বিংশ শতাব্দীর দুর্ধর্ষ কয়েকজন গ্যাংস্টার ডন ও তাদের আন্ডারওয়ার্ল্ড

বিংশ শতাব্দীর দুর্ধর্ষ কয়েকজন গ্যাংস্টার ডন ও তাদের আন্ডারওয়ার্ল্ড

মানব সভ্যতার ইতিহাসে অপরাধ ও অপরাধীদের উপস্থিতি সর্বদা লক্ষণীয় হলেও, বিংশ শতাব্দীতে সংঘবদ্ধ অপরাধ (Organized Crime) একটি সম্পূর্ণ নতুন ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। এই শতাব্দীতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এমন কিছু ব্যক্তিত্বের উত্থান ঘটে, যারা কেবল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাথাব্যথার কারণই ছিল না, বরং সমান্তরাল অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থাকে নিজেদের আঙুলের ইশারায় নাচিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রহিবিশন’ বা মদ নিষিদ্ধকরণের যুগ থেকে শুরু করে ল্যাটিন আমেরিকার কোকেন সাম্রাজ্য, কিংবা এশিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ সিন্ডিকেট এসব গ্যাংস্টাররা নিজস্ব এক মায়াজাল বা মিথ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।

চলচ্চিত্র, সাহিত্য ও গণমাধ্যমের কল্যাণে অনেক সময় এই দুর্ধর্ষ অপরাধীদের কর্মকাণ্ডকে রোমান্টিসাইজ করা হয়, তাদের উপস্থাপন করা হয় এক ধরণের 'আধুনিক রবিনহুড' হিসেবে। কিন্তু সেই গ্ল্যামারের খোলস ছাড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায় চরম নৃশংসতা, অর্থলালসা এবং হাজার হাজার নিরীহ মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একেকটি অপরাধ সাম্রাজ্য। বিংশ শতাব্দীর সেরকমই কয়েকজন আলোচিত, কুখ্যাত ও প্রভাবশালী গ্যাংস্টার ডনের জীবন, উত্থান, বিশ্ব কাঁপানো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং তাদের চূড়ান্ত পরিণতির এক বিশদ ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস নিচে তুলে ধরা হলো।

১. পাবলো এসকোবার: কোকেনের অপ্রতিহত রাজা

বিংশ শতাব্দীর অপরাধ জগতের ইতিহাসে সবচেয়ে ধনী ও হিংস্র গ্যাংস্টার হিসেবে যার নাম প্রথম সারিতে আসে, তিনি হলেন কলম্বিয়ার কোকেন সম্রাট পাবলো এমিলিও এসকোবার গাভিরিয়া। ১৯৪৯ সালে কলম্বিয়ার রিওনেগ্রোতে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করা এসকোবার ছোটবেলা থেকেই কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। শুরুটা সমাধিফলক চুরি করে বিক্রি করা এবং গাড়ি চুরির মাধ্যমে হলেও সত্তরের দশকে তিনি বুঝতে পারেন ভবিষ্যতের আসল অর্থনৈতিক ক্ষমতা লুকিয়ে আছে সাদা গুঁড়ো অর্থাৎ ‘কোকেন’-এর ভেতরে।

মেডেলিন কার্টেলের প্রতিষ্ঠা ও বিপুল সম্পত্তি: এসকোবার গড়ে তোলেন কুখ্যাত ‘মেডেলিন কার্টেল’ (Medellín Cartel)। সত্তরের দশকের শেষভাগে ও আশির দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাচার হওয়া মোট কোকেনের প্রায় ৮০ শতাংশই সরবরাহ করত এসকোবারের সিন্ডিকেট। প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৫ টন কোকেন পাচার করা হতো। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ফোর্বস সাময়িকীর তথ্য অনুযায়ী, এসকোবার ছিলেন বিশ্বের সপ্তম শীর্ষ ধনী ব্যক্তি, যার আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

টাকা রাখার জায়গা না পেয়ে তিনি গুদামে নোটের বান্ডিল রেখে দিতেন, যেখানে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ইঁদুরে কেটে ফেলত বা পানিতে নষ্ট হতো। নিজের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন 'হ্যাসিয়েন্দা নাপোলেস' এস্টেটে তিনি ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা, বিমানবন্দর ও বিলাসবহুল রেসওয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন।

'প্লাটা ও প্লমো' রাজনীতি ও নারকো-সন্ত্রাসবাদ: এসকোবারের মূল নীতি ছিল “Plata o Plomo” (রুপো অথবা সীসা), অর্থাৎ হয় ঘুষ গ্রহণ করো, না হয় মাথায় গুলির সীসা গ্রহণ করো। বিচারক, সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ অফিসার বা রাজনীতিবিদ যিনিই তাঁর মাদক সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, তাকেই মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।

তিনি প্রায় ১,০০০ এর বেশি পুলিশ কর্মকর্তা, বহু সাংবাদিক এবং রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী লুইস কার্লোস গালানসহ হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেন। ১৯৮৯ সালে একজন রাজনৈতিক প্রার্থীকে হত্যার উদ্দেশ্যে তিনি 'আভিয়ানকা ফ্লাইট ২০৩' নামক একটি যাত্রীবাহী বিমান বোমা মেরে উড়িয়ে দেন, যাতে ১০৭ জন নিরীহ যাত্রী মারা যান। একই বছর তিনি কলম্বিয়ার সুপ্রিম কোর্টে হামলা চালানোর জন্য বামপন্থী গেরিলা গোষ্ঠী 'M-19' কে অর্থায়ন করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যেখানে মূল উদ্দেশ্য ছিল বিচারকদের হত্যা করে সমস্ত পাচার সংক্রান্ত নথিপত্র পুড়িয়ে দেওয়া।

পতন ও মৃত্যু: এসকোবারের ক্রমবর্ধমান নারকো-সন্ত্রাসবাদে অতিষ্ঠ হয়ে কলম্বিয়া সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল ফোর্সের সহায়তায় 'সার্চ ব্লক' (Search Bloc) গঠন করে। দীর্ঘদিনের অভিযানের পর ১৯৯৩ সালের ২ ডিসেম্বর, নিজের ৪৪তম জন্মদিনের পরদিন, মেডেলিনের একটি সাধারণ আবাসিক এলাকায় রেডিও ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে তাঁর অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। ছাদ দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় কলম্বিয়ান ন্যাশনাল পুলিশের গুলিতে নিহত হন এই সর্বকালের অন্যতম ধনী ও হিংস্র গ্যাংস্টার।

২. গ্রিসেল্ডা ব্লাংকো: মিয়ামির 'কোকেন গডমাদার'

