ধর্মের মোড়কে শোষণ - মজিদ কি আজও আমাদের সমাজে প্রাসঙ্গিক?

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ১৯৪৮ সালে যখন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস 'লালসালু' প্রকাশ করেন, তখন তিনি কেবল একটি নিছক আঞ্চলিক উপন্যাসের জন্ম দেননি; বরং তিনি ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন বাঙালি মুসলিম সমাজের শত শত বছরের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত, অন্ধবিশ্বাস এবং ধর্মীয় ভণ্ডামির এক গভীর ক্ষতচিহ্নকে। উপন্যাসের প্রারম্ভেই আমরা দেখি শস্যহীন, ক্ষুধার্ত ও প্রান্তিক এক জনপদ 'মহব্বতপুর'। সেই মহব্বতপুরের স্থবির ও নিস্তব্ধ জীবনে হঠাৎ ঝড় তুলে আবির্ভাব ঘটে এক আগন্তুকের। গলায় তসবিহ, মুখে পরিপাটি দাড়ি, পরনে শাদাটে কাপড়ের লুঙ্গি আর চোখে এক অদ্ভুত, তীক্ষ্ণ ও রহস্যময় তেজ। সে মজিদ।
মজিদ কেবল ওয়ালীউল্লাহর কল্পনাপ্রসূত কোনো চরিত্র নয়। মজিদ একটি সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক 'আর্কিটাইপ' (Archetype) বা সর্বজনীন মডেল। শতাব্দী অতিক্রম করে আজ একুশ শতকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে এসেও যদি আমরা আমাদের চারপাশের সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকাই, তবে দেখব মজিদের সেই প্রেতাত্মা মরে যায়নি; বরং তা ভিন্ন ভিন্ন লেবাসে, ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে।
এই নিবন্ধে অনুসন্ধানী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশদভাবে আলোচনা করা হবে কীভাবে মজিদ নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছিল, কীভাবে সে একটি অচেনা কবরকে শোষণের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেছিল, কীভাবে ধর্ম ও অপরাধবোধকে মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল এবং কীভাবে তার সেই ‘মজিদবাদ’ আজকের যুগের সোশ্যাল মিডিয়া, রাজনৈতিক ‘ট্যাগিং’ কালচার ও ডিজিটাল প্রতারণার মাধ্যমে জীবন্ত রূপ ধারণ করেছে।
মেকওভার ও বাহ্যিক লেবাসের ধর্মের বাজারজাতকরণ
মজিদের যাত্রা শুরু হয়েছিল চরম ক্ষুধা ও অস্তিত্বের সংকট থেকে। সে ছিল 'গারো পাহাড়' অঞ্চলের শস্যহীন ভূখণ্ডের এক বাস্তুচ্যুত, ক্ষুধার্ত মানুষ। কিন্তু সে অত্যন্ত চতুরতার সাথে বুঝতে পেরেছিল যে, নিছক শ্রম বা নীতি-নৈতিকতা দিয়ে ক্ষুধার রাজ্যে টিকে থাকা সম্ভব নয়। ক্ষুধা থেকে মুক্তি পেতে হলে মানুষের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গায় আঘাত করতে হবে আর তা হলো ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ ও ‘পরকালের ভীতি’।
বাহ্যিক রূপান্তর (The Art of Religious Optics)
মানুষের মন জয় করার আগে তাদের ‘চোখ’ জয় করতে হয় মজিদ এই মনস্তাত্ত্বিক সত্যটি অক্ষরে অক্ষরে উপলব্ধি করেছিল। তাই মহব্বতপুরে পা রাখার আগেই সে নিজেকে এক সম্পূর্ণ নতুন অবয়বে সাজিয়ে তোলে:
সুন্নত দাড়ি: যা সাধারণ মানুষের চোখে এক নিমেষে তাকে একজন পরহেজগার ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরে।
তসবিহ ও টুপি: সারাক্ষণ আঙুলের ফাঁকে তসবিহ ঘুরানো এবং মাথায় টুপি রাখা, যা প্রতিনিয়ত তার চারপাশের মানুষকে বুঝিয়ে দেয় যে সে পৃথিবীর মোহাচ্ছন্ন বস্তুগত জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।
নাটকীয় চালচলন ও কণ্ঠস্বর: মহব্বতপুর গ্রামে প্রবেশ করেই মজিদ সাধারণ মানুষের মতো কথা বলেনি। সে চিৎকার করে বলে উঠেছিল "আপনারা জাহেল, অসচেতন, অন্ধ!" এই একটি বাক্যের মাধ্যমে সে শুরুতেই গ্রামের আপামর মানুষকে অপরাধবোধের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
লেবাসভিত্তিক মূল্যবোধের আধুনিক রূপান্তর
আমাদের বর্তমান সমাজেও চরিত্র, জ্ঞান, সততা বা যোগ্যতার চেয়ে মানুষের বাহ্যিক 'লেবাস' বা আড়ম্বরকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। যে লোকটির মুখে নির্দিষ্ট স্টাইলের দাড়ি আছে, হাতে তসবিহ কিংবা গায়ে বিশেষ ধরনের পোশাক রয়েছে, অথবা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যিনি বিশেষ ধারার ব্যাজ বা প্রতীক ধারণ করেন সমাজ তাকে অবচেতনভাবেই ‘সৎ’ ও ‘সর্বোচ্চ বিচারক’ হিসেবে ধরে নেয়। মজিদের এই মেকওভার মূলত আধুনিক মার্কেটিংয়ের 'প্যাকেজিং'-এর মতোই। পণ্যের মান যেমনই হোক, প্যাকেজিং যদি ধর্মীয় বা নৈতিক অনুভূতিকে স্পর্শ করে, তবে অন্ধ ভক্তের অভাব হয় না।
‘লালসালু’ ও একটি পরিচয়হীন মাজারের মিথ
মহব্বতপুর গ্রামে মজিদের ক্ষমতা দখলের মূল হাতিয়ার ছিল একটি পরিত্যক্ত, জঙ্গলে ঘেরা অজ্ঞাতপরিচয় কবর। মজিদ গ্রামবাসীকে ধমক দিয়ে বলল, এটি কোনো সাধারণ মানুষের কবর নয়; এটি ‘মোদাচ্ছের পীর’-এর মাজার। 'মোদাচ্ছের' শব্দের অর্থ 'আবৃত' বা 'নামহীন'। মূলত কোনো অস্তিত্ব না থাকা সত্ত্বেও একটি নামহীন ভিত্তির ওপর মজিদ গড়ে তুলল তার ক্ষমতার বিশাল দুর্গ।
