সৌদি আরব কি ওয়াহাবিবাদ থেকে সরে আসছে? রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের রূপান্তর ও ‘ভিশন ২০৩০’

সৌদি আরব কি ওয়াহাবিবাদ থেকে সরে আসছে? রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের রূপান্তর ও ‘ভিশন ২০৩০’

একাদিক্রমে বহু দশক ধরে ‘সৌদি আরব’ নামটি উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে বৈশ্বিক মানসপটে ভেসে উঠত চরম রক্ষণশীল এক ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের ছবি। যেখানে নারীদের জন্য ছিল কঠোর পর্দা ও চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা, গান-বাজনা ও সিনেমা ছিল নিষিদ্ধ, রাজপথে টহল দিত পরাক্রমশালী ধর্মীয় পুলিশ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিটি নীতি নির্ধারিত হতো অষ্টাদশ শতাব্দীর কঠোর বিশুদ্ধবাদী ধর্মীয় মতাদর্শ অনুযায়ী। তবে গত কয়েক বছরে মরুভূমির সেই দেশে বইছে এক নজিরবিহীন পরিবর্তনের হাওয়া।

ক্রাউন প্রিন্স ও ডি-ফ্যাক্টো শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান (সংক্ষেপে এমবিএস)-এর হাত ধরে সৌদি আরব তার শতবছরের সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে নতুন এক রূপান্তরে প্রবেশ করেছে। রিয়াদের কনসার্ট গ্রাউন্ডে তরুণ-তরুণীদের উন্মাদনা, সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের পদচারণা, রাস্তায় নারীদের গাড়ি চালানো কিংবা নিওম (NEOM)-এর মতো ভবিষ্যৎমুখী মেগা-প্রজেক্ট সবকিছুই সংকেত দিচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রভাবশালী দেশটি তার ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় গোঁড়ামি বা ওয়াহাবিবাদ (Wahhabism) থেকে দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় যে ওয়াহাবি মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে সৌদি রাজপরিবারের উত্থান ও টিকে থাকা, সেই ওয়াহাবিবাদকে কি সৌদি রাষ্ট্র আসলেই পরিত্যাগ করছে? নাকি এটি কেবলই বিশ্বকে দেখানোর জন্য এক অর্থনৈতিক বিপণন কৌশল? এই নিবন্ধে ওয়াহাবিবাদের সূচনা, সৌদি রাষ্ট্রের সাথে এর ঐতিহাসিক জোট, বিশ্বব্যাপী এর বিস্তার এবং বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর সংস্কারমুখী রাজনীতির নেপথ্য কারণসমূহ বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।

ইতিহাস ও জোট: সাউদ বংশ ও ওয়াহাবিবাদের ঐতিহাসিক মেলবন্ধন

সৌদি আরব রাষ্ট্র হিসেবে রাতারাতি গড়ে ওঠেনি; এর পেছনে রয়েছে ১৭৪৪ সালে স্বাক্ষরিত একটি ঐতিহাসিক চুক্তি, যা ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক-ধর্মীয় জোট হিসেবে পরিচিত।

দিরায়াহ চুক্তি ও প্রথম সৌদি রাষ্ট্র

অষ্টাদশ শতাব্দীতে অটোমান (উসমানীয়) সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়লে নজদ অঞ্চলে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এ সময় নজদের এক ছোট শহরের গোত্রপ্রধান মুহাম্মদ ইবনে সৌদ এবং কট্টর ধর্মীয় সংস্কারক শেখ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব-এর মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ‘দিরায়াহ চুক্তি’ নামে পরিচিত।

চুক্তির শর্ত ছিল সরল: মুহাম্মদ ইবনে সৌদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের ধর্মীয় মতাদর্শকে রাজনৈতিক ও সামরিক সুরক্ষা দেবেন এবং বিনিময়ে ইবনে আবদুল ওয়াহাব রাজনৈতিক শাসক হিসেবে ইবনে সৌদের বৈধতা ঘোষণা করবেন। এই দ্বিমুখী ক্ষমতার মেলবন্ধনেই জন্ম নেয় ‘প্রথম সৌদি রাষ্ট্র’ (১৭৪৪-১৮১৮)।

আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতার ভাগাভাগি

অটোমানদের সাথে সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে ১৯৩২ সালে কিং আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ (ইবনে সৌদ নামে পরিচিত) আধুনিক ‘সৌদি আরব রাজ্য’ প্রতিষ্ঠা করেন। আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও সাউদ পরিবার ও ইবনে আবদুল ওয়াহাবের বংশধরদের (যারা ‘আল আশ-শেখ’ নামে পরিচিত) মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা হয়:

সাউদ পরিবার (উমারা): রাষ্ট্র পরিচালনা, সামরিক বাহিনী, পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার একচ্ছত্র ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়।

আল আশ-শেখ ও উলামা পরিষদ (উলামা): ধর্মীয় বিষয়াবলী, বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, সামাজিক নীতি এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব লাভ করে।

এই ক্ষমতার ভাগাভাগির ফলেই ওয়াহাবিবাদ কেবল একটি আন্দোলন থাকেনি, বরং তা সরাসরি সৌদি আরবের প্রাতিষ্ঠানিক ‘রাষ্ট্রধর্ম’ ও আইনি কাঠামোয় রূপান্তরিত হয়।

ওয়াহাবিবাদ কী এবং এর মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ

ওয়াহাবিবাদ মূলত সুন্নি ইসলামের এক চরমপন্থী, রূপক অর্থ পরিহারকারী (Literalist) ও বিশুদ্ধবাদী সংস্করণ। এর প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব (১৭০৩-১৭৯২) বিশ্বাস করতেন যে, তৎকালীন মুসলিম সমাজ আদি ও অকৃত্রিম ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে এবং মাজারপূজা, সুফিবাদ ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত হয়েছে।

ওয়াহাবিবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

একক তৌহিদ ও শিরক বর্জন: আল্লাহর একত্ববাদে কোনো ধরনের মধ্যস্থতাকারী (পীর, মুরশিদ বা অলী-আউলিয়া) গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম ও শিরক হিসেবে গণ্য করা হয়।

মাজার ও সমাধিসৌধ ধ্বংস: কবর বা মাজারের ওপর যেকোনো স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। ওয়াহাবি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কাজই ছিল বিভিন্ন ঐতিহাসিক সমাধি ও সুফি মাজার গুঁড়িয়ে দেওয়া।

সুফিবাদ ও শিয়াবাদের কঠোর বিরোধিতা: সুফিদের আত্মিক চর্চা এবং শিয়াদের দ্বাদশ ইমাম কেন্দ্রিক ধারণাকে ইসলামী আকীদার পরিপন্থী বলে গণ্য করা হয়।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিষেধাজ্ঞা: সঙ্গীত চর্চা, ভাস্কর্য, চিত্রাঙ্কন, নাটক ও বিনোদন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পুরুষদের বাধ্যতামূলকভাবে জামাতে নামাজ আদায় করা এবং মহিলাদের মাহরাম ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়া বা মুখ অনাবৃত রাখা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

‘আম্‌র বিল মা'রুফ ওয়া নহি আনিল মুনকার’ (ধর্মীয় পুলিশ): এই নীতির ভিত্তিতে ‘কমিটি ফর দ্য প্রমোশন অফ ভার্চু অ্যান্ড দ্য প্রিভেনশন অফ ভাইস’ (CPVPV) বা ‘মুতাওয়া’ গঠিত হয়। এই ধর্মীয় পুলিশ বাহিনীকে রাস্তায় রাস্তায় টহল দিয়ে মানুষকে নামাজে পাঠানো, পোশাকের শালীনতা পরীক্ষা করা এবং নারী-পুরুষের মেলামেশা বন্ধ করার আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।

বৈশ্বিক রপ্তানি ও পেট্রোডলার কূটনীতি

বিংশ শতাব্দীর সত্তর ও আশির দশকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অভূতপূর্ব বৃদ্ধি পেলে সৌদি সরকারের হাতে বিপুল অর্থ বা ‘পেট্রোডলার’ আসতে শুরু করে। স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা বিশ্বের (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র) সান্নিধ্যে সৌদি আরব বিশ্বের বিভিন্ন কোণে ওয়াহাবি মতাদর্শ প্রচার করতে হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করে। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার মসজিদ, মাদ্রাসা ও ইসলামিক সেন্টার গড়ে তোলা হয়, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কমিউনিস্ট মতাদর্শকে রূখে দেওয়া এবং বিশ্বজুড়ে সুন্নি মুসলিমদের ওপর সৌদি আরবের ধর্মীয় প্রভাব বিস্তার করা।

