মায়ের দোয়া ও বদদোয়া – সন্তানের ভাগ্য নির্ধারণে এক অদৃশ্য শক্তি

‘মা’ মাত্র একটি অক্ষর বা একটি একশব্দের বাক্য, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত মমতা, প্রশান্তি ও নিবিড় আশ্রয়ের চিরন্তন মহাকাব্য। পৃথিবীতে মানুষের জীবনের সূচনা ঘটে মায়ের জঠরে, আর সেই সূচনালগ্ন থেকেই শুরু হয় এক তরফা আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার অবিরাম ধারা। কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক কিংবা সাধারণ মানুষ কারো পক্ষেই মায়ের ভালোবাসার গভীরতা মাপার কোনো দাঁড়িপাল্লা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। মা শব্দটির সাথে জড়িয়ে আছে একটি আত্মিক অনুভূতি, বিপদের মুহূর্তে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় এবং রাব্বুল আলামিনের দরবারে আরজ পেশ করার এক অবারিত ও অনায়াস দোয়ার দরজা।
মানবসমাজে পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে মা-বাবার গুরুত্ব স্বীকৃত হলেও, কালজয়ী জীবনবিধান ইসলামে এই সম্পর্ককে কেবল একটি বৈষয়িক বা সামাজিক বন্ধন হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। ইসলাম মায়ের মর্যাদা ও মায়ের প্রতি দায়িত্বকে সরাসরি আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ (তৌহিদ) ও ইবাদতের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত করে একে এক সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক ইবাদতে রূপান্তর করেছে। ইসলামী আকাইদ ও তাসাউফের দৃষ্টিতে মায়ের হাসি হলো রব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টির প্রতীক, আর মায়ের চোখের পানি বা ক্ষোভ হলো আল্লাহর গজব ও অসন্তুষ্টির সংকেত।
মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাদিসে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, সন্তানের জান্নাত লাভের চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে মায়ের খিদমত ও তাঁর পদতলে। বর্তমান আধুনিক সমাজে যখন ব্যক্তিকৈন্দ্রিকতা, ব্যস্ততা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে অনেক বয়োবৃদ্ধ মা-বাবা অবহেলা ও বৃদ্ধাশ্রমের মুখোমুখি হন, তখন ইসলামী জীবন দর্শনে মাতৃভক্তির গুরুত্ব পুনর্মূল্যায়ন করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি হয়ে পড়েছে। এই নিবন্ধে আমরা পবিত্র কোরআন, সহিহ হাদিস, ঐতিহাসিক ঘটনাবলী এবং আধ্যাত্মিক পর্যালোচনার আলোকে মায়ের মর্যাদা, মায়ের দোয়ার অলৌকিক শক্তি, বদদোয়ার ধ্বংসাত্মক পরিণতি এবং দৈনন্দিন জীবনে মায়ের সন্তুষ্টি অর্জনের ব্যবহারিক নির্দেশিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
পবিত্র কোরআনের ক্যানভাসে মায়ের অধিকার ও মর্যাদা
পবিত্র কুরআনুল কারীমে মহান আল্লাহ তাআলা যেখানেই নিজের ইবাদত ও একত্ববাদের নির্দেশ দিয়েছেন, প্রায় প্রতিটি স্থানেই তার পরপরই পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের আদেশ দান করেছেন। কোরআনে কারীমের এই গাঠনিক শৈলীই প্রমাণ করে যে, সৃষ্টিকর্তার ইবাদতের পর মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় নৈতিক ও দ্বীনি দায়িত্ব হলো পিতামাতার—বিশেষ করে মায়ের খিদমত করা।
গর্ভাবস্থা ও দুগ্ধপানের মহাকষ্টের স্মরণ
