বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ১০ শহরে আছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা

বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ১০ শহরে আছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা

আপনি কি কখনো এমন কোনো শহরের কথা কল্পনা করেছেন, যেখানে মধ্যরাতেও শুনশান রাজপথে মানিব্যাগ বা মোবাইল হাতে একা হেঁটে বেড়াতে ভয় লাগে না? কিংবা যেখানে গাড়ি আনলক রেখে বা ক্যাফেতে ল্যাপটপ টেবিলে রেখে বাথরুমে গেলেও সেটা চুরি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই? আধুনিক নাগরিক জীবনের প্রধান পূর্বশর্ত হলো 'নিরাপত্তা'। তবে ২০২৬ সালে এসে নিরাপত্তার সংজ্ঞা শুধু পুলিশের উপস্থিতি বা ক্রাইম রেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আজকের উন্নত বিশ্বে নিরাপত্তা মানে উন্নত প্রযুক্তি, সামাজিক স্থিতিশীলতা, শক্তিশালী আইনি পরিকাঠামো এবং নিখুঁত নগরায়নের এক অপূর্ব সমন্বয়।

সম্প্রতি প্রভাবশালী বিজনেস ম্যাগাজিন ফোর্বস (Forbes), বিশ্বখ্যাত ইকোনমিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট EIU (Economist Intelligence Unit) এবং বৈশ্বিক ডেটা প্ল্যাটফর্ম Numbeo Safety Index 2025-এর যৌথ ও সমন্বিত গবেষণা প্রতিবেদনে বিশ্বের ৬০টি প্রধান মহানগরের ওপর ভিত্তি করে নিরাপদ শহরের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

এই নিবন্ধে আমরা কেবল ১০টি শহরের নাম জানব না, বরং গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করব কীভাবে এই শহরগুলো অপরাধের হার প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনে আধুনিক নিরাপদ স্বর্গে পরিণত হয়েছে।

নিরাপদ শহর নির্বাচনের ৭টি মূল মানদণ্ড

কোনো শহরকে 'নিরাপদ' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে বৈশ্বিক গবেষক দল প্রধানত ৭টি মৌলিক দিক বিশ্লেষণ করেছেন:

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা (Personal Security): রাত বা দিনে এককভাবে চলাচলের স্বাধীনতা, হিংসাত্মক অপরাধ, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের পরিসংখ্যান।
অপরাধের পরিসংখ্যান ও আইন বিচার (Crime Rate & Legal Enforcement): গুরুতর অপরাধের হার এবং আইনি ব্যবস্থার দ্রুত ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
ডিজিটাল নিরাপত্তা (Digital Security): নাগরিকদের সাইবার আক্রমণ, ডেটা চুরি এবং স্মার্ট সিটি সার্ভেইল্যান্সের সুরক্ষা।
স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো (Health Security): জরুরি চিকিৎসাসেবা, মহামারী প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং উন্নত হাসপাতালের সহজলভ্যতা।
অবকাঠামোগত নিরাপত্তা (Infrastructure Security): নিরাপদ সড়ক, পথচারীদের নিরাপত্তা, বিল্ডিং কোড এবং পরিবহন ব্যবস্থা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি (Environmental & Disaster Resilience): জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমিকম্প বা বন্যা মোকাবেলায় শহরের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি।
সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা (Social & Economic Stability): সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, কম বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক আন্দোলন বা দাঙ্গামুক্ত পরিবেশ।

এক নজরে ২০২৫ সালের বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ১০ শহর

শহরের নাম

দেশ

সেফটি ইনডেক্স (Safety Index)

ক্রাইম ইনডেক্স (Crime Index)

নিরাপত্তার মূল চালিকাশক্তি

আবু ধাবি

সংযুক্ত আরব আমিরাত

৮৮.৮

১১.২

AI-নির্ভর নজরদারি, জিরো টলারেন্স নীতি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।

