কবরবাসীদের সালাম দেয়ার ফজিলত – আসসালামু আ’লাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর

মানুষের জীবন এক অদ্ভুত ও বৈচিত্র্যময় নদীর মতো, যা প্রতিনিয়ত বয়ে চলেছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। আমরা যখন প্রতিদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আমাদের চেনা কর্মব্যস্ততায় ডুবে যাই- অফিসের তাড়া, ব্যবসার হিসাব, সংসারের টানাপোড়েন আর অন্তহীন আকাঙ্ক্ষার পেছনে ছুটি তখন অবচেতনভাবেই আমরা ধরে নিই এই দুনিয়াই আমাদের স্থায়ী ঠিকানা। কিন্তু এই তীব্র কোলাহল আর ব্যস্ততার মাঝেও হঠাৎ যখন আমাদের গাড়ির জানলা দিয়ে বা হাঁটার পথে রাস্তার পাশে থাকা কোনো নীরব কবরস্থানের ওপর চোখ পড়ে, তখন এক মুহূর্তের জন্য হলেও পুরো পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে যায়।
সেই মাটির ঢিবির নিচে শুয়ে থাকা হাজারো নীরব বাসিন্দা আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক অমোঘ সত্য আমরা আজ যেখানে আছি, ওরাও একদিন সেখানেই ছিল; আর ওরা আজ যেখানে আছে, আমাদেরও একদিন অবধারিতভাবে সেখানে যেতে হবে।
ছোটবেলা থেকেই আমাদের অনেকেরই একটি সুন্দর অভ্যাস থাকে। কোনো কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা অবলীলায় বলে উঠি: "আসসালামু আ’লাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর"। আপাতদৃষ্টিতে এই অতি সাধারণ এবং কয়েক সেকেন্ডের একটি বাক্যের পেছনে যে কত বড় আধ্যাত্মিক রহস্য, ঐশ্বরিক রহমত এবং মৃত ও জীবিতের মাঝে এক অপার্থিব যোগসূত্র লুকিয়ে আছে, তা আধুনিক যুগের বস্তুবাদী চিন্তার ভিড়ে আমরা অনেকেই উপলব্ধি করতে পারি না।
আজকের এই বিস্তারিত ও তাত্ত্বিক নিবন্ধে আমরা কবরবাসীকে সালাম দেওয়ার সেই বিস্ময়কর ফজিলত, পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর সঠিক নিয়ম, এর ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এবং আমাদের নিজেদের চিরস্থায়ী ভবিষ্যতের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রতিদান নিয়ে এক গভীর ও তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা করব।
সুফি দর্শন ও ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে বারজাখ ও সালাম
ইসলামি আকীদা ও দর্শনে মৃত্যুই সবকিছুর শেষ নয়, বরং এটি হলো এক জগত থেকে অন্য জগতে স্থানান্তরের একটি মাধ্যম মাত্র। ইহকাল (দুনিয়া) এবং পরকালের (আখিরাত) মাঝখানে যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন জগত রয়েছে, তাকে ইসলামি পরিভাষায় বলা হয় 'বারজাখ' (Barzakh)।
"মৃত্যু কোনো বিনাশ নয়, এটি কেবল আত্মার এক ঘর থেকে অন্য ঘরে স্থানান্তরের নাম।" - সুফি প্রবচন
জীবিত ও মৃত আত্মার মাঝে আধ্যাত্মিক সেতু
কবরবাসীকে সালাম দেওয়ার বিষয়টি কেবল একটি সামাজিক প্রথা বা অন্ধ অনুকরণ নয়। এটি আসলে জীবিত মানুষের পক্ষ থেকে মৃত মানুষের প্রতি পাঠানো একটি আধ্যাত্মিক উপহার। ইসলাম আমাদের শেখায় যে, মানুষ মারা গেলেও তার রুহ বা আত্মা সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায় না। বারজাখ জগতে তারা এক বিশেষ অনুভূতি সম্পন্ন অবস্থায় থাকে।