পুরুষশাসিত আন্ডারওয়ার্ল্ডে যে অল্প কয়েকজন নারী নিজেদের চরম নৃশংসতা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে রাজত্ব করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন গ্রিসেল্ডা ব্লাংকো। ‘কুইন অব নারকো-ট্র্যাফিকিং’, ‘লা মাদ্রিনা’ (দ্য গডমাদার) এবং ‘ব্ল্যাক উইডো’ নামে পরিচিত এই নারী ছিলেন মেডেলিন কার্টেলের মিয়ামি অপারেশনের মূল কারিগর। ১৯৪৩ সালে কলম্বিয়ার কার্টাগেনায় চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জন্মগ্রহণ করা ব্লাংকোর অপরাধ জীবন শুরু হয় মাত্র ১১ বছর বয়সে, যখন তিনি এক ধনী পরিবারের শিশুকে অপহরণ করে মুক্তিপণ না পেয়ে গুলি করে হত্যা করেছিলেন বলে জানা যায়।

মিয়ামির ড্রাগ ওয়ার ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তি: ১৯৭০ এবং ১৯৮০-র দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি শহর যখন রক্তক্ষয়ী ‘কোকেন ড্রাগ ওয়ার’-এ উত্তপ্ত, তখন তার নেপথ্য পরিচালক ছিলেন ব্লাংকো। কলম্বিয়া থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচারের জন্য তিনি অন্তর্বাস তৈরি করেছিলেন, যার ভেতরে গোপন পকেট থাকত। পরবর্তীতে হাজার হাজার কেজি কোকেন বিমানে ও জাহাজে পাচারের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন তিনি।

মিয়ামি আন্ডারওয়ার্ল্ডে বহুল ব্যবহৃত এবং কুখ্যাত "ড্রাইভ-বাই মোটরবাইক শ্যুটিং" (মোটরসাইকেলে এসে চলন্ত অবস্থায় গুলি করে পালিয়ে যাওয়া)-এর উদ্ভাবক ছিলেন এই গ্রিসেল্ডা ব্লাংকো। নিজের উদ্দেশ্য সাধনে তিনি এতটাই নির্মম ছিলেন যে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের নারী ও শিশুদের হত্যা করতেও দ্বিধা করতেন না। তাঁর নির্দেশে প্রায় ২০০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল।

পারিবারিক ট্র্যাজেডি ও মৃত্যু: ব্লাংকোকে 'ব্ল্যাক উইডো' বলা হতো কারণ তাঁর তিনজন স্বামীই রহস্যজনকভাবে বা তাঁর সরাসরি নির্দেশে নিহত হয়েছিলেন। ১৯৮৫ সালে মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DEA) তাকে গ্রেপ্তার করে। তিনি প্রায় দুই দশক মার্কিন কারাগারে বন্দি থাকেন।

জেল থেকেই গোপন সহযোগীদের মাধ্যমে তিনি নিজের সিন্ডিকেট পরিচালনার চেষ্টা চালান। ২০০৪ সালে সাজা শেষে তাঁকে কলম্বিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি অপরাধ জগত থেকে গুটিয়ে গেলেও তাঁর তৈরি করা শত্রুর অভাব ছিল না। ২০১২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর, ৬৯ বছর বয়সে মেডেলিন শহরের একটি মাংসের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় নিজের উদ্ভাবিত সেই "ড্রাইভ-বাই মোটরবাইক শ্যুটিং" কায়দাতেই এক আততায়ীর গুলিতে নিহত হন এই 'কোকেন গডমাদার'।

৩. আল কাপোনে: শিকাগোর 'স্কারফেস'

আমেরিকান গ্যাংস্টার সংস্কৃতির কথা উঠলেই যে মুখটি সর্বপ্রথমে ভেসে ওঠে, তিনি হলেন আলফোন্সে গ্যাব্রিয়েল আল কাপোনে বা 'আল কাপোনে'। ১৮৯৯ সালে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে এক ইতালীয় অভিবাসী পরিবারে জন্মগ্রহণকারী কাপোনে খুব অল্প বয়সেই স্কুলে পড়াশোনা ছেড়ে গ্যাং কালচারের সাথে জড়িয়ে পড়েন। ব্রুকলিনের একটি নাইটক্লাবে বাউন্সার হিসেবে কাজ করার সময় এক মারামারিতে তাঁর বাম গালে চাকুর আঘাত লাগে, যার ফলে পরবর্তীতে তাঁর নাম হয় 'স্কারফেস' (Scarface)।

প্রহিবিশন যুগ ও 'শিকাগো আউটফিট': ১৯২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার মদ উৎপাদন, বিক্রি ও পরিবহন নিষিদ্ধ করে আইন জারি করে, যা ঐতিহাসিক 'প্রহিবিশন এরিয়া' নামে পরিচিত। সাধারণ মানুষের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও গ্যাংস্টারদের জন্য এটি একটি স্বর্ণযুগে পরিণত হয়। আল কাপোনে শিকাগোতে আসেন তাঁর গুরু জনি টোরিওর আমন্ত্রণে এবং পরবর্তীতে গড়ে তোলেন কুখ্যাত মাফিয়া দল 'শিকাগো আউটফিট' (Chicago Outfit)

অবৈধ মদের কারখানা, ক্যাসিনো, র্যাকেটিয়ারিং ও পতিতাবৃত্তির ব্যবসা থেকে কাপোনে প্রতি বছর প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার আয় করতে শুরু করেন। শহরের মেয়র, পুলিশ প্রধান এবং রাজনৈতিক নেতাদের ঘুষ দিয়ে তিনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিজের পকেটে পুরে ফেলেছিলেন।

সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে মেসাকার ও পতন: আল কাপোনের রাজত্বের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়টি ঘটে ১৯২৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। শিকাগোর একটি গ্যারেজে কাপোনের লোকেরা পুলিশের পোশাক পরে প্রতিপক্ষ 'বাগস মোর্ান' গ্যাংয়ের সাতজন সদস্যকে দেয়ালে দাঁড় করিয়ে মেশিনগান দিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। এই ঘটনাটি ইতিহাসে "St. Valentine's Day Massacre" নামে খ্যাত। এই নির্মম ঘটনার পর মার্কিন সংবাদপত্র ও প্রশাসন কাপোনেকে 'জনসাধারণের এক নম্বর শত্রু' (Public Enemy No. 1) হিসেবে চিহ্নিত করে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বহু চেষ্টা করেও কাপোনেকে কোনো হত্যা বা চোরাচালানের মামলায় ফাঁসাতে পারেনি। কিন্তু ১৯৩১ সালে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা (যার নেতৃত্বে ছিলেন এলিয়ট নেস) কাপোনের বিরুদ্ধে ট্যাক্স ফাঁকির নিখুঁত প্রমাণ জোগাড় করে। কর ফাঁকির অপরাধে আদালত তাঁকে ১১ বছরের কারাদণ্ড দেয়।

তাঁকে ক্যালিফোর্নিয়ার সুপরিচিত সিফিলিস রোগে আক্রান্ত হয়ে মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন। অবশেষে ১৯৩৯ সালে মুক্তি পেয়ে তিনি ফ্লোরিডায় নিজের বাড়িতে চলে যান এবং ১৯৪৭ সালে ৪৮ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

