আত্মসমর্পণ অথবা মৃত্যু – একাত্তরে ৫ ডিসেম্বর যখন বিজয় অনিবার্য

১৯৭১ সালের ৫ই ডিসেম্বর ছিল বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সামরিক দিক থেকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। নয় মাসের দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী ও অসমান গেরিলাযুদ্ধের পর ডিসেম্বরের প্রথম প্রহর থেকেই রণাঙ্গনের চিত্র দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ৩রা ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্তান বিমানবাহিনী কর্তৃক ভারতের একাধিক বিমানঘাঁটিতে ‘অপারেশন চেঙ্গিজ খান’ চালুর পর ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। গঠিত হয় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সমন্বয়ে ‘যৌথ কমান্ড’ (Joint Command)।
জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর সর্বাত্মক অভিযান শুরুর মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ ৫ই ডিসেম্বরের সূর্য যখন উদিত হয়, তখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দখলদার পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অবস্থান বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করে।
এই দিনটি কেবল সামরিক অগ্রগতির দিন ছিল না; এটি ছিল এমন একটি দিন যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা রেখেছিল ইতিহাস: ‘আত্মসমর্পণ অথবা মৃত্যু’। এক সামরিক সংকটে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল পাক বাহিনী, অন্যদিকে জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চেও তারা রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। চুয়াডাঙ্গার সীমান্তশহর দর্শনার শুনশান রেলস্টেশন থেকে শুরু করে নিউইয়র্কের জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের উত্তপ্ত সভাকক্ষ সর্বত্রই যেন বাজে স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়ের দামামা।
মুক্তিযুদ্ধের শেষ লগ্নের এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে সামরিক স্ট্র্যাটেজি, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মল্লযুদ্ধ এবং মুক্তিকামী বাঙালির অদম্য চেতনার যে ত্রিমুখী স্রোত তৈরি হয়েছিল, তা-ই ৫ই ডিসেম্বরকে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত মোড় ঘোরানো দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রণাঙ্গনের দৃশ্য: মুক্তির উল্লাস, মুক্তাঞ্চল ও শত্রুর পলায়ন
৫ই ডিসেম্বরের সকালে সীমান্ত ঘেঁষা এলাকাগুলোতে যে দৃশ্য উন্মোচিত হয়েছিল, তা একাধারে ছিল দখলদার বাহিনীর পলায়ন এবং অন্যদিকে অবরুদ্ধ বাঙালির বহু আকাঙ্ক্ষিত মুক্তির এক আবেগঘন চিত্র। ৯ মাস ধরে পাকিস্তানি সেনাদের নির্মম নির্যাতন, গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগের পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল যখন একের পর এক মুক্ত হচ্ছিল, তখন সেখানে তৈরি হয় এক অপার্থিব পরিবেশ।
সিডনি শনবার্গের প্রত্যক্ষদর্শী বয়ান ও দর্শনার চিত্র
মার্কিন সংবাদপত্র নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর খ্যাতিমান সাংবাদিক সিডনি শনবার্গ (Sydney Schanberg) সেদিন রণাঙ্গন পরিদর্শন করছিলেন। চুয়াডাঙ্গা জেলার সীমান্তঘেঁষা দর্শনা রেলস্টেশনে ৫ই ডিসেম্বর সকালে পৌঁছে তিনি এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী ঐতিহাসিক বাস্তবতার মুখোমুখি হন।
দর্শনা রেলস্টেশনের মাস্টার্স কক্ষে গিয়ে শনবার্গ দেখতে পান, ধূলিমলিন রেজিস্টার খাতায় শেষ ট্রেন চলাচলের তারিখ লেখা রয়েছে: ‘২৬শে মার্চ ১৯৭১, সকাল’। অর্থাৎ, ২৫শে মার্চের কালরাতে 'অপারেশন সার্চলাইট' শুরু হওয়ার পর থেকে এই স্টেশনে আর কোনো বেসামরিক ট্রেন চলেনি। ৮ মাস ১০ দিন ধরে এটি ছিল এক ভৌতিক ও নিস্তব্ধ এলাকা।
