জহির রায়হান – বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অমীমাংসিত রহস্য

জহির রায়হান – বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অমীমাংসিত রহস্য

"আসছে ফাগুনে আমরা হব দ্বিগুণ..." বাংলা সাহিত্যের পাতায় বা রাজপথের প্রকম্পিত স্লোগানে যখনই স্বাধিকার আন্দোলন আর বিপ্লবের মশাল জ্বলে ওঠে, তখনই প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এক অবিনশ্বর উচ্চারণ হিসেবে ধ্বনিত হয় এই বাক্যটি। এই পংক্তির রচিয়তা আর কেউ নন তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের ধ্রুবতারা, দূরদর্শী চিন্তাবিদ ও অদম্য দেশপ্রেমিক জহির রায়হান (১৯৩৫–১৯৭২)।

তিনি কেবল শব্দ বুনে উপন্যাস রচনা করেননি কিংবা সেলুলয়েডের ফিতায় রূপালী পর্দার দৃশ্যপট আঁকেননি; তিনি তাঁর ক্যামেরা এবং লেখনীকে বানিয়েছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামের প্রতিটি বাঁকে তিনি ছিলেন সামনের সারির এক অগ্রবর্তী সেনানী।

কিন্তু ইতিহাসের পরম নির্মমতা এই যে, বিজয়ের উদীয়মান সূর্যের আলোয় যখন পুরো দেশ স্নাত হচ্ছিল, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্মের মাত্র দেড় মাসের মাথায়, ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি, এই মহান শিল্পী চিরতরে নিখোঁজ হয়ে যান। ঢাকার মিরপুরের এক রক্তাক্ত প্রান্তরে তিনি অপহৃত বা নিহত হন যাকে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম জটিল, হৃদয়বিদারক এবং অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আজ অবধি জহির রায়হানের এই গুমের নেপথ্য কুশীলবদের মুখোশ পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।

এই বিস্তৃত নিবন্ধে আমরা জহির রায়হানের বর্ণাঢ্য জীবন, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে তাঁর বৈপ্লবিক অবদান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের আন্তর্জাতিক বিপ্লব, বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের নিখোঁজ হওয়া, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নথি সংগ্রহের অদম্য স্পর্ধা এবং ৩০ জানুয়ারির সেই কালরাতে মিরপুরে ঘটে যাওয়া রহস্যময় ট্র্যাজেডির আদ্যোপান্ত অনুসন্ধান করব।

প্রারম্ভিক জীবন ও রাজনৈতিক চেতনা

জহির রায়হানের জীবনপ্রবাহ অনুসরণের সূচনা ঘটে ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট। তিনি ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার অজপাড়াগাঁ মজুপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষানুরাগী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

পারিবারিক শিক্ষা ও মনন গঠন

জহির রায়হানের পিতা মওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ছিলেন তৎকালীন কলকাতা ও পরবর্তীতে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার একজন প্রখ্যাত শিক্ষক। ধর্মানুরাগী হলেও পরিবারে ছিল প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার অবারিত সুযোগ। পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন জহির রায়হানের চিন্তা ও দর্শনের প্রধান অনুপ্রেরণাদাতা। শৈশব থেকেই ভাইয়ের সান্নিধ্যে জহির সমাজতান্ত্রিক ও বামপন্থী রাজনীতির আদর্শে দীক্ষিত হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজপথের দ্রোহ

ঢাকার মিত্র ইনস্টিটিউশন থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর জহির রায়হান ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। ১৯৫৮ সালে তিনি বিএ (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তিনি প্রত্যক্ষভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ২১ ফেব্রুয়ারির বিখ্যাত ১৪৪ ধারা ভঙ্গের যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ছাত্রসমাজ নিয়েছিল, তাতে ১০ জনের প্রথম সারির দলের সদস্য হিসেবে জহির রায়হান অন্যতম ভূমিকা পালন করেন। এই আন্দোলনের অপরাধে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী তাঁকে গ্রেফতার করে এবং তিনি বেশ কিছুদিন কারাবরণ করেন। কারান্তরালে বসেই তাঁর ভেতরে প্রস্ফুটিত হয় অপরাজেয় এক বিপ্লবী সত্তা।

সাহিত্য জগতে জহির রায়হানের লেখনীর ধার

জহির রায়হান কেবল একজন আবেগীয় রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন একজন লেখক। খুব অল্প বয়সেই বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি তাঁর স্বকীয় স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন।