৪. চার্লস 'লাকি' লুসিয়ানো: আধুনিক সংঘবদ্ধ অপরাধের স্থপতি

আমেরিকান মাফিয়ার ইতিহাসে যদি কাউকে আধুনিক করপোরেট রূপ দেওয়ার কৃতিত্ব দিতে হয়, তবে তিনি হলেন চার্লস 'লাকি' লুসিয়ানো (মূল নাম: সালভাতোর লুসানিয়া)। ১৮৯৭ সালে ইতালির সিসিলিতে জন্মগ্রহণকারী লুসিয়ানো শৈশবেই পরিবারের সাথে নিউ ইয়র্কে চলে আসেন। প্রথাগত সিসিলিয়ান মাফিয়াদের পুরনো ও গোঁড়া চিন্তাভাবনাকে দূরে সরিয়ে লুসিয়ানো মাফিয়া আন্ডারওয়ার্ল্ডকে একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো পরিচালনা করার রূপরেখা তৈরি করেছিলেন।

'দি কমিশন' গঠন ও পাঁচ মাফিয়া পরিবার: ১৯৩০-এর দশকের শুরুতে নিউ ইয়র্কের আন্ডারওয়ার্ল্ডে দুটি প্রধান সিসিলিয়ান গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটে, যা 'কাস্টেল্যামারিজ যুদ্ধ' (Castellammarese War) নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে দুই শীর্ষ পুরনো ডন জো ম্যাসেরিয়া এবং সালভাতোর মারানজানো নিহত হন। এই দুটি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য পরিকল্পনাকারী ছিলেন লাকি লুসিয়ানো।

পাওয়ার পাওয়ার পর লুসিয়ানো এককভাবে মাফিয়া প্রধান না হয়ে গঠন করেন 'দি কমিশন' (The Commission)। নিউ ইয়র্কের পুরো অপরাধ জগতকে পাঁচটি প্রধান পরিবারে ভাগ করা হয়:

  1. জেনোভিজ (Genovese)

  2. গ্যাম্বিনো (Gambino)

  3. লুচিস (Lucchese)

  4. বোনানো (Bonanno)

  5. কলম্বো (Colombo)

কমিশনের কাজ ছিল নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়িয়ে আলোচনা ও ভোটের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের ব্যবসার বিভাজন ও সমস্যা সমাধান করা। লুসিয়ানো স্বয়ং জেনোভিজ পরিবারের প্রধান হন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও 'অপারেশন আন্ডারওয়ার্ল্ড': ১৯৩৬ সালে বিশেষ প্রসিকিউটর থমাস ই. ডিউই লুসিয়ানোকে পতিতাবৃত্তি ও র্যাকেটিয়ারিংয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত করে ৩০ থেকে ৫০ বছরের কারাদণ্ড দেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন নৌবাহিনী এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নেয়। নিউ ইয়র্ক বন্দরে জার্মান সাবমেরিনের নাশকতা রোধে এবং ইতালি আক্রমণের সময় সিসিলিতে মিত্রবাহিনীর অবতরণ সহজ করতে মার্কিন সরকার জেলে বন্দি লুসিয়ানোর সাথে গোপন চুক্তি করে, যা 'অপারেশন আন্ডারওয়ার্ল্ড' নামে পরিচিত।

লুসিয়ানোর আদেশে ইতালীয়-আমেরিকান বন্দর শ্রমিকরা মার্কিন নৌবাহিনীকে পূর্ণ সহযোগিতা করে। যুদ্ধশেষে তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সাজা মুকুপ করে তাঁকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজ দেশ ইতালিতে নির্বাসিত করা হয়। ১৯৬২ সালে ইতালির নেপলস বিমানবন্দরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান।

৫. এনোক 'নাকি' জনসন: আটলান্টিক সিটির রাজনৈতিক বস

যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধ জগতের ইতিহাসে কিছু চরিত্র ছিলেন যারা গ্যাংস্টার হয়েও ছিলেন মূলধারার প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। নিউ জার্সির আটলান্টিক সিটির রাজনৈতিক ও অপরাধ জগতের আনকাজেস্টেড কিং ছিলেন এনোক লুইস 'নাকি' জনসন। ১৮৮৩ সালে জন্মগ্রহণ করা নাকি জনসন ১৯১১ সাল থেকে ১৯৪১ সালে গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত টানা তিন দশক আটলান্টিক সিটিকে একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

এইচবিও (HBO)-এর বিখ্যাত টেলিভিশন সিরিজ 'বোর্ডওয়াক এম্পায়ার' (Boardwalk Empire)-এর মূল চরিত্র নাকি থম্পসন মূলত নাকি জনসনের জীবনের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি।

ভাইস ইন্ডাস্ট্রি ও আটলান্টিক সিটির স্বর্ণযুগ: নাকি জনসন আটলান্টিক কাউন্টির শেরিফ হিসেবে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। রিপাবলিকান পার্টির স্থানীয় প্রধান হিসেবে তিনি সরকারি ক্ষমতা, পুলিশ ও রাজনৈতিক প্রশাসনকে ব্যবহার করে শহরটিকে একটি 'ক্যাসিনো ও আনন্দ নগরী'তে পরিণত করেন। প্রহিবিশন যুগে যখন পুরো আমেরিকায় মদ নিষিদ্ধ ছিল, তখন নাকি জনসনের আশ্রয়ে আটলান্টিক সিটিতে দেদারসে বিক্রি হয়েছে অবৈধ মদ, চলেছে ক্যাসিনো এবং পতিতাবৃত্তি।

তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল: "আমাদের কাছে মদ আছে, জুয়া আছে, নারী আছে। যদি শহরের মানুষ এগুলো চায়, তবে আমি তা সরবরাহ করব।" প্রহিবিশন যুগের প্রতিটি মদের বোতল এবং ক্যাসিনোর টেবিল থেকে নাকি জনসন নির্দিষ্ট পরিমাণ ট্যাক্স বা ঘুষ পেতেন।

১৯২৯ সালের বিখ্যাত আটলান্টিক সিটি কনফারেন্স: ১৯২৯ সালের মে মাসে নাকি জনসন আটলান্টিক সিটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম জাতীয় মাফিয়া সম্মেলনের আয়োজন করেন। এই সম্মেলনে আল কাপোনে, লাকি লুসিয়ানো, ফ্র্যাঙ্ক কস্টেলো এবং জনি টোরিওর মতো শীর্ষ গ্যাংস্টাররা অংশ নিয়েছিলেন।

এই ঐতিহাসিক বৈঠকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কীভাবে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ করে সবাই মিলে মার্কিন অবৈধ বাজার ভাগাভাগি করে নেওয়া যায়। ১৯৪১ সালে মার্কিন ফেডারেল সরকার নাকি জনসনের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ আনে এবং তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। চার বছর জেল খাটার পর তিনি মুক্তি পান এবং ১৯৬৫ সালে ৮২ বছর বয়সে এক নার্সিং হোমে তাঁর মৃত্যু হয়।

৬. ফ্র্যাংক কস্টেলো: আন্ডারওয়ার্ল্ডের 'প্রধানমন্ত্রী'

