বাংলাদেশের প্রথম ঘোষিত বীরশ্রেষ্ঠ জগৎজ্যোতি দাস

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাসে কিছু কিছু নাম কেবল একজন ব্যক্তিসত্ত্বার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে একেকটি গোটা অঞ্চল, বৈপ্লবিক চেতনা এবং অপরাজেয় সংগ্রামের প্রতীকমাত্র। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামে ভাটি বাংলার (সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল) নদী-বিল-হাওরের বুকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের মনে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলেন যে কিংবদন্তি গেরিলা কমান্ডার তিনি হলেন জগৎজ্যোতি দাস।
মাত্র ২২ বছরের এক ডানপিটে তরুণ, যিনি নিজের অদম্য মেধা ও দুঃসাহস দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন স্বাধীন বাংলা ব্যাটালিয়নের অন্যতম দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনী ‘দাস পার্টি’। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে ১৯৭১ সালে যাকে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল, পরবর্তীতে স্বাধীনতার পর খেতাব বিন্যাসের অদ্ভুত প্রশাসনিক মারপ্যাঁচে যার নাম স্থান পায় ‘বীর বিক্রম’ তালিকায়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় দাপ্তরিক সনদে যা-ই লেখা থাক না কেন, হাওরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জগৎজ্যোতি দাস চিরকাল ‘বীরশ্রেষ্ঠ’র আসনেই সমাসীন।
এই বিস্তৃত নিবন্ধে আমরা ভাটি বাংলার এই মহানায়কের প্রারম্ভিক বৈপ্লবিক জীবন, ‘দাস পার্টি’র গঠন ও সামরিক কৌশল, একের পর এক দুঃসাহসিক নৌ-অভিযান, ১৬ নভেম্বরের ট্র্যাজিক মহাকাব্যিক যুদ্ধ, সহযোদ্ধা ও স্বজনদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা এবং স্বাধীনতার পর তাঁর খেতাব বদলের রহস্য উন্মোচন করব।
প্রারম্ভিক জীবন, সামাজিক পটভূমি ও বিপ্লবী চেতনার বিকাশ
১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল তৎকালীন সিলেট জেলার (বর্তমান হবিগঞ্জ জেলা) আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত অথচ ঐতিহ্যবাহী কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জগৎজ্যোতি দাস। তাঁর ডাকনাম ছিল 'শ্যামা'। বাবা জিতেন্দ্র দাস এবং মা হরিমতী দাসের কনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন তিনি।
রাজনীতি ও আইয়ুববিরোধী আন্দোলন
জগৎজ্যোতির শৈশব ও কৈশোর কেটেছে হাওরাঞ্চলের বর্ষার উত্তাল ঢেউ আর শুকনো মৌসুমের কর্দমাক্ত মাটির সাথে লড়াই করে। এই কঠোর প্রাকৃত কথাই তাঁর মধ্যে গড়ে তুলেছিল এক নির্ভীক শারীরিক ও মানসিক দৃঢ়তা। ১৯৬৮ সালে আজমিরীগঞ্জ হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা (ম্যাট্রিক) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তি হন।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন অগ্নিগর্ভ। সুনামগঞ্জ কলেজে অধ্যয়নকালেই জগৎজ্যোতি তৎকালীন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ)-এর সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের স্বৈরশাসন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি সুনামগঞ্জের রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
ভারতের গুয়াহাটি গমন ও গোপন সামরিক দীক্ষা
১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন চরম আকার ধারণ করলে এবং পাকিস্তানি প্রশাসনের গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি পেলে গোপন রাজনৈতিক আদেশে তিনি আসামের গুয়াহাটিতে যান। এটিই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম বড় মোড়।