বাঁক পরিবর্তন: ৯/১১, সন্ত্রাসবাদ ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ

বিগত কয়েক দশক ধরে ওয়াহাবিবাদ প্রচার করে আসলেও একসময় এই মতাদর্শ নিজেই সৌদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৭৯ সালের কাবা শরিফ অবরোধ (Grand Mosque Seizure)

১৯৭৯ সালে কট্টরপন্থী ওয়াহাবি মতাদর্শে বিশ্বাসী জুহায়মান আল-ওতাইবি এবং তার দল মক্কার মসজিদুল হারাম দখল করে নেয়। তাদের দাবি ছিল, সৌদি রাজপরিবার পশ্চিমা প্রভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তৎকালীন সৌদি সরকার কট্টরপন্থীদের শান্ত করতে উল্টো সমাজের ওপর ওয়াহাবি ধর্মীয় পুলিশ ও উলামাদের প্রভাব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলস্বরূপ, ১৯৭৯ পরবর্তী সৌদি আরব আরও চরম রক্ষণশীলতার অন্ধকারে তলিয়ে যায়।

১১ সেপ্টেম্বরের হামলা (৯/১১) ও আল-কায়েদা

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত হামলায় অংশগ্রহণকারী ১৯ জন বিমান হাইজ্যাকারের মধ্যে ১৫ জনই ছিল সৌদি নাগরিক। উপরন্তু, আল-কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেন ছিলেন সৌদি আরবের প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান। বিশ্বের দরবারে প্রশ্ন ওঠে ওয়াহাবিবাদই কি আধুনিক আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর? আল-কায়েদা এবং পরবর্তীতে ইসলামিক স্টেট (ISIS) তাদের চরমপন্থী ভাবাদর্শ ও শিরক-বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য মূলত ওয়াহাবি টেক্সট ও কিতাবকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র কূটনৈতিক চাপ এবং পরবর্তীতে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ মাটিতেই আল-কায়েদার ধারাবাহিক বোমাহামলা সৌদি রাজপরিবারকে এটি উপলব্ধি করতে বাধ্য করে যে, যে ওয়াহাবিবাদী ধর্মীয় শক্তিকে তারা লালন-পালন করেছে, তা এখন রাষ্ট্রকেই গিলে খেতে চাইছে।

মোহাম্মদ বিন সালমান (MBS) ও রূপান্তরের নতুন যুগ

২০১৫ সালে বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ সিংহাসনে বসেন এবং তাঁর তরুণ পুত্র মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) দ্রুত ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন। ২০১৭ সালে ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এমবিএস সৌদি সমাজ ও অর্থনীতিকে আমূল বদলে ফেলার মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেন, যার নাম ‘ভিশন ২০৩০’ (Vision 2030)

সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারসমূহ

ধর্মীয় পুলিশের (Mutawa) ডানা ছাঁটা: ২০১৬ সালেই এক ডিক্রির মাধ্যমে ধর্মীয় পুলিশের গ্রেপ্তার করা, টহল দেওয়া এবং নাগরিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করার সমস্ত ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। রাজপথ থেকে উধাও হয়ে যায় মুতাওয়া বাহিনী।

নারীদের ক্ষমতায়ন ও স্বাধীনতা:

২০১৮ সালে সৌদিতে নারীদের গাড়ি চালানোর ঐতিহাসিক অনুমতি দেওয়া হয়। পুরুষের অভিভাবকত্ব আইন (Male Guardianship Law) শিথিল করা হয়েছে; এখন নারীরা এককভাবে ভ্রমণ, পাসপোর্ট তৈরি ও চাকরির আবেদন করতে পারেন। কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের একত্রে কাজ করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

বিনোদন শিল্পের উন্মোচন: ৩৫ বছর ধরে নিষিদ্ধ থাকা সিনেমা হল ২০১৮ সালে পুনরায় চালু করা হয়। গড়ে তোলা হয়েছে ‘জেনারেল এন্টারটেইনমেন্ট অথরিটি’ (GEA)। অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘রিয়াদ সিজন’-এর মতো মেগা কালচারাল ফেস্টিভ্যাল, যেখানে আন্তর্জাতিক পপ স্টাররা পারফর্ম করছেন।

