দক্ষিণ আফ্রিকা পারমাণবিক আত্মত্যাগ - যে দেশটি স্বেচ্ছায় পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করেছিল

মহাবিশ্বের কোটি কোটি ছায়াপথ আর নক্ষত্রপুঞ্জের ভিড়ে আজ অবধি কেবল এই নীল গ্রহ প্রথিবীতেই প্রাণের বিকাশ ঘটেছে। আদিম গুহাবাসী ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ যখন থেকে নিজেদের আত্মরক্ষায় আগুনের ব্যবহার এবং পাথরের হাতিয়ার তৈরি শিখল, ঠিক তখন থেকেই শুরু হয়েছিল এক দ্বিমুখী যাত্রা। একদিকে সেই হাতিয়ার দিয়ে পশুর মাংস শিকার করে ক্ষুধা নিবারণ করা, আর অন্যদিকে ক্ষমতার লড়াইয়ে নিজেরই প্রজাতির মানুষকে হত্যা করা। পাথর, ব্রোঞ্জ ও লোহার যুগ পার হয়ে আধুনিক যুগে এসে মানুষের সেই আদিম সংঘাতপ্রবণ মানসিকতা রূপ নিয়েছে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের (Weapons of Mass Destruction) প্রতিযোগিতা এবং ধ্বংসাত্মক বিজ্ঞানের ইতিহাসে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চিরন্তন নীতি হলো বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য (Balance of Power) রক্ষা করতে কেবল শক্তিশালী অর্থনীতিই যথেষ্ট নয়, একই সাথে প্রয়োজন পর্বতসম সামরিক ক্ষমতা। যুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই পৃথিবী খুব কম সময়ই সংঘাতহীন ছিল। প্রত্যক্ষ যুদ্ধ, ছায়াযুদ্ধ (Proxy War) ও স্নায়যুদ্ধের (Cold War) যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বিশ্বজুড়ে পরাশক্তি থেকে শুরু করে ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশগুলোও নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে কোটি কোটি ডলার ঢেলে চলেছে।
১৯৪৫ সালের আগস্টে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আমেরিকান ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’-এর উদ্ভাবন ‘লিটল বয়’ এবং ‘ফ্যাট ম্যান’-এর ধ্বংসলীলা দেখার পর বিশ্ব রাজনৈতিক মঞ্চের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এরপর শুরু হয় দেশগুলোর মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের অন্ধ প্রতিযোগিতা।
তবে এই বিশ্ব ইতিহাসের ধারা উল্টে দিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত এক নজির স্থাপন করেছিল আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম শক্তিশালী দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা। নিজেদের প্রযুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে ৬টি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক বোমার সশ্রদ্ধ সমাবেশ ঘটিয়ে এবং ৭ম বোমাটির কাজ প্রায় অর্ধেকের বেশি শেষ করেও বিশ্বমঞ্চের কোনো সামরিক চাপ ছাড়াই স্বেচ্ছায়, নিজ হাতে সেই সব পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করে দিয়েছিল দেশটি। বর্তমান বিশ্বের ক্ষমতা আর সামরিক দরকষাকষির প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ আফ্রিকার এই পারমাণবিক আত্মত্যাগ বিশ্ব ভূ-রাজনীতির ইতিহাসে এক অতুলনীয় ও পরম বিস্ময়কর অধ্যায়।
স্নায়যুদ্ধকালীন বিশ্বব্যবস্থা ও দক্ষিণ আফ্রিকার ভূ-রাজনৈতিক অবরুদ্ধতা
দক্ষিণ আফ্রিকার পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পটভূমি বুঝতে হলে তৎকালীন বৈশ্বিক রাজনীতি এবং তাদের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার জটিল সমীকরণ বোঝা আবশ্যক।
বর্ণবাদী শাসন ও বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতা
১৯৪৮ সাল থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষমতায় ছিল চরম বর্ণবাদী ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল ‘ন্যাশনাল পার্টি’ (National Party)। এই দলটি দেশে সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গদের স্বার্থ রক্ষা করত এবং কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল বিশ্বজুড়ে ঘৃণিত ‘বর্ণবাদ’ বা ‘অ্যাপার্থাইড’ (Apartheid) নীতি। এই অমানবিক বর্ণবৈষম্যের কারণে জাতিসংঘ ও সমগ্র বিশ্বমঞ্চ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রমশ কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