ভাষা শিক্ষা ও অ্যাডাপ্টেশন: গুয়াহাটিতে অবস্থানকালে প্রখর মেধাবী জগৎজ্যোতি খুব দ্রুত হিন্দি, ইংরেজি এবং স্থানীয় অসমিয়া ভাষায় অসাধারণ পারদর্শিতা অর্জন করেন।
গেরিলা কৌশলের প্রাথমিক পাঠ: এই সময়েই তিনি ভারতের বিভিন্ন বিপ্লবী গোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসেন এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ছদ্মবেশ ধারণ, শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, ছোট অস্ত্র (পিস্তল ও রিভলভার) ব্যবহার এবং এনক্রিপ্টেড বার্তা আদান-প্রদানের প্রাথমিক কৌশল রপ্ত করেন। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে তাকে এক অতুলনীয় কৌশলবিদ হিসেবে গড়ে তোলে।
১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধ, ইকো-১ ক্যাম্প ও আধুনিক প্রশিক্ষণ
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তরুণ জগৎজ্যোতি মাতৃভূমিকে মুক্ত করার তীব্র সংকল্প নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন।
ইকো-১ ট্রেনিং ক্যাম্প (মেঘালয়)
মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বিএসএফ উচ্চ মেধা ও অদম্য মনোবলসম্পন্ন বাছাইকৃত কিছু ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন বাঙালি তরুণদের বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত করে। জগৎজ্যোতিকে পাঠানো হয় মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি এলাকা ইকো-১ (Eco-1) বিশেষ ট্রেনিং ক্যাম্পে। সেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডো ও প্যারা-রেজিমেন্টের প্রশিক্ষকদের অধীনে তিনি ২১ দিনের এক অত্যন্ত কঠোর ও উচ্চমানের গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
অর্জিত সামরিক দক্ষতা
প্রশিক্ষণকালে তিনি যেসব বিষয়ে অনন্য পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন:
১. উন্নত বিস্ফোরক ব্যবহার: ড্রাই এক্সপ্লোসিভ, সি-ফোর (C-4) এবং বিটুমিনাল চার্জ ব্যবহার করে ব্রিজের স্প্যান ও রেললাইন উড়িয়ে দেওয়া।
২. অ্যামবুশ ও কাউন্টার-অ্যামবুশ: হাওর ও ম্যানগ্রোভ এলাকায় শত্রুকে ফাঁদে ফেলার জটিল ভৌগোলিক ছক।
৩. নৌ-যুদ্ধ: প্রতিকূল আবহাওয়া ও স্রোতের মধ্যে পানিতে ডুব সাঁতার দিয়ে ট্রলার বা বার্জে লিম্পেট মাইন ও গ্রেনেড ফিট করা।
৪. ভাষাগত সুবিধা ও মিত্রবাহিনীর আস্থা: ইংরেজি ও হিন্দিতে সাবলীল হওয়ার কারণে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর ৫ নং সেক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের (যেমন: ব্রিগেডিয়ার সান সিং) সাথে তিনি সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারতেন। ফলে তাঁর দল অন্যান্য যেকোনো দলের চেয়ে দ্রুত ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র লাভ করেছিল।
‘দাস পার্টি’: ভাটি বাংলার দুর্ধর্ষ স্বতন্ত্র সামরিক ব্যাটালিয়ন
মুক্তিযুদ্ধের ৫ নং সেক্টরের (যার অধীনে ছিল সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, ছাতক এবং হবিগঞ্জের কিয়দাংশ) ভাটি অঞ্চল মূলত ছিল জলবেষ্টিত। সাধারণ স্থলযুদ্ধের চেয়ে এখানে প্রয়োজন ছিল সুনির্দিষ্ট নৌ-গেরিলা কৌশল। এই ভৌগোলিক চাহিদাকে কেন্দ্র করেই জন্ম নেয় ইতিহাসে চিরস্মরণীয় ‘দাস পার্টি’।
প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও জনবল
