গুলশান - বন জঙ্গলে ঘেরা ভোলা গ্রাম আজ রাজধানীর সবচেয়ে অভিজাত এলাকা

যে কারণে মেয়েরা বেশি বয়সী পুরুষদের জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ করে

একুশ শতকের ঢাকার ভূ-মানচিত্রে 'গুলশান' কেবল একটি নাম নয়; এটি আভিজাত্যের চূড়ান্ত প্রতীক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এবং উচ্চবিত্ত নাগরিক জীবনযাত্রার এক পরম রূপক। ঝকঝকে কাঁচের আকাশচুম্বী অট্টালিকা, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের শোরুম, সারিবদ্ধ বিলাসবহুল মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ বা প্রাদো, পাঁচ তারকা হোটেল, দৃষ্টিনন্দন কফি শপ এবং কূটনৈতিক পাড়ার কড়া নিরাপত্তা এই হলো আজকের গুলশানের চেনা অবয়ব। দিনের বেলা বহুজাতিক কর্পোরেট অফিসের ব্যস্ততা আর রাতে নিয়ন আলোর ঝলকানি মিলিয়ে এলাকাটি যেন বাংলাদেশের বুকে এক টুকরো আধুনিক পশ্চিমা নগরী।

কিন্তু এই চোখধাঁধানো জৌলুস, চাকচিক্য আর আধুনিকতার কঠিন কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে আছে একেবারেই এক ভিন্ন ইতিহাস। সময়ের ঘড়ির কাঁটাকে যদি আমরা মাত্র সাত দশক বা সত্তর বছর পেছনে ঘুরিয়ে দিই, তবে যে দৃশ্যপট উন্মোচিত হবে, তা আজকের বাসিন্দাদের কাছে কোনো অবাস্তব ফ্যান্টাসি বা রূপকথার গল্পের মতো মনে হবে। ১৯৫০-এর দশকের প্রথমার্ধেও আজকের গুলশান ছিল মূল ঢাকা শহর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, দুর্গম, জলাভূমি ও নিবিড় বনে ঘেরা এক নিভৃত জনপদ। যেখানে রাতে মানুষের কোলাহল নয়, রাজত্ব করত মেছো বাঘের গর্জন, বুনো শূকরের আনাগোনা আর শেয়ালের প্রকম্পিত ডাক।

একটি বিচ্ছিন্ন ও অনগ্রসর 'ভোলা গ্রাম' কীভাবে কয়েক দশকের ব্যবধানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দামি ও অভিজাত নগরে পরিণত হলো? কীভাবে পলিমাটি, বনজঙ্গল আর মেঠো পথ প্রতিস্থাপিত হলো শত শত কোটি টাকার রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্যে? এই রূপান্তরের পেছনের ইতিহাস, ভূ-রাজনীতি, নগর পরিকল্পনা, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনকে গভীরভাবে ব্যবচ্ছেদ করাই এই বিস্তারিত নিবন্ধের মূল লক্ষ্য।

১৯৪৭ উত্তর ঢাকা এবং 'ভোলা সামাইর' মৌজার আদি রূপরেখা

আজকের গুলশান ১ ও ২ নম্বর সার্কেল, এভিনিউ রোড এবং সংলগ্ন বনানী-বারিধারার বিস্তৃত অববাহিকা একসময় পরিচিত ছিল 'ভোলা গ্রাম' নামে। তবে ব্রিটিশ আমলের রাজস্ব রেকর্ড, সিএস (Cadastral Survey) এবং এসএ (State Acquisition) নথিপত্রে এই এলাকাটিকে চিহ্নিত করা হয়েছিল ‘ভোলা সামাইর’ মৌজা হিসেবে।

নামের পিছনের আদি ইতিহাস: 'ভোলা' নামটির উৎপত্তি নিয়ে স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও প্রবীণদের মুখে একটি ঐতিহাসিক তথ্য প্রচলিত রয়েছে। উনিশ শতকের শেষভাগে এবং বিশ শতকের প্রারম্ভে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর বিধ্বংসী ভাঙনে বরিশাল ও ভোলা দ্বীপ অঞ্চলের বহু পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে তৎকালীন বাস্তুচ্যুত কিছু নদীভাঙা কৃষক ও মৎস্যজীবী পরিবার জীবিকার খোঁজে উত্তরে এসে ঢাকা শহরের অদূরে এই নিচু ও জলাভূমিময় এলাকায় বসতি স্থাপন করে। নিজেদের ফেলে আসা আদি ভিটা 'ভোলা' দ্বীপের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং আবেগ ধরে রাখতে তারা নতুন এই বসতির নাম রেখেছিলেন ‘ভোলা গ্রাম’।

টিকে থাকা ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী: আধুনিক নগরীর জৌলুস ও কংক্রিটের ভিড়ে 'ভোলা' নামটি সিএস নথির পাতায় বন্দি হয়ে গেলেও এর অস্তিত্বের একটি প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক প্রমাণ এখনো ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের দক্ষিণ বাড্ডা এলাকায় সগৌরবে টিকে আছে যার নাম ‘ভোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। নামমাত্র একটি বিদ্যালয় ভবনের নাম হলেও, এটি মূলত এই অঞ্চলে বাস করা শত বছরের প্রাচীন সেই কৃষক ও মৎস্যজীবী জনগোষ্ঠীর আদি ইতিহাসের নিঃশব্দ স্মারক।

