউসের সামগ্রিক নেতৃত্বে এবং রিয়ার অ্যাডমিরাল স্যান্ডি উডওয়ার্ডের ফ্ল্যাগশিপ নির্দেশনায় রাজকীয় নৌবাহিনীর বিখ্যাত ‘রয়েল নেভি টাস্ক ফোর্স’ ফকল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।
সামরিক বহরের বিস্তার:
প্রধান রণতরী: ভিটিওল (VTOL) প্রযুক্তি চালিত 'সি হারিয়ার' যুদ্ধবিমান সজ্জিত দুইটি বিমানবাহী জাহাজ 'এইচএমএস হার্মিস' (HMS Hermes) এবং 'এইচএমএস ইনভিন্সিবল' (HMS Invincible)।
বাণিজ্যিক জাহাজের রূপান্তর: সামরিক পরিভাষায় যাকে বলা হয় 'স্টাফট' (STUFT - Ships Taken Up From Trade)। বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজ 'এসএস ক্যানবেরা', বিখ্যাত 'কোয়েন এলিজাবেথ ২' (QE2) এবং কনটেইনার জাহাজ 'এমভি আটলান্টিক কনভেয়ার'-কে দ্রুততম সময়ে সেনাবহন ও কার্গো জাহাজে রূপান্তর করে বহরে যুক্ত করা হয়।
মোট সক্ষমতা: রাজকীয় নৌবাহিনীর ৪৪টি যুদ্ধজাহাজ এবং রূপান্তর করা বিপুল সংখ্যক বেসামরিক নৌযান সহ মোট ১২৭টি জাহাজের এই সামরিক বহরে অবস্থান নেয় প্রায় ২৫,০০০ সেনা ও নৌকর্মী।
১৩,০০০ কিলোমিটারের অভূতপূর্ব লজিস্টিক অভিযান: উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের ব্রিটেন থেকে প্রায় ১৩,০০০ কিলোমিটার (৮,০০০ মাইল) দূরে দক্ষিণ আটলান্টিকের বিষুবরেখা পেরিয়ে বরফশীতল সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পৌঁছানো ছিল আধুনিক সামরিক ইতিহাসের অন্যতম কঠিন লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ। যাত্রাপথে বিষুবরেখার নিকটে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের অধীনস্থ ক্ষুদ্র দ্বীপ 'অ্যাসেনশন আইল্যান্ড' (Ascension Island)-এর ওয়াইডঅ্যাওয়েক বিমানঘাঁটিকে প্রধান রিফুয়েলিং ও লজিস্টিক হাব হিসেবে ব্যবহার করে এই বিশাল টাস্ক ফোর্স দক্ষিণ মহাসাগরের দিকে অগ্রসর হয়।
আকাশ ও সমুদ্রের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ: বিমান, সাবমেরিন ও এক্সোসেট মিসাইল
মে মাসের শুরুতেই ফকল্যান্ডের চারপাশের আকাশ ও সমুদ্র রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। শক্তির বিচারে আর্জেন্টাইন বিমানবাহিনী সংখ্যাগত দিক থেকে বেশ এগিয়ে ছিল। তাদের কাছে ছিল প্রায় ১২২টি যুদ্ধবিমান, যেখানে ব্রিটিশ টাস্ক ফোর্সের ঝুলিতে শুরুতে ছিল মাত্র ৪২টি সি হরিয়ার (Sea Harrier) ও হরিয়ার গ্রাউন্ড অ্যাটাক বিমান।
তবে প্রযুক্তিগত কৌশল এবং প্রশিক্ষণে ব্রিটিশরা এগিয়ে ছিল। যুদ্ধের অন্যতম প্রধান রক্তক্ষয়ী অধ্যায়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
সাউথ জর্জিয়া পুনরুদ্ধার (২৫ এপ্রিল)
ব্রিটিশ টাস্ক ফোর্স মূল দ্বীপে আক্রমণের আগেই সাউথ জর্জিয়া দ্বীপটি ঘিরে ফেলে। তীব্র লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার একটি সাবমেরিন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আর্জেন্টাইন বাহিনী সেখানে আত্মসমর্পণ করে।
জেনারেল বেলগ্রানো ডুবিয়ে দেওয়া (২ মে)
ব্রিটিশ পারমাণবিক সাবমেরিন HMS Conqueror আর্জেন্টিনার অন্যতম প্রধান যুদ্ধজাহাজ ‘এআরএ জেনারেল বেলগ্রানো’ (ARA General Belgrano)-কে লক্ষ্য করে দুটি টর্পেডো নিক্ষেপ করে। জাহাজটি দ্রুত সাগরে তলিয়ে যায়।
এই একটি মাত্র হামলায় প্রায় ৩২৩ জন আর্জেন্টাইন নাবিক প্রাণ হারান (যা যুদ্ধে আর্জেন্টিনার মোট প্রাণহানির অর্ধেকেরও বেশি)। এই ঘটনার পর আর্জেন্টিনার নৌবাহিনী তাদের প্রধান জাহাজগুলোকে উপকূলে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