অনেকে মনে করেন 'দাস পার্টি' ছিল নিছক স্থানীয় একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক উপদল। এটি সম্পূর্ণ ভুল তথ্য। দাস পার্টি ছিল ৫ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মীর শওকত আলী এবং মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ড দ্বারা লিখিতভাবে স্বীকৃত একটি স্পেশাল অ্যাকশন গেরিলা ব্যাটালিয়ন।
এই বাহিনীর অফিশিয়াল নামই রাখা হয়েছিল কমান্ডার জগৎজ্যোতি দাসের নামানুসারে 'দাস পার্টি'।
সংগঠন: মাত্র ৩৬ জন চরম দুঃসাহসী ও সুশিক্ষিত গেরিলা যোদ্ধা নিয়ে এই দল গঠিত হয়। জগৎজ্যোতি ছিলেন এর সর্বাধিনায়ক এবং তাঁর ডেপুটি হিসেবে কাজ করতেন ইলিয়াস চৌধুরী এবং মোটে মিয়া।
অস্ত্রের শক্তি: ৩৬ জন সদস্যের প্রতিটি সদস্যের কাছে ছিল স্বয়ংক্রিয় এসএলআর (SLR), ২টি করে ৩-ইঞ্চি মরটার, থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল, পর্যাপ্ত সংখ্যক হ্যান্ড গ্রেনেড, বিটুমিন বিস্ফোরক এবং অন্তত তিনটি অত্যন্ত আধুনিক হালকা মেশিনগান (LMG)।
ভৌগোলিক সীমানা ও 'মুক্তাঞ্চল' ঘোষণা
দাস পার্টির বিচরণক্ষেত্র ছিল সুনামগঞ্জের দিরাই, শাল্লা, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, নেত্রকোণার খালিয়াজুড়ি, ইটনা, আজমিরীগঞ্জ এবং বানিয়াচং। বর্ষাকালে যখন সমগ্র হাওরাঞ্চল মহাসমুদ্রের রূপ নিত, তখন মোটর চালিত দ্রুতগামী বজরা ও ট্রলার নিয়ে দাস পার্টি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জলযান ও দোসরদের ওপর বাজপাখির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ত।
তাদের অসামান্য বীরত্বের কারণে ১৯৭১ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত শাল্লা, খালিয়াজুড়ি ও আজমিরীগঞ্জের বিশাল এলাকা কার্যত 'সম্পূর্ণ স্বাধীন মুক্তাঞ্চল' হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল যেখানে পাকিস্তানি পতাকার পরিবর্তে উড়ত স্বাধীন বাংলাদেশের সবুজ-লাল মানচিত্রখচিত পতাকা।
দাস পার্টির প্রধান প্রধান সামরিক অপারেশনসমূহ
দাস পার্টি ১৯৭১ সালের মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রথাগত সামরিক কৌশলকে ভুল প্রমাণিত করে একের পর এক অবিশ্বাস্য অপারেশন পরিচালনা করে। তাদের প্রধান অপারেশনগুলো নিচে বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হলো:
পাহাড়পুর অপারেশন ও পাকিস্তানি বার্জ ধ্বংস (১৬ অক্টোবর, ১৯৭১)
অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের প্রধান সরবরাহ রুট হিসেবে কুশিয়ারা ও ভেড়ামোহনা নদীকে বেছে নেয়। ১৬ই অক্টোবর জগৎজ্যোতির কাছে খবর আসে একটি বিশাল পাকিস্তানি সামরিক বার্জ অস্ত্র ও রসদ নিয়ে আজমিরীগঞ্জের দিকে আসছে।
রণকৌশল: জগৎজ্যোতি তাঁর দলকে নদীর দুই বাকে চমৎকার অ্যামবুশে বসান।
ফলাফল: বার্জটি নির্দিষ্ট দূরত্বে আসামাত্রই দাস পার্টির মরটার ও এলএমজির একযোগে হামলায় বার্জটির ইঞ্জিন কামরায় আগুন ধরে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকসহ পাকিস্তানি বার্জটি নদীর তলদেশে তলিয়ে যায়। এই ঘটনার পর ভেড়ামোহনা নদীতে পাকি বাহিনীদের গানবোট চলাচল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়।
সদরপুর ব্রিজ ও জয়কলস স্পেশাল ডেমোলিশন
পাকিস্তানি বাহিনীর স্থলযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে সিলেট-সুনামগঞ্জ প্রধান সড়কের সংযোগস্থল সদরপুর ওভারব্রিজটি ধ্বংস করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও জগৎজ্যোতি নিজে রাতে বুক পানিতে নেমে ব্রিজের মূল স্প্যানে বিটুমিনাল চার্জ সেট করেন। রাত ২টায় বিকট শব্দে ব্রিজটি ধ্বংস হয়ে নদীতে ভেঙে পড়ে। ফলে সুনামগঞ্জের সাথে তৎকালীন মৈমনসিংহ ও সিলেটের পাকিস্তানি ট্যাঙ্কের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