‘স্বপ্ন’ যখন রাজকীয় শাসনতন্ত্র: মজিদ দাবি করল, পীর সাহেব তাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে আদেশ করেছেন এই অবহেলিত মাজারের যত্ন নিতে। ধর্মতত্ত্বের বিচারে মানুষের ‘স্বপ্ন’ কখনোই কোনো আইনি বা সার্বজনীন ধর্মীয় বিধান হতে পারে না। কিন্তু নিরক্ষর ও সরল গ্রামবাসীর কাছে এই 'স্বপ্নের গল্প' হয়ে উঠল ঐশ্বরিক ফরমান।
স্বপ্নের ওপর কোনো যুক্তি বা প্রশ্ন চলে না। কারণ স্বপ্নকে প্রমাণ বা অপ্রমাণ করার কোনো বস্তুগত উপায় নেই। মজিদ এই মনস্তাত্ত্বিক টেকনিকটি খুব নিখুঁতভাবে ব্যবহার করেছিল। সে নিজেকে সরাসরি অলৌকিক দাবি করেনি, বরং নিজেকে দাবি করেছিল পীরের ‘খাদেম’ হিসেবে। এতে সুবিধা হলো যেকোনো ভুল বা অন্যায়ের দায় সে পীরের ঐশ্বরিক ইচ্ছার ওপর চাপিয়ে দিতে পারত, আর সমস্ত সুবিধা ভোগ করত নিজে।
মাজার ভীতি, ভক্তি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা: মজিদ কবরটিকে ঢেকে দিল রক্তলাল একখণ্ড কাপড়ে যা ‘লালসালু’। এই লালসালু হয়ে উঠল ভয় ও ভক্তির প্রতীক। মাজারকে কেন্দ্র করে শুরু হলো ওরস, মানত, গরু-ছাগল দান এবং কাঁচা টাকার লেনদেন।
যে মজিদ শস্যহীন প্রান্তর থেকে ভুখা পেটে এসেছিল, মাজারের বদৌলতে সে রাতারাতি জমি-জমা, শস্যের গোলা এবং সামাজিক মর্যাদার মালিক হয়ে বসল। একটি মৃত মানুষের কাল্পনিক হাড়কে পুজো বানিয়ে মজিদ মূলত পুরো জীবিত জনপদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল। মাজারটি হয়ে উঠেছিল মহব্বতপুরের সমান্তরাল আদালত এবং শাসনকেন্দ্র।
ধর্ম যখন শোষণের হাতিয়ার: অপরাধবোধ ও আতঙ্কের মনস্তত্ত্ব
মজিদের শোষণের পদ্ধতি কেবল প্রশাসনিক ছিল না, তা ছিল চরম মনস্তাত্ত্বিক। সে মানুষকে শারীরিকভাবে প্রহার করত না; বরং তাদের মনকে অবশ করে দিত ‘গিল্ট’ (Guilt) বা অপরাধবোধ এবং ‘জাহান্নামের ভীতি’ ঢুকিয়ে দিয়ে।
"শস্যের চেয়ে টুপি বেশি, ধর্মের চেয়ে আগাছা বেশি।" - ওয়ালীউল্লাহ্ এই একটি বাক্যে মজিদচালিত সমাজের অসারতাকে উন্মোচিত করেছিলেন।
অপরাধবোধ তৈরি করা (Weaponizing Guilt): মজিদ খুব ভালো করে জানত, মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সেরা উপায় হলো তাকে বোঝানো যে সে একজন ‘পাপী’। গ্রামের সাধারণ কৃষকেরা যখন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে রাতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমাত, মজিদ তখন তাদের আমপারা না পড়া, ওয়াক্তমতো নামাজ না পড়া বা সামান্য সামাজিক ভুলগুলোকে আমলনামার বিশাল অপরাধ হিসেবে তুলে ধরত। মানুষ যখন নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করে, তখন সে একজন ‘ত্রাণকর্তা’ খোঁজে। আর মজিদ নিজেকে সেই ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করত।
ভাষার দেওয়াল ও তথ্যের একচেটিয়া অধিকার: তৎকালীন গ্রামীণ সমাজে সাধারণ মানুষের আরবি ভাষার ওপর কোনো দখল ছিল না। মজিদ এই সীমাবদ্ধতার পূর্ণ সুযোগ নেয়। সে পবিত্র কোরআনের আয়াত বা হাদিসের খণ্ডিত অংশ উচ্চারণ করে তার নিজের মতো মনগড়া ও স্বার্থান্বেষী ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিত। তথ্যের এই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ (Monopoly of Information) মজিদকে সমাজের একক সিদ্ধান্তকারীতে পরিণত করেছিল।
প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ‘আল্লাহর গজব’ বানানো: খরা, বন্যা, শিলাবৃষ্টি কিংবা মহামারীর মতো প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোকে মজিদ বৈজ্ঞানিক বা স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে দিত না। সে ঘোষণা করত এগুলো গ্রামবাসীর পাপাচারের ফসল, পীর সাহেবের অসন্তোষের ফল! ফলে দুর্যোগ থেকে বাঁচতে হলেও গ্রামবাসী মজিদের মাজারে এসে হাঁস-মুরগি, টাকা-পয়সা মানত করতে বাধ্য হতো।
আধুনিক ‘মজিদবাদ’ ও ট্যাগের সামাজিক মহোৎসব
'লালসালু' উপন্যাসের সবচেয়ে কালজয়ী দিক হলো এর প্রাসঙ্গিকতা। মজিদ কোনো নির্দিষ্ট সময়ের ব্যক্তি নয়; মজিদ হলো একটি কৌশল। আজ আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জাতীয় রাজনীতি এবং সামাজিক বাস্তবতায় যে পরিস্থিতি দেখছি, তা মজিদের সেই মনস্তাত্ত্বিক কৌশলেরই আধুনিক সংস্করণ।
প্রশ্ন তোলার অধিকার হরণ ও 'ট্যাগিং' (Labeling and Tagging): উপন্যাসে যখনই কেউ মজিদের কর্তৃত্ব, মাজারের সত্যতা কিংবা তার অর্থনৈতিক লেনদেন নিয়ে মৃদু প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছে, মজিদ তখনই যুক্তি দিয়ে তার জবাব দেয়নি। কারণ যুক্তিতে মজিদ হেরে যাবে। তাই সে ব্যবহার করেছে 'ট্যাগিং পদ্ধতি'।
কেউ প্রশ্ন করলেই মজিদ গর্জে উঠত: "আপনি কি পীর সাহেবকে মানেন না? আপনি কি ইসলামবিরোধী? আপনি কি কাফের?"