ব্যবসায়িক কড়াকড়ি শিথিল: আযান ও নামাজের সময়ে বাধ্যতামূলকভাবে দোকানপাট ও রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখার আইন শিথিল করা হয়েছে।

পরধর্ম সহিষ্ণুতা ও অমুসলিম ধর্মীয় ক্ষেত্র: ভিশন ২০৩০-এর অধীনে আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রসারে অমুসলিম বিদেশি পর্যটকদের স্বাগত জানানো হচ্ছে। বিভিন্ন অমুসলিম ধর্মীয় প্রতিনিধি দলকে রিয়াদে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে এবং মন্দির ও গির্জা নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা উন্মুক্ত করা হয়েছে।

ওয়াহাবিবাদ বনাম আধুনিক সৌদি আরবের সংস্কার

প্রথাগত ওয়াহাবিবাদী সৌদি রাষ্ট্র এবং বর্তমান এমবিএসের সংস্কারমুখী প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা নিচের সারণীটিতে সারসংক্ষেপ আকারে তুলে ধরা হলো:

বিষয়/ক্ষেত্র

প্রথাগত ওয়াহাবিবাদী সৌদি আরব (১৯৭৯ - ২০১৫)

বর্তমান সংস্কারমুখী সৌদি আরব (২০১৬ - বর্তমান)

ধর্মীয় মতাদর্শ

চরমপন্থী ওয়াহাবিবাদ; রাষ্ট্রীয় ও বিচারিক কাঠামোর ভিত্তি।

‘মধ্যপন্থী ইসলাম’ (Moderate Islam) ও প্যান-সৌদি জাতীয়তাবাদ।

ধর্মীয় পুলিশের অবস্থান

'মুতাওয়া' বাহিনীকে রাস্তায় নাগরিক গ্রেপ্তারের আইনি ক্ষমতা দেওয়া ছিল।

ধর্মীয় পুলিশের সমস্ত আইনি ও প্রশাসনিক ক্ষমতা সম্পূর্ণ বাতিল।

নারীদের অধিকার

ড্রাইভ করা নিষিদ্ধ, অভিভাবক ছাড়া চলাফেরা নিষিদ্ধ, বাধ্যতামূলক আবায়া।

ড্রাইভের সুযোগ, স্বাধীন চলাফেরা, আবায়ার বাধ্যবাধকতা রদ, ব্যাপক কর্মসংস্থান।

বিনোদন ও সংস্কৃতি

গান-বাজনা, সিনেমা, কনসার্ট, থিয়েটার ও পশ্চিমা বিনোদন সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ।

সিনেমা হল, আন্তর্জাতিক কনসার্ট, MDLBEAST মিউজিক ফেস্টিভ্যাল ও গ্লোবাল স্পোর্টস।

আইন ও বিচার ব্যবস্থা

কঠোর শরীয়া আইনের আক্ষরিক প্রয়োগ, উলামাদের একক আধিপত্য।

দেওয়ানি ও বাণিজ্যিক আইনের আধুনিকায়ন, লিখিত আইনি কোড প্রণয়ন।

অর্থনৈতিক দর্শন

তেল বিক্রির ওপর শতভাগ নির্ভরশীল এবং রাষ্ট্রীয় পেট্রোডলার কল্যাণমুখী ব্যবস্থা।

‘ভিশন ২০৩০’-এর মাধ্যমে পর্যটন, বিনোদন, প্রযুক্তি ও বিদেশী বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতি।

বৈশ্বিক ইসলামে ভূমিকা

বিশ্বজুড়ে ওয়াহাবিবাদী মসজিদ ও মাদ্রাসা অর্থায়নে মূল স্পন্সর।

আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বন্ধ, চরমপন্থা প্রতিরোধ ও বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক হাব হওয়ার লক্ষ্য।

এমবিএসের বক্তব্য ও মতাদর্শগত অবস্থান বদল

সৌদি আরবের এই পরিবর্তন কেবল নীতিগত স্তরে সীমাবদ্ধ নেই, বরং শাসকগোষ্ঠীর মুখ থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়েছে।