তৎকালীন সামাজিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা: ১৯৫০-এর দশকে ভোলা সামাইর মৌজার জনসংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত। অধিবাসীরা ছিল মূলত কৃষিজীবী, গবাদিপশু পালনকারী এবং মৎস্যজীবী। শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীর প্রাকৃতিক অববাহিকা এবং বর্তমান গুলশান লেকের আদি প্রাকৃতিক খালের সংযোগে পুরো এলাকাটি নিচু জলাভূমিতে রূপ নিয়েছিল। বর্ষাকালে পানি বৃদ্ধির ফলে পুরো ভোলা গ্রামটি মূল ঢাকা শহর (তৎকালীন পুরান ঢাকা ও তেজগাঁও) থেকে বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট কাদা-মাটির দ্বীপে পরিণত হতো। তালগাছ, বাঁশঝাড়, হিজল ও গজারি গাছে ঘেরা সেই ভূখণ্ডে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল ডিঙি নৌকা কিংবা মেঠো আাইলের ওপর হেঁটে চলা।

গজারি বন, মেছো বাঘ আর শেয়ালের ডাক: ষাটের দশকের পরিবেশ ও জনজীবন

আজকে যেখানে বিলাসবহুল আন্তর্জাতিক ফাইভ-স্টার হোটেল, লেকপাড়ের ক্যাফে আর ডিপ্লোম্যাটিক এ্যামবেসি দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে ষাটের দশকের প্রারম্ভেও প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল অবিশ্বাস্য রকমের বন্য। তেজগাঁও, মহাখালী এবং রামপুরার সীমানা পেরিয়ে উত্তরের দিকে তাকালে চোখে পড়ত কেবল ঘন গজারি বন, কাসবন আর বিশাল নিচু জলাভূমি।

বন্যপ্রাণীদের অভয়ারণ্য: প্রবীণ ঢাকাবাসীদের স্মৃতিচারণ এবং তৎকালীন ডায়েরি ও ভ্রমণকাহিনি থেকে জানা যায়, তদানীন্তন বনানী ও গুলশানের মধ্যবর্তী নিচু এলাকাগুলোতে ও ঘন ঝোপঝাড়ে প্রচুর মেছো বাঘ (Fishing Cat), বুনো শূকর, শিয়াল, মেছো বিড়াল এবং বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপের বিচরণ ছিল। গুলশান লেকের আদি রূপটি ছিল অত্যন্ত গভীর এবং কচুরিপানা ও জলজ উদ্ভিদে ভরা, যেখানে শীতকালে শত শত প্রজাতির পরিযায়ী পাখি এসে আশ্রয় নিত।

ঢাকায় বসবাসরত শিকারীরা সেই সময়ে বুনো হাঁস, খরগোশ ও মেছো বাঘ শিকার করার জন্য ছররা বন্দুক নিয়ে বর্তমান গুলশান-বনানী এলাকায় আসতেন। রাতে পুরো ভোলা গ্রাম নিস্তব্ধ হয়ে গেলে শুরু হতো শেয়ালের সম্মিলিত হুক্কাহুয়া ডাক, যা চারপাশের গ্রামীণ পরিবেশকে এক রহস্যময় থ্রিলারের মতো আচ্ছন্ন করে রাখত।

যাতায়াত ব্যবস্থা ও ডাকাত আতঙ্ক: তখন মহাখালী বা তেজগাঁও থেকে ভোলা গ্রামে ঢোকার মতো কোনো পিচঢালা সড়ক বা পাকা সেতু ছিল না। কাঁচা মেঠো পথ ধরে হাঁটা কিংবা বর্ষায় নাও বা ভেলাই ছিল একমাত্র ভরসা। এলাকায় না ছিল কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ, না ছিল পানীয় জলের জন্য কোনো টিউবওয়েলের সুব্যবস্থা। গ্রামের একমাত্র পানির উৎস ছিল প্রাকৃতিক কূপ বা লেকের পানি।

সুর্যাস্তের সাথে সাথে পুরো এলাকায় নেমে আসত অমাবস্যার মতো ঘুটঘুটে অন্ধকার। নির্জন গজারি বন আর জলাভূমির সুবিধা নিয়ে সে যুগে ডাকাত দল আস্তানা গাড়ত। ফলে সন্ধ্যা নামার পর ডাকাত ও বন্যপ্রাণীর যৌথ আতঙ্কে কোনো সাধারণ মানুষ মহাখালী বা রামপুরা থেকে গুলশানের দিকে পা বাড়াতে সাহস পেত না।