প্রধান উপন্যাসসমূহ

শেষ বিকেলের মেয়ে (১৯৬০): এটি জহির রায়হানের প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস। শহুরে মধ্যবিত্ত রোমান্টিক মনস্তত্ত্ব, প্রেম, অনিশ্চয়তা ও মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাসটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে এবং তাঁকে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

হাজার বছর ধরে (১৯৬৪): এটি বাংলা সাহিত্যের একটি অন্যতম কালজয়ী উপন্যাস। গ্রামবাংলার আবহমান রূপ, গ্রামীণ মানুষের অন্ধবিশ্বাস, বহুবিবাহ, নারীজীবনের ট্র্যাজেডি এবং প্রতিকূলতার মাঝে টিকে থাকার অদম্য লড়াইকে তিনি অতি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই উপন্যাসটির জন্য তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার এবং পরবর্তীতে বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন।

আরেক ফাল্গুন (১৯৬৯): ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত এই রাজনৈতিক উপন্যাসটি মূলত বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার দলিল। এই উপন্যাসের ছত্রে ছত্রেই লেখা রয়েছে সেই অমর পংক্তি "আসছে ফাগুনে আমরা হব দ্বিগুণ", যা আজ অবধি যেকোনো স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মূলমন্ত্র।

আর কত দিন (১৯৭০): আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যুদ্ধ, গণহত্যা এবং বিশ্ব মানবজাতির আর্তনাদকে উপজীব্য করে রচিত এই ছোট উপন্যাসটি জহির রায়হানের বৈশ্বিক মানবিক দর্শনের প্রমাণ দেয়।

সেলুলয়েডের সেলুকাস: চলচ্চিত্র নির্মাণে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লব

সাহিত্যচর্চায় অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জনের পরও জহির রায়হান অনুধাবন করেছিলেন যে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিশাল নিরক্ষর ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো চলচ্চিত্র। ১৯৫৭ সালে 'জাগো হুয়া সরা' ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে তাঁর চলচ্চিত্রে পদার্পণ ঘটে।

'জীবন থেকে নেয়া' (১৯৭০): এক রাজনৈতিক বিস্ফোরণ

১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'জীবন থেকে নেয়া' কেবল একটি চলচ্চিত্র ছিল না; এটি ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সেলুলয়েডের মাধ্যমে ঘোষিত এক প্রকাশ্য বিদ্রোহ।

প্রতীকী গল্প রূপায়ন: চলচ্চিত্রে একটি পরিবারের ভেতরের এক জাঁকালো ও স্বৈরাচারী গৃহকর্ত্রীর (রৌশন জামিল অভিনীত) শাসনকে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের রূপক বা মেটাফোর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পরিবারের দুই ভাই ও বধূদের অধিকার আদায়ের লড়াই মূলত পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রতিনিধিত্ব করেছিল।

একুশের প্রথম চিত্রায়ন: এই চলচ্চিত্রে জহির রায়হানই প্রথম ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরি, 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি' গানটি এবং শহীদ মিনারের দৃশ্য ধারণ করেন।

কিংবদন্তিদের প্রশংসা: চলচ্চিত্রটি মুক্তির সময় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এটি বন্ধ করার নানা ষড়যন্ত্র করে। তবে জনরোষের মুখে তা মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় এবং মৃণাল সেন চলচ্চিত্রটির অনন্য রাজনৈতিক প্রতীকী রূপায়ন দেখে জহির রায়হানের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

১৯৭১ এর রণাঙ্গন ও সেলুলয়েড সংগ্রাম: কলকাতার ট্রাঙ্ক রোড থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গন

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর নৃশংস গণহত্যা শুরু করে, তখন জহির রায়হান নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকতে পারেননি। তিনি ভারতের কলকাতায় চলে যান এবং সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান করার দায়িত্ব নেন।

'স্টপ জেনোসাইড' (১৯৭১): বিশ্ববিবেক নাড়িয়ে দেওয়া প্রামাণ্যচিত্র

কলকাতায় গিয়ে জহির রায়হান উপলব্ধি করেন যে, বিশ্বজনমত গঠনের জন্য পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বাস্তব চিত্র আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে দেওয়া অপরিহার্য।