"আমরা কেবল সেই মধ্যপন্থী ইসলামের দিকে ফিরে যাচ্ছি যা আমরা আগে ছিলাম একটি ইসলাম যা সমস্ত ধর্ম, ঐতিহ্য এবং মানুষের জন্য উন্মুক্ত। বিশ্বজুড়ে উগ্রবাদের পেছনে আমরা আমাদের জীবনের আর ৩০ বছর নষ্ট করব না। আমরা আজকেই এর বিলোপ ঘটাব।" - মোহাম্মদ বিন সালমান (ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ কনফারেন্স, ২০১৭)

ইবনে আবদুল ওয়াহাব সম্পর্কে অভূতপূর্ব বক্তব্য

২০২১ সালের এপ্রিলে সৌদি টেলিভিশনকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে প্রিন্স সালমান ওয়াহাবিবাদ সম্পর্কে যে বক্তব্য দেন, তা একসময় সৌদি আরবে চিন্তা করাও অসম্ভব ছিল। তিনি বলেন:

"সৌদি আরবে কোনো নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি বা নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় পন্ডিতের (ইবনে আবদুল ওয়াহাব) একক শাসন থাকতে পারে না... যদি শেখ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব আজ আমাদের মাঝে বেঁচে উঠতেন, এবং দেখতেন যে আমরা তাঁর লেখাকে অন্ধভাবে মেনে চলছি এবং আমাদের মনকে ইজতিহাদ (স্বাধীন চিন্তা)-এর জন্য বন্ধ করে রেখেছি, তবে তিনিই প্রথম এর তীব্র বিরোধিতা করতেন।"

তিনি স্পষ্ট করে জানান যে, সৌদি আরবের মূলভিত্তি ‘ওয়াহাবিবাদ’ নয়, বরং তা হলো ‘ইসলাম ও আরব্য ঐতিহ্য’।

ওয়াহাবিবাদ থেকে ‘সৌদি জাতীয়তাবাদে’ স্থানান্তর

এমবিএসের অন্যতম বড় চাল চাল বৈশ্বিক ইসলামিক নেতৃত্ব থেকে রাষ্ট্রকে সরিয়ে ‘সৌদি প্যান-ন্যাশনালিজম’ বা 'সৌদি জাতীয়তাবাদ' প্রতিষ্ঠা করা। আগে সৌদি আরবের প্রধান পরিচয় ছিল 'ইসলামের প্রাণকেন্দ্র' ও 'ওয়াহাবিবাদের ধারক'।

এখন প্রচার করা হচ্ছে 'সৌদি আরবের ৯০০ বছরের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য' এবং ৩৯৩ বছর পুরোনো ‘দিরায়াহ প্রতিষ্ঠা দিবস’ (Founding Day)। অর্থাৎ, ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে 'জাতীয়তাবাদী পরিচিতি'কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

সৌদি আরব কেন ওয়াহাবিবাদ থেকে দূরে সরছে? (মূল অনুঘটকসমূহ)

এই বিপুল পরিবর্তন কোনো হঠাৎ নেওয়া খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত নয়। এর পেছনে কাজ করছে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক, জনমিতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অনুঘটক।

অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা ও 'পোস্ট-অয়েল' যুগ

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব এখন জীবাশ্ম জ্বালানি বা তেল থেকে ধীরে ধীরে সরে গিয়ে সবুজ শক্তির দিকে ঝুঁকছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা ও মূল্য আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসবে। তেলের ওপর ভিত্তি করে চলতে থাকা সৌদি অর্থনীতি যদি এখনই নিজেকে পরিবর্তন না করে, তবে দেশটি অদূর ভবিষ্যতে চরম দেউলিয়া হয়ে পড়বে। বিদেশি বিনিয়োগ (FDI), আন্তর্জাতিক পর্যটন এবং গ্লোবাল বিজনেস হাব বানাতে হলে কঠোর ওয়াহাবিবাদী সমাজ ব্যবস্থা বজায় রাখা অসম্ভব।

জনমিতিক চাপ (Demographic Dividend)