করাচির মাস্টারপ্ল্যান থেকে 'গুলশান' ও ডিআইটি-র নামকরণ

১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। প্রাদেশিক রাজধানী হওয়ার পর ঢাকায় হঠাৎ করে সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, বিদেশী নাগরিক ও উদীয়মান মধ্যবিত্তের চাপ বহু গুণ বেড়ে যায়। ১৯৫০-এর দশকে পুরান ঢাকা ছিল চরম জনবহুল ও সংকুচিত, আর নবনির্মিত 'ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা' দ্রুত পূর্ণ হয়ে উঠছিল। ফলে তৎকালীন নগর পরিকল্পনাবিদরা শহরের উত্তর দিকে একটি আধুনিক, সুপরিকল্পিত এবং আন্তর্জাতিক মানের উপশহর গড়ে তোলার আবশ্যকতা তীব্রভাবে অনুভব করেন।

ডিআইটি (DIT) এবং মাস্টারপ্ল্যান

১৯৫৬ সালে গঠিত হয় ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (DIT), যা স্বাধীনতার পর রূপ নেয় আজকের রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (RAJUK)-এ। ডিআইটি-র অধীনে ১৯৬১ সালের দিকে ভোলা গ্রাম এবং এর আশপাশের প্রায় কয়েক হাজার একর নিচু জমি ও গজারি বন অধিগ্রহণের বিশাল প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়।

তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের প্রশাসনিক রাজধানী করাচির আধুনিক আবাসিক এলাকাগুলোর (যেমন- PECHS ও ক্লিপটন) স্থাপত্য নকশা এবং শহরের উন্মুক্ত লেকসাইড ভিউ-এর আদলে গুলশানের মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হয়।

মূল লক্ষ্য ছিল- চওড়া গ্রিডভিত্তিক রাস্তা নির্মাণ করা। প্রতিটি ব্লকে বিশাল খেলার মাঠ ও পার্কের ব্যবস্থা রাখা। প্রাকৃতিক লেককে রক্ষা করে ড্রেনেজ ও সৌন্দর্য বাড়ানো। এক-একটি প্লটের আয়তন বড় রাখা (কমপক্ষে ১ থেকে ২ বিঘা), যেন খোলামেলা বাগানবাড়ি (Bungalow) তৈরি করা যায়।

নামকরণ: 'ভোলা গ্রাম' থেকে 'গুলশান'

একটি অভিজাত এবং আধুনিক শহরের জন্য 'ভোলা গ্রাম' নামটি তৎকালীন নীতি-নির্ধারকদের কাছে কিছুটা গ্রামীণ ও অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছিল। আবাসিক এলাকাটিকে সবুজে ঘেরা এক উদ্যান-নগরী (Garden City) হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন থেকে বেছে নেওয়া হয় ফার্সি শব্দ ‘গুলশান’

‘গুলশান’ (گلشن) শব্দটির ফার্সি অর্থ হলো ‘ফুলের বাগান’ বা ‘পুষ্পকানন’

পরিকল্পনা অনুযায়ী এই উপশহরের সড়কগুলোর দুই পাশে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ফুলের গাছ রোপণ করার সিদ্ধান্ত হয়, যাতে বসন্তে পুরো এলাকাটি ফুলে ফুলে শোভিত হয়ে ওঠে। এভাবে প্রশাসনিক কাগজের এক কলমের খোঁচায় শতাব্দীর প্রাচীন 'ভোলা গ্রাম' নামটিকে ইতিহাসের অতল গহ্বরে পাঠিয়ে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ ঘটে 'গুলশান মডেল টাউন'-এর।

১৯৬০-১৯৭০ জঙ্গল থেকে উপশহরের কঠিন যাত্রা

ডিআইটি ১৯৬১ সালে জমি অধিগ্রহণ করলেও এবং ১৯৬৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে গুলশানকে 'আবাসিক এলাকা' ঘোষণা করলেও সাধারণ মানুষ শুরুতে এখানে প্লট কিনতে বা বাড়ি বানাতে বিন্দুমাত্র আগ্রহী ছিল না।

"জঙ্গলে কে থাকবে?": তৎকালীন ঢাকাবাসীদের কাছে গুলশান ছিল শহরের সীমানা ছাড়িয়ে দূর দিগন্তের এক জঙ্গল। মানুষ মনে করত, তেজগাঁও শিল্প এলাকার ওপারে, যেখানে যাতায়াতের ভালো রাস্তা নেই, রাতে আলো জ্বলে না, সেই গজারি বনে গিয়ে থাকার মতো বোকামি কেউ করবে না। ডিআইটি তখন প্রতি কাঠা জমি মাত্র কয়েকশো টাকা মূল্যে বিক্রি করার বিজ্ঞাপন দিলেও ক্রেতার চরম আকাল দেখা দিয়েছিল।

অনেক সরকারি কর্মকর্তা ও আমলাকে বাধ্যতামূলকভাবে বা কিস্তিতে গুলশানের প্লট দেওয়া হয়েছিল, যাদের অনেকেই পরে যাতায়াতের কষ্টের কথা চিন্তা করে জলের দামে সেই প্লট বিক্রি করে দিয়েছিলেন।

