ধর্মের মোড়কে শোষণ - মজিদ কি আজও আমাদের সমাজে প্রাসঙ্গিক?

Jan 16, 2026

মহব্বতপুরের সেই আগন্তুক শস্যহীন জনপদের ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকারের মধ্যে হঠাত একদিন উদয় হয়েছিল এক আগন্তুক। গলায় তসবিহ, মুখে দাড়ি, পরনে লুঙ্গি আর চোখে এক অদ্ভুত তেজ। সে মজিদ। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর ‘লালসালু’ উপন্যাসের এই চরিত্রটি কেবল একটি সাহিত্যিক সৃষ্টি নয়; বরং এটি একটি ‘আর্কিটাইপ’ বা আদর্শ নমুনা, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। আজ আমরা মজিদের সেই মনস্তাত্ত্বিক কূটকৌশল, শোষণের পদ্ধতি এবং আধুনিক যুগে তার বিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

মজিদের ‘মেকওভার’

মজিদ ছিল অত্যন্ত বুদ্ধিমান কিন্তু নীতিহীন একজন মানুষ। সে জানত, ক্ষুধার রাজ্যে নৈতিকতা দিয়ে পেট ভরে না। তাই সে ধর্মকে বেছে নিল তার ঢাল এবং জীবিকার মাধ্যম হিসেবে।

বাহ্যিক রূপান্তর (Physical Transformation)

মজিদ প্রথমেই বুঝতে পেরেছিল যে, মানুষের মন জয় করার আগে তাদের চোখ জয় করতে হয়। সে নিজের বাহ্যিক রূপ বদলে ফেলল:

সুন্নত দাড়ি: একটি বিশেষ দৈর্ঘ্যের দাড়ি যা তাকে ধার্মিকতার ছাপ দেয়।

টুপি ও তসবিহ: যা সার্বক্ষণিক আল্লাহ-ভীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

পীরের বেশ: তার হাঁটাচলা, কথা বলার ঢং এবং দৃষ্টির মধ্যে সে এক প্রকার গাম্ভীর্য নিয়ে এল।

গ্রামের নিরক্ষর ও ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে এই বাহ্যিক ধর্মীয় চেহারাই তাকে ‘বিশ্বস্ত’ করে তোলে। আমাদের বর্তমান সমাজেও আমরা দেখি, কোনো ব্যক্তির চারিত্রিক গুণাবলির চেয়ে তার লেবাস বা বাহ্যিক আড়ম্বরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যার সুযোগ নেয় মজিদের উত্তরসূরিরা।

‘লালসালু’ ও একটি পরিচয়হীন মাজারের মিথ

মজিদ মহব্বতপুর গ্রামে এসেই এক বিশাল চাল চালল। সে একটি পরিত্যক্ত, জঙ্গলে ঢাকা পরিচয়হীন কবরকে ‘মোদাচ্ছের পীরের মাজার’ হিসেবে ঘোষণা করল।

মাজার কেন ক্ষমতার কেন্দ্র? এতে ভয় ও ভক্তির মিশ্রণ রয়েছে। মজিদ দাবি করল, পীর সাহেব তাকে স্বপ্নে দেখা দিয়েছেন। এই ‘স্বপ্ন’ ছিল তার রাজনীতির প্রধান অস্ত্র। সে নিজেকে পীরের খাদেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল। এতে তার নিজের কোনো ভুল বা অপরাধকে সে পীরের মাহাত্ম্য দিয়ে ঢেকে দিতে পারত।

মাজারকে কেন্দ্র করে যখন ওরস, সিন্নি ও দান-খয়রাত শুরু হলো, তখন মজিদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে গেল। একটি মৃত মানুষের কবরকে পুঁজি করে মজিদ জীবন্ত মানুষের ওপর তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করল। এই মাজারটিই হয়ে উঠল মহব্বতপুরের অলিখিত শাসনকেন্দ্র।