সৌদি আরবের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশেরই বয়স ৩০ বছরের নিচে। এই বিশাল তরুণ প্রজন্ম ইন্টারনেটের যুগে বড় হয়েছে। তারা ওয়াহাবি ধর্মীয় পুলিশ বা কঠোর সামাজিক নিষেধাজ্ঞা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়; তারা চায় আধুনিক জীবনযাত্রা, চাকরি, বিনোদন এবং স্বাধীনতা। রাজপরিবারের বিরুদ্ধে যাতে এই তরুণেরা ক্ষুব্ধ হয়ে না ওঠে বা কোনো গণ-অভ্যুত্থান (যেমন: আরব বসন্ত) না ঘটে, তার জন্য তরুণদের মানসিক চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এমবিএসের প্রধান রাজনৈতিক কৌশল।

বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিং ও বিনিয়োগ আকর্ষণ

বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বা বিনিয়োগকারীরা এমন দেশে অর্থ ঢালতে চায় না যেখানে নারীদের কোনো অধিকার নেই, বা যেখানে সামান্য কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রিয়াদকে দুবাই কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র বানাতে হলে একটি উন্মুক্ত, বহুত্ববাদী এবং উদার পরিবেশ তৈরি করা আবশ্যিক।

ধর্মীয় তত্ত্ব ও আইনের নতুন ব্যাখ্যা (Fiqh & Hadith Reform)

ওয়াহাবিবাদ থেকে সরে আসার সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক আঘাতটি এসেছে ইসলামি আইন ও হাদিস শাস্ত্রের রাষ্ট্রীয় ব্যবহারের ওপর।

আহাদ (Ahad) হাদিসের প্রয়োগ সীমিতকরণ: ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন যে, ফৌজদারি বা রাষ্ট্রীয় শাস্তির ক্ষেত্রে কেবল যেসব হাদিস 'মুতাওয়াতির' (যা বিপুল সংখ্যক সনদে প্রমাণিত) সেগুলোকে আইনি ভিত্তি ধরা হবে। কেবল 'আহাদ' (একক সূত্রে বর্ণিত) হাদিসের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রে কঠোর শারীরিক শাস্তি বা কড়াকড়ি আরোপ করা বন্ধ করা হয়েছে।

হাম্বলি মাযহাবের একচ্ছত্র আধিপত্য বাতিল: আগে সৌদি আদালতের বিচারকরা শেখ ইবনে আবদুল ওয়াহাব ও প্রাচীন হাম্বলি ফিকাহর আক্ষরিক ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নিজ নিজ বিচারিক রায় দিতেন। বর্তমানে সৌদি আরব পুরো বিচারব্যবস্থাকে সংহিতাবদ্ধ (Codified Laws) করেছে, যার ফলে যেকোনো বিচারক নিজের মতো কট্টর ওয়াহাবি ফতোয়া দিয়ে রায় দিতে পারেন না।

মদিনায় হাদিস কমপ্লেক্স স্থাপন: বাদশাহ সালমানের নির্দেশে মদিনায় "কিং সালমান কমপ্লেক্স ফর দ্য প্রফেটস হাদিস" গঠন করা হয়। এর মূল কাজ হলো যেসব হাদিস উগ্রবাদ, সহিংসতা বা চরমপন্থা ছড়াতে ব্যবহার করা হতো, সেগুলোর নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষা করা এবং ভুল ব্যাখ্যা রোধ করা।

'মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ' (MWL) ও আন্তর্জাতিক দাওয়াহ নীতিতে পরিবর্তন

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে সৌদি আরব ‘মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ’ (রবেতা আল-আলম আল-ইসলামি) এবং ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাসেম্বলি অব মুসলিম ইউথ’ (WAMY)-এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ডলার পাঠিয়েছিল ওয়াহাবি কিতাব, মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণে।

বর্তমান পরিবর্তন: বর্তমানে মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের প্রধান শেখ ডা. মোহাম্মদ আল-ইসা (Mohammed al-Issa)-র নেতৃত্বে সংস্থাটি ওয়াহাবিবাদ প্রচারের পরিবর্তে 'আন্তঃধর্মীয় সংহতি' (Interfaith Harmony) এবং 'মধ্যপন্থী ইসলাম' প্রচারের বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