৪ঠা ডিসেম্বর রাতে দর্শনায় অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনারা যৌথ বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে পিছু হটে এবং স্টেশন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। ৫ই ডিসেম্বর সকালে যখন সাংবাদিকরা দর্শনায় প্রবেশ করেন, তখন সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ফেলে যাওয়া বুলেট, ভাঙা বাঙ্কার এবং পরিত্যক্ত রসদ।
প্রকৃতির নির্জনতা ও 'জয় বাংলা' ধ্বনির বিস্ফোরণ
সিডনি শনবার্গ তাঁর বিখ্যাত বই ‘Dateline Bangladesh: 1971’ এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে দর্শনার আশেপাশের প্রকৃতির এক কাব্যিক ও বেদনার্ত বিবরণ দেন। তিনি লিখেন:
"মাইল পর মাইল আখের ক্ষেত আগাছায় ঢেকে গেছে, যত্ন নেওয়ার কেউ ছিল না। হলুদ ফুলে ভরা সরিষার ক্ষেতগুলো বাতাসে দুলছে, কিন্তু চারপাশে কোনো মানুষের কোলাহল নেই। এই নীরবতা যেন গত আট মাসের গণহত্যার সাক্ষ্য দিচ্ছিল।"
কিন্তু এই ভৌতিক নীরবতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ভিনদেশি সাংবাদিক ও ভারতীয় সেনাদলকে দেখা মাত্রই ঝোপঝাড়, দূরের ভিটা ও পার্শ্ববর্তী শরণার্থী শিবির থেকে লুকিয়ে থাকা বাঙালিরা বেরিয়ে আসতে শুরু করে। বাতাসে প্রতিধ্বনি হতে থাকে রক্ত গরম করা স্লোগান: "জয় বাংলা!"। ৮ মাসের ভয় ও শঙ্কাকে ছিন্ন করে এটিই ছিল মুক্ত আকাশে বাঙালির প্রথম স্বাধীনতার শ্বাস।
আনন্দবাজার পত্রিকার প্রখ্যাত সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাসগুপ্তও সেই সময় সাংবাদিক দলটির সাথে ছিলেন। তিনি লিখেছেন যে, ৫ই ডিসেম্বর শীতের পড়ন্ত বিকেলে দর্শনা থেকে প্রায় চার মাইল পূর্বে চুয়াডাঙ্গাগামী সড়কের দু’পাশে পাকিস্তানি বাহিনীর ফেলে যাওয়া ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র পড়ে ছিল। সেখানে উপস্থিত ভারতীয় সেনাকর্তারা সাংবাদিকদের জানান, এর অনেক অস্ত্রই চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি, যেগুলো পাক বাহিনী ফেলে রেখে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে গেছে।
যৌথ বাহিনীর মাস্টারস্ট্রোক ও সামরিক কৌশল
৫ই ডিসেম্বরে রণাঙ্গনে যৌথ বাহিনীর সাফল্য কেবল সম্মুখযুদ্ধে গোলার্ধের লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এতে যুক্ত ছিল অত্যন্ত সুচিন্তিত, আধুনিক ও চতুর সামরিক স্ট্র্যাটেজি।
যশোর সেনানিবাসে চরমপত্র: ‘আত্মসমর্পণ অথবা মৃত্যু’
৫ই ডিসেম্বর যৌথ বাহিনী দক্ষিণ-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলীয় রণাঙ্গনে দ্রুত অগ্রগতি লাভ করে। এই দিনে লাকসাম, আখাউড়া, ময়মনসিংহের বকশিগঞ্জ, কুমিল্লার মিয়াবাজার, পারিকোট, লালবাগ এবং যশোরের কোটচাঁদপুর সম্পূর্ণভাবে শত্রুমুক্ত হয়।
বিশেষ করে যশোর সেনানিবাসকে ঘিরে মিত্র ও মুক্তিবাহিনী চতুর্মুখী অবরোধ সৃষ্টি করে। যশোর ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি (৯ম ডিভিশনের সদর দপ্তর)। ৫ই ডিসেম্বর সকালে মাইক দিয়ে যশোর সেনানিবাসের ভেতরে থাকা পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের উদ্দেশে স্পিকার ও বেতারের মাধ্যমে ঘোষণা দেওয়া হয়:
"তোমাদের পালানোর সব পথ বন্ধ। আমাদের চতুর্মুখী আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। তোমাদের সামনে কেবল দুটি পথ খোলা আছে আত্মসমর্পণ অথবা মৃত্যু। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী তোমরা আত্মসমর্পণ করলে যুদ্ধবন্দী হিসেবে পূর্ণ সম্মান ও নিরাপত্তা দেওয়া হবে।"
এই মনস্তাত্ত্বিক ঘোষণাটি পাকিস্তানি সৈন্যদের মনোবল পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেয়। তারা বুঝতে পারে, তাদের প্রধান কার্যালয় ঢাকার সাথে তাদের সংযোগ কেটে গেছে এবং তাদের কাছে কোনো অতিরিক্ত সাহায্য আসার সুযোগ নেই।
লে. জেনারেল জে. এফ. আর. জেকবের বাইপাস স্ট্র্যাটেজি
