সিলেটে হযরত শাহ পরান (রহঃ) ও তাঁর দরগাহ শরীফের ইতিহাস
সিলেটকে বলা হয় ৩৬০ আউলিয়ার পুণ্যভূমি। এই জনপদের পরতে পরতে মিশে আছে সুফি-সাধকদের পবিত্র স্মৃতি এবং আধ্যাত্মিকতার সুবাস। সুরমা নদীর তীরের এই প্রাচীন জনপদকে যারা ইসলামের আলোয় আলোকিত করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হলেন হযরত শাহ পরান ইয়ামেনী (রহঃ)। সিলেটের এই আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কথা বললে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর নামের পর যে নামটি সবচেয়ে বেশি ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন হযরত শাহপরাণ ইয়ামেনী (রহ.)। তিনি কেবল একজন সুফি সাধকই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন সুলতান-উল-বেঙ্গল হযরত শাহ জালাল (রহঃ)-এর অত্যন্ত প্রিয় ভাগ্নে এবং সুযোগ্য সফরসঙ্গী।
তিনি ছিলেন কেবল একজন সুফি সাধকই নন, বরং একজন বীর মুজাহিদ এবং সমাজ সংস্কারক। আজ আমরা এই মহান বুজুর্গের জীবন, তাঁর সিলেট আগমন এবং আধ্যাত্মিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ইয়ামেন থেকে সিলেট
হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর প্রকৃত নাম ছিল হযরত শাহ মুহাম্মদ। হযরত শাহ পরান (রহঃ)-এর জন্ম মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়ামেনে। তাঁর নামের সাথে ‘ইয়ামেনী’ যুক্ত হওয়ার কারণ তিনি আরবের ইয়ামেন প্রদেশ থেকে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে এই উপমহাদেশে এসেছিলেন।
বংশপরম্পরায় তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন একটি পরিবার। শৈশব থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী এবং খোদাভীরু ছিলেন। পার্থিব ধন-সম্পদ বা রাজকীয় বিলাসিতার চেয়ে আল্লাহর ইবাদত ও আত্মশুদ্ধিতেই তিনি পরম আনন্দ খুঁজে পেতেন। তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিক জগতের সম্রাট হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর ভাগ্নে। যখন তাঁর মামা হযরত শাহ জালাল (রহঃ) ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের ঐশ্বরিক আদেশ পান, তখন শাহ পরান (রহঃ)ও সেই মহান কাফেলায় শরিক হন।
বাংলায় আগমন
চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যখন ভারত উপমহাদেশে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন হযরত শাহজালাল (রহ.) তাঁর ৩৬০ জন সঙ্গী নিয়ে সিলেটে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এই কাফেলায় হযরত শাহপরাণ (রহ.) ছিলেন অন্যতম প্রধান সেনানি। ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে (৭০৩ হিজরি) তিনি শাহ জালাল (রহঃ)-এর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক সিলেট বিজয়ে অংশ নেন।
সিলেট বিজয় ও ইসলাম প্রচার: তৎকালীন রাজা গৌর গোবিন্দের অপশাসনের হাত থেকে স্থানীয় মজলুম মানুষদের রক্ষা এবং তাওহীদের বাণী প্রচারের লক্ষ্যে এই মহান সাধকরা সিলেটে পদার্পণ করেন। শাহপরাণ (রহ.) কেবল তসবিহ হাতে জিকিরই করেননি, বরং প্রয়োজনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঢাল-তলোয়ার নিয়েও দাঁড়িয়েছিলেন।
রাজা গৌর গোবিন্দের বিরুদ্ধে সেই বিজয়ের পর সিলেটের একেক এলাকায় ইসলাম প্রচারের জন্য একেকজন আউলিয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। শাহ পরান (রহঃ) সিলেট শহরের পূর্ব দিকের নির্জন এলাকাকে তাঁর সাধনার স্থান হিসেবে বেছে নেন। তিনি শাহজালাল (রহ.)-এর নির্দেশে সিলেটের উত্তর-পূর্ব দিকে বর্তমান শাহপরাণ এলাকায় বসতি স্থাপন করেন এবং সেখানে খানকাহ প্রতিষ্ঠা করে সাধারণ মানুষকে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আমন্ত্রণ জানাতে থাকেন।
‘শাহপরাণ’ নামকরণের নেপথ্যে
তাঁর প্রকৃত নাম হলো শাহ মুহাম্মদ। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, তাঁর নাম শাহপরাণ হলো কেন? এর পেছনে অত্যন্ত চমৎকার এবং আধ্যাত্মিক কিছু জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে।
১. পাহাড়ি অবস্থান: ‘পরাণ’ শব্দটি ফারসি বা স্থানীয় অপভ্রংশ হতে পারে যা উঁচু বা টিলা বুঝায়। যেহেতু তাঁর আস্তানা ছিল পাহাড়ের চূড়ায়, তাই ভক্তরা তাঁকে শাহপরাণ নামে ডাকতে শুরু করেন।