অবকাঠামোগত ভিত্তি স্থাপন: ডিআইটি বুঝতে পেরেছিল, মানুষের আস্থা ফেরাতে অবকাঠামো গড়ে তোলা আবশ্যক। ষাটের দশকের মধ্যভাগে মহাখালী থেকে গুলশান পর্যন্ত প্রথম পিচঢালা সড়ক নির্মাণ করা হয়। সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য স্থাপন করা হয় বিশেষ পুলিশি চৌকি।

অধিবাসীদের দৈনন্দিন কেনাকাটার সুবিধার জন্য গড়ে তোলা হয় 'গুলশান ডিসিসি মার্কেট' (গুলশান ১ ও ২ নম্বর সার্কেল মার্কেট)। প্রাকৃতিক লেকটিকে কৃত্রিমভাবে পুনঃখনন করে সোজা করা হয় এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার মূল মাধ্যম হিসেবে যুক্ত করা হয়।

ধীরে ধীরে শহরের সম্ভ্রান্ত পরিবার, উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা এবং ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা গুলশানে একতলা-দোতলা সবুজ বাগান ঘেরা বাংলো বাড়ি তৈরি করতে শুরু করেন। ১৯৭০ সালের মধ্যে গুলশান এক ছিমছাম, শান্ত ও নিস্তব্ধ অভিজাত আবাসিক উপশহরে রূপান্তরিত হতে থাকে।

ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ও 'ডিপ্লোম্যাটিক জোন'-এর উত্থান

১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় গুলশানের ভাগ্যকে চিরতরে বদলে দেয়। সদ্য স্বাধীন দেশের রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার দূতাবাস (Embassy) এবং হাই-কমিশন খোলার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

প্রশাসনিক থানা গঠন (১৯৭২): স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে গুলশানকে একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক থানার মর্যাদা দেওয়া হয়। এর ফলে এলাকাটিতে সরকারি তদারকি, পুলিশি টহল এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন বেগবান হয়।

ধানমন্ডি থেকে গুলশানে কূটনীতির স্থানান্তর: শুরুর দিকে বেশ কিছু দেশের দূতাবাস ধানমন্ডি ও সেগুনবাগিচা এলাকার ভাড়া বাড়িতে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু সেই এলাকাগুলো ছিল ঘনবসতিপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক স্তরের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য অসংকুল। গুলশানের সুপ্রশস্ত সড়ক, বিশাল বিশাল নিভৃত প্লট, কম জনঘনত্ব এবং বিমানবন্দর (তৎকালীন তেজগাঁও বিমানবন্দর ও পরবর্তীতে কুর্মিটোলা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর)-এর নিকটবর্তী দূরত্বের কারণে এটি বিদেশী কূটনীতিকদের প্রথম পছন্দে পরিণত হয়।

সরকার গুলশান ও সংলগ্ন বারিধারা এলাকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'ডিপ্লোম্যাটিক এনক্লেভ' (Diplomatic Enclave) বা কূটনৈতিক পাড়া হিসেবে ঘোষণা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, চীন, রাশিয়া, জাপান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো বিশাল জায়গা নিয়ে তাদের স্ব-স্ব হাই-কমিশন ও চ্যান্সারি ভবন নির্মাণ করে। এর ফলে পুরো গুলশান এলাকা একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় চলে আসে, যা এলাকাটির জমি ও সম্পত্তির মান এক লাফে বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।

সাত দশকে ভোলা গ্রাম থেকে আধুনিক গুলশানের বিবর্তন

নিচে ১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত গুলশানের সামগ্রিক রূপান্তরের ইতিহাস একটি সারণীর মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

সময়কাল (দশক)

ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত অবস্থা

সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য

মূল পরিচায়ক রূপ

১৯৫০-এর দশক

নিচু জলাভূমি, কাদা-মাটির মেঠো পথ, ঘন গজারি বন ও কাশবনে ঘেরা এলাকা।

মেছো বাঘ, শেয়াল ও বন্যপ্রাণীর বিচরণ; কৃষিজীবী ও মৎস্যজীবীদের বসবাস।

ভোলা গ্রাম / ভোলা সামাইর মৌজা

১৯৬০-এর দশক

ডিআইটি কর্তৃক জমি অধিগ্রহণ, প্লট বরাদ্দ, রাস্তা ও লেক খননের মাস্টারপ্ল্যান।

করাচির আদলে সাজানো; নাম পরিবর্তন; প্রাথমিক অনীহার পর বাংলো বাড়ি নির্মাণ।

গুলশান মডেল টাউন (উদ্বোধন)

১৯৭০-এর দশক

১৯৭২ সালে থানার মর্যাদা; বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগের ব্যাপক উন্নতি।

স্বাধীনতার পর ধনাঢ্য বর্গ ও বিদেশী নাগরিকদের বসতি; চিমছাম আবাসিক আমেজ।

অভিজাত আবাসিক উপশহর

১৯৮০-এর দশক

বনানী-গুলশান সংযোগ সেতু নির্মাণ; অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও পাকা ড্রেনেজ।

