ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান – মুক্তিযুদ্ধের এক অকুতোভয় বীর

Aug 20, 2025

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে কিছু নাম চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। তাদের মধ্যে একজন হলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান। একজন পাইলট, একজন দেশপ্রেমিক, একজন সাহসী যোদ্ধা, যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মাতৃভূমির মুক্তির জন্য। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি অমর নাম। ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের করাচি শহরের মাশরুর বিমানঘাঁটি থেকে একটি সামরিক বিমান ছিনতাই করে পালিয়ে আসার চেষ্টাকালে তিনি প্রাণ হারান। তার এই আত্মত্যাগ শুধু একটি ব্যক্তিগত সাহসিকতার গল্প নয় বরং এটি ছিল আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের এক অনন্য প্রচেষ্টা। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক অকুতোভয় বীর।

তিনি ছিলেন আপাদমস্তক সাহসী, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ একজন যোদ্ধা, যিনি নিজের জীবন, পরিবার এবং সবকিছু বিসর্জন দিয়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন। তাঁর এই অসাধারণ কীর্তি বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ন্যায্যতাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরে। এই নিবন্ধে মতিউর রহমানের জীবন, তাঁর সাহসী পরিকল্পনা এবং তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

মতিউর রহমানের পেশাগত জীবন

মতিউর রহমান ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর ঢাকার আগা সাদেক রোডে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মৌলভী মোহাম্মদ মিয়া ছিলেন একজন সম্মানিত শিক্ষক। মতিউর ছোটবেলা থেকেই ছিলেন বুদ্ধিমান ও সাহসী। তিনি ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং পরে পাকিস্তান এয়ার ফোর্সে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালে তিনি পাকিস্তান এয়ার ফোর্স অ্যাকাডেমি থেকে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। তিনি একজন দক্ষ পাইলট এবং প্রশিক্ষক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
মতিউরের ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন দায়িত্বশীল স্বামী ও পিতা। তাঁর স্ত্রী মিলি রহমান এবং দুই কন্যা, মাহিন ও তুহিন, ছিল তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু দেশের দুর্দিনে তিনি পরিবারের চেয়ে দেশকে প্রাধান্য দেন। মতিউর রহমানের দেশপ্রেম এতটাই গভীর ছিল যে তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি ও মতিউরের প্রস্তুতি

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে, যা বাঙালি জনগণের উপর নির্মম গণহত্যার সূচনা করে। এই সময় মতিউর রহমান ছুটিতে তাঁর গ্রামের বাড়ি রামনগরে ছিলেন। তিনি ২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন নাসিম এবং লেফটেন্যান্ট হেলালের সঙ্গে দেখা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। তবে একজন পাইলট হিসেবে স্থলযুদ্ধে তাঁর অবদান সীমিত হবে ভেবে তিনি একটি বড় পরিকল্পনা নিয়ে পাকিস্তানে ফিরে যান।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তখন মুক্তিযুদ্ধকে একটি ‘অভ্যন্তরীণ সংকট’ হিসেবে প্রচার করছিল। বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এমন একটি ঘটনা প্রয়োজন ছিল, যা পাকিস্তানের দাবিকে ভুল প্রমাণ করবে। মতিউর এই সুযোগে একটি সামরিক বিমান ছিনতাই করে ভারতে পৌঁছে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বাঙালি পাইলটদের গ্রাউন্ডেড করে রেখেছিল এবং তাদের উপর কড়া নজরদারি রাখছিল। মতিউর তাঁর পরিবারকে ভারতীয় দূতাবাসে পাঠিয়ে নিরাপদে রাখেন এবং নিজে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত হন।

বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা

১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট সকাল ১১টা ২৮ মিনিটে করাচির মাশরুর বিমানঘাঁটির এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারে একটি অস্বাভাবিক বার্তা ভেসে আসে “ব্লুবার্ড ওয়ান সিক্স সিক্স ইজ হাইজ্যাকড…”। এই বার্তার সঙ্গে সঙ্গে বিমানঘাঁটিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আসেম রশীদ যিনি তখন কন্ট্রোল টাওয়ারে ছিলেন, এই বার্তা শুনে হতবাক হয়ে যান। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান, যার কলসাইন ছিল ‘ব্লুবার্ড-১৬৬’, রানওয়ে থেকে উড্ডয়ন করে। নিয়ম অনুযায়ী ডানদিকে মোড় নেওয়ার পরিবর্তে এটি বাঁদিকে মোড় নিয়ে খুব নিচু দিয়ে উড়ে ভারতের দিকে অগ্রসর হয়।