বিখ্যাত ইসলামি পন্ডিত ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ‘কিতাবুর রূহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, যখন কোনো জীবিত ব্যক্তি কোনো পরিচিত বা অপরিচিত মুমিনের কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে সালাম দেয়, তখন আল্লাহ তাআলা সেই মৃত ব্যক্তির আত্মার কাছে সেই সালাম পৌঁছে দেন এবং মৃত ব্যক্তি সেই সালামের জবাব দেয় ও আনন্দিত হয়।
শান্তি ও নিরাপত্তার ঐশ্বরিক গ্যারান্টি
আমরা যখন বলি ‘আসসালামু আলাইকুম’, তখন এর মূল অর্থ হলো "আপনাদের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি ও নিরাপত্তা বর্ষিত হোক"। কবরের জগতটি অত্যন্ত একাকী, অন্ধকার এবং সাধারণ মানুষের জন্য ভীতিপ্রদ। এমন একটি অবস্থায় কোনো এক অপরিচিত বা পরিচিত পথিকের কাছ থেকে যখন শান্তির এই বার্তাটি কোনো কবরবাসীর কাছে পৌঁছায়, তখন তা তাদের জন্য এক পরম সান্ত্বনা ও ঐশ্বরিক রহমতের চাদর হয়ে দাঁড়ায়।
হাদিস শরীফের অকাট্য দলিল ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ
কবরবাসীকে সালাম দেওয়া এবং তাঁদের জন্য মাগফিরাত বা ক্ষমা প্রার্থনা করা স্বয়ং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নাহ। তিনি কেবল নিজেই এই আমল করতেন না, বরং তাঁর সাহাবিদের এবং উম্মতকে এর সঠিক শব্দ চয়ন ও নিয়ম শিখিয়েছেন।
সহীহ মুসলিমের ঐতিহাসিক বর্ণনা
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, আল্লাহর রাসূল (সা.) রাতের শেষভাগে মদীনার বিখ্যাত কবরস্থান ‘জান্নাতুল বাকী’-তে যেতেন এবং সেখানে গিয়ে কবরবাসীদের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ দোয়া ও সালাম পেশ করতেন। হযরত আয়েশা (রা.) যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমি যখন কবরস্থানে যাব, তখন তাঁদের কীভাবে সম্বোধন করব?"
তখন নবী করীম (সা.) তাঁকে এই বিখ্যাত দোয়াটি শিখিয়ে দেন:
আরবি উচ্চারণ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَاحِقُونَ
বাংলা অনুবাদ: "হে মুমিনদের ঘরবাসী (কবরবাসী)! তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আর আমরাও আল্লাহর ইচ্ছায় শীঘ্রই তোমাদের সাথে এসে মিলিত হব।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৯৭৪)
সম্প্রদায়ের বন্ধন ও চিরন্তন ভ্রাতৃত্ব
এই হাদিসটির শব্দগুলোর দিকে গভীর দৃষ্টি দিলে বোঝা যায়, নবীজি (সা.) কবরবাসীদের ‘দারা ক্বাওমিম মু’মিনীন’ বা মুমিনদের এক একটি পরিবার বা ঘর বলে সম্বোধন করেছেন। এর অর্থ হলো, ঈমানের যে বন্ধন, তা মৃত্যুর পরেও ছিন্ন হয়ে যায় না। কবরের নিচে শুয়ে থাকা মানুষগুলো আজও আমাদের ঈমানি ভাই ও বোন, আর তাঁদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব রয়েছে।
এক সেকেন্ডের সালাম ও আজাব লাঘবের ঐশ্বরিক সমীকরণ
আমরা মানুষ হিসেবে প্রতিনিয়ত পাপ ও পুণ্যের দোলাচলে দুলছি। মৃত্যুর পর কবরের প্রথম রাতেই প্রতিটি মানুষকে তাঁর কৃতকর্মের হিসাব দিতে হয়। যারা অবাধ্য ও পাপী, তাঁদের জন্য কবরের জীবনটি অত্যন্ত ভয়ংকর এবং আজাবে পরিপূর্ণ হতে পারে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই লুকিয়ে আছে কবরবাসীকে সালাম দেওয়ার সবচেয়ে বিস্ময়কর ও চোখ জুড়ানো ফজিলত।
