স্ত্রী যখন স্বামীর রিজিকের চাবিকাঠি ও সংসারের বরকত

পরিবার হলো মানব সমাজের মৌলিক ভিত্তি, আর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সেই ভিত্তির মূল স্তম্ভ। ইসলামে এই সম্পর্ককে কেবল একটি আইনি বা সামাজিক চুক্তি হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটিকে দেখা হয় মানসিক শান্তি, পারস্পরিক ভালোবাসা এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির এক শাশ্বত পথ হিসেবে। একটি পরিবারে স্বামী যেমন বহিরাঙ্গনের চালিকাশক্তি ও দায়িত্বশীল অভিভাবক, স্ত্রী তেমনি সেই কাঠামোর অভ্যন্তরীণ প্রাণকেন্দ্র।
ইসলামী জীবনদর্শনে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর সত্য বিদ্যমান: স্ত্রীর ধার্মিকতা, আমল, মানসিক অবস্থা এবং আচরণ সরাসরি তার স্বামীর রুজি-রোজগার, ঘরের বরকত ও সামগ্রিক ভাগ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
ইসলামের মহান মনীষীগণ এবং শরিয়তের গভীর গবেষকগণ পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকেই এই সত্যটি প্রচ্ছন্নভাবে তুলে ধরেছেন যে “স্ত্রীর সুন্দর আচরণ ও নেক আমলের কারণে আল্লাহ স্বামীর সম্পদ ও বরকত বাড়িয়ে দেন, আবার স্ত্রীর অকৃতজ্ঞতা ও গুনাহের কারণে আল্লাহ সংসারকে অভাব-অনটনের দিকে ঠেলে দেন।”
আজকের এই বিস্তারিত ও তাত্ত্বিক প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করব কীভাবে একজন স্ত্রীর আমল, পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিক প্রচেষ্টা তাদের সাংসারিক জীবনে আল্লাহর রহমত, রিজিক ও বরকত এনে দেয়, এবং এর বিপরীত চিত্রটি কীভাবে একটি সচ্ছল সংসারকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে ইসলামে কেবল ইহকালীন জৈবিক ও বস্তুগত বন্ধন হিসেবে গণ্য করা হয়নি, বরং এটিকে পরকালের জান্নাতী পাথেয় হিসেবেও দেখা হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এই সম্পর্কের মূল সুর বেঁধে দিয়েছেন এক অপূর্ব বাণীর মাধ্যমে:
“আর তাঁর নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের স্ত্রীদের, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে সে সব লোকের জন্য, যারা চিন্তা করে।” (সূরা রুম, ৩০:২১)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তিনটি মূল উপাদানের কথা বলেছেন: প্রশান্তি (সাকিনাহ), ভালোবাসা (মাওয়াদ্দাহ) এবং দয়া (রাহমাহ)।
মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই তিনটি উপাদানই একটি সংসারের অদৃশ্য চালিকাশক্তি যা সরাসরি রিজিকের বরকত নিশ্চিত করে। যখন একটি ঘরে এই উপাদানগুলো সচল থাকে, তখন সেই ঘরের পুরুষটি মানসিকভাবে সুস্থ ও উদ্যমী থাকেন। আর এই বরকতকে ধরে রাখার ও ঘরে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে স্ত্রীর আমল ও ধার্মিকতা এক অব্যর্থ চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে।
স্ত্রীর আমল ও রিজিকের বরকত - কুরআন ও হাদিসের আলো