স্নায়যুদ্ধের মেরুকরণ ও কমিউনিস্ট আতঙ্ক
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বিশ্ব রাজনীতি দুটি শক্তিশালী ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়ে—যার একদিকে ছিল পুঁজিবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন। আফ্রিকার মহাদেশে যখন একের পর এক দেশ স্বাধীনতা পাচ্ছিল, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফ্রিকাজুড়ে কমিউনিজম ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য স্থানীয় স্বাধীনতাকামী আন্দোলনগুলোকে অর্থ, ভারী অস্ত্র ও সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে।
অ্যাঙ্গোলা সংকট ও ‘অপারেশন কার্লোটা’
দক্ষিণ আফ্রিকার ঠিক প্রতিবেশী দেশ অ্যাঙ্গোলায় যখন গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের সরাসরি সমর্থনে এবং ফিদেল কাস্ত্রোর নির্দেশে হাজার হাজার প্রশিক্ষিত কিউবান সৈন্য সেখানে মোতায়েন করা হয়, যা ইতিহাসে ‘অপারেশন কার্লোটা’ (Operation Carlota) নামে পরিচিত। অ্যাঙ্গোলায় কিউবা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের এই বিশাল সামরিক উপস্থিতি দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সরকারকে আতঙ্কিত করে তোলে।
যদিও ন্যাশনাল পার্টি ছিল চরম কমিউনিস্টবিরোধী, তাও বর্ণবাদের কারণে আমেরিকা বা পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলো প্রকাশ্য সামরিক সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারছিল না। দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন শাসকেরা অনুধাবন করেছিলেন যে যদি কোনোদিন সোভিয়েত মদদপুষ্ট বাহিনী সরাসরি দক্ষিণ আফ্রিকা আক্রমণ করে, তবে আমেরিকা হয়তো মৌখিক সমর্থন দেবে, কিন্তু সেনা পাঠিয়ে রক্ষা করবে না।
এই চরম অস্তিত্বের সংকট থেকে বাঁচতে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের ‘সোফট পাওয়ার’ ও ‘হার্ড পাওয়ার’-এর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেদের পারমাণবিক বোমা তৈরির এক অতীব গোপন প্রজেক্ট হাতে নেয়।
গোপন পারমাণবিক প্রকল্পের উৎপত্তি ও প্রযুক্তির বিকাশ
দক্ষিণ আফ্রিকার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির এই মহাযজ্ঞ কিন্তু রাতারাতি শুরু হয়নি। এটি ছিল প্রায় তিন দশকের ধারাবাহিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা, গোপন চুক্তি এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ফল।
'অ্যাটমস ফর পিস' ও গবেষণার সূচনা
দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইউরেনিয়াম আকরিক সমৃদ্ধ দেশ। ১৯৪৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘পারমাণবিক শক্তি কর্পোরেশন’ (Atomic Energy Corporation - AEC) খনি ও ইউরেনিয়াম বাণিজ্যের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়।
মার্কিন সহায়তা (১৯৫৭): আমেরিকার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আইজেনহাওয়ারের ‘অ্যাটমস ফর পিস’ (Atoms for Peace) কর্মসূচির অধীনে ১৯৫৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ৫০ বছর মেয়াদী চুক্তি সই করে দক্ষিণ আফ্রিকা।
সাফারি চুল্লি নির্মাণ (১৯৬৫): ১৯৬৫ সালে আমেরিকান সহায়তায় পিলান্দাবায় নির্মিত হয় গবেষণাগার চুল্লি ‘সাফারি-১’ (SAFARI-1)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই চুল্লির জন্য ৯০% উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (HEU) সরবরাহ করেছিল।
জার্মান ও পাকিস্তানি প্রযুক্তিগত সূত্র
দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের পারমাণবিক গবেষণাকে দ্রুত এগিয়ে নিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিজ্ঞানীদের ইউরেনিয়াম অ্যারোডাইনামিক সেপারেশন প্রসেস (Aerodynamic separation process) শেখার জন্য জার্মানির বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য গবেষণা কেন্দ্রে পাঠায়। সেখানে অবস্থানকালে তৎকালীন উদীয়মান পাকিস্তানি কয়েকজন পারমাণবিক বিজ্ঞানীর সাথেও তাঁদের যোগাযোগ হয় এবং প্রযুক্তির আদান-প্রদান ঘটে।
