রমাদানের আগমনী বার্তা - রজব ও শাবান মাসের ফজিলত এবং আমাদের করণীয়
ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রতিটি মাসই তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে মহিমান্বিত। তবে বছরের বারোটি মাসের মধ্যে রমাদান মাসের মর্যাদা সবার ওপরে। আর এই মহিমান্বিত রমাদানকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি শুরু হয় তার দুই মাস আগে থেকেই পবিত্র রজব ও শাবান মাস থেকে। মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দারা এই সময় থেকেই হৃদয়ে আধ্যাত্মিকতার বীজ বপন করতে শুরু করেন, যাতে রমাদানে তারা তাকওয়ার পূর্ণ ফসল ঘরে তুলতে পারেন। প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের শিখিয়ে গেছেন কীভাবে এই বিশেষ সময়গুলোতে দু‘আ এবং ইবাদতের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। এই প্রবন্ধে আমরা রজব ও শাবানের গুরুত্ব, বরকতের দু‘আ এবং রমাদানের প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
বরকতের সেই বিশেষ সুন্নাত দু‘আ
এখন থেকেই রমাদান পর্যন্ত আমাদের দৈনন্দিন আমলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত সেই ছোট্ট কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী দু‘আটি। রাসূলুল্লাহ (সা.) রজব মাস শুরু হওয়ার পর থেকেই এই দু‘আটি পাঠ করতেন।
اللهمَّ بارِكْ لنا في رَجَبَ وشَعْبانَ. وبَلِّغْনা رمَضَانَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রজাবা ওয়া শা‘বান। ওয়া বাল্লিগনা রমাদান।
অর্থ: "হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং আমাদের রমাদান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।"
কেন এই দু‘আটি গুরুত্বপূর্ণ?
এই দু‘আটির মধ্যে দুটি গভীর চাওয়া লুকিয়ে আছে। প্রথমত, আমরা বর্তমান সময়ের (রজব ও শাবান) জন্য বরকত চাচ্ছি। বরকত মানে হলো অল্প সময়ে বেশি কাজ করার সক্ষমতা এবং নেক আমলের তৌফিক পাওয়া। দ্বিতীয়ত, আমরা আল্লাহর কাছে দীর্ঘায়ু এবং সুযোগ প্রার্থনা করছি যাতে আমরা আসন্ন রমাদান মাসটি সুস্থ শরীরে এবং পূর্ণ ইমানি শক্তিতে পেতে পারি। অনেক সৌভাগ্যবান মানুষ রমাদানের অপেক্ষায় থাকেন, কিন্তু মৃত্যু বা অসুস্থতা তাদের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ থেকে বঞ্চিত করে। তাই এই দু‘আটি পড়া সুন্নাত এবং একজন মুমিনের ঐকান্তিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ।
রজব মাস - বীজ বপনের সময়
আরবি পঞ্জিকা অনুযায়ী রজব হলো সপ্তম মাস। এটি ইসলামের চারটি সম্মানিত বা 'আশহুরুল হুরুম' মাসের অন্যতম। কুরআনুল কারীমে মহান আল্লাহ এই মাসগুলোতে নিজেদের ওপর জুলুম না করার এবং ইবাদতে মগ্ন হওয়ার বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন।
আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির শুরু
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, রজব মাস হলো ইবাদতের বীজ বপনের সময়। অর্থাৎ, আপনি যদি রমাদানে দীর্ঘ সময় কুরআন তিলাওয়াত বা তাহাজ্জুদ পড়তে চান, তবে তার অভ্যাস এখন থেকেই শুরু করতে হবে। হঠাৎ করে রমাদানে গিয়ে নিজেকে পরিবর্তন করা কঠিন, তাই রজব থেকেই ছোট ছোট আমলের মাধ্যমে নিজেকে মানসিকভাবে তৈরি করতে হয়।
ইস্তিগফার ও তাওবাহ
রজব মাসকে 'আল্লাহর মাস' হিসেবেও অনেক সময় অভিহিত করা হয় কারণ এই মাসে বান্দা বেশি বেশি ইস্তিগফার করে তার গুনাহের বোঝা হালকা করে। রমাদানে প্রবেশ করার আগে হৃদয়কে পরিষ্কার করার জন্য এই মাসটি একটি সুবর্ণ সুযোগ।
শাবান মাস - পরিচর্যার বসন্তকাল
