আল্লাহ কেন সবাইকে ধনী বানান না?

Dec 10, 2025

মানুষের চিরন্তন জিজ্ঞাসাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, যদি আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং দয়ালু হন, তবে কেন পৃথিবীতে এত বৈষম্য, এত অভাব? কেন তিনি সবাইকে ধনী করেন না? প্রায়শই আমরা দেখি, যে ব্যক্তি জীবনে চরম দারিদ্র্যের শিকার, সে আল্লাহর কাছে সামান্য সচ্ছলতা প্রার্থনা করে। আবার অনেকে মনে করেন, প্রাচুর্য পেলে জীবন হয়তো সরল হয়ে যেত। কিন্তু ইসলাম ধর্ম এবং এর আধ্যাত্মিক দর্শন বলে, রিজিক বা সম্পদ বণ্টনের এই বৈষম্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক মহৎ প্রজ্ঞা, এক নিগূঢ় পরীক্ষা এবং মানুষের ভালো-মন্দ সম্পর্কে স্রষ্টার পরিপূর্ণ জ্ঞান। আমাদের চাওয়া এবং আমাদের জন্য যা মঙ্গল, তার মধ্যে যে বিশাল পার্থক্য, সে বিষয়েই আলোকপাত করে এই প্রবন্ধ।

ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা ও মানুষের সীমাবদ্ধ দৃষ্টি

আমরা মানুষ হিসেবে আমাদের বর্তমান অভাব এবং আকাঙ্ক্ষা দ্বারা চালিত হই। আমাদের দৃষ্টি সবসময় সীমাবদ্ধ। আমরা মনে করি, সম্পদ বা প্রাচুর্য পেলেই আমাদের সমস্ত সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, যিনি আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখেন, তিনি জানেন অঢেল সম্পদ অনেক সময় মানুষের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে আসে।

এই সত্যটি উপলব্ধি করতে হলে আমরা প্রথমে সেই ঐতিহাসিক ঘটনাটি স্মরণ করতে পারি, যেখানে হযরত মুসা (আ.) স্বয়ং আল্লাহর কাছে এক দরিদ্র ব্যক্তির জন্য সচ্ছলতার দোয়া করেছিলেন।

হযরত মুসা (আ.) এবং দরিদ্রের আরজি

হযরত মুসা (আ.) ছিলেন আল্লাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নবী। তাঁর মতো নবী যখন কারো জন্য দোয়া করেন, তখন তা কবুল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এই ঘটনাটি আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর প্রজ্ঞা নবীর মানবিক আবেগের চেয়েও বহুগুণ বেশি গভীর।

একবার হযরত মুসা (আ.) এক রাস্তার পাশ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। তিনি দেখতে পান, অত্যন্ত দরিদ্র এক ব্যক্তি বালির ভেতরে শরীর ডুবিয়ে বসে আছে। তার গায়ে কোনো কাপড় নেই, লজ্জায় সে বালু দিয়ে শরীর ঢেকে রেখেছে।

দোয়ার আবেদন: লোকটি হযরত মুসা (আ.)-কে দেখে আর্তনাদ করে বলল, “হে আল্লাহর নবী! আমার জন্য একটু দোয়া করুন। আল্লাহ যেন আমাকে অন্তত বেঁচে থাকার মতো সামান্য কিছু রিযিক দান করেন। অভাবের তাড়নায় আমি আর বাঁচতে পারছি না।”

নবীর দয়া ও দোয়া: ফকিরের করুণ অবস্থা দেখে হযরত মুসা (আ.)-এর দয়া হলো। তিনি আল্লাহর কাছে লোকটির সচ্ছলতার জন্য দোয়া করলেন এবং চলে গেলেন। আল্লাহর নবীর দোয়াও কবুল হলো।

সচ্ছলতা নয়, বিপর্যয়

কিছুদিন পর মুসা (আ.) সেই পথ দিয়ে ফিরছিলেন। তিনি দেখলেন, রাস্তায় বিশাল জটলা। অনেক মানুষ ভিড় করে আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এখানে কী হয়েছে? এত ভিড় কেন?”

চূড়ান্ত পরিণতি: লোকেরা জানাল, "কিছুদিন আগে যে ভিক্ষুকটি বালির নিচে শরীর ঢেকে পড়ে থাকত, সে হঠাৎ কিছু সম্পদ পেয়েছিল। টাকা পেয়ে সে মদ খেয়ে মাতাল হয়েছে। এরপর মাতলামি করতে গিয়ে ঝগড়া করে এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। এখন তার 'কিসাস' বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রস্তুতি চলছে।”

আল্লাহর প্রজ্ঞার স্বীকারোক্তি

মুসা (আ.) তৎক্ষণাৎ আল্লাহর প্রজ্ঞার স্বীকারোক্তি দিলেন এবং নিজের আবদারের জন্য ইস্তিগফার করলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, সামান্য সচ্ছলতা এই লোকটির জীবন বাঁচানোর পরিবর্তে, তাকে চূড়ান্ত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আল্লাহ তাঁর জন্য দারিদ্র্য নির্ধারণ করে তাকে হয়তো দুনিয়া ও আখিরাতের বড় শাস্তি থেকে রক্ষা করেছিলেন।

কুরআন ও দর্শনের প্রজ্ঞা - প্রাচুর্য কেন বিপর্যয় ডেকে আনে?