উচ্চবিত্তদের প্রধান ঠিকানা; ডিপ্লোম্যাটিক পাড়ার পরিপূর্ণ বিকাশ ও নিরাপত্তা।

আন্তর্জাতিক ডিপ্লোম্যাটিক জোন

১৯৯০-এর দশক

ফ্লোর এরিয়া রেশিও (FAR) পরিবর্তন; একতলা বাংলো ভেঙে বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট।

বাণিজ্যিকীকরণের সূচনা; বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক ও শোরুমের আগমন।

আবাসিক থেকে মিশ্র এলাকা

২০০০-এর দশক

হাই-রাইজ কাঁচের বাণিজ্যিক টাওয়ার; পাঁচ তারকা হোটেল ও আন্তর্জাতিক ব্রান্ড।

দেশের মূল কর্পোরেট হাব; প্রতি কাঠা জমির দাম আকাশচুম্বী; মারাত্মক যানজট।

কমার্শিয়াল ও ফাইন্যান্সিয়াল হাব

২০১০-বর্তমান

সিসিটিভি নজরদারি, উন্নত ড্রেনেজ, লেক প্রজেক্ট, সমন্বিত ট্রাফিক ও নিরাপত্তা।

স্মার্ট ডিজিটাল সিটি; সবুজ প্রকৃতির বিলুপ্তি; অত্যন্ত দামি রিয়েল এস্টেট মার্কেট।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অভিজাত মেগাসিটি হাব

আদি অধিবাসীদের স্থানান্তর ও 'ভোলা গ্রাম' এর বাস্তুচ্যুতি

১৯৬১ সালে যখন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) 'ভোলা সামাইর' মৌজার জমি অধিগ্রহণের নোটিশ জারি করে, তখন আদি অধিবাসীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছিল।

স্বল্প ক্ষতিপূরণ ও ভিটাচ্যুতি: তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার কৃষিজমি ও বসতভিটার জন্য যে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করেছিল, তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। নিরক্ষর ও সরল কৃষিজীবীরা আইনি জটিলতা বুঝতে না পেরে নামমাত্র টাকায় বাপ-দাদার ভিটা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

সংলগ্ন এলাকায় পুনর্বাসন: বাস্তুচ্যুত এই পরিবারগুলো গুলশানের অধিগ্রহণকৃত সীমানা পার হয়ে পূর্ব দিকে অর্থাৎ বাড্ডা, ভাটারা, শাহজাদপুর, নূরের চালা এবং খিলক্ষেত এলাকায় গিয়ে কম দামে জমি কিনে নতুন বসতি গড়ে তোলেন।

শ্রমিক হিসেবে ফিরে আসা: এক সময়ের জমির মালিক কৃষক ও মৎস্যজীবীরা পরবর্তী দুই-তিন দশকে তাদেরই সাবেক ভিটায় গড়ে ওঠা অভিজাত বাংলো ও ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ড্রাইভার, মালী, গৃহপরিচারিকা ও সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন যা আধুনিক নগরায়ণের এক বাস্তব রূপ।

'ট্রপিক্যাল মডার্নিজম' থেকে হাই-টেক গ্লাস টাওয়ার

গুলশানের বাড়ি ও ভবনের নকশা পর্যবেক্ষণ করলে বাংলাদেশের স্থাপত্যশৈলীর চার দশকের রূপান্তর স্পষ্ট দেখা যায়:

লাল ইট ও খোলা উঠোনের যুগ (১৯৭০-১৯৮০): প্রখ্যাত স্থপতি মাজহারুল ইসলামের 'ট্রপিক্যাল মডার্নিজম' দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে গুলশানের শুরুর দিকের বাংলো বাড়িগুলো তৈরি হয়েছিল। লাল পোড়ামাটির ইট, উঁচু ছাদ, বিশাল বারান্দা, সবুজ বাগান এবং প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচলের জন্য উন্মুক্ত আঙিনা ছিল এসব বাড়ির মূল বৈশিষ্ট্য।

কনক্রিট ও ফ্ল্যাট সংস্কৃতি (১৯৯০-২০০০): জমির দাম বাড়তে থাকলে যৌথ পরিবারের ভাঙন এবং বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারেরা প্রথাগত বাংলো ভেঙে ৬ থেকে ৯ তলার অ্যাপার্টমেন্ট বানাতে শুরু করে।

গ্রীন ও স্মার্ট স্কাইস্ক্রেপার (২০১০-বর্তমান): বর্তমানে গুলশান এভিনিউ বা প্রধান সড়কগুলোতে যেসব ২০ থেকে ৩০ তলা ভবন উঠছে, সেগুলো পরিবেশবান্ধব (LEED Certified) এবং আর্কিটেকচারালি সাউথ এশিয়ান স্ট্যান্ডার্ডের। অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেল, থার্মাল গ্লাস এবং সেন্সর-চালিত স্মার্ট অটোমেশন সিস্টেম এখন গুলশানের করপোরেট টাওয়ারগুলোর মূল পরিচয়।