আমেরিকান মাফিয়া জগতে ফ্র্যাংক কস্টেলো (মূল নাম: ফ্রান্সেসকো কাস্তিগলিয়া) পরিচিত ছিলেন 'দ্য প্রাইম মিনিস্টার অফ দি আন্ডারওয়ার্ল্ড' নামে। ১৮৯১ সালে ইতালির ক্যালাব্রিয়ায় জন্মগ্রহণকারী কস্টেলো মার্কিন মাফিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও কৌশলী নেতাদের একজন ছিলেন। রক্তপাত ও সহিংসতার চেয়ে রাজনৈতিক সংযোগ, ঘুষ ও কূটনৈতিক আলোচনাকে তিনি অপরাধ সাম্রাজ্য চালনার মূল হাতিয়ার মনে করতেন।

রাজনৈতিক প্রভাব ও স্লট মেশিন সাম্রাজ্য: কস্টেলো খুব অল্প বয়সেই নিউ ইয়র্কের প্রভাবশালী 'ট্যামানি হল' (Tammany Hall) রাজনৈতিক ক্লাবের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বিচারক, রাজনীতিবিদ, পুলিশ কর্মকর্তা এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতাদের সাথে তাঁর এত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল যে, মাফিয়াদের যেকোনো সমস্যা তিনি এক ফোনেই সমাধান করে ফেলতে পারতেন।

লাকি লুসিয়ানো কারাবন্দি ও পরবর্তীতে নির্বাসিত হলে কস্টেলো কার্যকরভাবে 'লুসিয়ানো ক্রাইম ফ্যামিলি'-এর অ্যাক্টিং বস হন। নিউ ইয়র্ক এবং পরবর্তীতে নিউ অরলিন্সে হাজার হাজার ক্যাসিনো ও স্লট মেশিন বসিয়ে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেন।

কিফভার কমিটির শুনানি ও আততায়ীর হামলা: ১৯৫০ সালের দিকে মার্কিন সিনেটে সংঘটিত অপরাধ তদন্তের জন্য 'কিফভার কমিটি' (Kefauver Committee) গঠন করা হয়। এই কমিটির শুনানিতে কস্টেলোকে হাজির করা হয়, যা টিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত ও আত্মবিশ্বাসী উত্তর তৎকালীন মার্কিন গণমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করে।

১৯৫৭ সালে লুসিয়ানো পরিবারের মূল ক্ষমতার পাওয়ার জন্য ভিটো জেনোভিজ নামক এক হিংস্র গ্যাংস্টার কস্টেলোকে হত্যার পরিকল্পনা করে। কস্টেলোর মাথায় গুলি চালানো হলেও অলৌকিকভাবে তিনি বেঁচে যান। এই ঘটনার পর কস্টেলো স্বেচ্ছায় মাফিয়া রাজত্ব থেকে অবসর নেন এবং পরবর্তী জীবন শান্তিতে কাটিয়ে ১৯৭৩ সালে ৮২ বছর বয়সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

৭. কার্লো গ্যাম্বিনো: 'দ্য গডফাদার'-এর বাস্তব প্রেরণা

মারিও পুজোর বিখ্যাত উপন্যাস এবং ফ্রান্সিস ফোর্ড কোপোলার কালজয়ী চলচ্চিত্র 'দ্য গডফাদার' (The Godfather)-এর মূল চরিত্র ডন ভিটোর কথা মনে আছে? এই চরিত্রটি তৈরির নেপথ্যে যে মূল বাস্তব গ্যাংস্টারের জীবন বড় ভূমিকা রেখেছিল, তিনি হলেন কার্লো গ্যাম্বিনো। ১৯০২ সালে সিসিলিতে জন্ম নেওয়া গ্যাম্বিনো ১৯২১ সালে এক মালবাহী জাহাজে গোপনে আমেরিকা পৌঁছান। চুপচাপ কাজ করা, কম কথা বলা এবং পর্দার আড়াল থেকে ছক কষার জন্য তিনি ছিলেন মাফিয়া জগতের এক অতুলনীয় মাস্টারমাইন্ড।

গ্যাম্বিনো ক্রাইম ফ্যামিলি ও বন্দরের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ: ১৯৫৭ সালে গ্যাম্বিনো ক্রাইম ফ্যামিলির তদানীন্তন হিংস্র প্রধান অ্যালবার্ট অ্যানাস্টেসিয়াকে একটি বারবার শপে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের মূল নেপথ্য কারিগর ছিলেন কার্লো গ্যাম্বিনো। পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি গ্যাম্বিনো পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ধনী মাফিয়া সিন্ডিকেটে পরিণত করেন।

ম্যানহাটন ও ব্রুকলিনের বন্দরগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশই ছিল গ্যাম্বিনোর নিয়ন্ত্রণে। লেবার ইউনিয়ন, গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি, ট্রাকিং ব্যবসা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (Garbage Collection) থেকে তিনি মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ক্যাশ টাকা আয় করতেন।

লোকচক্ষুর অন্তরালে রাজত্ব: অন্যান্য গ্যাংস্টাররা যখন দামি গাড়ি, দামি স্যুট আর মিডিয়ার আলো পছন্দ করতেন, গ্যাম্বিনো তখন ব্রুকলিনের এক সাধারণ বাড়িতে অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তিনি তাঁর ক্যাডারদের জন্য কড়া নির্দেশ জারি করেছিলেন মাদক ব্যবসায় জড়ানো যাবে না, কারণ মাদকের মামলায় সাজা বেশি হয় এবং পুলিশ পিছু ছাড়েন না।

মার্কিন এফবিআই (FBI) তাঁর পেছনে শত শত গোয়েন্দা লাগিয়েও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বড় অপরাধের প্রমাণ দাঁড় করাতে পারেনি। তিনি কখনোই দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড ভোগ করেননি। ১৯৭৬ সালে ৭৪ বছর বয়সে নিজ বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়।

৮. জেমস বার্ক: লুফথানসা ডাকাতির মাস্টারমাইন্ড

আন্ডারওয়ার্ল্ডে "জিমি দ্য জেন্ট" (Jimmy the Gent) নামে পরিচিত জেমস বার্ক ছিলেন আইরিশ-আমেরিকান অপরাধ জগতের এক ভয়ংকর নাম। ১৯৩১ সালে নিউ ইয়র্কে জন্মগ্রহণকারী বার্ক ইতালীয় রক্তের না হওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে সিসিলিয়ান মাফিয়া পরিবারের ফুল মেম্বার বা 'মেড ম্যান' (Made Man) হতে পারেননি, তবে তিনি ছিলেন লুচিস ক্রাইম ফ্যামিলির (Lucchese Family) অন্যতম প্রধান সহযোগী ও সোর্স। রবার্ট ডি নিরো অভিনীত মার্টিন স্কোরসেসির বিখ্যাত সিনেমা 'গুডফেলাস' (Goodfellas)-এর 'জিমি কনওয়ে' চরিত্রটি মূলত জেমস বার্কের জীবনের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি।