'ওয়াই-প্ল্যান্ট' ও পারমাণবিক অস্ত্রের সবুজ সংকেত
১৯৭০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধানমন্ত্রী বি. জে. ভরস্টার পার্লামেন্টে অত্যন্ত গোপনে এক জাতীয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পের অনুমোদন দেন।
গোপনীয়তা: এটি এতটাই গোপন ছিল যে ক্যাবিনেটের অধিকাংশ মন্ত্রীও এর সত্যতা জানতেন না।
ছদ্মবেশ: খনিজ শিল্পে ও খনি খননে শান্তিপূর্ণ বিস্ফোরণ ঘটানোর ছদ্মবেশে ১৯৭১ সালে খনিজ ও জ্বালানি মন্ত্রী এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক খনি খাতে পারমাণবিক যন্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেন।
অস্ত্র উৎপাদন: পিলান্দাবার গোপন ‘ওয়াই-প্ল্যান্ট’ (Y-Plant)-এ তারা ইউরেনিয়ামকে অস্ত্র বানানোর উপযুক্ত অর্থাৎ ৯৩% পর্যন্ত সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকা হিরোশিমায় ফেলা বোমার মতো সাধারণ ‘গান-টাইপ’ (Gun-type fission weapon) ইউরেনিয়াম বোমা তৈরির পথ বেছে নেয়। ১৯৭৯ সালের মধ্যেই তারা তাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলে। এরপর একে একে তারা মোট ৬টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে এবং ৭ম বোমার কাজ অর্ধেকের বেশি সম্পন্ন করে ফেলে।
গোপন মিত্রতা: ইসরায়েল, ফ্রান্স ও রহস্যময় 'ভেলা ঘটনা' (Vela Incident)
দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কূটনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ একটি দেশের পক্ষে সম্পূর্ণ একাকী এত দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্রের রূপায়ণ করা অসম্ভব ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, নেপথ্যে বেশ কিছু দেশের গোপন প্রশ্রয় ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ছিল।
ফ্রান্সের সাথে সম্পর্ক
১৯৭০-এর দশকে ফ্রান্স দক্ষিণ আফ্রিকাকে দুটি বাণিজ্যভিত্তিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কয়বার্গ (Koeberg) নির্মাণে সহায়তা করে। যদিও ফ্রান্স দাবি করেছিল এটি নিছক বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য, কিন্তু এর আড়ালে বৈজ্ঞানিক আদান-প্রদান ত্বরান্বিত হয়েছিল।
ইসরায়েল-দক্ষিণ আফ্রিকা গোপন পারমাণবিক অক্ষ
১৯৭৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পি. ডব্লিউ. বোথা এবং ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী শিমন পেরেসের মধ্যে গোপন সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ইসরায়েলকে ইউরেনিয়াম আকরিক (Yellowcake) সরবরাহ করত দক্ষিণ আফ্রিকা, আর বিনিময়ে ইসরায়েল তাদের ট্রাইটিয়াম, মিসাইল প্রযুক্তি ও সামরিক অভিজ্ঞতা শেয়ার করত বলে সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯: রহস্যময় ‘ভেলা ঘটনা’ (Vela Incident)
১৯৭৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর রাতে মার্কিন গোয়েন্দা উপগ্রহ 'ভেলা ৬৯১১' ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ অংশে, প্রিন্স এওয়ার্ড দ্বীপের কাছে এক অদ্ভুত আলোর ঝলকানি (Double flash) রেকর্ড করে। সামরিক বিশ্লেষক ও বিজ্ঞানীদের সিংহভাগের মতে, এটি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইসরায়েলের যৌথভাবে পরিচালিত একটি গোপন পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা। যদিও কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে এটি স্বীকার করেনি, তবে ইতিহাসবিদদের মতে এটিই ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার পারমাণবিক ক্ষমতার প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
দক্ষিণ আফ্রিকার ভূ-রাজনৈতিক মোড় ও পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের সিদ্ধান্ত
যে উদ্দেশ্যে এত কষ্ট আর অর্থ ব্যয় করে দক্ষিণ আফ্রিকা পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হয়েছিল, ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে এসে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এক নাটকীয় মোড় নেয়। যেসব হুমকিকে সামনে রেখে এই পারমাণবিক বোমার জন্ম হয়েছিল, তা একে একে নিজে থেকেই দূর হতে শুরু করে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও সাম্যবাদের বিনাশ