হযরত মুসা (আ.)-এর এই ঘটনাটি পবিত্র কুরআনের একটি মৌলিক শিক্ষা এবং বিভিন্ন দার্শনিকের উপমার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।

আল্লাহ তা’আলা নিজেই তাঁর রিজিক বণ্টনের প্রজ্ঞা সম্পর্কে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। সূরা আশ-শূরা (৪২) এর ২৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

وَلَوْ بَسَطَ اللَّهُ الرِّزْقَ لِعِبَادِهِ لَبَغَوْا فِي الْأَرْضِ وَلَٰكِن يُنَزِّلُ بِقَدَرٍ مَّا يَشَاءُ ۚ إِنَّهُ بِعِبَادِهِ خَبِيرٌ بَصِيرٌ

“যদি আল্লাহ তাঁর সব বান্দাকে অঢেল রিযিক দিতেন, তবে তারা অবশ্যই পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত। বরং তিনি যা চান, সেই পরিমাণেই তা অবতীর্ণ করেন। নিশ্চয়ই তিনি তাঁর বান্দাদের ব্যাপারে সবিশেষ অবহিত ও দ্রষ্টা।” (সূরা শুরা: ২৭)

ব্যাখ্যা: এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে বলেছেন, অঢেল সম্পদ পেলে বান্দারা কৃতজ্ঞ হওয়ার পরিবর্তে অহংকারী হয়ে ওঠে এবং পৃথিবীতে জুলুম, অত্যাচার ও সীমালঙ্ঘন করে। তাই তিনি মানুষের সহ্য ক্ষমতা ও মানসিকতার ভিত্তিতে রিজিক সীমিত করে দেন।

শেখ সাদী (রহ.)-এর দার্শনিক উপমা

আল্লামা শেখ সাদী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'গুলিস্তাঁ' বা 'বুস্তাঁ'-তে এই বিষয়টি বোঝানোর জন্য কিছু চমৎকার উপমা ব্যবহার করেছেন:

১. বিড়ালের উপমা: “বেচারা বিড়ালের যদি ডানা থাকত, তবে সে দুনিয়া থেকে সব চড়ুই পাখির বংশ শেষ করে দিত।”

তাৎপর্য: অর্থাৎ, দুর্বল বা অসৎ প্রকৃতির মানুষ যখন অপ্রত্যাশিতভাবে ক্ষমতা বা প্রাচুর্য লাভ করে, তখন তারা অত্যাচারী ও ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে।

২. প্লেটোর উপমা: প্লাটো (আফলাতুন) বলেছেন: “পিঁপড়ার পাখা না থাকাই ভালো। কারণ পাখা গজালে সে উড়ে বেড়াবে এবং নিজের ধ্বংস ডেকে আনবে।”

তাৎপর্য: কিছু মানুষের জন্য সীমিত জীবন বা সীমিত সম্পদই নিরাপদ। উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের অতিরিক্ত সুযোগ অনেক সময় মানুষের সর্বনাশ ডেকে আনে।

পিতার মধু ও জ্বরের রোগীর উপমা: বাবার কাছে অনেক মধু আছে, কিন্তু তিনি জ্বরে আক্রান্ত ছেলেকে তা খেতে দেন না। কারণ তিনি জানেন, মধু মিষ্টি হলেও জ্বরের রোগীর জন্য (শরীরে গরমের তাপমাত্রা বেশি থাকলে) তা ক্ষতিকর।

তাৎপর্য: যিনি তোমাকে ধনী করেননি, তিনি তোমার ভালো-মন্দ তোমার চেয়ে বেশি জানেন। আল্লাহ জানেন, কার জন্য সম্পদ বিষতুল্য হতে পারে।

রিজিক বণ্টনের মূলনীতি - পরীক্ষা ও ভারসাম্য

আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টির মধ্যে রিজিক বণ্টনে যে বৈষম্য রেখেছেন, তা এক উদ্দেশ্যমূলক ব্যবস্থা। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানুষের ঈমান পরীক্ষা করা এবং পৃথিবীতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।

ঈমানের পরীক্ষা

দারিদ্র্য যেমন একটি পরীক্ষা, তেমনি প্রাচুর্যও একটি কঠিন পরীক্ষা।

ধনীর পরীক্ষা: ধনীকে পরীক্ষা করা হয় সে এই সম্পদ আল্লাহর পথে খরচ করে কৃতজ্ঞ হয়, নাকি কৃপণতা, অহংকার ও ভোগ-বিলাসে ডুবে যায়।

