শেখ আসরার রশিদ ও ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির সেই ঐতিহাসিক বিষ পানের ঘটনা
বর্তমান বিশ্বে যুক্তি, বিজ্ঞান এবং দর্শনের লড়াইয়ে ধর্ম প্রায়শই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের মধ্যে বিতর্কের ইতিহাস দীর্ঘ। কিন্তু ২০২০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির হলরুমে যা ঘটেছিল, তা ছিল যুক্তি আর তর্কের ঊর্ধ্বে এক অবিশ্বাস্য আধ্যাত্মিক মুহূর্ত। একজন মানুষ কেবল তার বিশ্বাসের ওপর ভরসা করে বিষ পান করলেন এবং সুস্থ অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইলেন এই দৃশ্য একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে কল্পনা করাও কঠিন। এই ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন ব্রিটিশ-পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট আলেম শেখ আসরার রশিদ। আজ আমরা এই আর্টিকেলে আলোচনা করব সেই রোমহর্ষক ঘটনার প্রেক্ষাপট, এর ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং বর্তমান সময়ে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে।
শেখ আসরার রশিদ - একজন নির্ভীক দায়ীর পরিচয়
ঘটনার গভীরে যাওয়ার আগে আমাদের চিনে নেওয়া প্রয়োজন শেখ আসরার রশিদকে। তিনি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সুন্নি আলেম এবং তুখোড় তার্কিক। ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে বসবাসরত এই পণ্ডিত দীর্ঘকাল ধরে ইউরোপে ইসলামি দাওয়াহর কাজে নিয়োজিত। তিনি হানাফি মাযহাব এবং মাতুরিদি আকিদার একজন একনিষ্ঠ অনুসারী।
শেখ আসরার কেবল একজন প্রথাগত আলেম নন; তিনি দর্শন, ইতিহাস এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে (Comparative Religion) অত্যন্ত দক্ষ। তার বাগ্মিতা এবং তাৎক্ষণিক যুক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা তাকে পশ্চিমা বিশ্বের তরুণ মুসলিম প্রজন্মের কাছে একজন আইকনে পরিণত করেছে। তিনি 'হাশমি পাবলিকেশন্স'-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে কাজ করে যাচ্ছেন।
ইসলাম বনাম খ্রিস্টানিটি বিতর্ক
২০২০ সালের শুরুর দিকে ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির ইসলামিক সোসাইটি এবং খ্রিস্টান কমিউনিটির উদ্যোগে একটি পাবলিক ডিবেটের আয়োজন করা হয়। ডিবেটের শিরোনাম ছিল "Islam vs. Christianity: The Choice" (ইসলাম বনাম খ্রিস্টধর্ম: আপনার পছন্দ)।
এই বিতর্কে খ্রিস্টান প্যানেলের পক্ষ থেকে ছিলেন ক্যালেব কর্নেলৌপ (Caleb Corneloup) এবং আলোচিত প্রচারক হাতুন তাশ (Hatun Tash)। অন্যদিকে ইসলামের পক্ষ সমর্থনে একা লড়ছিলেন শেখ আসরার রশিদ। হলরুমটি ছাত্র-শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের ভিড়ে কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। বিতর্কের মূল উদ্দেশ্য ছিল পবিত্র কুরআন এবং বাইবেলের সত্যতা যাচাই করা।
বাইবেলের চ্যালেঞ্জ - মার্ক ১৬:১৭-১৮ অধ্যায়
বিতর্কের এক পর্যায়ে শেখ আসরার রশিদ বাইবেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াতের দিকে খ্রিস্টান প্যানেলিস্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি নিউ টেস্টামেন্টের 'গসপেল অব মার্ক' (Mark 16:17-18) উদ্ধৃত করে বলেন, সেখানে যিশু খ্রিস্ট (ঈসা আ.)-এর অনুসারীদের জন্য কিছু অলৌকিক চিহ্নের কথা বলা হয়েছে।
আয়াতটি হলো:
"And these signs will accompany those who believe: In my name they will drive out demons... when they drink deadly poison, it will not hurt them at all..."