জামালগঞ্জ থানা দখল: একক বীরত্বের পরাকাষ্ঠা
জামালগঞ্জ থানায় পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের একটি বড় ঘাটি ছিল। জগৎজ্যোতি তাঁর পুরো দলকে ছদ্মবেশে নদীর তীরে রেখে নিজে একটি বেলজিয়ান এলএমজি বুক বেঁধে একা নদীর পাড় দিয়ে ক্রল করে থানার অত্যন্ত কাছে চলে যান।
থানার সেন্ট্রি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি এক টানা ব্রাশফায়ার শুরু করেন। তাঁর ফায়ারিংয়ের গতি ও তীব্রতা দেখে ভেতরে থাকা পাকি সেনা ও মিলিশিয়ারা মনে করেছিল বিশাল কোনো সেনাবাহিনী তাদের ঘিরে ফেলেছে। ভয়ে তারা পজিশন ছেড়ে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যায়। জগৎজ্যোতি একাই পুরো জামালগঞ্জ থানা দখল করে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেন।
খালিয়াজুড়ি ও শ্রীপুর শত্রুমুক্তকরণ
নেত্রকোণার খালিয়াজুড়ি ছিল রাজাকার ও আল-বদরদের একটি শক্ত ঘাঁটি। মাত্র ১২ জন বিশ্বস্ত অনুগামীকে সাথে নিয়ে রাত ৩টায় পাকি রাজাকারের ঘাঁটিতে হামলা চালান জগৎজ্যোতি। ৩-ইঞ্চি মরটারের নির্ভুল গোলাবর্ষণে মুহূর্তের মধ্যে শত্রুর বাঙ্কার ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কোনো রক্তপাত ছাড়াই ১২ জনের ওই ক্ষুদ্র টিম পুরো এলাকা শত্রুমুক্ত করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র হস্তগত করে।
১৬ নভেম্বর, ১৯৭১ জীবনের শেষ যুদ্ধ ও মহাকাব্যিক শাহাদাত
নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে মিত্রবাহিনী ও যৌথ কমান্ড সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তানি শক্তির মূল অর্থনৈতিক ও সামরিক লাইফলাইন ধ্বংস করার। সেই লক্ষ্যেই জগৎজ্যোতিকে এক দুঃসাধ্য দায়িত্ব দেওয়া হয়।
মিশন: জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ লাইন ধ্বংস
১৬ই নভেম্বর ১৯৭১। বাহুবল এলাকায় জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের মেইন হাই-ভোল্টেজ ট্রান্সমিশন লাইন উড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পায় দাস পার্টি। এতে ঢাকার সাথে সিলেটের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। জগৎজ্যোতি ৩৬ জনের মূল দল নিয়ে খালিয়াজুড়ি থেকে রওনা হন।
বদলপুর ও খৈয়াগোপীর বিলের ট্র্যাজিক ফাঁদ
পথে আজমিরীগঞ্জের কাছে বদলপুর নামক স্থানে তারা জানতে পারেন যে, পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে স্থানীয় রাজাকাররা বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন চালাচ্ছে। সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে জগৎজ্যোতি মূল মিশন কিছুটা স্থগিত রেখে বদলপুরে অবস্থান নেন।
তিনি ৩০ জন যোদ্ধাকে বদলপুর ঘাটে মূল পজিশনে রেখে, মাত্র ১২ জন অনুগামীকে সাথে নিয়ে রাজাকারদের ধাওয়া করেন। কিন্তু এটি ছিল স্থানীয় রাজাকারদের পাতা এক কুখ্যাত ও চতুর ছক। রাজাকাররা ফায়ার করতে করতে পিছু হটতে থাকে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী জগৎজ্যোতির দলকে খৈয়াগোপীর বিলের দিকে টেনে নিয়ে যায়।
তিন দিক থেকে ঘেরাও ও ঐতিহাসিক যুদ্ধ
খৈয়াগোপীর বিল ছিল চারদিকে খোলা ওয়াটার বডি, যার মাঝখানে ছোট একটু কাদা-জলের উঁচু আইল। দাস পার্টির ১২ জন যোদ্ধা বিলে আসামাত্রই পূর্বে থেকে লুকিয়ে থাকা পাকিস্তানি বাহিনীর ৩টি সজ্জিত প্ল্যাটুন এবং প্রায় দুই শতাধিক রাজাকার তাদের তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে শুরু করে অবিরাম গুলি বর্ষণ।