আভিজাত্য ও সামাজিক জীবন: 'গুলশান ক্লাব' ও অভিজাত নেটওয়ার্কিং

ঢাকার উচ্চবিত্ত সমাজের সামাজিক বিনোদন ও করপোরেট নেটওয়ার্কিংয়ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গুলশানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গুলশান ক্লাব (১৯৭৮): পুরান ঢাকা ও রমনা কেন্দ্রিক 'ঢাকা ক্লাব'-এর বিকল্প হিসেবে ১৯৭৮ সালে উত্তর ঢাকায় গুলশান ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি কেবল একটি স্পোর্টস বা বিনোদন ক্লাব নয়; দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি, কূটনীতিক এবং সামরিক ব্যুরোক্র্যাটদের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতি-নির্ধারণী আলোচনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এটি।

ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ বিপ্লব: ১৯৮০-র দশকে গুলশানে ছিল অল্প কিছু চাইনিজ রেস্তোরাঁ (যেমন: বাঁশঝাড় বা বাম্বু শুটস)। ২০০০ সালের পর থেকে আন্তর্জাতিক কফি চেইন, ইতালিয়ান অ্যান্ড ফ্রেঞ্চ ফাইন ডাইনিং, জাপানি সুশি বার এবং টার্কিশ ক্যাফের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে এই এলাকা।

ঐতিহাসিক ডিসিসি মার্কেট থেকে প্রিমিয়াম শপিং মল

গুলশানের কমার্শিয়াল লাইফস্টাইলের সবচেয়ে প্রাচীন ও জনপ্রিয় অনুষঙ্গ হলো 'ডিসিসি মার্কেট' (ডিএনসিসি মার্কেট)

আমদানিকৃত পণ্যের হাব: স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে যেকোনো প্রিমিয়াম বা বিদেশি চকলেট, প্রসাধন, সুগন্ধি, কফি বা কাটলারি কেনার একমাত্র নির্ভরযোগ্য স্থান ছিল গুলশান ১ ও ২-এর ডিসিসি মার্কেট।

অগ্নিকাণ্ড ও পুনরুত্থান: ২০১৭ এবং ২০১৯ সালে ডিসিসি মার্কেটে সংঘটিত বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড এখানকার কোটি টাকার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত করলেও ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার জেদ এবং ঐতিহ্যপ্রেমী ক্রেতাদের কারণে এটি এখনো সচল রয়েছে।

হাতিরঝিল ও তুরাগ নদীর সংযোগস্থল

গুলশান লেকটি কেবল কোনো কৃত্রিম লেক নয়; এটি ছিল ঢাকার প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন প্রণালীর (Natural Drainage System) অন্যতম প্রধান ধমনী।

প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ: বর্ষাকালে তেজগাঁও, বাড্ডা ও কুর্মিটোলার উদ্বৃত্ত পানি গুলশান লেক হয়ে হাতিরঝিল এবং বেগুনবাড়ী খালের মাধ্যমে বালু নদীতে গিয়ে পড়ত।

পরিকল্পনাহীন দখলের প্রভাব: ১৯৯০-এর দশকে লেকের সীমানা ভরাট করে আবাসন ও বাণিজ্যিক প্লট তৈরির ফলে লেকের স্বাভাবিক পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যায়। এর ফলেই আজকের আধুনিক গুলশানে সামান্য মুষলধারে বৃষ্টি হলেই ওয়াটারলগিং বা জলজটের সৃষ্টি হয়।

নিরাপত্তা বিপ্লব: ২০১৬ ট্র্যাজেডি-উত্তর 'ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি জোন'

গুলশানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংবেদনশীল ও রূপান্তরকারী মোড় ছিল ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের 'হোলি আর্টিজান' ট্র্যাজেডি। এই ঘটনাটি গুলশানের নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থার নকশাকে চিরতরে বদলে দেয়।

ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি জোন (DSZ): ঘটনার পর পুরো গুলশান ও বারিধারা কূটনৈতিক এলাকাকে বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হয়।

চেকপোস্ট ও কাউন্টার-টেররিজম ম্যাট্রিক্স: প্রবেশপথগুলোতে বসানো হয় এপিবিএন (APBn) ও এআরআরটি (ART) সশস্ত্র চেকপোস্ট। আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক অনুমোদনহীন হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে সরিয়ে নেওয়ার কঠোর আইনি অভিযান শুরু হয়।

কমিউনিটি পুলিশিং: 'গুলশান সোসাইটি' এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যৌথ উদ্যোগে 'গুলশান ক্লিন অ্যান্ড সেফ' প্রজেক্টের অধীনে পুরো এলাকায় সার্বক্ষণিক ই-নজরদারি ও স্মার্ট পাস ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।

গুলশানের এই বিচিত্র ইতিহাস আমাদের শেখায় কীভাবে একটি মেঠো পথের 'ভোলা গ্রাম' তার নিজের রূপ বদলে আধুনিক আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বাণিজ্য ও উচ্চবিত্ত জীবনযাত্রার প্রধান মাপে পরিণত হয়েছে।

আবাসিক থেকে করপোরেট হাব: নব্বই পরবর্তী রিয়েল এস্টেট বিপ্লব

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে গুলশানের মূল চরিত্রে এক আমূল ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। যে গুলশান এতকাল শান্ত, নির্জন ও নিস্তব্ধ এক আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল, তা দ্রুত রূপ নিতে থাকে একটি উত্তাল, বাণিজ্যিক ও করপোরেট হাবে।