ইসলামী জীবনদর্শন অনুযায়ী, ‘রিজিক’ বা জীবিকা মানে শুধু পকেটে থাকা বা ব্যাংকে জমে থাকা কিছু কাগজের নোট বা অর্থনৈতিক সচ্ছলতা নয়। রিজিক হলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রাপ্ত আল্লাহর সার্বিক অনুগ্রহ যার মধ্যে রয়েছে সুস্বাস্থ্য, মানসিক শান্তি, নেক সন্তান এবং অল্পে সন্তুষ্ট থাকার ক্ষমতা। যখন কোনো পরিবারে ধার্মিকতার পরিবেশ থাকে, তখন আল্লাহর বরকত স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই দিকে ধাবিত হয়।
ঘরে কুরআন তেলাওয়াত ও ঐশ্বরিক আলোর প্রবেশ
একটি ঘরে স্ত্রী যখন নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করেন, তখন তার প্রভাব কেবল তাঁর নিজস্ব আমলনামার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা পুরো ঘরের পরিবেশকে আমূল বদলে দেয়।
রহমতের ফেরেশতাদের আগমন: হাদিস শরিফে এসেছে, যে ঘরে নিয়মিত পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করা হয়, সেই ঘরে আল্লাহর রহমতের ফেরেশতারা দলে দলে প্রবেশ করেন এবং শয়তান ও সমস্ত ক্ষতিকর অপশক্তি দূর হয়ে যায়।
স্বামীর উপার্জনে বরকতের প্রতিফলন: ফেরেশতাদের উপস্থিতি সেই ঘরে এক পবিত্র ও ইতিবাচক শক্তি তৈরি করে। এর ফলে স্বামীর রুজি-রোজগারে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়। সামান্য উপার্জনেই পরিবারে অভাবনীয় সচ্ছলতা দেখা দেয়, অপ্রয়োজনীয় মেডিকেল খরচ বা আকস্মিক আর্থিক ক্ষতি থেকে পরিবার রক্ষা পায় এবং অল্পতেই মনের অভাববোধ দূর হয়।
জিকির-আসগার, তসবিহ-তাহলিল এবং মানসিক সুকুন
রসূলুল্লাহ (ﷺ) নেককার স্ত্রীর গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ধার্মিক স্ত্রী মূলত স্বামীর জন্য ইহকালের সবচেয়ে বড় সম্পদ। স্ত্রী যখন জিকির-আসগারের মাধ্যমে নিজের জিহ্বাকে আর্দ্র রাখেন, তখন তাঁর অন্তর এক স্বর্গীয় প্রশান্তিতে ভরে ওঠে।
স্বামীকে অনন্য মানসিক সমর্থন: একজন জিকিরকারী স্ত্রী ঘরের ছোটখাটো অভাব-অনটন বা সংকটে বিচলিত হন না, বরং ধৈর্য ও সবরের সঙ্গে তা মোকাবিলা করেন। স্বামী যখন সারাদিন বাইরে কঠোর পরিশ্রম ও মানসিক চাপ সহ্য করে ঘরে ফেরেন, তখন স্ত্রীর এই শান্ত ও স্মিত মুখ তাঁর সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দেয়। এই মানসিক স্বস্তি স্বামীকে পরবর্তী দিনে আরও দ্বিগুণ উদ্দীপনায় হালাল উপার্জনে মনোযোগ দিতে সাহায্য করে।
তাওয়াক্কুলের শক্তি: জিকিরকারী স্ত্রীর আল্লাহর ওপর ‘তাওয়াক্কুল’ বা ভরসা থাকে অত্যন্ত মজবুত। তিনি জানেন, তাঁর স্বামী কেবল উপার্জনের উসিলা মাত্র, প্রকৃত রিজিকদাতা স্বয়ং আল্লাহ। স্ত্রীর এই গভীর বিশ্বাস স্বামীর মনেও সততা ও আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়।
ইস্তেগফার ও গুনাহের ক্ষমা প্রার্থনা: রিজিকের প্রধান চাবিকাঠি