এই একটি ধর্মীয় ট্যাগ বা লেবেল মুহূর্তের মধ্যে প্রশ্নকর্তাকে পুরো সমাজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিত। ভয়ে, লজ্জায় এবং সামাজিক বয়কটের আতঙ্কে আর কেউ কোনোদিন মজিদকে প্রশ্ন করার সাহস পেত না।
সমাজ ও রাজনীতিতে আধুনিক ‘ট্যাগ’: আজকের দিনেও এই মজিদবাদ অত্যন্ত প্রকটভাবে দৃশ্যমান। আপনি যখনই কোনো সামাজিক অসংগতি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা গোষ্ঠীস্বার্থের বিরুদ্ধে যৌক্তিক প্রশ্ন তুলবেন, তখনই যুক্তি দিয়ে উত্তর না দিয়ে আপনার গায়ে একটি 'লেবেল' বা 'ট্যাগ' লাগিয়ে দেওয়া হবে:
রাজনীতিতে বিরুদ্ধমত দমন করতে কাউকে বানিয়ে দেওয়া হয় "ফ্যাসিবাদের দোসর", "ভারতের দালাল" কিংবা "দেশদ্রোহী"।
সামাজিকভাবে কাবু করতে দেওয়া হয় "ধর্মদ্রোহী", "মৌলবাদী" কিংবা "নাস্তিক" ট্যাগ।
এই ট্যাগিংয়ের মূল উদ্দেশ্য একটাই যৌক্তিক বিতর্ককে স্তব্ধ করে দেওয়া এবং প্রশ্নকর্তাকে মানসিকভাবে দেউলিয়া করে ভিড়ের কাছে অপরাধী বানানো। মজিদ মহব্বতপুর গ্রামে যে মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা তৈরি করেছিল, আধুনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (Cyberbullying and Mob Mentality) আমরা প্রতিদিন ঠিক সেই ট্রমার পুনরাবৃত্তি হতে দেখছি।
নারীর ওপর আধিপত্য ও মজিদের পারিবারে রহিমা ও জমিলার দ্বন্দ্ব
মজিদের সমাজিক ও ধর্মীয় সাম্রাজ্যের আরেকটি বড় খুঁটি ছিল তার পারিবারিক জীবন এবং নারীর ওপর একক আধিপত্য। মজিদের চরিত্র বোঝার জন্য তার দুই স্ত্রী রহিমা এবং জমিলা-র মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্য বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
রহিমা: পিতৃতন্ত্র ও শোষণের বিশ্বস্ত স্তম্ভ
রহিমা ছিল চওড়া হাড়ের, শক্ত গড়নের এবং অত্যন্ত বাধ্য এক নারী। মজিদ তাকে ধর্মের ভীতি দিয়ে এমনভাবে মগজধোলাই করেছিল যে, রহিমা মজিদকে কেবল স্বামী নয়, বরং প্রায় ঐশ্বরিক কোনো সত্তা বলে মনে করত।
মজিদের সামান্য রাগ বা চোখ রাঙানিতে রহিমা ভয়ে কেঁপে উঠত। সে নিজের ভেতরের সমস্ত মানবিক ইচ্ছা ও ক্ষোভকে চেপে রেখে মজিদের শোষণের বড় সহযোগীতে পরিণত হয়েছিল।
রহিমা হলো সেই সামাজিক শ্রেণীর প্রতীক, যারা দীর্ঘদিন শোষিত হতে হতে শোষণকেই নিজের ভাগ্য এবং ধর্ম বলে মেনে নেয়।
জমিলা: অবচেতন অবাধ্যতা ও মজিদের অস্তিত্বের সংকট
মজিদের বয়স যখন বেড়ে চলেছে, তখন সে তার জৈবিক আকাঙ্ক্ষা এবং বংশবৃদ্ধির লোভ সামলাতে না পেরে তরুণী জমিলাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে ঘরে তোলে। জমিলা ছিল রহিমার সম্পূর্ণ বিপরীত। সে ছিল চঞ্চল, খেলাধুলাপ্রিয় এবং কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় ভণ্ডামির গাম্ভীর্য সে বুঝত না।
জমিলা মজিদের সেই বানানো ভয়ের রাজত্বকে পাত্তাই দিত না। মজিদ যখন গম্ভীর হয়ে জিকির করত, জমিলা তখন ঘুমিয়ে পড়ত বা অবহেলা করত। জমিলার এই নিষ্পাপ ও অবচেতন অবাধ্যতাই মজিদের সারা জীবনের গড়ে তোলা মিথ্যা সাম্রাজ্যকে প্রথমবারের মতো কাঁপিয়ে দেয়। মজিদ বুঝতে পারে, তার লালসালুর কাপড় দিয়ে সে পুরো গ্রামকে বাঁধতে পারলেও এই তরুণী মেয়েটির মনকে বাঁধতে পারছে না।
মাজারের খুঁটিতে বন্দি জমিলা: ধর্মভিত্তিক সহিংসতার চরম রূপ
যখন মজিদ বুঝতে পারল কথা দিয়ে বা ভয়ের বাণী শোনাইয়া জমিলাকে বশ করা যাচ্ছে না, তখন তার ভেতরের ভণ্ড ধর্মীয় আবরণ খুলে বেরিয়ে এল এক হিংস্র পুরুষতান্ত্রিক দানব। সে জমিলাকে রাতের অন্ধকারে নিয়ে গিয়ে মাজারের খুঁটির সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখল।
কিন্তু ওয়ালীউল্লাহ্ এখানে এক মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছেন। পরদিন সকালে যখন মজিদ মাজারে যায়, সে দেখে নিস্তেজ জমিলা তার পা দিয়ে মাজারের দিকে থুথু বা পা বাড়িয়ে দিয়ে শুয়ে আছে। জমিলার এই অসাড়, নিঃশব্দ অবাধ্যতা মজিদের তৈরি 'মোদাচ্ছের পীর'-এর মিথকে এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দেয়। এটি প্রমাণ করে, ধর্মকে ব্যবহার করে নারীর কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা সাময়িকভাবে সফল হলেও, মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে কখনো পুরোপুরি ধ্বংস করা যায় না।
মজিদের ভেতরের মানুষটি: মিথ্যার আত্মকক্ষে বন্দি এক করুণ অস্তিত্ব
