বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা জটিল সংকট

বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা জটিল সংকট

বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তের একটি সাধারণ সরকারি হাসপাতালে পা রাখলেই যে কেউ এক অদ্ভুত ও শিউরে ওঠার মতো সমান্তরাল বাস্তবতার মুখোমুখি হবেন। চারিদিকে মানুষের গিজগিজে ভিড়, বাতাসে ভ্যাপসা ঘামের গন্ধ, রোগ আর যন্ত্রণার চড়া গন্ধ, গরমে সেদ্ধ হওয়া ওয়ার্ড, নোংরা উপচে পড়া বাথরুম, আর বিছানা না পেয়ে ফ্লোরে কিংবা বারান্দার ধুলোবালির মধ্যে চাদর বিছিয়ে শুয়ে থাকা সারিবদ্ধ রোগী। একটু এগোলেই শোনা যায় কান্নার আওয়াজ কোথাও সেন্ট্রাল অক্সিজেন নেই, কোথাও জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ মিলছে না, এক্স-রে কিংবা এমআরআই মেশিনটি বছরের পর বছর ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে, আর মাত্র ১ জন ডিউটি ডাক্তারের সামনে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে ২০০ জন মুমূর্ষু রোগী।

এটি কোনো কাল্পনিক চলচ্চিত্রের দৃশ্য নয়, বরং বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডের প্রতিদিনের নির্মম ও চিরচেনা চিত্র। এই চরম অমানবিক পরিবেশ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে সাধারণ মানুষ ভুগলেও, তাদের পক্ষে নীতিনির্ধারকদের কাছে শক্তভাবে কথা বলার কেউ নেই। দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আজ এমন এক জটিল ও পদ্ধতিগত সংকটের মুখোমুখি, যা সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারকেই সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে।

সরকারি হাসপাতালের এই দুঃসহ পরিবেশের কারণে বাধ্য হয়েই নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ তাদের শেষ সম্বল বিক্রি করে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালের দ্বারস্থ হন, যা তাদের ঠেলে দেয় এক অন্ধকার আর্থিক দেউলিয়াত্বের দিকে। অথচ একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের। বাংলাদেশে যেখানে স্বাস্থ্য খাতে মোট বাজেটের মাত্র ৪.৯% বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রস্তাবিত ১৫% এর তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য, সেখানে এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ছাড়া সাধারণ নাগরিকের মুক্তি অসম্ভব। এই বিস্তারিত প্রবন্ধে আমরা বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্য সংকটের গভীরতম কারণ, বেসরকারি খাতের আগ্রাসী বিকল্প এবং এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের সুনির্দিষ্ট পথ নিয়ে আলোচনা করব।

সরকারি হাসপাতালের বাস্তব চিত্র: সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানবিক বিপর্যয়

কাগজে-কলমে বাংলাদেশে সরকারি চিকিৎসা অবকাঠামোর একটি বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। সারা দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৭৫০টি সরকারি হাসপাতাল রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বিভাগীয় স্তরের বৃহৎ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট, জেলা সদর হাসপাতাল এবং একদম তৃণমূল পর্যায়ের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কিন্তু এই বিশাল কাঠামোর ভেতরে সেবার গুণগত মান এবং লজিস্টিক সাপোর্ট কতটা নড়বড়ে, তা কিছু সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যায়।

বেড ও চিকিৎসকের তীব্র অনুপাত বৈষম্য

দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় হাসপাতালের ধারণক্ষমতা বাড়েনি। বর্তমানে দেশে প্রতি ১,২০০ জন মানুষের জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ১টি সরকারি হাসপাতালের বেড। এর চেয়েও বড় বিপর্যয় রয়েছে জনবলে; প্রতি ১,৫৮১ জন নাগরিকের বিপরীতে মাত্র ১ জন নিবন্ধিত চিকিৎসক রয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ১০,০০০ মানুষের জন্য যে পরিমাণ চিকিৎসক থাকা প্রয়োজন, বাংলাদেশে তা মাত্র ৮ জন। ফলে একজন সরকারি ডাক্তারকে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ জন রোগী দেখতে হয়। এই বিপুল চাপের কারণে একজন রোগী ডাক্তারের কাছ থেকে গড়ে ১ থেকে ২ মিনিটের বেশি সময় পান না, যা মানসম্মত ও নির্ভুল চিকিৎসাপ্রদানের ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায়।