দোহা

কাতার

৮৪.৩

১৫.৭

শরিয়া ও দেওয়ানি আইনের নিখুঁত প্রয়োগ, উন্নত জীবনযাত্রা।

দুবাই

সংযুক্ত আরব আমিরাত

৮৩.৯

১৬.১

প্রিডিক্টিভ পুলিশিং, ফেসিয়াল রিকগনিশন ও স্মার্ট ড্রোন।

শারজাহ

সংযুক্ত আরব আমিরাত

৮৩.৭

১৬.৩

পারিবারিক ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, সুদৃঢ় আইন।

তাইপেই

তাইওয়ান

৮৩.৬

১৬.৪

সামাজিক সচেতনতা, সুপ্রশিক্ষিত পুলিশ ও ডিজিটাল সিকিউরিটি।

মানামা

বাহরাইন

৮১.৩

১৮.৭

কসমোপলিটান সামাজিক সহনশীলতা ও কঠোর সিসিটিভি নেটওয়ার্ক।

মাসকাট

ওমান

৮১.১

১৮.৯

ধর্মীয় অনুশাসন, নিরিবিলি পরিবেশ ও অস্ত্র ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা।

দি হেগ

নেদারল্যান্ডস

৮০.০

২০.০

আন্তর্জাতিক আদালত (ICJ/ICC), আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা স্ট্যান্ডার্ড।

ট্রনহেইম

নরওয়ে

৭৯.৩

২০.৭

নরডিক ওয়েলফেয়ার সিস্টেম, সামাজিক বিশ্বাস ও কম বৈষম্য।

আইনডহোভেন

নেদারল্যান্ডস

৭৯.১

২০.৯

১৫-মিনিট সিটি মডেল, আধুনিক টেকনোলজি ও কমিউনিটি পুলিশিং।

বিশ্বের শীর্ষ ১০ নিরাপদ শহরের বিস্তারিত বিশ্লেষণ

১. আবু ধাবি (সংযুক্ত আরব আমিরাত) — টানা ৯ বছর শীর্ষস্থানে

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী এবং দেশের সর্ববৃহৎ আমিরাত আবু ধাবি। পারস্য উপসাগরের একটি ত্রিভুজাকৃতি দ্বীপে অবস্থিত এই শহরটি ১৯৫৮ সালে তেল সম্পদ আবিষ্কারের পর দ্রুত বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও বিলাসবহুল মহানগরে রূপান্তরিত হয়। শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ, ল্যুভর আবু ধাবি এবং এমিরেটস প্যালেসের মতো বিশ্বখ্যাত স্থাপত্যের জন্য শহরটি পরিচিত।

অপরাধমুক্ত থাকার মূল কারণসমূহ:

জিরো টলারেন্স বিচার ব্যবস্থা: আবু ধাবিতে যেকোনো ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ও অত্যন্ত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিশেষ করে মাদক, যৌন হয়রানি, সাইবার অপরাধ এবং সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ডের জন্য কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।

বিশ্বমানের AI পুলিশিং: ‘Abu Dhabi Police’ বিশ্বজুড়ে তাদের আধুনিক প্রযুক্তির জন্য খ্যাত। শহরজুড়ে বিস্তৃত হাজার হাজার উচ্চমানের সিসিটিভি ক্যামেরা, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) চালিত নজরদারি এবং ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম অপরাধ ঘটার পূর্বেই তা শনাক্ত করতে সক্ষম।

সামাজিক ও ইসলামিক মূল্যবোধ: স্থানীয় সংস্কৃতিতে ধর্মীয় নৈতিকতা ও পারিবারিক মূল্যবোধ প্রাধান্য পাওয়ায় অপরাধ প্রবণতা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অনেক কম।

Numbeo Safety Index 2025 অনুযায়ী, আবু ধাবি ৮৮.৮ স্কোর নিয়ে বিশ্বের এক নম্বর নিরাপদ শহরের স্থান দখল করে রেখেছে। CEOWORLD এবং Economist Intelligence Unit (EIU)-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এটি বসবাসের জন্য পৃথিবীর অন্যতম স্থিতিশীল শহর।

২. দোহা (কাতার) — নিরাপদ ও সমৃদ্ধির প্রতীক

পারস্য উপসাগরের তীরে অবস্থিত কাতার রাজ্যের রাজধানী দোহা। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার এক অনন্য মিশ্রণ ঘটেছে এই শহরে। মিউজিয়াম অফ ইসলামিক আর্ট, সৌক ওয়াকিফ এবং দ্য পার্ল-কাতারের মতো আকর্ষণীয় স্থানগুলো দোহাকে বৈশ্বিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করেছে। ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপ সফলভাবে আয়োজন করে দোহা নিজেদের বিশ্বমানের নিরাপত্তা সক্ষমতা বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করেছে।