১৯৮৯ সালের মধ্যে বিশ্ব মানচিত্রে পরিবর্তন আসে। বার্লিন প্রাচীর ধসে পড়ে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক পতন ঘটার ফলে তারা আফ্রিকাজুড়ে তাদের সমাজতান্ত্রিক বিস্তার বন্ধ করতে বাধ্য হয়। আফ্রিকার মহাদেশে কমিউনিজমের যে ভয় শ্বেতাঙ্গ সরকারকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল, তা চিরতরে বিলীন হয়ে যায়।
অ্যাঙ্গোলা চুক্তি ও আঞ্চলিক শান্তি
১৯৮৮ সালে ট্রিপার্টাইট চুক্তির (Tripartite Accord) মাধ্যমে অ্যাঙ্গোলা থেকে কিউবান সৈন্যদের ফেরত পাঠানো শুরু হয়। একই সাথে দক্ষিণ আফ্রিকার অধীনস্থ ভূখণ্ড নামিবিয়া একটি স্বাধীন ও শান্ত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তর সীমান্তে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা শূন্যে নেমে আসে।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবরোধ
পারমাণবিক কর্মসূচি এবং বর্ণবাদী আচরণের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর চরম অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ জারি করে। দেশটির অর্থনীতি ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস না করলে এই আন্তর্জাতিক অবরোধ থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় ছিল না।
ক্ষমতা হস্তান্তর ও কৃষ্ণাঙ্গ সরকারের ভীতি
১৯৮৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক (F. W. de Klerk)। তিনি দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে বর্ণবাদের দিন শেষ, খুব শীঘ্রই দক্ষিণ আফ্রিকায় গণতান্ত্রিক নির্বাচন হবে এবং ক্ষমতা আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (ANC) তথা নেলসন ম্যান্ডেলা-র মতো কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের হাতে চলে যাবে।
শ্বেতাঙ্গ সরকারের আশঙ্কা ছিল এই সর্বনাশা পারমাণবিক মারণাস্ত্র যেন কোনো চরমপন্থী রাজনৈতিক দলের হাতে বা নতুন সরকারের অনভিজ্ঞ সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে না পড়ে।
এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্কের ঐতিহাসিক মন্তব্য:
"আমি অনুভব করেছি যে ছোটখাটো সীমান্ত যুদ্ধে বা আঞ্চলিক রাজনীতিতে এই ধরনের ভয়ঙ্কর পারমাণবিক বোমা ব্যবহার সম্পূর্ণ অর্থহীন। এটি আমাদের সুরক্ষার বদলে গলার ফাঁস হয়ে উঠেছিল। আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পেতে এই মারণাস্ত্র ধ্বংস করাই ছিল আমাদের একমাত্র পথ।"
পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংসের গোপন প্রক্রিয়া ও এনপিটি (NPT) চুক্তি
১৯৮৯ সালের নভেম্বর মাসে রাষ্ট্রপতি ক্লার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি চিরতরে বন্ধের নির্দেশে স্বাক্ষর করেন।
সম্পূর্ণ ধ্বংস প্রক্রিয়া (১৯৮৯-১৯৯১)
মাইন ধ্বংস: পিলান্দাবার গোপন অস্ত্রাগার থেকে ৬টি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক বোমার ইউরেনিয়াম মূল এবং মেকানিক্যাল অংশগুলো আলাদা করা হয়।
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিষ্ক্রিয়করণ: পারমাণবিক অস্ত্রের উপযোগী ৯৩% উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে গলিয়ে বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উপযুক্ত নিম্ন-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামে (LEU) রূপান্তর করা হয়।
নথিপত্র ও নকশা ভস্মীভূতকরণ: পারমাণবিক বোমা তৈরির সমস্ত নকশা, বৈজ্ঞানিক নথি, কম্পিউটার ডাটাবেজ এবং যন্ত্রাংশ সম্পূর্ণ পুড়িয়ে ও ধ্বংস করে ফেলা হয়।
১০ জুলাই ১৯৯১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি’ (NPT)-তে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করে। এরপর আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর পরিদর্শকেরা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিটি গবেষণাগার ও খনি পরিদর্শন করে নিশ্চিত করেন যে দেশটি তাদের সমস্ত পারমাণবিক মারণাস্ত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলেছে।