অবকাঠামোগত ও ডায়াগনস্টিক সরঞ্জামের ঘাটতি

সেবা খাতের বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণায় উঠে এসেছে সরকারি হাসপাতালগুলোর এক ভয়ংকর চিত্র:

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট: দেশের প্রায় ৪৩% সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকে না অথবা ব্যাকআপ জেনারেটর সুবিধা অত্যন্ত দুর্বল। অস্ত্রোপচারের মাঝখানে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার মতো ঘটনাও এখানে বিরল নয়।

ল্যাব ও জীবাণুনাশক সংকট: প্রায় ৩৪.৫% হাসপাতালে মৌলিক ল্যাবরেটরি বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো সুবিধাই নেই। এমনকি হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল জায়গায়, যেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, সেখানকার ২১.৫% হাসপাতালে পর্যাপ্ত জীবাণুনাশক বা স্যানিটাইজেশন সামগ্রী থাকে না।

জরুরি পরিবহনের অভাব: প্রায় ৫.১% তৃণমূল হাসপাতালে কোনো কার্যকর অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি পরিবহন সুবিধা নেই, যার ফলে মুমূর্ষু রোগীকে সময়মতো উন্নত সেন্টারে স্থানান্তর করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

নষ্ট যন্ত্রপাতির সিন্ডিকেট: দেশের প্রায় ৬০% সরকারি হাসপাতালে আধুনিক ডায়াগনস্টিক সরঞ্জাম (যেমন সিটি স্ক্যান, এমআরআই বা এক্স-রে মেশিন) হয় নেই, আর যদি থাকেও তবে তা বিকল হয়ে পড়ে আছে। অনেক সময় হাসপাতালের ভেতরের একটি অসাধু চক্র এবং বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর মালিকদের যোগসাজশে ইচ্ছাকৃতভাবে এই সরকারি মেশিনগুলো নষ্ট করে রাখা হয়, যাতে রোগীরা বাইরে থেকে চড়া মূল্যে পরীক্ষা করতে বাধ্য হন।

এই সমস্ত প্রতিবন্ধকতা সরকারি হাসপাতালগুলোকে সাধারণ মানুষের জন্য একটি দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। ফলস্বরূপ, জীবন বাঁচাতে মানুষ বাধ্য হয়েই বেসরকারি খাতের দিকে পা বাড়ায়।

বেসরকারি হাসপাতাল ও ব্যয়বহুল বিকল্প: চিকিৎসার নামে দেউলিয়া হওয়ার ফাঁদ

সরকারি ব্যবস্থার এই চরম ব্যর্থতার ওপর ভর করেই বাংলাদেশে বেসরকারি চিকিৎসানির্ভর বাণিজ্য এক বিশাল রূপ ধারণ করেছে। বর্তমানে দেশে বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৫,০০০-এর বেশি, এবং এর পাশাপাশি গড়ে উঠেছে ১০,০০০-এরও বেশি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

মূল্য নিয়ন্ত্রণের অভাব ও লাগামহীন খরচ

বেসরকারি চিকিৎসা খাতের সবচেয়ে বড় অন্ধকার দিকটি হলো এখানে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্ট্যান্ডার্ড রেট বা মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। যার ফলে প্রতিটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার তাদের নিজেদের ইচ্ছামতো কেবিন ভাড়া, আইসিইউ (ICU) চার্জ, ওটি (OT) ফি এবং ডাক্তারদের ভিজিট নির্ধারণ করে। একটি সাধারণ অ্যাপেন্ডিসাইটিস বা সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য বেসরকারি হাসপাতালে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে যায়। আর যদি রোগী আইসিইউ বা লাইফ সাপোর্টে চলে যান, তবে প্রতিদিনের বিল ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