গর্ভধারণ থেকে শুরু করে প্রসব এবং পরবর্তীতে দুধ খাওয়ানোর যে অকল্পনীয় শারীরিক ও মানসিক কষ্ট মা একাকী সহ্য করেন, কুরআন মজিদ অত্যন্ত জীবন্ত ভাষায় তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
"আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে অত্যন্ত কষ্টের সাথে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্টের সাথে তাকে প্রসব করেছে। আর তাকে গর্ভে ধারণ করা ও তার দুধ ছাড়ানোর মেয়াদ ত্রিশ মাস।" (সূরা আল-আহকাফ, আয়াত: ১৫)
অন্য এক আয়াতে মায়ের এই ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে:
"আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের ওপর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। আমারই কাছে চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন।" (সূরা লুকমান, আয়াত: ১৪)
এই আয়াতগুলোতে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তাআলা নিজের প্রতি কৃতজ্ঞতা (শুকরিয়া) আদায়ের পাশাপাশি মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি পিতামাতার ত্যাগের প্রতি অকৃতজ্ঞ, তার দ্বারা আল্লাহর প্রতি প্রকৃত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পাওয়া অসম্ভব।
বার্ধক্যে আচরণ ও ‘উফ’ শব্দ বলার ওপর নিষেধাজ্ঞা
পিতা-মাতা যখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েন, তখন তাদের মেজাজ বা শারীরিক চাহিদা পরিবর্তন হতে পারে। এই সংবেদনশীল সময়ে সন্তানের আচরণ কেমন হওয়া উচিত, তা সূরা আল-ইসরা (বনী ইসরাঈল)-এ অত্যন্ত কঠোর ও প্রাঞ্জল ভাষায় নির্দেশ করা হয়েছে:
"তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন অথবা উভয়ই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ (বিরক্তি বা অবজ্ঞাসূচক শব্দ) বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো। আর তাদের সামনে দয়াপরবশ হয়ে নম্রতার ডানা বিছিয়ে দাও এবং বলো: ‘হে আমার রব! তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন’।" (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩-২৪)
কোরআনের এই আয়াতটি মুমিনের জীবনের জন্য এক মহামূল্যবান আচরণবিধি। মায়ের কোনো কথায় বিরক্তি প্রকাশ করে একটি সামান্য নিঃশ্বাস ফেলা বা ‘উফ’ বলাকেও শরীয়তে কবিরা গুনাহের সমতুল্য অবাধ্যতা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
সুন্নাহ ও হাদিসের আলোকে মায়ের তিনগুণ শ্রেষ্ঠত্ব
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অজস্র বাণীতে মায়ের অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং বাবার চেয়েও মায়ের অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
পিতার চেয়ে মায়ের তিনগুণ বেশি অধিকার
ইসলামী শরীয়তে পিতার সম্মান ও অবস্থান যেমন সুউচ্চ, তেমনি সেবার দিক থেকে মায়ের হককে পিতার চেয়ে তিনগুণ বেশি ঘোষণা করা হয়েছে। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত বিখ্যাত হাদিসে এসেছে:
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে আরজ করল: "হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকট থেকে সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার পাওয়ার সর্বাধিক অধিকারী কে?"
মহানবী (সা.) বললেন: "তোমার মা।"
লোকটিকে আবার জিজ্ঞেস করল: "তারপর কে?"
তিনি বললেন: "তোমার মা।"
লোকটিকে তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করল: "তারপর কে?"