প্রশ্ন উঠতে পারে- মজিদ কি নিজে তার বানানো এই 'মোদাচ্ছের পীর' বা মাজারের অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করত? উত্তর হলো: একেবারেই না।
সার্ভাইভাল ইনস্টিঙ্কট (Survival Instinct): মজিদ কোনো জন্মজাত শয়তান ছিল না। সে ছিল পরিস্থিতির শিকার এক চরম সুযোগসন্ধানী মানুষ। তার চালিকাশক্তি ছিল 'ক্ষুধার ভয়'। সে জানত, যদি সে আজ স্বীকার করে যে এই মাজার মিথ্যা, তবে তাকে আবার সেই শস্যহীন পাহাড়ি অঞ্চলে ফিরে যেতে হবে, অনাহারে দিন কাটাতে হবে। তাই টিকে থাকার আদিম তাগিদই তাকে প্রতিদিন নতুন নতুন মিথ্যা আবিষ্কার করতে বাধ্য করত।
নিজের মিথ্যার কারাগারে নিজেই বন্দি: মজিদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সে চরম 'ইম্পোস্টার সিন্ড্রোম' (Imposter Syndrome) এবং অপরাধবোধে ভুগত।
সে যখন একা থাকত, তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে বা বাতাসের শব্দে সে শিউরে উঠত। তার মনে হতো, এই বুঝি তার মিথ্যা ধরা পড়ে গেল!
আক্কাস যখন গ্রামে একটি আধুনিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, মজিদ কেন তার বিরোধিতা করেছিল? কারণ স্কুল হওয়া মানেই আলো আসা, শিক্ষা আসা। আর সাধারণ মানুষ শিক্ষিত হয়ে উঠলে প্রথম প্রশ্নটি তুলবে মজিদের মাজার নিয়েই!
মজিদ এমন এক চোরাবালিতে পা দিয়েছিল, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ তার জানা ছিল না। একটি মিথ্যাকে ঢাকতে তাকে হাজারটি মিথ্যা বলতে হচ্ছিল এবং দিনশেষে সে নিজেই তার বানানো অক্টোপাসের জালে বন্দি হয়ে পড়েছিল।
কেন এই গল্পটা মজিদের নয়? অপাঙ্কতেও অজ্ঞতা ও অন্ধ আনুগত্যের দায়
আমরা সহজেই মজিদকে ভণ্ড, শোষক বা প্রতারক বলে গালাগাল দিতে পারি। কিন্তু খুব গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায় 'লালসালু'র গল্পটি আসলে মজিদের একার গল্প নয়; এটি মহব্বতপুরের মানুষের গল্প, এটি আমাদের সামষ্টিক অজ্ঞতার গল্প।
উর্বর জমিন ছাড়া আগাছা জন্মায় না: জীববিজ্ঞানের নিয়মে, একটি পরজীবী (Parasite) তখনই টিকে থাকে, যখন সে উপযুক্ত পোষকদেহ (Host) পায়। মজিদ যদি একটি ভাইরাস হয়, তবে মহব্বতপুরবাসীর অজ্ঞতা, অন্ধবিশ্বাস এবং প্রশ্নহীন আনুগত্য ছিল সেই ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ।
মহব্বতপুরের মানুষ যদি অন্ধভাবে অলৌকিকতায় বিশ্বাস না করত, তারা যদি লেবাসের বদলে মানুষের কাজকে বিচার করত, তারা যদি মজিদের কথা শুনেই ভীতিগ্রস্ত না হয়ে কোরআন-হাদিসের প্রকৃত অর্থ নিজেরা জানার চেষ্টা করত, তবে মজিদ কোনোদিনই 'মজিদ' হয়ে উঠতে পারত না। তাকে মহব্বতপুর থেকে বিতাড়িত হতে হতো।
আধুনিক সমাজের দায়: আজকের দিনেও যখন কোনো প্রতারক ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পোশাক পরে আমাদের লুণ্ঠন করে, তখন অপরাধ যতটা না সেই প্রতারকের, তার চেয়ে বেশি অপরাধ আমাদের সামষ্টিক অন্ধত্বের। আমরা যুক্তি ছেড়ে অলৌকিকত্ব পছন্দ করি, আমরা কঠিন সত্যের চেয়ে আরামদায়ক মিথ্যা শুনতে ভালোবাসি। যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজে অন্ধ ভক্ত তৈরি হওয়ার কারখানা বন্ধ না হবে, ততক্ষণ মজিদের মতো সুযোগসন্ধানীরা নতুন নতুন রূপ নিয়ে আসতেই থাকবে।
'ডিজিটাল মজিদ': প্রযুক্তি, অ্যালগরিদম ও আধুনিক ফেক নিউজের সাম্রাজ্য
একুশ শতকে এসে মজিদের রূপান্তর ঘটেছে সবচেয়ে ভয়াবহভাবে। সে আর এখন কেবল পাড়াগাঁয়ের অজপাড়াগাঁয়ের মাজারে লালসালুর কাপড় বিছিয়ে বসে নেই। সে এখন চলে এসেছে আমাদের ড্রয়িংরুমে, আমাদের হাতের স্মার্টফোনে, স্ক্রিনের ওপারে। সে এখন 'ডিজিটাল মজিদ'।
স্ক্রিনভিত্তিক মজিদবাদ
আজকের ডিজিটাল মজিদেরা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে (ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক) বসে থাকে।
প্যাকেজিং: তারা ব্যবহার করে চমৎকার লাইটিং, আকর্ষণীয় লেবাস এবং আবেগপ্রবণ কণ্ঠস্বর।
কন্টেন্ট: তাদের মূল কন্টেন্ট হলো মানুষের ভয়, ঘৃণা এবং ধর্মীয় বা গোষ্ঠীগত উসকানিকে উস্কে দেওয়া। তারা বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে অলৌকিক বানিয়ে উপস্থাপন করে, কিংবা সমাজকে বিভক্ত করার মতো বক্তব্য দেয়।
ভিউ ও ডোনেশন: লালসালুর যুগে মজিদের আয় হতো মাজারের 'সিন্নি ও বাক্সে পড়া টাকা' থেকে। আর আজকের ডিজিটাল মজিদের আয় হয় 'ভিউ, শেয়ার, সুপারচ্যাট এবং অনলাইন ডোনেশন' থেকে।
