গুলশান - বন জঙ্গলে ঘেরা ভোলা গ্রাম আজ রাজধানীর সবচেয়ে অভিজাত এলাকা
একুশ শতকের ঢাকায় 'গুলশান' মানেই আভিজাত্যের শিখর, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু আর উচ্চবিত্তের লাইফস্টাইল। ঝকঝকে কাঁচের অট্টালিকা, অত্যাধুনিক শপিং মল, সারিবদ্ধ মার্সিডিজ-বিএমডব্লিউ আর বিদেশী দূতাবাসের কড়া নিরাপত্তা এই হলো আজকের গুলশানের চেনা ছবি। কিন্তু এই জৌলুসের নিচে চাপা পড়ে আছে এক অন্য ইতিহাস। মাত্র সাত দশক আগেও গুলশান ছিল ঢাকার মূল শহর থেকে বিচ্ছিন্ন এক নিভৃত জঙ্গল, যেখানে বাঘের গর্জন আর শেয়ালের ডাক ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। 'ভোলা গ্রাম' থেকে আজকের 'গুলশান' হয়ে ওঠার এই রূপান্তর যেন এক রূপকথার গল্পকেও হার মানায়।
ঢাকার মানচিত্রে গুলশানের বর্তমান অবস্থান একদম হৃদপিণ্ডে। কিন্তু ১৯৫০-এর দশকেও এটি ছিল শহরের বাইরের এক অজপাড়াগ্রাম। ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যার অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই নিচু জলাভূমি আর ঘন ঝোপঝাড়ে ঘেরা এলাকাটির ইতিহাস জানলে বিস্মিত হতে হয়। সময়ের বিবর্তনে একটি সাধারণ মৌজা কীভাবে বিশ্বমানের এক নগরীতে পরিণত হলো, সেই দীর্ঘ পরিক্রমা আজ আমরা বিশ্লেষণ করব।
ভোলা গ্রাম যেভাবে হলো ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত পাড়া গুলশান
আজকের গুলশান-১ ও ২ নম্বরের বিশাল এলাকাটি একসময় পরিচিত ছিল 'ভোলা গ্রাম' নামে। লোকমুখে প্রচলিত আছে, বরিশাল ও ভোলার দ্বীপ অঞ্চল থেকে নদী ভাঙনের শিকার কিছু মানুষ এই এলাকায় এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। নিজেদের আদি ভিটার টানেই তারা এলাকাটির নাম রেখেছিলেন 'ভোলা'।
তৎকালীন তহশিল অফিসের নথিপত্র এবং ব্রিটিশ আমলের ভূমি রেকর্ডে এই এলাকাটিকে 'ভোলা সামাইর' মৌজা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, আধুনিক গুলশানের জৌলুসে এই নাম হারিয়ে গেলেও এর অস্তিত্বের প্রমাণ এখনো টিকে আছে। দক্ষিণ বাড্ডার দিকে তাকালে দেখা যায় ‘ভোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’, যা এই আধুনিক নগরীর আদি ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। সেই সময়কার ভোলা গ্রাম ছিল মূলত কৃষিজীবী ও মৎস্যজীবীদের এলাকা। চারদিকে লেক আর নিচু জমি থাকায় বর্ষাকালে এলাকাটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হতো।
বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক পরিবেশ - যখন গুলশানে মেছো বাঘ ছিল!
ভাবলে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে যে, যেখানে আজ বিলাসবহুল রেস্টুরেন্ট বা হাই-রাইজ বিল্ডিং, সেখানে একসময় শিকারীরা বন্যপ্রাণী খুঁজতে আসতেন। ষাটের দশকের শুরুর দিকেও গুলশান-বনানী সংলগ্ন এলাকাগুলো ছিল গভীর গজারি বন আর ঝোপঝাড়ে ভরা।
প্রবীণদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, সেই সময় রাতে শেয়ালের ডাক ছিল অতি সাধারণ বিষয়। বনানী ও গুলশানের মধ্যবর্তী নিচু এলাকাগুলোতে এমনকি মেছো বাঘ (Fishing Cat) ও বুনো শূকরের দেখা মিলত। মহাখালী থেকে গুলশানে ঢোকার জন্য কোনো পাকা রাস্তা ছিল না। মানুষজন মূলত মেঠো পথ ধরে হেঁটে বা নৌকায় করে যাতায়াত করতেন। সন্ধ্যা নামলেই সেই এলাকায় মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে যেত ডাকাত আর বন্যপ্রাণীর ভয়ে।
পরিকল্পনার শুরু - ডিআইটি ও করাচির অনুপ্রেরণা
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকা যখন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হয়, তখন উচ্চবিত্ত ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য একটি আধুনিক আবাসিক এলাকার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার পর সরকার আরও আধুনিক এবং পরিকল্পিত আবাসন ব্যবস্থা তৈরি করতে চায়।
১৯৬১ সালের দিকে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) যা বর্তমানে রাজউক (RAJUK) নামে পরিচিত ভোলা গ্রাম এবং এর আশপাশের জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা হাতে নেয়। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচির অভিজাত আবাসিক এলাকাগুলোর আদলে এই প্রজেক্টটি সাজানো হয়।
কেন ‘গুলশান’ নাম?