অপরাধমুক্ত থাকার মূল কারণসমূহ:

অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা: কাতারের নাগরিকদের মাথাপিছু আয় বিশ্বের সর্বোচ্চ সারিতে। ফলে অর্থনৈতিক দুস্থতার কারণে অপরাধের দিকে ধাবিত হওয়ার হার নেই বললেই চলে।

সমন্বিত আইন ব্যবস্থা: দোহাতে শরিয়া আইনি নীতি এবং আধুনিক দেওয়ানি আইনের সংমিশ্রণে বিচারকার্য পরিচালিত হয়। ফলে সহিংস অপরাধ (যেমন হত্যা, সশস্ত্র ডাকাতি বা ছিনতাই) প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।

বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তা: দোহা পর্যটক এবং একক নারী ভ্রমণকারীদের জন্য পৃথিবীর অন্যতম নিরাপদ স্থান। গভীর রাতেও এখানে নারী ও পর্যটকরা সম্পূর্ণ নিরাপদে যাতায়াত করতে পারেন।

Numbeo Crime Index 2025 অনুযায়ী দোহার অপরাধ সূচক মাত্র ১৫.৭ এবং নিরাপত্তা সূচক ৮৪.৩, যা দোহাকে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে বজায় রেখেছে।

৩. দুবাই (সংযুক্ত আরব আমিরাত) — প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার বিশ্বমডেল

বিশ্বের প্রধান ব্যবসায়িক কেন্দ্র এবং বিলাসবহুল পর্যটনের প্রবেশদ্বার দুবাই। বুর্জ খলিফা, পাম জুমেইরা এবং দুবাই মলের মতো আধুনিক বিস্ময় নিয়ে দুবাই গড়ে তুলেছে চার মিলিয়ন জনসংখ্যার এক আন্তর্জাতিক মেগাসিটি, যার প্রায় ৯২% শতাংশই বিশ্বজুড়ে আসা প্রবাসীরা।

অপরাধমুক্ত থাকার মূল কারণসমূহ:

স্মার্ট প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার: দুবাই পুলিশ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির ব্যবহার করে। প্রেডিক্টিভ পুলিশিং সফটওয়্যার (Predictive Policing) ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাব্য স্থান ও সময় পূর্বাভাস দিয়ে আগে থেকেই পেট্রোলিং বাড়ানো হয়।

দ্রুততম রেসপন্স টাইম: যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দুবাই পুলিশের গাড়ি মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। ড্রোনের মাধ্যমে ট্রাফিক ও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।

কঠোর ট্রাফিক ও শৃঙ্খলা আইন: প্রকাশ্যে মাতলামি, সামাজিক বিশৃঙ্খলা বা অশালীন আচরণ আইনের চোখে দণ্ডনীয় অপরাধ। ফলে সার্বিক নাগরিক পরিবেশ অত্যন্ত সুশৃঙ্খল।

CEOWorld Magazine 2025 এবং Numbeo-এর ডেটা অনুযায়ী, দুবাই ৮৩.৯ সেফটি স্কোর নিয়ে বিশ্বের ৩য় নিরাপদ শহরের মর্যাদা ধরে রেখেছে।

৪. শারজাহ (সংযুক্ত আরব আমিরাত) — সংস্কৃতি ও পরিবারবান্ধব নিরাপত্তা

সংযুক্ত আরব আমিরাতের তৃতীয় বৃহত্তম আমিরাত শারজাহ, যা দুবাইয়ের ঠিক উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। শারজাহকে বলা হয় আমিরাতের সাংস্কৃতিক ও ইসলামি ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু। শারজাহ মিউজিয়াম অফ ইসলামিক সিভিলাইজেশন এবং আল নুর মসজিদ এখানকার অন্যতম আকর্ষণ।

অপরাধমুক্ত থাকার মূল কারণসমূহ:

কঠোর সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়মাবলী: আমিরাতগুলোর মধ্যে শারজাহ তুলনামূলকভাবে বেশি রক্ষণশীল ও ইসলামিক অনুশাসন মেনে চলে। অ্যালকোহল ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে অপরাধের উৎস বহুলাংশে বন্ধ থাকে।