অ্যালগরিদম ও ফেক নিউজের মোদাচ্ছের পীর
ডিজিটাল দুনিয়ার অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি যা উসকানিমূলক এবং আবেগপ্রবণ কন্টেন্টকে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। এই অ্যালগরিদমই হলো আধুনিক যুগের 'মোদাচ্ছের পীর'। ভুয়া তথ্য বা ফেক নিউজ ছড়িয়ে এরা সমাজে উন্মাদনা তৈরি করে। কোনো তথ্য যাচাই না করেই সাধারণ মানুষ যখন তা শেয়ার করে, তখন তারা মূলত মহব্বতপুরবাসীর মতোই অন্ধ আনুগত্যের পরিচয় দেয়।
ওয়ালীউল্লাহর মজিদ বনাম আধুনিক মজিদবাদ
নিচে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাসের মূল মজিদ এবং আধুনিক যুগের ডিজিটাল/রাজনৈতিক মজিদবাদের তুলনামূলক বৈশিষ্ট্যসমূহ একটি একক সারণীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
মূল অনুঘটক ও ক্ষেত্র | 'লালসালু' উপন্যাসের মজিদ (১৯৪৮) | আধুনিক যুগের 'ডিজিটাল/রাজনৈতিক মজিদ' (বর্তমান) |
আগমনের মূল উদ্দেশ্য | ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে বেঁচে থাকা এবং স্থায়ী অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। | অনলাইন ভিউ, আর্থিক অনুদান, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সামাজিক ইনফ্লুয়েন্স। |
প্রধান দৃশ্যমান প্রতীক | লালসালু কাপড়ে ঢাকা 'মোদাচ্ছের পীর'-এর পরিচয়হীন মাজার। | ডিজিটাল স্ক্রিন, ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল, রাজনৈতিক ট্যাগ ও ব্যাজ। |
নিয়ন্ত্রণের মূল কৌশল | জাহান্নামের ভয়, অমঙ্গল ও অপদেবতার ভীতি এবং ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার। | ফেক নিউজ, ক্লিকবেইট উসকানি, ভিকটিম কার্ড খেলা এবং ভীতি ছড়ানো। |
ভিন্নমত দমনের উপায় | 'কাফের', 'পীর সাহেবের অবমাননাকারী', 'অধর্মী' ইত্যাদি অপবাদ দেওয়া। | 'ফ্যাসিবাদের দোসর', 'ভারতের দালাল', 'নাস্তিক', 'উগ্রবাদী' ইত্যাদি ট্যাগিং। |
নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি | নারীকে গৃহবন্দী রাখা, অবদমিত করা এবং ধর্মীয় দোহাই দিয়ে বশ করা। | সাইবার বুলিং, অনলাইন ট্রোলিং, ভিকটিম ব্লেমিং এবং সামাজিকভাবে হেয় করা। |
সাধারণ অনুসারীদের ভূমিকা | নিরক্ষর, অন্ধ বিশ্বাসী ও ভীতসন্ত্রস্ত গ্রামবাসী (মহব্বতপুর)। | অ্যালগরিদমের শিকার, শেয়ার-লাইককারী, প্রশ্নহীন ডিজিটাল জনতা (Mob)। |
পতনের প্রধান ভয় | আক্কাসের আধুনিক স্কুল ও জমিলার অবচেতন অবাধ্যতা/থুথু। | তথ্য যাচাই (Fact-checking), যৌক্তিক শিক্ষা ও প্রথার বাইরে স্বাধীন প্রশ্ন। |
অস্তিত্ববাদ ও ফরাসি দার্শনিক প্রভাব: মজিদের 'ব্যাড ফেইথ'
ওয়ালীউল্লাহ্ দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করেছিলেন এবং ফরাসি অস্তিত্ববাদী দর্শনের (বিশেষ করে জাঁ পল সার্ত্রে ও আলবেয়ার কামু) সাথে গভীরভাবে পরিচিত ছিলেন। 'লালসালু' উপন্যাসে অস্তিত্ববাদের এই ছায়া অত্যন্ত স্পষ্ট।
'Bad Faith' বা আত্ম-প্রতারণা: ফরাসি দার্শনিক জাঁ পল সার্ত্রের একটি বিখ্যাত ধারণা হলো 'Mauvaise foi' বা 'Bad Faith' (অসৎ বিশ্বাস)। যখন একজন মানুষ নিজের স্বাধীন সত্তাকে অস্বীকার করে সমাজ বা পরিস্থিতির বিচারে একটি নির্ধারিত 'মুখোশ' বা ভূমিকা পালন করতে বাধ্য হয় এবং এক পর্যায়ে নিজেকেই সেই মুখোশ বলে ভুল করে, তখন তা 'ব্যাড ফেইথ' তৈরি করে।
মজিদ প্রারম্ভে জানত সে একজন ভণ্ড। কিন্তু মহব্বতপুর গ্রামে নিজের প্রভাব যত বাড়াতে থাকে, সে নিজের তৈরি অলৌকিক বানিয়ে তোলা গল্পের ভেতরে নিজেই আটকা পড়ে।
সে যখন রহিমা বা গ্রামবাসীকে জাহান্নামের ভয় দেখায়, তখন সে কেবল তাদের প্রতারিত করে না, বরং নিজের ভেতরের অপরাধবোধ মুছে ফেলতে নিজের মিথ্যা চরিত্রটাকেই পরম সত্য বলে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করে।
ক্ষুধা ও অস্তিত্বের যুদ্ধ: অস্তিত্ববাদের মূল কথা "মানুষের অস্তিত্ব তার পরিচয়ের পূর্বে আসে" (Existence precedes essence)। মজিদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। প্রথমে এসেছে তার অনাহার ও বেঁচে থাকার খাঁটি আদিম ক্ষুধা, আর তারপর এসেছে তার 'খাদেম' বা 'ধর্মীয় অভিভাবক'-এর কৃত্রিম পরিচয়। মজিদ মূলত নিজের মৌলিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই ধর্মকে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
উপন্যাসের গভীরতর প্রতীকবাদ (Deeper Symbolism)
ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর উপন্যাসে প্রথাগত বিবরণ না দিয়ে গভীর প্রতীকী ভাষার ব্যবহার করেছেন। উপন্যাসের প্রতিটি উপাদান এক-একটি মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক অর্থ বহন করে:
লালসালু কাপড় (The Red Cloth): লাল রঙ একই সাথে রক্ত, বিপদ এবং পবিত্রতার প্রতীক। মজিদ যে লাল কাপড় দিয়ে পরিচয়হীন কবরটি ঢেকে দিয়েছিল, তা মূলত অজ্ঞতা এবং ভয়ের ছাদ। এই কাপড়ের নিচে কী আছে তা কেউ জানে না, কিন্তু এর বাইরের লাল আভা মানুষকে কাছে যেতে বাধা দেয়। এটি সত্যকে ঢেকে রাখা এক রহস্যময় ধর্মীয় দেয়াল।
শস্য ও খাদ্য (Grain as Power): উপন্যাসে শস্য কেবল পেট ভরানোর মাধ্যম নয়; এটি ক্ষমতার প্রধান একক। মজিদের নিজস্ব কোনো উর্বর জমি ছিল না। সে মাজারের মাধ্যমে কৃষকদের শস্যের একটা অংশ আত্মসাৎ করত। যার হাতে শস্যের নিয়ন্ত্রণ থাকে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে তার হাতেই প্রশাসনিক শক্তি চলে যায়।
মাছ ও বাঁশের খাঁচা (The Fish and the Cage): উপন্যাসে রহিমা যখন মাছ কাটে বা মাছ ধরে, তখন মাছের ছটফটানি এবং খাঁচায় বন্দি হওয়ার দৃশ্যটি মহব্বতপুরবাসীদের নির্দেশ করে। মজিদ পুরো গ্রামকে ধর্মীয় অনুশাসনের এমন এক খাঁচায় বন্দি করে ফেলেছিল, যেখানে ছটফট করলেও বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না।
শিলাবৃষ্টি (The Hailstorm): উপন্যাসের শেষভাগে নেমে আসা ধ্বংসাত্মক শিলাবৃষ্টি প্রাকৃতির রুদ্ররূপের প্রতীক। এটি প্রমাণ করে যে, প্রকৃতি মজিদের মনগড়া 'পীর সাহেবের খাস নজর' বা দোয়া-কালামের তোয়াক্কা করে না। প্রকৃতির নির্মোহ সত্যের সামনে মজিদের সমস্ত অলৌকিক মিথ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
খালিক ব্যাপারী ও মজিদ
মহব্বতপুর গ্রামকে কেবল মজিদ একা শাসন করেনি। মজিদের এই রাজত্ব টিকে থাকার পেছনে প্রধান অনুঘটক ছিল গ্রামের প্রধান জোতদার ও মাতব্বর খালিক ব্যাপারী।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তির ঐক্য: গ্রামীণ সমাজে সাধারণ মানুষকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দুটি জিনিস লাগে অর্থনৈতিক চাপ এবং মানসিক/ধর্মীয় ভয়। খালিক ব্যাপারীর ছিল প্রচুর জমি-জমা, টাকা-পয়সা এবং প্রভাব। কিন্তু তার অভাব ছিল একটি 'নৈতিক বৈধতার' (Moral Legitimacy)।
মজিদ তাকে সেই নৈতিক ও ধর্মীয় বৈধতা এনে দেয়। অপরদিকে মজিদের মাজার ও নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে খালিক ব্যাপারীর রাজনৈতিক ও আর্থিক পেশিশক্তির প্রয়োজন ছিল।
তানু বিবির তালাক ও নারীনির্যাতনের প্রশাসনিক রূপ: খালিক ব্যাপারীর প্রথম স্ত্রী তানু বিবি ছিলেন সন্তানহীনা। মজিদ নিজের ক্ষমতা জাহির করতে এবং খালিক ব্যাপারীর ওপর একক প্রভাব ধরে রাখতে তানু বিবিকে 'বন্ধ্যা' ও 'অপয়া' সাব্যস্ত করে এবং খালিক ব্যাপারীকে দিয়ে তাকে তালাক দেওয়ায়।
এখানে দেখা যায়, অভিজাত শ্রেণী এবং ধর্মীয় ভণ্ডামী কীভাবে এক হয়ে একজন নিরীহ নারীর জীবন ধ্বংস করে দেয়। খালিক ব্যাপারী নিজের স্বার্থে মজিদের ফতোয়াকে মেনে নেয়, যা প্রমাণ করে শোষক শ্রেণী সর্বদা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী ধর্মকে ব্যবহার করে।
আক্কাসের পতন ও প্রগতির বিরুদ্ধে মজিদবাদের প্রতিরোধ
উপন্যাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আক্কাস। সে শহর থেকে সামান্য লেখাপড়া শিখে গ্রামে এসে একটি আধুনিক প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। আক্কাসের এই উদ্যোগ ছিল মজিদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
কেন মজিদ স্কুলকে ভয় পেয়েছিল? শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়। আক্কাস যখনই স্কুল খুলবে, তখনই গ্রামের শিশুরা অক্ষরজ্ঞান পাবে, যুক্তি শিখবে এবং বড় হয়ে মজিদের মোদাচ্ছের পীরের মাজারের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। আলো প্রবেশ করলে অন্ধকারের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায় মজিদ তা খুব ভালোভাবেই জানত।
স্কুল বনাম মসজিদ: আক্কাস যখন গ্রামবাসীর কাছে স্কুলের প্রস্তাব নিয়ে যায়, মজিদ সেখানে অত্যন্ত চতুরতার সাথে প্রস্তাবটিকে একটি ধর্মীয় সংঘাত বানিয়ে ফেলে। মজিদ বলে "স্কুল পরে হবে, আগে আল্লাহর ঘর মসজিদ বড় করতে হবে। আপনারা কি স্কুলের জন্য আখেরাত বিসর্জন দেবেন?"
