জহির রায়হান – বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অমীমাংসিত রহস্য
বাংলাদেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসে জহির রায়হান (১৯৩৫–১৯৭২) এক অনন্য নাম। তিনি ছিলেন একজন ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তৎপর একজন দেশপ্রেমিক। তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেয়া যেমন রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রতীক, তেমনি স্টপ জেনোসাইড ছিল মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরার এক সাহসী প্রচেষ্টা। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র এক মাস পর, ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি নিখোঁজ হন যা একটি রহস্যময় ও হৃদয়বিদারক অধ্যায়, যা আজও ইতিহাসের অন্ধকারে ঢাকা। আসছে ফাগুনে আমরা হব দ্বিগুণ- তার এ লাইন আজও ব্যবহার করা হয় যে কোন বিপ্লব আন্দোলনে। জহির রায়হান যেন আজও অমর হয়ে আছেন প্রতিটা স্লোগানে মিছিলে। জহির রায়হান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অমীমাংসিত রহস্য।
জহির রায়হান বাংলাদেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্র জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর জীবন থেকে নেয়া, হাজার বছর ধরে এবং স্টপ জেনোসাইড বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি একটি ট্র্যাজিক রহস্যে ঢাকা। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি ঢাকার মিরপুরে আলবদর ও বিহারীদের দ্বারা গুম হয়ে যান। এই নিবন্ধে জহির রায়হানের গুমের পটভূমি, সম্ভাব্য কারণ, ঘটনার বিবরণ এবং এর তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
জহির রায়হান জীবন ও কর্ম
জহির রায়হান ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনী জেলার সোনাগাজি উপজেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ছিলেন কলকাতা ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক। তাঁর বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক। শৈশব থেকেই জহির বামপন্থী রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন, যা তাঁর সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে প্রতিফলিত হয়। তিনি ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস শেষ বিকেলের মেয়ে (১৯৬০) এবং হাজার বছর ধরে (১৯৬৪) তাঁকে সাহিত্য জগতে প্রতিষ্ঠিত করে।
চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে তিনি কখনো আসেনি (১৯৬১), জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০) এবং স্টপ জেনোসাইড (১৯৭১) নির্মাণ করেন। জীবন থেকে নেয়া ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত একটি প্রতীকী চলচ্চিত্র, যা সত্যজিৎ রায়ের মতো কিংবদন্তীদের প্রশংসা কুড়ায়।
মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জহির রায়হান কলকাতায় চলে যান। পুরো মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি কলকাতায় থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা চালান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। সেখানে তিনি নির্মাণ করেন স্টপ জেনোসাইড, লিবারেশন ওয়ার, ইনোসেন্ট মিলিয়ন্স প্রভৃতি তথ্যচিত্র, যা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং পাকিস্তান ঘাতক বাহিনী, রাজাকার, আলবদরদের কৃতকর্ম বিশ্বে ছড়িয়ে যায়। তিনি তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয় মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করেন এবং সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ তার কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