এলাকাটির নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কিছুটা শৈল্পিক ছোঁয়া দেওয়া হয়। ফার্সি শব্দ 'গুলশান'-এর অর্থ হলো 'ফুলের বাগান'। আবাসিক এলাকাটিকে সবুজ বাগান ও বৃক্ষরাজিতে সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা থেকেই এই নামটি বেছে নেওয়া হয়। সেই থেকে ‘ভোলা গ্রাম’ নথিপত্র থেকে বিদায় নিয়ে আধুনিক ‘গুলশান’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
জঙ্গল থেকে আধুনিক নগরী
শুরুতে গুলশান ছিল কেবল একটি প্লটভিত্তিক আবাসিক এলাকা। ১৯৬৪ সালের দিকে এলাকাটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'আবাসিক' হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে সেই সময় এখানে থাকার লোক পাওয়া কঠিন ছিল। মানুষ মনে করত, এত দূরে শহরের বাইরে জঙ্গলঘেরা এলাকায় কেউ কি থাকতে আসবে?
ধীরে ধীরে সরকার সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে শুরু করে। এলাকাটিকে নিরাপত্তার চাদরে ঢাকতে পুলিশ ফোর্স নিয়োগ করা হয়, গড়ে তোলা হয় ‘গুলশান বাজার’ (যা আজ বিশাল ডিসিসি মার্কেট)। এরপর শুরু হয় লেক উন্নয়ন। গুলশান লেকটি মূলত প্রাকৃতিকভাবে থাকলেও সেটিকে কৃত্রিমভাবে খনন করে সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়। ১৯৮০-র দশকে বনানী ও গুলশানকে সংযোগকারী সেতুগুলো নির্মাণের পর এই এলাকাটির গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়।
কূটনৈতিক পাড়া ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি
গুলশানের আভিজাত্যের অন্যতম বড় কারণ হলো এর নিরাপত্তা এবং পরিবেশ। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে গুলশানকে একটি প্রশাসনিক থানার মর্যাদা দেওয়া হয়। শান্ত, ছিমছাম এবং নিচু জনঘনত্বের কারণে বিদেশী দূতাবাসগুলো গুলশানকে তাদের স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে বেছে নিতে শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ দূতাবাস ও হাই-কমিশন গুলশান-বারিধারা এলাকায় অবস্থিত। এটি গুলশানকে একটি আন্তর্জাতিক ‘ডিপ্লোম্যাটিক জোন’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করেছে।
আবাসিক থেকে বাণিজ্যিক কেন্দ্রে
নব্বইয়ের দশকের পর থেকে গুলশানের চরিত্রে আমূল পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এক সময়ের একতলা-দোতলা বাংলো বাড়িগুলোর জায়গায় গড়ে উঠতে থাকে আকাশচুম্বী অ্যাপার্টমেন্ট ভবন। ২০০০ সালের পর থেকে গুলশান কেবল থাকার জায়গা নয়, বরং দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।
বিলাসবহুল জীবন: বর্তমানে গুলশান মানেই দেশের সবচেয়ে দামী রিয়েল এস্টেট। এখানকার প্রতি কাঠা জমির দাম আকাশচুম্বী।
করপোরেট অফিস: বহুজাতিক সংস্থা, ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় এবং বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা এখন গুলশান।
পরিবর্তিত পরিবেশ: অতিরিক্ত বাণিজ্যায়নের ফলে আদি গুলশানের সেই সবুজ প্রকৃতি আজ ফিকে হয়ে গেছে। যানজট ও শব্দদূষণ এখন এখানকার সাধারণ সমস্যা।
আধুনিক গুলশানের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
গুলশান বর্তমানে 'স্মার্ট সিটি'র একটি মডেল হিসেবে কাজ করছে। গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্প এবং উন্নত ড্রেনেজ সিস্টেম এলাকাটিকে আরও আধুনিক করেছে। তবে জলবদ্ধতা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমস্যা এখনো মাঝে মাঝে ভোগান্তির কারণ হয়। নিরাপত্তা বজায় রাখতে বর্তমানে পুরো গুলশান এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে আনা হয়েছে এবং প্রবেশ পথগুলোতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
সময়ের শ্রেষ্ঠ বিবর্তন
একটি সাধারণ দ্বীপবাসীদের বসতি ‘ভোলা গ্রাম’ থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দামী ও অভিজাত এলাকা ‘গুলশান’ হয়ে ওঠার গল্পটি আমাদের সময়ের রূপান্তরের কথা বলে। গুলশানের প্রতিটি সড়কের নিচে চাপা পড়ে আছে কৃষিজীবী মানুষের মেঠো পথ আর বন্যপ্রাণীদের বিচরণভূমি। আজ যখন আপনি গুলশানের কোনো কফি শপে বসে ল্যাটে-তে চুমুক দেন বা আধুনিক শপিং মলে ঘোরেন, তখন একবার ভাবুন মাত্র ৬০ বছর আগে এখানে হয়তো মেছো বাঘের থাবা পড়েছিল কিংবা রাত বাড়লে শেয়ালের ডাকে নিস্তব্ধ হতো চারপাশ।
গুলশান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবর্তনই চিরন্তন। তবে এই আধুনিকতার দৌড়ে যেন আমরা আমাদের ইতিহাসের শেকড়কে ভুলে না যাই।




