২৪ মার্চ ১৯৯৩ সালে রাষ্ট্রপতি ক্লার্ক দক্ষিণ আফ্রিকার পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বিশ্ববাসীকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান যে "দক্ষিণ আফ্রিকা ৬টি পারমাণবিক বোমা বানিয়েছিল, এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে তার প্রতিটি নিজ হাতে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।"
দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম ইউক্রেন, বেলারুশ ও কাজাখস্তান: কৌশলী পার্থক্য
অনেকে প্রশ্ন তুলে থাকেন দক্ষিণ আফ্রিকাই কি বিশ্বের একমাত্র দেশ যারা পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করেছে? ইউক্রেন, বেলারুশ কিংবা কাজাখস্তানও তো ১৯৯০-এর দশকে পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করেছিল।
তবে সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন বা বেলারুশের সাথে দক্ষিণ আফ্রিকার পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের একটি মৌলিক ও ঐতিহাসিক পার্থক্য রয়েছে।
অস্ত্রের মালিকানা ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ
ইউক্রেন/বেলারুশ/কাজাখস্তান: ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর এই দেশগুলো তাদের ভূখণ্ডে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার হঠাৎ করে পেয়েছিল। কিন্তু এই অস্ত্রগুলোর 'লঞ্চ কোড' (Launch Codes) ও মূল কমান্ড কন্ট্রোল ছিল রাশিয়ার মস্কোয়। ইউক্রেন চাইলেই সেই বোমাগুলো একা চালাতে পারত না।
দক্ষিণ আফ্রিকা: দক্ষিণ আফ্রিকা সম্পূর্ণ নিজেদের দেশে, নিজেদের বিজ্ঞানীদের বুদ্ধিতে, নিজেদের ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে বোমার নকশা, নির্মাণ ও পরীক্ষা সম্পন্ন করেছিল। অস্ত্রের ১০০% নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রেটোরিয়ার হাতে।
ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা বনাম স্বেচ্ছায় সিদ্ধান্ত
ইউক্রেন/বেলারুশ/কাজাখস্তান: ১৯৯৪ সালের ‘বুদাপেস্ট স্মারক’ (Budapest Memorandum) চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা, যুক্তরাজ্য ও রাশিয়ার প্রবল কূটনৈতিক চাপে এবং অর্থনৈতিক সহায়তার বিনিময়ে বাধ্য হয়ে অস্ত্রগুলো রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করে।
দক্ষিণ আফ্রিকা: দক্ষিণ আফ্রিকাকে পারমাণবিক বোমা ধ্বংস করার জন্য বাইরের কোনো পরাশক্তি সামরিক হুমকি দেয়নি। তারা সম্পূর্ণ নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ বিবেচনা করে স্বেচ্ছায় পারমাণবিক বোমা নিষ্ক্রিয় করেছিল।
পারমাণবিক আত্মত্যাগের সার্বিক চিত্র ও মূল তথ্যাবলী
দক্ষিণ আফ্রিকার পারমাণবিক কর্মসূচির সূচনা থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক তথ্য নিচে সারণীর মাধ্যমে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
মূল বিষয়াবলি | বিস্তারিত বিবরণ ও ঐতিহাসিক তথ্য |
পারমাণবিক কর্মসূচির স্থান | পিলান্দাবা (Pelindaba) গবেষণাগার ও ওয়াই-প্ল্যান্ট (Y-Plant), দক্ষিণ আফ্রিকা। |
প্রযুক্তির ধরন | ৯৩% উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (HEU) ভিত্তিক 'গান-টাইপ' বোমারু প্রযুক্তি। |
নির্মিত বোমার সংখ্যা | ৬টি সম্পূর্ণ তৈরি বোমা (হিরোশিমা টাইপ) এবং ১মটির কাজ অর্ধ-সম্পূর্ণ। |
পারমাণবিক সক্ষমতার সময়কাল | ১৯৭৯ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত (প্রায় ১২ বছর)। |
রহস্যময় পারমাণবিক পরীক্ষা | ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯ (ভারত মহাসাগরে 'ভেলা ঘটনা')। |
পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংসের নির্দেশক | রাষ্ট্রপতি এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক (F. W. de Klerk)। |
অস্ত্র ধ্বংস ও নিষ্ক্রিয়করণ কাল | ১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ সাল। |
এনপিটি (NPT) চুক্তিতে স্বাক্ষর | ১০ জুলাই ১৯৯১। |
পার্লামেন্টে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা | ২৪ মার্চ ১৯৯৩। |
দক্ষিণ আফ্রিকার ‘তিন-ধাপের’ অনন্য পারমাণবিক রণকৌশল (Three-Stage Strategy)
দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের পারমাণবিক বোমাগুলো শত্রুর ওপর সরাসরি ফেলে ধ্বংসলীলা চালানোর উদ্দেশ্যে তৈরি করেনি। তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল এটি ব্যবহার করে পশ্চিমা বিশ্বকে (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য) সামরিক হস্তক্ষেপে বাধ্য করা। এই কৌশলটি ইতিহাসে ‘থ্রি-স্টেজ ডিটারেন্ট স্ট্র্যাটেজি’ (Three-Stage Deterrent Strategy) নামে পরিচিত।
এই কৌশলের মূল লক্ষ্য
দক্ষিণ আফ্রিকান সামরিক পরিকল্পনাকারীরা জানতেন যে তারা একা বিশাল সোভিয়েত জোটের সাথে প্রথাগত (Conventional) যুদ্ধে অনির্দিষ্টকাল টিকে থাকতে পারবে না। তাই তারা সিদ্ধান্ত নেন যদি কখনো অ্যাঙ্গোলা থেকে কিউবান ও সোভিয়েত বাহিনী তাদের সীমান্ত অতিক্রম করে মূল ভূখণ্ডে সরাসরি আক্রমণ চালায়:
১. প্রথমে তারা গোপনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যকে নিজেদের পারমাণবিক ক্ষমতার কথা জানিয়ে সাহায্য চাইবে।
২. তাতেও যদি কাজ না হয়, তবে কালাহারি মরুভূমির ভূগর্ভে একটি প্রকাশ্যে পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়ে পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দেবে যে দক্ষিণ আফ্রিকা এক পারমাণবিক শক্তিধর দেশ।
৩. এর ফলে পারমাণবিক মহাযুদ্ধের আতঙ্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়ে সেখানে মধ্যস্থতা করবে এবং সোভিয়েত আক্রমণ প্রতিহত করবে।
কালাহারি মরুভূমির ‘ভাস্ট্রাপ’ (Vastrap) টেস্ট সাইট ও ১৯৭৭ সালের স্যাটেলাইট ড্রামা
পারমাণবিক বোমার কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকান সামরিক বাহিনী ১৯৭৪ সালে কালাহারি মরুভূমির ভাস্ট্রাপ (Vastrap) সামরিক ঘাঁটিতে একটি গোপন ভূগর্ভস্থ পরীক্ষার স্থান নির্মাণ শুরু করে।
২৪০ মিটারের গোপন কূপ: উপিংটনের কাছে অবস্থিত এই মরুভূমিতে দু’টি বিশাল ২৪০ মিটার (প্রায় ৮০০ ফুট) গভীর কূপ বা শ্যাফ্ট (Test Shafts) খনন করা হয়। পরিকল্পনা ছিল পিলান্দাবায় তৈরি প্রথম পারমাণবিক যন্ত্রটি এই কূপের নিচে নামিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এর শক্তি পরীক্ষা করা হবে।
১৯৭৭-এর ভূ-রাজনৈতিক চাপ: ১৯৭৭ সালের আগস্ট মাসে সোভিয়েত গোয়েন্দা উপগ্রহ কালাহারি মরুভূমির ওপর খননকাজ ও পারমাণবিক পরীক্ষার প্রস্তুতি শনাক্ত করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন অবিলম্বে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারকে এই বিষয়ে অবহিত করে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও পশ্চিম জার্মানি একযোগে দক্ষিণ আফ্রিকাকে মারাত্মক অর্থনৈতিক ও সামরিক পরিণতি ভোগের হুঁশিয়ারি দেয়। ফলে দক্ষিণ আফ্রিকা শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিত করে এবং ওই শ্যাফ্ট দুটিতে ভারী কংক্রিটের ঢাকনা দিয়ে সিল করে দেয়।
পারমাণবিক বোমার প্রযুক্তিগত ও কারিগরি বিবরণ
দক্ষিণ আফ্রিকায় নির্মিত বোমাগুলো ডিজাইনের দিক থেকে অত্যন্ত কার্যকর এবং হিরোশিমায় ব্যবহৃত আমেরিকান ‘লিটল বয়’ (Little Boy)-এর আধুনিক রূপান্তরের মতো ছিল।
বোমার প্রযুক্তি ও বৈশিষ্ট্য
গোপন সংকেত নাম: এই বোমারু ডিভাইসের কোডনাম দেওয়া হয়েছিল ‘মেলবা’ (Melba)।
বোমার ধরন: ইউরেনিয়াম ভিত্তিক ‘গান-টাইপ ফিলেমন্ট ডিভাইস’ (Gun-type fission weapon)। দুটি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের টুকরোকে কামানের গোলার মতো উচ্চ গতিতে এক করে বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হতো।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ: বোমাগুলোতে প্রায় ৮০% থেকে ৯৩% পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম-২৩৫ (U-235) ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রতিটি বোমায় প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম লাগত।
বিস্ফোরণ ক্ষমতা (Yield): প্রতিটি বোমার ক্ষমতা ছিল ১০ থেকে ২০ কিলোটন টিএনটি (TNT)-র সমতুল্য, যা হিরোশিমায় ফেলা বোমার প্রায় সমান ধ্বংসক্ষমতাসম্পন্ন।
পারমাণবিক বোমা বহন ব্যবস্থা: বিমান ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প