১৯৭১-এর গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতায় থেকে সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে সক্রিয় ছিলেন এবং স্টপ জেনোসাইড সহ একাধিক প্রামাণ্য নির্মাণে অংশ নেন। স্টপ জেনোসাইড পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার ভয়াবহতা তুলে ধরে এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বব্যাপী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি বাংলাদেশ লিবারেশন কাউন্সিল অব ইনটেলিজেন্সিয়ার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ছিলেন।
গুমের পটভূমি মুক্তিযুদ্ধ ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে ঢাকার বুদ্ধিজীবী অপহরণ ও হত্যার ধারাবাহিকতায় জহির রায়হানের বড় ভাই প্রখ্যাত সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সার অপহৃত হন। পরিবার ও সহস্রজনের সাক্ষ্য আদালতে উপস্থাপিত দলিলপত্রে এটি ব্যাপকভাবে নথিবদ্ধ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। জহির রায়হান ১৭ ডিসেম্বর কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে জানতে পারেন যে তাঁর বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার ১৪ ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ।
শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় আলবদর ও আলশামস বাহিনী কর্তৃক অপহৃত বুদ্ধিজীবীদের একজন। পান্না কায়সার, শহীদুল্লাহর স্ত্রী এবং তাঁর বোন সুরাইয়া খানম জানান, জামায়াত নেতা খালেক মজুমদার এই অপহরণে জড়িত ছিলেন। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ জহির রায়হান তাঁর ভাইয়ের নিখোঁজের রহস্য উদঘাটনে তৎপর হন।
পরিবার ও সহকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, শহীদুল্লাহ কায়সারের খোঁজ, অপহরণ নিধনের প্রমাণ সংগ্রহ এবং মিরপুর মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প অঞ্চলে আলবদর ঘাতক চক্রের লুকিয়ে থাকা সদস্যদের সন্ধান – এই তিনটি উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি নানাদিকে যোগাযোগ রাখছিলেন। তিনি এনায়েতউল্লাহ খান, সৈয়দ হাসান ইমাম, এহতেশাম হায়দার চৌধুরী, ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এবং ড. সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে একটি বেসরকারি বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

জহির রায়হান যেন আজও অমর হয়ে আছেন প্রতিটা স্লোগানে মিছিলে।
২৫ জানুয়ারি ১৯৭২ প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে জহির ঘোষণা করেন যে তাঁর কাছে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র রয়েছে, যা তিনি শিগগির প্রকাশ করবেন। এই ঘোষণা তাঁর জীবনে বিপদ ডেকে আনে বলে অনেকে মনে করেন। তিনি সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল ওসমানীর সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন এবং মিরপুরে অপারেশনের সময়সীমা জানতে চেষ্টা করছিলেন।
মিরপুর গুমের স্থান
মিরপুর ছিল মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণক্ষেত্র। মিরপুর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানপন্থী বিহারি সম্প্রদায়ের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। এই এলাকায় আলবদর ও রাজাকার বাহিনী সক্রিয় ছিল এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের জন্য এ স্থানটি কুখ্যাত ছিল। স্বাধীনতার পরও মিরপুরে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি মিরপুর পুরোপুরি শত্রুমুক্ত হয় এবং অবশিষ্ট পাক বাহিনী আত্মসমর্পন করে। ওইদিন মিরপুর থেকে অনেক রাজাকার ও আলবদরদের আটক করা হয়। এর আগের দিন জহির রায়হানের গুমের ঘটনা ঘটে।
৩০ জানুয়ারি সকালে জহির রায়হানের বাসায় একটি ফোনকল আসে। এই কল কে গ্রহণ করেছিলেন, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তাঁর ছোট বোন ডা. সুরাইয়া খানম দাবি করেন তিনি কলটি গ্রহণ করেছিলেন এবং জহির রায়হানকে ডেকে দিয়েছিলেন। অপরদিকে শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার বলেন যে তিনি কলটি গ্রহণ করেছিলেন। কলকারী কে ছিলেন, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