সামরিক কৌশলের দিক থেকে ৫ই ডিসেম্বর ঝিনাইদহ ও যশোর ফ্রন্টে যে অপারেশন চালানো হয়েছিল, তা যুদ্ধবিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত প্রশংসিত। ভারতীয় যৌথ বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে. এফ. আর. জেকব তাঁর বই ‘Surrender at Dhaka: Birth of a Nation’-এ ৫ই ডিসেম্বরের অপারেশনাল কৌশল বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন:
প্রথাগত পথ ত্যাগ: দর্শনা, কোটচাঁদপুর ও কালীগঞ্জ দখলের পর ভারতীয় ৪ মাউন্টেন ডিভিশনের মূল সড়ক ধরে ঝিনাইদহ আক্রমণের কথা ছিল। কিন্তু সেখানে পাকিস্তানিরা শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরি করে রেখেছিল। জেনারেল জেকবের নির্দেশে যৌথ বাহিনী প্রথাগত সড়ক পথ এড়িয়ে মাঠের ভেতরের কাঁচা পথ ও ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে উত্তর দিকে আকস্মিক আক্রমণ চালায়।
রোড ব্লক (Road Block): চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহের মাঝামাঝি স্থানে এক ব্যাটালিয়ন ও এক স্কোয়াড্রন সাঁজোয়া যান দিয়ে শক্তিশালী রোড ব্লক তৈরি করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা এই অবরুদ্ধ পথ ভাঙতে ব্যর্থ হয় এবং ঝিনাইদহে অবস্থানরত তাদের ব্রিগেডটি ঢাকায় বা যশোরে রসদ পাঠাতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়ে।
শত্রুকে বাধ্য করা: ফলস্বরূপ, পাকিস্তানিরা ঝিনাইদহ রক্ষা করার পরিবর্তে পিছু হটে কুষ্টিয়ার দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এতে ঝিনাইদহ অরক্ষিত হয়ে পড়ে এবং ৪১ মাউন্টেন ব্রিগেড খুব সহজেই ঝিনাইদহ শহরে প্রবেশ করে।
রেল ও সরবরাহ লাইন ধ্বংস
একই দিনে পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টে আখাউড়া ও লাকসামের পতন ঘটে। দৈনিক যুগান্তর-এর ৬ই ডিসেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আখাউড়া ও লাকসাম মুক্ত হওয়ার ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা, সিলেট ও চাঁদপুরের মধ্যে সমস্ত রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর রসদ, গোলাবারুদ ও অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর যে প্রাথমিক মাধ্যম ছিল রেলওয়ে, তা ৫ই ডিসেম্বরের মধ্যেই পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে। একেকটি পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটি যেন এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়।
আকাশপথের আধিপত্য: ৩৬ ঘণ্টায় আকাশ জয় ও প্রচার যুদ্ধ
স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি ৫ই ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক ছিল আকাশপথে যৌথ বাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা।
কুর্মিটোলা ও তেজগাঁও ঘাঁটিতে হামলা
৩রা ডিসেম্বর রাতে ভারতের তৎকালীন ইস্টার্ন এয়ার কমান্ডের অধীনে থাকা মিগ-২১, ক্যানবেরা ও হান্টার বিমানগুলো পূর্ব পাকিস্তানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে। ৪ ও ৫ই ডিসেম্বর এই ৩৬ ঘণ্টার তাণ্ডবে ভারতীয় বিমানবাহিনী ঢাকার কুর্মিটোলা ও তেজগাঁও বিমানঘাঁটির রানওয়ে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।
পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর (PAF) ১৪ নম্বর স্কোয়াড্রনের মূল শক্তি ছিল সাবের জ্যাফ (F-86 Sabre) বিমান। রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং বেশ কিছু সাবের জেট আকাশে ওঠার আগেই ধ্বংস হওয়ায় ৫ই ডিসেম্বর দুপুরের মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের আকাশ পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর জন্য পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশের আকাশে যৌথ বাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলো কোনো প্রকার বাধা ছাড়াই উড্ডয়ন করতে থাকে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর ও কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানে থাকা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙ্কার, গোলন্দাজ বহর এবং গাড়ি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়।