২. আধ্যাত্মিক ক্ষমতা: লোকমুখে শোনা যায়, তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাবে মৃতপ্রায় হৃদয়ে ‘প্রাণ’ বা ঈমানি শক্তি ফিরে আসত, যা থেকে কালক্রমে তাঁর নাম শাহপরাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. অন্যান্য মত: কেউ কেউ বলেন, তিনি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করতে পারতেন, যা দেখে মানুষ মনে করত তিনি বাতাসের মতো বা প্রাণের বেগে চলছেন।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
হযরত শাহপরাণ (রহ.) ছিলেন বিনয় ও পরহেজগারির মূর্ত প্রতীক। তাঁর চরিত্রের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি, দুনিয়াবি বিরাগ এবং মানবসেবা।
তিনি সর্বদা আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকতেন। গভীর রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, তিনি তখন জায়নামাজে চোখের পানি ফেলতেন। রাজপরিবারের সাথে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। মোটা কাপড় পরা এবং সাধারণ খাবার গ্রহণ করা ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য।
জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অভাবী ও অসুস্থ মানুষের সেবা করা ছিল তাঁর প্রতিদিনের রুটিন। তাঁর খানকায় আসা কোনো মানুষ কখনো খালি হাতে ফিরে যেত না।
দরগাহ শরীফের অবস্থান ও ভৌগোলিক গুরুত্ব
সিলেট শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে একটি নয়নাভিরাম পাহাড়ি টিলার ওপর অবস্থিত হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার বা দরগা শরীফ। এটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং সিলেটের অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান।
স্থানটির নাম খাদিম নগর এলাকা। আগে এটি 'খাদিম পাড়া' নামে পরিচিত ছিল। পাহাড় আর টিলা ঘেরা এই চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশে হযরত শাহ পরান (রহঃ)-এর মাজার শরীফ অবস্থিত।
দরগা শরীফের বৈশিষ্ট্যসমূহ
প্রাকৃতিক পরিবেশ: মাজারটি অনেক উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় এখান থেকে চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চমৎকারভাবে উপভোগ করা যায়। বিশাল বড় একটি প্রাচীন গাছ (যাকে স্থানীয়রা মহুয়া গাছ বলেন) দরগা প্রাঙ্গণে ছায়া দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জিয়ারতকারীদের ভিড়: প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এখানে ছুটে আসেন। কেউ আসেন দোয়া করতে, কেউ আসেন কোরআন তিলাওয়াত করতে, আবার কেউ আসেন মানসিক অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে।
ঐতিহাসিক স্থাপনা: মাজার সংলগ্ন মসজিদটি মুঘল স্থাপত্যশৈলীর ছাপ বহন করে। এখানকার পরিবেশ অত্যন্ত শান্ত ও গাম্ভীর্যপূর্ণ।
বলা হয়, শাহ পরান (রহঃ) এই টিলার ওপর বসে ইবাদত করতেন এবং তাঁর অনুসারীদের সুফি দর্শনের শিক্ষা দিতেন। বর্তমানে এটি কেবল একটি মাজার নয়, বরং কয়েকশ বছরের পুরনো এক স্থাপত্য ঐতিহ্যের স্মারক।
আধ্যাত্মিক সুরাওয়ার্দিয়া ও জালালিয়া তরিকা
হযরত শাহ পরান (রহঃ) ছিলেন সুরাওয়ার্দিয়া এবং জালালিয়া তরিকার একজন অন্যতম দিকপাল। সুফিবাদের এই ধারাগুলো মূলত মানুষের মনের পবিত্রতা এবং স্রষ্টার সাথে আধ্যাত্মিক সংযোগ স্থাপনের ওপর জোর দেয়।
সুরাওয়ার্দিয়া তরিকা: এই তরিকার শিক্ষা হলো কঠোর আত্মসংযম এবং মানুষের সেবার মাধ্যমে স্রষ্টাকে পাওয়া।
জালালিয়া তরিকা: শাহ জালাল (রহঃ)-এর অনুসারী ও মুরিদদের যে ধারা তৈরি হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিলেন শাহ পরান (রহঃ)।
তাঁর সহজ-সরল জীবন যাপন এবং মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা দেখে তৎকালীন সাধারণ মানুষ দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করে।
ঐতিহাসিক টিলা ও প্রাচীন স্থাপত্য
শাহ পরান (রহঃ)-এর দরগাহ শরীফে পৌঁছাতে হলে সিঁড়ি বেয়ে একটি ছোট টিলার ওপর উঠতে হয়। এই টিলার উপরেই তাঁর পবিত্র মাজার অবস্থিত। মাজারের পাশেই রয়েছে একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। মোঘল আমলের স্থাপত্য শৈলীর আদলে তৈরি এই মসজিদ এবং দরগাহের কাঠামো পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
দরগাহ প্রাঙ্গণে রয়েছে কয়েকশ বছরের পুরনো একটি বিশাল গাছ, যাকে স্থানীয়রা 'হিজল গাছ' বা ভিন্ন নামেও ডাকেন। কিংবদন্তি আছে, এই গাছের নিচেই তিনি ধ্যান করতেন। যদিও সুফিবাদে মূল ইবাদত স্রষ্টার জন্য, তবে ভক্তরা এই স্থানটিকে বরকতময় মনে করেন।
কেন এই দরগাহ সিলেটবাসীর কাছে এত পবিত্র?