সীমিত সম্পদে মহাকাব্য নির্মাণ: কোনো আধুনিক সরঞ্জাম ছাড়াই, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় সীমান্ত অতিক্রম করে তিনি ও তাঁর দল যুদ্ধের ভয়াবহ দৃশ্য রেকর্ড করেন। মাত্র ২০ মিনিটে নির্মিত এই প্রমান্যচিত্র 'Stop Genocide' পাকিস্তানি সৈন্যদের বর্বরতা, শরণার্থীদের হাহাকার এবং ভারতীয় শরণার্থী শিবিরের করুণ চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: তৎকালীন বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রামাণ্যচিত্রটি আলোড়ন সৃষ্টি করে। লেনিনগ্রাদ ও তাসখন্দ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এটি বিশেষ সম্মাননা লাভ করে। চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে যে আয় হয়েছিল, তার সমুদয় অর্থ জহির রায়হান অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযোদ্ধা ফান্ডে দান করে দেন।

ইনটেলিজেন্সিয়ার দায়িত্ব: তিনি 'বাংলাদেশ লিবারেশন কাউন্সিল অব ইনটেলিজেন্সিয়া'-র সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিশ্বজুড়ে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের সংঘবদ্ধ করতে দিনরাত পরিশ্রম করেন।

স্বাধীনতার কালবেলা ও রক্তঝরা পৌষ: ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের অপহরণ ও স্বদেশে প্রত্যাবর্তন

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু এই বিজয়ের ঠিক দুদিন আগে, ১৪ ডিসেম্বর, ঘাতক আলবদর বাহিনী পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের নির্বিচারে হত্যা করে।

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১: আলবদর কর্তৃক শহীদুল্লাহ কায়সার অপহরণ ─► ১৭ ডিসেম্বর: জহির রায়হানের ঢাকায় প্রত্যাবর্তন


ভাইয়ের সন্ধানে ও ঘাতকদের বিচারে তদন্ত কমিটি গঠন

শহীদুল্লাহ কায়সারের অপহরণ

১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় কাায়েতটুলীর বাসভবন থেকে বিজয়ের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে আলবদর বাহিনীর ঘাতকরা ধরে নিয়ে যায়।

স্বাক্ষ্য ও দলিল: শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার এবং বোন সুরাইয়া খানম পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সাক্ষ্য দেন যে, জামায়াত নেতা খালেক মজুমদার এবং আলবদরের শীর্ষ ঘাতক চৌধুরী মঈনুদ্দীনআশরাফুজ্জামান খান এই অপহরণের পেছনে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল।

জহির রায়হানের প্রত্যাবর্তন

১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান কলকাতা থেকে বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত ঢাকায় পা রাখেন। কিন্তু বাসায় এসে ভাইয়ের অনুপস্থিতি এবং বুদ্ধিজীবীদের পচাগলা লাশের খবর শুনে তিনি স্তব্ধ হয়ে যান। পরম ভালোবাসার বড় ভাইকে খুঁজে বের করা এবং এই জঘন্য গণহত্যার পেছনের মাস্টারমাইন্ডদের মুখোশ উন্মোচন করাকে তিনি জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন।

সত্য অনুসন্ধানের অদম্য অভিযাত্রা: বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি ও ২৫ জানুয়ারির ঐতিহাসিক প্রেস কনফারেন্স

স্বদেশ ফিরে জহির রায়হান হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থবিরতা দেখে তিনি নিজেই সহকর্মীদের নিয়ে গঠন করেন এক বেসরকারি তদন্ত কমিটি।

তদন্ত কমিটির কার্যক্রম ও ঘাতক আটক

জহির রায়হানের নেতৃত্বে এই প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশন কমিটি ঢাকার অলিতে-গলিতে অনুসন্ধান শুরু করে।

খালেক মজুমদারকে আটক: জহির রায়হানের ব্যক্তিগত তৎপরতা ও তথ্যের ভিত্তিতেই শহীদুল্লাহ কায়সারকে ধরে নিয়ে যাওয়া অন্যতম মূল ঘাতক আলবদর নেতা খালেক মজুমদারকে পুলিশ আটক করতে সক্ষম হয়।

গোপন নথিপত্র সংগ্রহ: তদন্ত কমিটি মিরপুর, মোহাম্মদপুর এবং পাকিস্তানপন্থী বিহারি ও রাজাকারদের বিভিন্ন আস্তানা থেকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের তালিকা, নির্দেশনামা এবং একাধিক গোপন ভিডিও ও অডিও রেকর্ড সংগ্রহ করে।