ওষুধের চড়া মূল্য ও চরম অর্থনৈতিক দারিদ্র্য

বাংলাদেশের মোট চিকিৎসা খরচের সিংহভাগই চলে যায় ওষুধ কিনতে। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন রোগীর মোট চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৬৪% খরচ হয় শুধু ফার্মেসির ওষুধের পেছনে। এই বিপুল আউট-অফ-পকেট এক্সপেনডিচার (Out-of-Pocket Expenditure) বা পকেট থেকে দেওয়া খরচের কারণে দেশের মানুষের ওপর এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়।

ঋণের ফাঁদ: বাংলাদেশে প্রায় ৭০% পরিবারকে তাদের স্বজনের চিকিৎসার খরচ মেটানোর জন্য নিজেদের জমিজমা বিক্রি করতে হয়, সঞ্চয় শেষ করতে হয় অথবা চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হতে হয়।

নতুন দরিদ্র জনগোষ্ঠী: একটি আন্তর্জাতিক গবেষণার চমকপ্রদ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৬.১ মিলিয়ন (৬১ লক্ষ) মানুষ শুধুমাত্র চিকিৎসার চড়া খরচ মেটাতে গিয়ে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যান। অর্থাৎ, একটি রোগ একটি সচ্ছল পরিবারকে রাতারাতি ভিখারিতে পরিণত করতে পারে।

বেসরকারি হাসপাতাল কি সত্যিই এককভাবে দায়ী?

সাধারণ মানুষের মধ্যে বেসরকারি হাসপাতালের উচ্চ বিল নিয়ে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে এবং প্রায়শই চিকিৎসকদের এই জন্য খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তব ও ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বেসরকারি হাসপাতালগুলো কোনো চ্যারিটি বা দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়; এগুলো উচ্চ বিনিয়োগের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। একটি বিশ্বমানের আধুনিক বেসরকারি হাসপাতাল বা মাল্টি-স্পেশালিটি সেন্টার স্থাপন ও তার রক্ষণাবেক্ষণে ১০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত মূলধন বিনিয়োগ করতে হয়।

এই বিশাল বিনিয়োগের বিপরীতে তাদের মুনাফা অর্জন, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ এবং উন্নত প্রযুক্তির অবচয় খরচ তুলতে হলে উচ্চ ফি নির্ধারণ করা ছাড়া তাদের উপায় থাকে না। তাই বেসরকারি খাতের উচ্চ বিলের জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করার চেয়ে আমাদের মূল মনোযোগ দেওয়া উচিত কেন রাষ্ট্র আমাদের একটি সস্তা ও মানসম্মত সরকারি বিকল্প দিতে পারছে না, সেই দিকে।

সরকারি স্বাস্থ্য সংকটের মূল কারণসমূহ: পদ্ধতিগত ত্রুটির ব্যবচ্ছেদ

বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্য খাতের এই দীর্ঘস্থায়ী পচনের পেছনে মূলত চারটি বড় নীতিগত ও প্রশাসনিক কারণ দায়ী:

জিডিপি ও জাতীয় বাজেটের চরম অপ্রতুলতা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) গাইডলাইন অনুযায়ী, যেকোনো দেশের টেকসই স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য জাতীয় বাজেটের অন্তত ১৫% অথবা দেশের মোট জিডিপির (GDP) ৫% স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা উচিত। অথচ বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির মাত্র ০.৭% বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। এই নামমাত্র বাজেটের সিংহভাগই চলে যায় সরকারি কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের বেতন-ভাতা দিতে; ফলে হাসপাতালের আধুনিকায়ন, নিখরচায় ওষুধ বিতরণ বা নতুন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য কোনো অর্থই অবশিষ্ট থাকে না।