অবুঝ গ্রামবাসী স্কুলের চেয়ে মসজিদ বড় করাকে বেশি সওয়াবের কাজ মনে করে আক্কাসের প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। উপরন্তু, মজিদ আক্কাসের মুখে 'সুন্নত দাড়ি' না থাকার অজুহাত তুলে তাকে মানসিকভাবে সবার সামনে লজ্জিত ও হেয় প্রতিপন্ন করে। এর ফলে আক্কাসের স্বপ্নের প্রগতিশীল স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সেখানেই অংকুরে বিনষ্ট হয়ে যায়।
বিশ্বসাহিত্যের সাথে 'লালসালু' ও মজিদের তুলনা
ধর্মীয় ভণ্ডামি, ভীতি প্রদর্শন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার কেবল বাংলা সাহিত্যের একক বিষয় নয়। বিশ্বসাহিত্যের বহু কালজয়ী রচনায় মজিদের মতো চরিত্রের দেখা মেলে। নিচে একটি সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক সারণী দেওয়া হলো:
সাহিত্যের নাম ও লেখক | কেন্দ্রীয় ভণ্ড/শোষক চরিত্র | মজিদের সাথে মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত সাদৃশ্য |
'টারটুফ' (Tartuffe) (মোলিয়্যার, ফরাসি নাটক) | টারটুফ (Tartuffe) | টারটুফ ধর্মীয় সাধুর রূপ ধরে এক ধনী পরিবারের ট্রাস্ট অর্জন করে এবং তাদের গৃহ লুণ্ঠন করে। মজিদের মতোই সে বাহ্যিক লেবাস ও বানোয়াট পবিত্রতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। |
'এলমার গ্যান্ট্রি' (Elmer Gantry) (সিনক্লেয়ার লুইস, মার্কিন উপন্যাস) | এলমার গ্যান্ট্রি (Elmer Gantry) | গ্যান্ট্রি ছিলেন একজন সুবিধাবাদী প্রচারক, যিনি নিজের কামুকতা ও অর্থের লোভ ঢাকতে খ্রিস্টধর্মের আবেগপূর্ণ ভাষণ ব্যবহার করতেন। মজিদের মতো তার ভেতরেও কোনো খাঁটি বিশ্বাস ছিল না, ছিল কেবল টিকে থাকার কৌশল। |
'দ্য ক্রুসিবল' (The Crucible) (আর্থার মিলার, মার্কিন নাটক) | অ্যাবিগেল উইলিয়ামস ও বিচারকগণ | সালেম শহরে 'ডাইনি' (Witchcraft) শিকারের বাহানায় ভয়ের রাজত্ব কায়েম করা হয়। মজিদের মতো সেখানেও কোনো প্রমাণ ছাড়াই 'শয়তানের অনুসারী' ট্যাগ দিয়ে নির্দোষ মানুষকে ফাঁসানো হতো। |
'অ্যানিম্যাল ফার্ম' (Animal Farm) (জর্জ অরওয়েল, রাজনৈতিক রূপক) | সুকুইলার (Squealer - শুকর) | সুকুইলার কথা ও খণ্ডিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে বাকি সাধারণ পশুদের মগজধোলাই করত এবং নেপোলিয়ানের শোষণে সহায়তা করত। মজিদ যেভাবে ধর্মীয় বাণী বিকৃত করত, সুকুইলার সেভাবে 'সাতটি নীতি' বিকৃত করত। |
প্রকৃতির নির্মমতা ও মজিদের চরম অস্তিত্ব সংকট: ক্লাইম্যাক্স বিশ্লেষণ
উপন্যাসের শেষ অধ্যায়গুলোতে মজিদের ভেতরের মানসিক ভাঙন অত্যন্ত করুণ ও নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
ঘরের ভেতরের বিদ্রোহ (জমিলা): মজিদ বহিরাগত শত্রু বা আক্কাসের মতো যুবকদের সামলাতে পারলেও, তার তরুণী স্ত্রী জমিলার অবচেতন ও চঞ্চল বিদ্রোহের কাছে হেরে যায়। জমিলা তাকে ভয় পায় না, তার জিকির শুনে ঘুমিয়ে পড়ে এবং অবশেষে মাজারের দিকে পা বাড়িয়ে শুয়ে থেকে তার সমস্ত কৃত্রিম ধর্মীয় মিথকে অবজ্ঞা করে।
প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বী (আওয়ালপুরের পীর): পাশের গ্রাম আওয়ালপুরে যখন এক নতুন পীরের আগমন ঘটে, তখন মজিদ চরম ঈর্ষা ও আতঙ্কে ভোগে। সে বুঝতে পারে, তার ব্যবসায়ে ভাগ বসাতে অন্য এক মজিদের আগমন ঘটেছে। মজিদ তখন তার গ্রামবাসীদেরকে সেই পীরের কাছে যেতে নিষেধ করে এবং দুই গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আবহ তৈরি করে।
প্রকৃতির চূড়ান্ত চপেটাঘাত: উপন্যাসের শেষে শিলাবৃষ্টিতে যখন মহব্বতপুরের ধান ও শস্যের খেত একেবারে ধ্বংস হয়ে যায়, তখন ক্ষুধার্ত ও দিশেহারা গ্রামবাসী মজিদের কাছে ছুটে আসে। মজিদ তখনো বাহ্যিক গাম্ভীর্য ধরে রেখে চিৎকার করে বলে "বিশ্বাস হারাইও না! মাজারে গিয়ে সেজদায় পড়ো!"