জহির রায়হানের প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবী জানান, ইউএসআইএস এর কর্মী রফিক নামের একজন কল করেছিলেন। অন্য একটি সূত্রে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর প্রটোকল অফিসার লেফটেন্যান্ট সেলিম কলটি করেছিলেন। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সেদিন সকালে এবং আগের রাতে একাধিক কল এসেছিল, যার মধ্যে একটি ছিল বিহারি অভিনেতা আসগর আলী মাস্তানার।
কলগুলোতে জহির রায়হানকে জানানো হয় যে মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনে শহীদুল্লাহ কায়সারসহ বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী আটক রয়েছেন এবং সেদিন সেখানে সেনাবাহিনী ও পুলিশের অপারেশন হবে। এই খবরে উৎসাহিত হয়ে জহির রায়হান জাফরিয়া হাবিব, শাহরিয়ার কবির, তাঁর শ্যালক বাবুল, আবদুল হক, নিজাম এবং পারভেজকে নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশে রওনা হন।
গুমের ঘটনা ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২
মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনে পৌঁছে জহির রায়হান এবং তাঁর সঙ্গীরা ভারতীয় সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং পুলিশের সমন্বিত নিরাপত্তা বাহিনীর সম্মুখীন হন। সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকায় তাঁর সঙ্গীদের ফিরে যেতে বলা হয়। জহির রায়হান সাংবাদিক পরিচয়ে একা থাকার অনুমতি পান। তাঁর গাড়িটি পরে রমনা পার্কের সামনে রহস্যজনকভাবে পাওয়া যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী আমির হোসেনের বর্ণনা অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পুলিশ ও ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি দল মিরপুরে ঢোকে, তাদের সঙ্গে ছিলেন একমাত্র বেসামরিক ব্যক্তি জহির রায়হান, যার লক্ষ্য ছিল অপহৃতদের খোঁজ উদ্ধার ও এলাকা সুরক্ষায় তথ্য সহায়তা করা। আনুমানিক ১১টার দিকে পাক বাহিনী, আলবদর বাহিনী ও বিহারি গোষ্ঠী দ্বারা নিকটবর্তী বাড়িঘর ও গলিপথ থেকে স্বয়ংক্রিয় ভারী অস্ত্র এবং হ্যান্ড গ্রেনেড দিয়ে হামলা শুরু হয়। দ্রুতই সেনাবাহিনীর ওপর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে এবং বহু জনকে কুপিয়ে ও টেনে হেচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই হামলায় জহির রায়হান গুলিবিদ্ধ হন এবং পানির ট্যাংকের দেয়ালের পাশে পড়ে যান। নির্ভরযোগ্য সূত্রে সেদিন ডেল্টা কোম্পানির নেতৃত্বে থাকা কর্মকর্তাসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সৈন্য নিহত ও নিখোঁজ হন। আমির হোসেন দেখেন, বিহারিরা তাঁকে পশ্চিম দিকে নূরী মসজিদের কাছে টেনে নিয়ে যায়। এই হামলায় লেফটেন্যান্ট সেলিম, এসপি জিয়াউল হক লোদীসহ ৪২ জন নিহত হন। ১৯৯৯ সালে নূরী মসজিদ সম্প্রসারণের সময় একটি কুয়া থেকে পাঁচটি মাথার খুলি এবং ৬০০টি হাড় পাওয়া যায়, যা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত হয়। এই স্থানটি মুসলিম বাজার বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত হয়।
গুমের সম্ভাব্য কারণ
জহির রায়হানের গুমের পেছনে একাধিক তত্ত্ব প্রচলিত-
বিহারি রাজাকারদের হত্যাকাণ্ড: জহির রায়হান পাকিস্তান সরকার, রাজাকার ও আলবদরদের কাছে হুমকিস্বরূপ ছিলেন। তাদের কাছে তিনি ছিলেন “প্রচারযোদ্ধা”, যার কাজ ছিল তাদের কৃতকর্ম প্রকাশ করা। সবচেয়ে প্রচলিত বয়ান অনুসারে, জহির রায়হান মিরপুরে আলবদর ও বিহারি গোষ্ঠীর হাতে নিহত হন। মিরপুরের কসাই আখতার গুন্ডার নেতৃত্বে বিহারিরা অতর্কিত হামলা চালায়, যাতে জহির গুলিবিদ্ধ হন এবং তাঁর দেহ গুম করা হয়। আমির হোসেনের সাক্ষ্য এই বয়ানকে সমর্থন করে।
রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব: কিছু সূত্রে দাবি করা হয়, জহির রায়হানের কাছে থাকা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নথি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কিছু নেতার জন্য হুমকি ছিল। তাঁর স্টপ জেনোসাইড নির্মাণের সময় আওয়ামী লীগের কিছু নেতা তাঁকে বাধা দিয়েছিলেন। তবে এই তত্ত্বের সমর্থনে কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ নেই।
পাকিস্তানের গণহত্যা বিরোধী প্রচারণা: মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধ, প্রপাগাণ্ডা ও তাদের গণহত্যা বিশ্বের সামনে তুলে ধরতেন জহির রায়হান। দেশে ফিরে তিনি বুদ্ধিজীবী হত্যা ও গণহত্যার তদন্তে সরাসরি এগিয়ে আসেন। গঠন করেন ‘বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি’। এই কমিটির মাধ্যমে তিনি রাজাকার ও আলবদরদের গোপন তথ্য সংগ্রহ করেন, ঘাতকদের আড্ডাখানা খুঁজে বের করেন, এমনকি শহীদুল্লাহ কায়সারকে ধরে নিয়ে যাওয়া কুখ্যাত রাজাকার খালেক মজুমদারকেও তিনি ধরিয়ে দেন। এসব কারণে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী গোষ্ঠীর নিকট তিনি হুমকিস্বরূপ ছিলেন।
বামপন্থী রাজনীতির প্রভাব: জহিরের বামপন্থী অবস্থান তাঁকে বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। তাঁর তদন্ত এবং নথি সংগ্রহ তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ও তাদের সমর্থিত রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর জন্য অস্বস্তিকর ছিল।
বিতর্ক ও প্রতিবাদ
জহির রায়হানের গুম নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠী বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করে। কেউ কেউ দাবি করেন, তাঁর গাড়িতে আওয়ামী লীগ নেতাদের কুকর্মের ভিডিও ফুটেজ ছিল যা গুমের কারণ। তবে জহির রায়হানের সঙ্গীরা জানান, তিনি শুধু অপারেশনের ফুটেজ ধারণের জন্য ক্যামেরা নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আওয়ামীলীগের কোন নেতাদের ভিডিও ফুটেজ নেননি। তারা এই অভিযোগগুলোকে অনেকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রচারণা হিসেবে বিবেচনা করেন।
পান্না কায়সার আদালতে সাক্ষ্য দেন যে কুখ্যাত খালেক মজুমদার শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করে আলবদরের নেতা চৌধুরী মঈনুদ্দিনের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তিনি আশরাফুজ্জামান খানের নামও উল্লেখ করেন। এই সাক্ষ্য বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে জামায়াতের ভূমিকাকে স্পষ্ট করে।
তদন্ত ও উত্তরাধিকার
জহির রায়হানের গুমের তদন্তে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তাঁর ছেলে অনল রায়হান ‘পিতার অস্থির সন্ধানে’ প্রতিবেদনে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। দৈনিক ভোরের কাগজ (১৯৯৯) এবং প্রথম আলো এই বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তবে রহস্য এখনো অমীমাংসিত।
জহির রায়হানের কাজ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে অমর। তাঁর স্টপ জেনোসাইড এবং জীবন থেকে নেয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধরে রেখেছে। তাঁর গুম বাংলাদেশের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি বেঁচে থাকলে জামায়াত ও আলবদরের যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী কাজ করতেন। তাঁর গুমের রহস্য উদঘাটনের জন্য আরও গবেষণা ও তদন্ত প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র:
নিখোঁজ নন, গুলিতে নিহত হয়েছেন জহির রায়হান, জুলফিকার আলী মানিক, দৈনিক ভোরের কাগজ, ১ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯
মিরপুরের ১০টি বধ্যভূমি, মিরাজ মিজু
যেখানে শহীদ হয়েছিলেন জহির রায়হান, কমল জোহা খান, দৈনিক প্রথম আলো
পিতার অস্থির সন্ধানে, অনল রায়হান, সাপ্তাহিক ২০০০
এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক, মেজর জেনারেল মঈনুল ইসলাম




