শূন্য পদের হাহাকার ও প্রশাসনিক অবহেলা

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনবলের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। অনুমোদিত পদের প্রায় ৩০% পদই স্থায়ীভাবে শূন্য পড়ে আছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক টেকনিশিয়ান না থাকায় কোটি কোটি টাকার রেডিওলজি মেশিন বাক্সবন্দী হয়ে নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ গ্রামীণ বা উপজেলা পর্যায়ে বদলি হলেও সেখানে আবাসন ও নিরাপত্তার অভাবে থাকতে চান না, যা শহরকেন্দ্রিক চাপকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

টিআইবি (TIB) এর রিপোর্টে উঠে আসা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) এর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্য খাতের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি মজ্জাগত হয়ে গেছে। ওষুধ কেনাকাটা, হাসপাতালের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি (যেমন এমআরআই বা লিনিয়ার এক্সিলারেটর) চড়া মূল্যে ক্রয় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকার ঘুষের লেনদেন হয়। দুর্নীতির মাধ্যমে কেনা নিম্নমানের যন্ত্রপাতি অল্প দিনেই নষ্ট হয়ে যায়, যার খেসারত দিতে হয় সাধারণ রোগীদের।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অকার্যকারিতা ও রেফারেল সিস্টেমের অভাব

উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো (Community Clinics) সঠিকভাবে কার্যকর না হওয়ায়, একজন রোগী সাধারণ সর্দি-জ্বর বা পেটের অসুখের জন্যও সরাসরি ঢাকা মেডিকেল বা বড় বিভাগীয় হাসপাতালে চলে আসেন। একটি সুনির্দিষ্ট রেফারেল সিস্টেম (যেখানে প্রাথমিক ডাক্তার না পাঠালে বড় হাসপাতালে যাওয়া যায় না) না থাকায় টারশিয়ারী হাসপাতালগুলোর ওপর ধারণক্ষমতার চেয়ে ৫০০ গুণ বেশি চাপ সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের তুলনামূলক ল্যান্ডস্কেপ ও সংকট সূচক

নিচে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান বাস্তব অবস্থা এবং সংকটের মূল সূচকগুলো একটি সমন্বিত টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

স্বাস্থ্য খাতের সূচক / ক্ষেত্র

বর্তমান পরিসংখ্যান ও ডেটা

বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব

সংকট নিরসনে নীতিগত করণীয়

জাতীয় বাজেট বরাদ্দ

মোট বাজেটের মাত্র ৪.৯% (জিডিপির ০.৭%)

WHO-এর প্রস্তাবিত ১৫% এর চেয়ে কম হওয়ায় ওষুধ ও সরঞ্জামের তীব্র সংকট।

স্বাস্থ্য খাতের বাজেট জিডিপির অন্তত ৩% থেকে ৫% এ উন্নীত করা।

চিকিৎসক ও বেডের অনুপাত

বেড: ১:১,২০০ জন



নিবন্ধিত চিকিৎসক: ১:১,৫৮১ জন

সরকারি হাসপাতালে মেঝেতে রোগী থাকা এবং চিকিৎসকের ওপর অতিরিক্ত কর্মচাপ।

নতুন পদ সৃষ্টি ও দ্রুত নিয়োগের মাধ্যমে শূন্য ৩০% পদ পূরণ করা।

লজিস্টিক ও অবকাঠামো সংকট

৪৩% হাসপাতালে বিদ্যুৎ থাকে না, ৩৪.৫% ল্যাব সুবিধা বঞ্চিত।

রোগীরা সাধারণ পরীক্ষার জন্যও বাইরের ল্যাবে যেতে বাধ্য হন।

প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ২৪/৭ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করা।

ওষুধের ব্যক্তিগত খরচ (Out-of-Pocket)

মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ৬৪%

দরিদ্র পরিবারগুলো ওষুধ কিনতে গিয়ে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে।