২৫ জানুয়ারির ঐতিহাসিক সংবাদ সম্মেলন

১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি, জাতীয় প্রেস ক্লাবে জহির রায়হান এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেন। সেখানে বিষাদ ও ক্ষোভঘন কণ্ঠে তিনি এক যুগান্তকারী ঘোষণা দেন:

"আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ছিল এক চরম আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চক্রান্তের নীলনকশা। আমার কাছে এই বুদ্ধিজীবী গণহত্যার নীল নকশা এবং আলবদর ও তাদের দোসরদের গোপন নথিপত্র এসে পৌঁছেছে। খুব শীঘ্রই আমি সাংবাদিক সম্মেলন করে এই নথিপত্র ও ভিডিও প্রমাণাদি পুরো বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত করব।"

ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, ২৫ জানুয়ারির এই দুঃসাহসিক ঘোষণাই মূলত জহির রায়হানের জীবনের ওপর মৃত্যুপ পরোয়ানা জারি করে দেয়। কারণ এই নথিতে কেবল পাকিস্তানি সেনা বা রাজাকারের নাম ছিল না, বরং অনেক ছদ্মবেশী ক্ষমতাবান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নামও থাকার সম্ভাবনা ছিল।

কালরাতের রহস্যময় ফোনকল এবং ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২: মিরপুর ট্র্যাজেডির পুঙ্খানুপুঙ্খ ঘটনাক্রম

২৫ জানুয়ারির ঘোষণার পর থেকেই জহির রায়হানের ওপর অদৃশ্য ছায়ার নজরদারি শুরু হয়। তিনি সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানীর সাথে যোগাযোগ রেখে মিরপুর অঞ্চলে সামরিক অভিযানের সময়সীমা জানতে চাচ্ছিলেন।

কালরাতের ফোনকল ও বিতর্ক

৩০ জানুয়ারি সকালে জহির রায়হানের বাসায় একটি টেলিফোন আসে। এই টেলিফোন কে রিসিভ করেছিলেন, তা নিয়ে দুটি প্রধান তথ্য পাওয়া যায়:

১. সুরাইয়া খানম ও পান্না কায়সারের বক্তব্য: জহির রায়হানের ছোট বোন ডা. সুরাইয়া খানম দাবি করেন, তিনিই ফোনটি ধরেছিলেন এবং জহির রায়হানকে ডেকে দিয়েছিলেন। অপরপক্ষে পান্না কায়সার জানান ফোনটি তিনি ধরেছিলেন।

২. ফোনকারীর পরিচয়: জহির রায়হানের প্রথম স্ত্রী, অভিনেত্রী সুমিতা দেবী জানিয়েছিলেন, মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের (USIS) কর্মী রফিক নামের একজন কল করে জানিয়েছিলেন যে মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনে শহীদুল্লাহ কায়সারসহ বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী বন্দি অবস্থায় বেঁচে আছেন। অন্য সূত্রে জানা যায়, রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর প্রটোকল অফিসার অথবা আসগর আলী মাস্তানা নামের এক বিহারি অভিনেতার পক্ষ থেকেও কল এসেছিল।

বার্তার সারমর্ম ছিল "আজ সকালে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মিরপুরে অপারেশন চালাবে। এখনই না গেলে আপনার ভাইকে আর জীবিত পাবেন না।"

মিরপুরের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি (জানুয়ারি ১৯৭২)

এখানে জানা আবশ্যক যে, ১৬ ডিসেম্বর পুরো বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও মিরপুর এবং মোহাম্মদপুর অঞ্চল তখনো স্বাধীন হয়নি। তৎকালীন মিরপুর ছিল পাকিপন্থী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হাজার হাজার বিহারি, আলবদর ও আত্মগোপনকারী রাজাকারদের এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে মিরপুর স্বাধীন হয়। অর্থাৎ, ৩০ জানুয়ারি মিরপুর ছিল এক মিনি-পাকিস্তান ও যুদ্ধের ময়দান।

মিরপুর ১২ নম্বরের অভিশপ্ত রক্তপাত

টেলিফোন পেয়ে উন্মাদপ্রায় জহির রায়হান দেরি না করে জাফরিয়া হাবিব, শাহরিয়ার কবির, শ্যালক বাবুল, আবদুল হক, নিজাম ও পারভেজকে সাথে নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে করে মিরপুরের দিকে রওনা হন।