শাবান মাস হলো রজব ও রমাদানের মধ্যবর্তী সেতু। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই মাসে রমাদানের বাইরে সবচেয়ে বেশি নফল রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, তিনি নবীজিকে শাবান মাসের মতো আর কোনো মাসে এত অধিক রোজা রাখতে দেখেননি।
আমলনামা উত্তোলনের মাস
উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) একবার রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে শাবান মাসে যত রোজা রাখতে দেখি, অন্য কোনো মাসে তা দেখি না।" উত্তরে নবীজি বললেন, "মানুষ রজব এবং রমাদানের মাঝখানের এই মাসটি সম্পর্কে গাফেল থাকে। অথচ এই মাসে বান্দার আমলসমূহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে পেশ করা হয়। তাই আমি ভালোবাসি যে, আমার আমল যখন আল্লাহর কাছে পেশ করা হবে, তখন যেন আমি রোজা অবস্থায় থাকি।" (সুনানে নাসায়ি)।
কুরআন তিলাওয়াতের বিশেষ মাস
সালাফ বা পূর্ববর্তী নেককার বান্দারা শাবান মাসকে বলতেন 'কুরআন তিলাওয়াতকারীদের মাস'। তারা এই মাসে নিজেদের ব্যবসার হিসাব চুকিয়ে ফেলতেন এবং পুরো সময় কুরআনের জন্য বরাদ্দ রাখতেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই যাতে রমাদানে তারা কুরআনের গভীরে অবগাহন করতে পারেন।
রমাদান পর্যন্ত পৌঁছানোর আকুতি - মুমিনের লক্ষ্য
রমাদান পর্যন্ত বেঁচে থাকা এবং সুস্থ থাকা আল্লাহর এক বিশাল নেয়ামত। সাহাবায়ে কেরাম রমাদানের ছয় মাস আগে থেকেই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন, "হে আল্লাহ! আমাদের রমাদান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।" আবার রমাদান চলে যাওয়ার পর পরবর্তী ছয় মাস দু‘আ করতেন, "হে আল্লাহ! রমাদানে আমাদের করা আমলগুলো কবুল করুন।"
মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করা
আমরা যখন 'ওয়া বাল্লিগনা রমাদান' বলি, তখন আমাদের মনে রমাদানের একটি পরিকল্পনা (Plan) থাকা উচিত। কেবল দু‘আ করাই যথেষ্ট নয়, বরং রমাদানে আমি কয়বার কুরআন খতম দেব, কতটুকু দান-সদকা করব এবং কোন গুনাহগুলো ত্যাগ করব—তার একটি রোডম্যাপ এখন থেকেই তৈরি করা উচিত।
রজব ও শাবানে আমাদের করণীয় কার্যাবলি
রমাদানের পূর্ণ বরকত পেতে হলে এই দুই মাসে নিচের কাজগুলো নিয়মিত করার চেষ্টা করা যেতে পারে:
বেশি বেশি দু‘আ পাঠ: পথে-ঘাটে, রিকশায় বা অফিসের কাজের ফাঁকে 'আল্লাহুম্মা বারিক লানা...' দু‘আটি জিকিরের মতো পড়া। এতে প্রতিবার সুন্নাত আদায়ের সওয়াব হবে।
নফল রোজা: সম্ভব হলে সোমবার এবং বৃহস্পতিবার সুন্নাত রোজা রাখা শুরু করা। এতে রমাদানে দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার ক্লান্তি শরীর আগে থেকেই সয়ে নেবে।
কুরআন তিলাওয়াত শুরু: দৈনিক অন্তত ৫ থেকে ১০ আয়াত অর্থসহ পড়ার অভ্যাস করা।
বদভ্যাস ত্যাগ: মিথ্যা কথা বলা, গিবত করা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অনর্থক সময় নষ্ট করার অভ্যাসগুলো এখন থেকেই কমিয়ে আনা।
একটি পরিবর্তনের সূচনা
রমাদান হলো মুমিনের জন্য একটি রিফ্রেশমেন্ট কোর্স। এই কোর্সে ভালো ফলাফল করতে হলে প্রিপারেটরি বা প্রস্তুতিমূলক ক্লাসের কোনো বিকল্প নেই। রজব এবং শাবান মাস হলো সেই প্রস্তুতির সময়। আমরা যদি এখন থেকেই 'আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রজাবা ওয়া শা‘বান, ওয়া বাল্লিগনা রমাদান' দু‘আটি পাঠ করি এবং সে অনুযায়ী কাজ করি, তবে ইনশাআল্লাহ আমাদের এবারের রমাদান হবে জীবনের শ্রেষ্ঠ রমাদান।
আসুন, আমরা অলসতা ঝেড়ে ফেলি। ছোট এই দু‘আটি নিজের মুখে এবং পরিবারের সবার মুখে ছড়িয়ে দিই। আল্লাহ আমাদের রজব ও শাবানে বরকত দিন এবং পূর্ণ সুস্থতার সাথে ইবাদতগুজার অবস্থায় রমাদান পর্যন্ত পৌঁছে দিন। আমিন।




