অর্থাৎ, যারা সত্যিকারে বিশ্বাসী, তারা যদি প্রাণঘাতী বিষও পান করে, তবে তাদের কোনো ক্ষতি হবে না। শেখ আসরার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, "যদি আপনারা দাবি করেন যে বাইবেল আল্লাহর কিতাব এবং আপনারা সত্য বিশ্বাসী, তবে আজ এই জনসম্মুখে বিষ পান করে তা প্রমাণ করুন।"
খ্রিস্টান প্যানেলের পিছুটান এবং পাল্টা চ্যালেঞ্জ
শেখ আসরারের এই অকাট্য চ্যালেঞ্জের মুখে খ্রিস্টান প্যানেলিস্টরা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। তারা যুক্তি দিতে শুরু করেন যে, এই আয়াতটি আধুনিক সময়ের জন্য নয়, বরং এটি ছিল শুধুমাত্র প্রথম যুগের প্রেরিতদের (Apostles) জন্য। কেউ কেউ আবার দাবি করেন, প্রাচীনতম পাণ্ডুলিপিতে (Manuscripts) এই অংশটি ছিলই না, এটি পরবর্তীতে যুক্ত করা হয়েছে।
এই যুক্তির মাধ্যমে তারা কার্যত বাইবেলের বর্তমান সংস্করণের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে ফেলেন। তবে তারা সেখানেই দমে যাননি। তারা শেখ আসরারকে পাল্টা আক্রমণ করতে গিয়ে ইসলামের হাদিস শাস্ত্র থেকে একটি রেফারেন্স টেনে আনেন।
আজওয়া খেজুর ও বিষ - নবীজির (সা.) সেই ভবিষ্যদ্বাণী
খ্রিস্টান বক্তারা শেখ আসরারকে লক্ষ্য করে বলেন, "তোমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.) তো বলেছেন যে, সাতটি আজওয়া খেজুর খেলে বিষের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তোমাদের যদি নিজেদের নবীর ওপর এতই বিশ্বাস থাকে, তবে তুমি নিজে কেন বিষ পান করে দেখাচ্ছ না?"
তারা মূলত সহীহ বুখারী (৫৪৪৫) এবং সহীহ মুসলিম (২০৪৭) এর সেই বিখ্যাত হাদিসটি উল্লেখ করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি প্রতিদিন সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে, সেদিন তাকে কোনো বিষ বা জাদু ক্ষতি করতে পারবে না।"
খ্রিস্টান প্যানেলের উদ্দেশ্য ছিল শেখ আসরারকে জনসম্মুখে বিব্রত করা। তারা ভেবেছিলেন, শেখ আসরার এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবেন না এবং এতে ইসলামের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলতে পারবেন।
শেখ আসরারের বিষ পান
পুরো হলরুম তখন নিস্তব্ধ। উত্তেজনায় টানটান পরিবেশ। সবাই ভাবছিলেন শেখ আসরার এখন কী করবেন? কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে শেখ আসরার রশিদ শান্তভাবে তার সামনে থাকা একটি বিষের বোতল হাতে তুলে নেন।
তিনি উপস্থিত দর্শকদের এবং প্যানেলিস্টদের মনে করিয়ে দেন যে, তিনি আজ সকালে সুন্নাহ অনুযায়ী সাতটি আজওয়া খেজুর খেয়েছেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন, "আমি আমার নবীর (সা.) বাণীর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখি।" এরপর তিনি বিসমিল্লাহ বলে সেই বিষ পান করেন।

মুহূর্তের মধ্যে পুরো হলরুমে মুসলিম ছাত্রদের কণ্ঠে 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। এটি ছিল এক অভাবনীয় দৃশ্য। একজন আলেম প্রকাশ্যে তার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজ ধর্মের সত্যতা প্রমাণ করছেন এমন ঘটনা আধুনিক ইতিহাসে বিরল।
ঘটনার সত্যতা যাচাই ও বৈজ্ঞানিক দিক
অনেকেই প্রথমে ভেবেছিলেন এটি হয়তো কোনো নাটক বা বোতলে সাধারণ পানি ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ভিডিও বিশ্লেষণ এবং উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী নিশ্চিত করা হয় যে, সেটি প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিকারক রাসায়নিক বা বিষ ছিল।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বিষ পানের পর শেখ আসরারের শরীরে কোনো ধরনের অসুস্থতা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তিনি পুরো ডিবেটটি সম্পন্ন করেন এবং অত্যন্ত সাবলীলভাবে নিজের বক্তব্য পেশ করে যান। চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যা অসম্ভব ছিল, ঈমানী শক্তিতে তা সম্ভব করে দেখান তিনি।
আজওয়া খেজুরের রহস্য - ধর্ম ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন
শেখ আসরারের এই সাহসিকতা আধুনিক বিজ্ঞানকেও নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। সৌদি আরবের মদিনার 'আজওয়া' খেজুর নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, আজওয়া খেজুরে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং এমন কিছু খনিজ উপাদান রয়েছে যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। লিভারের বিষক্রিয়া নষ্ট করতে (Detoxification) আজওয়া খেজুরের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে বলে গবেষণায় প্রমাণিত।