১৯৭৮ সালের ঐতিহাসিক লুফথানসা ডাকাতি: জেমস বার্কের অপরাধ জীবনের সবচেয়ে কুখ্যাত ঘটনাটি ঘটে ১৯৭৮ সালের ১১ ডিসেম্বর, যা ইতিহাসে "Lufthansa Heist" নামে পরিচিত। জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লুফথানসা এয়ারলাইন্সের কার্গো টার্মিনাল থেকে বার্কের তৈরি করা টিম আনুমানিক ৫.৮ মিলিয়ন ডলার (যার বর্তমান মূল্য প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি) মূল্যের নগদ অর্থ ও রত্ন অলংকার ডাকাতি করে। এটি ছিল সে সময় মার্কিন ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ডাকাতির ঘটনা।

সহযোগীদের গণহত্যা ও পতন: ডাকাতির পর পুলিশ ও এফবিআই যখন ব্যাপকভাবে তদন্ত শুরু করে, তখন বার্ক আতঙ্কিত হয়ে পড়েন যে তাঁর টিমের কেউ হয়তো পুলিশের কাছে মুখ খুলবে। নিজের পিঠ বাঁচাতে বার্ক চরম সিদ্ধান্ত নেন। একে একে সেই ডাকাতিতে অংশ নেওয়া ও পরিকল্পনার সাথে জড়িত প্রায় এক ডজন বন্ধু ও সহযোগীকে নৃসংশভাবে হত্যা করেন তিনি।

তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হেনরি হিল পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এফবিআই-এর সাথে চুক্তি করেন এবং বার্কের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। ১৯৮২ সালে বার্ক গ্রেপ্তার হন এবং একটি পৃথক হত্যা ও বাজির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ১৯৯৬ সালে জেলখানায় ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে ৬৪ বছর বয়সে মারা যান এই আইরিশ গ্যাংস্টার।

৯. দাউদ ইব্রাহিম: এশিয়ার সবচেয়ে বড় মাফিয়া সিন্ডিকেট 'ডি-কোম্পানি'

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এশিয়ার আন্ডারওয়ার্ল্ডে যার প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল, তিনি হলেন ভারতের মুম্বাইয়ের অপরাধ জগতের ডন দাউদ ইব্রাহিম কাসকার। ১৯৫৫ সালে মহারাষ্ট্রের রত্নগিরিতে জন্মগ্রহণকারী দাউদের বাবা ছিলেন মুম্বাই পুলিশের একজন কনস্টেবল। তবে তরুণ বয়সেই দাউদ ছোটখাটো চুরি ও তোলাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে গড়ে তোলেন নিজের কুখ্যাত সিন্ডিকেট 'ডি-কোম্পানি' (D-Company)

মুম্বাই থেকে দুবাই - অপরাধের সাম্রাজ্য: আশির দশকে মুম্বাইয়ের পুরনো পাঠান গ্যাংকে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাধ্যমে পরাজিত করে দাউদ ইব্রাহিম শহরের একচ্ছত্র অধিপতি হন। পরবর্তীতে তিনি দুবাইয়ে পাড়ি জমান এবং সেখান থেকেই মুম্বাইয়ের ক্যাসিনো, রিয়েল এস্টেট, ক্রিকেট ম্যাচ ফিক্সিং, জাল নোটের কারবার, তোলাবাজি এবং বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন। মুম্বাইয়ের বহু বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও অভিনেতাকে তাঁর ক্যাডাররা চাঁদার জন্য হত্যা বা হুমকি দিয়েছিল।

১৯৯৩ সালের মুম্বাই বোমা হামলা ও সন্ত্রাসবাদী তকমা: ১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জসহ ১২টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যে ভয়াবহ ধারাবাহিক বোমা হামলা চালানো হয়, তাতে ২৫৭ জন নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারান। এই হামলার মূল চক্রান্তকারী ও অর্থদাতা হিসেবে দাউদ ইব্রাহিম ও তাঁর ডানহাত ছোট শাকিল অভিযুক্ত হন।

এই ঘটনার পর দাউদ ইব্রাহিম কেবল সাধারণ গ্যাংস্টার থাকেননি, তিনি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে নাম লেখান। ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ তাকে "গ্লোবাল টেররিস্ট" (বৈশ্বিক সন্ত্রাসী) হিসেবে ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্যানুসারে, ভারত থেকে পলাতক এই গ্যাংস্টার পাকিস্তানের করাচিতে পাকিস্তান সরকারের প্রত্যক্ষ আশ্রয়ে আত্মগোপন করে আছেন, যদিও পাকিস্তান সরকার তা বরাবরের মতোই অস্বীকার করে আসছে।

বিংশ শতাব্দীর শীর্ষ গ্যাংস্টারদের পরিচিতি ও পরিণতি

গ্যাংস্টার ডন

সক্রিয়তার অঞ্চল / সিন্ডিকেট

মূল অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড

রাজত্বের স্বর্ণযুগ

চূড়ান্ত পরিণতি

পাবলো এসকোবার

কলম্বিয়া (মেডেলিন কার্টেল)

আন্তর্জাতিক কোকেন চোরাচালান, নারকো-সন্ত্রাসবাদ, গণহত্যা

১৯৭০-১৯৯০ দশক

১৯৯৩ সালে কলম্বিয়ান ন্যাশনাল পুলিশের গুলিতে নিহত।

গ্রিসেল্ডা ব্লাংকো

কলম্বিয়া, মিয়ামি (যুক্তরাষ্ট্র)

কোকেন পাচার, বাইক-শ্যুটার এনকাউন্টার, রাজনৈতিক হত্যা

১৯৭০-১৯৮০ দশক

মার্কিন জেলে সাজার পর দেগোত্র ত্যাগ; ২০১২ সালে কলম্বিয়ায় আততায়ীর গুলিতে নিহত।

আল কাপোনে

শিকাগো, যুক্তরাষ্ট্র (শিকাগো আউটফিট)

অবৈধ মদের ব্যবসা, তোলাবাজি, গ্যাং ওয়ার, পতিতাবৃত্তি

১৯২০-১৯৩১

ট্যাক্স ফাঁকির দায়ে কারাদণ্ড; শারীরিক অসুস্থতায় ১৯৪৭ সালে বাড়িতে স্বাভাবিক মৃত্যু।

লাকি লুসিয়ানো

নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র (জেনোভিজ ফ্যামিলি)

জাতীয় অপরাধ সিন্ডিকেট প্রতিষ্ঠা, 'দি কমিশন' গঠন, পতিতাবৃত্তি

১৯২০-১৯৪০ দশক

কারাদণ্ড ও পরবর্তীতে ইতালিতে নির্বাসন; ১৯৬২ সালে হৃদরোগে মৃত্যু।

এনোক 'নাকি' জনসন

আটলান্টিক সিটি, নিউ জার্সির (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)