তিনি আবারও বললেন: "তোমার মা।"
লোকটিকে চতুর্থবার জিজ্ঞেস করার পর তিনি বললেন: "তারপর তোমার বাবা, এবং এরপর তোমার নিকটাত্মীয়গণ।"
(সহিহ বুখারী: ৫৯৭১, সহিহ মুসলিম: ২৫৪৮)
মুহাদ্দিসীন ও তাফসিরকারকগণ এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, মা সন্তানকে জন্ম দিতে গিয়ে মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট ও অনন্য কষ্ট একাকী সহ্য করেন, যা বাবা কোনোদিন করতে পারেন না:
১. গর্ভধারণের দীর্ঘ ৯-১০ মাসের কষ্ট।
২. প্রসববেদনা ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সন্তান প্রসবের কষ্ট।
৩. নিজের রক্ত নিংড়ে দুই বছর পর্যন্ত দুধ পান করানো ও রাত জেগে লালন-পালন করার কষ্ট।
এই তিনটি মৌলিক ও একক ত্যাগের কারণেই শরীয়তে সেবাপ্রাপ্তি ও সদ্ব্যবহারের বিচারে মাকে বাবার ওপর তিনগুণ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
"জান্নাত মায়ের পদতলে"–হাদিসের গভীর তাৎপর্য
ইসলামে মায়ের খিদমতকে জিহাদের চেয়েও বড় ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ইবাদত হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। হযরত জাহেমা (রা.) নামক এক সাহাবী নবীজি (সা.)-এর কাছে এসে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। নবীজি (সা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন: "তোমার কি মা জীবিত আছেন?" তিনি বললেন: "হ্যাঁ।" তখন মহানবী (সা.) ইরশাদ করলেন:
"তুমি তোমার মায়ের খিদমতে লেগে থাকো, কেননা জান্নাত তাঁর দুই পায়ের নিচে অবস্থিত।"(সুনানে নাসাঈ: ৩১০৪, মুসনাদে আহমাদ; হাদিসটি সহিহ)
'জান্নাত মায়ের পায়ের নিচে' এই বাণীর অর্থ কেবল বাহ্যিক কোনো রূপক নয়। এর গভীর আত্মিক অর্থ হলো, জান্নাত লাভের সমস্ত শর্ত ও পথ মায়ের সন্তুষ্টি এবং তাঁর চরণের খিদমতের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। যে সন্তান তার মায়ের মন জয় করতে পেরেছে, জান্নাত তার জন্য সুনিশ্চিত।
মায়ের দোয়ার মহাজাগতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি
আল্লাহ তাআলা দুআ কবুল করার জন্য জগতে কিছু নির্দিষ্ট মাধ্যম ও বিশেষ বান্দাদের দোয়ায় সুনির্দিষ্ট অলৌকিক ক্ষমতা দান করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী ও প্রত্যক্ষ মাধ্যম হলো সন্তানের জন্য মায়ের দরদমাখা দোয়া।
হাদিসের আলোকেও মায়ের দোয়ার দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন কিছু দোয়ার কথা উল্লেখ করেছেন যা আল্লাহর আরশে সরাসরি পৌঁছে যায় এবং যার মাঝে ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
"তিনটি দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়–১. মজলুমের দোয়া, ২. মুসাফিরের দোয়া এবং ৩. সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৫৩৬, জামে আত-তিরমিযী: ১৯০৫; হাদিসটি সহিহ)
মায়ের ভালোবাসা যেহেতু শতভাগ নিঃস্বার্থ, তাই মায়ের অন্তর থেকে নির্গত প্রতিটি দোয়ার পেছনে থাকে গভীর আবেগ, চোখের পানি ও আত্মিক আকুতি। যখন একজন মা তাঁর সন্তানের কল্যাণে হাত তোলেন, তখন আল্লাহর কুদরত ও দয়ার সাগরে জোয়ার আসে এবং সেই দোয়া মুহূর্তের মধ্যে আরশে অজিমে কবুল হয়ে যায়।
ওহুদের যুদ্ধ ও উয়াইস আল-কারনী (রহ.)-এর ঐতিহাসিক ঘটনা
ইসলামের ইতিহাসে মায়ের অনুগত সেবা ও দোয়ার বরকতে সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভের শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত হলেন তাবেয়ীদের সরদার হযরত উয়াইস আল-কারনী (রহ.)। তিনি ইয়েমেনে বসবাস করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে জীবিত থাকা সত্ত্বেও এবং তাঁর প্রতি গভীর ঈমান থাকা সত্ত্বেও তিনি কেবল তাঁর বৃদ্ধা ও অন্ধ মায়ের সেবায় নিয়োজিত থাকার কারণে মদিনায় এসে মহানবী (সা.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেননি। ফলে তিনি সাহাবী হওয়ার মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হন।
কিন্তু মায়ের প্রতি তাঁর এই অতুলনীয় সেবা ও মায়ের দোয়ার কারণে নবীজি (সা.) তাঁর জীবদ্দশাতেই সাহাবীদের কাছে উয়াইস আল-কারনীর সুউচ্চ মর্যাদার সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সা.) হযরত উমর (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-কে ওসিয়ত করে গিয়েছিলেন:
"তোমাদের কাছে ইয়েমেন থেকে সাহায্যকারী দলের সাথে উয়াইস ইবনে আমীর আসবে... তার একজন মা আছেন, যার প্রতি সে অত্যন্ত অনুগত ও সৎ। সে যদি কোনো বিষয়ে আল্লাহর নামে কসম খায়, তবে আল্লাহ তা পূরণ করে দেন। যদি পারো, তবে তার মাধ্যমে তোমাদের নিজেদের জন্য ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করিয়ে নিও।" (সহিহ মুসলিম: ২৫৪২)
পরবর্তীতে হযরত উমর (রা.) তাঁর খিলাফতকালে উয়াইস আল-কারনী (রহ.)-কে খুঁজে বের করেন এবং তাঁর কাছে দোয়া চান। একজন বিশ্বনেতা ও খলিফাতুল মুসলিমীন হয়েও হযরত উমর (রা.) যাঁর কাছে দোয়ার আরজি জানালেন, তিনি কোনো বড় আলেম, দানবীর বা রণক্ষেত্রের বীর ছিলেন না; তিনি ছিলেন কেবল মায়ের অনুগত ও মায়ের দোয়াধন্য এক সাধারণ ইয়েমেনি যুবক!