কিন্তু মজিদ ভেতরের অন্ধকারে বুঝতে পারে, যে শস্য ও খাদ্যের লোভ দেখিয়ে সে এত বছর শাসন করেছে, সেই শস্যই আজ শেষ। প্রকৃতির এই তাণ্ডব কোনো দোয়া বা সালু কাপড়ে আটকানো সম্ভব নয়। মজিদ একা, অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে। তার লালসালুর রাজত্ব টিকে থাকলেও, তার ভেতরে তৈরি হয় এক অনন্ত শূন্যতা ও অনিশ্চয়তা।
উত্তরণের উপায় ও আধুনিক প্রতিরোধ: লালসালুর রাজত্ব ভাঙার মন্ত্র
মজিদ বা মজিদবাদ কোনো অপরাজয় শক্তি নয়। লালসালুর রক্তিম কাপড় যতটাই ভয়াল দেখাক না কেন, তার নিচে রয়েছে শুধুই ধুলো আর একখণ্ড ভুয়া পাথর। এই শোষণ থেকে সামাজিকভাবে মুক্ত হতে হলে আমাদের কয়েকটি মৌলিক জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে:
প্রশ্ন করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা: মজিদ সবচেয়ে বেশি ভয় পায় 'প্রশ্ন'-কে। সে চায় সবাই অন্ধের মতো মাথা নোয়াবে।আমাদের পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই প্রশ্ন করার স্বাধীনতা দিতে হবে।
যে শিক্ষক, যে নেতা বা যে ধর্মপ্রচারক প্রশ্ন করায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, বুঝতে হবে সেখানেই কোনো 'মজিদবাদ' লুকিয়ে আছে।
লেবাসের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মূল্যায়ন করা: কারো বাহ্যিক পোশাক, দাড়ি, টুপি, টাই কিংবা রাজনৈতিক স্লোগান দেখে তাকে সৎ বা বিচারক মনে করার ভুল থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মানুষকে বিচার করতে হবে তার আচরণ, সততা, কাজের স্বচ্ছতা এবং মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে।
তথ্যের সত্যতা যাচাই: ডিজিটাল মজিদদের যুগে বেঁচে থাকতে হলে আমাদের 'মিডিয়া লিটারেসি' বাড়াতে হবে। কোনো খবর বা ভিডিও দেখলেই আবেগে ভেসে না গিয়ে তার মূল উৎস কোথায় তা অনুসন্ধান করতে হবে। কাউকে হুট করে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক 'ট্যাগ' দেওয়ার আগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করতে হবে আমি কি কোনো আধুনিক মজিদের শোষণের হাতিয়ার হচ্ছি না তো?
নিজের ভেতরের মজিদকে চেনা ও লালসালুর রক্তিম আভা
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ 'লালসালু' উপন্যাসের শেষে কোনো নাটকীয় বিজয় দেখাননি। উপন্যাস শেষেও দেখা যায় মহব্বতপুর গ্রামে খরা নেমে এসেছে, শস্যের চরম সংকট, কিন্তু মজিদ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার মাজারকে আঁকড়ে ধরে। এটি ওয়ালীউল্লাহর এক নির্মম বাস্তবতা। তিনি পাঠককে প্রস্তুত উত্তর দেননি, বরং পাঠকের বিবেকের সামনে একটি বিরাট আয়না ধরে দিয়ে গেছেন।
মজিদ কোনো মৃত চরিত্র নয়। মজিদ প্রতিনিয়ত আমাদের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়।কখনো সে ধর্মীয় নেতার বেশে এসে আমাদের জান্নাত-জাহান্নামের ভয় দেখিয়ে পকেট কাটে।
কখনো সে চতুর রাজনীতিবিদের বেশে এসে অপোজিশনকে 'দেশদ্রোহী' বা 'দালাল' ট্যাগ দিয়ে নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে। কখনো বা সে সামাজিক ইনফ্লুয়েন্সারের মুখোশ পরে ফেসবুক স্ক্রিনে উসকানিমূলক ভিডিও বানিয়ে ভিউয়ের বাণিজ্য করে।
তবে সবচেয়ে ভীতিজনক বিষয় হলো মজিদ কেবল বাইরের মানুষ নয়। সুযোগ পেলে, স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটলে আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ‘ক্ষুদ্র মজিদ’টি জেগে ওঠে। আমরাও তখন নিজেদের স্বার্থ বাঁচাতে মিথ্যার আশ্রয় নিই, প্রতিপক্ষকে নিচু করতে ভুল লেবেল লাগাই এবং নিজের সুবিধামতো নৈতিকতার সংজ্ঞা বদলে ফেলি।
যেদিন আমরা বাহ্যিক লেবাসের চেয়ে ভেতরের মানুষকে বেশি সম্মান দিতে শিখব, কুসংস্কারের চেয়ে যুক্তিকে বেশি প্রাধান্য দেব এবং ভয়ের সম্পর্কের চেয়ে ভালোবাসার মানবতাকে বড় করে দেখব ঠিক সেদিনই মহব্বতপুর থেকে, আমাদের সমাজ থেকে এবং আমাদের মন থেকে লালসালুর ভীতিপ্রদ রক্তিম রাজত্ব চিরতরে বিলীন হবে।





