রাজনৈতিক দুর্নীতি, জুয়া, অবৈধ মদ সরবরাহ, ঘুষ গ্রহণ

১৯১০-১৯৪১

ট্যাক্স ফাঁকির মামলায় কারাদণ্ড; ১৯৬৫ সালে স্বাভাবিক মৃত্যু।

ফ্র্যাংক কস্টেলো

নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র (লুসিয়ানো ফ্যামিলি)

রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, স্লট মেশিন ব্যবসা, জুয়া

১৯৩০-১৯৫০ দশক

হত্যা চেষ্টা থেকে বেঁচে যান; পরবর্তীতে অবসরে যান এবং ১৯৭৩ সালে হৃদরোগে মৃত্যু।

কার্লো গ্যাম্বিনো

নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র (গ্যাম্বিনো ফ্যামিলি)

বন্দর দখল, লেবার র‍্যাকেটিয়ারিং, চাঁদাবাজি, মাদক

১৯৫০-১৯৭০ দশক

কখনোই বড় সাজা পাননি; ১৯৭৬ সালে নিজ বাসভবনে হৃদরোগে মৃত্যু।

জেমস বার্ক

নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র (লুচিস ফ্যামিলি অ্যাসোসিয়েট)

আর্মড রবারি (লুফথানসা ডাকাতি), গণহত্যা, চাঁদাবাজি

১৯৬০-১৯৮০ দশক

১৯৮২ সালে গ্রেফতার; ১৯৯৬ সালে কারাগারে ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু।

দাউদ ইব্রাহিম

ভারত, পাকিস্তান, ইউএই (ডি-কোম্পানি)

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, জাল নোট, অস্ত্র ও মাদক পাচার

১৯৮০-বর্তমান

আন্তর্জাতিকভাবে পলাতক; জাতিসংঘের চিহ্নিত বিশ্বসন্ত্রাসী হিসেবে আত্মগোপনে।

আমেরিকান মাফিয়ার অন্যান্য প্রসংখ্যাত মাস্টারমাইন্ডগণ

আমেরিকান মাফিয়ার ‘কর্পোরেট’ রূপায়ণে এবং অবৈধ সাম্রাজ্য প্রসারে আরও কয়েকজন গ্যাংস্টার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন:

মেয়ার ল্যানস্কি: 'মাফিয়ার অর্থনৈতিক স্থপতি'

ইতালীয় না হয়েও (তিনি ছিলেন পোলিশ-ইহুদি অভিবাসী) মেয়ার ল্যানস্কি (Meyer Lansky) আমেরিকান মাফিয়া আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন হয়ে উঠেছিলেন। লাকি লুসিয়ানোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদার ল্যানস্কি মাফিয়াদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন।

লাভেগাস ও হাভানা সাম্রাজ্য: ল্যানস্কি বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল মাদক বা তোলাবাজি দিয়ে স্থায়ী ব্যবসা সম্ভব নয়। তিনি কিউবার স্বৈরশাসক ফালগেনসিও বাতিস্তার সাথে চুক্তি করে হাভানায় বিশাল ক্যাসিনো সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসকে বিশ্বের জুয়া নগরীতে রূপান্তর করার নেপথ্যে তাঁর মূল অর্থায়ন কাজ করেছিল।

সুইস ব্যাংক ও মানি লন্ডারিং: আধুনিক 'মানি লন্ডারিং' বা অবৈধ অর্থ বৈধ করার কৌশলের জনক বলা হয় ল্যানস্কিকে। তিনিই প্রথম সুইজারল্যান্ডের গোপনীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে মাফিয়াদের অবৈধ অর্থ আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সিস্টেমে যুক্ত করেন। ১৯৮৩ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি এফবিআই-এর তালিকায় ছিলেন, কিন্তু কখনও বড় কোনো সাজা ভোগ করেননি।

বাগসি সিগেল: লাস ভেগাসের রূপকার

বেনজামিন 'বাগসি' সিগেল (Bugsy Siegel) ছিলেন ল্যানস্কি ও লুসিয়ানোর শৈশবের বন্ধু। তিনি ছিলেন অত্যন্ত হিংস্র এবং ফ্যাশনেবল গ্যাংস্টার।

মার্ডার, ইনকর্পোরেটেড (Murder, Inc.): নিউ ইয়র্কের অপরাধ জগতকে একটি চুক্তভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে তিনি 'মার্ডার, ইনকর্পোরেটেড' গঠনে ভূমিকা রাখেন। এই সংস্থাটি মাফিয়াদের আদেশে সুনির্দিষ্ট অর্থ বিনিময়ে প্রতিপক্ষকে হত্যা করত।

ফ্ল্যামিঙ্গো হোটেল: ১৯৪০-এর দশকে মরুভূমির মাঝে অবস্থিত লাস ভেগাসকে একটি পর্যটন ও জুয়ার কেন্দ্র বানানোর স্বপ্ন দেখেন সিগেল। তিনি সেখানে নির্মাণ করেন ঐতিহাসিক 'ফ্ল্যামিঙ্গো হোটেল অ্যান্ড ক্যাসিনো'। তবে বাজেট মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া এবং ক্যাসিনোর লভ্যাংশ আত্মসাতের সন্দেহে ১৯৪৭ সালে লাকি লুসিয়ানো ও 'দি কমিশন'-এর নির্দেশে সিগেলকে ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজ বাসভবনে গুলি করে হত্যা করা হয়।

জন গটি: 'দ্য টেফলন ডন'

গ্যাম্বিনো ক্রাইম ফ্যামিলির শেষ প্রতাপশালী প্রধান ছিলেন জন গটি (John Gotti)। কার্লো গ্যাম্বিনোর মৃত্যুর পর পরিবারের ক্ষমতা দখল নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ দেখা দিলে ১৯৮৫ সালে গটি তৎকালিন বস পল কাস্তেলানোকে প্রকাশ্য রাস্তায় হত্যা করে গ্যাম্বিনো পরিবারের দখল নেন।

পপ-কালচার ও মিডিয়া মেকানিজম: গটি আগের মাফিয়া ডনদের মতো আত্মগোপনে থাকতেন না। তিনি দামি ইতালীয় স্যুট পরতেন, মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দিতেন এবং নিজেকে জনসম্মুখে প্রদর্শনী পছন্দ করতেন। এজন্য তাঁকে বলা হতো 'দ্য ড্যাপার ডন' (The Dapper Dapper)

মামলা থেকে অব্যাহতি: এফবিআই তিনটি বড় মামলায় গটিকে বেকসুর খালাস পেতে দেখে সংবাদপত্রগুলো তাঁকে 'দ্য টেফলন ডন' নাম দেয় (কারণ কোনো অপরাধের অভিযোগ তাঁর গায়ে ‘আটকাবে’ না)। তবে ১৯৯২ সালে তাঁর আন্ডারবস সামি 'দ্য বুল' গ্রাভানো পুলিশের কাছে সরকারি সাক্ষী (Informant) হয়ে জবানবন্দি দিলে গটির সাজা নিশ্চিত হয়। ২০০২ সালে কারাগারেই গটির মৃত্যু হয়।