ধর্ম যখন শোষণের হাতিয়ার

মজিদ কেবল মাজার গড়ে ক্ষান্ত হয়নি, সে মানুষের মনে ‘গিল্ট’ বা অপরাধবোধ তৈরি করতে ওস্তাদ ছিল। সে কোরআনের আয়াত এবং হাদিসের খণ্ডিত ব্যাখ্যা দিয়ে গ্রামবাসীর মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিত। কৌশলগুলো ছিল নিম্নরূপ:

১. জাহান্নামের ভয়: মানুষের সামান্যতম ত্রুটিকে সে ভয়াবহ গুনাহ হিসেবে তুলে ধরত।
২. অজ্ঞতার সুযোগ: গ্রামবাসী আরবি পড়তে জানত না, মজিদ এই সুযোগে নিজের মনগড়া ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিত।
৩. অলৌকিকত্ব: যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রোগকে সে ‘আল্লাহর গজব’ হিসেবে ব্যাখ্যা করত, যার সমাধান কেবল মাজারের মাধ্যমেই সম্ভব।

আধুনিক মজিদবাদ ও ‘ট্যাগিং’ কালচার

উপন্যাসের মজিদ এবং আজকের যুগের স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর মধ্যে এক অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যায়। মজিদ যখন তার স্বার্থে আঘাত পেত, তখন সে ভিন্নমতাবলম্বীদের ‘ধর্মদ্রোহী’ বা ‘কাফের’ হিসেবে সাব্যস্ত করত।

আজকাল যেমন রাজনৈতিক বা সামাজিক সুবিধা নিতে কাউকে হুট করে “ফ্যাসিবাদের দোসর”, “ভারতের দালাল”, কিংবা “দেশদ্রোহী” বলে ট্যাগ দেওয়া হয়, মজিদ ঠিক সেই কাজটাই করত ধর্মের নাম দিয়ে।

যখনই কেউ তার মাজার বা ক্ষমতার উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলত, মজিদ বলত “আপনি কি পীর সাহেবের অবমাননা করছেন? আপনি কি ইসলাম বিরোধী?” এই ‘লেবেলিং’ বা ‘ট্যাগিং’ এর ফলে সাধারণ মানুষ ভয়ে আর প্রশ্ন তোলার সাহস পেত না। এটি ছিল মজিদের একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যা বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (Social Media) আমরা প্রকটভাবে দেখতে পাই।

নারীর ওপর আধিপত্য ও মজিদের ব্যক্তিগত জীবন

মজিদ কেবল অর্থনৈতিক বা ধর্মীয় নেতা হতে চায়নি, সে চেয়েছিল জৈবিক ও সামাজিক পূর্ণ তৃপ্তি। সে ধর্মের দোহাই দিয়ে একাধিক বিয়ে করে।

রহিমা মজিদের প্রথম স্ত্রী, যে ছিল একান্ত বাধ্য। সে মজিদকে ভয় পেত এবং শ্রদ্ধার চোখে দেখত। রহিমা ছিল মজিদের শোষণের আদর্শ ক্ষেত্র।

জমিলা মজিদের দ্বিতীয় স্ত্রী। জমিলা ছিল চঞ্চল, প্রতিবাদী এবং মজিদের ধর্মের ভণ্ডামিকে সে অবচেতনভাবেই অস্বীকার করত। জমিলার বিদ্রোহই মজিদকে প্রথমবার অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দেয়।

মজিদ যখন জমিলাকে মাজারের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখে, তখন বোঝা যায় তার ধর্ম আসলে সহমর্মিতার নয়, বরং অবদমনের। এটি সমাজের সেই পুরুষতান্ত্রিক চেহারার প্রতিফলন, যেখানে ধর্মকে ব্যবহার করা হয় নারীর কণ্ঠরোধ করার জন্য।