মায়ের বদদোয়ার অদৃশ্য বিপর্যয় ও ভীতিপ্রদ পরিণতি
যেভাবে মায়ের দোয়া সন্তানকে সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে যায়, ঠিক তেমনি মায়ের অন্তরভাঙা বদদোয়া বা অভিশাপ সন্তানের জীবনের ইহকাল ও পরকালকে এক লহমায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে। মায়ের অভিশাপের প্রভাব এতটাই তীব্র যে, তা পরম পরহেজগার বা ইবাদতগুজার ব্যক্তির জীবনকেও মহা পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
জুরাইজ আবেদ (আবেদ ইবাদতগুজার)-এর শিক্ষণীয় ঘটনা
বনী ইসরাঈলের এক পরম পরহেজগার ব্যক্তি ছিলেন জুরাইজ। তিনি নিজের ইবাদতখানায় দিনরাত আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। একদিন তিনি নফল নামাজে রত থাকা অবস্থায় তাঁর বৃদ্ধা মা এসে তাঁকে ডেকে বললেন, "হে জুরাইজ!" জুরাইজ মনে মনে চিন্তা করলেন, "একদিকে আমার নামাজ, অন্যদিকে আমার মা!" তিনি নামাজ চালিয়ে যাওয়াকে অগ্রাধিকার দিলেন এবং মায়ের ডাকে সাড়া দিলেন না। পরদিন এবং তার পরদিনও মা এলেন এবং একইভাবে জুরাইজ ইবাদতে ব্যস্ত থাকায় মায়ের ডাকে সাড়া দিলেন না।
মা ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে হাত তুলে দোয়া করলেন:
"হে আল্লাহ! যতক্ষণ না সে কোনো ব্যভিচারিণী বা পতিতার মুখ দেখে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে মৃত্যু দিয়ো না।"
মায়ের এই সামান্য ক্ষোভের দোয়া সাথে সাথে কবুল হয়ে যায়। পরবর্তীতে এক ব্যভিচারিণী নারী জুরাইজের ওপর মিথ্যা অপবাদ দেয় যে, জুরাইজের সাথে অবৈধ সম্পর্কের ফলে তার সন্তান হয়েছে। সাধারণ মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে জুরাইজের ইবাদতখানা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় এবং তাঁকে চরম অপমানিত করে। যদিও পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা অলৌকিকভাবে সেই নবজাতক শিশুকে কথা বলিয়ে জুরাইজকে নিষ্পাপ প্রমাণ করেছিলেন, কিন্তু মায়ের ডাকে সাড়া না দেওয়ার কারণে সেই অলি ও আবেদ পুরুষকেও চরম অপমান ও পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। (সহিহ বুখারী: ২৪৮২, সহিহ মুসলিম: ২৫৫০)
আলকামা (রা.)-এর সাকরাতের (মৃত্যুর যন্ত্রণা) ঘটনা
ইসলামের ইতিহাসে আরেকটি অত্যন্ত সুপরিচিত ও শিক্ষাগ্রাহ্য ঘটনা হলো আলকামা (রা.)-এর ঘটনা। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একজন নিষ্ঠাবান সাহাবী ছিলেন, যিনি প্রচুর নামাজ, রোজা ও দান-ছদকা করতেন। কিন্তু মৃত্যুর সময়ে তাঁর মুখে কালেমা শাহাদাত উচ্চারিত হচ্ছিল না; জিহ্বা যেন অবশ হয়ে গিয়েছিল।
নবীজি (সা.) বিষয়টি জানতে পেরে খোঁজ নিয়ে দেখলেন যে, আলকামার বৃদ্ধা মা তাঁর ওপর চরম অসন্তুষ্ট ছিলেন। কারণ আলকামা বিয়ের পর স্ত্রীর অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে অজান্তে মায়ের মনে কষ্ট দিয়েছিলেন। মায়ের অসন্তুষ্টির কারণেই মৃত্যুর বিকট যন্ত্রণার মধ্যেও আলকামার মুখ দিয়ে কালেমা বের হচ্ছিল না।