স্ত্রীর নিয়মিত ইস্তেগফার (আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা) কেবল তাঁর নিজের আত্মশুদ্ধি ঘটায় না, বরং পুরো পরিবারের ওপর আল্লাহর রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ করে। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ইস্তেগফার হলো সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আর আমি বললাম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয় তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, আর তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য জান্নাতের বাগান ও নহর তৈরি করে দেবেন।” (সূরা নূহ, ৭১:১০-১২)
যখন কোনো ঘরের নারী প্রতিনিয়ত আস্তাগফিরুল্লাহ পাঠ করেন, তখন সেই ঘরের ওপর থেকে আল্লাহর গজব ও অর্থনৈতিক সংকটের মেঘ কেটে যায়।
স্ত্রীর নেতিবাচক আচরণ - রিজিক ও বরকত কমে যাওয়ার মূল কারণ
ইসলামে যেমন নেককার স্ত্রীর সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে, তেমনি সতর্ক বার্তাও দেওয়া হয়েছে যে, স্ত্রীর ভুল আচরণ, অসততা বা অকৃতজ্ঞতার কারণে একটি সুসংগঠিত পরিবারও ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে, যা আধ্যাত্মিক ও জাগতিকভাবে স্বামীকে ‘ফকির’ বা নিঃস্ব বানানোর জন্য যথেষ্ট।
না-শোকরি বা অকৃতজ্ঞতার মারাত্মক পরিণাম
যে স্ত্রী আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করেন না এবং স্বামীর সামর্থ্য ও ভালোবাসার মূল্যায়ন করেন না, তিনি মূলত আল্লাহর অনুগ্রহের অবমাননা করেন।
হাদিসের কঠোর হুঁশিয়ারি: মিরাজের রাতে নবীজি (ﷺ) যখন জাহান্নাম পরিদর্শন করেন, তখন তিনি সেখানে নারীদের আধিক্য দেখতে পান। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তারা স্বামীর প্রতি চরম অকৃতজ্ঞ হয় এবং অল্পতে সন্তুষ্ট হতে পারে না।
বরকত উঠে যাওয়া: স্ত্রী যদি সবসময় স্বামীর উপার্জন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং অন্যের বিলাসী জীবনের সঙ্গে তুলনা করে স্বামীকে ছোট করেন, তবে আল্লাহ সেই সংসার থেকে মানসিক ও আর্থিক বরকত পুরোপুরি তুলে নেন। এমন সংসারে স্বামীর উপার্জন কোটি টাকা হলেও দিনশেষে ঋণ, অসন্তোষ ও অভাব লেগেই থাকে।
অপব্যয়, অপচয় এবং সামাজিক দেখনদারি
হালাল উপার্জনের বরকত নষ্ট হওয়ার অন্যতম বড় কারণ হলো অপব্যয় বা অপচয় (Israf)। ইসলামে অপব্যয়কারীকে শয়তানের ভাই বলে গণ্য করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক ভিত্তির বিনাশ: স্ত্রী যদি সংসার পরিচালনায় মিতব্যয়ী বা হিসেবি না হন, এবং কেবল সামাজিক দেখনদারি বা ট্রেন্ডের পেছনে দৌড়ে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা, পোশাক ও প্রসাধনীতে অর্থ অপচয় করেন, তবে স্বামীর রোজগার কখনোই পরিবারে স্থায়িত্ব আনতে পারে না।
হারাম উপার্জনের প্ররোচনা: স্ত্রীর এই অন্তহীন চাহিদা ও অপব্যয়ী স্বভাব স্বামীর ওপর এক ধরণের মানসিক ও ঋণের চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেক সময় সৎ স্বামীও বাধ্য হয়ে ঘুষ, দুর্নীতি বা অন্য কোনো হারাম পন্থায় অর্থ উপার্জনের অন্ধকার পথে পা বাড়ান।