স্মার্ট পুলিশিং ও সিসিটিভি নেটওয়ার্ক: পুরো শারজাহ শহর ২৪/৭ সিসিটিভি নজরদারির আওতায় বিস্তৃত। সামান্য নিয়ম ভঙ্গ করলেও ডিজিটাল জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থার সম্মুখীন হতে হয়।

পরিবারবান্ধব পরিবেশ: পরিবার নিয়ে নিরাপদে বসবাস করার জন্য শারজাহ প্রবাসী ও স্থানীয়দের প্রথম পছন্দ।

Numbeo Safety Index 2025-এ প্রায় ৮৩.৭ স্কোর পেয়ে শারজাহ বিশ্ব তালিকায় ৪র্থ স্থান অর্জন করেছে।

৫. তাইপেই (তাইওয়ান) — এশিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর ও সামাজিক সম্প্রীতির শহর

তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেই প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। বিখ্যাত তাইপেই ১০১ টাওয়ার, ঐতিহাসিক চিয়াং কাই-শেক মেমোরিয়াল হল এবং রাত জেগে থাকা নাইট মার্কেটগুলোর জন্য শহরটি বিখ্যাত। প্রযুক্তি খাতের বৈশ্বিক হাব হওয়ার পাশাপাশি এটি এশিয়ার সবচেয়ে নিরাপদ মহানগরী।

অপরাধমুক্ত থাকার মূল কারণসমূহ:

উচ্চ নাগরিক সচেতনতা ও নৈতিকতা: তাইপেইয়ের নাগরিকরা আইনের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। নাইট মার্কেট বা গণপরিবহনে ভুল করে ফেলে যাওয়া দামি জিনিসপত্র বা মানিব্যাগও অক্ষত অবস্থায় ফেরত পাওয়ার অজস্র দৃষ্টান্ত রয়েছে।

দক্ষ ও দ্রুত পুলিশি ব্যবস্থা: তাইপেই পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত সুপ্রশিক্ষিত এবং জনবান্ধব। অপরাধ দমনে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে।

ডিজিটাল সিকিউরিটি ও ইআইইউ র‍্যাঙ্কিং: Economist Intelligence Unit (EIU)-এর মতে, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো এবং ডিজিটাল সুরক্ষায় তাইপেই বিশ্বের অন্যতম সেরা।

২০২৫ সালের Numbeo সূচকে তাইপেই ৮৩.৬ স্কোর পেয়ে ৫ম স্থানে রয়েছে। এর ক্রাইম ইনডেক্স মাত্র ১৬.৪।

৬. মানামা (বাহরাইন) — মধ্যপ্রাচ্যের উন্মুক্ত ও সহনশীল নিরাপত্তা কেন্দ্র

পারস্য উপসাগরের দ্বীপ রাষ্ট্র বাহরাইনের রাজধানী মানামা। বাহরাইন ন্যাশনাল মিউজিয়াম, আল ফাতিহ গ্র্যান্ড মসজিদ এবং ঐতিহ্যবাহী মানামা সৌকের জন্য বিখ্যাত এই শহরটি মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান আর্থিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর একটি।

অপরাধমুক্ত থাকার মূল কারণসমূহ:

কসমোপলিটান ও সামাজিক সহনশীলতা: মানামায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ একসঙ্গে বসবাস করেন। সামাজিক সম্প্রীতি ও সহনশীলতা এখানকার নিরাপত্তার মূল ভিত্তি।

কঠোর বিচার প্রয়োগ: ছোটখাটো অপরাধ হলেও কঠিন শাস্তির বিধান থাকায় অপরাধীরা কোনো সুযোগ পায় না।

আধুনিক নজরদারি পরিকাঠামো: সমগ্র বাণিজ্যিক এলাকা ও আবাসিক অঞ্চল সার্বক্ষণিক ডিজিটাল পর্যবেক্ষণের অধীনে থাকে।

Numbeo ২০২৫ অনুযায়ী, মানামা ৮১.৩ স্কোর নিয়ে বিশ্বের সেরা ১০ নিরাপদ শহরের তালিকায় ৬ষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছে।

৭. মাসকাট (ওমান) — শান্তি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নিভৃত আলয়

আরব সাগরের উপকূলে অবস্থিত ওমানের রাজধানী মাসকাট। সুউচ্চ আধুনিক অট্টালিকার বদলে ঐতিহ্যবাহী সাদা দালানকোঠা, সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদ, মুত্রাহ সৌক এবং রয়্যাল ওপেরা হাউসের মনোরম স্থাপত্য দিয়ে সাজানো এই শান্ত শহরটি ওমানের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র।