জগৎজ্যোতি বুঝতে পারেন যে তারা ফাঁদে পড়েছেন। কিন্তু তিনি পজিশন ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার মানুষ ছিলেন না। তিনি সহযোদ্ধাদের শান্ত থেকে পজিশন নিতে বলেন এবং হাঁটু পানিতে নেমে একাই এলএমজি দিয়ে পাকি বাহিনীর অগ্রযাত্রা রুখে দেন। ১ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে মাত্র ১২ জন বাঙালি যোদ্ধা প্রকাণ্ড এক পাকিস্তানি ব্যাটালিয়নের সাথে সমানে সমানে লড়াই করেন।
"আমি যাই গা..." - চূড়ান্ত আত্মত্যাগ
যুদ্ধে জগৎজ্যোতির পাশে যুদ্ধ করছিলেন তাঁর অত্যন্ত প্রিয় সহযোদ্ধা আইনুল হক। বিকেলের দিকে আইনুল হক গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সহযোদ্ধার রক্তে প্লাবিত কাদা-জলে দাঁড়িয়েও জগৎজ্যোতি একাই এলএমজির ট্রিপল বার্স্ট ফায়ার চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
হঠাৎ করে তাঁর এলএমজির ম্যাগাজিন খালি হয়ে যায়। কাদা ও পানির মধ্যে নতুন ম্যাগাজিন লোড করে শত্রুর অবস্থান দেখার জন্য তিনি সামান্য মাথা উঁচু করেন। ঠিক সেই মুহূর্তে দূর থেকে এক পাকিস্তানি স্নিপারের একটি ৭.৬২ মিমি বুলেট সরাসরি তাঁর বাঁ চোখে এসে বিদ্ধ হয়।
চোখ ভেদ করে বুলেট মগজে ঢুকে যায়। হাতে শক্ত করে ধরা এলএমজি নিয়ে বীর যোদ্ধা জগৎজ্যোতি লাল হয়ে যাওয়া খৈয়াগোপীর বিলের পানিতে উপুড় হয়ে ঢলে পড়েন। মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে পাশে থাকা সহযোদ্ধার দিকে তাকিয়ে তাঁর মুখ থেকে বের হয়ে এসেছিল শেষ শব্দকয়টি: "আমি যাই গা..."। মাত্র ২২ বছর ৬ মাস বয়সে নিভে যায় ভাটি বাংলার সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি।
পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়াবহ নৃশংসতা ও কুশিয়ারা নদীর ট্র্যাজেডি
জগৎজ্যোতির মৃত্যুর পরও পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের পশুপাখির মতো ভয় কেটে যায়নি। তারা নিশ্চিত হওয়ার জন্য বহুদূর থেকে তাঁর মৃতদেহে কয়েক ডজন ব্রাশফায়ার করে।
আজমিরীগঞ্জ বাজারে মধ্যযুগীয় বর্বরতা
পাকিস্তানি পিশাচেরা এবং স্থানীয় রাজাকারের দল বীর জগৎজ্যোতির দেহ আজমিরীগঞ্জ গরুর হাটে নিয়ে আসে। স্থানীয় বাঙালি ও মুক্তিযোদ্ধাদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করার জন্য তারা এই মহানায়কের রক্তাক্ত নিথর দেহ একটি বিদ্যুতের খুঁটির সাথে উল্টো করে (পায়ে দড়ি বেঁধে) ঝুলিয়ে রাখে।
পিতা-মাতার ওপর মানসিক অত্যাচার
পাকিস্তানি সেনারা তাঁর বৃদ্ধ পিতা জিতেন্দ্র দাস এবং মাতা হরিমতী দাসকে টেনে-হেঁচড়ে বাজারে নিয়ে আসে। পুত্রের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ পিতাকে বলতে বাধ্য করা হয় "এটিই কি তোর দেশদ্রোহী সন্তান?" কিন্তু বীরের পিতা চোখের জল সামলে নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে ছিলেন।
কুশিয়ারা নদীতে মরদেহ বিসর্জন
সারাদিন মৃতদেহের ওপর নানা বিকৃত অত্যাচার চালানোর পর, রাতে পাকি সেনারা ভয়ে কোনোরূপ সৎকার বা দাফন করতে দেয়নি। পরবর্তীতে তাঁর দেহটিতে পাথর বেঁধে আজমিরীগঞ্জের কুশিয়ারা নদীর অতল জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। ভাটি বাংলার যে নদী-জলকে তিনি ভালোবেসে মুক্ত করেছিলেন, সেই কুশিয়ারার বুকেই চিরদিনের জন্য বিলীন হয়ে যান এই অমর যোদ্ধা।
‘বীরশ্রেষ্ঠ’ থেকে ‘বীর বিক্রম’: খেতাব বদলের দাপ্তরিক রহস্য ও বিতর্ক
জগৎজ্যোতি দাসের শাহাদাতের ঘটনাটি কেবল সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদেরই নয়, বরং তৎকালীন অস্থায়ী মুজিবনগর সরকার এবং ভারতীয় উচ্চপদস্থ যৌথ কমান্ডকেও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