সিলেটে আগত যে কোনো পর্যটক বা জিয়ারতকারী প্রথমেই হযরত শাহ জালাল (রহঃ)-এর মাজারে যান এবং এরপর অবধারিতভাবেই হযরত শাহ পরান (রহঃ)-এর মাজারে আসেন। একে বলা হয় 'পরিপূরক জিয়ারত'।
১৩০৩ সালের পর থেকে এই স্থানটি উত্তর-পূর্ব বাংলার ইসলামি শিক্ষার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ এখানে আসেন মানসিক শান্তির খোঁজে। সুফিবাদের মূল শিক্ষা "সকলের তরে সকলে আমরা" এর প্রতিফলন এখানে দেখা যায়।
প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে দরগাহে ওরস মোবারক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ একত্রিত হন।
শাহ পরান (রহঃ)-এর জীবনের কিছু কিংবদন্তি
বাংলার জনপদে আউলিয়াদের নিয়ে অনেক লোককথা প্রচলিত আছে। শাহ পরান (রহঃ)-এর ক্ষেত্রে একটি বিখ্যাত কাহিনী হলো তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা। জনশ্রুতি আছে, তাঁর মামা শাহ জালাল (রহঃ) একবার তাঁকে কবুতর জবাই না করার অনুরোধ করেছিলেন (মতান্তরে একটি বিশেষ পরীক্ষা ছিল), কিন্তু শাহ পরান (রহঃ) তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় মৃত কবুতরকে আকাশে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
এই ঘটনার পর থেকেই তাঁর নামের সাথে 'পরান' (যার অর্থ আত্মা বা প্রাণ) শব্দটি যুক্ত হয় বলে অনেকে মনে করেন। যদিও এগুলো লোকগাথা, তবে তা জনমনে তাঁর প্রভাবের গভীরতাই ফুটিয়ে তোলে।
আধুনিকায়ন ও জিয়ারতকারীদের সুযোগ-সুবিধা
বর্তমানে শাহ পরান (রহঃ) দরগাহ শরীফ অনেক আধুনিক করা হয়েছে। প্রশস্ত রাস্তা, জিয়ারতকারীদের জন্য ওজুখানা এবং বিশ্রামাগারের ব্যবস্থা রয়েছে। সিলেটের খাদিম নগর এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থাও এখন অত্যন্ত উন্নত।
কীভাবে যাবেন: সিলেট কদমতলী বাস টার্মিনাল বা রেল স্টেশন থেকে সিএনজি বা অটো রিকশায় খুব সহজেই দরগাহে যাওয়া যায়।
দরগাহ দেখে আপনি কাছেই অবস্থিত খাদিম নগর ন্যাশনাল পার্ক বা চা বাগানগুলো ভ্রমণ করতে পারেন।
আধ্যাত্মিকতার শেষ আশ্রয়স্থল
হযরত শাহ পরান (রহঃ) কেবল ইতিহাসের কোনো এক সুদূর অতীতে হারিয়ে যাওয়া নাম নন, তিনি আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন তাঁর কর্ম এবং দর্শনের মাধ্যমে। তাঁর দরগাহ শরীফ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ত্যাগের মাধ্যমেই প্রকৃত শান্তি অর্জিত হয়। আপনি যদি মনের শান্তি খুঁজতে চান বা বাংলার সমৃদ্ধ ইসলামি ঐতিহ্যকে কাছ থেকে দেখতে চান, তবে সিলেটের শাহ পরান (রহঃ) দরগাহ শরীফ আপনার জন্য এক অপরিহার্য গন্তব্য।
শান্তি ও আধ্যাত্মিকতার এই পুণ্যভূমি হোক আমাদের সবার জন্য এক ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণার উৎস। আপনি কি শাহ পরান (রহঃ) দরগাহ শরীফ ভ্রমণ করেছেন?




















