জুলাইবীব (রা.) - ইতিহাসের এক উপেক্ষিত বীর ও নবীজির পরম ভালোবাসা
এক রক্তিম গোধূলির বিষণ্ণতা পড়ন্ত বিকেল। দিগন্তরেখায় সূর্যটা তখন পাটে বসছে। যুদ্ধের দামামা মাত্র থেমেছে, কিন্তু বাতাসের ভার কমেনি। মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশি তখনো উত্তপ্ত, যেন আগ্নেয়গিরির লাভা মিশে আছে সেখানে। চারদিকে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, যা কেবল মাঝে মাঝে আহত যোদ্ধাদের অস্ফুট গোঙানি আর বাতাসের দীর্ঘশ্বাসে ভেঙে যাচ্ছে। আকাশটা লালে লাল হয়ে আছে ঠিক যেন রণক্ষেত্রের মাটিটার মতোই রক্তিম এবং বিষণ্ণ।
শহিদদের পবিত্র রক্তে মদিনার ধূসর মরুভূমি আজ রঞ্জিত। সাহাবীরা ব্যস্ত কেউ নিজের ভাই খুঁজছেন, কেউ খুঁজছেন আপন গোত্রের সর্দারকে। এরই মাঝে ইতিহাসের এক অনন্য দৃশ্য রচিত হতে যাচ্ছে, যা কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বাসী হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি করবে।
এই পৃথিবীর ইতিহাস সাধারণত বিজয়ীদের কথা বলে, প্রভাবশালীদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখে। কিন্তু ইতিহাসের ধুলোবালি মাখা পাতায় এমন কিছু মানুষের গল্প লুকিয়ে আছে, যারা দুনিয়ার চোখে ছিলেন নগণ্য, অথচ আসমানের অধিবাসীদের কাছে ছিলেন অতি পরিচিত। এমনই এক মহিমান্বিত ও হৃদয়স্পর্শী উপাখ্যান হলো সাহাবী জুলাইবীব (রা.)-এর জীবন।
কে ছিলেন এই জুলাইবীব (রা.)?
মদিনার সমাজে জুলাইবীব (রা.) ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাকে সাধারণ দৃষ্টিতে কেউ ‘গুরুত্বপূর্ণ’ মনে করত না। তাঁর কোনো প্রভাবশালী বংশীয় পরিচয় ছিল না, ছিল না অগাধ ধন-সম্পদ। তিনি ছিলেন খাটো গড়নের, গায়ের রং ছিল মিশমিশে কালো, আর চেহারায় ছিল না কোনো বাহ্যিক চাকচিক্য।
তৎকালীন আরব সমাজে বংশমর্যাদা আর বাহ্যিক সৌন্দর্যই ছিল মানুষের মাপকাঠি। জুলাইবীব (রা.) ছিলেন এসবের ঊর্ধ্বে এক ‘অপরিচিত’ পথিক। মদিনার অলিতে-গলিতে তিনি একা একা হাঁটতেন। একা খেতেন, একা থাকতেন। তাঁর থাকা বা না-থাকার খবর নেওয়ার মতো মানুষের বড্ড অভাব ছিল। কিন্তু তাঁর বুকে ছিল এক জ্বলন্ত ঈমান এবং প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি অগাধ ভালোবাসা।
নবীজির দৃষ্টিতে জুলাইবীব - এক সামাজিক বিপ্লব
ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি মানুষের বাহ্যিক রূপ নয়, বরং অন্তরের তাকওয়া দেখে। নবীজি (সা.) প্রায়ই জুলাইবীবের খোঁজ নিতেন। একবার নবীজি (সা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে জুলাইবীব! তুমি কি বিয়ে করবে না?"
জুলাইবীব (রা.) অত্যন্ত লাজুক হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমার মতো সম্পদহীন আর রূপহীন মানুষকে কে বিয়ে করবে? বাজারে তো আমার কোনো দাম নেই।"
নবীজি (সা.) তখন এক অমর বাণী উচ্চারণ করেছিলেন: "জুলাইবীব! মানুষের বাজারে তোমার দাম না থাকতে পারে, কিন্তু আল্লাহর কাছে তোমার দাম অনেক বেশি।"
পরবর্তীতে নবীজি (সা.) নিজে দাঁড়িয়ে থেকে মদিনার এক আনসারী পরিবারের সুন্দরী ও গুণবতী কন্যার সাথে তাঁর বিয়ের ব্যবস্থা করেন। সেই আনসারী মেয়েটিও ছিল এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যখন তার বাবা-মা জুলাইবীবের দারিদ্র্য আর চেহারা দেখে দ্বিধায় ছিলেন, তখন সেই মেয়েটি বলেছিল, "রাসূলুল্লাহ (সা.) যার প্রস্তাব দিয়েছেন, তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।" এটি ছিল ইসলামের সেই সামাজিক সাম্যের চিত্র, যেখানে জুলাইবীবের মতো ‘উপেক্ষিত’ মানুষকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল।
রণক্ষেত্রের সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্ত
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সাহাবীদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি আর বিষাদ কাজ করছিল। প্রথা অনুযায়ী নবীজি (সা.) সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কি কাউকে হারিয়েছ?" সাহাবীরা একে একে বড় বড় বংশের বীরদের নাম বললেন। অমুক বীর শহিদ হয়েছেন, অমুক গোত্রের নেতাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নবীজি (সা.) শান্তভাবে সব শুনলেন। কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবারও জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কি আর কাউকে হারিয়েছ?" সাহাবীরা আবারও কিছু পরিচিত নাম বললেন। তাঁরা ভাবছিলেন, নবীজি হয়তো বড় কোনো সেনাপতি বা নামকরা কোনো সাহাবীর কথা বলছেন। কিন্তু নবীজি (সা.) তখন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর পবিত্র কণ্ঠে এক গভীর হাহাকার ফুটে উঠল। তিনি বললেন:
"কিন্তু আমি যে আমার জুলাইবীবকে খুঁজে পাচ্ছি না! তোমরা আমার জুলাইবীবকে খুঁজে বের করো।"
সবাই চমকে উঠলেন। জুলাইবীব? ওই সাধারণ মানুষটা? যার অনুপস্থিতি কেউ টেরই পায়নি, তাকে খোঁজার জন্য স্বয়ং বিশ্বনবীর এই আকুতি!