১৯৭১-এর ঐতিহাসিক সরকারি ঘোষণা
১৭ ও ১৮ই নভেম্বর ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং অল ইন্ডিয়া রেডিও (All India Radio)-র খবর ও বিশেষ বুলেটিনে মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়:
"ভাটি বাংলার দুর্ধর্ষ সমরাধ্যক্ষ, দাস পার্টির কমান্ডার জগৎজ্যোতি দাস শত্রুর সাথে সম্মুখযুদ্ধে বীরত্বের সাথে শহীদ হয়েছেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এই মহান বীরকে মরণোত্তর 'বীরশ্রেষ্ঠ' উপাধিতে ভূষিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।"
এটিই ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ঘোষিত সর্বপ্রথম 'বীরশ্রেষ্ঠ' খেতাবের ঘোষণা। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সারা দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল।
স্বাধীনতার পর খেতাব বদল: সরকারি নীতির বৈষম্য
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৭২-১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে. খন্দকারের নেতৃত্বে বীরত্বসূচক খেতাব বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু ১৯৭৩ সালের ১৫ই ডিসেম্বর প্রকাশিত সরকারি গেজেটে দেখা যায় জগৎজ্যোতি দাসের নাম 'বীরশ্রেষ্ঠ' তালিকা থেকে বাদ দিয়ে তাকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেতাব 'বীর বিক্রম' প্রদান করা হয়েছে।
বীরত্ব খেতাবের সরকারি ক্যাটাগরি বিভাগ (১৯৭৩)
├── সামরিক / আধাসামরিক সদস্য ─► ৭ জন 'বীরশ্রেষ্ঠ' (সেনা, নৌ, বিমান, ইসিপি, ইডিআর)
└── অসামরিক সাধারণ নাগরিক ─► 'বীরশ্রেষ্ঠ' থেকে বাদ ─► 'বীর বিক্রম' (জগৎজ্যোতি দাস)
খেতাব বদলের মূল কারণসমূহ: লেখক ও গবেষকদের বিশ্লেষণ
বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক হাসান মোরশেদ তাঁর বহুল আলোচিত গবেষণা গ্রন্থ 'দাস পার্টির খোঁজে' এবং ইতিহাসবিদদের পর্যালোচনায় খেতাব বদলের মূল তিনটি কারণ উঠে আসে:
১. সামরিক বাহিনী বনাম সাধারণ নাগরিক বৈষম্য: স্বাধীনতার পর প্রজ্ঞাপন তৈরির সময় তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও খেতাব নির্ধারণী বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয় যে, সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা 'বীরশ্রেষ্ঠ' খেতাবটি কেবল নিয়মিত সামরিক বাহিনীতে (সেনা, নৌ, বিমান), ইপিআর (EPR) বা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত পেশাদার সৈনিকদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। জগৎজ্যোতি দাস কোনো ক্যাডার বা নিয়মিত সামরিক বাহিনীর সৈনিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন সাধারণ নাগরিক বা সিভিলিয়ান ছাত্র-মুক্তিযোদ্ধা। এই আমলাতান্ত্রিক সামরিক কাঠামোর কারণেই তাঁর প্রাপ্য বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
২. রাজনৈতিক প্রভাব ও আঞ্চলিক দূরবর্তীতা: ভাটি অঞ্চলের হাওরাঞ্চলীয় রাজনৈতিক নেতৃবর্গের তৎকালীন কেন্দ্র পর্যায়ে জোরালো লবিংয়ের অভাব ছিল। ফলে একজন সিভিলিয়ান গণযোদ্ধাকে সর্বোচ্চ খেতাবে ভূষিত রাখার পক্ষে দাপ্তরিক টেবিলে কেউ জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেননি।
৩. সহযোদ্ধা ও জনমানুষের ক্ষোভ: আজ অবধি দাস পার্টির জীবিত সহযোদ্ধা, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষ এবং দেশের প্রগতিশীল সমাজবিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। তাঁদের মতে, বীরত্ব ও আত্মত্যাগের বিচারে যে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিয়েছে, তার রক্তের মর্যাদা কোনো সামরিক বাহিনীর আইডেন্টিটি দিয়ে মাপা চরম অন্যায়।