ফেরেশতাদের শাস্তির হাত স্তব্ধ হওয়ার মুহূর্ত
কল্পনা করুন এমন একটি দৃশ্য: কোনো এক কবরবাসী হয়তো তাঁর জীবনের কোনো বড় ভুলের কারণে কবরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আজাবের ফেরেশতাদের কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হয়েছেন। শাস্তির হাতুড়ির আঘাতে তিনি হয়তো জর্জরিত, তাঁর চারপাশে কোনো আলোর রেখা নেই, কোনো আশার আলো নেই। ঠিক সেই মুহূর্তে, দুনিয়ার বুক থেকে কোনো এক সাধারণ মানুষ হতে পারে কোনো রিকশাচালক, কোনো পথচারী কিংবা কোনো স্কুলপড়ুয়া শিশু সেই কবরস্থানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় বা গাড়ি দিয়ে যাওয়ার সময় আলতো করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বা কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে আন্তরিকতার সাথে বলল:
"আসসালামু আ’লাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর" (হে কবরবাসী, আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক)।
যেহেতু আল্লাহ তাআলা পরম দয়ালু এবং তিনি বান্দার খাঁটি দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেন না, বিশেষ করে যখন কোনো বান্দা অন্য কোনো ভাইয়ের জন্য নিঃস্বার্থভাবে দোয়া করে, তখন আল্লাহর আরশ থেকে তাৎক্ষণিক নির্দেশ আসে:
“হে আজাবের ফেরেশতারা! শোনো, আমার এক জীবিত বান্দা এই মাত্র এই কবরবাসীর ওপর আমার পক্ষ থেকে ‘সালাম’ বা শান্তি ও নিরাপত্তা বর্ষণের জন্য আবেদন করেছে। আমি আমার বান্দার এই আরজি কবুল করলাম। এই মুহূর্তের জন্য এই ব্যক্তির ওপর থেকে সমস্ত আজাব ও শাস্তি স্থগিত করো এবং আমার পক্ষ থেকে শান্তি নাজিল করো।”
আপনার মুখের মাত্র দুই সেকেন্ডের এই ছোট্ট বাক্যটির কারণে একজন অসহায় মৃত মানুষ সেই ভয়ংকর আজাবের ভেতর থেকে কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও পরম সুকুন বা শান্তি লাভ করলেন। এর চেয়ে বড় পরোপকার আর কী হতে পারে?
কর্মের প্রতিদান ও আল্লাহর বিচারিক মূলনীতি (The Law of Reciprocity)
ইসলামের একটি চিরন্তন মূলনীতি হলো "তুমি অন্যের প্রতি দয়া করো, আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করবেন।" আজকে আপনি যে দয়া অন্য এক মৃত মানুষের প্রতি দেখাচ্ছেন, সময়চক্রের আবর্তনে সেই দয়া আপনার কাছেই ফিরে আসবে।
দুনিয়ার নিয়ম হলো আপনি যা দেবেন, তা হয়তো হারিয়ে যাবে; কিন্তু আল্লাহর নিয়ম হলো আপনি যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অন্যকে দেবেন, তা বহুগুণ হয়ে আপনার কাছেই ফিরে আসবে।
আজ থেকে ২০, ৩০ বা ৫০ বছর পর যখন আপনার ও আমার নামটিও এই পৃথিবীর জীবিত মানুষের তালিকা থেকে মুছে যাবে, যখন আমাদের শরীরটিও মাটির নিচে অন্ধকার কবরে শায়িত থাকবে, তখন হয়তো আমাদেরও কোনো ভুলের কারণে আজাব হতে পারে। কিন্তু ঠিক সেই সময়, আপনার সেই পুরনো আমলের কারণে আল্লাহ এমন এক ব্যবস্থার সৃষ্টি করবেন যে, কোনো এক অচেনা পথিক আপনার কবরের পাশ দিয়ে যাবে এবং তার মনে আপনার কবরটি দেখে মায়া হবে। সে-ও দাঁড়িয়ে বলবে, "আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর।" আর আল্লাহর রহমতে আপনার ওপর থেকেও সেই আজাব দূর হয়ে যাবে।