চেকপোস্টে আটকে দেওয়া: মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে সেনাসদস্য ও পুলিশ নিরাপত্তার স্বার্থে অন্যান্য বেসামরিক সহগামীদের আটকে দেয়। কিন্তু জহির রায়হান সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের দলটির সাথে সাংবাদিক ও বিশেষ অনুমোদিত ব্যক্তি হিসেবে প্রবেশের সুযোগ পান।

প্রত্যক্ষদর্শী আমির হোসেনের রোমহর্ষক সাক্ষ্য: ভারতীয় সেনাবাহিনী ও ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের যৌথ স্কোয়াডের সাথে প্রবেশ করেছিলেন সাংবাদিক আমির হোসেন। তাঁর বিবরণী অনুযায়ী, সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনে (নূরী মসজিদের কাছে) পৌঁছামাত্র চারপাশের ছাদ, গলি এবং ঘরবাড়ি থেকে অতর্কিতে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, মেশিনগান এবং হ্যান্ড গ্রেনেড দিয়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশের ওপর প্রলয়ঙ্করী হামলা চালানো হয়।

মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনে অতর্কিত হামলা ─► সামরিক স্কোয়াড ছত্রভঙ্গ ও ব্যাপক হতাহত


জহির রায়হান গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন


বিহারি ঘাতকরা তাঁকে টেনে পশ্চিম দিকে নিয়ে যায়

ঘটনাস্থলেই মৃত্যু ও গুম: বিহারি ঘাতক ও আলবদরদের এই ভারী হামলায় পুলিশের তৎকালীন এসপি জিয়াউল হক লোদী, সেনাবাহিনীর লেফট্যানেন্ট সেলিম এবং ৪২ জন সেনাসদস্য তাৎক্ষণিক শহীদ হন। আমির হোসেন প্রত্যক্ষ করেন যে, ছিটকে আসা একটি গুলিতে জহির রায়হান মারাত্মকভাবে আহত হয়ে একটি পানির ট্যাংকের গায়ে ঢলে পড়েন। এরপর বিহারিরা তাঁকে পশ্চিম দিকে নূরী মসজিদের অলিগলির দিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। তাঁর লাশ আর কখনোই পাওয়া যায়নি।

১৯৯৯ সালে মুসলিম বাজার বধ্যভূমি আবিষ্কার ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ

দীর্ঘ ২৭ বছর পর, ১৯৯৯ সালে ঢাকার মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনে নূরী মসজিদের সম্প্রসারণ ও কূপ খননের কাজ করার সময় মাটি খুঁড়তেই বেরিয়ে আসে শত শত মানুষের মাথার খুলি, হাড়গোড় এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র।

প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদরা নিশ্চিত হন যে, এই স্থানটিই ছিল ৩০ জানুয়ারির সেই রক্তক্ষয়ী আম্বুশ বা গণহত্যার কেন্দ্রস্থল যা মুসলিম বাজার বধ্যভূমি নামে পরিচিতি পায়। উদ্ধৃত এই আলামতগুলো বর্তমানে ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

গুমের নেপথ্য কারণ ও সম্ভাব্য থিওরি সমূহের ব্যবচ্ছেদ

জহির রায়হানের গুম হওয়া নিয়ে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে চারটি প্রধান তত্ত্ব বা থিওরি প্রচলিত রয়েছে:

বিহারি ও আলবদরদের অতর্কিত হামলা (সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও প্রমাণিত তত্ত্ব)

মিরপুরে অবস্থানরত সশস্ত্র পাকিস্তানপন্থী বিহারি ও আলবদর ঘাতকদের মূল লক্ষ্য ছিল সামরিক বাহিনীকে ফাঁদে ফেলা। আর জহির রায়হান ছিলেন প্রপাগান্ডা যুদ্ধের প্রধান নায়ক। আখতার গুন্ডা ও মেহের মেম্বারের মতো কুখ্যাত বিহারি নেতৃত্বাধীন ঘাতক দল জহির রায়হানকে চিনে ফেলে এবং গুলিবর্ষণ করে হত্যা করে তাঁর দেহ গুম করে ফেলে। প্রত্যক্ষদর্শী ও সামরিক নথি এই তত্ত্বকেই সর্বাধিক সমর্থন করে।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নথিপত্র গুমের রাজনৈতিক চক্রান্ত