বিমানঘাঁটি / এলাকা | আক্রমণের ধরণ | ফলাফল / প্রভাব (৫ই ডিসেম্বর ১৯৭১) |
কুর্মিটোলা ও তেজগাঁও | রকেট ও ভারী বোমাবর্ষণ | রানওয়ে ধ্বংস; পাক সাবের জেটের উড্ডয়ন ক্ষমতা চিরতরে বন্ধ। |
যশোর ও ঝিনাইদহ ফ্রন্ট | ক্লোজ এয়ার সাপোর্ট (CAS) | পাক ৯ নম্বর ডিভিশনের সাজোঁয়া গাড়ি ও বাঙ্কার ধ্বংস; সেনা পলায়ন। |
আখাউড়া ও লাকসাম | কৌশলগত বিমান হামলা | পাক বাহিনীর রসদ সরবরাহ লাইন পুরোপুরি অচল। |
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ | আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক যুদ্ধ | মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে রাশিয়ার দ্বিতীয় ভেটো প্রদান। |
পাকিস্তান প্রচারযন্ত্রের বিভ্রান্তিকর মিথ্যাচার
রণাঙ্গনে যখন পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রাণভয়ে বাঙ্কার ছেড়ে পালাচ্ছিল এবং আকাশে বিমানঘাঁটিগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, তখন পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির সরকারি প্রচারযন্ত্র ও রেডিও পাকিস্তান চালাইছিল এক আজব প্রচারযুদ্ধ।
৫ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা 'এপিপি' (Associated Press of Pakistan)-এর বরাত দিয়ে দৈনিক ইত্তেফাক ও অন্যান্য পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। পাক প্রচারযন্ত্র দাবি করে:
"পূর্ব পাকিস্তানের আকাশে পাক বিমানবাহিনী সম্পূর্ণ আধিপত্য বজায় রেখেছে।"
"আকাশযুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর ৬১টি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে।"
"দর্শনা ও ঠাকুরগাঁওয়ে ভারতীয় বাহিনীর সাময়িক চাপ ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র পরিস্থিতি 'স্বাভাবিক' ও 'নিয়ন্ত্রণে' আছে।"
এই মিথ্যাচার ছিল মূলত পাকিস্তানের সাধারণ জনগণ ও তাদের বিভ্রান্ত সৈন্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার এক ব্যর্থ চেষ্টা। বাস্তবে ৫ই ডিসেম্বরেই পাকিস্তানি সামরিক কমান্ডের প্রধান জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজী বুঝতে পেরেছিলেন যে, ঢাকা রক্ষা করা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।
উত্তপ্ত নিরাপত্তা পরিষদ: আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক যুদ্ধ ও সুশীতল ভেটো
রণাঙ্গনে যখন কামানের গর্জন চলছিল, ঠিক একই সময়ে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে (UN Security Council) চলছিল বিশ্ব মোড়লদের স্নায়ুযুদ্ধ। ৫ই ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক রাজনীতির ময়দানে বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণে এক ঐতিহাসিক নাটকীয় মোড় উন্মোচিত হয়।
ওয়াশিংটনের চাল ও মার্কিন প্রস্তাব
মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার ছিলেন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়া খানের অন্ধ সমর্থক। যৌথ বাহিনীর দ্রুত অগ্রযাত্রায় পাকিস্তান যখন পতনোন্মুখ, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মূল্যে যুদ্ধ থামিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে বিদ্যমান পরিস্থিতি টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল।
৫ই ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি অধিবেশনে মার্কিন প্রতিনিধি জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ (যিনি পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন) একটি প্রস্তাব পেশ করেন। প্রস্তাবের মূল কথা ছিল:
১. ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অবিলম্বে 'যুদ্ধবিরতি' (Ceasefire) ঘোষণা করতে হবে।
২. দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে নিজ নিজ সীমান্ত সীমানায় ফিরিয়ে নিতে হবে।
এই প্রস্তাবের আসল উদ্দেশ্য ছিল যদি যুদ্ধবিরতি হয়ে যায়, তবে মুক্তিবাহিনী ও যৌথ বাহিনীর অগ্রগতি থেমে যাবে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হতে পারবে না। পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানে তার সামরিক দখল বজায় রাখার সুযোগ পাবে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিক 'ভেটো'
মার্কিন প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া হলে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি দেশের মধ্যে অধিকাংশ দেশ এর পক্ষে ভোট দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের পরম বন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR) এই মার্কিন চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেয়।
সোভিয়েত প্রতিনিধি ইয়াকভ মালিক (Yakov Malik) মার্কিন প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সরাসরি ‘ভেটো’ (Veto) প্রয়োগ করেন। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া দ্বিতীয় সোভিয়েত ভেটো। সোভিয়েত যুক্তি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও মানবিক:
"পূর্ব পাকিস্তানের মূল রাজনৈতিক সংকটের সমাধান না করে, অর্থাৎ সেখানকার জনপ্রতিনিধিদের (বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দল) হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং গণহত্যার বিচার না করে কেবল যুদ্ধবিরতি দিলেই শান্তি আসবে না। যুদ্ধ বিরতির আগে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের পরাধীনতা থেকে মুক্ত হতে হবে।"
চীনের অবস্থান ও কাউন্টার-ভেটো
সোভিয়েত ভেটোর পর রাশিয়া নিজেও নিরাপত্তা পরিষদে একটি বিকল্প খসড়া প্রস্তাব জমা দেয়। সোভিয়েত প্রস্তাবে বলা হয় পাকিস্তানে চলমান সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে এবং পূর্ব পাকিস্তান সংকটের একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।
কিন্তু চীনের প্রতিনিধি হুয়াং হুয়া (Huang Hua) সোভিয়েত প্রস্তাবে ক্ষিপ্ত হন এবং চীন তাতে ‘ভেটো’ প্রয়োগ করে। চীনের অভিযোগ ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের পক্ষ নিয়ে পাকিস্তানের 'অভ্যন্তরীণ বিষয়ে' অন্যায্য হস্তক্ষেপ করছে।
এই কূটনৈতিক দড়ি টানাটানির ফলে নিরাপত্তা পরিষদ স্থবির হয়ে পড়ে, যা মূলত যৌথ বাহিনীকে রণাঙ্গনে বাংলাদেশকে দ্রুত মুক্ত করার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান সময় এনে দেয়।
দর্শক সারিতে বাঙালির অভিভাবক: বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী
আন্তর্জাতিক কূটনীতির এই উত্তপ্ত দিনটিতে নিরাপত্তা পরিষদের দর্শক সারিতে নীরবে বসেছিলেন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।
তিনি জাতিসংঘ অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আকুল আবেদন জানান। যদিও পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের বাধার কারণে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাননি, কিন্তু বিশ্বমঞ্চে দর্শক সারিতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করেছিল বাঙালি জাতিকে আর কোনো শক্তি দাবিয়ে রাখতে পারবে না।
চূড়ান্ত স্বীকৃতির অপেক্ষা: প্রবাসী সরকার ও ভারতের বার্তা
রণাঙ্গনে জয় এবং জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব ভণ্ডুল হয়ে যাওয়ার পর ৫ই ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকারের (প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার) কূটনৈতিক কার্যক্রম এক তুঙ্গস্পর্শী স্তরে পৌঁছায়। বাংলাদেশ যে খুব দ্রুত একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে, তার আভাস বাতাসে ভাসছিল।
খন্দকার মোশতাকের ঘোষণা ও প্রবাসী সরকারের প্রস্তুতি
মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ ৫ই ডিসেম্বর মুক্তাঞ্চল পরিদর্শনকালে এবং পরবর্তীতে সাংবাদিকদের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময়ে অংশগ্রহণ করেন। দৈনিক যুগান্তর-এর ৬ই ডিসেম্বরের বিশেষ খবর অনুযায়ী, মোশতাক সাংবাদিকদের বলেন:
"ভারত যেকোনো মুহূর্তে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করবে। আমরা আশা করছি, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটবে। ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণেই ভারতের কাছ থেকে প্রথম স্বীকৃতি লাভ করা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।"
যদিও খন্দকার মোশতাক পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক চরম বিতর্কিত ও কলঙ্কিত ভূমিকা পালন করেছিলেন, তবে ১৯৭১ সালের ৫ই ডিসেম্বরের প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর এই বার্তাটি বিশ্ববাসীকে নিশ্চিত করেছিল যে, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্নতা এখন স্রেফ সময়ের ব্যাপার।
কে বি লালের ব্রিফিং ও ভারতের প্রশাসনিক অবস্থান
একই দিনে (৫ই ডিসেম্বর) নতুন দিল্লিতে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ভারতের প্রতিরক্ষা সচিব কে বি লাল (K. B. Lall) আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন।
সাংবাদিকরা যখন ভারত সরকারের তরফ থেকে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন কে বি লাল এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ভারত ইতোমধ্যেই বাংলাদেশকে একটি ‘স্বাধীন ও পৃথক সত্তা’ (Independent and Separate Entity) হিসেবে গণ্য করে তার সামরিক ও মানবিক সহায়তা পরিচালনা করছে। প্রশাসনিক কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া মাত্র, যা সঠিক সময়ে সম্পন্ন হবে।
বস্তুত, ৫ই ডিসেম্বরের এই কূটনৈতিক বৈঠকের ওপর ভিত্তি করেই পরের দিন, অর্থাৎ ৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী লোকসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন।
এক নজরে ১৯৭১ সালের ৫ই ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক মাইলফলক
নিচে ১৯৭১ সালের ৫ই ডিসেম্বরের সামরিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলীর একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সারসংক্ষেপ প্রদান করা হলো:
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: নির্দেশনামতে এটিই পুরো আর্টিকেলের একমাত্র ছক)
ক্ষেত্র / ফ্রন্ট | ৫ই ডিসেম্বর ১৯৭১-এর প্রধান ঘটনা | ঐতিহাসিক ও কৌশলগত তাৎপর্য |
দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গন | দর্শনা, কোটচাঁদপুর ও ঝিনাইদহ মুক্ত; সিডনি শনবার্গের পরিদর্শন। | যশোর সেনানিবাস অবরুদ্ধ; পাক ৯ নম্বর ডিভিশনের ঢাকা ও কুষ্টিয়ার সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন। |
পূর্বাঞ্চলীয় রণাঙ্গন | আখাউড়া, লাকসাম, মিয়াবাজার ও বকশিগঞ্জ শত্রু মুক্তকরণ। | ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-সিলেট রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস। |
আকাশপথ (PAF vs IAF) | কুর্মিটোলা ও তেজগাঁও বিমানঘাঁটি অচল; ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে আকাশ জয়। | পাকিস্তানি পদাতিক বাহিনী বিমান সহায়তা থেকে বঞ্চিত এবং মানসিকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত। |
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিক 'ভেটো'। | আন্তর্জাতিক স্তরে যুদ্ধ বিরতির চক্রান্ত নস্যাৎ; যৌথ বাহিনীর জন্য ঢাকা অভিযানের পথ সুগম। |
কূটনৈতিক অঙ্গন | ভারতের প্রতিরক্ষা সচিবের বার্তা ও খন্দকার মোশতাকের সংবাদ সম্মেলন। | পরের দিনই (৬ই ডিসেম্বর) ভারতের কাছ থেকে ঐতিহাসিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি অর্জনের ভিত্তি প্রস্তুত। |
বঙ্গোপসাগরে নৌ-অবরোধ ও পিএনএস গাজীর পতন