কবরস্থানের সালাম, দোয়া ও ফজিলতের সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকা
কবরবাসীকে সালাম দেওয়ার দোয়া, সেগুলোর অর্থ এবং এর তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদী উপকারিতা সহজে বোঝার সুবিধার্থে নিচে একটি তথ্যসমৃদ্ধ টেবিল দেওয়া হলো:
সঠিক দোয়া ও আরবি বা বাংলা রূপ | হাদিসের উৎস / রেফারেন্স | তাৎক্ষণিক ফজিলত (মৃতের জন্য) | দীর্ঘমেয়াদী ফজিলত (জীবিত ব্যক্তির জন্য) |
আসসালামু আ'লাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর (হে কবরবাসী! আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।) | সুনানে তিরমিযী | আল্লাহর নির্দেশে কবরবাসীর একাকীত্ব দূর হয় এবং আত্মার শান্তি অর্জিত হয়। | নিজের অন্তরে মৃত্যুর ভয় জাগ্রত হয় এবং গুনাহের প্রতি অনীহা তৈরি হয়। |
আসসালামু আলাইকুম দারা ক্বাওমিম মু'মিনিন, ওয়া ইন্না ইনশা আল্লাহু বিকুম লা-হিকুন। | সহীহ মুসলিম | কবরের আজাব সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে লাঘব হওয়ার ঐশ্বরিক সুসংবাদ। | আখেরাতে নিজের কবরের কঠিন সময়ে অন্য কোনো পথিকের মাধ্যমে দোয়ার ভাগ্য হওয়া। |
ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়া লাকুম, আনতুম সালাফুনা ওয়া নাহনু বিল আসার। (আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের ক্ষমা করুন...) | সুনানে দারেমী ও তিরমিযী | মৃত ব্যক্তির গুনাহ খাতা মাফ হওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে বিশেষ সুপারিশ। | একনিষ্ঠভাবে আমল করলে আমলনামায় অসংখ্য নেকি যুক্ত হওয়া এবং অহংকার দূর হওয়া। |
কবর জিয়ারত ও সালাম দেওয়ার পূর্ণাঙ্গ আদব ও নিয়মাবলী
যেকোনো ইবাদত বা আমল আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার জন্য তার কিছু নির্দিষ্ট আদব বা শিষ্টাচার মেনে চলা আবশ্যক। কবরবাসীকে সালাম দেওয়া এবং জিয়ারতের ক্ষেত্রেও ইসলাম আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদব শিখিয়েছে, যা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
নিয়তের বিশুদ্ধতা (Ikhlas)
কবর জিয়ারত বা সালাম দেওয়ার সময় প্রধান নিয়ত হতে হবে দুটি:
প্রথমত, মৃত মুসলিম ভাই-বোনদের জন্য আল্লাহর কাছে নিঃস্বার্থভাবে ক্ষমা ও শান্তি প্রার্থনা করা।
দ্বিতীয়ত, নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে আখেরাতের প্রস্তুতি নেওয়ার তাড়না অনুভব করা। কোনো প্রকার লোকদেখানো বা সামাজিক লৌকিকতার জন্য এটি করা যাবে না।
সঠিক শারীরিক অবস্থান ও দিক নির্দেশন
যখন আপনি কোনো কবরস্থানের পাশ দিয়ে হেঁটে বা কোনো যানবাহনে যাবেন, তখন কেবল কবরস্থানের দিকে মুখ করে মনে ফোকাস এনে সালাম দেওয়াই যথেষ্ট। কিন্তু আপনি যদি বিশেষভাবে কোনো কবর জিয়ারত করতে যান, তবে কবরের পায়ের দিক থেকে প্রবেশ করে কবরের দিকে মুখ করে এবং নিজের পিঠ কিবলার দিকে রেখে দাঁড়ানো উত্তম। এরপর শান্ত ও গম্ভীর কণ্ঠে সালাম পেশ করতে হবে।