ইতালীয় মূল মাফিয়া (কোসা নোস্ত্রা) ও ইউরোপের অপরাধ জগত

যুক্তরাষ্ট্রের মাফিয়া ইতালীয়দের হাত ধরে শুরু হলেও ইতালির মূল সিসিলিয়ান মাফিয়া বা 'কোসা নোস্ত্রা' (Cosa Nostra) ছিল আরও বেশি ভয়ংকর ও প্রাতিষ্ঠানিক।

সালভাতোর "তোতো" রিনা: 'দ্য বিস্ট'

সিসিলির পালেরমো শহরের কোসা নোস্ত্রার প্রধান ছিলেন সালভাতোর 'তোতো' রিনা (Toto Riina)। বিংশ শতাব্দীর ৭০ ও ৮০-এর দশকে ইতালীয় সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন তিনি।

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস: রিনা ইতালির পুলিশ কর্মকর্তা, প্রসেকিউটর এবং রাজনীতিবিদদের একের পর এক হত্যা করেন। ১৯৯২ সালে ইতালির বিখ্যাত দুই মাফিয়াবিরোধী বিচারক জিওভানি ফালকোনে এবং পাওলো বোরসেলিনোকে গাড়ি বোমায় উড়িয়ে দেন রিনা।

পতন: এই হত্যার ঘটনা পুরো ইতালিজুড়ে তীব্র গণবিক্ষোভের জন্ম দেয়। ইতালীয় সেনাবাহিনী সিসিলিতে মোতায়েন করা হয় এবং ১৯৯৩ সালে ২৩ বছর পলাতক থাকার পর রিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারেই তাঁর মৃত্যু হয়।

ক্রেই টুইনস: লন্ডনের আন্ডারওয়ার্ল্ড

১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ইস্ট এন্ড নিয়ন্ত্রণ করত দুই জমজ ভাই রোনাল্ড 'রনি' ক্রেই এবং রেজিনাল্ড 'রেজি' ক্রেই। তাঁরা নাইটক্লাবের মালিক ছিলেন এবং পপ স্টার, সেলিব্রিটি ও রাজনীতিবিদদের সাথে মেশার মাধ্যমে নিজেদের এক ধরনের আভিজাত্য তৈরি করেছিলেন।

কিন্তু পর্দার অন্তরালে তাঁরা ছিল অত্যন্ত হিংস্র অপরাধী, যারা সশস্ত্র ডাকাতি, অগ্নিসংযোগ, সুরক্ষা র‍্যাকেট এবং জর্জ মিচেল ও জ্যাক 'দ্য হ্যাট' ম্যাকভিটির মতো গ্যাংস্টারদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। ১৯৬৮ সালে তাঁদের গ্রেফতার করা হয় এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এশিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেট: ইয়াকুজা ও ট্রায়াডস

পশ্চিমা মাফিয়াদের পাশাপাশি এশিয়ায় বিংশ শতাব্দীতে দুটি অত্যন্ত সুসংগঠিত ও শতাব্দীর প্রাচীন অপরাধ সিন্ডিকেট আন্তর্জাতিক রূপ নেয়।

ইয়াকুজা (জাপান): ইয়ামাগুচি-গুমি

জাপানের সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রকে বলা হয় 'ইয়াকুজা' (Yakuza)। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দল হলো 'ইয়ামাগুচি-গুমি' (Yamaguchi-gumi)

কাজুও তাওকা (Kazuo Taoka): ১৯৪৬ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তাওকার নেতৃত্বে ইয়ামাগুচি-গুমি একটি ছোট গ্যাং থেকে হাজার হাজার সদস্যের একটি বিশাল আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটে পরিণত হয়।

বৈশিষ্ট্য: পশ্চিমা গ্যাংস্টারদের থেকে পৃথকভাবে ইয়াকুজা জাপানি সমাজে আধা-আইনিভাবে কাজ করত। তাদের অফিস, বিজনেস কার্ড এবং লোগো থাকত। সদস্যরা দেহে সম্পূর্ণ 'ইরেজুমি' (ঐতিহ্যবাহী পূর্ণাঙ্গ ট্যাটু) আঁকত এবং কোনো ভুল করলে নিজেদের আঙুলের অগ্রভাগ কেটে ফেলা (ইউবিতসুমেন) হতো। তারা বিনোদন শিল্প, নির্মাণ খাত ও শেয়ার বাজারে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিল।

ট্রায়াডস (চীন ও হংকং): সান ইয়ি অন

চীনের প্রাচীন গোপন সমাজ থেকে উঠে আসা 'ট্রায়াড' (Triad) সিন্ডিকেটগুলো বিংশ শতাব্দীতে হংকং, তাইওয়ান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হেরোইন পাচার, মানব পাচার ও জুয়ার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর মধ্যে 'সান ইয়ি অন' (Sun Yee On) এবং '১৪কে' (14K) ছিল সবচেয়ে বড়। তারা কঠোর শপথ এবং মার্শাল আর্ট সংস্কৃতির মাধ্যমে পরিচালিত হতো।

আমেরিকান মাফিয়ার অভ্যন্তরীণ কাঠামো

বিংশ শতাব্দীর আমেরিকান ইতালীয় মাফিয়া (পাঁচ পরিবার) একটি নির্দিষ্ট ও সুসংগঠিত সামরিক বা করপোরেট পিরামিড কাঠামো মেনে চলত:

ডন/বস (Boss): পরিবারের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারক। সকল ব্যবসার লভ্যাংশ তাঁর কাছে পৌঁছায়।

আন্ডারবস (Underboss): বসের দ্বিতীয় প্রধান। পরিবারের দৈনন্দিন অপরাধের তদারকি করেন।

কনসিগ্লিয়ারে (Consigliere): পরিবারের আইনগত বা কৌশলগত উপদেষ্টা। ইনি বসের নিরপেক্ষ পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন।

ক্যাপোরেজিম (Caporegime / Capo): পরিবারের এক একটি নির্দিষ্ট দল বা 'ক্রিউ' (Crew)-এর অধিনায়ক বা ক্যাপ্টেন।

সোলেজার (Soldier): পরিবারের ফুল মেম্বার বা 'মেড ম্যান' (Made Man)। এদের ছোঁয়া বা হত্যা করা মাফিয়া কমিশনের অনুমতি ছাড়া অসম্ভব। এরা কেবল খাঁটি ইতালীয় রক্তের হতে হয়।

অ্যাসোসিয়েট (Associate): যারা পরিবারের সাথে কাজ করে কিন্তু এখনো 'মেড ম্যান' হয়নি। (যেমন: জেমস বার্ক, মেয়ার ল্যানস্কি এরা ইতালীয় না হওয়ায় অ্যাসোসিয়েট হিসেবেই থেকে গেছেন)।