সরকারি হাসপাতালে নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধ ১০০% বিনামূল্যে সরবরাহ করা।

বেসরকারি খাতের বিস্তার

৫,০০০+ হাসপাতাল, ১০,০০০+ ডায়াগনস্টিক সেন্টার

কোনো মূল্য নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি সেবার জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড সর্বোচ্চ মূল্যসীমা নির্ধারণ।

চিকিৎসা ব্যয়জনিত দারিদ্র্য

প্রতি বছর ৬.১ মিলিয়ন মানুষ নতুন করে দরিদ্র হন

স্বাস্থ্যসেবার উচ্চ মূল্য দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

সার্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা (Universal Health Insurance) চালু করা।

দুর্নীতি ও ক্রয়ে অনিয়ম (TIB ডেটা)

ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রায় ৬০% যন্ত্রপাতি অকেজো বা অব্যবহৃত থাকে

রাষ্ট্রীয় ফান্ডের অপচয় এবং ডায়াগনস্টিক সিন্ডিকেটের চক্রান্ত।

ই-টেন্ডারিং এবং স্বাধীন অডিট কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

কেমন হওয়া উচিত আমাদের স্বাস্থ্য খাত?

বাংলাদেশের এই মরণাপন্ন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে কোনো জোড়াতালির সংস্কারে কাজ হবে না; এর জন্য প্রয়োজন একটি আমূল ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন। নিম্নে সাতটি সুনির্দিষ্ট সমাধানের পথ আলোচনা করা হলো:

স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধি (১৫%) ➔ অবকাঠামো ও সরঞ্জাম আধুনিকায়ন ➔ দুর্নীতি প্রতিরোধ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ ➔ সার্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা ➔ মানসম্মত নিখরচায় চিকিৎসা

স্বাস্থ্য খাতে বাজেট ও জিডিপি বরাদ্দ বাড়ানো

সরকারকে অনতিবিলম্বে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বর্তমানের ৪.৯% থেকে বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে ১৫% এ উন্নীত করতে হবে। মেগা প্রজেক্টগুলোর পাশাপাশি মানুষের জীবন বাঁচানোর এই প্রজেক্টে অর্থায়ন করা এখন সময়ের দাবি। বাজেট বাড়লে প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে মানসম্মত ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

আধুনিক অবকাঠামো ও বিকেন্দ্রীকরণ

প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে অন্তত একটি করে আধুনিক এমআরআই (MRI) এবং সিটি স্ক্যান (CT Scan) মেশিন স্থাপন করতে হবে এবং এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারদের স্থায়ীভাবে নিয়োগ দিতে হবে। চিকিৎসকদের গ্রামীণ এলাকায় ধরে রাখার জন্য বিশেষ লোন, উন্নত আবাসন এবং গ্রামীণ অ্যালাউন্স (Rural Allowance) প্রদান করা উচিত।

দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট নির্মূল করা

হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা আনতে হবে। মেডিকেল ইকুইপমেন্ট ক্রয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক থার্ড-পার্টি অডিট ব্যবস্থার প্রবর্তন করা যেতে পারে। যেসকল সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী বাইরের প্রাইভেট ক্লিনিকের সাথে যুক্ত থেকে সরকারি মেশিন নষ্ট করার পেছনে ভূমিকা রাখে, তাদের সরাসরি চাকরি থেকে বরখাস্ত ও কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

সার্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা (Universal Health Insurance) প্রবর্তন

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য বীমা মডেল। সরকার প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রিমিয়ামের বিনিময়ে (যা দরিদ্রদের জন্য রাষ্ট্র বহন করবে) স্বাস্থ্য কার্ড ইস্যু করতে পারে। এর ফলে যেকোনো বড় অপারেশনের খরচ সরাসরি বীমা কোম্পানি রাষ্ট্রীয় ফান্ড থেকে পরিশোধ করবে, যা সাধারণ মানুষকে ঋণের হাত থেকে বাঁচাবে।