মতিউর রহমান সেদিন সকালে তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পাইলট অফিসার রশীদ মিনহাজকে টার্গেট করেন। মিনহাজ ছিলেন তাঁর ছাত্র এবং তিনি তার সেফটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সকালে আবহাওয়া খারাপ থাকায় প্রশিক্ষণ উড্ডয়ন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু ১১টার দিকে আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়। মতিউর এই সুযোগ কাজে লাগান। মিনহাজের বিমান ট্যাক্সিংয়ের সময় তিনি ক্যানোপি খোলা অবস্থায় বিমানের পাখায় লাফিয়ে উঠে দ্বিতীয় আসনে বসে পড়েন। এরপর তিনি ক্লোরোফর্ম ভেজানো রুমাল দিয়ে মিনহাজকে অজ্ঞান করার চেষ্টা করেন। মিনহাজ জ্ঞান হারানোর আগে কন্ট্রোল টাওয়ারে বিমান ছিনতাইয়ের বার্তা পাঠিয়ে দেন।

মতিউর রাডারকে ফাঁকি দিতে খুব নিচু দিয়ে বিমান চালান। পাকিস্তানি বিমানবাহিনী তাঁর পিছনে চারটি যুদ্ধবিমান পাঠায়। এই সময় মিনহাজের সঙ্গে ধস্তাধস্তি চলতে থাকে। এক পর্যায়ে মিনহাজ ইজেক্ট সুইচ চাপলে বিমান থেকে মতিউর ছিটকে পড়েন। বিমানটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে পাকিস্তানের থাট্টা এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। মতিউরের প্যারাসুট না থাকায় তিনি ঘটনাস্থল থেকে আধা মাইল দূরে শহীদ হন। মতিউর ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র তিন মিনিটের দূরত্বে ছিলেন, যা তাঁর পরিকল্পনার প্রায় সফলতার ইঙ্গিত দেয়।

ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান - মুক্তিযুদ্ধের এক অকুতোভয় বীর

ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান – মুক্তিযুদ্ধের এক অকুতোভয় বীর

মতিউর রহমানের দাফন ও পুনঃসমাধি

শহীদ মতিউর রহমানের মৃতদেহ পাকিস্তানিরা মাশরুর বিমানঘাঁটির চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের কবরস্থানে দাফন করে। তার স্ত্রী মিলি রহমান ও দুই শিশুকন্যা মাহিন ও তুহিনকে এক মাস আটক রাখা হয়। মতিউর রহমানের দেহাবশেষ ২০০৬ সালের ২৩ জুন পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ২৫ জুন তাঁকে ঢাকার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় পুনরায় দাফন করা হয়।

তাঁর এই সাহসী প্রচেষ্টা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৭১ সালে তাঁর এই কীর্তি বিশ্ব মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার পায়, যা পাকিস্তানের দাবিকে দুর্বল করে এবং মুক্তিযুদ্ধের ন্যায্যতাকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। মতিউরের বিমান ছিনতাইয়ের প্রচেষ্টা বিশ্বের কাছে প্রমাণ করে যে বাঙালিরা তাদের স্বাধীনতার জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত।

সম্মাননা ও উত্তরাধিকার

মতিউর রহমানকে মরণোত্তর ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করা হয়, যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান। তাঁর নামে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি ঘাঁটি ‘বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ঘাঁটি’ নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়াও ঢাকা এবং অন্যান্য শহরে তাঁর নামে রাস্তা ও স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। বাংলাদেশ এয়ারফোর্স তার নামে একটি ট্রফি প্রদান করে সেরা ফ্লাইং ট্রেইনি অফিসারকে। মতিউরের জীবন ও ত্যাগ বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি প্রেরণার উৎস।

সমাজে মতিউর রহমানের সাহসিকতা

মতিউর রহমানের সাহসী কীর্তি শুধু সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রমাণ করেছেন যে যুদ্ধ শুধু রণাঙ্গনে রাইফেল হাতে নয়, বুদ্ধি, সাহস এবং কৌশল দিয়েও লড়া যায়। তাঁর এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক শক্তিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। মতিউর রহমানের ত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

তাঁর জীবন নিয়ে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি বই, প্রামাণ্যচিত্র এবং নাটক নির্মিত হয়েছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী তাঁর জীবনীভিত্তিক একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করে, যা তরুণদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগানোর লক্ষ্যে নির্মিত হয়। এছাড়াও প্রতি বছর ২০ আগস্ট তাঁর শাহাদাতবার্ষিকীতে বিভিন্ন স্থানে স্মরণসভা ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

উপসংহার

ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের জীবন ও ত্যাগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি অমর অধ্যায়। তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানের মাশরুর বিমানঘাঁটি থেকে বিমান ছিনতাইয়ের সাহসী প্রচেষ্টা করেছিলেন, যা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ন্যায্যতা তুলে ধরে। তাঁর শাহাদাত ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র তিন মিনিট দূরে ঘটলেও, তাঁর কীর্তি বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। মতিউর রহমানের জীবন আমাদের শেখায় যে, দেশপ্রেম ও সাহসের মাধ্যমে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.