৫ই ডিসেম্বরের সামরিক সাফল্যের পেছনে স্থল ও আকাশপথের পাশাপাশি নৌবাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্যের বড় অবদান ছিল।
আইএনএস বিক্রান্তের (INS Vikrant) তাণ্ডব: ভারতীয় নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী ‘আইএনএস বিক্রান্ত’ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান নিয়ে ৪ ও ৫ই ডিসেম্বর থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও চালনা বন্দরে একযোগে ‘সি হপ’ (Sea Hawk) যুদ্ধবিমান দিয়ে বোমাবর্ষণ শুরু করে। এর ফলে সমুদ্রপথে পাকিস্তানি বাহিনীর পালিয়ে যাওয়া বা বাইরে থেকে রসদ পাওয়ার সমস্ত পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
পিএনএস গাজী (PNS Ghazi) সাবমেরিন ধ্বংস: পাকিস্তান নৌবাহিনীর একমাত্র দূরপাল্লার সাবমেরিন 'পিএনএস গাজী' ভারতীয় রণতরী বিক্রান্তকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে বঙ্গোপসাগরে এসেছিল। ৪ই ডিসেম্বর রাত ও ৫ই ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে ভারতের বিশাখাপত্তনম উপকূলের কাছে এটি রহস্যজনকভাবে ডুবে যায় (গভীর সমুদ্রে মাইন বিস্ফোরণ বা ভারতীয় রণতরী ‘রাজপুত’-এর চার্জে)। এটি ছিল পাকিস্তানের জন্য এক বিশাল বিপর্যয়, যা ৫ই ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের নৌ-প্রতিরক্ষাকে একেবারে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে।
সেক্টরভিত্তিক বিশেষ রণাঙ্গনের চিত্র (৫ই ডিসেম্বর)
হিলির যুদ্ধ ও উত্তরবঙ্গ ফ্রন্ট (সেক্টর ৬ ও ৭): মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী প্রথাগত যুদ্ধের একটি ছিল ‘হিলির যুদ্ধ’ (Battle of Hilli)। ৫ই ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর ২০ মাউন্টেন ডিভিশন হিলিতে পাকিস্তানি বাহিনীর শক্ত ঘাঁটি সরাসরি আক্রমণ না করে, চতুরতার সাথে তা বাইপাস করে ঘোড়াঘাট ও বগুড়ার দিকে অগ্রসর হয়। এতে হিলিতে আটকে পড়া পাকিস্তানি সেনারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বকশীগঞ্জ মুক্ত ও জামালপুর অভিমুখে অভিযান (সেক্টর ১১): ৫ই ডিসেম্বর যৌথ বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী ময়মনসিংহের বকশীগঞ্জ এলাকা সম্পূর্ণ মুক্ত করে। এখান থেকেই যৌথ বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার হারদেব সিং ক্লের পাকিস্তানি ৩৩১ ব্রিগেডের কমান্ডার লেফট্যানেন্ট কর্নেল সুলতান আহমেদের কাছে বিখ্যাত চিঠি পাঠিয়েছিলেন, যেখানে বলা হয়েছিল: “আমরা জামালপুর ঘিরে ফেলেছি, আত্মরক্ষা অসম্ভব। অনর্থক প্রাণ না দিয়ে আত্মসমর্পণ করো।”
লাকসাম-মুদাফফরগঞ্জের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ (সেক্টর ২): কুমিল্লা ও লাকসাম দখলের জন্য ৫ই ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর ২৩ মাউন্টেন ডিভিশন মুদাফফরগঞ্জে অবস্থান নেয়। লাকসামে অবস্থানরত পাকিস্তানি ৫৩ ব্রিগেডের সৈন্যরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং ঢাকায় পালিয়ে যাওয়ার শেষ পথটিও হারায়।
জেনারেল মানেকশর বার্তা ও লিফলেট ছিটানো
৫ই ডিসেম্বর থেকে ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশ (Sam Manekshaw) আকাশপথে মুক্তাঞ্চল ও দখলীকৃত এলাকাগুলোতে লাখ লাখ লিফলেট ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সাথে ‘আকাশবাণী’ রেডিও থেকে নিয়মিত বার্তা সম্প্রচার করা হতে থাকে।
"পাকিস্তানি জোয়ানরা! তোমাদের ওপর থেকে আকাশপথের সাপোর্ট শেষ। সমুদ্রেও তোমাদের পালানোর পথ নেই। মুক্তিবাহিনী তোমাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে। বেঁচে থাকতে চাইলে অস্ত্র সংবরণ করো, নয়তো নিশ্চিত মৃত্যু তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।"