কেবল পারমাণবিক বোমা তৈরি করলেই চলে না, শত্রুর ওপর তা নিক্ষেপ করার জন্য নির্ভরযোগ্য ‘ডেলিভারি সিস্টেম’ (Delivery System)-এর প্রয়োজন হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের পারমাণবিক বোমাকে দুটি উপায়ে বহনের উপযোগী করে গড়ে তুলেছিল:
বিমানভিত্তিক বহন ব্যবস্থা
দক্ষিণ আফ্রিকান বিমানবাহিনীর (SAAF) হকার সিডলি বাকানিয়ার (Hawker Siddeley Buccaneer) এবং ক্যানবেরা (Canberra) বোমারু বিমানগুলোকে বিশেষভাবে সংশোধন করা হয়েছিল। বিমানের ভেতরের অস্ত্রাগারে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পারমাণবিক বোমা ফিট করার ব্যবস্থা করা হয়।
গোপন ‘RSA’ ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম
১৯৮০-এর দশকে দক্ষিণ আফ্রিকা অনুধাবন করে যে আধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Anti-Aircraft Radar) টপকে বিমানে করে বোমা ফেলা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তারা ইসরায়েলের সহায়তায় ‘RSA’ (Republic of South Africa) নামক এক গোপন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প হাতে নেয়।
RSA-1 ও RSA-2: এগুলো মূলত ইসরায়েলের ‘জেরিকো-২’ (Jericho-II) ব্যালিস্টিক মিসাইলের নকশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র।
RSA-3 ও RSA-4: এগুলো ছিল মহাকাশে উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পাশাপাশি কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম শক্তিশালী আইসিবিএম (ICBM) বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রয়াস। ওয়েস্টার্ন কেপের ওভারবার্গ টেস্ট রেঞ্জ (Overberg Test Range) থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর সফল পরীক্ষা চালানো হয়।
অস্ত্র নিষ্ক্রিয়করণ ও পরিষ্কারকরণ প্রক্রিয়া: 'পিলান্দাবার গোপন অপারেশন'
১৯৮৯ সালে এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্কের আদেশের পর অত্যন্ত সাবধানে এবং অত্যন্ত গোপনে সমস্ত পারমাণবিক সরঞ্জাম ধ্বংসের কাজ শুরু হয়। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার তদারকি করেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার পরমাণু শক্তি কর্পোরেশনের প্রধান ডক্টর ওয়াল্ডো স্টাম্পফ (Dr. Waldo Stumpf)।
অস্ত্রের জন্য তৈরি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে (HEU) কম-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামে (LEU) রূপান্তর করে বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদনের বাণিজ্যিক জ্বালানি বানিয়ে ফেলা হয়। পরে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শকেরা দীর্ঘ তদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করেন যে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে আর ১ গ্রামও পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর উপাদান অবশিষ্ট নেই।
দক্ষিণ আফ্রিকার পারমাণবিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলী
দক্ষিণ আফ্রিকার গোপন পারমাণবিক কর্মসূচির এই বিশেষ প্রযুক্তিগত ও সামরিক দিকগুলো সংক্ষেপে একটি তালিকার মাধ্যমে নিচে তুলে ধরা হলো:
মূল বিষয়াবলি | বিস্তারিত সামরিক ও প্রযুক্তিগত তথ্য |
কৌশলগত নীতি | ‘থ্রি-স্টেজ ডিটারেন্ট স্ট্র্যাটেজি’ (পশ্চিমা শক্তিকে যুদ্ধ বিরতিতে বাধ্য করার কৌশল)। |
গোপন ভূগর্ভস্থ টেস্ট সাইট | কালাহারি মরুভূমির ‘ভাস্ট্রাপ’ (Vastrap) টেস্ট শ্যাফ্ট (উপিংটন)। |
বোমার টাইপ ও কোডনেম | 'মেলবা' (Melba) - ইউরেনিয়াম ভিত্তিক গান-টাইপ বিস্ফোরণ যন্ত্র। |
ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রজেক্ট | 'RSA' প্রোগ্রাম (RSA-1, RSA-2, RSA-3 এবং RSA-4 মিসাইল)। |
অস্ত্রবাহী প্রধান বিমান | হকার সিডলি বাকানিয়ার (Buccaneer) ও ক্যানবেরা বোমারু বিমান। |
অস্ত্র নিষ্ক্রিয়করণের প্রধান কারিগর | ডক্টর ওয়াল্ডো স্টাম্পফ (Waldo Stumpf) ও AEC টিম। |
ঐতিহাসিক চুক্তি অবদান | ১৯৯৬ সালের ‘পেলিন্দাবা চুক্তি’ (সমগ্র আফ্রিকাকে পরমাণু মুক্ত ঘোষণা)। |