এক নজরে শহীদ জগৎজ্যোতি দাস ও ‘দাস পার্টি’
পাঠকদের সুবিধার্থে শহীদ জগৎজ্যোতি দাস ও তাঁর ঐতিহাসিক 'দাস পার্টি' সম্পর্কিত সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য একটি স্বসংগঠিত সারণীতে উপস্থাপন করা হলো:
পরিমাপক / বিবরণী | বিস্তারিত ঐতিহাসিক তথ্য |
পূর্ণ নাম | জগৎজ্যোতি দাস (ডাকনাম: শ্যামা) |
জন্ম তারিখ ও স্থান | ২৬ এপ্রিল, ১৯৪৯; জলসুখা গ্রাম, আজমিরীগঞ্জ, হবিগঞ্জ |
মা-বাবার নাম | বাবা: জিতেন্দ্র দাস, মা: হরিমতী দাস |
রাজনৈতিক আদর্শ | বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) |
সামরিক ক্যাডার ও সেক্টর | সেক্টর নং ৫ (সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চল); স্পেশাল কমান্ডার |
অনুমোদিত গেরিলা বাহিনী | 'দাস পার্টি' (৩৬ জন সদস্যের বিশেষ অ্যাকশন স্কোয়াড) |
প্রশিক্ষণ কেন্দ্র | ইকো-১ (Eco-1) বিশেষ কমান্ডো ক্যাম্প, মেঘালয়, ভারত |
প্রধান অপারেশনের স্থানসমূহ | আজমিরীগঞ্জ, দিরাই, শাল্লা, জামালগঞ্জ, খালিয়াজুড়ি, বাঘাউড়া ও সদরপুর |
গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য | পাহাড়পুর বার্জ ডুবি, সদরপুর ওভারব্রিজ ধংস, জামালগঞ্জ থানা দখল |
শাহাদাতের তারিখ ও স্থান | ১৬ নভেম্বর, ১৯৭১; খৈয়াগোপীর বিল, বদলপুর, আজমিরীগঞ্জ |
শাহাদাতের বয়স | ২২ বছর ৬ মাস |
মরদেহের পরিণতি | পাকি বাহিনী কর্তৃক বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝোলানো ও কুশিয়ারা নদীতে বিসর্জন |
১৯৭১ সালের মূল খেতাব ঘোষণা | বীরশ্রেষ্ঠ (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও অল ইন্ডিয়া রেডিও কর্তৃক) |
১৯৭৩ সালের গ্যাজেট খেতাব | বীর বিক্রম (সরকারি ক্যাটাগরি পরিবর্তনের কারণে) |
স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত ভাস্কর্য | 'বিকল্প বীরশ্রেষ্ঠ স্মৃতিসৌধ', আজমিরীগঞ্জ ও লোক সাহিত্য চর্চাকেন্দ্র |
সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসে জগৎজ্যোতির অমর উপস্থিতি
জগৎজ্যোতি দাসের জীবন ও বীরত্বগাথা বাংলাদেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।
অঞ্জলি লাহিড়ীর উপন্যাস 'জগৎজ্যোতি': ভারতের অসমের বিশিষ্ট প্রগতিশীল সাহিত্যিক ও কমিউনিস্ট কর্মী অঞ্জলি লাহিড়ী জগৎজ্যোতির বীরত্বগাথা নিয়ে ২০০৩ সালে প্রকাশ করেন কালজয়ী তথ্যভিত্তিক উপন্যাস 'জগৎজ্যোতি'। গ্রন্থটিতে দাস পার্টির গঠন, পাহাড়ি প্রশিক্ষণ এবং ১৬ নভেম্বরের ট্র্যাজিক যুদ্ধের প্রতিটি মুহূর্ত অতি নিখুঁতভাবে চিত্রায়িত হয়েছে।
হাসান মোরশেদের 'দাস পার্টির খোঁজে': আধুনিক গবেষক হাসান মোরশেদ হাওরাঞ্চলের বাড়ি বাড়ি ঘুরে জীবিত দাস পার্টির মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে রচনা করেছেন ঐতিহাসিক দলিল গ্রন্থ 'দাস পার্টির খোঁজে'। এই গ্রন্থে খেতাব কেড়ে নেওয়ার পেছনের নোংরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা উন্মোচিত হয়েছে।
সাংস্কৃতিক গান ও জারি গান: ভাটি বাংলার বাউল ও চারণ কবিরা (যেমন: বাউল কামাল পাশা ও স্থানীয় শিল্পীরা) জগৎজ্যোতিকে নিয়ে অসংখ্য পালাগান ও জারিগান রচনা করেছেন, যা আজমিরীগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের হাওরে বর্ষার রাতে আজও সান্ধ্য আসরে গাওয়া হয়।
"জলসুখার শ্যামা রে তুই
খৈয়াগোপীর বিলে দিলি প্রাণ,
কুশিয়ারার ঢেউয়ে ভাসে
তোর বীরত্বের গান..."