শেফিল্ড ও ব্রিটিশ জাহাজে এক্সোসেট হামলা (৪ মে - ২৫ মে)
জেনারেল বেলগ্রানো ডোবানোর প্রতিশোধ নিতে ক্ষিপ্ত আর্জেন্টাইন বিমানবাহিনী ফরাসি প্রযুক্তির ‘এক্সোসেট’ (Exocet) ভীতি সৃষ্টি করে।
৪ মে আর্জেন্টাইন সুপার এটেনডার্ড বিমান থেকে ছোঁড়া এক্সোসেট মিসাইলের আঘাতে ধ্বংস হয় আধুনিক ব্রিটিশ ধ্বংসকারী জাহাজ HMS Sheffield।
এরপর ২১ মে HMS Ardent, ২৪ মে HMS Antelope, এবং ২৫ মে HMS Coventry ও বাণিজ্যিক রসদবাহী জাহাজ MV Atlantic Conveyor আর্জেন্টাইন বিমান হামলায় সলিল সমাধি লাভ করে।
আর্জেন্টাইন পাইলটরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একেবারে সমুদ্রের জল ঘেঁষে উড়ে এসে (Low-level bombing) ব্রিটিশ জাহাজে বোমাবর্ষণ করছিল, যা বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে এক সাহসিকতার নজির হিসেবে দেখা হয়।
পদাতিক লড়াই ও পোর্ট স্ট্যানলি দখল
আকাশ ও সমুদ্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর ব্রিটিশ কমান্ডারেরা বুঝতে পারেন, বিমান হামলায় ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হলে দ্বীপে সরাসরি পদাতিক সেনা নামিয়ে আর্জেন্টাইন বিমানঘাঁটি ও রসদ ব্যবস্থা গুটিয়ে দিতে হবে।
আর্জেন্টাইন বিমানগুলোর দূরপাল্লার ক্ষমতা ছিল না; তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে উড়ে এসে আক্রমণ করতে হতো অথবা ফকল্যান্ডের রাজধানী পোর্ট স্ট্যানলির রানওয়ে ব্যবহার করতে হতো।
২১ মে: সান কার্লোস অবতরণ ➔ ২৭ মে: গুজ গ্রীনের যুদ্ধ ➔ ১১-১৩ জুন: মাউন্ট লংডন ও টাম্বলডাউন ➔ ১৪ জুন: মেনেন্দেজ-এর আত্মসমর্পণ
সান কার্লোসে সেনা অবতরণ (২১ মে)
ব্রিটিশ সেনারা 'সান কার্লোস ওয়াটার' নামক স্থানে সফলভাবে প্রায় ৫,০০০ পদাতিক সৈন্য নামায়। একে ব্রিটিশরা বলতো 'বোমা অ্যালি', কারণ অবতরণের সময়ও আর্জেন্টাইন বিমানগুলো অনবরত বোমা বর্ষণ করছিল।
গুজ গ্রীনের যুদ্ধ (২৭-২৮ মে)
এটি ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রথম বড় ধরনের স্থলযুদ্ধ। ব্রিটিশ ২য় ব্যাটালিয়ন প্যারাশুট রেজিমেন্ট কম সেনা নিয়েও প্রায় দ্বিগুণ আর্জেন্টাইন সেনাকে পরাজিত করে গুজ গ্রীন এলাকা দখল করে নেয়। এই লড়াইয়ে ব্রিটিশ কমান্ডার প্রাতঃস্মরণীয় কর্নেল এইচ. জোন্স শহীদ হন।
ব্লাফ কোভ বিপর্যয় (৮ জুন)
লজিস্টিক স্থানান্তরের সময় ব্লাফ কোভের কাছে ব্রিটিশ অবতরণকারী জাহাজ Sir Galahad ও Sir Tristram-এর ওপর আর্জেন্টাইন স্কাইহক বিমানগুলো মারাত্মক হামলা চালায়। এতে ৫৬ জন ব্রিটিশ সৈন্য নিহত এবং দেড় শতাধিক দগ্ধ ও আহত হন।
চূড়ান্ত লড়াই: মাউন্ট লংডন, মাউন্ট হ্যারিয়েট ও টাম্বলডাউন (১১-১৩ জুন)
রাজধানী পোর্ট স্ট্যানলি ঘিরে রেখেছিল পাহাড়ি ধারাবাহিক শৃঙ্গ। কনকনে শীত, কর্দমাক্ত পথ, মাইনফিল্ড এবং তীব্র তুষারপাতের মধ্যে ১১ থেকে ১৩ই জুন রাতের অন্ধকারে রক্তক্ষয়ী মুখোমুখি যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
মাউন্ট লংডনের যুদ্ধ: দুই পক্ষের মধ্যে বেয়োনেট ও হাতাহাতি লড়াই হয়।
মাউন্ট টাম্বলডাউন: স্কটল্যান্ড ও গুর্খা রেজিমেন্টের সেনারা মাউন্ট টাম্বলডাউন দখল করে নিলে আর্জেন্টাইন বাহিনীর প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ (১৪ জুন ১৯৮২)