ওমের্তা (Omertà) ও এর ভাঙন

মাফিয়াদের টিকে থাকার মূল ভিত্তি ছিল 'ওমের্তা' (Omertà) বা চরম গোপনীয়তার শপথ। এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো মাফিয়া সদস্য পুলিশের কাছে বা আদালতে নিজের পরিবার বা আন্ডারওয়ার্ল্ড সম্পর্কে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারবে না; করলে তার শাস্তি একমাত্র মৃত্যুদণ্ড।

১৯৬৩ সালে জো ভ্যালাচি (Joe Valachi) নামক এক মাফিয়া সদস্য প্রথম এফবিআই-এর কাছে 'ওমের্তা' ভেঙে আমেরিকার মাফিয়া কাঠামোর অস্তিত্ব (যাকে তারা বলত Cosa Nostra বা "আমাদের জিনিস") প্রকাশ্যে আনেন। পরবর্তীতে সামি গ্রাভানো, হেনরি হিলের মতো ইনফরম্যান্টদের কারণে মাফিয়াদের ওমের্তা কোড সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে আইনি কাঠামোর বিপ্লব: RICO অ্যাক্ট

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত মার্কিন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মাফিয়া বসদের ধরতে ব্যর্থ হতো, কারণ মূল বসরা কখনো নিজের হাতে খুন বা অপরাধ করতেন না; তাঁরা ক্যাডারদের দিয়ে কাজ করাতেন। এই সমস্যার সমাধানে ১৯৭০ সালে মার্কিন কংগ্রেস একটি যুগান্তকারী আইন পাস করে, যা হলো RICO Act (Racketeer Influenced and Corrupt Organizations Act)

RICO অ্যাক্টের মূল শক্তি: এই আইনের অধীনে, যদি প্রমাণ করা যায় যে কোনো ব্যক্তি একটি 'অপরাধমূলক সংস্থার' (Criminal Enterprise) প্রধান বা সদস্য হিসেবে কাজ করছেন, তবে ওই সংস্থার ক্যাডারদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের (হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি, পাচার) জন্য সরাসরি সেই সংস্থাপ্রধান বা ডনকে অভিযুক্ত ও দণ্ডিত করা যাবে।

প্রভাব: ১৯৮০-র দশকে ফেডারেল প্রসেকিউটর রুডলফ জিউলিয়ানি এই RICO আইন ব্যবহার করে নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত 'পাঁচ পরিবার'-এর প্রধানদের একসাথে অভিযুক্ত করেন (ঐতিহাসিক Mafia Commission Trial) এবং শীর্ষ ডনদের ১০০ বছর করে কারাদণ্ড দিয়ে আমেরিকান মাফিয়ার মূল মেরুদণ্ড ভেঙে দেন।

গ্যাংস্টারদের মনস্তত্ত্ব ও সমাজব্যবস্থায় তাদের প্রভাব

বিংশ শতাব্দীর এসব গ্যাংস্টারদের জীবনপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে কয়েকটি সাধারণ সামাজিক ও রাজনৈতিক উপাদান স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা তাদের এই উচ্চতায় পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল:

সামাজিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক মন্দা: বেশিরভাগ গ্যাংস্টারই চরম দারিদ্র্য বা সামাজিক অস্থিরতার মধ্য থেকে উঠে এসেছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে 'প্রহিবিশন' বা অর্থনৈতিক মন্দা, কলম্বিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা ভারতে পুলিশের অদক্ষতার সুযোগ নিয়ে এই অপরাধীরা বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল।

রাজনীতি ও অপরাধের আঁতাত: কোনো গ্যাংস্টারই রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আশ্রয় ছাড়া বেশিদিন টিকতে পারেনি। আল কাপোনে, নাকি জনসন, ফ্র্যাঙ্ক কস্টেলো কিংবা দাউদ ইব্রাহিম সবাই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরের দুর্নীতিগ্রস্ত অংশকে অর্থ দিয়ে কিনে নিয়েছিলেন।

জনপ্রিয়তার মিথ্যা খোলস (Robin Hood Myth): পাবলো এসকোবার মেডেলিনের দরিদ্র মানুষদের ঘর বানিয়ে দিতেন, কাপোনে ফ্রি স্যুপ কিচেন চালাতেন, নাকি জনসন গরীবদের খাদ্য দিতেন। এগুলো সবই ছিল মূলত সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার অপরাধমূলক কৌশল (Public Relations Strategy)।

পপ-কালচার ও চলচ্চিত্রে বিংশ শতাব্দীর গ্যাংস্টাররা

বিংশ শতাব্দীর এসব গ্যাংস্টাররা যে কেবল অপরাধের ইতিহাস তৈরি করেছেন তা নয়, তারা বৈশ্বিক পপ-কালচার ও বিনোদন শিল্পে এক বিশাল স্থান দখল করে আছেন। হলিউড থেকে শুরু করে বলিউড পর্যন্ত শত শত কালজয়ী চলচ্চিত্র ও ওয়েব সিরিজ নির্মিত হয়েছে এদের জীবনকে কেন্দ্র করে:

দ্য গডফাদার (The Godfather): কার্লো গ্যাম্বিনো ও লাকি লুসিয়ানোর জীবনের ছায়াবলম্বনে মারিও পুজোর কালজয়ী উপন্যাস ও চলচ্চিত্র।

গুডফেলাস (Goodfellas): জেমস বার্ক ও হেনরি হিলের লুফথানসা ডাকাতির ওপর তৈরি মার্টিন স্কোরসেসির মাস্টারপিস।

স্কারফেস (Scarface): আল কাপোনে ও পাবলো এসকোবারের অপরাধ জগতের অনুকরণে নির্মিত ছবি।

নারকোস (Narcos): নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় সিরিজ, যা পাবলো এসকোবার ও মেডেলিন কার্টেলের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস তুলে ধরেছে।

বোর্ডওয়াক এম্পায়ার (Boardwalk Empire): নাকি জনসন ও আটলান্টিক সিটির আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিখুঁত দলিল।

বিংশ শতাব্দীর এই দুর্ধর্ষ গ্যাংস্টারদের ইতিহাস মূলত ক্ষমতার মোহ, বিপুল অর্থনৈতিক লোভ এবং চরম সহিংসতার এক কালো দলিল। আল কাপোনে থেকে শুরু করে পাবলো এসকোবার কিংবা দাউদ ইব্রাহিম প্রত্যেকেই ক্ষণিকের জন্য বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন, তৈরি করেছিলেন শত শত মিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য।

কিন্তু ইতিহাসের অমোগ নিয়ম হলো অধর্ম ও অন্যায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কোনো রাজত্বই স্থায়ী হয় না। তাদের প্রত্যেকের পরিণতিই হয়েছে চরম করুণ কখনও জেলে নিঃসঙ্গ মৃত্যু, কখনও সহযোগীদের গুলিতে রাস্তায় পতন, আবার কখনও বা দেশ ছেড়ে ফেরারি আসামীর মতো আজীবন আত্মগোপন। এই অপরাধীদের গ্ল্যামারময় ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানবীয় মূল্যবোধের ধ্বংসলীলাই বিংশ শতাব্দীর সংঘবদ্ধ অপরাধ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.