এই বেতার বার্তা ও লিফলেট পাকিস্তানি সৈন্যদের মানসিকভাবে পুরো ভেঙে দিয়েছিল। ৫ই ডিসেম্বরের পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট দলে পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্র ফেলে পালাতে শুরু করে।
মার্কিন ৭ম নৌবহর ও চীন-মার্কিন গোপন হিসাব
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যখন ভেটো যুদ্ধ চলছিল, তখন ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে গোপন কূটনৈতিক চিঠি চালাচালি হচ্ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ৭ম নৌবহর (US 7th Fleet): প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জার বঙ্গোপসাগরের দিকে মার্কিন সপ্তম নৌবহর (Task Force 74 / USS Enterprise) পাঠানোর পরিকল্পনা ৫ই ডিসেম্বর থেকেই ত্বরান্বিত করেন, যাতে ভারত ও যৌথ বাহিনীর ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা যায়।
চীনের কৌশলগত নীরবতা: আমেরিকা আশা করেছিল চীন সীমান্তে সেনা বাড়িয়ে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। কিন্তু ৫ই ডিসেম্বরের গোপন নথিপত্র অনুযায়ী বেইজিং ভারতকে সরাসরি সামরিক উস্কানি দেওয়া থেকে বিরত থাকে, কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল যে উত্তরে বরফাবৃত হিমালয় টপকে যুদ্ধ শুরু করা অসম্ভব এবং সিয়াটো (SEATO) চুক্তি কার্যকর নয়।
বেসামরিক প্রশাসন ও 'জোনাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিল'
৫ই ডিসেম্বর যখন একের পর এক জেলা (যেমন চুয়াডাঙ্গা, যশোর, আখাউড়া ও মেহেরপুরের বিভিন্ন অংশ) মুক্ত হচ্ছিল, তখন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক জরুরি প্রশাসনিক রূপরেখা ঘোষণা করেন।
মুক্তাঞ্চলে প্রশাসন চালু: মুক্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা পুনর্বহাল, খাদ্য সরবরাহ এবং শরণার্থীদের স্বদেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসনের জন্য ৯টি ‘জোনাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিল’ (Zonal Administrative Councils)-কে পূর্ণ শক্তিতে কাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনা: মুক্ত হওয়া এলাকাগুলোতে পাকিস্তানি রূপীর বদলে সাময়িকভাবে সিল মেরে ব্যবহার এবং স্বাধীন বাংলাদেশের নিজস্ব ট্রেজারি ও ব্যাংক ব্যবস্থা চালু করার প্রাথমিক কাজ ৫ই ডিসেম্বর থেকেই শুরু হয়।
৫ই ডিসেম্বর থেকে ১৬ই ডিসেম্বর
১৯৭১ সালের ৫ই ডিসেম্বর ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অমলিন ও মহিমান্বিত অধ্যায়। এই একটি দিন পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, কীভাবে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা এবং সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ একসাথে মিলে একটি জাতিকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়।
৫ই ডিসেম্বরের সূর্য যখন অস্তমিত হচ্ছিল, তখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের এ দেশীয় দোসররা বুঝতে পেরেছিল, তাদের সাড়ে ২৩ বছরের শোষণ ও ৯ মাসের নির্মম গণহত্যার হিসাব চুকানোর দিন এসে গেছে। দর্শনার পরিত্যক্ত রেলস্টেশনের নীরবতা ভেঙে যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উঠেছিল, তা কেবল চুয়াডাঙ্গার সীমান্তেই থেমে থাকেনি; তা নিরাপত্তা পরিষদের দেয়াল ভেদ করে ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্ব মানচিত্রে।
যৌথ বাহিনীর মাইকে প্রচারিত ‘আত্মসমর্পণের আল্টিমেটাম’ ৫ই ডিসেম্বরেই পাকিস্তানি সৈন্যদের মনে যে ভীতির সঞ্চার করেছিল, তার চূড়ান্ত পরিণতি আমরা দেখতে পাই মাত্র ১১ দিন পর ১৬ই ডিসেম্বরে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। সেদিন জেনারেল নিয়াজীর ৯৩ হাজার সৈন্য নতশিরে অস্ত্র সমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
সুতরাং, ৫ই ডিসেম্বর কেবল একটি তারিখ নয়; এটি ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনের এক অনিবার্য ও ঐতিহাসিক মহাসন্ধিক্ষণ।





