সফল বৈশ্বিক মডেল থেকে শিক্ষা গ্রহণ

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে সফল দুটি মডেল থেকে শিক্ষা নিতে পারে:

থাইল্যান্ডের ইউএইচসি (UHC) মডেল: থাইল্যান্ড তাদের ‘সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা’ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ৯৮% মানুষকে প্রায় বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে উন্নত চিকিৎসা প্রদান করে, যা তাদের দেশের মানুষের গড় আয়ু ও কর্মক্ষমতা বাড়িয়েছে।

ভারতের নিখরচায় ডায়াগনস্টিক মডেল: ভারতের কিছু রাজ্যে (যেমন রাজস্থান ও তামিলনাড়ু) সরকারি হাসপাতালে সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ওষুধ শতভাগ বিনামূল্যে দেওয়া হয়, যা সফলভাবে প্রাইভেট ল্যাবগুলোর সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়েছে।

করদাতা হিসেবে জনগণ প্রশ্ন তুলতে হবে আজই

স্বাস্থ্য খাতের এই দুরাবস্থার জন্য জনগণের অসচেতনতা এবং ভুল জায়গায় ক্ষোভ প্রকাশ করাও আংশিক দায়ী। আমরা যখন বেসরকারি হাসপাতালের উচ্চ বিল দেখি, তখন আমরা হাসপাতালের কাউন্টারে ভাঙচুর করি বা ডাক্তারদের ওপর চড়াও হই। কিন্তু আমরা কখনো ঠান্ডা মাথায় ভাবি না যে, কেন আমাদের এই প্রাইভেট হাসপাতালে আসতে হলো?

আমাদের দেশের সাধারণ ও মধ্যবিত্ত নাগরিকরা তাদের দৈনন্দিন কেনাকাটায় ভ্যাট (VAT) দেন এবং আয়ের একটি বড় অংশ ট্যাক্স (Tax) হিসেবে রাষ্ট্রকে প্রদান করেন। করদাতা হিসেবে প্রতিটি নাগরিকের উচিত সরকারকে সরাসরি এবং সাহসের সাথে এই প্রশ্নটি করা:

“আমরা আমাদের আয়ের ৫% থেকে ২৫% পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ট্যাক্স রাষ্ট্রকে দিচ্ছি, তবুও কেন আমাদের একটি সরকারি হাসপাতালে সামান্য একটু সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার নেই? কেন আমাদের স্বজনদের চিকিৎসার জন্য শেষ সম্বল বিক্রি করে বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হবে?”

জনগণের পক্ষ থেকে যখন এই জবাবদিহিতার দাবিটি জোরালো হবে, তখনই কেবল রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হবে।

একটি সুস্থ ও মানবিক বাংলাদেশের প্রত্যাশা

বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর বর্তমান জরাজীর্ণ ও অমানবিক অবস্থা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ওপর একটি বড় কলঙ্ক। আমরা অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছি, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ যদি একটি রোগের চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে যায়, তবে সেই বাহ্যিক উন্নয়নের কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকে না।

এই মহাসংকটের সমাধান বেসরকারি হাসপাতালের বিল জোর করে কমানো বা তাদের ওপর লাঠি ঘোরানো নয়; এর একমাত্র টেকসই সমাধান হলো সরকারি হাসপাতালের সেবার মানকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাতে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে সেখানে যায়। রাষ্ট্রীয় বাজেট বৃদ্ধি, শূন্য পদে সৎ ও দক্ষ জনবল নিয়োগ, ডায়াগনস্টিক সিন্ডিকেট ও দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য কাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমেই কেবল এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। একটি সুস্থ, নিরোগ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে স্বাস্থ্য খাতের এই ক্ষয়িষ্ণু ক্ষতটিকে আজই সারিয়ে তুলতে হবে নতুবা জনস্বাস্থ্যের এই মরণফাঁদ একদিন পুরো সমাজব্যবস্থাকেই গ্রাস করে নেবে।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.