অপরাধমুক্ত থাকার মূল কারণসমূহ:

অস্ত্র ও মাদক ব্যবহারে কঠোর আইনি বাধা: ওমানে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আগ্নেয়াস্ত্র বহন বা মাদকের কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফলে বন্দুক সহিংসতা বা গ্যাং কালচার এখানে অনুপস্থিত।

অপরাধমুক্ত পরিবেশ: মাসকাটে চুরি, ছিনতাই বা কোনো ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এতই বিরল যে সাধারণ মানুষ বাড়ি বা গাড়ির দরজা লক করা নিয়েও খুব একটা চিন্তিত থাকেন না।

ওমানি আতিথেয়তা ও শান্তিপ্রিয় মানসিকতা: ওমানের জনগণ স্বভাবগতভাবেই শান্তিপ্রিয় ও অতিথিপরায়ণ।

২০২৫ সালের Numbeo Safety Index-এ মাসকাট ৮১.১ স্কোর অর্জন করে বিশ্বে ৭ম স্থান দখল করেছে।

৮. দি হেগ (The Hague, নেদারল্যান্ডস) — ইউরোপের আইনি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রাজধানী

নেদারল্যান্ডসের দক্ষিণ হল্যান্ড প্রদেশে অবস্থিত দি হেগ দেশটির রাজনৈতিক রাজধানী। এখানে রয়েছে নেদারল্যান্ডসের পার্লামেন্ট, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ), আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC), ইউরোপোল (Europol) এবং একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার সদর দপ্তর।

অপরাধমুক্ত থাকার মূল কারণসমূহ:

বিশ্বমানের নিরাপত্তা প্রটোকল: বৈশ্বিক বিচার ব্যবস্থা ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের আবাসন নিশ্চিত করায় দি হেগের সার্বিক নিরাপত্তা প্রটোকল বিশ্বের যেকোনো শহরের চেয়ে বহুগুণ কঠোর।

কমিউনিটি পুলিশিং ও ২৪/৭ পেট্রোলিং: শহর জুড়ে রয়েছে বিশেষ প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষিত পুলিশ নেটওয়ার্ক। চুরি বা ভাঙচুরের মতো ইউরোপীয় সাধারণ অপরাধও এখানে খুব কম।

শক্তিশালী আইনি কাঠামো: নেদারল্যান্ডসের স্বচ্ছ ও শক্তিশালী শাসন ব্যবস্থার কারণে দুর্নীতি ও অন্যায়ের হার নেই বললেই চলে।

Numbeo ২০২৫ অনুযায়ী দি হেগ ৮০.০ নিরাপত্তা স্কোর পেয়ে বিশ্ব তালিকায় ৮ম এবং ইউরোপের অন্যতম শীর্ষ নিরাপদ শহর হিসেবে স্বীকৃত।

৯. ট্রনহেইম (নরওয়ে) — স্ক্যান্ডিনেভীয় ওয়েলফেয়ার ও সামাজিক বিশ্বাসের প্রতীক

নরওয়ের তৃতীয় বৃহত্তম শহর ট্রনহেইম নিদেলভা নদীর তীরে অবস্থিত। এটি নরওয়ের অন্যতম ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ঐতিহ্যবাহী নিদারোস ক্যাথেড্রাল এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় (NTNU)-এর কারণে এই শহরটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

অপরাধমুক্ত থাকার মূল কারণসমূহ:

উচ্চ সামাজিক বিশ্বাস (Social Trust): স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলোতে একে অপরের ওপর সামাজিক ট্রাস্ট অত্যন্ত বেশি। মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করে এবং কমিউনিটি স্পিরিট বজায় রাখে।

কম সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য: নরওয়ের কল্যাণমূলক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার (Welfare State) কারণে দারিদ্র্য বা সামাজিক অসমতা নেই। ফলে অভাবজনিত অপরাধের প্রবণতা শূন্য।

নূন্যতম অপরাধ রেট: ডাটা অনুযায়ী, এখানে গাড়ি চুরি (১৩.১), মারামারি (১২.৯) বা ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা পৃথিবীর সর্বনিম্ন সারিতে।