পরবর্তীতে নবীজি (সা.) কাঠ পুড়িয়ে আলকামাকে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়ার ভান করলেন। তা দেখে মায়ের মমতা জেগে উঠল এবং মা বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমার চোখের সামনে আমার সন্তানকে আগুনে পোড়াবেন না, আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম।" মা ক্ষমা করার সাথে সাথেই আলকামার মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের হয়ে এল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ এবং তিনি ঈমানের সাথে ইন্তেকাল করলেন। (বায়হাকী, শিআবুল ঈমান)
দৈনন্দিন জীবনে মায়ের অসন্তুষ্টির অদৃশ্য কুফল
আলেমগণ উল্লেখ করেছেন যে, অনেক সময় মানুষ বুঝতে পারে না কেন তার ব্যবসায় বার বার লোকসান হচ্ছে, কেন পরিবারে অশান্তি লেগে আছে, কেন সুচিকিৎসা সত্ত্বেও দূরারোগ্য ব্যাধি সারছে না কিংবা কেন সন্তান অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। এর নেপথ্যে অনুসন্ধানে বহু ক্ষেত্রে দেখা যায় বার্ধক্যে অবহেলিত মায়ের কোনো দীর্ঘশ্বাস বা চোখের পানি অলক্ষ্যে কাজ করছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন:
"তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে, তোমাদের সন্তানদের বিরুদ্ধে এবং তোমাদের ধন-সম্পদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করো না। পাছে তা এমন কোনো মুহূর্তের সাথে মিলে যায়, যখন আল্লাহর কাছে দোয়া চাইলে তা কবুল হয়ে যায়।" (সহিহ মুসলিম: ৩০১৪)
মায়ের সন্তুষ্টি অর্জনের পথ ও সুনির্দিষ্ট আচরনবিধি
ইসলাম কেবল তত্ত্ব প্রদান করে না, বরং দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে মায়ের মন জয় করা যায় এবং তাঁর মেজাজ ও চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলা যায়, তার বাস্তবমুখী দিকনির্দেশনাও প্রদান করে।
বাক্যালাপ ও কণ্ঠস্বরের শিষ্টাচার
কণ্ঠস্বর নিচু রাখা: মায়ের সামনে কথা বলার সময় স্বর সবসময় অনুচ্চ ও নরম রাখতে হবে। কখনোই মায়ের ওপর চিৎকার করা বা তর্ক করা শরীয়তে বৈধ নয়।
বিনয় প্রদর্শন: বৈষয়িক শিক্ষায় বা পদে সন্তান যত বড়ই হোক না কেন, মায়ের সামনে নিজেকে সবসময় একজন সাধারণ ও বাধ্য অনুগত সন্তান হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে।
আর্থিক ও শারীরিক খিদমত
প্রয়োজন পূরণে অগ্রাধিকার: নিজের সাধ্যানুযায়ী মায়ের খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান ও চিকিৎসার সুব্যবস্থা করা সন্তানের ওপর প্রাথমিক ফরজ দায়িত্ব।
স্ত্রী ও মায়ের হকের ভারসাম্য: পুরুষদের ক্ষেত্রে একটি বড় পরীক্ষা হলো মা ও স্ত্রীর অধিকারে ভারসাম্য রক্ষা করা। স্ত্রীকে তার প্রাপ্য সম্মান ও স্বাধীনতা দিতে হবে, কিন্তু কখনোই স্ত্রীর প্ররোচনায় পড়ে মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার বা মা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না।