মজিদের ভেতরের মানুষটি

মজিদ কি নিজের সৃষ্টি করা মিথ বিশ্বাস করত? উত্তর হলো না। মজিদ জানত সে মিথ্যা বলছে। কিন্তু সে মিথ্যা বলতে বলতে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, এখন সত্যি বললে তার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।

“তার ভেতরে প্রকৃত ধর্মবোধ নেই, আছে কেবল টিকে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।”

এই চরিত্রটি আমাদের শেখায় যে, একজন মানুষ যখন একবার দুর্নীতির চোরাবালিতে পা দেয়, তখন তাকে টিকিয়ে রাখতে আরও এক হাজারটি মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। মজিদ নিজেও তার মিথ্যার কারাগারে বন্দী ছিল।

কেন এই গল্পটা মজিদের নয়?

প্রবন্ধের শুরুর দিকে বলা হয়েছিল, গল্পটা মজিদের নয়। তাহলে কার? এই গল্পটা আসলে আমাদের সামষ্টিক অজ্ঞতার। মজিদ তখনই মজিদ হয়ে ওঠে, যখন একটি সমাজ:

  • যুক্তি ছেড়ে কুসংস্কারে বিশ্বাস করে।

  • লেবাস দেখে মানুষকে বিচার করে।

  • প্রশ্নের বদলে অন্ধ আনুগত্যকে বেছে নেয়।

  • শোষককে চেনার পরিবর্তে তার ওপর ভক্তি আরোপ করে।

মহব্বতপুরের মানুষ যদি শিক্ষিত ও সচেতন হতো, তবে মজিদকে উত্তর গোলার্ধ থেকে পালিয়ে আসতে হতো না। মজিদ কেবল একটি সুযোগসন্ধানী ভাইরাস, আর আমাদের অজ্ঞতা হলো সেই ভাইরাসের বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ।

আধুনিক যুগের ‘ডিজিটাল মজিদ’

বর্তমান ডিজিটাল যুগে মজিদ আর কেবল গ্রামের মাজারে সীমাবদ্ধ নেই। এখন তারা স্ক্রিনের সামনে বসে উসকানিমূলক ভিডিওর মাধ্যমে মানুষের আবেগ নিয়ে খেলে। ভুয়া তথ্য (Fake News) ছড়িয়ে অস্থিরতা তৈরি করে। ব্যক্তিগত স্বার্থে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক উগ্রবাদ ছড়ায়।

আমাদের বাঁচার উপায় কী?

১. যৌক্তিক চিন্তা: কোনো কিছু শোনার পর আবেগতাড়িত না হয়ে সেটির উৎস অনুসন্ধান করা।
২. প্রকৃত শিক্ষা: ধর্মের প্রকৃত মর্মার্থ এবং মানবিক দিকগুলো জানা, যাতে কেউ ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্ত করতে না পারে।
৩. প্রশ্ন করার সংস্কৃতি: মজিদ সবচেয়ে বেশি ভয় পায় প্রশ্নকে। তাই যেকোনো বিষয়ে প্রশ্ন করার মানসিকতা গড়ে তোলা।

লালসালুর রক্তিম আভা মজিদ কোনো মৃত চরিত্র নয়। সে বারবার ফিরে আসে কখনও ধর্মীয় নেতার বেশে, কখনও চতুর রাজনীতিবিদের বেশে, কখনও বা সমাজের অভিভাবকের মুখোশে। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ আমাদের আয়না দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। সেই আয়নায় মজিদকে চেনার দায়িত্ব আমাদের।

মজিদকে ঘৃণা করা সহজ, কিন্তু নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট মজিদগুলোকে (স্বার্থপরতা, ভণ্ডামি) দমন করা কঠিন। যেদিন আমরা লেবাসের চেয়ে মানুষকে বেশি গুরুত্ব দেব এবং ভয়ের চেয়ে ভালোবাসাকে বড় করে দেখব, সেদিনই মহব্বতপুর থেকে মজিদের লালসালুর রাজত্ব বিলীন হবে।

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.