আন্তর্জাতিক পরমাণু অপ্রসারণ আন্দোলনে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্তমান নেতৃত্ব
নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করার পর দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বের কাছে এক অনন্য নজির স্থাপন করে। তারা বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে নিজেদের তৈরি অস্ত্র ধ্বংস করে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার আন্দোলনে প্রধান নেতৃত্বদায়ী ভূমিকা পালন শুরু করে।
পেলিন্দাবা চুক্তি (১৯৯৬): দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্যোগেই ১৯৯৬ সালে পুরো আফ্রিকা মহাদেশকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক ‘পেলিন্দাবা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়।
TPNW চুক্তি (২০১৭): জাতিসংঘের ‘পারমাণবিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা চুক্তি’ (Treaty on the Prohibition of Nuclear Weapons - TPNW) প্রণয়নে দক্ষিণ আফ্রিকা অন্যতম প্রধান অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
নেলসন ম্যান্ডেলার ভূমিকা ও বিশ্বমঞ্চে দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন সূর্যোদয়
দক্ষিণ আফ্রিকার এই পারমাণবিক অস্ত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস করার সিদ্ধান্তকে পরবর্তীতে পূর্ণ সমর্থন জানান বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলা।
১৯৯৪ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা ক্ষমতায় আসার পর দক্ষিণ আফ্রিকাকে বৈশ্বিক পারমাণবিক অসংহতকরণের (Nuclear Disarmament) প্রধান মুখপাত্র হিসেবে উপস্থাপন করেন।
পেলিন্দাবা চুক্তি (১৯৯৬): ১৯৯৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ঐতিহাসিক পিলান্দাবায় সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলো একত্রিত হয়ে ‘পেলিন্দাবা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পারমাণবিক অস্ত্র মুক্ত অঞ্চল’ (Nuclear-Weapon-Free Zone) হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এই অভাবনীয় ত্যাগের বদৌলতে দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর থেকে আন্তর্জাতিক সমস্ত অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। নেলসন ম্যান্ডেলা এবং এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক যৌথভাবে ১৯৯৩ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বমঞ্চে এক নতুন ধারার নৈতিক শক্তির (Moral Authority) প্রতিকৃতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়।
বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ আফ্রিকার শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা
আজকের এই ২১ শতকে দাঁড়িয়ে যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে পারমাণবিক হামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, উত্তর কোরিয়া প্রতিনিয়ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মহড়া চালাচ্ছে, এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া জুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার নতুন আগুন জ্বলছে তখন দক্ষিণ আফ্রিকার ৩৩ বছর আগের সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এক বিরল আলোকবর্তিকা হিসেবে মানবজাতির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বমঞ্চে একটি চিরন্তন সত্য প্রমাণ করে দিয়ে গেছে "পারমাণবিক মারণাস্ত্র কখনোই কোনো দেশের প্রকৃত নিরাপত্তা বা স্থায়ী শান্তির গ্যারান্টি হতে পারে না।" প্রকৃত নিরাপত্তা আসে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে।
নিজের হাতে গড়া পারমাণবিক বোমার ভাণ্ডার নিজ হাতেই গুঁড়িয়ে দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে চিরদিনের জন্য এক অনন্য ও মহিমান্বিত অধ্যায় হয়ে থাকবে। তাদের এই বীরত্বপূর্ণ পারমাণবিক আত্মত্যাগ আজও সমগ্র বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানুষ চাইলে সংহারের পথ ছেড়ে শান্তির পথ বেছে নিতে পারে।



