বাংলো সংস্কৃতির অবসান ও রিয়েল এস্টেট বুম

১৯৯০-এর দশকের আগে গুলশানের সৌন্দর্য ছিল এর সবুজ বাগান ঘেরা একতলা বা দোতলা বিশাল বিশাল বাংলো বাড়িগুলোতে। কিন্তু ঢাকা শহরের দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং রিয়েল এস্টেট ব্যবসার অভূতপূর্ব বিকাশের ফলে জমির অর্থনৈতিক মূল্য অসম্ভব বেড়ে যায়।

বিকাশমান রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো প্লট মালিকদের সাথে যৌথ উদ্যোগে (Joint Venture) চুক্তি করে বাংলো বাড়িগুলো ভাঙতে শুরু করে। সেখানে গড়ে ওঠে ৮ থেকে ১৫ তলাবিশিষ্ট বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট টাওয়ার। একের পর এক সবুজ বাগান হারিয়ে যেতে থাকে কঠিন কংক্রিটের নিচে।

করপোরেট হেডকোয়ার্টার ও কমার্শিয়ালের আগ্রাসন

২০০০ সালের পর থেকে মতিঝিল ও পুরান ঢাকা থেকে প্রধান প্রধান ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক সংস্থা (MNCs), টেলিকম অপারেটর (যেমন- গ্রামীণফোন, বাংলালিংক), এবং শীর্ষস্থানীয় দেশীয় গার্মেন্টস ও কর্পোরেট গ্রুপগুলো তাদের প্রধান কার্যালয় গুলশানে স্থানান্তর করতে শুরু করে।

গুলশান এভিনিউ, ১৮ ও ৯৯ নম্বর সড়কের মতো মূল সড়কগুলোর দু-পাশে গড়ে ওঠে সর্বাধুনিক কাঁচের তৈরি বাণিজ্যিক টাওয়ার। ফাইভ-স্টার হোটেল (যেমন- দ্য ওয়েস্টিন, শেরাটন, রেনেসাঁ), আন্তর্জাতিক ফুড চেইন (KFC, Pizza Hut, Gloria Jean's, Starbucks কালচার) এবং বুলেটপ্রুফ সিকিউরিটির বুটিক শপ গুলশানকে দেশের সবচেয়ে প্রিমিয়াম কমার্শিয়াল সেন্টারে পরিণত করে।

জমির অবিশ্বাস্য মূল্যবৃদ্ধি

১৯৬০-এর দশকে যে গুলশানের প্রতি কাঠা জমি কয়েকশো টাকায় বিক্রি হতো, ২০২৬ সালে এসে সেই গুলশানের প্রধান সড়ক সংলগ্ন প্রতি কাঠা জমির বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ কোটি টাকা বা তারও বেশি। সাধারণ বা উচ্চ-মধ্যবিত্তের জন্য গুলশানে এক ইঞ্চি জমি বা একটি অ্যাপার্টমেন্ট কেনা আজ একপ্রকার অবাস্তব স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। এটি এখন কেবল শতকোটিপতি, মাল্টিন্যাশনাল করপোরেট ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের নিজস্ব রাজত্ব।

নগর সমাজবিজ্ঞান ও আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ

গুলশানের এই অভূতপূর্ব বিবর্তন যেমন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক চমৎকার দৃশ্যপট উপস্থাপন করে, তেমনি এটি নগর সমাজবিজ্ঞান এবং পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ কিছু জটিল চ্যালেঞ্জ ও সংকটের জন্ম দিয়েছে।

পরিবেশিক বিপর্যয় ও হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট

যে ‘গুলশান’ ফার্সি ভাষার ‘ফুলের বাগান’ নামের সার্থকতা বহন করার কথা ছিল, তা আজ অনেকাংশেই বৃক্ষশূন্য কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। ঘন গজারি বন, কাশবন এবং ছোট ছোট খালগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় এলাকাটির তাপমাত্রা আগের চেয়ে কয়েক ডিগ্রি বৃদ্ধি পেয়েছে। গুলশান লেকটি সৌন্দর্যায়ন প্রজেক্টের মাধ্যমে ধরে রাখার চেষ্টা করা হলেও, আশেপাশের ড্রেনের বর্জ্য ও প্লাস্টিকের কারণে এর স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান (Ecosystem) মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। একসময় যে লেকে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি আসত, আজ সেখানে কেবল কৃত্রিম প্যাডেল বোট চলে।

যানজট ও অবকাঠামোগত চাপ

আবাসিক নকশায় তৈরি রাস্তার ওপর দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার বাণিজ্যিক গাড়ি, প্রাইভেট কার এবং ডেলিভারি ভ্যান চলাচলের কারণে গুলশান ১ ও ২ নম্বর সার্কেলসহ সংযোগ সড়কগুলোতে দীর্ঘ সময়জুড়ে স্থবির যানজট লেগে থাকে। বিশেষ করে স্কুল ছুটির সময় এবং অফিস টাইমে গুলশানের ট্রাফিক ব্যবস্থা একপ্রকার ভেঙে পড়ে।