তিনি পোপের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অউশভিচ (Auschwitz) কনসেনট্রেশন ক্যাম্প পরিদর্শন করে হোলোকস্টের শিকার ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন এবং অন্যান্য ধর্মের প্রধানদের সাথে সম্প্রীতি সভা করছেন।

দক্ষিণ এশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বে অর্থায়ন বন্ধ: পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, বলকান অঞ্চল এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কট্টর সালাফি/ওয়াহাবি সংস্থায় রিয়াদ থেকে সরাসরি অর্থ পাঠানো বন্ধ বা কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।

শিক্ষা ব্যবস্থা ও পাঠ্যপুস্তকের ব্যাপক সংস্কার (Curriculum Overhaul)

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা IMPACT-se-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সৌদি আরবের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক থেকে ওয়াহাবি চরমপন্থার সমস্ত উপাদান ছেঁটে ফেলা হয়েছে:

অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ দূরীকরণ: পাঠ্যবই থেকে ইহুদি, খ্রিস্টান বা অমুসলিমদের ‘কাফের’ হিসেবে কট্টরভাবে চিহ্নিত করার অংশগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

জিহাদ ও শাহাদাতের সংজ্ঞা পরিবর্তন: সশস্ত্র যুদ্ধের চেয়ে 'স্বদেশের সেবা' ও 'জ্ঞানার্জনকে' প্রকৃত দায়িত্ব হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সুফিবাদ ও শিয়াবাদের প্রতি কড়াকড়ি শিথিল: শিয়া ও সুফিদের প্রার্থনার স্থানকে সরাসরি 'শিরক' বা 'বিদআত' হিসেবে গালাগাল করার কট্টর পাঠ্যক্রম বাদ দেওয়া হয়েছে।

রাজকীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও বিরোধী আলেমদের ওপর দমন-পীড়ন

এই সামাজিক উদারীকরণের মানে কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়। রাষ্ট্রীয় নীতির বাইরে গিয়ে যেসব আলেম ওয়াহাবি কট্টরপন্থা ধরে রাখতে চেয়েছেন কিংবা যারা রাজনৈতিক ইসলামের (যেমন: মুসলিম ব্রাদারহুড) সমর্থক, তাদের কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে।

শীর্ষ আলেমদের গ্রেফতার: শেখ সালমান আল-ওদাহ (Salman al-Ouda), আওয়াদ আল-কারনি (Awাদ al-Qarni)-এর মতো জনপ্রিয় কট্টর বা রাজপরিবার-বিরোধী ধর্মীয় বক্তাদের কারাগারে বন্দি করা হয়েছে।

‘উলামা পরিষদ’ (Council of Senior Scholars)-কে বাধ্যগতকরণ: সিনিয়র উলামা কাউন্সিলকে পুনর্গঠন করে সেখানে কেবল রিয়াদের সংস্কার নীতিকে সমর্থনকারী আলেমদের রাখা হয়েছে। এখন রাজপরিবার যে সামাজিক নীতিই গ্রহণ করে, উলামা পরিষদ দ্রুত সেটিকে 'ইসলামসম্মত' বলে ফতোয়া জারি করে।

অর্থনৈতিক মেগা-প্রজেক্ট ও পৃথক আইনি অঞ্চল (NEOM & Special Zones)

ওয়াহাবি সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত এক অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা হচ্ছে মেগা-প্রজেক্টগুলোর মাধ্যমে:

বিশেষ আইনি এলাকা (Autonomous Legal Zone): ৫০০ বিলিয়ন ডলারের ৫০০ কিমি দৈর্ঘ্যের মেগা-সিটি NEOM, Red Sea Project বা Qiddiya অঞ্চলগুলোতে সাধারণ সৌদি শরীয়া আইন প্রযোজ্য হবে না। সেখানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পৃথক দেওয়ানি ও বাণিজ্যিক আইন থাকবে।

প্যান-ইসলামিজম থেকে 'সৌদি ফার্স্ট' জাতীয়তাবাদে রূপান্তর

আগে সৌদি আরবের পরিচয় ছিল "বিশ্বের সমস্ত মুসলিমের অভিভাবক"। বর্তমানে তারা স্থানান্তরিত হচ্ছে "সৌদি ফার্স্ট" (Saudi First) জাতীয়তাবাদে।