দরিদ্রের পরীক্ষা: দরিদ্রকে পরীক্ষা করা হয় সে অভাবের মধ্যেও ধৈর্য, আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) এবং ঈমানের ওপর অটল থাকে, নাকি হতাশাগ্রস্ত হয়ে হারাম পথে পা বাড়ায়।

সমাজের ভারসাম্য (Socio-Economic Balance)

যদি সবাই ধনী হয়ে যেত, তবে সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। কেউ কারো কাজ করতে চাইত না, ফলে সমাজের ভিত্তি ভেঙে পড়ত।

কর্ম বিভাজন: সূরা যুখরুফ (৪৩) এর ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “আমরা তাদের মধ্যে পার্থিব জীবনে জীবিকা বণ্টন করে দিয়েছি এবং একজনকে অপরের ওপর মর্যাদায় উন্নীত করেছি, যাতে একে অপরকে দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে।”

সহযোগিতার বন্ধন: এই বৈষম্যই সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতা তৈরি করে। ধনীরা শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল, আবার শ্রমিকরা ধনীদের কাজের ওপর নির্ভরশীল। এভাবে পুরো সমাজ একটি সুসংগঠিত চেইনের মাধ্যমে টিকে থাকে।

মানব মনের দুর্বলতা

যদি মানুষের সব চাহিদা পূরণ হয়ে যেত, তবে মানুষ সহজে আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য থেকে দূরে সরে যেত। সম্পদ পেলে মানুষ সাধারণত আরও বেশি পার্থিব ভোগের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আল্লাহ তাঁর বান্দাকে দুনিয়ার ভোগ থেকে মুক্ত করে আখিরাতের দিকে মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করেন।

সচ্ছলতা ও প্রাচুর্যের ইসলামী সংজ্ঞা

ইসলামে সচ্ছলতা মানে কেবল অঢেল টাকা নয়। একজন মুসলিমের কাছে সত্যিকারের ধনী সে, যে:

মনের ধনী (Richness of the Soul)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “ধনী হওয়ার অর্থ প্রচুর সম্পদ হওয়া নয়, বরং আসল ধনী তো সে, যার মন ধনী।” (সহীহ বুখারী, কিতাবুর রিকাক) অর্থাৎ, যে অল্পতে সন্তুষ্ট থাকতে পারে এবং আল্লাহর দেওয়া রিজিকের জন্য কৃতজ্ঞ, সেই প্রকৃতপক্ষে ধনী।

বরকতময় রিজিক

ইসলামে রিজিকের পরিমাণ নয়, বরং বরকত (Blessing) বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কম সম্পদে যদি শান্তি, স্বাস্থ্য এবং নেক কাজে খরচ করার সুযোগ থাকে, তবে তা অঢেল সম্পদ থেকেও উত্তম, যা কেবল অশান্তি ও গুনাহ বয়ে আনে।

আল্লাহর সিদ্ধান্তে আস্থা ও তাওয়াক্কুল

আল্লাহ কেন সবাইকে ধনী বানান না - এই প্রশ্নের উত্তর মূলত একটি মৌলিক উপলব্ধির দিকে আমাদের নিয়ে যায়: আল্লাহ তোমার ভালো-মন্দ তোমার চেয়েও বেশি জানেন।

সর্বোত্তম ব্যবস্থা: রিজিক বণ্টনে আল্লাহর ব্যবস্থা হলো সর্বোত্তম এবং ন্যায়সঙ্গত। তিনি যা আমাদের দিয়েছেন, তা আমাদের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।

তাওয়াক্কুল: আমাদের কাজ হলো হালাল পথে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা, আল্লাহর কাছে দুআ করা এবং ফলাফলের জন্য তাঁর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা (তাওয়াক্কুল)।

অন্তরের শান্তি: আমরা যেন প্রাচুর্যের নেশায় আত্মহারা না হই বা দারিদ্র্যের হতাশায় নিমজ্জিত না হই। আমাদের অন্তরের শান্তি এবং ঈমানের অবিচলতা যেন সম্পদ বা অভাব দ্বারা প্রভাবিত না হয়, এটাই রিজিক বণ্টনের ঐশ্বরিক পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য।

অতএব, ধনী না হওয়ার কারণে আমাদের হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং আমাদের ভাবা উচিত, এই সীমিত রিজিকের মাধ্যমেই আল্লাহ হয়তো আমাদের বড় কোনো বিপদ বা ধ্বংস থেকে রক্ষা করেছেন। আল্লাহর সিদ্ধান্তে আস্থা রাখাই একজন মুমিনের প্রধান কর্তব্য।

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.