অসততা ও হারাম কাজে পরোক্ষ সমর্থন
একটি আদর্শ পরিবারে স্ত্রী হলেন স্বামীর নৈতিকতার পাহারাদার। কিন্তু স্ত্রী যদি নিজেই অসৎ মানসিকতার হন কিংবা স্বামীর হারাম উপার্জনের অর্থ দেখে খুশি হন এবং আরও বেশি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় স্বামীকে উৎসাহিত করেন, তবে সেই সংসার থেকে আল্লাহর রহমত চিরতরে বিদায় নেয়। নবীজি (ﷺ) বলেছেন, হারাম উপার্জনে গড়ে ওঠা শরীর জান্নাতে প্রবেশ করবে না। স্ত্রীর এই অনৈতিক সমর্থন পুরো পরিবারের ইহকাল ও পরকালকে একযোগে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
এক নজরে স্ত্রীর আচরণ, আমল এবং পারিবারিক রিজিকের ওপর তার প্রভাব
সংসারে বরকত আসা বা চলে যাওয়ার পেছনে স্ত্রীর আমল ও আচরণের যে প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে, তা সহজে বোঝার সুবিধার্থে নিচে একটি তথ্যবহুল টেবিল দেওয়া হলো:
স্ত্রীর আমল ও আচরণ | আধ্যাত্মিক ও মানসিক প্রভাব | রিজিক ও বরকতের ওপর ফলাফল | সংশ্লিষ্ট কুরআন/হাদিসের ইঙ্গিত |
নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত ও সালাত | ঘরে রহমতের ফেরেশতাদের আগমন ঘটে, শয়তান বিতাড়িত হয়। | উপার্জনে বরকত আসে, অপ্রয়োজনীয় ও আকস্মিক ক্ষতি থেকে রক্ষা মেলে। | হাদিস: "যে ঘরে কুরআন পড়া হয়, তার কল্যাণ বৃদ্ধি পায়।" |
অধিক পরিমাণে ইস্তেগফার করা | পরিবারের সামগ্রিক গুনাহ মোচন হয় ও আল্লাহর সন্তুষ্টি আসে। | আসমান ও জমিনের বরকতের দরজা খুলে যায়, অভাব দূর হয়। | সূরা নূহ, আয়াত: ১০-১২ (ধন-সম্পদ বৃদ্ধির ঘোষণা) |
স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অল্পে তুষ্টি | ঘরে মানসিক শান্তি ও সাকিনাহ (প্রশান্তি) বিরাজ করে। | আল্লাহ নেয়ামত আরও বাড়িয়ে দেন এবং অভাবমুক্ত অন্তর দান করেন। | সূরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৭ ("শুকরিয়া আদায় করলে বাড়িয়ে দেব") |
অকৃতজ্ঞতা ও প্রতিনিয়ত অসন্তোষ | ঘরে নেতিবাচক শক্তির সৃষ্টি হয়, স্বামীর কাজের উদ্যম নষ্ট হয়। | উপার্জনের বরকত পুরোপুরি উঠে যায়, ঋণ ও অভাব স্থায়ী হয়। | হাদিস: "জাহান্নামের অধিকাংশ নারী স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞ।" |
অপব্যয়, অপচয় ও বিলাসিতা | সংসারে ঋণের বোঝা বাড়ে, শয়তানের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। | হালাল উপার্জন দ্রুত শেষ হয়ে যায়, সঞ্চয় ও স্থায়িত্ব থাকে না। | সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ২৭ ("অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই") |
হারাম উপার্জনে প্ররোচনা/চাপ | ঘরের পবিত্রতা নষ্ট হয়, সন্তানদের ওপর কালো ছায়া পড়ে। | সাময়িক অর্থ বাড়লেও ইহকালীন অশান্তি ও পরকালীন ধ্বংস নিশ্চিত হয়। | হাদিস: "হারাম রক্ত ও মাংসে গঠিত শরীর জান্নাতে যাবে না।" |
ভারসাম্যপূর্ণ জীবন - ধার্মিকতা ও পারস্পরিক দায়িত্বের সমন্বয়