পাহাড়ি প্রতিরক্ষা ব্যূহ হারিয়ে এবং রসদ ও গোলাবারুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় আর্জেন্টাইন কমান্ডার মেজর জেনারেল মারিও মেনেন্দেজ আর লড়াই না করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৪ই জুন ১৯৮২ সালে তিনি ব্রিটিশ কমান্ডার মেজর জেনারেল জেরেমি মুর-এর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ৮,০০০-এরও বেশি আর্জেন্টাইন সৈন্যসহ আত্মসমর্পণ করেন।
এর মাধ্যমেই দীর্ঘ ৭৩ দিনের রক্তক্ষয়ী ফকল্যান্ড যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
যুদ্ধের সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি ও সামরিক তথ্যাবলী (The Casualty & Asset Matrix)
ফকল্যান্ডের ৭৩ দিনের সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র যুদ্ধে উভয় পক্ষেরই বিপুল পরিমাণ মানবসম্পদ ও সামরিক সরঞ্জামের ক্ষতি হয়েছিল। নিচে একটি বিস্তারিত তুলনামূলক তথ্যচিত্র দেওয়া হলো:
সামরিক ও অর্থনৈতিক সূচক | যুক্তরাজ্য (গ্রেট ব্রিটেন) | আর্জেন্টিনা |
মোট মোতায়েনকৃত সেনা | প্রায় ২৫,০০০ জন (টাস্ক ফোর্সসহ) | প্রায় ১৩,০০০ জন |
নিহত সৈন্য সংখ্যা | ২৫৫ জন | ৬৪৯ জন |
আহত সৈন্য সংখ্যা | ৭৫৫ জন | ১,০৮৭ জন |
যুদ্ধবন্দী | আনুমানিক ১১৫ জন | ১১,৪০০ জনের বেশি |
জাহাজ/রণতরী ধ্বংস | ৭টি ধ্বংস (যেমন: Sheffield, Coventry, Atlantic Conveyor) | ৯টি ধ্বংস (যেমন: General Belgrano, Santa Fe সাবমেরিন) |
ধ্বংসপ্রাপ্ত যুদ্ধবিমান/হেলিকপ্টার | ২৪টি হেলিকপ্টার, ১০-১১টি হরিয়ার বিমান | ৭৫টি যুদ্ধবিমান, ২৫টি হেলিকপ্টার |
প্রধান সামরিক কমান্ডার | এডমিরাল স্যার জন ফিল্ডহাউস, জেনারেল জেরেমি মুর | জেনারেল লিওপোল্ডো গালতিয়েরি, জেনারেল মারিও মেনেন্দেজ |
রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্ব | প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার | সামরিক জান্তা প্রধান লিওপোল্ডো গালতিয়েরি |
ভূ-রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
ফকল্যান্ড যুদ্ধের ফলাফল কেবল দক্ষিণ আটলান্টিকের ভৌগোলিক মানচিত্রকেই প্রভাবিত করেনি; এটি যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনা উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জাতীয় সংস্কৃতিতে গভীর দাগ কেটে গেছে।
যুক্তরাজ্য: থ্যাচারের রাজনৈতিক পুনর্জন্ম
যুদ্ধের আগে মার্গারেট থ্যাচারের অর্থনৈতিক নীতির কারণে যুক্তরাজ্যে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং কনজারভেটিভ দলের জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। কিন্তু ফকল্যান্ড যুদ্ধে বিজয়ের পর যুক্তরাজ্যে তীব্র জাতীয়তাবাদী জোয়ার তৈরি হয়।
থ্যাচারকে 'বীর' হিসেবে দেখা হতে থাকে। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের ওপর ভর করে ১৯৮৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে মার্গারেট থ্যাচার ও তাঁর কনজারভেটিভ পার্টি এক বিশাল ব্যবধানে পুনর্নির্বাচিত হয় এবং পরবর্তী এক দশক যুক্তরাজ্য শাসন করে।
আর্জেন্টিনা: স্বৈরাচারের পতন ও গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন
যুদ্ধের পরাজয়কে আর্জেন্টাইন জাতি একটি চরম জাতীয় অপমান হিসেবে গ্রহণ করে। সামরিক বাহিনীর যে ভাবমূর্তি দেশে ছিল, তা চুরমার হয়ে যায়।