অনেকে সন্দেহ করেন যে, জহির রায়হানের কাছে থাকা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নথিতে এমন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ছিল, যারা স্বাধীনতার পর নতুন সরকারে বা প্রশাসনিক কাঠামোতে নিজেদের সুসংগঠিত করেছিলেন। জহির রায়হান ২৫ জানুয়ারি নথিপত্র প্রকাশের যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা সেই অশুভ চক্রের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাঁকে ফোন করে ভুল তথ্যের ফাঁদে ফেলে মিরপুরের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়।

পাকিস্তানের প্রপাগান্ডা প্রতিশোধ ও আন্তর্জাতিক সংযোগ

'স্টপ জেনোসাইড'-এর মাধ্যমে পাকিস্তান সরকারের যে চরম চরিত্র উন্মোচন হয়েছিল, তার কারণে আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তান কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। পাক সামরিক জান্তা এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর দূরবর্তী হিটলিস্টে জহির রায়হানের নাম শীর্ষস্থানে ছিল।

বামপন্থী রাজনৈতিক আদর্শগত বৈরিতা

জহির রায়হানের আপসহীন বামপন্থী জাতীয়তাবাদী অবস্থান এবং ক্ষমতার বলয়ের বাইরে গিয়ে এককভাবে সত্য অনুসন্ধানের স্পর্ধা তৎকালীন কিছু কট্টর রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে ক্ষুব্ধ করেছিল।

অপপ্রচার বনাম ঐতিহাসিক সত্য: জহির রায়হানের অবদান

বিভিন্ন সময় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও কুচক্রী মহল অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করেছে যে, জহির রায়হানের কাছে নাকি তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতাদের নেতিবাচক ভিডিও চিত্র ছিল এবং সে কারণেই তাঁকে গুম করা হয়।

তবে এই অপপ্রচারের মূল উপড়ে দিয়েছেন খোদ জহির রায়হানের ছায়াসঙ্গী ও সাংবাদিকরা।

সঙ্গীদের সাক্ষ্য: ৩০ জানুয়ারি জহির রায়হানের সাথে গাড়িতে থাকা সহকর্মী ও স্বজনরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, জহির রায়হান কেবল মিরপুরের সামরিক উদ্ধার অভিযানের ছবি ও ফুটেজ তোলার জন্য সাথে ক্যামেরা নিয়েছিলেন। কোনো রাজনৈতিক নেতার স্ক্যান্ডাল বা ফুটেজ তাঁর গাড়িতে ছিল না।

সত্যিকারের লক্ষ্য: তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে মুক্ত করা এবং আলবদর প্রধানদের বিচার সুনিশ্চিত করা। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তিই মূলত এই ঘটনাকে ভিন্নখাতে পরিচালিত করার জন্য এসব বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায়।

এক নজরে জহির রায়হানের জীবন, কর্ম ও গুমের ঐতিহাসিক বিবরণ

পাঠকের সুবিধার্থে জহির রায়হানের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, সাহিত্য, চলচ্চিত্র এবং নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাবলী নিচে একটি সংগঠিত সারণীতে উপস্থাপন করা হলো:

পরিমাপক / বিবরণী ক্ষেত্র

বিস্তারিত ঐতিহাসিক তথ্য

পূর্ণ নাম

জহিরুল হক (ছদ্মনাম ও পরিচিতি: জহির রায়হান)

জন্ম তারিখ ও স্থান

১৯ আগস্ট ১৯৩৫; গ্রাম: মজুপুর, সোনাগাজী, ফেনী জেলা

পারিবারিক পরিচয়

পিতা: মওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ; জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা: শহীদুল্লাহ কায়সার

শিক্ষাগত যোগ্যতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) (১৯৫৮)

রাজনৈতিক আদর্শ

সমাজতন্ত্র, বামপন্থী চেতনা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ

ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী ১০ জনের প্রথম দলের সদস্য ও কারাবরণ

প্রখ্যাত উপন্যাসসমূহ

শেষ বিকেলের মেয়ে (১৯৬০), হাজার বছর ধরে (১৯৬৪), আরেক ফাল্গুন (১৯৬৯), আর কত দিন (১৯৭০)

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রসমূহ

কখনো আসেনি (১৯৬১), কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩), বাহানা (১৯৬৫), জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০)

মুক্তিযুদ্ধে অবদান

'স্টপ জেনোসাইড' (Stop Genocide), 'লিবারেশন ওয়ার' প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ ও শরণার্থী ফান্ডে দান