তবে শেখ আসরারের কাছে এটি কেবল বিজ্ঞানের বিষয় ছিল না, এটি ছিল 'তাওয়াক্কুল' বা আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাস। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, যখন কোনো মুমিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহকে পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে আঁকড়ে ধরে, তখন আল্লাহ তাকে অলৌকিকভাবে রক্ষা করেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড়
এই ঘটনার ভিডিওটি ইউটিউব, ফেসবুক এবং রেডিটে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। লাখ লাখ মানুষ এটি দেখেন এবং হাজার হাজার মন্তব্য আসে। অনেক অমুসলিম এই ঘটনা দেখে ইসলামের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তারা অবাক হন এই ভেবে যে, আধুনিক যুগেও এমন অটল বিশ্বাসের মানুষ পৃথিবীতে আছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ঘটনাটিকে 'Victory of Iman' (ঈমানের জয়) হিসেবে অভিহিত করা হয়।
শেখ আসরার রশিদের বর্তমান অবস্থা
২০২০ সালের সেই ঘটনার পর ৫ বছর পার হয়ে গেছে। আজ ২০২৫ সালেও শেখ আসরার রশিদ সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। তার এই ঘটনাটি কোনো সাময়িক স্টান্ট ছিল না, বরং তার পরবর্তী ৫ বছরের নিরবচ্ছিন্ন দাওয়াহ কার্যক্রম প্রমাণ করে যে আল্লাহর রহমত তার ওপর ছিল।
বর্তমানে তিনি ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে তার কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করেছেন। তিনি বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে লেকচার দিচ্ছেন এবং আধুনিক নাস্তিক্যবাদ (Atheism) ও লিবারেলিজমের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি বছরই তার সেই বিষ পানের ঘটনার বর্ষপূর্তিতে ভক্তরা ভিডিওটি শেয়ার করেন এবং তা থেকে অনুপ্রেরণা নেন।
এই ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা
শেখ আসরার রশিদের এই ঘটনা থেকে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই: ১. সুন্নাহর প্রতি অবিচল আস্থা: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিটি কথা সত্য, তা বর্তমান বিজ্ঞান বুঝুক আর নাই বুঝুক। ২. সাহসিকতা ও দাওয়াহ: ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে ভয় বা সংকোচ নয়, বরং সাহসের সাথে সত্য তুলে ধরা উচিত। ৩. যুক্তি বনাম অলৌকিকতা: সব কিছু যুক্তি দিয়ে বিচার করা যায় না, কিছু বিষয় থাকে যা কেবল বিশ্বাসের আলোকেই উপলব্ধি করা সম্ভব।
সমালোচকদের জবাব
অবশ্যই এই ঘটনার সমালোচনাও হয়েছে। কিছু যুক্তিবাদী দাবি করেন, "এটি একটি বিপজ্জনক কাজ ছিল এবং এটি দেখে অন্যদের বিষ পান করা উচিত নয়।" শেখ আসরার নিজেও পরবর্তীতে তার চ্যানেলে ব্যাখ্যা করেছেন যে, এটি কোনো সাধারণ মানুষের জন্য অনুকরণীয় কাজ নয়। এটি ছিল একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে, বিশেষ চ্যালেঞ্জের জবাবে করা একটি কাজ। এটি করার জন্য যে পরিমাণ আধ্যাত্মিক শক্তি এবং 'তাওয়াক্কুল' প্রয়োজন, তা সবার থাকে না।
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, তিনি আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে এটি করেননি, বরং ইসলামের সত্যতা প্রমাণের এক চরম মুহূর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা করে এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
উপসংহার
শেখ আসরার রশিদের ম্যানচেস্টার ডিবেটের সেই মুহূর্তটি ইসলামের দাওয়াহ ইতিহাসে একটি সোনালী অধ্যায় হয়ে থাকবে। যেখানে পশ্চিমা বিশ্ব বস্তুবাদে বিশ্বাসী, সেখানে তিনি আধ্যাত্মিক শক্তির এক ঝলক দেখিয়ে দিয়েছেন। বিষ পান করেও সুস্থ থাকা কেবল কোনো জাদুকরী ঘটনা নয়, বরং এটি ছিল নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সত্যতার এক জীবন্ত প্রমাণ।
আমরা দোয়া করি আল্লাহ শেখ আসরার রশিদকে দীর্ঘজীবী করুন এবং তার মাধ্যমে দ্বীনের এই খেদমত অব্যাহত রাখুন। তার এই বীরত্বগাথা আগামী দিনের মুসলিম তরুণদের মনে ঈমানের নতুন শিখা প্রজ্বলিত করবে।




