শরিয়ত পরিপন্থী কাজ থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকা
কবরস্থান হলো আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি ও ক্ষমা চাওয়ার জায়গা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে কবরকে কেন্দ্র করে কিছু বিদ'আত ও শিরকপূর্ণ কাজের প্রচলন দেখা যায়। জিয়ারতের সময় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো কঠোরভাবে বর্জন করতে হবে:
কবরকে সেজদা করা: সেজদা একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য। কবরে সেজদা করা স্পষ্ট শিরক।
মৃত ব্যক্তির কাছে কিছু চাওয়া: মৃত ব্যক্তি নিজে আল্লাহর রহমতের মুখাপেক্ষী, সে কাউকে কিছু দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। তাই চাইতে হবে সরাসরি আল্লাহর কাছে, মৃত ব্যক্তির উসিলায় বা তার কবরে মানত করা যাবে না।
কবরের ওপর বসা বা পাড়ানো: নবীজি (সা.) কবরের ওপর বসতে বা তার ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন, কারণ এটি মৃত ব্যক্তির প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করে।
জীবিত মানুষের ওপর এই আমলের মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক প্রভাব
কবরবাসীকে সালাম দেওয়ার এই আমলটি আপাতদৃষ্টিতে মৃত ব্যক্তির উপকারের জন্য মনে হলেও, এর আসল মনস্তাত্ত্বিক ও মানসিক সুফল ভোগ করে স্বয়ং জীবিত মানুষটি।
অন্তরের কঠোরতা দূরীকরণ ও ‘তাজকিয়াহ’ (Purification)
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে বলা হয়, মানুষ যখন অতিরিক্ত বস্তুবাদী হয়ে পড়ে, তখন তার মধ্যে সহানুভূতি ও সহমর্মিতা কমে যায়। ইসলাম একে বলে ‘ক্বালব বা অন্তরের কঠোরতা’। নবী করীম (সা.) বলেছেন:
"আমি পূর্বে তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু এখন তোমরা কবর জিয়ারত করো। কারণ এটি তোমাদের অন্তরকে নরম করে, চোখের পানি প্রবাহিত করে এবং আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়।" (মুসনাদে আহমাদ)
প্রতিদিন কবর দেখে সালাম দিলে মানুষের ভেতরের অহংকার, হিংসা এবং অতিরিক্ত লোভ নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
মানসিক বিষণ্ণতা ও স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট (Stress Management)
আজকের দুনিয়ায় আমরা ছোটখাটো ব্যর্থতা যেমন চাকরিতে প্রমোশন না পাওয়া, পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়া বা আর্থিক ক্ষতি হওয়ার কারণে চরম ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতায় ভুগি। কিন্তু যখন আপনি কবরস্থানের দিকে তাকাবেন এবং ভাববেন যে এই মাটির নিচে যারা শুয়ে আছেন, ওরাও একদিন আপনার মতোই কোটি টাকার মালিক ছিলেন কিংবা অনেক বড় পদের অধিকারী ছিলেন, কিন্তু আজ ওপরে সুন্দর মার্বেল পাথর ছাড়া আর কিছুই সাথে নেই; তখন আপনার ভেতরের সমস্ত জাগতিক দুঃখ ছোট মনে হতে শুরু করবে। এটি আপনাকে এক অদ্ভুত মানসিক শান্তি ও আত্মিক সুকুন এনে দেবে।