"সে আমার... আর আমি তার"
খুঁজতে খুঁজতে রণক্ষেত্রের এক প্রান্তে জুলাইবীব (রা.)-এর দেহ পাওয়া গেল। দৃশ্যটি দেখে সাহাবীদের চোখ ভিজে এল। জুলাইবীবের নিথর দেহের পাশে পড়ে আছে সাতজন কাফেরের লাশ। অর্থাৎ, শহিদ হওয়ার আগে এই সাধারণ গড়নের মানুষটি একাই সাতজন শত্রুকে যমপুরে পাঠিয়েছিলেন।
সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত, ধুলো আর রক্তে মাখামাখি হয়ে তিনি পড়ে আছেন পাথুরে মাটিতে। খবর পেয়ে নবীজি (সা.) নিজে ছুটে এলেন। তিনি দাঁড়িয়ে থাকলেন না। যেই মাটির ওপর জুলাইবীব পড়ে ছিলেন, সেখানেই নবীজি পরম মমতায় বসে পড়লেন।
তিনি নিজের হাত দিয়ে জুলাইবীবের মুখের ধুলো ঝেড়ে দিলেন। তারপর শহিদ জুলাইবীবের মাথাটা তুলে নিজের পবিত্র হাঁটুর ওপর রাখলেন। যেন কত কালের চেনা আপনজন। যেন জুলাইবীবের জীবনের সব একাকিত্ব আর অবহেলা আজ তিনি মিটিয়ে দেবেন। সূর্যের শেষ আলোয় নবীজির চোখ চিকচিক করে উঠল। তিনি জুলাইবীবের নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন:
"তুমি একাই সাতজনকে মেরেছ... তারপর শহিদ হয়েছ?"
এরপর তিনি আকাশের দিকে তাকালেন, তারপর আবার জুলাইবীবের দিকে। ভাঙা গলায়, গভীর আবেগে দুবার বললেন:
"সে আমার... আর আমি তার। সে আমার... আর আমি তার।" (হাযা মিন্নী ওয়া আনা মিনহু)
জুলাইবীব (রা.)-এর গল্পের আধ্যাত্মিক শিক্ষা
জুলাইবীবের এই গল্পটি কেবল একটি শোকাতুর কাহিনী নয়, বরং এটি আমাদের জীবনের অনেক বড় এক দর্শন শেখায়:
সাফল্যের সংজ্ঞার পরিবর্তন: দুনিয়া যাকে ‘ব্যর্থ’ বা ‘মূল্যহীন’ মনে করে, আল্লাহর কাছে সে-ই হতে পারে জান্নাতের রাজপুত্র।
একাকিত্বের অবসান: জুলাইবীব (রা.) হয়তো সারাজীবন মানুষের অবহেলাই পেয়েছিলেন। সমাজ তাঁকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল, কিন্তু মৃত্যুর পর তিনি পেলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষের শ্রেষ্ঠতম ভালোবাসা।
নবীজির নিঃস্বার্থ প্রেম: নবীজি (সা.) কেবল বড়দের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন জুলাইবীবের মতো নিঃস্বার্থ প্রেমিকের পরম আশ্রয়।
আপনি কি নিজেকে একা ভাবছেন?
আমাদের আধুনিক জীবনে আমরা অনেকেই মাঝেমধ্যে খুব একা বোধ করি। মনে হয় এই বিশাল পৃথিবীতে আমি খুব তুচ্ছ। আমার টাকা নেই, ক্ষমতা নেই বা বাহ্যিক সৌন্দর্য নেই বলে হয়তো কেউ আমাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। আমাদের চারপাশের মানুষ যখন আমাদের যোগ্যতাকে কেবল বাহ্যিক মাপকাঠিতে বিচার করে, তখন আমাদের বুক ফেটে কান্না আসে।
তখন জুলাইবীব (রা.)-এর এই গল্পটা কানে কানে বলে যায়: দুনিয়া তোমাকে না গুনুক, মদিনার সেই মানুষটা তোমাকে ভোলেননি। তুমি তাঁর আদর্শ বুকে ধরে রাখলে, তুমিও তাঁর ‘আপনার জন’ হতে পারবে।
জান্নাতের সেই নীরব তারকা
জুলাইবীব (রা.)-এর জানাজা যখন পড়া হয়েছিল, তখন আকাশ থেকে হাজারো ফেরেশতা নেমে এসেছিল সেই মিছিলে যোগ দিতে। যিনি পৃথিবীতে একা হাঁটতেন, কবরে যাওয়ার সময় তাঁর সাথে ছিল সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ মানব এবং আসমানের ফেরেশতারা।
ইতিহাস সাক্ষী, মানুষের দেওয়া সম্মান সাময়িক, কিন্তু নবীজির (সা.) দেওয়া এই স্বীকৃতি "সে আমার আর আমি তার" হলো অনন্তকালের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আমাদের জীবনও যদি জুলাইবীবের মতো ইশক ও ইখলাসে পূর্ণ হয়, তবে পরকালের সেই কঠিন দিনে আমরাও হয়তো নবীজির সেই পরম মমতার স্পর্শ পাব।
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।




