মায়ের মৃত্যুর পরও অনুগত থাকার উপায়
যদি কারো মা ইন্তেকাল করে থাকেন, তবে তাঁর প্রতি সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং মৃত্যুর পরও সন্তানের আমলের মাধ্যমে মা কবরে সওয়াব পেতে থাকেন:
১. নিয়মিত ইস্তিগফার ও দোয়া করা: কুরআনে শেখানো দোয়াটি বেশি বেশি পড়া “রাব্বির হামহুমা কামা রব্বায়ানী ছাগীরা” (অর্থ: হে আমার রব! তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন)।
২. ঈসালে সওয়াব ও সদকায়ে জারিয়া: মায়ের নামে এতিমখানা, মসজিদ নির্মাণ, কুয়া খনন বা জনকল্যাণমূলক কাজে অর্থ দান করা।
৩. মায়ের আত্মীয় ও বান্ধবীদের সম্মান করা: হাদিস শরিফে এসেছে, মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর বান্ধবী বা পরিচিত মানুষদের সাথে ভালো ব্যবহার করাও মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহারের অংশ।
এক নজরে কোরআন ও হাদিসের আলোকে মায়ের মর্যাদা (সারসংক্ষেপ ছক)
পাঠকদের সুবিধার্থে ইসলামী শরীয়তে মায়ের অবস্থান, দায়িত্ব ও ফজিলত সম্পর্কিত সারসংক্ষেপ ছক নিচে প্রদান করা হলো:
বিষয়বস্তু | কোরআন/হাদিসের সুনির্দিষ্ট রেফারেন্স | মূল শিক্ষা ও বাস্তব প্রয়োগ |
মায়ের ত্যাগের কথা স্মরণ | সূরা আল-আহকাফ: ১৫; সূরা লুকমান: ১৪ | গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানের কষ্টের জন্য চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকা। |
উফ শব্দ বলার নিষেধাজ্ঞা | সূরা আল-ইসরা (বনী ইসরাঈল): ২৩-২৪ | মায়ের কোনো আচরণে বিরক্তি বা রাগ প্রকাশ না করা। |
সেবাপ্রাপ্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব | সহিহ বুখারী: ৫৯৭১, সহিহ মুসলিম: ২৫ ৪৮ | বাবার চেয়েও মাকে সেবা ও ভালোবাসায় ৩ গুণ অগ্রাধিকার দেওয়া। |
জান্নাত লাভের মাধ্যম | সুনানে নাসাঈ: ৩১০৪, মুসনাদে আহমাদ | জিহাদের চেয়েও মায়ের সেবাকে জান্নাত পাওয়ার সহজ পথ মানা। |
দোয়া কবুলের নিশ্চয়তা | সুনানে আবু দাউদ: ১৫৩৬, জামে আত-তিরমিযী: ১৯০৫ | সন্তানের জন্য মায়ের দোয়া সরাসরি আরশে অতি দ্রুত কবুল হয়। |
অধ্যবসায় ও বদদোয়ার পরিণতি | সহিহ বুখারী: ২৪৮২ (জুরাইজের ঘটনা) | পিতামাতার ডাকে সাড়া না দেওয়া বড় বিপদের কারণ হতে পারে। |
আধুনিক প্রেক্ষাপট: বৃদ্ধাশ্রম, সামাজিক অবক্ষয় ও আমাদের করণীয়
বর্তমান ২১ শতকে আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া পেলেও আমাদের মানবিক মূল্যবোধ চরম সঙ্কটের মুখোমুখি। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার যুগে অনেক সন্তান মা-বাবাকে বোঝা মনে করতে শুরু করেছে। পৃথিবীর বহু দেশে এবং দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশেও ‘বৃদ্ধাশ্রম’ সংস্কৃতি ডালপালা মেলছে।
ইসলামী জীবনব্যবস্থায় বৃদ্ধাশ্রমের অবস্থান