আজকের পথিক, আগামীকালের কবরবাসী
এই নিবন্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি লুকিয়ে আছে সময়ের এই অমোঘ চক্রের মধ্যে। আমরা যখন রাস্তা দিয়ে খুব দ্রুত গতিতে দামী গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালিয়ে যাই, তখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নীরব কবরগুলো আমাদের দিকে চেয়ে যেন এক নিঃশব্দ ভাষায় কথা বলে। তারা যেন ফিসফিস করে বলে:
"ওহে দ্রুত গতিতে ছুটে চলা পথিক! একটু আস্তে চলো, একটু থামো। তুমি আজ যে পথের পথিক, আমরাও একদিন সেই পথের যাত্রী ছিলাম। আর আমরা আজ যেখানে চিরদিনের জন্য থমকে গেছি, কালকের সূর্যোদয়ে তুমিও হয়তো আমাদের পাশের এই অন্ধকার ঘরে এসে স্থান নেবে।"
"জীবন হলো একটি সংক্ষিপ্ত পরীক্ষার হল, আর কবর হলো সেই হলের বাইরের নীরব প্রতীক্ষালয়।"
তাই প্রতিদিন চলার পথে যতবার আপনার চোখে কোনো কবরস্থান পড়বে, ততবারই এই আমলটি করুন। এটিকে আপনার জীবনের একটি অবলিলায় ঘটে যাওয়া অভ্যাসে পরিণত করুন। আপনি যখনই কোনো কবরস্থান পার হবেন, আপনার ঠোঁটের কোণে যেন ভেসে ওঠে সেই পবিত্র বাণী: "আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর।" এটি করতে আপনার কোনো টাকা খরচ হবে না, আপনার মূল্যবান সময়ের কোনো ক্ষতি হবে না; কিন্তু আপনার আমলনামায় এমন কিছু জমা হবে, যা আপনার জীবনের সমস্ত ব্যাংকিং ব্যালেন্সের চেয়ে কোটি গুণ বেশি মূল্যবান প্রমাণিত হবে সেই দিন, যেদিন আপনার পাশে আপনার আপনজনও থাকবে না।
অনন্ত যাত্রার মহিমান্বিত প্রস্তুতি
দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী রঙ্গমঞ্চে আমরা সবাই একেকজন মুসাফির বা প্রবাসী। প্রবাস জীবনের মেয়াদ শেষ হলে যেমন সবাইকে নিজ দেশে ফিরে যেতেই হয়, তেমনি আমাদেরও আসল ঠিকানা সেই আখেরাত এবং তার প্রথম স্টেশন হলো কবর। কবরবাসীকে সালাম দেওয়ার এই ছোট্ট কিন্তু অতি বরকতময় আমলটি আমাদের প্রতিনিয়ত সেই পরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে নিঃস্বার্থ হতে হয়, কীভাবে এমন মানুষদের জন্য দোয়া করতে হয় যারা আমাদের কোনো প্রতিদান দিতে পারবে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে, আসুন আমরা আজ থেকেই প্রতিজ্ঞা করি এখন থেকে যখনই কোনো ছোট বা বড়, পরিচিত বা অপরিচিত কবরস্থানের পাশ দিয়ে আমরা যাব, আমাদের মন যেন উদাসীন না থাকে। আমরা যেন অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কবরবাসীদের সালাম জানাই এবং আল্লাহর কাছে তাঁদের জন্য মাগফিরাত কামনা করি।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সকলকে এই সহজ, সুন্দর এবং অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমলটি নিয়মিত করার তৌফিক দান করুন। আল্লাহ আমাদের পূর্বসূরি সমস্ত মুমিন কবরবাসীদের কবরের আজাব মাফ করে তাঁদের জান্নাতুল ফেরদাউসের উচ্চ মাকাম দান করুন, এবং যেদিন আমরাও সেই অন্ধকার কবরের বাসিন্দা হব, সেদিন আমাদের জন্যও কোনো নেককার পথিকের দোয়ার উসিলায় কবরের জীবনকে শান্তিময় ও সুকুনপূর্ণ করে দিন। আমীন।





