কড়াইল বস্তি ও চরম সামাজিক বৈষম্য: প্রাচীরের দুই পিঠ

গুলশানের সমাজতাত্ত্বিক কাঠামোর সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য চোখে পড়ে যখন কেউ গুলশান লেকের একপারে দাঁড়িয়ে বিপরীত দিকে তাকায়। গুলশানের ওপারেই বিস্তৃত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ 'কড়াইল বস্তি'

একদিকে দেশের সবচেয়ে ধনী পরিবারগুলোর শতকোটি টাকার পেন্টহাউস, হেলিপ্যাড, এবং দামি গাড়ির বহর; আর লেকের ঠিক অপর পারেই হাজার হাজার খেটে খাওয়া, নিম্ন আয়ের মানুষের গাদাগাদি করে বাস করা জীর্ণ টিনের ঘর।

এই ভৌগোলিক নিকটত্ব কিন্তু চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য আমাদের নগর ব্যবস্থার এক করুণ সামাজিক সত্যকে তুলে ধরে। কড়াইলের অধিবাসীরাই মূলত গুলশানের রিকশাচালক, গৃহপরিচারিকা, সিকিউরিটি গার্ড ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে এই তিলত্তমা নগরীকে সচল রাখেন অথচ তারা গুলশানের জৌলুসের অংশীদার হতে পারেন না।

স্মার্ট সিটি মডেল ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ

একুশ শতকের আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুলশান বর্তমানে ঢাকার অন্যতম 'পাইলট প্রজেক্ট' হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাজউক, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (DNCC) এবং 'গুলশান সোসাইটি'-র যৌথ উদ্যোগে এলাকাটিকে আরও নিরাপদ, টেকসই এবং প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার জন্য নানা উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে।

এআই নজরদারি ও স্মার্ট সিকিউরিটি: ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের 'হোলি আর্টিজান' ট্র্যাজেডির পর পুরো কূটনৈতিক পাড়া ও আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক স্তরে পুনর্গঠন করা হয়। পুরো গুলশান এলাকাকে এখন শত শত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) চালিত সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে রাখা হয়েছে। প্রতিটি প্রবেশপথে বসানো হয়েছে স্বয়ংক্রিয় নম্বর প্লেট সনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং বিশেষ পুলিশি চেকপোস্ট।

লেক উন্নয়ন ও পরিবেশ পুনরুদ্ধার: রাজউক গৃহীত ‘গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় লেকের পার ধরে আধুনিক ওয়াকওয়ে (Walkway), সাইকেলিং ট্র্যাক, সবুজ পার্ক এবং ওয়াটার বোট সার্ভিস চালু করা হয়েছে। লেকের সুয়ারেজ লাইন বিচ্ছিন্ন করে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে পানি পরিষ্কার রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা আদি প্রকৃতির কিছু ছোঁয়া ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

পরিবর্তনের চিরন্তন ধারা ও শেকড় স্মরণের দায়

একটি নিভৃত, বন্যপ্রাণীতে ঘেরা island-like জনপদ 'ভোলা গ্রাম' থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ধনাঢ্য ও কূটনৈতিক কেন্দ্র 'গুলশান'-এ পরিণত হওয়ার গল্পটি কেবল একটি জায়গার ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়। এটি মূলত স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নগরায়ন, বিশ্বায়ন এবং সামাজিক শ্রেণি-রূপান্তরের এক প্রতিচ্ছবি।

আজকে যখন আপনি বা আমি গুলশানের আধুনিকতম কোনো কফি শপে বসে ক্যাপুচিনো বা ল্যাটে-তে চুমুক দিই, অথবা কাঁচের তৈরি স্কাইস্ক্রেপারের ঝলমলে কাঁচের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হই তখন একবারের জন্য হলেও অতীতকে স্মরণ করা উচিত। মাত্র ৬০-৭০ বছর আগেও এই সুউচ্চ বিল্ডিংগুলোর জায়গায় বাতাসে দুলত গজারি গাছের পাতা, মাটির মেঠো পথে হেঁটে যেত নদীভাঙা সাধারণ কৃষক, আর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসত মেছো বাঘের গর্জন বা শেয়ালের হুক্কাহুয়া।

নগর পরিবর্তন হবে, আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্রাচীন বিলুপ্ত হবে এটাই স্বাভাবিক ও চিরন্তন নিয়ম। কিন্তু এই আধুনিকতার উত্তুঙ্গ শিখরে দাঁড়িয়েও আমাদের উচিত ইতিহাসের সেই শেকড়কে ভুলে না যাওয়া। ভোলা গ্রামের সেই মেঠো পথ আর কৃষিজীবীদের ঘামের ইতিহাসই আজকের গুলশানের আসল ভিত্তিপ্রস্তর। সেই ইতিহাসকে মনে রাখাই হবে আমাদের সচেতন নগরায়ন ও আত্ম পরিচয়ের শ্রেষ্ঠ স্মারক।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.