Numbeo ২০২৫ সূচকে ট্রনহেইম ৭৯.৩১ স্কোর নিয়ে বিশ্বে ৯ নম্বর স্থানে অবস্থান করছে।

১০. আইনডহোভেন (নেদারল্যান্ডস) — ‘১৫-মিনিট সিটি’ ও ভবিষ্যতের স্মার্ট মডেল

নেদারল্যান্ডসের দক্ষিণে অবস্থিত আইনডহোভেন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের বৈশ্বিক কেন্দ্র। বিশ্বখ্যাত ফিলিপস (Philips) এবং সেমিকন্ডাক্টর জায়ান্ট এএসএমএল (ASML)-এর জন্মস্থান এই শহরটিকে বলা হয় ‘City of Light’ ও ‘City of Design’।

অপরাধমুক্ত থাকার মূল কারণসমূহ:

১৫-মিনিট সিটি আর্কিটেকচার: শহরটি এমনভাবে পরিকল্পিত যে নাগরিক প্রয়োজনীয় প্রতিটি সেবা (পুলিশ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস) মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছানো সম্ভব। এই স্মার্ট নগর পরিকল্পনা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী।

উচ্চ প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান: তরুণ জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ আধুনিক টেকনোলজি ও শিক্ষায় নিয়োজিত থাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর হার নেই।

শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও পরিবেশবান্ধব লাইফস্টাইল: বিশ্বমানের ইকো-সিস্টেম ও সাইক্লিং ফ্রেন্ডলি অবকাঠামো নগরজীবনকে অত্যন্ত শান্ত ও সুরক্ষিত করে তুলেছে।

Numbeo ২০২৫ অনুযায়ী আইনডহোভেন ৭৯.০৭ সেফটি স্কোর নিয়ে বিশ্বের শীর্ষ ১০ নিরাপদ শহরের তালিকা পূর্ণ করেছে।

নিরাপদ শহরের তিনটি বৈশ্বিক মডেল: একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা

বিশ্বের শীর্ষ ১০টি শহরের দিকে তাকালে দেখা যায়, অপরাধমুক্ত সমাজ গড়ার পেছনে মূল মডেল কাজ করছে প্রধানত তিনটি অঞ্চলভেদে:

জিপিএস ও জিডিটাল তদারকিভিত্তিক 'মধ্যপ্রাচ্য মডেল' (গালফ অঞ্চল): আবু ধাবি, দোহা বা দুবাই দেখিয়েছে কীভাবে বিপুল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, কঠোর শাসন ব্যবস্থা এবং এআই-ভিত্তিক স্মার্ট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে কোনো অপরাধকেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না দেওয়া যায়।

নাগরিক নৈতিকতা ও প্রযুক্তির 'ইস্ট এশিয়ান মডেল': তাইপেই প্রমাণ করেছে যে, সরকারের চেয়েও বড় শক্তি হলো নাগরিকদের আইনমান্য করার মানসিকতা ও উচ্চ নৈতিক শিক্ষা।

সামাজিক সুরক্ষা ও মানবিক 'ইউরোপীয় মডেল': দি হেগ বা ট্রনহেইম দেখিয়েছে যে, অপরাধের মূল কারণ (দারিদ্র্য ও অসমতা) দূর করতে পারলে পুলিশি শক্তির ব্যবহার ছাড়াই একটি শহর নিরাপদ স্বর্গে পরিণত হতে পারে।

নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ কী?

বিশ্বের এই শীর্ষ ১০টি নিরাপদ শহর প্রমাণ করে যে, নিরাপত্তা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি হলো সুচিন্তিত নগরায়ন, আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সমন্বিত ফল।

নিরাপত্তা কেবল পুলিশের লাঠি বা জেলের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না যখন একটি শহর তার নাগরিকদের উন্নত জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্যসেবা এবং রাতের আঁধারেও নির্বিঘ্নে হেঁটে বেড়ানোর আস্থার পরিবেশ দিতে পারে, তখনই সেটি বিশ্বমঞ্চে ‘নিরাপদ শহর’ হিসেবে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করতে সক্ষম হয়।

এই ১০টি শহরের মধ্য থেকে আপনার সবচেয়ে পছন্দের শহর কোনটি এবং কোন শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আপনাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে? কমেন্টে আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের সাথে শেয়ার করুন!

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.