ক্ষুব্ধ জনতা বুয়েনস আইরেসের রাজপথে নেমে আসে। যুদ্ধের পরাজয়ের মাত্র তিন দিনের মাথায় ১৮ জুন ১৯৮২ সালে সামরিক জান্তা প্রধান জেনারেল গালতিয়েরি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
এর পরদিনই ১৯৮৩ সালে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যার মাধ্যমে আর্জেন্টিনায় সামরিক জান্তার পতনের মাধ্যমে পুনরায় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন ঘটে।
যুদ্ধের ফলাফল: ১৪ই জুন ➔ লন্ডন: থ্যাচারের ১৯৮৩ পুনর্নির্বাচন ➔ বুয়েনস আইরেস: সামরিক জান্তার ধস ও গণতন্ত্র
ফুটবল ও ঐতিহাসিক প্রতিশোধ: ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও ১৯৮৬ বিশ্বকাপ
আর্জেন্টাইনদের মনে ফকল্যান্ড/মালভিনাস হারের ক্ষত কতটা গভীর ছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে ক্রীড়াজগতে।
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। সেই ম্যাচে ফুটবল ঈশ্বর ডিয়েগো ম্যারাডোনা একাই দুটি ঐতিহাসিক গোল করেছিলেন একটি বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ (Hand of God) এবং অন্যটি শতাব্দীর সেরা একক ড্রিবলিং গোল।
ম্যারাডোনা তাঁর আত্মজীবনী ‘আই অ্যাম এল ডিয়েগো’-তে স্পষ্ট লিখেছিলেন:
“আমরা ম্যাচের আগে বলছিলাম ফুটবল আর রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই; কিন্তু তা ছিল মিথ্যা। আমরা ফকল্যান্ডে আমাদের ছেলেদের মৃত্যুর কথা ভুলিনি। ওই জয়টি ছিল ফুটবল খেলায় আমাদের বন্ধুদের রক্তের এক প্রতীকী প্রতিশোধ।”
সমসাময়িক রাজনৈতিক দাবি
আজও আর্জেন্টিনায় ফকল্যান্ড বা মালভিনাস অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও আবেগঘন একটি বিষয়। সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি আর্জেন্টাইন সরকার মালভিনাসের ওপর দাবি বজায় রাখতে বাধ্য। ২০১৩ সালেও আর্জেন্টিনার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ দে কির্চনার যুক্তরাজ্যকে ফকল্যান্ড ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছিলেন।
তবে ২০১৩ সালেই ফকল্যান্ডের অধিবাসীদের মধ্যে একটি গণভোট (Referendum) আয়োজন করা হয়। সেই ভোটে ৯৯.৮% মানুষ যুক্তরাজ্যের নাগরিক হিসেবে থাকার পক্ষেই মতামত প্রদান করেন, যা আন্তর্জাতিক আইনি অঙ্গনে যুক্তরাজ্যের অবস্থানকে অত্যন্ত শক্ত করে তুলেছে।
একালের আয়নায় ফকল্যান্ডের শিক্ষা
ফকল্যান্ডের যুদ্ধ বিংশ শতাব্দীর সামরিক ইতিহাসে একটি বিরল উদাহরণ। এটি আমাদের শেখায়-
কোনো স্বৈরাচারী শাসক যখন নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ঢাকতে কৃত্রিম জাতীয়তাবাদ ও যুদ্ধের উসকানি দেয়, তার পরিণতি শেষ পর্যন্ত নিজের দেশের জন্যই ধ্বংসাত্মক হয়।
আধুনিক নৌ ও আকাশ যুদ্ধ এবং ভৌগোলিক দূরত্বের চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে কীভাবে পেশাদারিত্ব দিয়ে লক্ষ্য অর্জন করা যায়, তার একটি টেক্সটবুক উদাহরণ ছিল ব্রিটিশ টাস্ক ফোর্সের এই অভিযান।
আজও ফকল্যান্ডের রুক্ষ পাহাড়ে বা শান্ত নদীর পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, পরিত্যক্ত মাইনফিল্ড এবং নিহত সৈনিকদের সমাধি। আটলান্টিকের বাতাস আজও যেন সেই ২৫৫ জন ব্রিটিশ এবং ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন তরুণ সেনার আত্মত্যাগের গল্প শুনিয়ে যায় যারা দুই দেশের রাজনৈতিক অহংকার ও মর্যাদার লড়াইয়ে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন।