ইসলাম ধর্মে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রম বা পরিবার থেকে আলাদা করে কোনো আশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া চরম গর্হিত ও হারাম কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই ব্যক্তির ওপর অভিশাপ দিয়েছেন, যে তার মা-বাবা উভয়কে বা কোনো একজনকে বার্ধক্য অবস্থায় পেল অথচ তাদের সেবা করে জান্নাত হাসিল করতে পারল না। (সহিহ মুসলিম: ২৫৫১)
মা-বাবার বার্ধক্য হলো সন্তানের জন্য জান্নাত অর্জনের সহজতম অনুদান। তাদের সেবা করার কষ্ট সহ্য করা ঈমানের পরীক্ষা। সন্তান যখন ছোট ও অসামর্থ্য ছিল, তখন মা-বাবা তাঁকে কোনো আশ্রমে ফেলে আসেননি; বরং নিজের সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়ে লালন-পালন করেছেন। সুতরাং বার্ধক্যে তাঁদের আগলে রাখা কোনো এহসান নয়, বরং তা ঋণের সামান্য পরিশোধ মাত্র।
পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা
পারিবারিক জীবনে সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই কোরআন-হাদিসের এই শিক্ষাগুলো অনুধাবন করাতে হবে। নিজের মা-বাবার সাথে সুসম্পর্ক ও সদাচরণের যে দৃষ্টান্ত আজ একজন পিতা বা মাতা স্থাপন করবেন, ভবিষ্যতে তাঁর সন্তানরাও তাঁর সাথে ঠিক একই আচরণ করবে।
কর্মব্যস্ততার মধ্যেও প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় মায়ের পাশে বসে গল্প করা, তাঁর সুখ-দুঃখের খোঁজ নেওয়া এবং তাঁর প্রিয় খাবার বা পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
উপসংহার
মা কেবল কোনো রক্তমাংসের মানুষ নন, মা হলেন এই ধূলাধরার বুকে মহান আল্লাহর অসীম রহমত ও দয়ার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন। মায়ের ভালোবাসায় কোনো কৃত্রিমতা নেই, নেই কোনো স্বার্থের হিসাব-নিকাশ। দুনিয়ার সমস্ত সম্পর্ক কোনো না কোনো স্বার্থ বা বিনিময়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, কিন্তু মায়ের ভালোবাসা হলো সম্পূর্ণ প্রতিদানহীন ও সর্বংসহা।
ইসলাম ধর্ম মাকে যে সুউচ্চ আসনে আসীন করেছে, তা পৃথিবীর কোনো মতবাদ বা ধর্ম দিতে পারেনি। মায়ের মুখের একটি তৃপ্তির হাসি মুমিনের জীবনে এনে দিতে পারে পরম সাফল্য, অন্তহীন বরকত ও জান্নাতের অবিসংবাদিত গ্যারান্টি। আর মায়ের চোখের এক ফোটা অশ্রু বা ক্ষোভের এক ফোঁটা নিশ্বাস উল্টে দিতে পারে জীবনের সমস্ত প্রাপ্তি ও অর্জনকে।
আসুন, আজ থেকেই আমরা প্রতিজ্ঞা করি আমরা আমাদের মায়ের মন কখনো ভাঙব না। মায়ের সেবা ও ভালোবেসে তাঁর মুখের দোয়ায় আমাদের জীবনকে ধন্য করব। যদি মা বেঁচে থাকেন, তবে এখনই গিয়ে তাঁর চরণ স্পর্শ করে ক্ষমা চেয়ে নিই এবং তাঁর সেবায় নিজেকে সঁপে দিই। আর মা যদি ওফাত পেয়ে থাকেন, তবে রাত-দিনের মোনাজাতে পরম করুণাময়ের দরবারে অশ্রুসজল চোখে দোয়া করি:
"Rabbir Hamhuma Kama Rabbayani Sagheera"
(অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! আমার মা-বাবার ওপর ঠিক তেমনি দয়া করুন, যেভাবে তাঁরা শৈশবে আমাকে পরম মমতায় লালন-পালন করেছিলেন।)





