দিরায়াহ ফাউন্ডেশন ডে (Founding Day): আগে সৌদি আরবের জাতীয় দিবস ছিল কেবল একটি। এখন ১৭৪৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি 'দিরায়াহ প্রতিষ্ঠা দিবস' হিসেবে মহাসমারোহে পালন করা হয়। এতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠাতা ইবনে আবদুল ওয়াহাবের চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইবনে সৌদ এবং প্রাচীন পারস্য/আরব ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

আব্রাহাম একর্ডস ও ইসরায়েল সমীকরণ: প্যান-ইসলামিক আবেগ সরিয়ে রেখে রিয়াদ এখন নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত স্বার্থে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নিচ্ছে।

ওয়াহাবিবাদের অবসান নাকি নিয়ন্ত্রণ?

সৌদি আরব ওয়াহাবিবাদ থেকে সরে আসছে এই বাস্তবতা এখন স্পষ্ট। তবে এই রূপান্তরের পথটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়।

সুপ্ত ক্ষোভ ও কট্টরপন্থীদের প্রতিক্রিয়া

অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে যে সমাজ ওয়াহাবিবাদ চর্চা করে অভ্যস্ত, সেই সমাজের একাংশের মন থেকে গোঁড়ামি রাতারাতি মুছে ফেলা সম্ভব নয়। অনেক প্রবীণ নাগরিক ও আড়ালে থাকা উলামারা এই দ্রুত পশ্চিমাকরণকে 'ইসলামিক মূল্যবোধের ধ্বংস' হিসেবে দেখছেন। প্রকাশ্যে বিরোধিতার উপায় না থাকলেও, এটি একটি সুপ্ত সামাজিক ক্ষোভ তৈরি করছে।

সামাজিক উদারীকরণ বনাম রাজনৈতিক একচ্ছত্রবাদ

এমবিএস সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে নজিরবিহীন স্বাধীনতা দিলেও, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো স্বাধীনতা দেননি। যারা তাঁর নীতির সমালোচনা করছেন তাঁরা উদারপন্থী লেখক হোন কিংবা ধর্মীয় স্কলার সবাইকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ, সৌদি আরবে সামাজিক গণতন্ত্র এলেও রাজনৈতিক কোনো গণতন্ত্র আসেনি; এটি একধরণের ‘কর্তৃত্ববাদী আধুনিকায়ন’ (Authoritarian Modernization)

পোস্ট-ওয়াহাবি সৌদি আরবের উদয়

‘সৌদি আরব কি ওয়াহাবিবাদ থেকে সরে আসছে?’ এই প্রশ্নের সহজ ও একক উত্তর হলো: হ্যাঁ, সৌদি আরব রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ ও সামাজিক অনুসঙ্গ হিসেবে ওয়াহাবিবাদ থেকে প্রায় পুরোপুরি সরে এসেছে।

আজকের সৌদি আরব আর কোনো কট্টর ধর্মীয় থিওক্রেটিক রাষ্ট্র নয়; বরং এটি একটি জাতীয়তাবাদী, অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি চালিত আধুনিক রাষ্ট্রে রূপ নিচ্ছে। শেখ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের সাথে সাউদ পরিবারের যে ঐতিহাসিক চুক্তি আড়াই শতক ধরে বজায় ছিল, মোহাম্মদ বিন সালমান সেই চুক্তির পাঠ চুকিয়ে দিয়েছেন। ধর্মকে আর রাষ্ট্র পরিচালন নীতি হিসেবে নয়, বরং ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয়ের পর্যায়ে নামিয়ে আনা হচ্ছে।

তবে ওয়াহাবিবাদের প্রভাব থেকে বের হয়ে আসা কেবল শুরু। সৌদি আরবের এই রূপান্তর দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে কিনা, তা নির্ভর করবে এমবিএসের ‘ভিশন ২০৩০’ কতটা অর্থনৈতিকভাবে সফল হয় এবং রাজপরিবার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে কিনা তার ওপর। তবে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় অষ্টাদশ শতাব্দীর ওয়াহাবিবাদী সৌদি আরব অতীতে পরিণত হয়েছে এবং বিশ্বমঞ্চে উদয় ঘটেছে এক নতুন, উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও আধুনিক সৌদি আরবের।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.