স্ত্রীর আমলের কারণে স্বামীর রিজিক বাড়ে বা কমে এই বক্তব্যের অর্থ কিন্তু এই নয় যে স্বামী নিজে হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন কিংবা নিজের সমস্ত ব্যর্থতার দায় স্ত্রীর ওপর চাপিয়ে দেবেন। ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যেখানে স্বামী-স্ত্রী উভয়ই একে অপরের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক পার্টনার।
সালিহা বা নেককার স্ত্রীর মৌলিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
ইসলামী শরিয়তে ‘সালিহা’ বা আদর্শ স্ত্রীর কিছু অনন্য গুণের কথা বলা হয়েছে, যা একটি জলজ্যান্ত সংসারকে জান্নাতের টুকরোয় পরিণত করতে পারে:
আল্লাহভীতি (Taqwa): যিনি লোকচক্ষুর অন্তরালেও আল্লাহকে ভয় করেন এবং নিজের ইবাদতে কোনো কমতি রাখেন না।
বৈধ আনুগত্য: যিনি স্বামীর শরিয়তসম্মত এবং যৌক্তিক নির্দেশনাবলী আনন্দের সঙ্গে মেনে নেন এবং স্বামীর অবর্তমানে নিজের সতীত্ব ও স্বামীর আমানত (সম্পদ ও সন্তান) রক্ষা করেন।
কানা'আত বা অল্পে সন্তুষ্টি: যিনি স্বামীর আর্থিক অবস্থা বোঝেন এবং তার সাধ ও সাধ্যের বাইরে অতিরিক্ত চাহিদার বোঝা চাপিয়ে দেন না।
কল্যাণময়ী সহযোদ্ধা: যিনি স্বামীকে দ্বীনের পথে চলতে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করতে এবং কর্মক্ষেত্রে শতভাগ হালাল উপার্জন বজায় রাখতে প্রতিনিয়ত উদ্বুদ্ধ করেন।
স্বামী ও স্ত্রীর পারস্পরিক পরিপূরক ভূমিকা
স্বামীর প্রধান দায়িত্ব: স্বামীকে মনে রাখতে হবে, স্ত্রীর কাছ থেকে নেক আমল ও সুন্দর আচরণ আশা করার আগে তাকে নিজের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করতে হবে। স্ত্রীকে হালাল রিজিক খাওয়ানো, তাকে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া এবং ঘরের ভেতরে তার প্রতি দয়া ও কোমলতা প্রদর্শন করা স্বামীর প্রধান কাজ।
স্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব: স্ত্রীকে বুঝতে হবে যে, তার ঘরটি কেবল একটি থাকার জায়গা নয়, এটি একটি ইবাদতখানা। তার ভেতরের আমল, ধৈর্য, মুখের মিষ্টি কথা এবং মিতব্যয়িতাই স্বামীর উপার্জিত হালাল টাকাকে এক বিশাল সম্পদে রূপান্তর করার অদৃশ্য শক্তি।
আধুনিক জীবনে পারিবারিক বরকত ধরে রাখার বাস্তবমুখী কৌশল
আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল, অতি-ভোক্তাবাদী এবং সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে যেখানে মানসিক চাপ অনেক বেশি, সেখানে সংসারে আল্লাহর রহমত ও বরকত ধরে রাখতে আধ্যাত্মিক আমলের পাশাপাশি কিছু বাস্তবসম্মত কৌশল অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি:
পারিবারিক ইবাদতের রুটিন তৈরি করা
প্রতিদিন সকালবেলা ফজর নামাজের পর কিংবা সন্ধ্যার সময় স্বামী-স্ত্রী দুজনে একসাথে অন্তত ১০-১৫ মিনিটের জন্য বসা উচিত। এই সময়ে দুজনে মিলে কুরআনের একটি আয়াত অর্থসহ পড়া, কোনো শিক্ষণীয় হাদিস পাঠ করা কিংবা সম্মিলিতভাবে ইস্তেগফার ও দরুদ শরিফ পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। এটি ঘরের ভেতরের সমস্ত নেতিবাচক এনার্জি দূর করে দেয়।