সংগঠন ও পদবী

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ লিবারেশন কাউন্সিল অব ইনটেলিজেন্সিয়া

পুরস্কার ও সম্মাননা

আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৪), একুশে পদক (১৯৭৭ - মরণোত্তর), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯২ - মরণোত্তর)

ভাই নিখোঁজের তারিখ

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ (আলবদর বাহিনী কর্তৃক শহীদুল্লাহ কায়সার অপহৃত)

প্রেস কনফারেন্সের তারিখ

২৫ জানুয়ারি ১৯৭২ (জাতীয় প্রেস ক্লাবে বুদ্ধিজীবী হত্যার দলিল প্রকাশের ঘোষণা)

গুম / নিখোঁজের তারিখ

৩০ জানুয়ারি ১৯৭২ (স্থান: মিরপুর ১২ নম্বর সেকশন, ঢাকা)

নিখোঁজের প্রত্যক্ষদর্শী

সাংবাদিক আমির হোসেন (২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের স্কোয়াড সঙ্গী)

বধ্যভূমি আবিষ্কার

১৯৯৯ সালে মিরপুর ১২ নম্বরের 'মুসলিম বাজার বধ্যভূমি' (নূরী মসজিদের নিকট)

বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে জহির রায়হানের অমর উত্তরাধিকার

জহির রায়হানের তিরোধান কেবল একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি ছিল না; এটি ছিল সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও মেধার ওপর এক অপূরণীয় আঘাত।

স্বাধীন চলচ্চিত্রের দিকপাল

জহির রায়হান যদি বেঁচে থাকতেন, তবে স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিশ্ব দরবারে অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো। তাঁর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প দীর্ঘকাল ধরে একধরনের অভিভাবকহীনতায় ভুগেছে। তার প্রামাণ্যচিত্র তৈরির স্টাইল আজও তরুণ নির্মাতাদের অনুপ্রাণিত করে।

অমর স্লোগান ও রাজপথের প্রেরণা

১৯৬৯ সালে রচিত তাঁর 'আরেক ফাল্গুন' উপন্যাসের লাইনটি আজ বাংলাদেশের যেকোনো ন্যায়সংগত অধিকার আদায়ের আন্দোলনে মূল স্লোগানে পরিণত হয়েছে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে যেকোনো গণজাগরণে জহির রায়হানের পংক্তি রাজপথে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে।

ছেলের সন্ধান ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা

জহির রায়হানের পুত্র অনল রায়হান পরবর্তীতে 'পিতার অস্থির সন্ধানে' শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে পিতার গুমের রহস্য উন্মোচনে কাজ করেন। তৎকালীন সময় 'দৈনিক ভোরের কাগজ' (১৯৯৯) এবং 'দৈনিক প্রথম আলো' অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে জহির রায়হানের অবদানের সত্যতা তুলে ধরে।

উপসংহার

জহির রায়হান ছিলেন এমন এক অগ্নিপুরুষ, যিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সত্য বলতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। তুলির আঁচড়ে সৌন্দর্য আঁকার পাশাপাশি তিনি সেই তুলি দিয়েই শোষকের চাবুকের দাগ ফুটিয়ে তুলেছিলেন সেলুলয়েডের ফিতায়। দেশের জন্য, পরম শ্রদ্ধেয় ভাইয়ের জন্য এবং নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের ন্যায়বিচারের জন্য তিনি নিজের জীবনকে বাজি ধরেছিলেন।

১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুরের রক্তভেজা মাটিতে জহির রায়হান হয়তো নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর নশ্বর শরীর হয়তো চিরতরে মাটির নিচে হারিয়ে গেছে; কিন্তু তাঁর স্বপ্ন, তাঁর সিনেমা, তাঁর সাহিত্য এবং তাঁর অবিনশ্বর স্লোগান আজও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটা ইটে, পতাকায় এবং রাজপথের মিছিলে প্রকম্পিত হয়।

জহির রায়হান কোনো সাধারণ নাম নন; জহির রায়হান হলেন একটি চেতনার নাম, একটি জ্বলন্ত মশাল, এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক অবিনশ্বর অমীমাংসিত রহস্য। যতদিন বাঙালি থাকবে, যতদিন একুশে ফাল্গুন আসবে, জহির রায়হান ততবার আমাদের মাঝে দ্বিগুণ হয়ে ফিরে আসবেন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.