- (স্থানীয় চারণ গীতি)
স্মৃতি সংরক্ষণ ও বর্তমান বাস্তবতা: আমরা কি আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি?
স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক অতিক্রম করলেও শহীদ জগৎজ্যোতি দাসের স্মৃতি সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ অত্যন্ত সীমিত বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও স্থানীয়দের উদ্যোগ
আজমিরীগঞ্জ বাজারে যে স্থানে জগৎজ্যোতির মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল, সেখানে পরবর্তীতে স্থানীয় জনগণ একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করেছেন। সুনামগঞ্জ জেলা সদরে তাঁর নামে একটি পাঠাগার রয়েছে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে রাজধানী ঢাকা বা প্রধান প্রধান কেন্দ্রে তাঁর নামে কোনো সড়ক, সেতু বা প্রধান ইমারতের নামকরণ করা হয়নি।
গণদাবি: 'বীরশ্রেষ্ঠ' খেতাব পুনর্বাহাল
ভাটি বাংলার সর্বস্তরের জনগণ এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদের একটিই চিরন্তন দাবি আমলাতান্ত্রিক 'সামরিক বনাম অসামরিক' ভুলনীতি সংশোধন করে জগৎজ্যোতি দাসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনরায় 'বীরশ্রেষ্ঠ' খেতাবে ভূষিত করা হোক। কারণ স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম সারির নায়ক ছিলেন এদেশের ছাত্র, কৃষক ও সাধারণ জনতা। সেই সিভিলিয়ান জনতার রক্তকে অবমূল্যায়ন করার কোনো নৈতিক অধিকার রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রের হতে পারে না।
উপসংহার
'জগৎজ্যোতি' নামটির আক্ষরিক অর্থ হলো 'পৃথিবীর আলো'। নামের সার্থকতা বজায় রেখে মাত্র ২২ বছরের স্বল্পস্থায়ী জীবনে জগৎজ্যোতি দাস এমন এক আলো জ্বালিয়ে গিয়েছিলেন, যা ১৯৭১ সালের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনে পরাধীন বাঙালি জাতিকে দেখিয়েছিল স্বাধিকার ও মুক্তির পরম দিশা।
হাওরাঞ্চলের উত্তাল তরঙ্গমালার মাঝে, খৈয়াগোপীর কাদা-জলে নিজের চোখ দিয়ে রক্ত ঝরিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন দেশপ্রেমের কাছে মৃত্য ভয় কতখানি তুচ্ছ। দাস পার্টি কেবল একটি গেরিলা দল ছিল না; এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাঙালির শাশ্বত প্রতিরোধের এক বজ্রনির্ঘোষ।
রাষ্ট্রীয় খাতায় তাঁর নামের পাশে 'বীর বিক্রম' লেখা থাকুক কিংবা না থাকুক, বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের হৃদয়ের খাতায়, কুশিয়ারা নদীর কুলকুল ধ্বনিতে এবং ভাটি বাংলার প্রতিটি বাতাসের দোলায় জগৎজ্যোতি দাস ছিলেন, আছেন এবং চিরকাল থাকবেন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সর্বমান্য 'বীরশ্রেষ্ঠ'। তাঁর রক্তের ঋণ শোধ করার একমাত্র পথ হলো তাঁর ত্যাগের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে সততার সাথে তুলে ধরা এবং একটি বৈষম্যহীন, মুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।





