দৈনিক সাদকা বা দানের অভ্যাস
সাদকা বা দান হলো এমন এক আমল যা আল্লাহর রাগকে ঠান্ডা করে এবং রিজিককে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ঘরের নারীরা প্রতিদিন রান্নার সময় বা সকালের শুরুতে একটি নির্দিষ্ট পাত্রে সামান্য কিছু টাকা বা চাল আলাদা করে রাখতে পারেন, যা মাস শেষে কোনো এতিম বা অভাবী মানুষকে দেওয়া হবে। এই ক্ষুদ্র আমলটি পরিবারকে বড় বড় দুর্ঘটনা ও আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে।
সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম জগৎ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা
আজকের দিনে অনেক সংসারে অশান্তির মূল কারণ হলো সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের কৃত্রিম সুখী জীবন বা বিলাসী লাইফস্টাইল দেখা। স্ত্রীদের উচিত এই ধরণের অমূলক তুলনা থেকে নিজেকে দূরে রাখা। নিজের যা আছে, তা নিয়েই আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা।
পরিকল্পিত বাজেট ও ঋনমুক্ত জীবন
সংসার পরিচালনায় স্বামী-স্ত্রী যৌথভাবে একটি বাজেট প্রণয়ন করবেন। আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ প্রথমেই সঞ্চয় বা আপদকালীন তহবিলের জন্য রেখে, বাকি অংশের মধ্যে অত্যন্ত মিতব্যয়িতার সঙ্গে সংসার চালাতে হবে। ক্রেডিট কার্ড বা সুদের ঋণের ফাঁদ থেকে নিজেদের পুরোপুরি মুক্ত রাখা বরকতের অন্যতম প্রধান শর্ত।
দাম্পত্য জীবন এক মহিমান্বিত ইবাদত
ইসলামের দৃষ্টিতে দাম্পত্য জীবন নিছক একটি সামাজিক বা জৈবিক বন্ধন নয়, বরং এটি আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক মহিমান্বিত ইবাদত। এই পবিত্র সম্পর্কের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি ত্যাগ এবং প্রতিটি মিষ্টি কথার ওপর মহান আল্লাহর বিশেষ দৃষ্টি থাকে।
স্ত্রীর কারণে আল্লাহ স্বামীকে ধনী বা সচ্ছল বানিয়ে দেন, আবার স্ত্রীর কর্মের কারণে সংসারকে অভাবের মুখোমুখি করেন এই গভীর প্রবচনটি আমাদের প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি সফল ও বরকতময় সংসার গড়ে তোলার পেছনে নারীর ভূমিকা কতখানি অনস্বীকার্য। স্ত্রীর ইবাদত, আমল, তসবিহ, মুখের মিষ্টি ভাষা এবং ঘরের ভেতরের পবিত্রতাই হলো সেই অদৃশ্য চুম্বক, যা দূর থেকে আল্লাহর রহমত ও হালাল রিজিককে ঘরের দিকে টেনে আনে।
সুতরাং, শুধু স্বামী একাকী উপার্জনের জন্য দৌড়াবেন না, বরং স্ত্রীও যখন ঘরে বসে নিজের আমল, ধৈর্য ও তাকওয়ার মাধ্যমে তার সহযোদ্ধা হবেন, তখনই পুরো পরিবার আল্লাহর রহমতের শীতল ছায়ায় আশ্রয় পাবে। সেই পরিবারই পৃথিবীর বুকে সত্যিকারের ধনী ও সফল যা পার্থিব স্বস্তি ও পরকালীন মুক্তি উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই অনন্য। মহান আল্লাহ আমাদের প্রতিটি মুসলিম পরিবারকে নেক আমল ও বরকতের চাদরে আবৃত রাখুন। আমীন।





















